X
বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২
১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

বাংলাদেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন?

ড. খুরশিদ আলম
১৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৩:২৯আপডেট : ০৪ জুন ২০১৭, ১২:৪৪

খুরশিদ আলম বাংলাদেশে প্রতিদিন কোনও না কোনও হত্যা, ধর্ষণের মতো মারাত্মক অপরাধ নিয়মিত ঘটছে। প্রতিদিন এ ধরনের অপরাধের বিষয় নিয়ে পত্রিকায় এবং টেলিভিশনের টকশোগুলোতে আলোচনা হচ্ছে; কারণ কিছু কিছু ঘটনা সবাইকে বেশ নাড়া দেয় যেমন খাদিজা হত্যাচেষ্টা। কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া তনু হত্যাকাণ্ড কিংবা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীরসহ ঢাকায় ঘটে যাওয়া বিভিন্ন হত্যার ঘটনা বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া হলি আর্টিজানের ঘটনা কিংবা শোলাকিয়ার ঘটনা এখানে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সরকারের সমালোচকরা তীব্র স্বরে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি হয়েছে বলে উল্লেখ করছেন। এসব প্রতিক্রিয়া থেকে অবশ্য আইন-শৃঙ্খলার আসল পরিস্থিতি বোঝার তেমন উপায় নেই। তাই এখানে দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
দেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ অপরাধ হয় তারমধ্যে হত্যার পরিমাণ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী ২০১৫ সালে ছিল ৪০৩৫ টি। এই হত্যার পরিমাণ ২০১৩ সালে ছিল প্রতিলাখে বাংলাদেশে ২.৭, ভারতে ৩.৫, পাকিস্তানে ৭.৭, শ্রীলংকায় ৩.৭, মালদ্বীপে ৩.৯, ভুটানে ১.৭ এবং পাশ্ববর্তী দেশ মায়ানমারে ১৫.৩। বাংলাদেশে হত্যার হার দীর্ঘদিন ধরে প্রায় একই রকমের। পুলিশের সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী ২০০২ সালে ছিল ৩৫০৩টি যা ২০১৫ সালে হয়েছে ৪০৩৫টি। হত্যার হারে দেখা যায় যে, বাংলাদেশে ২০০২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ১.০৯% বেড়েছে অর্থাৎ জনসংখ্যার তুলনায় সে সময়ে প্রকৃত হত্যার হার কমেছে। আবার দেখা যায় যে, ২০১৪ থেকে ২০১৫ এসে হত্যা, চুরি এবং ডাকাতির পরিমাণ কিছুটা কমেছে। তবে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া হত্যাগুলো সংখ্যার দিক দিয়ে বড় না হলেও এটি সমাজের উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিশেষ করে পেশাজীবীদের মধ্যে বড় ধরনের ভীতির সঞ্চার করেছে। অপরাধের চেয়ে অপরাধ-ভীতি মানুষের জন্য বেশি ক্ষতিকর।

অপহরণ এখনও একটি বড় সমস্যা কারণ ২০১৫ সালে ছিল ৮০৬ টি তবে তা ২০১৪ সালের তুলনায় কিছুটা কমেছে (৯২০); কিন্তু প্রতিদিন তা ছিল ২.২০ জন বা প্রতি ১১ ঘণ্টায় ১ জন করে অপহরণ হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদী তথ্য দেখলে দেখা যায় যে, পুলিশের ওপর হামলা ২০০২ সাল (২৮১) থেকে ২০১৫ (৬২৯) এসে দ্বিগুনেরও বেশি বেড়েছে।

আবার জাতিসংঘের অপরাধ এবং ড্রাগ সংক্রান্ত তথ্য থেকে দেখা যায় যে, সর্বমোট হত্যা ছিল ২০১৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৭,০৬৮ জন; আমেরিকায় ১২,২৫৩ জন; ব্রাজিল ৫০,১০৮ জন; চীনে ১১,২৮৬ জন; ভারতে ৪৩,৩৫৫ জন; পাকিস্তানে ১৩,৮৪৬ জন এবং রাশিয়ায় ১২,৭৮৫ জন। হত্যার ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, আমেরিকা মহাদেশে যেখানে গড়ে ১৬.৩ জন, এশিয়ায় সেখানে মাত্র ২.৯ জন। আর বাংলাদেশে এশিয়ার হারের চেয়েও কম আছে।

বাংলাদেশে ২০১৫ সালে ধর্ষণ ছিল ৮৪৬ জন বা প্রতিদিন ২.৩২ জন যার মধ্যে মৃত্যু ঘটেছে ৬০ জনের (৭.০%)। আবার ৭-১২ বছরের যারা তাদের সংখ্যা ছিল ১৬৩ (১৯.২৭%) জন এবং ৬ বছরের নিচে যারা তাদের সংখ্যা ছিল ৫৩ (৬.২৬%) জন যা প্রায় বড়দের এক তৃতীয়াংশ। যাই হোক, বাংলাদেশে দু’ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় যার একটি হচ্ছে এটিকে অনেকে অপরাধের দিক থেকে অনেক বেশি মনে করেন আবার আরেক ধরনের লোক আছেন যারা মনে করেন যে, এটি তেমন বেশি নয়। এখন এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

একটি দেশে অপরাধ কতটা হবে তা নির্ভর করে প্রাধানত দুটি বিষয়ের ওপর যার একটি হচ্ছে সে দেশের মানুষের মধ্যে সামাজিক সংহতি কতটা আছে এবং দ্বিতীয়ত সে দেশের মানুষের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা কেমন। বাংলাদেশের পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, কিছু কিছু জেলা অপরাধের দিক থেকে অনেক এগিয়ে, আবার কিছু কিছু জেলায় অপরাধ প্রবণতা কম। বাংলাদেশে অপরাধ কম হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে এ দেশে মানুষের মধ্যে এখনও সামাজিক সংহতি অনেক বেশি যদিও তা এখন দিন দিন কমে আসছে। সকল ক্ষেত্রে আধুনিকীকরণের ফলে এই সামাজিক সংহতি কমে আসবে যা স্বাভাবিক।

ড্রাগের পরিমাণ যত বাড়বে, ততই ড্রাগ সম্পর্কিত অপরাধ বাড়বে। যদি মনে করা হয় যে, ড্রাগ গ্রহণকে প্রতিহত করা হবে না অথচ অপরাধ কমানো হবে তবে তা কখনও সম্ভব নয়। তেমনি মোবাইল ফোনের ব্যবহারের মাধ্যমে কিংবা ইন্টারনেট ভিত্তিক অপরাধ দিন দিন বেড়ে চলেছে যা নিয়ন্ত্রণের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া দরকার। মোবাইলের রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও সুবিধা দেবে। একইভাবে ইন্টারনেটের মাধ্যমে যে-সব অপরাধ হচ্ছে সেগুলো উন্নতর প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।   

বাংলাদেশে বর্তমানে অপরাধ কম আছে বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার তুলনায়। তবে এতে আত্মতৃপ্তির কোনও সুযোগ নেই বরং বর্তমান সামাজিক ও আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সক্রিয় করতে পারলে তা আরও কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। অপরাধ দমনে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ যত বেশি নেবে ততই এর কার্যকারিতা বাড়বে যেমন ইভ-টিজিং বা এসিড নিক্ষেপের ক্ষেত্রে যে সাফল্য দেখা গেছে। উল্লেখ্য, লক্ষ্য হচ্ছে আমরা অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করবো, অপরাধী নির্মূল নয়। তবে কখনও কখনও তা করা হয় না এমন নয়, বিশেষ করে দাগী অপরাধীর ক্ষেত্রে।

সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর ফলে অপরাধের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে পশ্চাৎপদ গোষ্ঠী তথা কর্মজীবী মানুষ যেমন রিকসাওয়ালা কিংবা গার্মেন্টস শ্রমিকদের মধ্যে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা সামাজিক সংহতি বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। পরিবহন শ্রমিক, কৃষি শ্রমিকসহ আরও বিভিন্ন উপেক্ষিত গোষ্ঠীদের মধ্যে প্রতিভা অন্নেষণসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মকাণ্ড সামাজিক সংহতি বৃদ্ধিতে কার্যকর হতে পারে।

বাংলাদেশের অনেকগুলো সুবিধা আছে যা এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে নেই। এ দেশের বেশিরভাগ লোক একই ভাষাভাষী। তাদের মধ্যে বিভিন্ন বর্ণ, জাতি ইত্যাদি পরিচয়ের কারণে দ্বন্ধ-সংঘাত তেমন একটা হয় না। রাজনৈতিক কারণে সংগঠিত অপরাধ এখনও মোট অপরাধের ১৫% বেশি নয় বলে ধারণা করা যায়। কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সামান্য কিছু হানাহানি বা সংঘাত হয়ে থাকে। নারীর প্রতি সহিংসতা পরিবারে যতটা হয় ততটা পরিবারের বাইরে হয় না। তবে পরিবারের বাইরে অস্বস্তিকর বিষয়গুলো বেশি ঘটে থাকে যা সভ্যতার পরিপন্থী। এটির অবস্থা উন্নত করা অতি সহজ, কেবল উদ্যোগ নিলেই তা করা সম্ভব। রক্ত সম্পর্ক এখনও পারিবারিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করে রেখেছে। ফলে এখনও পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন অপরাধকে চরমভাবে নিরুৎসাহিত করে।

মানুষ এখনও কারও বিপদে একযোগে এগিয়ে আসে। গোষ্ঠীভিত্তিক উদ্যোগ নিয়ে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করতে দেখা যায়। এখনও একজন আরেকজনের কষ্ট দেখলে এগিয়ে আসে। এ-সব মূল্যবোধকে যত বেশি লালন করা যাবে তত অপরাধ কমিয়ে রাখা যাবে। ধর্মীয় অনুশাসন এখনও যথেষ্ট কার্যকর। বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান সামাজিক টানাপোড়নকে প্রশমিত করতে বেশ সাহায্য করছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণের সামাজিক চেষ্টা বৃদ্ধি না করে কোর্টের সংখ্যা বৃদ্ধি বা পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি করলে রাষ্ট্রের খরচ যতটা বাড়বে অপরাধ ততটা কমবে না।

লেখক: চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল রিসার্চ ট্রাস্ট 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
জয়দেবপুর স্টেশনে অবস্থান কর্মসূচি, ট্রেন চলাচল বিঘ্নিত
জয়দেবপুর স্টেশনে অবস্থান কর্মসূচি, ট্রেন চলাচল বিঘ্নিত
পাহাড়ে দুর্বৃত্তের গুলিতে যুবক নিহত
পাহাড়ে দুর্বৃত্তের গুলিতে যুবক নিহত
মাস্টারকার্ড এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড পেলো প্রাইম ব্যাংক
মাস্টারকার্ড এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড পেলো প্রাইম ব্যাংক
শুরু হলো অনলাইন প্রপার্টি মেলা
শুরু হলো অনলাইন প্রপার্টি মেলা
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ