X
রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০২৪
৮ বৈশাখ ১৪৩১

‘ওনার এক ইতিহাস আছে’

ড. জোবাইদা নাসরীন
২১ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৬:১৬আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৭:৩১

জোবাইদা নাসরীন এক.
যশোরের গুরুদাসীকে সবাই ‘পাগলি’ হিসেবে জানতো। সেই ‘পাগলি’ গুরুদাসীকে নিয়ে ইয়াসমীন কবীরের ছবি ‘এ সারটেন লিবারেশন’। এই ছবিতে গুরুদাসী সারা যশোর ঘুরে বেড়ায়। অনেকে তাকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করে। এই হাসিঠাট্টার মধ্যেই একজন বিক্রেতা বলেন, ‘ওনার এক ইতিহাস আছে, এ জন্য ইনি এই রকম’। কী সেই ইতিহাস? যে ইতিহাস গুরুদাসীকে ‘এই রকম’ করেছে? যে ইতিহাস সবাই জানে, আবার জানেও না, যে ইতিহাসের ভেতর থাকে অনেক ইতিহাস, যে ইতিহাসকে ঢেকে দেওয়া হয় ‘ইজ্জত’ শব্দের আড়ালে, যে ইতিহাসকে ভুলে যাওয়ার জন্যই বারবার স্মরণ করা হয়।
৩০ লাখ শহীদ আর ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর এই লাইনটি সবচেয়ে বেশি শোনা যায়। আমার খুব স্পষ্টভাবে মনে আছে আমার ভাগনে খুব ছোট বয়সে একবার আমার মাকে জিজ্ঞাসা করলো, ইজ্জত কী? এটি কিভাবে যায়? আর ওটার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধেরই বা কী সম্পর্ক? আমার মা কিছু বলেননি, বলতেও পারেননি। একটি ছোট বাচ্চাকে কিভাবে ধর্ষণ বোঝাবেন? ইজ্জত বোঝাবেন? বলেছেন নারীদের ওপর ‘অত্যাচার’ হয়েছে, ১৯৭১ সালে। আর এই ‘অত্যাচার’ই ছিল নারীর সেই সময়ের অভিজ্ঞতা বোঝানোর ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ শব্দ। কিন্তু সেই অত্যাচারের ইতিহাস কী প্রক্রিয়ায় শুধু ‘ইজ্জত’-এর পরিমাপক হয়ে উঠলো, তা বোঝা জরুরি। আমার মা-ই নন, আজও স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও কিভাবে ধর্ষণের মতো একটি মানবতাবিরোধী অপরাধকে 'ইজ্জত'-এর আব্রু দিয়ে ঢেকে সহনীয় করে তোলা হয়! লক্ষ করার বিষয় এই যে, কিভাবে এই নারীর বয়ানের 'অত্যাচার' শব্দটিও ধর্ষণের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়নি।

দুই.
তবে গুরুত্বপূর্ণ এই যে, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষণের শিকার নারীদের 'বীরাঙ্গনা' (বীর যে নারী) উপাধি দিয়ে ইতিহাসে একটি বিরল নজির তৈরি করে, পৃথিবীর আর কোনও দেশের ইতিহাসে আজ পর্যন্ত এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এই সিদ্ধান্ত ১৯৭১ সালেই হয়েছিল। মুজিব নগর সরকারের পক্ষ থেকে এএইচএম কামরুজ্জামান ১৯৭১ সালের ২৩ ডিসেম্বর রেডিওতে এই ঘোষণা দেন যে, 'All young girls and women who had been subjected to inhuman torture by the occupying Pakistani army during the war would all be accorded with respect as biranganas of the Bangladesh liberation struggle (Purbodesh, December 23, 1971, নেওয়া হয়েছে মুখার্জী ২০১৬, পৃষ্ঠা ১৩০). বীরাঙ্গনা নারীদের সামাজিক প্রতিষ্ঠার জন্য নেওয়া হয় বিভিন্ন উদ্যোগ। এরই ধাপ হিসেবে পরবর্তী সময়ে তৈরি করা হয় নারী পুনর্বাসন কেন্দ্র, সরকারি চাকরি দেওয়া হয় অনেককে। নব্বই দশকের শুরুর দিকে এই নারীদের ন্যারেটিভ নিয়ে প্রথম বই বের করেন ড. নীলিমা ইব্রাহিম, তিনি ওই পুনর্বাসন কেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। বইটি ছেপেছিলেন গতবছর জঙ্গিদের হাতে খুন হওয়া ব্লগার এবং প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন। মুক্তিযুদ্ধের যে প্রথম সার্টিফিকেট প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া হয়েছিল, সেখানে লেখা ছিল বীর/বীরাঙ্গনা ছিল। অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনারা সমান মর্যাদায় ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধের নতুন সার্টিফিকেট যেটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেয়, সেখান থেকে ‘বীরাঙ্গনা’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। সর্বশেষ মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় যে সনদ দিয়েছে, সেটিতেও এই বীরাঙ্গনাকে সার্টিফিকেট থেকে খারিজ করা জয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই যে, মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক সব নাটক, সিনেমা, বইপত্রের কিছুতেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলতে গেলে সেখানে বীরাঙ্গনা একটি চরিত্র থাকে। সে বীরাঙ্গনারা বেশিরভাগই অসহায়, দুর্বল, ‘পাগলি’ কিংবা আত্মহত্যা করে।
কিন্তু গবেষণা বলে ভিন্ন কথা। যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালেয়র শিক্ষক ড. নয়নিকা মুখার্জী তার বই Spectral Wound: sexual violence, public memories and the Bangladesh war of 1971 (২০১৫)-এ দেখান, সেই নারীরা দুর্বল নয়, তারা পরিবারের মধ্যেই ছিলেন, আছেন, পারিবারিক ও সামাজিক পরিসরের সঙ্গে প্রতিনিয়ত তাদের মতো করে বোঝাপড়া করে।
রাষ্ট্র কিভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কাগজপত্র থেকে এই নারীদের গায়েব করেছে, সেই প্রশ্ন কেউ কখনও তোলেনি। কিংবা মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেটের ভাষাগত পরিবর্তন কেন হলো কিংবা কারা এই কাজ করেছেন, সেটি খোলাসা হওয়া জরুরি। প্রতিষ্ঠানিকভাবে গায়েব হওয়া এই নারীরা নাটক সিনেমায় চরিত্র হিসেবে সদা উপস্থিত থাকলেও ব্যক্তিগত জীবনে বেশিরভাগই দরিদ্র। হয়তো দরিদ্র বলেই আমরা তাদের কথা জানতে পেরেছি। ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষীনী ছাড়া কোনও মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চবিত্ত নারীর ন্যারেটিভ এখন পর্যন্ত পাবলিকলি জানি না। তবে গত পঁচিশ বছরে এই বিষয়ে গবেষণা ও প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে অনেক নারীর ৭১’ এবং তার পরবর্তী জীবন নিয়ে দেন দরবারের ইতিহাসের কিছু কিছু আমরা জানতে পারি। ২০১৩ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সর্বোচ্চ বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চ থেকে নতুন ধারায় স্লোগান ওঠে ‘আমার মা বীরাঙ্গনা, তাই আমরা আপসহীনা’ এবং ; আমাদের ধমনীতে বীরাঙ্গনার রক্ত, এই রক্ত কোনও দিনও পরাজয় মানে না'-যার মাধ্যমে বীরাঙ্গনা পরিচয়টি একটি সামষ্টিক গর্বের অঙ্গীকার হয়ে দাঁড়ায়।
বলা হচ্ছে এই প্রথম এ নারীরা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেন এবং কিন্তু বীরাঙ্গনা নারীর বীর হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিও ঘটেছিল ১৯৭১ সালেই। তবে তাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি এবং গেজেটভুক্তি তাদের হারানো পরিসর ফিরে পাওয়ার মতো। বলা যায় যে, এটি হলো তাদের স্বীকৃতির পুনঃপ্রাতিষ্ঠানিক স্মরণ।

তিন.
গতমাসের ১৫ তারিখে ১০ জন বীরাঙ্গনা এসেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আর সি মজুমদার অডিটরিয়ামে। তাদের বেশিরভাগই ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলে থাকেন এবং ভিক্ষা করতেন। এখন ওনাদের নাম তালিকাভুক্ত হয়নি। কারণ তাদের বয়স সংক্রান্ত জটিলতা। জন্মতারিখ না জানা এবং ভোটার পরিচয়পত্রে ভিন্ন জন্মতারিখ থাকায় মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তাদের বয়সের গড়মিল দেখা যায়। তবে আশার কথা, এই বিষয়ে কাজ চলছে। তাদের মধ্যে দুই-একজন বলেছেন, ওনাদের দুই-একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি করা হয়েছিল এবং তারা সম্মানিত বোধ করেছেন। এই সম্মানটুকুর জন্য তারা বেঁচেছিলেন।
বেশিরভাগ বীরাঙ্গনাই আর বেঁচে নেই। এই বীরাঙ্গনাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে হারিয়ে যায় বাংলাদেশে নামক একটি রাষ্ট্রের জন্মের এক একটি অগ্রন্থিত ইতিহাস। তাই যারা বেঁচে আছেন তাদের যুদ্ধ ও পরবর্তী ইতিহাস জেনে নেওয়া এবং জানিয়ে দেওয়ার সময় এখনই।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ইমেইল: [email protected]

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
জাবির ডিন নির্বাচন ১৫ মে
জাবির ডিন নির্বাচন ১৫ মে
সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বাংলাদেশ সবসময় প্রস্তুত: প্রধানমন্ত্রী
সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বাংলাদেশ সবসময় প্রস্তুত: প্রধানমন্ত্রী
হাইকোর্টে ফের মিন্নির জামিন আবেদন
হাইকোর্টে ফের মিন্নির জামিন আবেদন
আগের চেয়েও অনেক বেশি ফিট আমির
আগের চেয়েও অনেক বেশি ফিট আমির
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ