X
শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২
১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

আমাদের কিংবদন্তি সাকিব আল হাসান

রিয়াজুল হক
৩০ জুন ২০১৯, ১৩:৪৬আপডেট : ৩০ জুন ২০১৯, ১৩:৫৮

রিয়াজুল হক একজন ক্রিকেটার কতটা দায়িত্ব নিয়ে দেশের জন্য খেলতে পারে, সাকিব আল হাসান সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তাকে ‘ব্যাটসম্যান কাম বোলার’ বলবো, নাকি ‘বোলার কাম ব্যাটসম্যান’—সেটা নিয়েও বিস্তর আলোচনা করা যেতে পারে। আর ফিল্ডিংয়ের কথা যদি বলি, সেখানেও সাকিব এক নম্বর। যে কারও থেকে অনেক এগিয়ে। কোনও ম্যাচে আমাদের কোনও খেলোয়াড় যদি ক্যাচ মিস করে, তাহলে অনেক দর্শককে বলতে শুনি—সাকিব থাকলে এই ক্যাচ মিস হতো না। ওইখানে সাকিব কেন নেই? সবাই সাকিবকে কল্পনা করে নেয়। কারণ একটি খেলায় কেউ যদি সবদিক থেকে নির্ভরতার প্রতীক হয়ে যায়, তাহলে সবাই তাকে সবখানেই চাইবে। সাকিবের ক্ষেত্রেও তেমনই হয়েছে।
বাংলাদেশের খেলা থাকলে বন্ধুরা একসঙ্গে বসে খেলা দেখে থাকি। যদি বাংলাদেশের রান রেট বেশি প্রয়োজন হয়, তবে সবাই সাকিব কখন মাঠে নামবে সেই প্রার্থনা করে। অর্থাৎ ক্রিজের ব্যাটসম্যান আউট হলে হোক। সাকিব মাঠে নামুক। সাকিব আমাদের ক্রিকেটের জন্য প্রেরণা, নির্ভরতা এবং আস্থার নাম। একই সঙ্গে বিনোদনের নাম। কারণ ব্যাট হাতে থাকলে যেমন চার-ছক্কা দেখা যায় আবার বল হাতে উইকেট শিকার। সাকিব সম্পর্কে যাই বলা হোক, আসলেই কম বলা হবে। ছোট দেশে জন্ম নেওয়া বিশ্বমানের কিংবদন্তি খেলোয়াড়। যে একাই একটা দলকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। দুটি দলের মধ্যে পার্থক্য যে শুধু সাকিবের কারণে হয়, সেটা এখন অনেক দেশের খেলোয়াড় স্বীকার করে নেয়। প্রকাশিত তথ্য মতে, শুধু বিশ্বকাপে মঞ্চে সাকিব আল হাসানের কিছু কীর্তি আমরা জেনে নেই।

১. প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বকাপে এক ম্যাচে ৫ উইকেট। (বিশ্বকাপে বাংলাদেশের হয়ে সেরা বোলিংয়ের কীর্তি ছিল এর আগে শফিউল ইসলামের, ২০১১ বিশ্বকাপে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ২১ রানে নিয়েছিলেন ৪ উইকেট)। বাংলাদেশ-আফগানিস্তান ম্যাচ পর্যন্ত সাকিবের ২৯ রানে ৫ উইকেট, যা বিশ্বকাপের সেরা বোলিং।

২. প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে এক বিশ্বকাপে অন্তত ৪০০ রান ও ১০ উইকেট।

৩. যুবরাজ সিংয়ের পর দ্বিতীয় ক্রিকেটার হিসেবে বিশ্বকাপের কোনও ম্যাচে ৫০ রান ও ৫ উইকেট নেওয়ার কীর্তি।

৪. প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে বিশ্বকাপে অন্তত দুটি সেঞ্চুরি ও দু’বার চারটি করে উইকেট নেওয়ার গৌরব।

৫. বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে অন্তত ১ হাজার রান ও ৩০-এর বেশি উইকেট

৬. কপিল দেব ও যুবরাজ সিংয়ের পর তৃতীয় ক্রিকেটার হিসেবে এক বিশ্বকাপে সেঞ্চুরি ও ৫ উইকেট।

৭. বাংলাদেশের হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রান ও সর্বোচ্চ উইকেট।

বিশ্বকাপে একবার মাত্র বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচ খেলেছে। সেমিফাইনাল,ফাইনাল ম্যাচও কখনও খেলেনি। বিশ্বকাপে অল্প ম্যাচ খেলার পরেও সাকিবের এই কীর্তি। এছাড়া আমাদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ কম। বেশি ম্যাচ খেলে মোড়ল সম্প্রদায়ের দেশগুলো। তাদের রয়েছে আইসিসিতে ক্ষমতাধর ব্যক্তি, টিভি চ্যানেল, বেশি আর্থিক অনুদান দেওয়ার ক্ষমতা ইত্যাদি ইত্যাদি। বাংলাদেশ যদি বেশি ম্যাচ খেলার সুযোগ পেতো, তাহলে সাকিবের আরো বেশি রেকর্ড ঝুলিতে থাকতো। ক্যারিয়ারের দীর্ঘসময় ধরেই সাধারণত তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটেই এক নম্বর র‌্যাংকিংয়ে থাকছেন বিশ্ব ক্রিকেটের এই মহাতারকা সাকিব আল হাসান। যদিও কখনও কখনও অল্প সময়ের জন্য কোনও ফরম্যাটে যদি দুই-তিন র‌্যাংকিংয়ে চলে যান, সেটার মূল কারণ ম্যাচের সংখ্যা কম থাকা।   

সাকিব আল হাসান ক্রিকেট উপভোগ করেন। থাকতে চান নম্বর ওয়ান। থাকছেনও তাই। চাওয়া-পাওয়ার সমন্বয় করেন কঠোর পরিশ্রম দিয়ে। বিশ্বকাপে নিজেকে আরও বেশি ফিট করার জন্য ওজন কমিয়েছেন। এ যেন নিজের সঙ্গেই নিজের প্রতিযোগিতা। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই খালেদ মাহমুদ সুজন বলেছিলেন, সাকিব এই বিশ্বকাপে কিছু করে দেখাতে চান। দেখাচ্ছেনও তাই। বিশ্বকাপের এই আসরে সাকিবের এখন পর্যন্ত রান ৪৭৬, গড় ৯৫.২। বল হাতে উইকেট নিয়েছেন দশটি। একজন খোলোয়াড় ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং সবদিকে থেকে সমান পারদর্শী। জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর তার বিকল্প কাউকে ভাবা যায়নি। বিকল্প পাওয়ার কথাও না।

কী বলবেন সাকিব আল হাসানকে? শুধু অলরাউন্ডার বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তিনি আমাদের ক্রিকেটের প্রেরণার নাম। মাশরাফির গর্বের নাম। আসুন বিশ্বকাপ জয়ী দু’জন লিভিং লিজেন্ড অলরাউন্ডার কপিল দেব এবং ইমরান খানের সঙ্গে সাকিব আল হাসানের ওয়ানডে ক্রিকেটের পারফরমেন্স একটু মিলিয়ে নেই। তাহলে বুঝতে সুবিধা হবে।

১. ইমরান খান ১৭৫ ওডিআই ম্যাচে করেছেন ৩৭০৯ রান (ব্যাটিং গড় ৩৩.৪১) এবং উইকেট নিয়েছেন ১৮২টি। ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়েছেন ১ বার।

২. কপিল দেব ২২৫ ওডিআই ম্যাচে করেছেন ৩৭৮৩ রান (ব্যাটিং গড় ২৩.৭৯) এবং উইকেট নিয়েছেন ২৫৩টি। ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়েছেন ১ বার।

৩. সাকিব আল হাসান ২০৪ ওডিআই ম্যাচে করেছেন ৬১৯৩ রান (ব্যাটিং গড় ৩৭.৫৩) এবং উইকেট নিয়েছেন ২৫৯টি। ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়েছেন ২ বার।

তবে দুঃখের বিষয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের খেলার সংখ্যা কম। সাকিব আল হাসানের ওয়ানডে ক্রিকেটে অভিষেক হয় ৬ আগস্ট ২০০৬। বিশ্বকাপ শুরু পর্যন্ত ২০২টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছেন। অন্যদিকে বিরাট কোহলির ওয়ানডে ক্রিকেটে অভিষেক হয় ১৮ আগস্ট ২০০৮। কোহলিও বিশ্বকাপ শুরু হওয়া পর্যন্ত ২২৭টি ওয়ানডে খেলেছেন। অর্থাৎ সাকিব আল হাসান থেকে ২ বছর পর ওয়ানডে ক্রিকেটে অভিষেক হওয়ার পরেও কোহলি বেশি ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছেন। একই অবস্থা টেস্ট ক্রিকেটের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। সাকিব আল হাসানের টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক হয় ১৮ মে ২০০৭। এ পর্যন্ত ৫৫টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছেন। অন্যদিকে বিরাট কোহলির টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক হয় ২০ জুন ২০১১। তিনি এ পর্যন্ত ৭৭টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছেন। অর্থাৎ সাকিব আল হাসান থেকে ৪ বছর পর টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক হওয়ার পরেও কোহলি ২২টি বেশি ম্যাচ খেলেছেন।  

চলতি বিশ্বকাপের প্রথম পর্বে বাংলাদেশের বাকি আছে আরও দুই ম্যাচ, সেমিফাইনালে উঠতে পারলে পাওয়া যাবে বাড়তি একটা ম্যাচও। পারফরম্যান্সটা বজায় থাকলে যে মিশন নিয়ে সাকিব বিশ্বকাপে এসেছেন, নিজের জাত চেনাচ্ছেন, সেটা পূরণ হবে নিশ্চিত। মিশনের নামটা জানেন তো? ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট হওয়া।

সাকিব আমাদের এই ছোট দেশের কিংবদন্তি খেলোয়াড়। যাকে খেলোয়াড়ি জীবনের মধ্যেই এই ঘোষণা দেওয়া যায়। পরিসংখ্যান সেই কথাই বলে কিংবা বলবে। মন না চাইলেও অনেক ভিন দেশের কিছু পরশ্রীকাতর ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ ঘোষণা দেবে, সাকিব আল হাসান দুটি দেশের মধ্যে পার্থক্য করে দেওয়া খেলোয়াড়, যিনি তিন ধরনের ক্রিকেটে দীর্ঘদিন ধরে নাম্বার ওয়ান থেকেই ক্রিকেট বিশ্ব শাসন করেছেন।

লেখক: উপপরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

[email protected]

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বুদ্ধিজীবীদের কবর সংরক্ষণ জরুরি
বুদ্ধিজীবীদের কবর সংরক্ষণ জরুরি
ধর্ষণের ঘটনা গোপন রাখতেই বাকপ্রতিবন্ধী তরুণীকে পুড়িয়ে হত্যা
ধর্ষণের ঘটনা গোপন রাখতেই বাকপ্রতিবন্ধী তরুণীকে পুড়িয়ে হত্যা
আইসিএমএবি বেস্ট করপোরেট অ্যাওয়ার্ড পেলো বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ
আইসিএমএবি বেস্ট করপোরেট অ্যাওয়ার্ড পেলো বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ
তুরস্কের চাপে নতি স্বীকার করলো সুইডেন
তুরস্কের চাপে নতি স্বীকার করলো সুইডেন
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ