X
মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪
২১ ফাল্গুন ১৪৩০

ঘরে যারা ফিরছেন তারা কি ঘরেই থাকবেন?

সাইফুল হোসেন
১৯ জুলাই ২০২০, ১৮:৩০আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২০, ১৮:৩২

সাইফুল হোসেন একটি চুম্বনের দৃশ্য অমর হয়ে গেলো। অথচ সেই চুম্বন তেমন কোনও রোমান্টিক দৃশ্য ছিল না। জর্জ মেনডোনসা নামক এক নাবিক মনের আনন্দে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলেন অপরিচিত নার্সের পোশাক পরিহিত গ্রেটা ফ্রায়েডম্যান নামক এক তরুণীকে। দিনটা ছিল ১৯৪৫ সালের ১৪ আগস্ট।
সবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ক্লান্ত সেনারা প্রিয়জনের সঙ্গে মিলনের আকাঙ্ক্ষায় অপরিসীম আবেগ ও ভালোবাসা বুকে নিয়ে ঘরে ফিরছেন। কেউ তখন আর যুদ্ধ চায় না, ঘরে ফিরছে সবাই, দলে দলে। অগণিত মানুষ রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে তাদের স্বাগত জানাচ্ছেন। সেই আনন্দঘন পরিবেশে মুহূর্তের মধ্যে ঘটে যায় ঘটনাটা। কিন্তু যুদ্ধ শেষের বাঁধনহীন আনন্দের প্রতীক হিসেবে সেই চুম্বনের ছবি স্থান নিয়েছে ইতিহাসের পাতায়।
সেদিন দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরে যারা ঘরে ফিরেছিলেন তারা আকাঙ্ক্ষিত ছিল বলেই সবাই তাদের বরণ করেছেন প্রাণের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে। নাবিক যখন নার্সকে তার প্রেমিকের সামনেই চুমু খেয়েছেন তখন প্রেমিক পাশে থেকে উপভোগ করেছেন, মুচকি হেসে অভিবাদন জানিয়েছেন।
বাংলাদেশকে স্বাধীন করে সেদিন যে সাহসী বীর বাঙালি মুক্তিযোদ্ধারা ঘরে ফিরেছিলেন তাদেরও হাজার হাজার মানুষ স্বাগত জানিয়েছিলেন। প্রাণের আবেগে কাছে টেনেছিলেন, বুকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। তারা ছিল খুব আকাঙ্ক্ষিত, ভালোবাসার ধন।

কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে আজ যারা শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরছেন একা একা, দলে দলে বা পরিবার পরিজনসহ, তাদের কি গ্রাম ওভাবে বরণ করে নিচ্ছে, নাকি গ্রামের ওপর, গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর একটা বাড়তি চাপ তৈরি হবার আশঙ্কায় সবাই তাদের দূরের মানুষ ভাববেন? প্রশ্ন থেকে যায়। 

আজ যেন বিপদগ্রস্ত শিশু ফিরছে তার মায়ের কোলে, অসহায় সন্তান ফিরছে তার বাবার সান্নিধ্যে, জন্মভিটায়। বাড়ি ফিরে তারা দেখবেন যে সবকিছু আগের মতোই আছে, সবকিছু দেখতে একই লাগছে, গন্ধও আগের মতোই, শুধু তাদের ভেতরটা পরিবর্তন হয়ে গেছে। সবাই বাড়ি হাজির হবেন নিজের পরিবর্তিত নিজেকে নিয়ে, কারণ সে এখন শহুরে বাতাসে এলোমেলো, তার মন ও মননে ঘটে গেছে অনেক সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম পরিবর্তন। তাদের যেমন গ্রামে মানিয়ে নিতে কষ্ট হবে তেমন গ্রামেরও কষ্ট হবে তাদের পূর্বের মতো আলিঙ্গন করতে। তারা খুব ভালো অনুভব নিয়ে গ্রামে ফিরছেন না, তারা ফিরছেন নতুন জীবনযুদ্ধে পর্যুদস্ত হয়ে। তাদের প্রয়োজন একটু আশ্রয়, একটু দাঁড়াবার জায়গা যেখান থেকে আবার তারা উঠে দাঁড়াতে পারেন, নিজের পায়ের মাটি শক্ত করতে পারেন।

বাংলাদেশ গ্রামনির্ভর কৃষিভিত্তিক দেশ বলে পরিচিত হলেও বর্তমান সরকারের আমলে গত কয়েক বছরে নগরায়ণ হয়েছে খুব দ্রুত। জনসংখ্যা গ্রাম থেকে শহরে স্থানান্তর হচ্ছে পূর্বের চেয়ে বেশি হারে। ফলে শহরের লোকসংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, বিশেষ করে ঢাকা’তে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে ঢাকা শহরের জনসংখ্যা ছিল ৬৮ লাখ। এরপর ২০১৮ সালে জনসংখ্যা বেড়ে ১ কোটি ৭০ লাখ ছাড়িয়েছে (জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেকটাস)। এসবের সূত্র ধরে নগরবিদরা ধারণা করেছিলেন, শহরের জনসংখ্যা বাড়তে বাড়তে ২০৪৭ সাল নাগাদ দেশের মোট জনসংখ্যার ৫০ ভাগ শহরেই বাস করবে।

যাহোক, ইতোমধ্যে ঢাকা শহর ছেড়ে অনেক মানুষ গ্রামে চলে গেছে। কারণ ঢাকা শহরে থাকার মতো আর্থিক সঙ্গতি তাদের থাকছে না। ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ২ হাজার ৩৭১ জনের সাক্ষাৎকার নিয়ে ব্র্যাক মে মাসে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। এতে দেখা যায়, ৩৬ শতাংশ লোক চাকরি বা কাজের সুযোগ হারিয়েছেন। ৩ শতাংশ লোক চাকরি থাকলেও বেতন পাননি। আর দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে যারা কাজ করেন, তাদের ৬২ ভাগই কাজের সুযোগ হারিয়েছেন। করোনার কারণে অন্তত ১০টি জেলার মানুষের আয় কমে গেছে। ঢাকা জেলার মানুষের আয় কমেছে ৬০ ভাগ। বর্তমানে এদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

ঢাকা শহরের রেস্টুরেন্টগুলোতে কাজ করা প্রায় ৯ লাখ কর্মী বর্তমানে বিনা বেতনে ছুটিতে আছেন। হয়তো এরা আর সবাই চাকরি ফিরে পাবেন না। তাদের গ্রামমুখী হতে হবে আবার যদি অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন না হয়। শুধু দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষ ঢাকা ছাড়ছেন না; অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারও কাজ হারিয়ে শহর ছেড়ে যাচ্ছে। ব্র্যাক, ডেটাসেন্স এবং উন্নয়ন সমুন্বয় যৌথভাবে চালানো এক গবেষণায় বলেছে মহামারির কারণে দেশে ১০ কোটি ২২ লাখ মানুষ আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েছে।

প্রশ্ন আসতে পারে যারা ঢাকা ছাড়ছেন তারা কি আবার ঢাকায় ফিরবেন, নাকি তারা সেখানেই থিতু হবার চেষ্টা করবেন? তাছাড়া সরকারের এখানে কোনও প্রকল্প হাতে নেওয়া উচিত কিনা।

আশার কথা হচ্ছে যখন দেশে কোনও বড় সমস্যার সৃষ্টি হয় তখনই বেশ কিছু সুযোগেরও তৈরি হয়। স্বাধীনতার পরেই একটা ভঙ্গুর অর্থনীতির জঠরে বেশকিছু ব্যবসা ও ব্যবসায়ীর জন্ম হয়েছিল, যারা পরবর্তীতে দেশের আর্থিক কাঠামো বিনির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল। করোনার অভিঘাতও তেমনি কিছু নতুন উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দেবে; যারা যোগ্য তারা নিজেদের মেধা মনন কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতের-বড়-ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেদের স্থান তৈরি করে নেবেন।

যারা গ্রামে ফিরছেন তারা এখন শহর ও দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা, জীবনযাপন ও জীবন পরিচালনার কৌশল সম্পর্কে বেশি অবগত। যিনি একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কয়েক বছর কাজ করেছেন, তিনি এখন একটা ছোট ব্যবসা পরিচালনার জন্য তৈরি। তাদের মনোভাবের একটা দারুণ পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হয়েছে। এখন জীবনের প্রয়োজনে তারা তাদের সেই লব্ধ অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা দিয়ে নতুন কোনও উদ্যোগ শুরু করতে পারবেন।

কৃষি ক্ষেত্রে তারা নতুন চিন্তা ও মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারবেন, কৃষি পণ্য বিপণনে তারা নিজেদের সম্পৃক্ত করে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পারবেন। শহরে থেকে অধিকাংশের হাতে কিছু টাকা জমেছে, যে টাকা হতে পারে তাদের ব্যবসা শুরুর প্রথম পুঁজি। সেই পুঁজি দিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা এবং এলাকার সুযোগসুবিধা বিবেচনায় নিয়ে নিজের মতো একটা উদ্যোগ দাঁড় করাবেন। যেমন যে অঞ্চলে প্রচুর আম হয় সে অঞ্চলের লোকজন হয়তো বাসাতেই আমের প্রসেসিং করতে পারেন, কেউ ছোট ছোট দোকান চালু করতে পারেন, কেউবা পারেন হাঁস, মুরগি ও ছাগল গরুর খামার শুরু করতে। কেউ মাছ চাষে সম্পৃক্ত হতে পারেন। আধুনিক বায়োফ্লক পদ্ধতি ক্রমান্বয়ে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা।

তাছাড়া শহর সম্পর্কে তাদের ধারণা থাকার কারণে তারা তাদের নিজেদের উৎপাদিত এবং অন্যের উৎপাদিত পণ্য সহজে বিপণন করতে পারবেন বাজারে, যা একজন গ্রাম্য কৃষক হয়তো পারবেন না। অনেকেই আছেন যারা শহরে থাকার কারণে তাদের নিজেদের জমি অন্যকে দিয়ে চাষ করাতেন, তারা এখন নিজের জমির চাষের দায়িত্ব নিজে নিতে পারবেন। ফলে বেড়ে যাবে কৃষি উৎপাদন। কৃষিক্ষেত্রে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারের সুযোগও বেড়ে যাবে। পতিত জমিতে চাষের সুযোগ বাড়বে।

নিঃসন্দেহে গ্রামীণ অর্থনীতির গতি বেশ বেড়ে যাবে। দেশের অধিকাংশ গ্রামে এখন বিদ্যুৎ আছে, ফলে ছোট ছোট শিল্পোদ্যোগ ও গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে গ্রামে, যা আগে ছিল না। সরকারকে এখানে নিশ্চিত করতে হবে পুঁজি-প্রাপ্তি। অনেকেই হয়তো তাদের অল্প যে পুঁজি আছে তা দিয়ে শুরু করবে এবং পরে দরকার হবে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ সুবিধা। আবার অনেকেই হয়তো যোগ্যতা থাকলেও শুরু করতে পারবে না পুঁজির অভাবে। তাদেরও পুঁজির জোগান নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে এনজিও বা অন্য কোনও ক্ষুদ্র ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করার ব্যবস্থা নিলে ভালো হবে। কৃষি ব্যাংকসহ অন্যান্য সরকারি ব্যাংকও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে ঘুষ দুর্নীতির ব্যাপারে সরকারকে শূন্য টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।

বর্তমান সরকার একটি গ্রাম, একটি শহর প্রকল্পটি কার্যকরভাবে শুরু করতে পারে এই বাস্তবতায়। তাহলে যারা ফিরে গেছেন, তাদের একটা বড় অংশ গ্রামে তাদের টিকে থাকার ব্যবস্থা করতে পারবেন, হয়তো গ্রামকে তারা শহরের আদলে গড়ে তুলতেও ভূমিকা রাখতে পারবেন। তবে তাদের গ্রামে স্থায়ী করতে হলে গ্রামে বা আশেপাশে ভালো লেখাপড়ার পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে।

করোনার কারণে গ্রামে বাধ্য হয়ে যারা ফিরলেন, তাদের অনেকেই সেখানে ভালোভাবে স্থান করে নিক। গ্রাম সবাইকে রক্ষা করতে পারে আপন মহিমায়। এই বাস্তবতায় যে যোগ্য সন্তানেরা গ্রামে ফিরে গেলেন, তারা নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে পারবেন তখনই, যখন সহায়ক শক্তি হিসেবে রাষ্ট্র-সমাজ তাদের পাশে থাকবে, যত্ন করে তাদের লালন করবে, সমস্ত অন্তর দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে তাদের গ্রহণ করবে। যারা ফিরে গেলেন তারা গ্রাম বাংলাকে সুন্দর করে সাজাবেন, গ্রাম উন্নত হয়ে উঠবে, শহরের প্রয়োজন তাদের কাছে ম্লান হয়ে যাবে—এই প্রত্যাশা করা যাক। প্রতিটা গ্রাম হয়ে উঠুক ছোট এক ফালি শহর। তবে অনেকে ফিরবে হয়তো এই ইট পাথরের শহরে নতুন স্বপ্ন নিয়ে; নতুন বাস্তবতায়, নতুন আকাঙ্ক্ষায়। 

লেখক: কলামিস্ট ও অর্থনীতি বিশ্লেষক। ফাউন্ডার ও সিইও, ফিনপাওয়ার লিডারশিপ ইন্টারন্যাশনাল।

 

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বিদেশি অনুদানে পরিচালিত এনজিও ২৬১২টি
বিদেশি অনুদানে পরিচালিত এনজিও ২৬১২টি
তিন লাখ টাকা জরিমানার বিধান রেখে গ্রাম আদালত বিল সংসদে
তিন লাখ টাকা জরিমানার বিধান রেখে গ্রাম আদালত বিল সংসদে
রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের ৩৩ সদস্য গ্রেফতার, কাউন্সিলররা জড়িত থাকলে ব্যবস্থা
রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের ৩৩ সদস্য গ্রেফতার, কাউন্সিলররা জড়িত থাকলে ব্যবস্থা
সরকার সব ক্ষেত্রে প্রতিহিংসাপরায়ণ: মির্জা ফখরুল
হাফিজ উদ্দিন কারাগারেসরকার সব ক্ষেত্রে প্রতিহিংসাপরায়ণ: মির্জা ফখরুল
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ