X
রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২
৯ আশ্বিন ১৪২৯

রেলের জরাজীর্ণ জীবন

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
১৯ নভেম্বর ২০২০, ১৪:১২আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২০, ১৪:১৪

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী গত ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশ রেলপথ প্রতিষ্ঠার ১৫৮ বছরে পা রেখেছে। ওই দিনটিকে এবার বাংলাদেশ রেলওয়ে ‘জাতীয় রেলপথ’ দিবস হিসেবে পালন করে। আগে কখনও দিবসটি সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়নি, মুজিববর্ষে এই প্রথম ‘জাতীয় রেলপথ’ দিবসটি পালিত হলো। বিগত ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর চুয়াডাঙ্গা জেলার দর্শনা থেকে কুষ্টিয়া জেলার জগতি পর্যন্ত ৫৩ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেললাইন চালু হয়। এ সময়ই মূলত বাংলাদেশে প্রথম রেল চলাচল শুরু হয়। এই রেল চলাচল শুরুর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে প্রথম রেলওয়ে সম্পর্কে ধারণা জন্মায়। এরপর ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশে রেলওয় সেবা সম্প্রসারণ হতে থাকে। একপর্যায়ে পাকশীতে গড়ে ওঠে ভারতবর্ষের মধ্যে চলাচলকারী রেলওয়ে ট্রেনের নিয়ন্ত্রণ অফিস।
কার্ল মার্ক্স তার ‘ফার্স্ট ইন্ডিয়ান ওয়ার অব ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ শীর্ষক রচনায় ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসন ও তার পুঁজি বিকাশের প্রচুর সমালোচনা করেছেন। কিন্তু রেলওয়ে ও টেলিগ্রাম প্রবর্তনের ঘটনাকে ইংরেজদের বড় অবদান বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এই উপমহাদেশে জাতীয় জীবনে তথা এই উপমহাদেশের অর্থনীতিতে ভারতীয় রেলওয়ের ভূমিকা অপরিসীম। ভারতীয় পণ্ডিতেরা বলেন এ উপমহাদেশকে আকবর একবার ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। দ্বিতীয়বার এই ঐক্যকে সুবিস্তৃত করেছে ইংরেজরা আর তাকে সুদৃঢ় ও সুসংহত করেছে ভারতীয় রেলওয়ে। লর্ড ডালহৌসী তাদের প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যে সেনাবাহিনী এই প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত নির্বিঘ্নে ও দ্রুত চলাচল করার জন্য ভারতে রেললাইন প্রতিষ্ঠার জন্য কমন্স সভায় প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট বিনা বাক্য ব্যয়ে তা গ্রহণ করেছিল। কিন্তু এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যে পুঁজির দরকার তা ব্রিটিশের তহবিলে ছিল না। ভারতে যারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তারা ছিলেন খুবই পারদর্শী লোকজন। স্থানীয় উদ্যোক্তা নিয়ে তারা প্রথম রেলপথ প্রতিষ্ঠার কাজ আরম্ভ করেছিলেন। তখন এ মহাপরিকল্পনার পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ম্যাকডোনাল্ড স্টিফেনসন। প্রকৃতপক্ষে তিনিই ছিলেন ভারতীয় রেলের জনক।
ভারতে প্রথম কয়লা খনি আবিষ্কৃত হয় রানিগঞ্জে। নদীপথে কয়লা পরিবহন কঠিন হওয়ায় তারা রেলপথ স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। প্রথম রেলপথ স্থাপিত হয় রানীগঞ্জ থেকে উড়িষ্যার পুরি পর্যন্ত। পুরিতে জগন্নাথ দেবীর মন্দির। রানীগঞ্জ থেকে উড়িষ্যার পুরির জগন্নাথ দেবীর মন্দিরের দূরত্ব ছিল ৩২০ মাইল। উড়িষ্যা ছিল দুর্ভিক্ষ পীড়িত এলাকা। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ মারা যেতো না খেয়ে। খাদ্যের অভাব ছিল না কিন্তু পরিবহনের অভাবে খাদ্য পৌঁছানো ছিল মুশকিল। ড. অমর্ত্য সেন বলেছেন প্রাচীন সময়ে যত দুর্ভিক্ষ হয়েছে সবই খাদ্য পরিবহনের জটিলতার জন্য।
স্থানীয় উদ্যোক্তার খোঁজে রাওল্যান্ড ম্যাকডোনাল্ড স্টিফেনসন প্রথম প্রস্তাব রাখেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের কাছে। আলোচনার পর সাব্যস্ত হয় যে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর পাবেন লাভের এক ভাগ আর ব্রিটিশ সরকার পাবে দুই ভাগ। আর সে ভাগের অর্থও বিনিয়োগ করা হবে। উড়িষ্যা ছিল ময়ূরভঞ্জ মহারাজের জমিদারি। তিনি প্রতিবছর দুর্ভিক্ষ নিয়ে খুবই বিব্রত হতেন, খাদ্য পরিবহনের কথা চিন্তা করে তিনি বিনামূল্যে তার বাগান থেকে সংগ্রহ করে ৩২০ মাইল দীর্ঘ রেলপথের জন্য স্লিপার সরবরাহের প্রস্তাব করেন। এভাবে ভারতে প্রথম রেলপথ স্থাপিত হয়। পুরি জগন্নাথের মন্দিরে যারা রানীগঞ্জ থেকে তীর্থযাত্রা করতেন তাদের ৩২০ মাইল পথ অতিক্রম করতে ২৪ দিন সময় লাগতো। কিন্তু রেলপথ প্রতিষ্ঠার পর সে পথ ২৪ ঘণ্টায় অতিক্রম সম্ভব হয়েছিল। তখন জনসাধারণের পক্ষ থেকে দ্রুত রেলপথ প্রতিষ্ঠার দাবিও উঠেছিল। খুব দ্রুত ব্রিটিশেরা সমগ্র ভারতে রেলপথ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বড় বড় শহরে রেলের কারণে তিন দশকের মাঝে আন্তঃযোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। বিংশ শতাব্দীতে সুদূর খাইবার থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রেলপথ যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বিপ্লব ঘটে।
বাংলাদেশের নদীমাতৃক হওয়ায় বাংলাদেশে রেলওয়ের অংশে ব্রিজ, কালভার্ট বেশি। ১৮৬২ সালে বাংলাদেশে রেলপথ স্থাপনের কাজ শুরু হয়। সে সময়েই ব্রিজগুলো নির্মিত হয়েছিল। এখন সব ব্রিজের বয়স হয়েছে। ১৯৩০ সালে চট্টগ্রামের কালুরঘাট ব্রিজ নির্মিত হয়েছিল। শেষের দিকে নির্মিত ব্রিজগুলোর মধ্যে কালুরঘাট ব্রিজ নির্মিত হয় তার বয়সও এখন ৯০ বছর। দীর্ঘদিন এ ব্রিজের ওপর দিয়ে বাস ট্রাকও চলাচল করেছে। কর্ণফুলী নদীর ওপর সড়কপথের জন্য ১৯৯৩ সালে পাকা ব্রিজ নির্মিত হওয়ায় পর এখন কালুরঘাট ব্রিজের ওপর দিয়ে বাস-ট্রাকের চলাচল উল্লেখযোগ‌্য পরিমাণে কমেছে। তবে কালুরঘাট ব্রিজের এখন জরাজীর্ণ অবস্থা। এ ব্রিজটি ব্যাপকভাবে মেরামত করা না হলে বড় ধরনের একটা দুর্ঘটনা ঘটবেই।
আমি দেখেছি এ ব্রিজের মেরামতের ব্যাপারে অত্র এলাকার লোকের মাঝে ব্যাপক অসন্তোষ রয়েছে। অত্র এলাকার সংসদ সদস্য মঈন উদ্দীন খান বাদল গত সংসদ নির্বাচনের সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি যদি নির্বাচিত হন তবে তার প্রথম কাজ হবে ব্রিজ মেরামত করানো, আর মেরামতের কাজ ২ বছরের মাঝে সম্পন্ন করতে না পারলে তবে তিনি সংসদ সদস্যপদ পদত্যাগ করবেন। দুর্ভাগ্য যে নির্বাচনের পরেই তার মৃত্যু হয়েছে। এখন সবকিছুই চাপা পড়ে গেছে।
আমি সরকারকে স্মরণ করিয়ে দেবো গত শতাব্দীর পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভৈরব সেতুতে এক ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছিল। ট্রেন ভৈরব নদীতে পড়ে গিয়েছিল। আর হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। অনুরূপ কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে সরকারের অমনোযোগিতার কারণে দেশে তখন ব্যাপক গণঅসন্তোষ দেখা দেবে। ২০১৮ সালে ১৩ জুন মৌলভীবাজারে ট্রেন দুর্ঘটনা হয়েছে। তারপর কয়দিন মেরামতের কাজ চলেছিল। তারপর এখন বন্ধ। রেলের লালমনিরহাট বিভাগে ৫৬১ কিলোমিটার রেললাইন আছে তাতে ৪১১টি সেতুর মাঝে অর্ধেক সেতুই জরাজীর্ণ। ট্রেন চলছে ঝুঁকি নিয়ে। ড্রাইভাররা বলে ট্রেন সেতুতে উঠলে নাকি তারা দুর্ঘটনার ভয়ে ভীত থাকে। এ অবস্থা শুধু লালমনিরহাট বিভাগে নয়। এ অবস্থা বাংলাদেশের সর্বত্র।
দেশের সর্বমোট রেলপথ ২৯২৯ কিলোমিটার আর রেলপথে ছোটবড় সেতু ৩১৪৩টি, বড় সেতু হচ্ছে ৩২৬টি, ছোট সেতু ২৮১৭টি আর এই সেতুগুলোর মাঝে অধিকাংশ সেতু নির্মিত হয়েছে ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৩৫ সালের মাঝে। এখন ৪০০ সেতু খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। রেল মন্ত্রণালয়কে বলবো অবিলম্বে যেন এ সেতুগুলো মেরামত করে মানুষকে যেন ঝুঁকিমুক্ত করেন।


লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
জীবিত উদ্ধার রহিমা, বস্তাবন্দি লাশটা তাহলে কার?
জীবিত উদ্ধার রহিমা, বস্তাবন্দি লাশটা তাহলে কার?
পরীক্ষায় বসে ফেসবুকে লাইভ, দুই শিক্ষার্থী বহিষ্কার
পরীক্ষায় বসে ফেসবুকে লাইভ, দুই শিক্ষার্থী বহিষ্কার
দুই গ্রুপের কোন্দলে মধ্যরাতে উত্তপ্ত ইডেন কলেজ
দুই গ্রুপের কোন্দলে মধ্যরাতে উত্তপ্ত ইডেন কলেজ
রামনাথ বিশ্বাসের বসতভিটা পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণে ১০০ নাগরিকের বিবৃতি
রামনাথ বিশ্বাসের বসতভিটা পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণে ১০০ নাগরিকের বিবৃতি
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ