X
বুধবার, ০৬ জুলাই ২০২২
২২ আষাঢ় ১৪২৯

২০২০-এর সঙ্গেই বিদায় হোক করোনার বিষ

আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০২০, ১৬:০৪






সালেক উদ্দিন প্রতি বছরের মতো পুরনোকে বিদায় দিয়ে একরাশ সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হয়েছিল নতুন বছর ২০২০ সাল, যা আজকের দিন শেষে আবার অতীত হয়ে যাবে। জমকালো আতশবাজি আর আলোকসজ্জার মধ্য দিয়ে পৃথিবীর দেশে দেশে বরণ করে নেওয়া হয়েছিল খ্রিষ্টীয় নতুন বছর ২০২০-কে। নতুন স্বপ্ন, উদ্দীপনা আর প্রত্যাশা নিয়ে আনন্দ-উল্লাসের মধ্য দিয়ে বিশ্ববাসী বছরটিকে বরণ করেছিল।




বিবিসি, সিএনএন-সহ বিভিন্ন টিভি চ্যানেল আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বদৌলতে সেই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানগুলো বিশ্ববাসীর অবলোকন করার সৌভাগ্য হয়েছিল। সে রাতে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে আতশবাজির মাধ্যমে নতুন বছর উদযাপনের রেকর্ড করেছিল রাশিয়া। লন্ডনের টেমস নদীর পাশে নেমেছিল হাজার হাজার মানুষের ঢল। বিগ বেনের ঘণ্টা ১২ বার বাজার পর শুরু হয় আতশবাজি আর হর্ষধ্বনি। বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন সংযুক্ত আরব-আমিরাতের 'বুর্জ খলিফার' উপর দুবাইয়ের আকাশে মনোমুগ্ধকর আতশবাজি দেখেছিল বিশ্ববাসী। ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় লাখ লাখ মানুষ বৃষ্টিতে ভিজে জড় হয়েছিল নতুন বছরবরণ করতে। দাবানলের কারণে নববর্ষ উদযাপন বন্ধ রাখার দাবি উপেক্ষা করে অস্ট্রেলিয়াতেও আনন্দ মুখরতার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছিল ২০২০ সালের প্রথম দিনের ঊষালগ্ন।

সব মিলিয়ে বিশ্ববাসীর উন্নত পৃথিবী গড়ার প্রত্যয় নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল বছরটির। আমাদেরও প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। এ বছরই ছিল জাতির জনকের শততম জন্মবার্ষিকী। বছরটি পরিচিতি পেয়েছিল মুজিববর্ষ নামে। বিশাল সম্ভাবনার বছর হওয়ার কথা ছিল ২০২০।

বছরের প্রথম প্রহরে সারা বিশ্ববাসী যখন আনন্দ উল্লাসের সময় অতিবাহিত করছিল এবং সম্ভাবনাময় সুখ-সমৃদ্ধি নিয়ে পরিকল্পনা করছিল তখন কেউ কি জানতো মানুষের এই স্বপ্ন নস্যাৎ করতে আড়ালে দাঁড়িয়ে বিশ্রী দাঁত বের করে হাসছে কোভিড ১৯ বা করোনাভাইরাসের মতো ভয়ঙ্কর এক শত্রু? বছরের শুরুতেই চীনের উহানে আবির্ভাব ঘটে করোনাভাইরাসের। উহান থেকেই পৃথিবীময় বিস্তার লাভ করে এই মরণব্যাধি। যার ভয়াল ছোবল এতই ভয়ানক ছিল যে মার্চ মাসেই বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা করোনাকে বৈশ্বিক মহামারি ঘোষণা করে। বছর জুড়েই প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিল নামে। এরই মধ্যে বিশ্বে আট কোটিরও বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে এবং মৃত্যুবরণ করেছে ১৭ লাখেরও বেশি। বাংলাদেশেও ৫ লাখ তিন হাজারের অধিক জনের দেহে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। মৃত্যুর সংখ্যা সাড়ে সাত হাজার ছুঁয়েছে।

করোনার এই প্রকোপে বছরের সিংহভাগ সময়ই বিশ্বের সব দেশই কমবেশি লকডাউনের মধ্যে ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক, যে শহর কখনও ঘুমায় না বলে প্রবাদ রয়েছে, সেই নিউ ইয়র্কই বছরের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছে সুনসান নীরবতায়। ইতালির মৃত্যুর সংখ্যাও ছিল আতঙ্কময়। বছরের মধ্যভাগে মেক্সিকোতে চলছিল মড়কের মেলা। ব্রাজিলে মৃত্যুর সংখ্যা এতই বেশি ছিল যে, সেখানে রাস্তায় রাস্তায় লাশ পড়ে থাকতো। সংখ্যার দিক থেকে এতটা না হলেও করোনার ভয়ে অমানবিক কর্মকাণ্ডে আমরাও খুব একটা পিছিয়ে ছিলাম না। প্রথম দিকে কোনও বাড়িতে করোনা হলে তাদের মোটামুটিভাবে ‘জামাতে বন্ধ’ দেওয়ার মতো অবস্থা করা হতো। তারা যেন বের হতে না পারে তার জন্য এলাকাবাসী তাদের ঘরের দরজায় তালা মেরে রেখেছে- এমন খবরও পত্রপত্রিকায় দেখেছি। শুধু কি তাই? করোনায় আক্রান্ত সন্দেহে একটি পরিবার তাদের বৃদ্ধা মাকে জঙ্গলে ফেলে চলে গিয়েছিল। মানবতার পরাজয় এরচেয়ে বড়আর কী হতে পারে!

মোটকথায় পুরো পৃথিবীকে এগোতে দেয়নি  করোনা। বছর জুড়েই সমাজ শিক্ষা অর্থনীতি সবকিছুর রশি টেনে ধরেছিল এই মহামারি ব্যাধি। করোনার প্রথম ধাপকে কোনও মতে সামাল দিতে না দিতেই শুরু হয় তার সেকেন্ড ওয়েভ বা দ্বিতীয় হামলা। পৃথিবীকে কাঁপিয়ে তোলে আবার। এটাকে সামাল দেওয়ার জন্য যখন ভ্যাকসিনের প্রস্তুতি চলছে (কোথাও কোথাও শুরু হয়ে গেছে) তখনই আরও ৭০ শতাংশ বেশি সংক্রমণের ক্ষমতা নিয়ে এলো করোনার নতুন প্রজন্ম। ব্রিটেনে করোনার এই স্টেইন ছড়িয়ে পড়ার খবর ইতোমধ্যে বিশ্বের জন্য আরও বেশি আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। একই ধরনের শক্তিশালী প্রজাতির করোনাভাইরাসের  অস্তিত্ব মিলেছে দক্ষিণ আফ্রিকাসহ ৬/৭টি দেশে। এই নতুন ধরনের করোনাভাইরাসের সংক্রমণ যেন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য দেশের জনস্বাস্থ্যবিদরা আগেই আকাশ, জল ও স্থলবন্দরে কড়াকড়ি আরোপের পরামর্শ দিয়েছেন। কেউ কেউ বলছেন, এর হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে দেশের সব বন্দরের এন্ট্রি পয়েন্ট কড়াকড়িভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রয়োজনে সেখানে সেনাবাহিনী নিয়োগ করতে হবে। সংক্রমিত দেশগুলোর সঙ্গে ফ্লাইট বন্ধ করে দিতে হবে। এরপরও যদি ওইসব দেশ থেকে কেউ আসেন তবে যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের পিসিআর টেস্ট নেগেটিভ না আসবে ততক্ষণ তাদের আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

মোটকথায় বিশ্ববাসী বছরজুড়েই করোনার ভয়ে ভীত ছিল, এখনও আছে। ব্যক্তি, দেশ ও বিশ্বের উন্নয়ন এবং কল্যাণ থমকে দাঁড়িয়ে আছে। আর এর থেকে পরিত্রাণের জন্য ক্লান্তিহীন প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।  

করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবিলায় সর্বশক্তি দিয়ে লড়ছে পৃথিবীর সব দেশ। তৈরি করছে করোনার ভ্যাকসিন। এরইমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত,কানাডা, সৌদি আরব, ইসরায়েল, কাতার, মেক্সিকো, সার্বিয়া, কুয়েত, রাশিয়া, কোস্টারিকাসহ অনেক দেশে ভ্যাকসিনের  ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে। পৃথিবীর বড় বড় দেশ প্রয়োজন থেকে অনেক বেশি ভ্যাকসিন কিনে রাখার খবর বাজারে থাকলেও আশা করছি আমাদের মতো দেশেও করোনার ভ্যাকসিন প্রয়োগ শিগগিরই শুরু হবে। পৃথিবীজুড়েই করোনা মুক্তির যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে তা অচিরেই সফলকাম হবে- সে আশায় বুক বেঁধে আছে পৃথিবীর মানুষ। ২০২০ সালের বিদায়ের মতোই কোভিড-১৯’ও খুব তাড়াতাড়ি পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে। করোনামুক্ত সুন্দর পৃথিবী উপহার দেবে ২০২১- সেটাই প্রত্যাশা। 

লেখক: কথাসাহিত্যিক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বিদ্যুতে রেশনিং চায় এফবিসিসিআই
বিদ্যুতে রেশনিং চায় এফবিসিসিআই
কমছে সব নদীর পানি
কমছে সব নদীর পানি
হেলে পড়া বিদ্যালয় ‘সোজা’ করার চেষ্টা
হেলে পড়া বিদ্যালয় ‘সোজা’ করার চেষ্টা
শীর্ষ পুরস্কার পেলো সিটি ব্যাংক
শীর্ষ পুরস্কার পেলো সিটি ব্যাংক
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ