X
শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪
৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

একজন গৃহিণীর আর্জি প্রধানমন্ত্রীর সমীপে

মাসুমা সিদ্দিকা
২৩ মার্চ ২০২১, ১৯:০৬আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২১, ১৬:১০

মাসুমা সিদ্দিকা
‘কি, আপনি গৃহিণী? কী করেন আপনি সারাদিন বাসায় বসে? আপনার লেখাপড়া করে কী লাভ হলো?’– এ কথাগুলো প্রায়ই শুনতে হয় আমাকে। আমি একজন গৃহিণী এটাই আমার পরিচয়। আমার দুটি ছেলে আছে। আমি সারাক্ষণ তাদের নিয়ে ব্যস্ত থাকি, সংসারে শ্রম দিই। সকাল থেকে রাত অবধি কাজ করে যাই অবিশ্রান্তভাবে কোনও পারিশ্রমিক ছাড়াই। আমি সন্তানদের পড়াই, ওদের কোনও হোম টিউটর লাগে না। আর হ্যাঁ, আমি কিন্তু ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স করেছি। কিন্তু আমি কোনও আনুষ্ঠানিক চাকরি করি না, কিন্তু আমি আমার মেধা দিয়ে, আমার শ্রম দিয়ে সব সময়ই সংসারের জন্য খেটে যাচ্ছি। আমি শ্রম দিচ্ছি বলে আমার স্বামী তাঁর পেশাগত কাজে পুরোপুরি আত্মনিবেশ করতে পারছেন। আমি আমার সন্তানদের দেখছি বলে ওরা ভবিষ্যতে দেশের উন্নতিতে অবদান রাখবে বলে স্বপ্ন দেখি ।

আপনি বলবেন, আমি তো নিজের জন্যই সবকিছু করছি, এতে অন্যের উপকার কী? একটি দেশ তার জনগণেরই সমষ্টি। আর জনবল যদি শিক্ষিত না হয়ে অশিক্ষিত হয়, তবে তো দেশের উন্নতিই ব্যাহত হয়। আমরা গৃহিণীরা অবিরামভাবে শ্রম দিয়ে যাচ্ছি সংসারে স্বামী, সন্তানদের জন্য, ক্ষেত্রবিশেষে পরিবারের অন্যদের জন্যও। যদি আমরা গৃহিণীরা সংসারে মনোযোগ না দিতাম, সন্তানদের যত্ন-আত্তি কমে যেত, বৃদ্ধাশ্রম অনেক বেশি বেড়ে যেত। আর তাই জাতীয় অর্থনীতিতে তো আমাদেরও অনেক অবদান আছে। কিন্তু কেন তাহলে আমাদের অবদানকে স্বীকার করা হবে না, কেন আমরা বঞ্চিত হব ন্যূনতম সম্মান থেকে, ন্যূনতম প্রাপ্তি থেকে! কেন প্রায়ই আমাদের শুনতে হবে যে আমরা কিছু করি না, শুধু ঘরে বসে থাকি। আমরা আর তাচ্ছিল্যভরে শুনতে চাই না- "কি, আপনি গৃহিণী? কী করেন আপনি সারাদিন বাসায় বসে? আপনার লেখাপড়া করে কী লাভ হলো?"

তাই আমাদের জন্য এই সরকারের কি কিছুই করার নেই? আমরা চাই এই অবদানের জন্য আমাদের যেন সম্মান প্রাপ্তি হয়, আমাদের অবদানকে যেন খাটো করে দেখা না হয় আর পাশাপাশি আমাদের যেন একটা বাৎসরিক ভাতা প্রদান করা হয়, একটা পেনশনের ব্যবস্থা করা হয়। যদি বলেন বিশ্বের কোথাও তো গৃহিণীদের জন্য এমন কোনও উদাহরণ নেই, তবে বাংলাদেশে কেন এটা চাওয়া হবে৷ হ্যাঁ, আপনি বলতেই পারেন। কিন্তু আপনি তো বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছেন, তাই এবারেও আপনি গৃহিণীদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করে মডেল হিসেবে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশে একজন মহিলা সারা জীবন কষ্ট করে খেটে যাচ্ছেন সংসারে শুধু তার স্বামী, ছেলেমেয়েদের (ক্ষেত্রবিশেষে শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর-ননদের) উন্নতির জন্য। কিন্তু এর বিনিময়ে গৃহবধূর কপালে জোটে বিভিন্ন অবহেলা, লাঞ্ছনা-গঞ্জনা। আর যদি কিছু ভালোবাসা জুটেও থাকে, তবে তা যেন ঠুনকো।

আমরা যদি অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকাই তাহলে দেখি যে, অনেক দেশেই যদি স্বামী- স্ত্রীর মধ্যে ডিভোর্স হয়ে যায় তবে স্ত্রী স্বামীর অর্জিত সম্পদের একটা অংশ পাচ্ছে। এখানে অনেকটাই নারীদের অধিকার রক্ষিত হচ্ছে। অথচ আমাদের দেশে স্বামীদের সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে গেলে স্ত্রীরা খুব কমই ন্যায্য ভরণপোষণ পান। তাই যদি নারীদের অন্তত গৃহিণী ভাতাটুকু থাকতো তবে তারা নিজে থেকেই অনেকটা শক্তিশালী হতে পারতো, আর সমাজেও তার একটা দাম থাকতো। তখন নারীরাও নিজে থেকে স্বাবলম্বী হতে পারতো, নিজে থেকে কিছু করে খেতে পারতো আর তার জন্য সমাজের অন্য কারও কাছে হাত পাততে হতো না। আর যখন একজন নারী স্বাবলম্বী হবে তখন সমাজেও তার সম্মান প্রাপ্তি হবে। কেননা, অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে মানুষের মর্যাদার একটা যোগাযোগ আছে।

অনেকে মনে করেন গৃহিণীদের কাজ কেবল রান্না, পরিচ্ছন্নতার কাজ করা এবং স্বামী ও বাচ্চাদের যত্ন নেওয়া। তাদের নিজেদের কোনও শখ-আহ্লাদ থাকতে নেই, তাই আমরা আমাদের পরিবার এবং সমাজ দুটোর দ্বারাই অবমূল্যায়িত হই। আবার অনেকের কাছ থেকে শুনতে হয়, গৃহিণীরা তো বাসায় বসেই থাকেন সারাক্ষণ, কোনও কাজ করেন না। তারা মনে করেন বাইরে গিয়ে চাকরি করাটাই শুধু কাজ। বাসায় সকাল থেকে শুরু করে সংসারের জন্য রান্না করা, বাচ্চাদের পড়ানো, বাচ্চাদের নিয়ে স্কুলে যাওয়া-আসা করা, ঘর পরিষ্কার রাখা, সবার দেখাশোনা করা, রোগীর সেবা করা- এসব কোনও কাজই নয়। আমরা বিনা পারিশ্রমিকে বছরের পর বছর এসব কাজ করে আসছি বলেই হয়তোবা এই কাজগুলোকে কেউ দাম দেয় না, সেটার কোনও মূল্য নেই। বাড়িতে আপনি যদি সারাক্ষণ থাকেন এবং লক্ষ করেন একজন গৃহিণীকে, তাহলে দেখবেন সারা দিন তিনি কত কাজ করেন। কিন্তু যদি একটা ঘণ্টা টিভিতে বসে কোন প্রোগ্রাম দেখেন তবে অনেকে মনে করেন সারা দিন বাসায় বসে এসব টিভি সিরিয়ালই সারাক্ষণ গৃহিণীরা দেখেন। আপনি তো একজন নারী, আপনিও তো আমাদের বঙ্গমাতাকে দেখেছেন, তিনি একজন গৃহিণী হয়ে কীভাবে তার সংসারটাকে দশভূজার মতো সামলাতেন, সংসারে কাজকর্ম করতেন, আবার সন্তানদের বড় করেছিলেন, মানুষ করেছিলেন আর একজন মহান নেতার সহধর্মিণী হয়ে কীভাবে তিনি তাঁকে প্রেরণা জুগিয়েছেন, অন্তরালে থেকে; কীভাবে তিনি তাঁর কাজগুলো অনেক সময় নিজেও করে দিয়েছেন। অথচ আজ সব অনুষ্ঠানই হয় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কিন্তু বঙ্গমাতাকে নিয়ে তো তেমন কোনও শোরগোল দেখা যায় না।

আবার বৃদ্ধ বয়সে অনেক নারীকে তাঁদের সন্তানদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হয়। তখন তাদের না থাকে কোনও মতামত, না থাকে কোনও স্বাধীনতা। আবার অনেকের আশ্রয় হয় বৃদ্ধাশ্রমে। আবার যাঁদের স্বামীরা বেসরকারি চাকরি করেন তাঁরা তো বৃদ্ধ বয়সে পেনশনটুকুও পান না, তখন তাঁরা খুব অসহায় হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় যদি নারী তার ভাতা পেতো তবে সেটা যেমন একদিকে নিজের জন্য সাহায্য হতো অন্যদিকে তাঁর জীবনসঙ্গীদের জন্যও ভরসার একটু আশ্রয়স্থল হতে পারতো। বাংলাদেশে নারীরা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল বলেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তারা প্রতিনিয়ত লাঞ্ছিত, অপমানিত হয়। তাই একজন নারী হয়ে আপনি তো অবশ্যই একজন নারীর কষ্ট বুঝবেন, বোঝেন।

তাই আমাদের অনুরোধ, দেশের সব গৃহিণীর জন্য একটা ভাতার ব্যবস্থা করুন। আর যদি সেটা হয় তবেই তো নারীরা তাঁর সম্মানটাও পাবে। কেননা, বিষয়টা শুধু অর্থনৈতিক নয়, এর সঙ্গে মর্যাদার ব্যাপারটাও জড়িত। না পাঠক, এতক্ষণ যা বলেছি তা আসলে আমার প্রকৃত মনের কথা নয়, অর্থ সব সময় মানুষের মর্যাদার নিয়ামক হতে পারে না। একজন গৃহিণী সংসারের জন্য যা যা করেন, তা তিনি কোনও আর্থিক লাভের আশায় করেন না, তা তিনি করেন ভালোবাসায়-মমতায়। কিন্তু তার এই ভালোবাসা-মমতাকে সমাজ প্রায়ই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে এবং তাকে যথাযথ মর্যাদা দেয় না, কিন্তু কোনোভাবেই একজন গৃহিণীর কাজকে আট-দশটা চাকরির কাজের থেকে অবহেলা করার কোনও সুযোগ নেই। আজকের বাংলাদেশে সে সাহস কারও থাকা উচিত নয়।

লেখক: রন্ধন শিল্পী

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঝাঁজ তুলে শুরু হচ্ছে ইউরো
তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঝাঁজ তুলে শুরু হচ্ছে ইউরো
ঈদ আসছে, ‘আওয়াজ’ বাড়ছে কামারপাড়ায়
ঈদ আসছে, ‘আওয়াজ’ বাড়ছে কামারপাড়ায়
ঐতিহ্যবাহী গরুর মাংসের কালা ভুনা 
ঈদ রেসিপিঐতিহ্যবাহী গরুর মাংসের কালা ভুনা 
হুথি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় গুরুতর আহত এক নাবিক: যুক্তরাষ্ট্র
হুথি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় গুরুতর আহত এক নাবিক: যুক্তরাষ্ট্র
সর্বশেষসর্বাধিক