X
বৃহস্পতিবার, ০৭ জুলাই ২০২২
২৩ আষাঢ় ১৪২৯

পুরস্কার থাকলে তিরস্কার কেন নয়?

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২১, ২০:০৩

মাসুদ কামাল

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের শেষ ম্যাচ ছিল অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে। অফিসে বসে একা একা খেলাটি দেখছিলাম। খেলা শুরুর আগে মনে মনে কী আশা করেছিলাম সেটি উচ্চারণ করা তো দূরের কথা, মনে করতেও এখন লজ্জা পাচ্ছি। বাংলাদেশ যখন ৭৩ রানে গুটিয়ে গেলো, আমি আড়চোখে এদিক-ওদিক তাকালাম। টিভি স্ক্রিনের দিকে যে তাকিয়েছিলাম এতক্ষণ, সেটা আবার কেউ দেখে ফেলেনি তো! দেখলে হয়তো সে ভাববে– এমন খেলাও কেউ দেখে নাকি! জবাব দিতে নেমে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটাররা যখন আমাদের বোলারদের তুলোধুনা করছিল, টিভিটাই বন্ধ করে দিলাম। কিছু সময় পর অনলাইনে ক্রিকইনফোতে স্কোর দেখতে গিয়ে হতবাক, মাত্র ছয় ওভারেই খেলা শেষ। টি-টোয়েন্টি ম্যাচ, পুরো ইনিংসই যেখানে ১২০ বলের সেখানে ৮২ বল হাতে রেখেই ওরা জিতে গেলো! আমি অস্ট্রেলিয়া দলটির ওপর বিরক্ত হচ্ছিলাম, কী দরকার ছিল তাদের এত বেশি ব্যবধানে জেতার? এক সহকর্মী জানালেন, রানরেট বাড়িয়ে রাখার জন্য নাকি ৮.১ ওভারেই জেতা দরকার ছিল তাদের। তো সেটা তারা আরও আগেই ৬ ওভার ২ বলেই করে নিয়েছে। আমার কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকছিল। যে অস্ট্রেলিয়াকে কিছু দিন আগেই আমরা ৪-১ ব্যবধানে হারিয়েছি, হোক না সেটা নিজেদের বানানো উদ্ভট পিচে; তাদের কাছেই এরকম নাস্তানাবুদ হতে হবে? তাহলে মিরপুরের মাঠে আমাদের সেই জয়টি কি সঠিক ছিল না?

কেবল এই শেষ খেলাই কিন্তু নয়, সুপার টুয়েলভের প্রতিটি ম্যাচে আমাদের দল (যাদের আমরা আহ্লাদ করে ‘টাইগার’ ডাকি) হেরেছে। পাঁচ ম্যাচে আমাদের সংগ্রহ শূন্য পয়েন্ট। এর আগে কোয়ালিফাইং রাউন্ডের প্রথম ম্যাচে স্কটল্যান্ডের মতো দলের কাছেও হেরেছে আমাদের টাইগাররা। ওই রাউন্ডে সেটি ছিল আমাদের প্রথম ম্যাচ। ওই এক পরাজয় আমাদের সুপার টুয়েলভে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিশাল এক সন্দেহ তৈরি করে দিয়েছিল। তারপর অবশ্য ওমান আর পাপুয়া নিউগিনির বিরুদ্ধে পাওয়া দুটি জয় আপাত স্বস্তি দিয়েছে। এই যে ক্ষুদ্র দুটি জয় এবং বিশাল পাঁচ পরাজয় আমার মনে ভিন্ন একটা চিন্তার জন্ম দিলো।

স্কটল্যান্ডের কাছে পরাজয়ের পর বিভিন্ন ধরনের সমালোচনা হতে থাকলো। সেই সমালোচকদের শীর্ষে একলাফে ওঠে এলেন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। সিনিয়র খেলোয়াড়সহ সবাইকে গালমন্দ করতে লাগলেন। সেই গালমন্দের ভাষা কখনও কখনও সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রলের ভাষার চেয়েও তীব্র হয়ে গেলো। এতটাই তীব্র যে কেউ কেউ এমনও সন্দেহ প্রকাশ করলেন– টুর্নামেন্ট চলাকালে এমন ভাষায় সমালোচনা কি খেলোয়াড়দের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না? প্রভাব যে কিছুটা হলেও পড়েছিল তা বোঝা গেলো ওমান এবং পাপুয়া নিউগিনির সঙ্গে জয়ের পর। সিনিয়র খেলোয়াড়দের ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তা আর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ যেন অনেক কিছুই জানান দিলো। পাপন সাহেবকেও আর মন্তব্যের জন্য পাওয়া গেলো না। আচ্ছা, খেলোয়াড় কিংবা তাদের পরিবারের কোনও সদস্য কি তখন ওই দুটি জয়ের পর কারও না কারও কাছ থেকে অভিনন্দন-টন্দন আশা করেছিলেন? কে জানে, হতেও পারে। কারণ, আমাদের দেশে এমন রীতি তো আসলেই আছে।

এই একটি বিষয় আমি ঠিক বুঝি না। ক্রিকেট দল কিছু একটা ভালো রেজাল্ট করলেই দেখা যায়, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা অভিনন্দন দিতে থাকেন। রীতিমতো অভিনন্দনের বন্যা বয়ে যায়। সেই অভিনন্দন আবার মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার হতে থাকে। দীর্ঘদিন আমি ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় কাজ করেছি। তখন এ ধরনের কিছু বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে। হয়তো মিরপুর স্টেডিয়ামে কোনও ম্যাচ হচ্ছে; পিচের কারণেই হোক বা অন্য কোনও কারণেই হোক, বাংলাদেশ দল জিতে গেলো। তখনও হয়তো পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান শেষ হয়নি, কিন্তু আমাদের নিউজরুমে অভিনন্দনবাণী আসতে শুরু করেছে। রিপোর্টারদের মধ্যে যিনি যে বিট কভার করেন তিনি টেলিফোনে কার সঙ্গে যেন কথা বলছেন আর জানাচ্ছেন– অমুক অভিনন্দন জানিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, মন্ত্রী, নেতা, বিরোধীদলীয় নেতা– সবার অভিনন্দনই পাওয়া যেতে থাকলো। এসব অভিনন্দনবাণী সঙ্গে সঙ্গে টেলিভিশনের স্ক্রলে দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও থাকে। 

একবার এমন হলো– যে লোকের অভিনন্দনের কথা বলা হচ্ছে, টিভি পর্দায় দেখছি তিনি তখনও স্টেডিয়ামে ওই পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে রয়েছেন! তিনি অভিনন্দনটা জানালেন কখন, কিংবা কীভাবে? আমাদের রিপোর্টারের কাছে বিষয়টা জানতে চাইতেই জবাব দিলেন, ওনার অফিস থেকে ফোন করে বলা হয়েছে। তাহলে অভিনন্দনটা কি উনি জানান না? ওনার অফিসের লোকজন জানান? অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানেন, মন্ত্রী মহোদয়ের ঠিক কখন কাকে অভিনন্দন জানানো দরকার। আর একবার দেখি বিখ্যাত ব্যক্তিটি তখন বিদেশে। যে দেশে গেছেন সেখানকার সঙ্গে আমাদের সময়ের পার্থক্য এমন, মিরপুরে খেলাটি যখন শেষ হয়েছে ওই দেশে তখন রাত সাড়ে তিনটা। ওই সময়ই ওনার অভিনন্দন পাওয়া গেলো টেলিভিশন স্ক্রলে দেওয়ার জন্য! আচ্ছা, উনি কি ঘুমাননি? ওনার অফিসের কর্মকর্তারা কি ওনাকে ঘুমাতে দেননি? অথবা ঘুমন্ত মহোদয়ের পক্ষে কর্মকর্তারাই সবসময় ভালো বা মন্দ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে থাকেন?

ঠিক এই জায়গাতেই আর একটি প্রশ্ন এসে যায়। দল ভালো করলে আপনি অভিনন্দন দেন, যখন মন্দ করে তখন কেন নিন্দা করেন না? অথচ এটাই কি বেশি স্বাভাবিক ছিল না? জাতীয় দলে যারা আছেন, দেশের জন্য যারা মাঠে খেলেন, তারা কি কোনও বেতন-ভাতা পান না? যতদূর জানি, জাতীয় দলে যারা সুযোগ পান তাদের বেতন-ভাতা দেশের মন্ত্রী-এমপিদের চেয়েও বেশি। সেই সঙ্গে একবার জাতীয় দলে সুযোগ পেলে বিজ্ঞাপনের মডেল হয়েও বাড়তি আয়ের সুবিধা হয়ে যায়। এই যে এত এত অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা কেন দেওয়া হয়েছে? তারা দেশের জন্য জান লড়িয়ে খেলবেন– এই প্রত্যাশাতেই তো। কিন্তু সেটা কি তারা সবসময় করেন? প্রত্যাশা যদি তারা মেটাতে না পারেন, তখন নিন্দা কেন করা যাবে না? কেন সমালোচনা করা যাবে না? অভিনন্দনের অপর পৃষ্ঠায় নিন্দা বা সমালোচনাও থাকা দরকার। আমার তো বরং মনে হয়– অভিনন্দনটাই অপ্রয়োজনীয়, সমালোচনাটাই জরুরি। যদি তাদের বেতন ভাতা দেওয়া না হতো, তখন হয়তো অভিনন্দন বা প্রশংসাটা অপরিহার্য হতে পারতো। বলা যেতো– টাকা পয়সা কিছু পায় না, তারপরও ভালো খেলে দেশের সম্মান বৃদ্ধি করেছে, এখন অভিনন্দনটাও কি জানাবো না? কিন্তু যখন তারা জাতীয় দলের জন্য নির্বাচিত হন, তখন কিন্তু তারা আর আমাদের কোনও দয়া দেখাচ্ছেন না। নিয়মিত বেতন নিচ্ছেন, ভাতা নিচ্ছেন। তাদের খেলার মান আরও উন্নত করার জন্য আমরা বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে সারা দুনিয়া খুঁজে ভালো ভালো কোচ নিয়ে আসছি। এত বিনিয়োগের পরও যদি তারা সেই দায়িত্ব পালন করতে না পারেন, প্রত্যাশিত ফল না এনে দিতে পারেন, সেটাও মেনে নিতে হবে?

অথচ আমাদের প্রত্যাশাটা কিন্তু অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। দলটি যখন সেখানে গেলো, খুব বেশি কিছু কি কেউ আশা করেছিল? কেউ কি বলেছিলেন, চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফিরতে হবে? অথবা আমরা কি ভেবেছিলাম, চ্যাম্পিয়ন না হতে পারলেও ফাইনালে কিংবা সেমিফাইনাল পর্যন্ত যাবেই আমাদের দল? আমার ধারণা, সেরকম কেউ ভাবেনি। কিন্তু তাই বলে তো আমরা এমনও ভাবিনি যে স্কটল্যান্ডের মতো দলের কাছে আমরা হেরে যাবো। আমরা কিন্তু ভাবিনি, পাঁচ ম্যাচে আমাদের নেট প্রাপ্তি হবে শূন্য পয়েন্ট। আমরা চিন্তাও করিনি, যে দলকে এই আমরাই ৪-১ ম্যাচের ব্যবধানে হারিয়েছিলাম মাস কয়েক আগে, তারাই আমাদের করা রান টপকে যাবে মাত্র ৬ দশমিক ২ ওভার খেলেই। এই দলটি, যাদের পেছনে আমরা কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ ব্যয় করি, তারা যখন জাতির প্রত্যাশাকে আহত করে, তখন তাদের কাজটি যে ঠিক হয়নি– সেই কথাটা সরাসরি উচ্চারণের একটা কালচার থাকা দরকার।

দুই যুগ আগে, বাংলাদেশ যখন আইসিসি চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, দেশের মানুষ তাদের হৃদয় উজাড় করে ক্রিকেট দলকে ভালোবাসা দিয়েছিল। সরকার তাদের সংবর্ধনা দিয়েছিল, বিশাল অঙ্কের অর্থ পুরস্কার দিয়েছিল। এমনকি বাড়ি করার জন্য জমি পর্যন্ত দিয়েছিল। সেটাই শেষ নয়, এমন উপহার দেওয়ার প্রচলন পরেও দেখা গেছে। অনেক ক্রিকেটারই গাড়ি পেয়েছেন পুরস্কার হিসেবে। এসব প্রদানকে তখনই যুক্তিগ্রাহ্য বলা যাবে, যখন এর বিপরীতটাও থাকবে। যেমন, কোনও ট্যুরে খারাপ বা অপ্রত্যাশিত ফল করলে, ক্রিকেটারদের পেতে থাকা অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে দেওয়া হবে। আনুপাতিক হারে কমে যাবে। খেলায় হারজিত থাকবেই। জিতলে যদি পিঠ চাপড়ে দেন, হারলে গাল চাপড়ে দিতে পারবেন না কেন? হারার মাত্রাটা যদি অপমানজনক হয়, প্রতিপক্ষ যদি ছয় ওভারেই গুঁড়িয়ে দেয়, সেক্ষেত্রে পুরো মাসের বেতন কেটে নেওয়ার উদাহরণও তৈরি করা যেতে পারে।

আবার একইসঙ্গে এই যে বিপুল ব্যয়, সেটা করার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে যাদের, সেই ক্রিকেট বোর্ডের কর্মকাণ্ডও মনে হয় এখন জবাবদিহির মধ্যে আনার সময় হয়েছে। ক্রিকেট বোর্ডের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা এখন নাজমুল হাসান পাপন। ইনি একইসঙ্গে একজন সংসদ সদস্য, একটি ওষুধ কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তা। তাকে আসলে একইসঙ্গে অনেক কাজ করতে হয়। কাজগুলোও ভিন্ন ধরনের। তিনি কি ক্রিকেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় নিয়ে ঠিকঠাক ভাবতে পারছেন? পাপন সাহেব বলেন ভালো, হয়তো প্রশ্ন করলে তিনি বিরতিহীনভাবে বলতে পারবেন গত কয়েক বছরে তিনি কত কত কাজ করেছেন। হয়তো করেছেনও, কিন্তু তাতে হয়েছেটা কী? উনি ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি থাকাকালীন বাংলাদেশ দল চার-চারটি বিশ্বকাপ খেলেছে। ফল প্রতিবারই আগেরবারের চেয়ে খারাপ হয়েছে। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে ফল দেখে। এটা তো আর ব্যাখ্যা করে বোঝানোর বিষয় না। এটা কোনও আধ্যাত্মিক বিষয় নয়। ফল চোখের সামনে। আপনি যা করছেন তাতে কাজ হচ্ছে না। আমরা সুফল পাচ্ছি না। এই যে সুফল না পাওয়া, এটাই আপনার সম্পর্কে শেষ কথা।

দেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমার কথা হলো, আমাদের কিন্তু আকাশচুম্বী কোনও প্রত্যাশা নেই। আমরা বলিনি– আপনারা গিয়ে এখনই বিশ্বকাপ নিয়ে আসুন। তবে আমরা মাঠে একেবারে আত্মবিশ্বাসহীন, ভেঙে পড়া একটা জাতীয় দল দেখতে চাই না। মাঠে ব্যাট আর বল হাতে আমাদের ক্রিকেটারদের এমন সব ক্যারিকেচার দেখতে চাই না, যা আমাদের লজ্জায় ফেলে দেয়।

লেখক: হেড অব নিউজ, বাংলা ট্রিবিউন

/এসএএস/জেএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
জোর করে গরু নামাতে বাধা দেওয়ায় পুলিশের ওপর হামলা, গ্রেফতার ৩
জোর করে গরু নামাতে বাধা দেওয়ায় পুলিশের ওপর হামলা, গ্রেফতার ৩
পর্দা নামলো উইমেন্স লেন্স আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবের
পর্দা নামলো উইমেন্স লেন্স আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবের
সীতাকুণ্ডে আগুন: তদন্তে একমাস লাগার কারণ
সীতাকুণ্ডে আগুন: তদন্তে একমাস লাগার কারণ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মসজিদের টাকার হিসাব নিয়ে বিবাদে নিহত ১
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মসজিদের টাকার হিসাব নিয়ে বিবাদে নিহত ১
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ