X
সোমবার, ০৩ অক্টোবর ২০২২
১৭ আশ্বিন ১৪২৯

কেবলই কি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব?

মাসুদ কামাল
০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬:০৬আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬:০৬

মাসুদ কামাল তিনি বললেন, ‘একটা বিষয় খেয়াল করেছেন? সবকিছু কেমন যেন একসঙ্গে ঘটছে!’

ভদ্রলোক একজন ব্যবসায়ী। তবে কেবল টাকা পয়সার হিসাব নিয়েই ব্যস্ত থাকেন না, দেশ নিয়েও ভাবেন। সেসব ভাবনার কথা মাঝে মধ্যে প্রকাশও করেন। যখন বলেন, শুনে মনে হয়- তাই তো, এভাবে তো ভাবিনি!

এবারও তা-ই হলো। আসলে ঘটনা তো কিছু ঘটছে, উদ্বিগ্ন হওয়ার মতোই সেগুলো। আমি এই সময়ের ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালাম।

তেলের দাম বাড়লো, প্রায় একই সঙ্গে বেড়ে গেলো গণপরিবহনের ভাড়া। ভাড়া নিয়ে সারাদেশে হুলস্থুল কাণ্ড। যা বাড়ানোর কথা, তারচেয়েও বেশি দাবি করতে থাকলো পরিবহনের লোকেরা। ফলে অবধারিতভাবে বাগবিতণ্ডা, মারামারি। কোথাও কোথাও যাত্রীদের চলন্ত গাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হলো রাস্তায়। মহিলা যাত্রীদের হুমকি দেওয়া হলো, গায়ে হাত পর্যন্ত উঠলো। এসব চলতে চলতেই শুরু হলো ছাত্রদের হাফ ভাড়ার আন্দোলন। দ্রুত এটি ছড়িয়ে পড়লো। দেখা গেলো– এখানে সেখানে রাস্তা অবরোধ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে যাত্রীবাহী গণপরিবহনের ভয়ে ভয়ে যাতায়াত।

এ আন্দোলনটি শুরুতে অনেকটা শান্তিপূর্ণই ছিল। হঠাৎ করেই একে যেন উসকে দিলো সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির অবৈধ চালকরা। প্রথম দিন দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় নটর ডেম কলেজের একজন ছাত্রকে চাপা দিয়ে মারলো এদের একটি ময়লার গাড়ি। আর পরের দিনই উত্তর সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি। এবার মারা পড়লো একজন গণমাধ্যমকর্মী। এই গাড়িও নাকি প্রকৃত চালক চালাচ্ছিলেন না।

ঢাকার দুটি সিটি করপোরেশনই সরকারি প্রতিষ্ঠান। বৈধ এই দুই প্রতিষ্ঠানের গাড়িগুলোও বৈধ। তাহলে সেগুলো অবৈধ চালকের হাতে বছরের পর বছর থাকে কী করে? কারা দেয় তাদের কাছে ময়লার গাড়ি? এসব প্রশ্নও উচ্চারিত হতে থাকলো। এই যে অবৈধ চালক, এরা কিন্তু বেতন কিছুই পায় না। তাহলে তারা এই গাড়িগুলো আগ্রহ নিয়ে চালায় কেন? জানা গেলো– তাদের মূল কাজই ছিল গাড়ির তেল চুরি করা। বিভিন্ন মিডিয়ায় এ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলো। তেল চুরি ছাড়াও আরও কত বিচিত্র উপায়ে এরা দুর্নীতি করে, সরকারি সম্পত্তির তছরুপ করে- সেসবও জানা গেলো। এসবই উদ্বেগের বিষয় হতে পারে। আমরা ভেবেছিও।

কিন্তু তিনি ভাবছেন অন্য কথা। বলেছিলেন সেদিন, গাড়িচাপা পড়ে কেউ যে মরে না, তা নয়। কিন্তু এখনই, ঠিক এই সময়েই কেন? সরকারি গাড়ির নিচে পড়েই বা কেন? ছাত্ররা যখন হাফ ভাড়ার দাবি নিয়ে আন্দোলন করছে, ঠিক তখনই একটি সেরা কলেজের ছাত্রকেই বা সরকারি গাড়ি চাপা দেবে কেন? তাহলে কি ধিকি ধিকি করে জ্বলতে থাকা কোনও আগুনে নেপথ্যে থেকে কেউ ঘি ঢালতে চাইছে?

ঠিক পরের দিন যখন ঢাকা উত্তর সিটির ময়লার গাড়িও ঘটালো একই অপকর্ম, তখনও তিনি করলেন সেই একই প্রশ্ন- সংবেদনশীল এই সময়ে একসঙ্গে এত অঘটন কেন? এসব কি কেবলই কাকতালীয়? অঘটনগুলো কি ঘটছে, নাকি ঘটানো হচ্ছে?

সবকিছুতে ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ খুঁজে বেড়ানো আমার ঠিক পছন্দ নয়। কিন্তু সন্দেহগুলো যখন একের পর এক ঘটনা ও লজিকের ওপর ভিত্তি করে হয়, তখন সেটাকে উপেক্ষাই বা করবো কীভাবে? এই যে ঘটনাপ্রবাহ, এই একই সময়ে পাশাপাশি কিন্তু আরও একটা বিষয় চলছিল। সেটা হচ্ছে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ‘উন্নত চিকিৎসা’ এবং সে জন্য অতি অবশ্য তাকে বিদেশে পাঠানোর দাবি নিয়ে আন্দোলন। এ কথা কেউ-ই অস্বীকার করতে চাইবেন না যে, গত কয়েক বছরের মধ্যে এত ঠান্ডামাথায় গোছানো রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে বিএনপি আর মাঠে নামেনি। রাজপথে যখন ছাত্ররা, ঠিক তখনই সারা দেশে বিএনপির কর্মসূচি। এটিও কি কাকতালীয়?

এর মাঝে আরও একটা ঘটনা দেখা গেলো। পরিবহন মালিকরা হাফ ভাড়ার দাবিটি মেনে নিলেন। সংবাদ সম্মেলন করে তার ঘোষণাও দিলেন।  তাদের এই মেনে নেওয়া পরিস্থিতিকে ঠান্ডা না করে বরং উল্টো আরও গরম করে তুললো। হাফ ভাড়ার বিষয়টি মেনে নিলেও পরিবহন মালিকরা সেখানে কিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন। শর্তগুলো ছাত্রদের ভালো লাগার কথা নয়। বিশেষ করে ঢাকার বাইরের ছাত্রদের হাফ ভাড়া নেওয়া হবে না- এমন শর্ত পুরো বিষয়টিকেই ঘোলাটে করে তুললো। কেউ কেউ এমনও মনে করতে থাকেন, এর মাধ্যমে আসলে ছাত্রদের এই আন্দোলনকে রাজধানী থেকে বিভিন্ন জেলা শহরেও ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ঘটনা কিন্তু আরও আছে। এরইমধ্যে দেখা গেলো ছাত্রদের হাফ ভাড়ার আন্দোলন যেন ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে’। সোমবার (২৯ নভেম্বর) রাতে রামপুরায় একজন ছাত্র মারা গেলো বাসচাপায়। সেই অত রাতেই একের পর এক বাসে আগুন দেওয়ায় পুরো এলাকা পরিণত হলো এক অগ্নিকুণ্ডে। ছাত্র নিহতের ঘটনাটি মর্মান্তিক- এতে কোনই সন্দেহ নেই। এর সুবিচার হওয়াও জরুরি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই মধ্যরাতে একের পর এক বাসে আগুন দেওয়ার মতো উন্মাদনা ছাত্রদের মধ্যে এলো কী করে? তারা কি তাহলে অন্য কোনও কারণে ক্ষুব্ধ ছিল? এতদিন প্রকাশের সুযোগ পায়নি, হঠাৎ করে পেয়ে সব ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছে? হতে পারে। আবার এমনও তো হতে পারে, কেউ কেউ পুরো পরিবেশটাকে শান্ত হতে দিতে চাচ্ছে না।

বিষয়গুলো নিয়ে আমার এক বন্ধুর সঙ্গে সেদিন কথা বলছিলাম। তিনিও কিন্তু ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’টিকে একেবারে উড়িয়ে দিলেন না। বরং তিনি কল্পনার চোখে আরও কিছু দেখতে চাইলেন। বললেন- আচ্ছা এমনকি হতে পারে না দেশি বা বিদেশি কোনও চক্র এসব ঘটাচ্ছে? আমি বললাম, তা কী করে হয়, ছাত্রদের হাফ ভাড়ার আন্দোলনটা শুরু করতে কি কোনও চক্রের অবদান রাখার প্রয়োজন আছে? এটা তো একটা যৌক্তিক দাবি। যখন ছাত্র ছিলাম, আমরাও হাফ ভাড়া দিয়েছি। ঢাকায় দিয়েছি, যখন ঢাকার বাইরে পড়ালেখা করতাম তখনও দিয়েছি। তিনি জবাব দিলেন, ছাত্রদের আন্দোলন নিয়ে প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হচ্ছে- ওই গাড়ি চাপা দেওয়া, আগুন ধরানো- এসব নিয়ে। গাড়ি চাপা দিতে কয়জন লোককে সম্পৃক্ত করা দরকার? একজন ক্লিনার, যার কোনও ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই, তাকে কিনতে কত টাকা লাগে? ছাত্রদের বিক্ষোভের সুযোগে মধ্যরাতে দশ-বারোটা গাড়িতে আগুন দিতেই বা কতজন লোক লাগে? আমি স্তব্ধ হয়ে শুনলাম। কী জবাব দেবো বুঝতে পারলাম না।

হাফ ভাড়া কিংবা নিরাপদ সড়ক- এর কোনোটিরই যৌক্তিকতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। হাফ ভাড়া ছাত্ররা পেতেই পারে। কেবল ঢাকায় নয়, সারা দেশের ছাত্রছাত্রীদেরই এই সুবিধা দেওয়া দরকার। এ বিষয়ে বাস মালিক সমিতি নয়, উদ্যোগ নিতে হবে খোদ সরকারের। বাস মালিকদের উদ্যোগ যে ঝামেলা আরও বাড়াতে পারে, তার নমুনা কিন্তু এরইমধ্যে টের পাওয়া যাচ্ছে। আর নিরাপদ সড়ক কে না চায়। সবাই চায়। তবে সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার যদি মালিক-চালকদের মতো করে চিন্তা করে, তাহলেও সমস্যা বাড়বে ছাড়া কমবে না।  এগুলো সবই হচ্ছে তত্ত্বগত কথা, নৈতিকতার কথা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি নিয়ে। আন্দোলন কে পরিচালনা করছে, অথবা ইন্ধন কারা জোগাচ্ছে, সেসব নিয়ে। এসব নিয়ে চিন্তা করতে হবে, অনুসন্ধান করতে হবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে- আমাদের এই চিন্তা বা ‘অনুসন্ধান’গুলো প্রায়ই খুব রাজনৈতিক হয়ে যায়। অনুসন্ধান বা তদন্তের নাম করে বিরোধী দলের শীর্ষ নেতৃত্বসহ হাজার খানেক লোকের নামে মামলা করে দিলে সমাধান আর হয় না। তখন প্রকৃত সমস্যা চাপা পড়ে যায় রাজনীতির নিচে।  
আমার তো মনে হয় বিষয়গুলোকে সার্বিক পরিস্থিতির আলোকে বিচার করতে হবে। এমনকি এখানে আন্তর্জাতিক প্রভাব বলয়ের কথাও বিবেচনায় রাখা যেতে পারে। একসময় আমাদের রাজনীতিকদের কণ্ঠে আইএসআই বা র’র কথা প্রায়ই উচ্চারিত হতো। পাকিস্তান বা ভারতের পাশাপাশি ইদানীং অনেককে চীনের কথাও বলতে শুনি। তারাও নাকি নানাভাবে এখানে প্রভাব বিস্তার করতে চায়। এসব নিছক মুখরোচক কথা যেমন হতে পারে, তেমনি কিছু বাস্তবতাও কিন্তু থাকতে পারে। আমরা আদার ব্যাপারী, এত বড় বড় খবর জানার সুযোগ আমাদের নেই।  কিন্তু সরকারের তো সুযোগ আছে, সক্ষমতা আছে। তাই তাদেরই বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে হবে। হয়তো কিছুই না, নিছকই ষড়যন্ত্র আশঙ্কা, কিন্তু খতিয়ে দেখতে তো আর সমস্যা নেই।

লেখক: হেড অব নিউজ, বাংলা ট্রিবিউন

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ঘটনাবহুল ম্যাচ জিতে সিরিজ ভারতের
ঘটনাবহুল ম্যাচ জিতে সিরিজ ভারতের
জমিদারপুত্র থেকে সংগীত সাধক
বারীণ মজুমদারের প্রয়াণদিনজমিদারপুত্র থেকে সংগীত সাধক
বিবিয়ানায় আরও কূপ খনন করবে শেভরন
বিবিয়ানায় আরও কূপ খনন করবে শেভরন
দেরি করেই বাড়ছে বিপদ
দেরি করেই বাড়ছে বিপদ