X
মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২
২১ আষাঢ় ১৪২৯

যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার বিলাস ও অনৈতিক নিষেধাজ্ঞা উল্লাস

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০২১, ১৭:৩৬

মো. জাকির হোসেন ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে—‘The saucepan should not call the kettle black’. এর সমতুল্য বাংলা প্রবচন হলো, ‘চালুনি বলে সুচ, তোর কেন এত বড় ফুটো’। মানবাধিকার ব্যবসায়ী যুক্তরাষ্ট্র অপর রাষ্ট্রের মানবাধিকার নিয়ে কথা বললে তাৎক্ষণিকভাবে এই প্রবাদ-প্রবচনগুলো আমার মনে আসে। মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিপীড়নের অভিযোগে উত্তর কোরিয়া, চীন ও মিয়ানমার ও বাংলাদেশের ১০টি প্রতিষ্ঠান ও ১৫ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ।

এ তালিকায় বাংলাদেশের র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব), সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ ৬ কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। র‍্যাবের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের উল্লেখ করে ট্রেজারি বিভাগ জানায়, মাদকের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের যুদ্ধে অংশ নিয়ে র‌্যাব আইনের শাসন ও মানবাধিকার খর্ব করেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থ হুমকির মুখে পড়েছে। র‌্যাবের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০১৪ সালে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস থেকে পুলিশের মহাপরিদর্শককে চিঠি দিয়ে মার্কিন সহায়তায় পরিচালিত কোনও প্রশিক্ষণে র‌্যাব সদস্যদের পাঠাতে নিষেধ করা হয়েছে। যে চিঠিতে র‌্যাবের কোনও সদস্যকে মার্কিন সহায়তাপুষ্ট কোনও প্রশিক্ষণে পাঠাতে নিষেধ করা হয়েছিল সেই চিঠিতে র‌্যাবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকায় র‌্যাবের কোনও সদস্য বা ইউনিট প্রশিক্ষণসহ কোনও ধরনের মার্কিন সহায়তা পাবে না বলে জানানো হয়েছিল।

বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীকে মার্কিন সরকার আর্থিক ও প্রশিক্ষণ সহায়তা দেবে কিনা কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেবে কিনা এটি কোনও রাষ্ট্রের একান্তই নিজস্ব সার্বভৌমত্বের বিষয়। কিন্তু মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র‌্যাবের কোনও সদস্য বা ইউনিটকে প্রশিক্ষণসহ কোনও ধরনের মার্কিন সহায়তা প্রদান থেকে বিরত থাকা কিংবা যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মতো নৈতিক দৃঢ় অবস্থান মার্কিন সরকারের আছে কি? অবশ্যই নেই।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের বিরুদ্ধে মার্কিন সরকারের সুস্পষ্ট অবস্থান ও তার প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক অগণিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের কয়েকটি উল্লেখ করছি।

এক. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মানবতার প্রতি যে চরম বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করা হয়েছে তার পুনরাবৃত্তি রোধে যুদ্ধ শেষে একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে তার অধীনে একটি কার্যকর মানবাধিকার ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য যুদ্ধ চলাকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টসহ তৎকালীন বৈশ্বিক নেতৃবৃন্দ বারবার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। যুদ্ধ শেষে যে চারটি রাষ্ট্রের বিরোধিতার কারণে জাতিসংঘের গঠনতন্ত্রে মানবাধিকারের তালিকা সংযোজন ও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়নি তার মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম।

দুই. ১৯৬৬ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের ওপর দুটি আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অদ্যাবধি অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার সংক্রান্ত চুক্তি অনুমোদন করেনি। নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত চুক্তিটি গৃহীত হওয়ার ২৬ বছর পর ১৯৯২ সালে অনুমোদন করলেও চুক্তির প্রায় প্রতিটি অধিকারের ওপর এমনভাবে শর্ত সংরক্ষণ করেছে যে এটি একটি নপুংসক দলিলে পরিণত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক চুক্তিতে এভাবে শর্তারোপের বিরুদ্ধে বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ড, নরওয়ে, পর্তুগাল, স্পেন ও সুইডেন আপত্তি জানিয়েছে। নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি (সিডও) যেসব রাষ্ট্র অনুমোদন করেনি তার মধ্যে রয়েছে সোমালিয়া, সুদান, পালাও ও যুক্তরাষ্ট্র। তার মানে নারী অধিকারের আইন অনুমোদনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সোমালিয়া ও সুদানের কাতারে।

তিন. হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব রেড ক্রসসহ বিভিন্ন সংস্থা ও মিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তান ও ইরাক ছাড়াও ২৮টি দেশে মার্কিন সরকারের গোপন কারাগারের সন্ধান মিলেছে। এই দেশগুলো হলো, আলজেরিয়া, আজারবাইজান, জিবুতি, মিসর, ইথিওপিয়া, গ্যাম্বিয়া, ইসরায়েল, জর্ডান, কেনিয়া, কসোভো, লিবিয়া, লিথুয়ানিয়া, মৌরিতানিয়া, মরোক্কো, পাকিস্তান, পোল্যান্ড, কাতার, রোমানিয়া, সৌদি আরব, সিরিয়া, সোমালিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, উজবেকিস্তান, ইয়েমেন ও জাম্বিয়া। স্থল কারাগার ছাড়াও অন্তত ১৭টি জাহাজকে ভাসমান কারাগার হিসেবে ব্যবহারের একাধিক রিপোর্ট রয়েছে। এসব স্থল ও জল কারাগারের মধ্যে বাগরাম, আবুগারিব, গুয়ান্তানামো কারাগারসহ বেশক’টি কারাগার বন্দি নির্যাতনের জন্য কুখ্যাত।

চার. মানবাধিকারের দোহাই দিয়ে মার্কিন প্রশাসন বিশ্বের বেশক’টি দেশের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত কিংবা হত্যা করে সামরিক জান্তাকে ক্ষমতায় বসাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা পালন করেছে।

পাঁচ. ভবিষ্যতে আমেরিকার জন্য বিপদ বা ক্ষতির কারণ হতে পারে এই অজুহাতে মার্কিন প্রশাসন অন্য রাষ্ট্রের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরে ড্রোন হামলা চালিয়ে কয়েক হাজার বেসামরিক নাগরিককে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অনোয়ার-আল-আওলাকি, সমীর খান ও আওলাকির ১৬ বছরের পুত্র আবদুল রহমানকে ড্রোন হামলা চালিয়ে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার বিষয়ে আমেরিকান সিভিল লিবার্টিস ইউনিয়ন সিআইএ, এফবিআই ও জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের বিরুদ্ধে নিউ ইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

গত ২৯ আগস্ট আইএস জঙ্গি সদস্যদের অবস্থান সন্দেহে কাবুলে একটি গাড়িতে ড্রোন হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এতে তিন জন প্রাপ্তবয়স্ক ও সাত শিশুসহ ১০ জন নিহত হয়। কাবুলে মার্কিন ড্রোন হামলায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকারী কাউকেই বিচারের আওতায় না আনার ঘোষণা দিয়েছে মানবাধিকারের ‘মহাজন’ যুক্তরাষ্ট্র।

ছয়. ম্যালকম এক্স গ্রাসরুটস মুভমেন্ট (এমএক্সজিএম) ও দ্য রিয়েল নিউজ নেটওয়ার্ক (টিআরএনএন)-সহ বেশ কিছু সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী পুলিশ, নিরাপত্তা রক্ষী ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা ২০১২ সালে ৩১৩ জন আফ্রিকান আমেরিকানকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করেছে। ‘অপারেশন গেট্টো স্টর্ম’ শিরোনামে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি ২৮ ঘণ্টায় একজন কালো চামড়ার পুরুষ, নারী বা শিশুকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করার রেকর্ডও আমেরিকার দখলে।

সাত. বন্দিদের ওপর পুলিশ ও কারা কর্মকর্তাদের নিষ্ঠুর আচরণ, জাতিগত বৈষম্য, নারী বন্দিদের ওপর যৌন নিপীড়ন, পুলিশ কর্তৃক বৈদ্যুতিক শক ও রেস্ট্রেইন্ট চেয়ার ব্যবহারসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী নানা নির্যাতনমূলক কৌশল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপকভাবে প্রচলিত বলে জাতিসংঘের নিপীড়নবিরোধী কমিটি মত দিয়েছে।

আট. যুদ্ধ মানে শান্তি—এ মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে কোনও আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই বিশ্বের নানা প্রান্তে ঠান্ডা মাথায় খুনের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। জঙ্গিবাদের অন্যতম জন্মদাতা ও আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এটি দিবালোকের চেয়েও সত্য। আফগানিস্তানে সোভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে প্রক্সি যুদ্ধে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধকে ‘জিহাদ’ আখ্যা দিয়ে আল-কায়েদা ও তার প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে অস্ত্র-অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য-সহযোগিতা প্রদানের কথা কে না জানে? আইএস সৃষ্টিতে ও লালনে যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে খোদ মার্কিন সাংবাদিক, গবেষক, লেখকরা তথ্য-প্রমাণাদিসহ অসংখ্য প্রবন্ধ লিখেছেন।

নয়. সন্তানকে মা-বাবা থেকে আলাদা করে কারাগারসম শেল্টারে বন্দি রাখার মতো মানবাধিকারবিরোধী অভিবাসন নীতির প্রবক্তা যুক্তরাষ্ট্র।

দশ.  বর্ণবাদী হত্যা-নির্যাতন-বৈষম্য-অবিচার যুক্তরাষ্ট্রে অতি সাধারণ নৈমিত্তিক ঘটনা। ক্লিনটনের শ্রমমন্ত্রী রবার্ট রাইস লিখেছেন, আজকের আমেরিকার যে আর্থসামাজিক ব্যবস্থা, তার সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী ‘অ্যাপারথেইড’ ব্যবস্থার কোনও ফারাক নেই। এ দেশে দাসপ্রথার অবসান হয়েছে বটে, কিন্তু তার বদলে এক ভিন্ন দাসপ্রথা চালু হয়েছে। আমেরিকার শেকড় থেকে শিখরে বর্ণবাদ। রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার পরতে পরতে সাদা-কালো বৈষম্য। সমাজ ব্যবস্থার গভীরভাবে প্রোথিত আছে বর্ণবাদ’ সাদা-কালো বিদ্বেষ। বারাক ওবামা বলেছিলেন, ‘বর্ণবৈষম্য আমাদের সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত। এটা আমাদের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত। বর্ণবৈষম্য আমাদের সমাজের আদি প্রবাহ ও আমাদের ইতিহাসের জঘন্যতম অধ্যায়।’

আমেরিকার ইউসিএলএ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাগরিক অধিকার বিষয়ক একটি গ্রুপের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, আমেরিকার বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আবারও বর্ণবাদ জোরদার হচ্ছে। আমেরিকার আবাসন বিভাগেও আবার ফিরে এসেছে বর্ণবাদ। ফলে কৃষ্ণাঙ্গরা শহরের অভিজাত অঞ্চলে বসবাস করতে পারছে না। তাই বড় শহর ছাড়া ছোট ছোট শহরে বহু-বর্ণভিত্তিক শিক্ষা-ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অঙ্গরাজ্যে ‘রেশিয়াল প্রোফাইলিং’ এখনও একটি বৈধ আইনি ব্যবস্থা।

এগারো. র‌্যাবের বিরুদ্ধে ২০০৯ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৬০০ জন মানুষ নিখোঁজের অভিযোগ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের  National Crime Information Center-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ সালে এক বছরেই ৬ লাখ ১২ হাজার ৮৪৬ জন মানুষ নিখোঁজ হয়েছে। এরমধ্যে কেবল ডিসেম্বর মাসেই ৮৫ হাজার ৪৫৯ জন আমেরিকান নিখোঁজ হয়েছে।

বারো. সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে এই মিথ্যা অজুহাতে ইরাক আক্রমণ করে ইরাকে তাঁবেদার সরকার প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় হত্যা-ধর্ষণসহ যে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, গুচ্ছবোমা ব্যবহার করে ইরাকের প্রতি দশ জন মানুষের মধ্যে একজনকে ক্যানসারের হুমকিতে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, তার দায়ভার আমেরিকার নয় কি?

ইরাক, আফগানিস্তানসহ বিশ্বের অনেক দেশে আত্মঘাতী হামলায় যে হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করছে তা আমেরিকার অবিমৃশ্যকারিতার জন্যই নয় কি?

মোটামুটি স্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্যে ‘আরব বসন্তের’নাম করে রাষ্ট্রসমূহের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ করে যেভাবে লন্ডভন্ড করা হলো, তার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দায়ী নয় কি? আমেরিকার নেতৃত্বে মধ্যপ্রাচ্য তছনছ হওয়ার আগে যে মানুষগুলোর অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার ন্যূনতম নিশ্চয়তা ছিল, সেই মানুষগুলো সব হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অজানা আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় সমুদ্র পেরিয়ে কুকুর-বিড়ালের মতো তাড়িত হয়ে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর এক সীমান্ত থেকে আরেক সীমান্তে ভিক্ষুকের মতো যে হাত পাতলো, তার জন্য আমেরিকার অনুশোচনা হয় কি? ‘আয়লান ট্র্যাজেডি’ আমেরিকার সৃষ্টি নয় কি?

তেরো. বঙ্গবন্ধুর খুনি রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছে এবং তাকে ফেরত দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের অনুরোধ বারবার উপেক্ষা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। খুনিকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া কি মানবাধিকারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকারের সাক্ষ্য দেয়?

চৌদ্দ. আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ ইউরোপীয় পূর্ব পুরুষরা ভয়ংকর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিষ্ঠুরতার মাধ্যমে আমেরিকায় তার বসতি স্থাপন করেছিল। অ্যাজটেক-ইনকাদের সমৃদ্ধ সভ্যতা ও জনপদকে পদানত করেছিল তারা। আমেরিকার আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়, হাজার হাজার রেড ইন্ডিয়ানকে হত্যা করে তাদের জমি ও দেশ দখল করতে হেন নৃশংসতা নেই তারা করেনি। অনেক আদিবাসী পালিয়ে আশ্রয় নেয় পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে। অল্প দিনের মাঝেই ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গরা আমেরিকার ভূমিপুত্র আদিবাসীদের বিশাল ইনকা ও অ্যাজটেক সাম্রাজ্য দখল করে নেয়। নিজভূমে পরবাসী হয় আদিবাসীরা। আমেরিকায় দাস প্রথা চালু করেছিল ইউরোপিয়ানরা। কলম্বাস আমেরিকায় পদার্পণের আগে রেড ইন্ডিয়ানদের মধ্যে দাসপ্রথা ছিল না। ইউরোপীয়রা আমেরিকা দখলের পর সমস্যা দেখা দিলো মহাদেশের হাজার হাজার মাইল অনাবাদি জমি আবাদ করার মতো জনবল তাদের ছিল না। সেই সমস্যার পৈশাচিক সমাধান বের করা হলো, আফ্রিকা থেকে লাখ লাখ মানুষকে দাস হিসেবে ধরে এনে। আফ্রিকা থেকে আটলান্টিক মহাসাগর পার হয়ে আমেরিকায় দাস ধরে আনার এই ব্যবসা ইতিহাসে ‘ট্রান্স আটলান্টিক স্লেভ ট্রেড’ হিসেবে পরিচিত। ষোড়শ শতকের শুরু থেকে আরম্ভ হওয়া দাস ব্যবসা উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিনশ’ বছর ধরে চলতে থাকে।

এই সময়ে আফ্রিকার প্রায় দেড় থেকে দুই কোটির মতো নারী, পুরুষ ও শিশুকে দাস বানিয়ে ধরে আনা হয়েছিল। এদের প্রায় তিন ভাগের এক ভাগই মারা পড়েছিল সমুদ্রপথে নিয়ে আসার সময় অত্যাচারে কিংবা ক্ষুৎ-পিপাসাক্লিষ্ট ও রোগ-শোকে। দাস ব্যবসায়ী আমেরিকা এখন "মানবাধিকার ব্যবসায়ী"।

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বন্ধু হলেও ঘনিষ্ঠ বন্ধু নয়। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পরে সমগ্র বিশ্ব বাংলাদেশের শ্রম পরিস্থিতি নিয়ে অনেক তির্যক মন্তব্য করেছিল, কিন্তু তারা এমন কোনও কাজ করেনি যাতে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম যুক্তরাষ্ট্র। রানা প্লাজা দুর্ঘটনা ঘটার দুই মাসের মধ্যে দেশটি বাংলাদেশের সীমিত যে কয়েকটি পণ্য (এরমধ্যে তৈরি পোশাক নেই) জিএসপি সুবিধা পেতো সেটি তারা বাতিল করেছিল। যা রাজনৈতিক কারণে হয়েছিল বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন সদস্যের ওপর সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষেত্রেও রাজনীতি রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের বাড়ন্ত সম্পর্ক ও ইন্দো-প্যাসিফিক কোয়াড তথা ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গঠিত জোটে বাংলাদেশের যোগদান না করার প্রতিক্রিয়ায় এমন নিষেধাজ্ঞা এক ধরনের চাপ সৃষ্টির কৌশল বলে মনে করার সঙ্গত কারণ রয়েছে।

স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, কানাডা, ভারত, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়। কিন্তু সবচেয়ে ধনী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গড়ে ১৭ শতাংশ হারে শুল্ক দিয়ে বাংলাদেশের পণ্য প্রবেশ করে। অবকাঠামো খাতে দ্বিপক্ষীয়ভাবে চীন, জাপানসহ অনেক ধনী দেশ বাংলাদেশকে সহায়তা করলেও যুক্তরাষ্ট্র তেমনভাবে সহযোগিতা করে না। বাংলাদেশের অর্থনীতির যে আকার সেটির বিবেচনায় মার্কিন বিনিয়োগ অনেক কম এবং এর বড় একটি অংশ জ্বালানি খাতে। মার্কিন বিনিয়োগ বাড়লে সেটির বড় প্রভাব থাকতো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মার্কিন সরকার মানবাধিকার বিষয়ে যেখানেই অতি উৎসাহী হয়েছে সেখানেই রাষ্ট্র ব্যবস্থার ঘাড় মটকে দিয়েছে। মেরুদণ্ড ভেঙে ফেলেছে। ইরাক, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, মিসর তার জলজ্যান্ত উদাহরণ।

বাংলাদেশের মায়েদের অনেককেই তাদের শিশুদের ওপর যাতে বদ নজর না পড়ে সেজন্য কাজলের বড় টিপ দিতে দেখা যায়। যানবাহনের ওপর কারও কুদৃষ্টির কারণে যাতে তা দুর্ঘটনায় না পড়ে সেজন্য যানবাহনের মালিককে বাহনের জুতসই জায়গায় অনেক সময় ছেঁড়া জুতা-স্যান্ডেল ঝুলিয়ে রাখতে দেখা যায়। এমনকি ফসলের ক্ষেতে কু-দৃষ্টি প্রতিরোধ করতে ক্ষেতের মালিককে কাকতাড়ুয়ার সঙ্গে বদনজর প্রতিরোধী নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায়। বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বদ নজর পড়েছে কিনা তা গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে। প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতি মনোযোগী হতে হবে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশকেও অনুধাবন করতে হবে, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ দমন ও মাদক প্রতিরোধ ‘বন্দুক যুদ্ধের’ মতো সরল সমীকরণ দিয়ে সমাধানযোগ্য নয়।

‘বন্দুক যুদ্ধে’ একজন সন্ত্রাসী-জঙ্গি অপসারিত হওয়া সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর তাবৎ মানুষের একটি অধিকার লঙ্ঘিত হয়। আর তা হলো তথ্য জানার অধিকার। যাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় সন্ত্রাসী-জঙ্গি-মাদক ব্যবসায়ীরা ভয়ংকর হয়ে ওঠে তাদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ-বিচারিক ব্যবস্থা গ্রহণ কিংবা নিদেনপক্ষে মুখোশধারী এসব ব্যক্তির বিষয়ে জনসাধারণের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

বন্দুকযুদ্ধের এই পদ্ধতি সাময়িক স্বস্তি আনলেও আখেরে ভালো কোনও ফলাফল বয়ে আনেনি। কার্যকর কোনও ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়নি পৃথিবীর কোথাও। যুগে যুগে দেশে দেশে এই পদ্ধতির ব্যর্থতার পাল্লা ভারি হয়েছে। সুদূর অতীত থেকে শুরু করে সমসাময়িক বিশ্বে এর নজির রয়েছে ভূরি ভূরি।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: [email protected]

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ইসরায়েলিরা ভাগ্যবান: ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট
ইসরায়েলিরা ভাগ্যবান: ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট
জমে উঠছে অনলাইন পশুর হাট
জমে উঠছে অনলাইন পশুর হাট
চট্টগ্রাম সিটির বর্জ্য অপসারণ করবে ৫ হাজার শ্রমিক 
চট্টগ্রাম সিটির বর্জ্য অপসারণ করবে ৫ হাজার শ্রমিক 
কোন গ্রিডে কত লোডশেডিং
কোন গ্রিডে কত লোডশেডিং
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ