X
সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২
১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

‘বস্তিতে আগুন লাগবে’: নগরের ওপর সাধারণের অধিকার

মাহমুদুল সুমন
১০ জানুয়ারি ২০২২, ১৭:০৭আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২২, ১৭:০৭
মাহমুদুল সুমন পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় কেবল পুঁজির জন্য নগর কীভাবে বারবার পুনর্নির্মিত হয় তা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে ইকোনমিক জিওগ্রাফার ডেভিড হার্ভি বলেছেন, দুনিয়ার মেট্রোপলিটনগুলোই হচ্ছে আগামী দিনের শ্রেণি-সংগ্রামের ক্ষেত্র। এই সংগ্রাম বুঝতে নগরের ওপর অধিকার বিষয়ে একটি ধারণাও তিনি দিয়েছেন। নিজেকে ও নিজেদের শহরকে নিজেদের মতো করে গড়ে তোলার স্বাধীনতার প্রশ্ন মানবাধিকারেরই এক অবহেলিত প্রশ্ন বলে তিনি মনে করেন। হার্ভি স্থানিক অসমতা বা স্পেশিয়াল ইনইকুয়ালির একটি ধারণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, আজকের দিনে নগরের ওপর অধিকারের ধারণাটি যেভাবে গঠিত, তাতে সুবিধা হয় কেবল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এলিটদের, যারা নিজেদের শ্রেণি-স্বার্থের ঊর্ধ্বে যেতে পারে না। আবার তৃতীয় বিশ্বের মেট্রোপলিটনগুলো নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে মারসেলো বালবো বলেছেন, শহরগুলো এখন ভাগ হচ্ছে ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন অংশে, যেন এগুলো একেকটা ‘ক্ষুদ্র রাষ্ট্র’! ধনী এলাকাগুলোতে সব ধরনের সুবিধাই থাকে, আর এর পাশেই থাকে ‘অবৈধ’ সেটেলমেন্ট। প্রত্যেকেই আবার স্বয়ম্ভূ!

আজকের ঢাকার দিকে দিকে তাকালে এসব চিন্তার কিছু প্রতিফলন পাওয়া যাবে। ঢাকার কোনও কোনও এলাকায় রয়েছে চকচকে রাস্তা, কিন্তু তার আড়ালেই বস্তি, যেখানে জীবনযাপন করে ইনফরমাল ইকোনমির মানুষেরা, যারা আবার শ্রমশক্তির বড় অংশ। গড়পরতা যাদের আমরা শ্রমজীবী মানুষ বলি সেই শ্রমজীবী মানুষের জন্য ভাসানটেকে একটা সরকারি আবাসন প্রকল্প হয়েছিল, কিন্তু কিছু গবেষণা দেখাচ্ছে সেখানে শ্রমজীবী মানুষের জায়গা হয়নি। সরকারি লোকজনের দুর্নীতির কবলে পড়ে সেই প্রকল্প গেছে পয়সাওয়ালা নেতাদের পেটে। পশ্চিমা মেট্রোপলিটন শহরগুলোর কায়দায় আমাদের শহরের ‘উন্নয়ন’ এখন জেন্ট্রিফিকেশনের মধ্য দিয়ে ঘটছে। মানে বাইরে দিয়ে ফিটফাট, মধ্যবিত্তের চোখের আরাম, উজ্জ্বল আলো, ফ্যান্সি খাবার দোকানের সারি, সবই শহুরে মধ্যবিত্তের জন্য।

সরকারি বেসরকারি আবাসন প্রকল্পগুলোর দিকে তাকালেও একই প্রবণতা। আজকাল আবাসন প্রকল্পগুলো পশ্চিমা প্ল্যানিংয়ের এফিসিয়েন্সির ধারণা ব্যবহার করে কনডোমিনিয়ামের রূপ ধারণ করেছে এবং এটাই এখন মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তের বসবাসের ট্রেন্ডি রেজিম। নতুন নতুন গেইটেড কমিউনিটি বানাতে গিয়ে প্রতিনিয়তই আমরা হারাচ্ছি কৃষিজমি, জলাশয়। প্রতিনিয়তই বস্তিবাসী উৎখাত করা হচ্ছে শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে। শহরের কোথাও কোনও বস্তিতে আগুন লাগলে তাই এখন ধরে নিই এগুলো রিয়েল এস্টেটের কারবার, দু’দিন পরেই সাইনবোর্ড ঝুলবে নতুন অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের নামে। ক’দিন আগে আমার পরিচিত একজন গৃহকর্মীর কাছে জানতে পারলাম, তিনি ও তার পরিবার নতুন বাসা খুঁজছে। কারণ, বস্তিতে আগুন লাগবে!

ঢাকা শহরে মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের জায়গা নেই (মানে জায়গা সব আলাদা, গরিবের এক ধনীর আরেক)। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের পুরুষরা হয়তো পাড়ার দোকানে, চায়ের দোকানে আড্ডা দেয়, সময় কাটায়। কিন্তু সেই জায়গাটা আবার সব লিঙ্গীয় পরিচয়ের মানুষের জন্য অবারিত নয়। ধনীর চা খাবার বিল খেটে খাওয়া মানুষের এক দু’দিনের আয়ের সমান। এরকম এক অসম সমাজে স্রেফ হাওয়া খাবার জন্যও এখন আর জায়গা নেই। সংসদ ভবনে একসময় নগরবাসীর প্রবেশাধিকার ছিল। অনেক দিন থেকেই জায়গাটার আর কোনও ব্যবহার নেই! কেন নেই?

সংসদ ভবন তো বটেই, আমার অনেক দিন থেকেই মনে হয়, এই শহরের দেয়ালগুলো তুলে দেওয়া হোক। বাসাবাড়ির সঙ্গে দেয়াল, সরকারি স্থাপনার দেয়াল, খুব জরুরি কি? যেখানে এই শহরের একটা বড় অংশের রাস্তায় ঠিকঠাক অ্যাম্বুলেন্স বা ফায়ার ব্রিগেড ঢুকতে পারে না? ইলেক্ট্রিসিটির পিলারগুলোকে এমনভাবে স্থাপন করা যায় যাতে রাস্তাটা আরেকটু প্রশস্ত হয়। এটুকু করলে ঢাকা শহরের অনেক এলাকায় জরুরি সেবাগুলো আপৎকালীন মুহূর্তে সহজেই এগিয়ে আসতে পারবে। এসব রাস্তা প্রশস্ত হলে বড় রাস্তাতেও চাপ কমবে, মানুষকে কম জ্যাম ঠেলতে হবে, সময় বাঁচবে।

খুব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ক্ষেত্রে সি থ্রু দেয়াল দেওয়া যেতে পারে। দেয়াল না থাকলেই চোখের আরাম! একটা স্কুলের মাঠে হয়তো একটা গরু চরছিল, চলার পথে হয়তো দেয়াল না থাকার কারণেই দৃশ্যটি আমার চোখে পড়লো। এই আমরা মানে শহরবাসী, হয়তো একই সুযোগ-সুবিধা ভোগ না করা শহরের অগুনতি মানুষ, কিন্তু সুন্দর একটা দৃশ্য দেখবার, প্রকৃতিকে উপভোগ করবার, জৈববৈচিত্র্যের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পাবার অধিকার নিশ্চয়ই সবারই আছে। এই শহরে দরকার হাঁটার নিরাপদ স্থান। যত্রতত্র দোকান ভাড়া দিয়ে টু পাইস কামিয়ে নিতে বেশ পটু শহরের জমির মালিকেরা। বরং সব এলাকায় একটা নির্দিষ্ট জায়গা করে দেওয়া হোক হকার ও ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য, যাতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সেখানে বসতে পারে এবং তাদের আর এদিক সেদিক ছুটোছুটি করতে না হয়। আমরা বরং সম্মান করতে শিখি খুদে ব্যবসায়ীকে। একটা কাজের পরিবেশ আছে, এমন একটা জায়গায় নিরাপদ থাকুক তারা।

৮০-এর দশকে এই শহরেই আমরা বড় হয়েছি পাড়ায় ক্রিকেট খেলে, যেমনটা এখনও আছে বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে। কিন্তু ৯০ পরবর্তী ‘ অ্যাপার্টমেন্ট কালচার’ (শুরুতে এভাবেই “অ্যাপার্টমেন্ট কালচার” শব্দটি ব্যবহৃত হতো। এখন কালচার শব্দটা আর আলাদা করে বলা হয় না)-এর হাত ধরে শহরের চেহারা বদলাতে শুরু করলো। আগে আমরা জানতাম পাশের বাড়িতে কে বা কারা থাকে। এখন সেই জানাশোনার কোনও বালাই নাই, সুযোগ নাই। ফলে এলাকার মানুষজনের চিন-পরিচয়ের জন্য বা কথাবার্তার জায়গা কমে গেলো। আমরা কি ধরেই নিলাম যে নগরের বিভিন্ন শ্রেণি, ধর্ম, এথনিক ও লিঙ্গীয় পরিচয়ের মানুষের আর দেখা সাক্ষাৎ চিন-পরিচয়ের দরকার নেই?

আমাদের জাতীয় রাজনীতি উগ্র ক্রোধকে পুষে রাখবার কাজে নিমজ্জিত, রাজনৈতিক ভেদ তৈরির কাজে সদাব্যস্ত। পরিস্থিতি দেখে মনে হয় আজকের শাসক গোষ্ঠী হয়তো ডিভাইড অ্যান্ড কুইটের ধারণায় আস্থাশীল, মানে ভাগ কর ও প্রস্থান কর! মালয়েশিয়া বা কানাডার বেগমপাড়া, এবং সেখানকার শহর ও “সুশাসনের” অংশীদার হবার আশায় তারা হয়তো সময় মতো প্রস্থান করবেনও। কিন্তু যারা এই দেশে, এই শহরে থাকতে চান, তাদের কী হবে?

নগর পরিকল্পনায় সমাজতাত্ত্বিক সাসকিয়া সাসেন ডাইভারসিটিকে গুরুত্ব দেবার কথা বলেছেন। জেইন জ্যাকব গ্রাসরুট মোকিং অব সিটিজের কথা বলেছেন। আরবান ডিজাইনার ইয়ান জ্যাল বলেছেন জনগণের জন্য শহরের কথা। সার্বিকভাবে সাধারণ জনগণকে কেন্দ্রে রেখে নগর পরিকল্পনার কথাই বলছেন সবাই। শহরের ওপর সাধারণের অধিকার আছে এই অ্যাকটিভিজমটা এখন সামনে চলে এসেছে। শিক্ষার্থীদের ২০১৮ ও ২০২১-এর নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং উই ওয়ান্ট জাস্টিস স্লোগান সে কথাই বলছে। দরকার এসব প্রশ্ন নিয়ে এলাকাভিত্তিক আলাপের পরিসর তৈরি করা, শহরের মানুষকে যুক্ত করবার কিছু পদ্ধতি ঠিক করা। ঠিক ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া পলিসি নয়। শহরবাসীর চিন্তার সমবায়ের মধ্য দিয়েই একটা সম্মতিতে পৌঁছতে হবে আমাদের।

লেখক: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
‘মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে থাকবে ইসলামী আন্দোলন’
‘মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে থাকবে ইসলামী আন্দোলন’
ভারতজুড়ে ত্রিফলা প্রচার, বিরোধীদের কোণঠাসা করতে গেরুয়া গেমপ্ল্যান
ভারতজুড়ে ত্রিফলা প্রচার, বিরোধীদের কোণঠাসা করতে গেরুয়া গেমপ্ল্যান
সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অবস্থা উদ্বেগজনক
সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অবস্থা উদ্বেগজনক
এসএসসিতে বাবা-ছেলে পেলেন জিপিএ-৫
এসএসসিতে বাবা-ছেলে পেলেন জিপিএ-৫
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ