X
বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২
১৪ আশ্বিন ১৪২৯

অর্থনৈতিক পর্যালোচনা ২০২১: উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের বছর

সুলতান মাহমুদ
১৮ জানুয়ারি ২০২২, ১৩:৪২আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২২, ১৩:৪২

সুলতান মাহমুদ বাংলাদেশ এখন আনন্দ ও গর্বের সঙ্গে বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত জাতি হিসেবে দেশটির যাত্রা শুরু হলেও আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতিতে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়েছে।

দেশটি ইতোমধ্যে (২০২১ সালের নভেম্বরে) জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)-এর কাছ থেকে চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছে এবং মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচকের সব নির্ণায়ক পূরণ করে ২০২৬ সালের মধ্যে সফলভাবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হবে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ (৬ষ্ঠ) এবং দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে দ্রুততম ক্রমবর্ধমান প্রধান অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ গত এক দশক ধরে গড়ে জিডিপির ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ভিত্তিতে বাংলাদেশ বিশ্বে ৩৭তম (নমিনাল) এবং ৩১তম (পিপিপি) স্থান অর্জন করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (২০২১) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জিডিপির পরিমাণ ৪১১ (নমিনাল) বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিগত অর্থবছরের তুলনায় ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ বেশি।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে পাট উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় হলেও রফতানিতে প্রথম, ধান ও আলু উৎপাদনে যথাক্রমে তৃতীয় ও ষষ্ঠ, সবজি ও মাছ উভয় উৎপাদনে তৃতীয়, কাঁঠাল উৎপাদনে দ্বিতীয়, আম ও পেয়ারা উভয় উৎপাদনে অষ্টম, ছাগল উৎপাদনে চতুর্থ, ছাগলের দুধ উৎপাদনে দ্বিতীয়, চা উৎপাদনে নবম, গবাদিপশু পালনে দ্বাদশ, মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে তৃতীয় এবং জলবায়ু সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনেও শীর্ষে। সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, বিশ্বের মোট উৎপাদিত ইলিশের ৮৬ ভাগই উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে।

২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বিগত অর্থবছরে ছিল ৫.২৪ শতাংশ, যদিও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ (বাংলাদেশের এই প্রবৃদ্ধির হার ছিল স্বাধীনতার পর সর্বোচ্চ)। ২০২০-২১ অর্থবছরটিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বিগত অর্থবছরের তুলনায় বেশি হওয়ায়, দেশের মানুষের মাথাপিছু আয়ের উন্নতি হয়েছে। গত অর্থবছরে (২০১৯-২০) মাথাপিছু আয় ছিল ২০৬৪ মার্কিন ডলার, যা ২০২০-২১ অর্থবছরটিতে মাথাপিছু আয় ২৫৫৪ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

পূর্ববর্তী বছরগুলোর মতো, প্রধানত সেবা, শিল্প ও কৃষি খাত মোট দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধি ও অগ্রগতিতে অবদান রেখেছে যথাক্রমে ৫১ দশমিক ৫৩ শতাংশ, ৩৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ এবং ১৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যা বিগত অর্থবছরে ছিল যথাক্রমে ৫১ দশমিক ৪৮ শতাংশ, ৩৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং ১৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

 অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে জিডিপির শতাংশ হিসেবে দেশে এখন মোট খরচ ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৭৪ দশমিক ৯ শতাংশ, মোট জাতীয় সঞ্চয়ের পরিমাণ ৩০ দশমিক ৩৯ শতাংশ, যা বিগত অর্থবছরে ছিল ৩০ দশমিক ১১ শতাংশ এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে, মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ২৯ দশমিক ৩২ শতাংশ (ব্যক্তি খাত ২১ দশমিক ২৩ শতাংশ + সরকারি খাত ৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ), যা ২০১৯-২০ অর্থবছরে ছিল ৩১ দশমিক ৭৫ শতাংশ (ব্যক্তি খাত ২৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ + সরকারি খাত ৮ দশমিক ১২ শতাংশ)।

বাংলাদেশ ব্যাংকের (জুলাই ২০২১) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরটিতে মোট বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিগত অর্থবছরের তুলনায় ৪ দশমিক ১৭ শতাংশ বেশি এবং বিশ্বের ০ দশমিক ২৯ শতাংশ, যেখানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা বিশ্বের ২ দশমিক ১১ শতাংশ। বিআইএসআর মনে করে, বাংলাদেশে আরও অধিক পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে, যদি ব্যবসায় এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।

২০২০-২১ অর্থবছরে, মোট রফতানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০ দশমিক ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিগত অর্থবছরের তুলনায় ১২ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেশি এবং মোট আমদানির পরিমাণ ৬১ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিগত অর্থবছরের তুলনায় ১০ দশমিক ০৯ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর লেবার ফোর্স সার্ভের (মার্চ, ২০১৭) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট ৬৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন (পুরুষ ৪৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন এবং মহিলা ২০ মিলিয়ন) শ্রমশক্তির মাঝে ২ দশমিক ৭ মিলিয়ন জনবল বেকার রয়েছে, যা মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (জুন ২০২১)-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বেকারত্বের হার প্রায় ৫ দশমিক ৩০ শতাংশ, যা ২০১৯-২০ অর্থবছরটিতে  ছিল ৪ দশমিক ২০ শতাংশ। যদিও স্বাধীনতার পর থেকে বেকারত্ব, বিশেষ করে যুব বেকারত্ব (৩৬.৬% বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকধারী বেকার) বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা, তথাপি অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বেকারত্ব কমানোর বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কোনও পরিকল্পনা নেই। বিআইএসআর-এর পরামর্শ হলো, বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করতে রূপকল্প ২০৪১ অর্জনে সৃজনশীল পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নযোগ্য কৌশলগুলো বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

বিআইডিএস-এর মতে, কোভিড-১৯ এর কারণে বিপুল সংখ্যক মানুষ (প্রায় ১.৬৪ কোর) নতুন দরিদ্র হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২০ সালের প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরটিতে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.০৬% যা ২০০০-০১ অর্থবছরে ছিল ৪৯.৯%। অর্থাৎ, কোভিড-১৯-এর পূর্বে, ২০০০- ০১ অর্থবছরটি থেকে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার প্রতি বছর গড়ে ১.৬২% হারে কমেছে। সামগ্রিকভাবে দারিদ্র্য বিমোচনে অগ্রগতি হলেও সারা বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশে ধনী শ্রেণির সংখ্যা দ্রুত বাড়ার ফলে আয়বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারি চলাকালীন ১৭ হাজারের ও বেশি নতুন কোটিপতি যোগ হওয়ায়, সামাজিক খাতে উন্নয়ন সত্ত্বেও, বাংলাদেশে আয়বৈষম্য প্রকট ।

প্যারিস স্কুল অফ ইকোনমিক্সের ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাব-এর  বিশ্ববৈষম্য রিপোর্ট ২০২২ অনুযায়ী, ৫০% দরিদ্র মানুষের আয় দেশের মোট আয়ের মাত্র ১৭.১%, প্রথম ১০% শীর্ষ ধনী ব্যক্তিরা দেশের মোট  আয়ের ৪২.৯% আয় করেন এবং  শীর্ষ ১% ধনী আয় করে দেশের মোট আয়ের ১৬.৩%। যদিও মোট জিডিপি এবং মোট জাতীয় আয় গত এক দশক থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে, তবুও দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এর সুবিধা সমানুপাতিক হারে ভোগ করতে পারেনি। ইউএনডিপির ২০২০ সালের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের গিনি সূচকের পয়েন্ট ০ দশমিক ৪৭৮। কোনও দেশের এই স্কোর ০ দশমিক ৫০-এর ঘর পেরোলেই উচ্চ বৈষম্যের দেশ হিসেবে ধরা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের (জুন ২০২১) তথ্য অনুযায়ী, সরকারের অতিরিক্ত কর আরোপের ফলে বিগত অর্থবছরের মতো ২০২০-২১ অর্থবছরটিতে সঞ্চয়পত্রের প্রতি জনগণের আগ্রহ কমেছে। ঋণের অতিরিক্ত বোঝা থেকে বাঁচতে এবং সঞ্চয়পত্রের ওপর চাপ কমাতে বাড়তি কর আরোপ করেছে সরকার।

২০২০-২১ অর্থবছরটিতে, গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ, যা বিগত অর্থবছরটিতে ছিল ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। যদিও অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণে আছে বলে মনে হচ্ছে, তথাপি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, বিশেষ করে ভোজ্য তেল, চাল, ডিজেল, পেঁয়াজ, আলু, ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম (পিপিই), এবং স্বাস্থ্যসেবা পণ্যের অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধি ছিল বহুল আলোচিত।

পোশাকশিল্পের পর পাট এবং চামড়া বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় শিল্পের মধ্যে অন্যতম। ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ ঘোষণা করার ফলে, শিল্পদ্বয়ের তেমন কোনও অগ্রগতি লক্ষ করা যায়নি, বরং প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিককে অবসরে পাঠানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে সরকার। এর মধ্য দিয়ে মূলত রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল যুগের অবসান ঘটল। পূর্ববর্তী বছরগুলোর মতো, পবিত্র ঈদুল আজহার আগে সরকার কর্তৃক কোরবানির পশুর চামড়ার দাম বেঁধে দেওয়া হলেও বেশিরভাগ চামড়া নামমাত্র দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে সাধারণ জনগণ।

বিশ্ব মন্দায় অর্থনীতি, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, আমদানি ও রফতানিতে স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের অভাব, এবং ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্যের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের জন্য এমন একটি বাজেট তৈরি করা ছিল অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। পূর্ববর্তী বছরগুলোর মতো, চলতি অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে বরাবরের মতো বাজেট ঘাটতি বিদ্যমান রয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে মোট বাজেটের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৬ লাখ ০৩ হাজার কোটি টাকা, যা বিগত অর্থবছরের (২০২০-২১) তুলনায় ৮ দশমিক ০৬ শতাংশ বেশি এবং মোট জিডিপির ১৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। উন্নয়ন বাজেট ২ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৩৯ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং ঘাটতি বাজেট ২ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৩৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ। বরাবরের ন্যায় এবার ও বাজেট প্রস্তুতির পদ্ধতিতে কোনও পরিবর্তন আনা হয়নি, যদিও দীর্ঘদিন ধরে বিআইএসআর চাহিদা ভিত্তিক বাজেট তৈরির বিষয়ে প্রস্তাব দিয়ে আসছে। চাহিদাভিত্তিক বাজেট তৈরি না হওয়ার ফলে অর্থ অপচয়ের বা অব্যবহৃত থাকার সুযোগ থেকে যাচ্ছে, যা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর সাধারণ মানুষ তা নিয়ে মাঝেমধ্যে আলোচনা করলেও এটা শুধু আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এবং ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার জন্য অর্থ পাচার (প্রকৃত অর্থে বৈদেশিক মুদ্রাপাচার) এবং খেলাপি ঋণ ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে পর্যন্ত মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লক্ষ, ১৬৮ কোটি টাকা, যা ২০২০ সাল থেকে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই ২০২১) বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিগত ৬ বছরে  বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৪৯ দশমিক ৬৫  বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে বিদেশে পাঠানো হয়েছে, বিশেষ করে ২০১৫ সালে ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা পাচার হয়েছে। প্রতি বছর বাংলাদেশের মোট রফতানির প্রায় ১৮% কোনও না কোনোভাবে পাচার হয়ে যাচ্ছে, যা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসছে।

বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয় ২০২১-এর মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি সাহায্যের (যেমন অনুদান এবং ঋণ) ওপর বাংলাদেশের নির্ভরশীলতা কমেছে। দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ায় বিদেশি সহায়তায় অনুদানের পরিমাণ কমে ৫ দশমিক ৯৮ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ১৯৭১-৭২ অর্থবছরটিতে ছিল সর্বোচ্চ প্রায় ৮৪ থেকে ৮৬ শতাংশ ।

রেমিট্যান্সকে বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের অন্যতম মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের (জুন, ২০২১) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরটিতে মোট রেমিট্যান্স প্রবাহের পরিমাণ ২৪ দশমিক ৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা এ যাবত সর্বোচ্চ এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৩৬ দশমিক ২২ শতাংশ বেশি।

বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে ২৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০২০-২১ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ ৪৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিগত অর্থবছরটিতে ছিল ৩৬ দশমিক ০৩ বিলিয়ন  মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ এখন দশ  মাস পণ্য আমদানি করার সক্ষমতা অর্জন করেছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় (সর্বনিম্ন তিন মাসের আমদানির সক্ষমতা) তিনগুণেরও বেশি। বিএমইটির (নভেম্বর, ২০২১ পর্যন্ত) তথ্য অনুসারে, মোট ৪৮৫৮৩৯ জন শ্রমিক (নারী শ্রমিকের সংখ্যা ৬৮,৫৭৯) বাংলাদেশ থেকে বিদেশে গিয়েছে কর্মসংস্থানের জন্য, যা বিগত অর্থবছরটিতে ছিল ২১৭৬৬৯ (নারী শ্রমিকের সংখ্যা ২১,৯৩৪)।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি বা ইউএনডিপির ২০২০ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানব সম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮৫টি দেশের মধ্যে দুই ধাপ এগিয়ে ১৩৩তম। বিগত বছরের মতো দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে শীর্ষে আছে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। অগ্রগতি সত্ত্বেও সার্বিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থানের কোনও পরিবর্তন হয়নি।

বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৯-২০ অর্থবছরটিতে দেশে ই-কমার্স ব্যবসা-বাণিজ্যের বাজার ছিল ১৬৬ দশমিক ১৬ বিলিয়ন টাকারও বেশি, যা ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ছিল মাত্র ৫ দশমিক ৭০ বিলিয়ন টাকা। গত পাঁচ বছরে দেশের ই-কমার্স ব্যবসার প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৩০ গুণ। ই-কমার্স ব্যবসা এবং অনলাইন কেনাকাটা দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল কিন্তু ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, ধামাকা এবং রিং-আইডিসহ বেশ কিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগে সারা বছর ধরে ব্যাপকভাবে আলোচনার বিষয় বস্তুতে পরিণত হওয়ার ফলে এখন অনলাইন কেনাকাটার প্রতি মানুষের বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে।

উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে অনেক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী ডিজিটালাইজেশন এবং প্রযুক্তিগত বিকাশের জন্য বাংলাদেশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলস্বরূপ দেশটি ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের আইসিটি পণ্য রফতানি করেছে এবং ২০২৫ সাল নাগাদ ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা করেছে।

ডিজিটাল আউটসোর্সিংয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অন্যতম পথিকৃৎ এবং বিশ্বে দ্বিতীয়। এই সম্ভাবনাময় প্রযুক্তিনির্ভর আউটসোর্সিং খাতে, বাংলাদেশে বর্তমানে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে নিয়মিত কাজ করছে প্রায় অর্ধ মিলিয়নেরও বেশি যুবক। আঙ্কটাডের ডিজিটাল অর্থনীতি রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে আউটসোর্সিংয়ে প্রতি বছর বাংলাদেশ প্রায় ১০ কোটি মার্কিন ডলার আয় করছে।

কোভিড-১৯ মহামারি, ৩১টি জেলায় বন্যা, ইয়াসসহ ১৫টি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় এবং নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অগ্রগতির গতি শুধু ইতিবাচকই নয়, বরং উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির হারও বজায় রেখেছে।

লেখক: গবেষক, অর্থনৈতিক বিভাগ, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল রিসার্চ ট্রাস্ট।

Email: [email protected]

 
 
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পুরোনো মেশিনকে নতুন দেখিয়ে কিনেছে তাঁত বোর্ড!
তাঁত বোর্ডে দুর্নীতিপুরোনো মেশিনকে নতুন দেখিয়ে কিনেছে তাঁত বোর্ড!
শেখ হাসিনার জন্মদিন, জাতির উৎসবের দিন : ডেপুটি স্পিকার
শেখ হাসিনার জন্মদিন, জাতির উৎসবের দিন : ডেপুটি স্পিকার
অনার্স ভর্তির শেষ রিলিজ স্লিপের মেধা তালিকা প্রকাশ ২ অক্টোবর
অনার্স ভর্তির শেষ রিলিজ স্লিপের মেধা তালিকা প্রকাশ ২ অক্টোবর
রমেকে ১৬ কর্মচারীর বদলিতেও থেমে নেই ‘সিন্ডিকেট চক্র’
রমেকে ১৬ কর্মচারীর বদলিতেও থেমে নেই ‘সিন্ডিকেট চক্র’
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ