X
রবিবার, ০৩ জুলাই ২০২২
১৯ আষাঢ় ১৪২৯

আমির হামজার স্বাধীনতা পুরস্কার কিংবা আমলাদের বার্তা

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২২, ১৭:২২

ডা. জাহেদ উর রহমান ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার আগ্রাসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের বাজারে আগুন লেগে যাওয়ার মতো সব গরম খবরের মধ্যে আমির হামজা এক বিরাট খবর হয়ে উঠেছেন। যদিও জানি না মৃত এই মানুষটি জীবিত থাকলে এভাবে তার খবর হওয়াটাকে কেমনভাবে নিতেন।

অনুমান করি আমার এই কলামের পাঠকরা আমির হামজা সম্পর্কে জানেন। তারপরও কেউ যদি না জেনে থাকেন তাই দুটো কথা বলে রাখি। এই বছরে সাহিত্যে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান, স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন জনাব হামজা। একজন পালাগান গায়ক ছিলেন তিনি। তার বই মূলত একটি– ‘বাঘের থাবা’। পরে এই বইয়ের গানের অংশ নিয়ে ‘পৃথিবীর মানচিত্রে একটি মুজিব তুমি’ এবং ‘একুশের পাঁচালি’ নামে দুটি বই প্রকাশিত হয়।

সাহিত্য, বিশেষ করে সমকালীন বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে আমার পড়াশোনা জানাশোনা একেবারে তলানিতে। তাই জনাব হামজার নাম কিংবা তার লেখার সঙ্গে আমার পরিচয় না থাকাকে আমি আমার ব্যর্থতা হিসেবেই ধরে নিয়েছিলাম। কিন্তু পরে মূলধারার মিডিয়া এবং ফেসবুক দেখে বুঝলাম, সমকালীন বাংলা সাহিত্যের একেবারে খুঁটিনাটির খোঁজ-খবর রাখেন তারাও তাকে চেনেন না, তার সম্পর্কে জানেন না।

একেবারে অপরিচিত একজন মানুষের সাহিত্যে স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়া স্বাভাবিকভাবেই তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বলা বাহুল্য, হাতে গোনা দুই একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে সবাই এই পুরস্কারটির প্রচণ্ড সমালোচনা করছেন। অন্য সব সময় সরকারের সব বিতর্কিত পদক্ষেপকে যৌক্তিকতা দিতে চেষ্টা করা মানুষদের অনেকে এই ক্ষেত্রে আবার সরকারকে ডিফেন্ড না করে তীব্র সমালোচনা করছেন। এই সমালোচকের তালিকায় সাধারণ নেটিজেন থেকে শুরু করে আছেন সাহিত্য-সংস্কৃতির সুশীল মানুষও। এদের মধ্যে অনেকেই আবার সরকারের আনুকূল্যপ্রাপ্ত হয়ে নানা রকম রাষ্ট্রীয় পদে নিযুক্ত ছিলেন বা আছেন।

প্রাথমিক আলোচনা-সমালোচনার জের শেষ হতে না হতেই সামনে এসেছে আরও বিতর্কিত বিষয়। জনাব আমির হামজা হত্যা মামলায় অপরাধী প্রমাণিত হয়ে রীতিমতো জেল খেটেছিলেন। পরে সরকারের সাধারণ ক্ষমায় বেরিয়ে আসেন তিনি। খুনের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত কেউ খুব বড় সাহিত্যিক হতে পারবেন না এমন নয় অবশ্য। আর তেমন কোনও মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া যাবে না, এমন নিয়ম আছে কিনা সেটাও জানি না।

শিল্প ও সাহিত্যের মান নির্ণয় নিয়ে সারা পৃথিবীতে একটা বিতর্ক আছে। যে মানদণ্ডগুলোর ভিত্তিতে কোনও শিল্প বা সাহিত্যকে উঁচু-নিচু মানের বলে আমরা গ্রহণ কিংবা বর্জন করি, সেই মানদণ্ডগুলোকেই চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে। তাই এটা নিশ্চিত হয় শিল্প-সাহিত্যের মান পরিমাপের জন্য কোনও অবজেক্টিভ মানদণ্ড নেই, যা আছে সেটা নেহায়েতই সাবজেক্টিভ। কিন্তু এই আলোচনায় আমরা মান নির্ণয়ের মানদণ্ড সম্পর্কিত বিতর্কটা সরিয়ে আলাপটা করছি। সরকার যেহেতু কোনও মানুষকে সাহিত্য ক্যাটাগরিতে পুরস্কার দেয় তখন আমরা সেটুকু বুঝবো সরকারের একটা মানদণ্ড আছে, আর সরকার তার মানদণ্ডে পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তির সাহিত্যকর্ম অন্য অনেকের চাইতে অনেক উঁচু মানের বলে বিশ্বাস করেন।

স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়ার বিষয়টি একেবারে যে আমলানির্ভর সেটা এখন আমাদের সামনে এসেছে। আমরা জানতে পেরেছি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে পরবর্তী বছরের স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য প্রস্তাব আহ্বান করে সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং এর আগে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার বা স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্তদের কাছে পত্র পাঠায়। নির্ধারিত যেকোনও ক্ষেত্রে পুরস্কারের জন্য প্রস্তাব করা যাবে। প্রস্তাবগুলো নভেম্বর মাসের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পৌঁছানোর কথা।

এরপর প্রস্তাবগুলো ‘প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটি’র মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করা হয়। ১৬ সদস্যের প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির চেয়ারম্যান হলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। যেখানে বিভিন্ন সচিব সদস্য হিসেবে থাকেন। প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটিতে যাচাই-বাছাই করার পর প্রস্তাবগুলো ‘জাতীয় পুরস্কার সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’র মাধ্যমে প্রক্রিয়া করে প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনা ও সিদ্ধান্তের জন্য উপস্থাপন করা হয়। জাতীয় পুরস্কার সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বর্তমান আহ্বায়ক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। এখানে আছেন আরও ১১ জন মন্ত্রী।

পুরো প্রক্রিয়াটি জানার পর এটা নিশ্চিত হওয়া গেলো, পুরস্কারের জন্য মূল যাচাই-বাছাইটি করেন দেশের সর্বোচ্চ আমলা মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে অন্তত ১৬ জন সচিব। এখানে মন্ত্রিসভা কমিটির দায়িত্ব তেমন কিছু না, মূল কাজটি করেন সচিবরা। অর্থাৎ জনাব আমির হামজার নাম চূড়ান্তভাবে প্রস্তাবিত হয়েছে ১৬ জন সচিবের বিচার-বিবেচনার পর। এই পুরস্কারের সূত্র ধরে এখন আলোচনায় আসছে কেন সাহিত্যসহ প্রতিটি পুরস্কারে স্ব-স্ব ক্ষেত্রের যোগ্যদের সমন্বয় কমিটি তৈরি করে নাম প্রস্তাবিত হয় না।

বিশেষজ্ঞ কমিটি থাকার প্রয়োজনের কথা স্বীকার করার পরও আমি বলতে চাই, সচিবরাও যদি নাম প্রস্তাব করে তার জন্য জনাব আমির হামজার নাম প্রস্তাব করতে হবে? হামজা সাহিত্যে কী কী অবদান রেখেছেন এবং সেটা স্বাধীনতা পুরস্কারের মতো সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পাওয়ার জন্য যোগ্য হতে পারে কিনা সেটুকু বোঝার জন্য স্রেফ কাণ্ডজ্ঞান লাগে, আর সেটুকু কাণ্ডজ্ঞান অন্তত সচিবদের থাকার কথা। আমি বিশ্বাস করি সেই কাণ্ডজ্ঞান থাকার পরও তারা কাজটি ইচ্ছে করেই করেছেন এবং কেন করেছেন সেই প্রসঙ্গে আসছি পরে।

সচিব কমিটিতে আলোচনার আগে সেই কমিটিতে জনাব হামজার নাম প্রস্তাব করেছিলেন সরকারের একজন অতি বড় আমলা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব। জনাব হামজার নাম প্রস্তাব করা প্রসঙ্গে একটি দৈনিক পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘আমির হামজার নাম আমি প্রস্তাব করেছিলাম। তিনি একজন প্রথম সারির মুক্তিযোদ্ধা, পালাগান করতেন এবং পরবর্তী সময়ে সাহিত্য রচনাও করেছেন’। তিনি আরও বলেছিলেন হামজা সম্পর্কে তার সন্তানের কাছ থেকে তিনি ধারণা পেয়েছেন, যেহেতু জনাব হামজার সন্তান একজন উপ-সচিব।

প্রশ্ন হচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কি জনাব হামজার সাহিত্য পড়ে দেখেছিলেন তার নাম প্রস্তাব করার আগে? তিনি না পড়ে দেখা এক অপরাধ, কারণ না পড়ে তিনি কাউকে সর্বোচ্চ জাতীয় পুরস্কারের জন্য প্রস্তাব করছেন। আবার যদি পড়ে করে থাকেন সেটাও খুব গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে, জনাব হামজার সাহিত্য পড়ে তার মনে হয়েছিল যে এটি সাহিত্যে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পুরস্কার পেতে পারে। কিংবা সেটা মনে না হলেও তিনি এটা করেছেন, তার মানে তার বিশেষ কোনও উদ্দেশ্য আছে।

আমাদের মনোযোগ দেওয়া উচিত জনাব হামজার উপ-সচিব সন্তানের কাণ্ডকারখানায়ও। ২০১৮ সালে প্রথম বই বের করা হয়েছে, পরে একই বই থেকে কিছু কিছু অংশ নিয়ে আরও দুটো বই বানিয়ে বইয়ের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। এসব তড়িঘড়ি কাণ্ড দেখে মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে, বাবাকে স্বাধীনতা পুরস্কার পাইয়ে দেওয়ার জন্য ‘যোগ্য করে তুলতে’ এসব করেছেন তিনি। বাবার প্রতি সন্তানের গভীর ভালোবাসা হিসেবে এটাকে কেউ দেখতে পারেন কিন্তু আমি দেখি না। এই দেশের জনগণের করের টাকায় বেতনভুক্ত একজন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী যাচ্ছেতাই করতে পারেন না, এমনকি তার বাবার প্রতি অন্ধ শ্রদ্ধা থাকলেও।

রাষ্ট্রকে নিয়ে তাচ্ছিল্য করা এবারকার অপরাধটি কতটা গুরুতর সেটা আমরা বুঝতে পারবো যদি ২০২০ সালের ঘটনাটি এবারের ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে নিই। সেই বছর এস এম রইজ উদ্দিন নামে একজন সদ্য অবসরে যাওয়া সরকারি কর্মকর্তার সাহিত্যে স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়া নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। চরম সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত সেই পদক প্রত্যাহার করা হয়েছিল। পদক দিয়ে আবার সেটা প্রত্যাহার করা, এটাও এক ভয়ংকর হাস্যকর ঘটনা।

কলামটি লেখা শেষ হওয়ার মুহূর্তে জানতে পারলাম আমির হামজার স্বাধীনতা পুরস্কারটি বাতিল হয়েছে। দুই বছর আগে ঘটা হাস্যকর ঘটনাটি আবারও ঘটানো হলো। কিন্তু তবুও প্রশ্ন হচ্ছে মাত্র দুই বছর আগে যেনতেনভাবে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার দেওয়া নিয়ে তীব্র সমালোচনার পর দুই বছরের মাথায় আবার একই কাণ্ড ঘটালেন আমলারা। তার মানে আমরা নিশ্চিতভাবেই এটা বুঝতে পারি দুই বছর আগের ঘটনাটির জন্য তারা ন্যূনতম অনুতপ্ত নন। বরং তারা দ্রুতই একই কাণ্ড ঘটিয়ে বার্তা দিলেন।

এই দেশে অনেক আমলা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন না। আছে তাদের অনেকের বিরুদ্ধে অদক্ষতা এবং দুর্নীতির জোরালো অভিযোগ। শুধু সেটাই না, বেশ কিছু দিন থেকে তারা তাদের সাংবিধানিক এবং আইনি চৌহদ্দির বাইরে গিয়ে অনেক বেশি কিছু করছেন। এসব কথা এখন আর সাধারণ মানুষ বিরোধী রাজনৈতিক দলের মুখেই সীমাবদ্ধ নেই, এসব কথা এখন বলেন ক্ষমতাসীন দলের বড় বড় নেতারাও।

আমি বিশ্বাস করি জনাব আমির হামজাকে পুরস্কার দেওয়াটা একেবারে পরিকল্পিতভাবে হয়েছে। আমলারা দেখাতে চেয়েছেন, তারা করতে পারেন যা খুশি তা। দেশের ক্ষমতা এখনই প্রধানত তাদের হাতে কুক্ষিগত এবং সামনের বাংলাদেশে তারা হয়ে উঠবেন আরও অনেক বেশি অপ্রতিরোধ্য। জনাব হামজাকে পুরস্কার প্রদান করার মাধ্যমে আমলাদের দেওয়া এই বার্তা আমি ভালোভাবে পেয়েছি, বুঝতে পেরেছি। আপনারা?

লেখক: শিক্ষক ও অ্যাকটিভিস্ট

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
যুদ্ধের প্রভাবে আবারও লোডশেডিংয়ের কবলে দেশ
যুদ্ধের প্রভাবে আবারও লোডশেডিংয়ের কবলে দেশ
বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ কে?
বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ কে?
মাদ্রাসাছাত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ
মাদ্রাসাছাত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ
শিক্ষা আইন প্রণয়ন কমিটিতে যুক্ত হতে চায় হেফাজত
শিক্ষা আইন প্রণয়ন কমিটিতে যুক্ত হতে চায় হেফাজত
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ