X
বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২২
২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

পঙ্কজ নাথ বলতে পারবেন অঙ্কে কোথায় ভুল করেছিলেন

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৮:২৮আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৮:২৮

দল ক্ষমতায় থাকলে ভেতরে কোন্দল বাড়ে। বেশি দিন থাকলে আরও বেশি বাড়ে। তাই বর্তমান আওয়ামী লীগে দলীয় কোন্দল নিতান্তই চেনা ঘটনা। দলের ভেতরেই তা নিয়ে ভূরি ভূরি অভিযোগ উঠতে দেখা গেছে। খোদ দলের সাধারণ সম্পাদকের জেলায়ও দলীয় কোন্দলের সহিংস প্রকাশ দেখা গেছে এবং তার রেশ এখনও আছে।

কিন্তু হঠাৎ আওয়ামী লীগের সব পদ থেকে বরিশাল-৪ আসনের সংসদ সদস্য পঙ্কজ নাথকে অব্যাহতি এবং তাকে কারণ দর্শানোরও নোটিশ দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে দুয়ারে নির্বাচন বলেই কী এমনটা হচ্ছে? বিষয়টিকে এতটা সাধারণীকরণ করা না হলেও বলা যায় নির্বাচনি এলাকার রাজনীতিতে নিজস্ব ক্ষমতা কাঠামো তৈরি করায় জেলা আওয়ামী লীগের আরেকটি শক্ত নেতৃত্বের সঙ্গে বিরোধের কারণে তাকে এই পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে।

অনেকে প্রশ্ন করছেন, দল থেকে চূড়ান্তভাবে বাদ পড়লে পঙ্কজ নাথের সংসদ সদস্য পদ কী থাকবে? অতীতের অনেক ঘটনা থেকে এটা বলা যায়, আগামী সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত তিনি সংসদে থাকছেন। কারণ, তার সংসদ সদস্য পদ থাকবে কিনা, এটা নির্ধারণে তার দল, জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং নির্বাচন কমিশনের অনেক জটিল অঙ্ক কাজ করে। আইনি প্রক্রিয়ায় তার সংসদ সদস্য পদ কেড়ে নেওয়া সময়সাপেক্ষ ব্যাপারও।

কী অভিযোগ পঙ্কজ নাথের বিরুদ্ধে? বলতে গেলে অন্তহীন অভিযোগই উঠে এসেছে। পত্রপত্রিকার রিপোর্টে বলা হচ্ছে, সেই প্রথমবার নির্বাচিত হওয়ার পরপরই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে স্বেচ্ছাসেবক লীগ পুনর্গঠনের নামে নির্বাচনি এলাকায় একক নিজস্ব বলয় তৈরি করার। আর এ নিয়েই তার সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হয় জেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সব পর্যায়ে জেলা আওয়ামী লীগের দেওয়া প্রার্থীদের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রার্থী দেওয়ার অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে। যে কারণে দুটি উপজেলাসহ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনগুলোতে গণহারে পরাজিত হয় নৌকা। বিজয়ী হয় পঙ্কজ অনুসারীরা। এসব নিয়ে দফায় দফায় সংঘর্ষ এবং হামলার ঘটনায় বিভিন্ন সময়ে হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জে নিহত হয় আওয়ামী লীগের অন্তত ১১ নেতাকর্মী। আহতের সংখ্যাও কয়েকশ’। পঙ্কজ নিজে অবশ্য জেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে দলীয় পদ-পদবি নিয়ে বাণিজ্য, বিরোধ জিইয়ে রেখে ফায়দা নেওয়া এবং হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জকে উন্নয়ন বঞ্চিত করে রাখার অভিযোগ করে আসছিলেন।

এই অভিযোগ বা পাল্টা অভিযোগ শুধু পঙ্কজের এলাকায় নয়, সারা দেশেই। প্রতিটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শাসক দলের এই গৃহবিবাদের চিত্র পাওয়া গেছে এবং সেটা খুবই সহিংস। নিজেরাই নিজেদের খুন করছে, বহিষ্কার করছে এবং অভিযোগের পাহাড় তৈরি করছে। পঙ্কজ দেবনাথের বিরুদ্ধে বাসে আগুন দিয়ে মানুষ পোড়ানোর অভিযোগটার রাজনৈতিক গুরুত্ব কি সেটা ভবিষ্যতে বোঝা যাবে।

এর আগে এমন অবস্থা দেখেছি আমরা নোয়াখালীতে। গত জানুয়ারিতে আমরা দেখলাম নোয়াখালী-৪ (সদর-সুবর্ণচর) আসনের সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরীকে জেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য পদ থেকে অব্যাহতি ও একইসাথে তাকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের জন্য প্রধানমন্ত্রী বরাবর লিখিত পত্র পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল জেলা আওয়ামী লীগ। আরও অনেক জেলায়, সংসদীয় এলাকায় হয়তো এমন চিত্র পাওয়া যাবে একটু খোঁজাখুঁজি করলে। নির্বাচন যতই কাছে আসছে, দলের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলো একটি বস্তুর মহিমা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে আর তা হলো অঙ্ক। এক দলে বহু পক্ষ এবং  সব পক্ষই প্রাণপণ ক্রমাগত অঙ্ক কষছে কে কাকে কত বুদ্ধি করে অঙ্কের হিসাব কাজে লাগিয়ে হারিয়ে দিতে পারবে। এ এমন এক পরীক্ষা যেখানে অঙ্কের মাহাত্ম্যেই জয়, অঙ্কের আঘাতেই পরাজয়। পঙ্কজ নাথ নিজে বলতে পারবেন অঙ্কে কোথায় তিনি ভুল করেছিলেন বা করেছেন।

বিএনপি যদি নির্বাচনে আসে তবে এক প্রকার অঙ্ক হবে, না এলে আরেক রকম। তবে নিজ দলের অঙ্ক প্রায় সবার জন্যই জটিল। বিরোধী দলের সাথে অক্ষ হারলে জীবন থাকে, কিছুটা হলেও মর্যাদা থাকে। নিজ দলের প্রতিপক্ষের সাথে অঙ্কে হারলে উদভ্রান্ত হয়ে যেতে হয়। বিরোধী দলের সাথে নিজের ব্যক্তিগত ক্যারিশমার ওপর ভর করতে হয়, নিজ দলের সাথে কোন্দল ও সহিংসতা তৈরির দক্ষতা প্রদর্শন করতে হয়।

‘কোন্দল-কাঁটা’য় বিদ্ধ হয়ে আওয়ামী লীগ কোন অবস্থায় আছে সেটা দলই বিবেচনা করবে। আমরা শুধু এটুকু বুঝি সাধারণ মানুষ তিক্ত বিরক্ত, বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এগুলো আর নিতে পারছে না, তবু নিতে হচ্ছে। আরেকটি বড় সমস্যা এসব বিবাদে দুর্বল হয়ে পড়ে সংগঠন। তবে দল নেতৃত্ব এসব তত্ত্বে আমল দিতে চায় কিনা সেটা বড় প্রশ্ন দলের কাছেই।

ব্যক্তি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত কারিশমা প্রবলভাবে সমাজে অনুভূত। এলাকায় এলাকায় কান পাতলে শোনা যায় দলীয় ‘কোন্দল’। এই ‘বিবাদ’ অবশ্যই দলের ত্যাগী কর্মীদের মনোবলে চিড় ধরিয়েছে। কিন্তু ভোটে এর প্রভাব পড়বে কিনা সেটা ভোটের প্রকৃতির ওপরই নির্ভর করছে। ‘‘সবাই এক হয়ে দলের প্রার্থীর জন্য কাজ করছি’’ – এমন সত্য আসছে নির্বাচনে সব স্তরে উচ্চারিত হবে কিনা সেটা দলই বলতে পারবে।

লেখক: সাংবাদিক 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
৮ ডিসেম্বর যেভাবে হানাদার মুক্ত হয় কুমিল্লা
৮ ডিসেম্বর যেভাবে হানাদার মুক্ত হয় কুমিল্লা
ইকুরিয়ার নিয়ে এলো ‘ইন্সটা পে’
ইকুরিয়ার নিয়ে এলো ‘ইন্সটা পে’
দুই নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের আদেশ না মানায় ডিসি-ইউএনওকে তলব
দুই নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের আদেশ না মানায় ডিসি-ইউএনওকে তলব
ব্যক্তিগত তথ্যকেন্দ্রিক বিজ্ঞাপন দেখানো নিষিদ্ধ হচ্ছে ফেসবুকে
ব্যক্তিগত তথ্যকেন্দ্রিক বিজ্ঞাপন দেখানো নিষিদ্ধ হচ্ছে ফেসবুকে
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ