X
বুধবার, ২৪ জুলাই ২০২৪
৯ শ্রাবণ ১৪৩১

বিমানবন্দরে ‘লাগেজ কাটা’:  নতুন করে পুরনো কথা

সালেক উদ্দিন
২৪ ডিসেম্বর ২০২২, ১৭:২৭আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২২, ১৭:২৭

ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের লাগেজ চুরি, লাগেজ কেটে মূল্যবান সামগ্রী হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা বহুবার গণমাধ্যমে দেখেছি।

গত নভেম্বর মাসে আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেশের বিশিষ্ট গার্মেন্টস ব্যবসায়ী স্বপরিবারে ঢাকা থেকে বিমানে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর  যান। ব্যবসায়িক কারণে ভদ্রলোক ইদানিং কুয়ালালামপুরেই বেশি থাকেন। ঢাকা থেকে যাওয়ার পথে তিনি তার লাগেজের ভেতরে দশ হাজার ডলার নিয়ে যাচ্ছিলেন। কুয়ালালামপুরে বাসায় এসে দেখেন তার সুটকেস কাটা এবং সুটকেস থেকে শুধু ওই দশ হাজার ডলারই হাতিয়ে নিয়েছে কে বা কারা!  ঘটনাটি আমাদের জানানোর সময় তিনি বললেন– স্ক্যানের সময় স্যুটকেসের ভেতরে ডলারের বিষয়টি নিশ্চয়ই দায়িত্বরত কর্মীর নজরে পড়েছিল। তারা কিন্তু তখন একটি কথাও বলেননি। বললে উত্তর রেডি ছিল তার। বিদেশ ভ্রমণের সময় সরকারি নিয়ম অনুযায়ী একজন যাত্রী ১০ হাজার ডলার পর্যন্ত দেশের বাইরে নিয়ে যেতে পারেন বা দেশে নিয়ে আসতে পারেন। সেই হিসেবে তার নেওয়া এই ডলার আইনসিদ্ধ। তবে অসুস্থতার কারণে তিনি ডলার সঙ্গে না রেখে লেগেজে রেখেছিলেন।

তার চারটি লাগেজের মধ্যে শুধুমাত্র একটি কাটা হলো এবং ডলারের প্যাকেটটি উধাও হয়ে গেলো। এই ঘটনা থেকে তিনি যে ধারণা পোষণ করছেন তা হলো, এ ধরনের অপরাধের জন্য বিমানবন্দরে একটি চক্র আছে যা স্ক্যান থেকে শুরু করে বিমানে মাল ওঠানো পর্যন্ত কর্মীরা জড়িত। বন্ধুটিকে সান্ত্বনা দিলাম এবং ডলারের প্যাকেটটি সাথে রাখা উত্তম ছিল বলে জানালাম। ঘটনাটি এখানেই শেষ।

এবার আমাদের কথায় আসি। ১০ ডিসেম্বর আমার মেয়ে পড়াশোনার জন্যে কানাডার উদ্দেশ্যে কাতার এয়ারলাইন্সে ঢাকা বিমানবন্দর ত্যাগ করলো। তার দুটি লাগেজের মধ্যে একটির পেট বেশ ফুলা ছিল বলেই হবে হয়তো বিমানবন্দর থেকে ভালোভাবে র‌্যাপিং করে বিমানে উঠিয়ে দিলাম। এক ঘণ্টার ব্যবধানে আমিও স্বপরিবারে কুয়ালালামপুরে আসলাম বাংলাদেশ বিমানে। আমাদের লাগেজ ছিল দুটি। কুয়ালালামপুর বিমানবন্দর থেকে লাগেজ সংগ্রহকালে দেখলাম লাগেজ দুটোই কাটা এবং এমন জায়গায় কাটা যা সহজে চোখে পড়ে না। লাগেজ দুটি একেবারে নতুন কিনেছিলাম বলে বেশ কষ্ট পেলাম।

আমাদের লাগেজে শুধু কাপড়ই ছিল; বন্ধুর মতো ডলার ছিল না। হোটেলে উঠে দেখলাম লেগেজ কাটা হয়েছে ঠিকই তবে কিছুই খোয়া যায়নি। ১২ ডিসেম্বর মেয়ে পৌঁছালো টরেন্টোতে। মধ্যরাতে ফোন করে জানালো তার ওই ‘পেট ফোলা লাগেজ’ যেটি মজবুত করে র‌্যাপিং করে দিয়েছিলাম সেটাও কে বা কারা কেটেছে।

তাৎক্ষণিকভাবে মনে হলো হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরের কর্মীদের সেবার মান যাই হোক তারা লাগেজ কর্তন কর্মে পারদর্শি। ভয়ও পেলাম এই ভেবে যে, আগামী সপ্তাহেই তো মালয়েশিয়া থেকে আমরা আবার দেশে ফিরবো তখন কি আবারও এভাবে লাগেজ কাটবে? 

ঘটনাগুলো এ কারণেই উল্লেখ করলাম যে, লাগেজ কাটার এইসব ঘটনা ভিন্ন ভিন্ন দেশের   বিমানবন্দরে ধরা পড়লেও লাগেজগুলোর যাত্রাস্থল ছিল ঢাকা বিমানবন্দর। ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ চুরি, লাগেজ কেটে  মূল্যবান সামগ্রী চুরি অনেক পুরনো ঘটনা। অভিযোগের পরিমাণ খুব বেশি হলে, পত্রপত্রিকায় লেখালেখি শুরু হলে মাঝে মাঝে বন্ধ হয়। আবার শুরু হয়।

এ বিষয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত অতি সম্প্রতিকালের কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাফ জয়ী ফুটবল দলের সদস্যদের কয়েকজনের টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী এবং লাগেজ ভাঙার অভিযোগ ওঠে। ১০ আগস্ট বিমানবন্দরে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং বিমানবন্দরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে গণশুনানি কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে যাত্রীরা লাগেজ কেটে মূল্যবান মালামাল চুরি ও লাগেজ চুরির অভিযোগ করেন। ৮ জুলাই প্রবাসী শ্রমিক এস এম ইসহাক তার তিনটি লাগেজের মধ্যে একটি কাটা দেখতে পান এবং এর ভেতরে থাকা অনেক মূল্যবান জিনিস তিনি আর পাননি বলে জানান। ১৮ জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ঢাকা ফেরার সময় বিমানবন্দরে কুমিল্লার ওয়ালীউল্লাহর লাগেজ লাপাত্তা হয়ে যায়। 

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখে একটি জাতীয় দৈনিকের অনলাইন সংস্করণে হজরত  শাহজালাল বিমানবন্দরে লাগেজ কাটা ও লাগেজ গায়েবের বিষয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাপা হয়। এতে বিমানবন্দরের সূত্রের বরাত দিয়ে লেখা হয় যে বিমান থেকে লাগেজ বেল্টে দেওয়ার আগ মুহূর্তে লাগেজ কেটে মূল্যবান মালপত্র সরিয়ে ফেলা হয়। কখনও কখনও যাত্রীদের জানানো হয় লাগেজ আসেনি পরবর্তী ফ্লাইটে আসবে।

কোনও কোনও ক্ষেত্রে  লাগেজ আর প্রকৃত মালিকের কাছে পৌঁছানো হয় না। দামি জিনিসপত্র হাতিয়ে নিয়ে বলা হয় ওই লাগেজে অবৈধ মালামাল এসেছে। গোয়েন্দারা লাগেজের মালিককে খুঁজছে।

প্রতিবেদনে আরও এসেছে যে, বিমানবন্দরে লাগেজ চুরি ও লাগেজ কেটে মালামাল চুরিতে বেবিচক, বিমান ও বিভিন্ন সংস্থার শতাধিক চক্র জড়িত। গত নভেম্বরে লাগেজ কেটে মালামাল চুরির অভিযোগে হাতেনাতে দুটি চক্রের চারজনকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরা সবাই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এয়ার ট্রাফিক হেলপার। এর আগেও সিআইডি এবং এপিবিএন এর হাতে গ্রেফতার হয়েছিল এই চক্রের ২০-২৫ জন সদস্য। তাদেরকেও হাতেনাতে ধরা হয়েছিল। এদের মধ্যে অনেকেই এখন চাকরিচ্যুত হয়েছে আবার কেউ কেউ আইনের ফাঁক দিয়ে জামিনে বের হয়ে বিমানবন্দরে ফিরেছে বলেও পত্রিকাটি উল্লেখ করেছে।

বিবিসি বাংলা ২২ সেপ্টেম্বরের একটি প্রতিবেদনে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে লাগেজ কাটা ও লাগেজ চুরির বহু ঘটনা বর্ণনা করেছে। এই প্রতিবেদনে প্রবাসী শ্রমিকদের লাগেজ কেটে বাচ্চার চকলেট চুরি থেকে শুরু করে স্ত্রীর গহনা চুরির অনেক ঘটনায় বিবৃত হয়েছে। অর্থাৎ বিমানের যাত্রিদের লাগেজ কেটে মূল্যবান জিনিস চুরি করা, লাগেজ গায়েব করে ফেলা হজরত শাহজালাল বিমান বন্দরের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। 

আবার আমার বন্ধুর কথায় ফিরে আসি। ১০ হাজার ডলার খুইয়ে বন্ধুটি যে বলেছিলেন– লাগেজ স্ক্যান থেকে শুরু করে লাগেজ বিমানে ওঠানো পর্যন্ত কর্মীদের একটি চক্র এই চুরি কর্মের সাথে জড়িত। তা নেহায়েত মন্দ বলেননি।

আমাদের প্রশ্ন, বিমানবন্দরে কঠোর সিসিটিভির ব্যবস্থা রয়েছে এবং সেখানে সিভিল এভিয়েশন, বিমান ও বিভিন্ন সংস্থার লোকজন ডিউটি করছেন। তাদের অন্যতম কাজ সম্পদের নিরাপত্তা, যাত্রির জান মালের নিরাপত্তায় কাজ করা। এই তাদের নিরাপত্তার নমুনা? তাদের নাকের ডগায় লাগেজ কাটা, লাগেজ হারানো বা মালামাল খোয়া যায় কীভাবে? হারানো লাগেজ  ফেরত পাওয়ার জন্য সেখানে লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড শাখা রয়েছে। সেখানে অভিযোগ করেও লাগেজ পাওয়া যায় না কেন? বিমানবন্দরের কর্মীরা কি এতই দায়িত্বহীন? নাকি এর মধ্যে স্বার্থসংশ্লিষ্টতার ইশারা কাজ করে এবং সেটাই মুখ্য। 

পৃথিবীতে খুব কম দেশই আছে যেখানকার বিমানবন্দরে বাংলাদেশের বিমানবন্দরের মতো চুরির ঘটনা ঘটছে। এছাড়াও সেবার মান আমাদের কোথায় দাঁড়িয়েছে তা কি বলার অপেক্ষা রাখে? প্রবাসী শ্রমিক যাদের পাঠানো রেমিট্যান্সে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ভর্তি হচ্ছে তাদের অপমান করতে বিমানবন্দরের কর্মীরা পারদর্শী। তাদের সাথে মানবেতর আচরণ করা হচ্ছে, লাগেজ কাটা হচ্ছে, লাগেজ গায়েব করা হচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ হওয়ার কথা ছিল উল্টো। সম্ভবত বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনে প্রবাসীদের সঙ্গে আমাদের মতো এত বাজে ব্যবহার পৃথিবীতে অন্য কোনও দেশ করে না। এ নিয়েও বহু লেখালেখি হয়েছে। কাজের কাজ কতটা হয়েছে তা বিবেচনার বিষয়।

আমাদের প্রত্যাশা হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর একটি আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন বিমানবন্দর হোক। প্রবাসীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হোক, লাগেজ চুরি বন্ধ হোক, লাগেজ কাটা বন্ধ হোক,‌ সর্বোপরি বিমান কর্মীদের আচরণেরও সর্বোচ্চ উন্নয়ন হোক।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: জনমত জরিপে ট্রাম্পের চেয়ে এগিয়ে কমলা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: জনমত জরিপে ট্রাম্পের চেয়ে এগিয়ে কমলা
পাঁচ দিন পর খুললো অফিস-আদালত
পাঁচ দিন পর খুললো অফিস-আদালত
টি-টোয়েন্টিতে লঙ্কানদের নতুন অধিনায়ক
টি-টোয়েন্টিতে লঙ্কানদের নতুন অধিনায়ক
কারফিউ বা সান্ধ্য আইন কী 
কারফিউ বা সান্ধ্য আইন কী 
সর্বশেষসর্বাধিক