X
বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
১৯ মাঘ ১৪২৯

সামাজিক বৈকল্য সৃষ্টিতে শিক্ষা

ড. খুরশিদ আলম
২৪ জানুয়ারি ২০২৩, ১৯:৪২আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৩, ১৯:৪২

ছোটবেলায় স্কুলে পড়েছিলাম আবুল হোসেনের লেখা ‘কৃষকের আর্তনাদ’ প্রবন্ধ। সেখানে লেখক বলতে চেয়েছেন, গ্রামের কৃষকের ছেলেরা লেখাপড়া শিখে শহরে চলে যায়। কৃষকের দুঃখ দূর করতে তারা আর গ্রামে ফিরে যায় না। সেটিই ছিল কৃষকের আর্তনাদের মূল বিষয়। শিক্ষার মাধ্যমে কৃষকের ছেলের মধ্যে এক ধরনের ‘সামাজিক বৈকল্য’ সৃষ্টি হয়, যাতে গ্রামের প্রচলিত রীতিনীতি এবং সদস্যদের সঙ্গে সে আর খাপ খাওয়াতে পারে না।

এখন শহরের ছেলেরা আবার দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শেষে বিদেশে পড়ালেখা করতে যায়, আর তা শেষ করে আর দেশে ফিরতে চায় না। তখন সেসব ছেলে এই বাংলাদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা করতে শুরু করে। এ দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতির মান উন্নয়নের চেষ্টা না করে এটিকে পেছনে ফেলে নিজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়। সে আত্ম-উন্নয়নের চেষ্টায় বিভোর হয়ে থাকে। যে দেশটির উন্নয়নে তার প্রয়োজন ছিল সবচেয়ে বেশি, সেটি বাদ দিয়ে যে দেশটির উন্নয়নে তার প্রয়োজন নেই সে দেশটিতে সে থাকতে চায়। যে দেশটি তাকে লালন-পালন করেছে সে দেশটিকে পেছনে ফেলে রেখে সে কেবল আরাম-আয়েশের চেষ্টা চালিয়ে যায়। অনেকে এমনকি তার কথা বলার ধরনও পাল্টে ফেলে। নিজকে নেটিভ ইংরেজ বানানোর চেষ্টা করে। ফলাফল যাহোক, তার মধ্যেও এক ধরনের সামাজিক বৈকল্য সৃষ্টি হয়। সে আর তার দেশের পরিচিত মানুষ থাকে না। কিন্তু এটি নিয়ে কেউ কিন্তু আর আবুল হোসেনের মতো কেরানির আর্তনাদ বলে কিছু লিখে না। তখন ছিল কৃষকের আর্তনাদ, আর এখন হচ্ছে কেরানির আর্তনাদ। এভাবে একদিন তার পিতা তার দাদার গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসে আর তার উত্তরসূরি তাকে ছেড়ে ভিন দেশে চলে যায়।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক জাফর শাহ গণপিটুনিতে নির্মমভাবে আহত হয়ে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেছেন। বিভিন্ন জনের মন্তব্যে থেকে মনে হয়েছে তিনি সামাজিক এবং মানসিক বৈকল্যে ভুগছিলেন। তিনি সামাজিক বৈকল্যে ভুগছিলেন বলে মনে হয় এ কারণে যে তিনি বিদেশে পড়াশোনা করেছেন এবং বিদেশিদের মতো ইংরেজি বলতেন। স্বাভাবিকভাবে তিনি তার সহকর্মীদের শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন বলে মনে হয় না। ফলে তার সহকর্মীরাও তার প্রতি শ্রদ্ধা বা সহানুভূতিশীল ছিলেন এমনটা নয়। এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন আমরা একজনকে বিদেশি কোনও নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষালাভের পর অসাধারণ কিছু হয়ে গেছে এমন একটি ধারণা তার মধ্যে কোনোভাবে প্রবেশ করাই। এ ধরনের একটি ধারণা একজন মানুষের মধ্যে যদি কোনোভাবে ঠাঁই পায় তবে সে ব্যক্তি সবাইকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবে এটাই স্বাভাবিক। সমাজের সদস্যদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশতে না পারার একটি সামাজিক বৈকল্য তার মধ্যে তৈরি হবে, যা থেকে তার মানসিক বৈকল্যও তৈরি হবে। এর দুটো পরিণাম হতে পারে। এক. এ দেশ থেকে চলে যাওয়া; দুই. মানসিক বৈকল্য নিয়ে দেশে টিকে থাকা।

জাফর শাহর ক্ষেত্রে দ্বিতীয় যে ঘটনাটি ঘটেছে তা হচ্ছে রাস্তায় গাড়ি চালানোর সময় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটানো এবং তাৎক্ষণিকভাবে তার গাড়িতে আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে না নিয়ে যাওয়া। তার গাড়িতে পিষ্ট ব্যক্তিকে রক্ষার চেষ্টা না করে নিহতকে গাড়ির চাকায় আটক অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে বহুদূর নিয়ে যাওয়া। এটি দেখতে পেয়ে সমবেত জনতা আরও বেশি ক্রুদ্ধ হয়েছেন। তারা তাকে গণপিটুনি দিয়ে মারাত্মক আহত করেছেন।

গণপিটুনির কারণ হচ্ছে সমাজের সদস্যরা তাকে একজন নির্মম হত্যাকারী মনে করেছে। তাকে তারা তাই চরম শাস্তি প্রদান করেছে। এটি তারা করেছে ‘সামাজিক ন্যায়’-এর ধারণা থেকে, আইনের প্রয়োগের দিক থেকে নয়। আমাদের দেশে সামাজিক ন্যায় এবং আইনের শাসনের ধারণাটি এক নয়। তাই তারা এ কাজটিকে এক ধরনের নৈতিক কাজ মনে করেছে। এখানে কোনও কোনও সময় সন্ত্রাসীকেও জনতা এভাবে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করে। এটি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একটি ব্যাখ্যা, কোনও হত্যাকাণ্ডের পক্ষে যুক্তি প্রদান করা নয়।  

সামাজিক বৈকল্য দেখা দেওয়ার সঙ্গে তার সামাজিকীকরণের উদ্যোগ নেওয়া দরকার, যাতে শুরুতে সে সমস্যার সমাধান করা যায়। আবার যদি তা মানসিক বৈকল্য পর্যন্ত চলে যায় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করে থাকে। দেশে বর্তমানে এ ধরনের সামাজিক বৈকল্যে ভুগছেন হয়তো বিভিন্ন শিক্ষক, যার কোনও সঠিক পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই। তবে সে তথ্য জনসাধারণের সামনে প্রচার করার কোনও দরকার নেই কিন্তু সে সম্পর্ক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। সামাজিক এবং পরবর্তী সময়ে মানসিক বৈকল্যের জন্য বাংলাদেশের শিক্ষার যে ক্ষতি হচ্ছে তা জাতির জন্য একটি অপূরণীয় ক্ষতি।

 সামাজিক বৈকল্যকে আমরা খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখি না। অনেকে আবার একে আধুনিককরণ থেকে অর্জিত কোনও গুণ বলে মনে করেন। ফলে ব্যক্তিকে সমাজের সঙ্গে সঙ্গতিমূলক আচরণ করতে উদ্বুদ্ধ করার পরিবর্তে তাদের নিয়ে নতুন একটি সামাজিক সমস্যা তৈরি করা হয়। আবার এ ধরনের ব্যক্তির ক্ষেত্রে দেখা যায়, তাদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদের হার অনেক বেশি। তারা নিজেদের শুধু খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হচ্ছে না বরং অন্যদের খাপখায়ানোকে অস্থিতিশীল করে তুলে। ফলে এতে সমাজে নতুন নতুন সংকট তৈরি হয়। যেমন, তাদের পিতার বাড়িঘর বিক্রি করে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। দেশের সম্পদ এভাবে বিদেশে চলে যাচ্ছে। বস্তুগত এবং অবস্তুগত সম্পদ দুটো দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে।

এর কি কোনও প্রতিকার আছে? সামাজিক বিজ্ঞানীরা বলতে পারেন যে সামাজিক বৈকল্য দূর করা শতভাগ না হলেও অনেকটা সম্ভব। সামাজিকীকরণ যদি ঠিকভাবে করা যায় তাহলে এটি অনেকটা দূর করা সম্ভব। যেমন, জাপান এতটা আধুনিক হওয়ার পরও তাদের দেশের ঐতিহ্য ছেড়ে দেয়নি। তারা আধুনিক কিন্তু পাশ্চাত্যমুখী হয়ে যায়নি।

বাংলাদেশে এখন ব্যাপক সংখ্যক শিক্ষার্থী বিদেশে পড়তে যাচ্ছে। এদের মধ্যে জ্ঞানের চাহিদা থেকে সামাজিক চাহিদা অনেক বেশি। তাদের মধ্যে যদি জ্ঞানের চাহিদা তৈরি করা যায়, তাহলে এরা সত্যি মানবসম্পদ হবে, যেমনটা বর্তমানে চীনের হচ্ছে, এর আগে জাপান বা কোরিয়ার হয়েছে। আর তার জন্য আলাদা প্রস্তুতি থাকতে হবে। সামাজিক সমস্যাগুলো যথাযথ সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।

লেখক: সমাজবিজ্ঞানী ও গবেষক। চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব সোশাল রিসার্চ ট্রাস্ট।

[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
মেলায় আবু আলীর বই ‘টেমস থেকে নীলনদ’
মেলায় আবু আলীর বই ‘টেমস থেকে নীলনদ’
জয় দিয়ে সাফ মিশন শুরু করতে চাইছে বাংলাদেশ
জয় দিয়ে সাফ মিশন শুরু করতে চাইছে বাংলাদেশ
জামানত বাজেয়াপ্ত হচ্ছে হিরো আলমের
জামানত বাজেয়াপ্ত হচ্ছে হিরো আলমের
নির্বাচনের পরদিন নিজ বাসায় পাওয়া গেলো ‘নিখোঁজ’ প্রার্থীকে
নির্বাচনের পরদিন নিজ বাসায় পাওয়া গেলো ‘নিখোঁজ’ প্রার্থীকে
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ