X
মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪
২১ ফাল্গুন ১৪৩০

‘নেটওয়ার্কিং’কে কীভাবে ‘নেটওয়ার্থে’ পরিণত করা যায়?

সাইফুল হোসেন
২৪ জুলাই ২০২৩, ১৭:৫৪আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৩, ১৭:৫৪

একটি বহুল প্রচলিত কথা আছে—‘নেটওয়ার্ক ইজ ইওর নেটওয়ার্থ। যার নেটওয়ার্ক যত বেশি তার নেটওয়ার্থ তত বেশি। আপনার নেটওয়ার্ক নির্ধারণ করে দেবে আপনার নেটওয়ার্থ কী পরিমাণ হবে। করপোরেট ওয়ার্ল্ডে সব জায়গায় শুধু বলতে শুনবেন নেটওয়ার্কিং বাড়াতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে এই নেটওয়ার্কিং আপনি কীভাবে বাড়াবেন, কী করলে এই নেটওয়ার্কিং বাড়বে?

আমাদের সমাজে যার নেটওয়ার্কিং যত বেশি সে তত বেশি সমৃদ্ধ এবং সে এই নেটওয়ার্কিংকে কাজে লাগিয়ে সার্বিক উন্নতি লাভ করতে পারেন। ছোট একজন ব্যবসায়ী, অনেক বড় ব্যবসায়ী হতে পারেন, চাকরিজীবী তার দক্ষতা বাড়িয়ে, সেলস বাড়িয়ে চাকরিতে অনেক উন্নতি করতে পারেন শুধু কার্যকর নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে।

বর্তমান যুগে নেটওয়ার্কিংয়ের বিকল্প আসলে নেই। অনেকেই বলেন মামা-চাচা না থাকলে আমাদের দেশে কোনও কাজ পাওয়া সম্ভব না। কথাটা একেবারে অমূলক নয়, অনেক ক্ষেত্রে এটাই সত্যি। আপনার যদি মামা-চাচা না থাকে তাহলে আপনি কাজ পাবেন না। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, সবার তো মামা চাচা নেই।  যাদের মামা-চাচা নেই তারা করবে কী? তারা যেটা করবে সেটা হলো তারা তাদের নেটওয়ার্কিং বৃদ্ধি করে সেই নেটওয়ার্ক মেইনটেইন করার মাধ্যমে অসংখ্য ‘মামা-চাচা’ তৈরি করবেন এবং এই নেটওয়ার্কিং আপন মামা-চাচাদের মতোই কাজে লাগবে। মূলত,  নেটওয়ার্কিংয়ের উদ্দেশ্য সেটাই। প্রশ্ন হচ্ছে নেটওয়ার্কিং কীভাবে বাড়াবেন?

প্রথম যেটি দরকার সেটা হচ্ছে বিষয়টা সম্পর্কে একটা সম্যক ধারণা থাকা প্রয়োজন। সারা দেশে আপনার পরিচিত, অপরিচিত গণ্ডিতে অনেক পেশাদার মানুষ ছড়িয়ে আছেন। তাদের সঙ্গে আপনার একটা সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। এখন আপনার জন্য নেটওয়ার্কিংটা কী হলো? এটা নির্ভর করছে আপনি কী করছেন, আপনার অবস্থান কোথায়, কী করতে চান তার ওপর। যেমন, একজন ব্যাংকার যদি নেটওয়ার্কিং করতে চায় তাহলে তার দরকার দুই ধরনের লোক। যারা তাদের কাছে টাকা দেবে এবং যারা তাদের কাছ থেকে টাকা নেবে। অর্থাৎ ব্যাংকের দরকার ডিপোজিটর এবং ঋণগ্রহীতা। ডিপোজিটর এবং ঋণগ্রহীতাদেরও দরকার ব্যাংক। তাহলে একজন ব্যাংকার যখন নেটওয়ার্কিং করবেন তখন তিনি তার এই গণ্ডির মধ্যে এটি করবেন। কারণ, তার পেশার সঙ্গে যেটা যায় সেটা তার পেশাকে উন্নত করবে, জীবনে সাফল্য নিয়ে আসবে।

আবার একজন ব্যবসায়ী যখন নেটওয়ার্কিং করবেন, তখন তার চিন্তা একটু ভিন্ন ধরনের হবে। ব্যবসায় মূলত ফান্ডিং করে ব্যাংকগুলো, এনবিএফআইগুলো। তাই ব্যবসায়ীরা সম্পর্ক করবে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে এবং তারা যাদের কাছে মালামাল বা সার্ভিস বিক্রি করে তাদের সঙ্গে এবং যাদের কাছ থেকে তারা কোনও কাঁচামাল কেনে তাদের সঙ্গে। প্রত্যেকের একটা টার্গেট গ্রুপ থাকে, স্টেকহোল্ডার থাকে। সবার সঙ্গে পরিচয়, সম্পর্ক ও নেটওয়ার্কিং খুব জরুরি।

এই নেটওয়ার্কিং যার যত বেশি সে তত জায়গায় পৌঁছাতে পারে এবং যে যত দক্ষতার সঙ্গে নেটওয়ার্কিং’কে ব্যবহার করতে পারে সে তত দক্ষতার সঙ্গে সেলস বাড়াতে পারে, ব্যবসায় উন্নতি করতে পারে। যখন আপনি ডিফাইন করে ফেলতে পারবেন আপনার নেটওয়ার্কিং কী, কাদের সঙ্গে নেটওয়ার্কিং দরকার, কোন ধরনের মানুষ আপনার কাজে আসবে তখন আপনার কাজ সঠিক দিকে এগোবে।

অযথা নেটওয়ার্কিং করা দরকার বলে আমার মনে হয় না। নেটওয়ার্কিংয়ের একটা উদ্দেশ্য থাকবে। সেই উদ্দেশ্যটা ঠিকমতো বুঝে নেওয়াটা খুব দরকার। যখন আপনি আপনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বুঝে ফেলবেন, তখন তার পরবর্তী ধাপ হচ্ছে আপনি কী করবেন, কীভাবে এগোবেন? আপনি কিন্তু বুঝে ফেললেন যে কোন ধরনের লোক আপনার নেটওয়ার্কিংয়ে আনা দরকার, কাদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া দরকার, কাদের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া দরকার। এবার খুঁজতে হবে যে এই লোকদের সঙ্গে আপনি সংযুক্ত কীভাবে হবেন?

এগুলো কিন্তু প্রত্যেকটা খাতা কলম নিয়ে বসে লেখার বিষয়। কোন ধরনের লোক আপনার দরকার, কোন ধরনের লোকের সঙ্গে সংযুক্ত হতে চান ইত্যাদি।

বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম আপনাকে অনেক সুযোগ করে দিয়েছে। ধরুন লিংকডইন সুযোগ করে দিয়েছে বিভিন্ন পেশার অসংখ্য মানুষের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার। ফেসবুকে অসংখ্য মানুষ পাবেন, টুইটারে পাবেন, তারপর বিভিন্ন ধরনের সাইট তো আছেই। তাছাড়া বিভিন্ন ক্লাব, সোসাইটি আছে সেখান থেকে অনেকের সঙ্গে সংযুক্ত হবার সুযোগ পাওয়া যায়।

যখন কেউ ভালোভাবে বুঝে ফেলবেন যে কাকে কেন দরকার, তখন বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী লোকজন পিক করতে পারবেন।

তবে চাইলেই এই কাজটা আপনি একদিনে করতে পারবেন না। এটা করতে আপনার অনেক সময় লাগবে, অনেক শ্রম দিতে হবে, অনেক পারপাসফুলি এগোতে হবে। ধরুন, আপনি সংযুক্ত হতে চান লিংকডইনে। সংযুক্ত হতে হলে ওখানে যে হাজার হাজার বা লক্ষ লক্ষ সদস্য আছে, আপনি প্রত্যেক দিন সময় করে তাদের প্রোফাইল চেক করুন, চেক করে যাদের মনে হবে কাজে লাগবে তাদের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার চেষ্টা করুন। এক্ষেত্রে একটা কাজ করুন, তাদের রিকোয়েস্ট পাঠান। রিকোয়েস্ট পাঠানোর সঙ্গে একটা স্মল নোট দিতে ভুলবেন না যে কেন আপনি তার সঙ্গে সংযুক্ত হতে চান। সেখানে থাকবে আপনার ছোট্ট একটা পরিচিতি, আপনার উদ্দেশ্য এবং তাকে একটা রিকোয়েস্ট করা।

তারপর এটা পাঠিয়ে দিলেন, যিনি রিকোয়েস্ট পেলেন তিনি যদি ভাবেন যে আপনি প্রফেশনাল তাহলে তিনি আপনার প্রোফাইল ঘাঁটবেন এবং আপনাকে তার ভালো লাগলে সংযুক্ত করবেন। কিন্তু ঝামেলাটা অন্য জায়গায়। ঝামেলাটা হচ্ছে আপনি প্রচুর নেটওয়ার্কিং করেছেন, করছেন, অনেকের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছেন কিন্তু এসব সংযুক্তি আপনাকে কী এনে দিলো সেটা খতিয়ে দেখা। এই যে কানেকশন আপনার হলো, এর পরবর্তী ধাপ হচ্ছে এই কানেকশনটাকে ভালোভাবে মেইনটেইন করা। যদি কানেক্টেড হবার পর আর কাজ না করেন, সম্পর্কটাকে যত্ন না করেন, সম্পর্ককে যদি গ্র্যান্টেড ধরে নেন তাহলে কোনও লাভ নেই।

সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে পরিবার থেকে শুরু করে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন– সব জায়গাতেই পরিচয়টাকে একটা সম্পর্কে রূপদান করা, সম্পর্ক মেইনটেইন করা– এটাই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয় বিষয়।

নেটওয়ার্কিংয়ের জন্য আপনি একটা প্ল্যান তৈরি করতে পারেন এভাবে যে প্রতিদিন দশজন পরিচিত লোককে আপনি বার্তা পাঠাবেন তাদের বিশেষ বিশেষ দিনে, এটা হতে পারে খুদে বার্তা, হতে পারে মেইল, হতে পারে WhatsApp-এ কোনও বার্তা, হতে পারে লিংকডইনে কোনও বার্তা, হতে পারে ফেসবুকে কোনও মেসেজ ইত্যাদি। বিভিন্ন আয়োজনে তাদের স্মরণ করা, বিনা কারণেই তাদের জিজ্ঞাসা করা ‘কেমন আছেন’? এই ব্যাপারগুলো মানুষের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে সাহায্য করে। যেমন, কারও কাছে আপনার একটা প্রয়োজন আছে, আপনি তাঁর কাছে গেলেন। গিয়ে আপনি আপনার প্রয়োজনের কথা বললেন। উনি ভাববেন, হঠাৎ করে দরকার হয়েছে বলে আপনি তার কাছে গেছেন। আপনজনও দেখবেন হঠাৎ ভিজিটকে খুব ভালোভাবে নেন না। কিন্তু যদি এমন হয় যে তার সঙ্গে মাঝে মাঝে কথা বলেন বা মাঝে মাঝে বিভিন্ন বিষয় শেয়ার করেন, উইশ করেন এবং কোনও কাজে তার কাছে যান, তখন সেটা তিনি ভালোভাবে গ্রহণ করবেন।

একটা ভালো প্রোডাক্ট বিক্রি করতে চান, যার কাছে বিক্রি করতে চান তার ওই প্রোডাক্টটা দরকার। আপনাদের দুজনের মধ্যে একটা বিজনেস রিলেশনশিপ বা প্রফেশনাল রিলেশনশিপ। হয়তো চাকরি দরকার, অন্যজন আপনার মতো একজন প্রার্থী খুঁজছেন এবং আপনি তার সঙ্গে সংযুক্ত। তার কাছ থেকে সাহায্য পেতে পারেন।

এই ব্যস্ত জীবনে অকারণে কোনও কিছু করার সুযোগ কারও নেই। আপনার গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাদ দিয়ে অকারণে কাজ করবেন কেন? নেটওয়ার্ক থেকে সেই ধরনের বেনিফিট আপনার চিন্তা করা দরকার, যার আর্থিক এবং আবেগীয় মূল্য আছে। ফলে এটি আপনার ক্যারিয়ারে কিছু সংযোগ করবে এবং পেশাদারি জীবনে ভ্যালু সংযোগ করবে। এতে আপনি পেশায় বা ক্যারিয়ারে দিনে দিনে উন্নতি লাভ করবেন। যখন সেটা করতে পারবেন তখনই আপনি নেটওয়ার্কিংকে নেটওয়ার্থে পরিণত করতে পারবেন। এটি সম্পদ বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে, জীবনযাপনকে সহজ করবে। যখন আপনি অনেক বেশি সংযুক্ত থাকবেন মানুষের সঙ্গে, আপনি যখন এটা মেইনটেইন করবেন তখন দেখবেন আপনি সাহায্য চাইলেই পাবেন।

এজন্য নিজেকে সঠিকভাবে, সুন্দরভাবে চাইতে জানতে হবে। সুন্দর করে বলতে জানতে হবে। প্রয়োজনের কথাগুলো গুছিয়ে বলতে জানতে হবে। তবে দেখতে হবে আপনার কাজ অন্যদের কাজে লাগছে কিনা, অন্যদের জীবনে বা প্রতিষ্ঠানে মূল্য সংযোজন করছে কিনা। যখন সুন্দরভাবে, অর্থপূর্ণভাবে যোগাযোগ করতে পারবেন সঠিক মানুষের সঙ্গে, তখন আপনার জীবন আরও সুন্দর, সাবলীল এবং তাৎপর্যপূর্ণ হবে, সফল হবেন।

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক, ফাইন্যান্স ও বিজনেস স্ট্রাটেজিস্ট; সিইও, ফিনপাওয়ার লিডারশিপ ইন্টারন্যাশনাল।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর এসি চালুর আগে যে ৫ সতর্কতা জরুরি
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর এসি চালুর আগে যে ৫ সতর্কতা জরুরি
গর্ভপাতকে সাংবিধানিক অধিকার দিলো ফ্রান্স
গর্ভপাতকে সাংবিধানিক অধিকার দিলো ফ্রান্স
চাকরি না করেই নিয়েছেন বেতন-ভাতা, শখ অধ্যক্ষ হওয়া
চাকরি না করেই নিয়েছেন বেতন-ভাতা, শখ অধ্যক্ষ হওয়া
প্রার্থিতা বাতিলের মামলায় জিতলেন ট্রাম্প
প্রার্থিতা বাতিলের মামলায় জিতলেন ট্রাম্প
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ