X
মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪
২১ ফাল্গুন ১৪৩০

কেন আপনি আরও গরিব হচ্ছেন?

সাইফুল হোসেন
১০ আগস্ট ২০২৩, ১৭:৫৯আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২৩, ১৭:৫৯

আমাদের মধ্যে কেউ কেউ জন্মগতভাবে গরিব থাকেন, আবার কেউ কেউ জন্মগতভাবেই ধনী হন। অনেকে বলছেন গরিব হিসেবে জন্ম নেওয়াটা দোষের নয়, কিন্তু মারা যাওয়ার সময় যদি আপনি দরিদ্র বা গরিব থাকেন সেটা আপনার দোষ। কারণ, সারা জীবন আর্থিকভাবে সফল হওয়ার জন্যে, স্বাধীন হওয়ার জন্যে ঠিকমতো কাজ করেননি।

আমরা কেউ কেউ মনে করি যে আল্লাহ আমাদের গরিব রেখেছেন। আবার কেউ কেউ ভাবেন যে তাঁদের ভাগ্যই খারাপ। আমি কোনও কথাকে গ্রহণ বা পরিত্যাগ করছি না, এখানে কিছু কথা যোগ করছি। ভাগ্য বলে একটা কথা আছে, আমরা জানি। কিন্তু যদি কাজ না করে কেউ বসে থাকে, তাহলে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হওয়ার কোনও সুযোগ নেই। কেউ কাজ করলে, পরিশ্রম করলে, তার সঙ্গে ভাগ্য যোগ হবেই। তখন যে কেউ ধনী হবে এবং পেশাতেও সফলতা আসবে।  

কী কী অভ্যাসের কারণে মূলত কেউ গরিব থেকে আরও গরিব হচ্ছেন, হয়তো সেটা তিনি জানেন অথবা জানেন না। যারা প্রতিদিন একটু একটু করে গরিব হচ্ছেন, তাদের উদ্দেশ করে, তাদের খেয়াল করার জন্য আমরা কয়েকটি পয়েন্ট নিয়ে আলোচনা করছি। এই আলোচনায় সূক্ষ্মভাবে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে, এই পয়েন্টগুলো সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয় না। অনুসরণ করলে কেউ ধীরে ধীরে ওয়েলদি হয়ে উঠতে পারতো।

এক. পরিকল্পনাহীনতা। ইনকাম করছেন, খরচ করছেন। সময় চলে যাচ্ছে, বাচ্চারা বড় হচ্ছে, আপনারও বয়স হচ্ছে, বুড়ো হচ্ছেন  কিন্তু কোনও ধরনের কোনও আর্থিক পরিকল্পনা নেই। সময়ের সঙ্গে যেগুলো সামনে আসছে শুধু সেগুলো মিট করতে করতে আপনি সামনে যাচ্ছেন। আপনি পাঁচ বছর পরে নিজেকে কোন অবস্থায় দেখতে চান? আপনার বাচ্চাকে ভবিষ্যতে কী ধরনের এডুকেশন দিতে চান? আপনি রিটায়ারমেন্টের পরে কি করতে চান? আপনি দশ বছর পরে কী আর্থিক অবস্থায় নিজেকে দেখতে চান– এগুলোর ব্যাপারে কোনও চিন্তাভাবনা আপনার নেই। সবকিছু ভাগ্যের হাতে সমর্পণ করা।

এই যদি অবস্থা হয় তাহলে আপনি আর্থিকভাবে স্বাধীন হতে পারবেন না, আপনি দরিদ্র থেকে যাবেন। কারণ আপনি শুধু আয় করবেন আর ব্যয় করবেন।

দুই. নিডস এবং ওয়ান্টস– এই দুটো বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য না করা। আমরা অধিকাংশ সময় যেটা করি সেটা হচ্ছে, আমাদের সামনে যে প্রয়োজন চলে আসে, সেই প্রয়োজনীয়তাকে মিট করে সামনে এগিয়ে যাই। কিন্তু আমরা ভেবে দেখি না যে এটা আমার নিডস নাকি ওয়ান্টস। নিডস যেটা সেটা আপনার না হলে চলবে না। ওয়ান্টস আপনার না হলেও চলে (যদিও সেটা আপনার জীবনে কিছু ভ্যালু যোগ করে)।

জীবন চালানোর জন্য যখন আপনি খরচ করছেন, তখন দেখবেন যে মনের অজান্তেই ওয়ান্টসের প্রতি বেশি মনোযোগী হচ্ছেন। ধরুন, আপনার জামা আছে পাঁচটা, আপনার আরও দুটো কিনলে ভালো লাগবে।

আপনার ঘড়ি আছে একটা, একটু পুরোনো হয়ে গেছে, আর একটা নতুন ঘড়ি হলে ভালো লাগবে। টেলিভিশনটা একটু পুরোনো, একটু বড় স্ক্রিনের একটা টিভি হলে ভালো লাগবে। বাসাটা একটু কম চকচক করছে। এটা যদি ভালো করে ইন্টেরিয়র করা যায় তাহলে ভালো লাগবে। এরকম অনেক বিষয় আছে, যে বিষয়গুলো অ্যাভয়েড করলে কেউ চলতে পারা যায়। কিন্তু আপনার হাতে টাকা আসলেই আপনি সেগুলো খরচ করে ফেলেন। মানে আপনি নিডস আর ওয়ান্টসের মধ্যে পার্থক্যটা সঠিকভাবে করেন না। এই দুটোর মধ্যে একটা পার্থক্য করতে হবে এবং নিডস-এ ফোকাস করতে হবে। ওয়ান্টসে কম ফোকাস করবেন।

তিন. একটি আয়ের উৎসের ওপর নির্ভর করা। দেখবেন, যারা নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত বা গরিব শ্রেণির মানুষ তারা শুধু একটা আয়-উৎসের ওপর নির্ভর করে। তারা হয়তো একটা চাকরি করে, কিন্তু তাদের যে দক্ষতা সেটাকে কাজে লাগিয়ে বা দক্ষতাকে উন্নত করে বা অন্য একটা স্কিল ডেভেলপ করে, আরও যে বাড়তি ইনকাম করার সুযোগ রয়েছে, সেদিকে অনেকেই খেয়াল করেন না। ফলে একটা ইনকামের ওপর যখন নির্ভর করবেন তখন ইনফ্লেশনের ইফেক্ট বা অন্যান্য তাৎক্ষণিক বিভিন্ন প্রয়োজনীয়তার কারণে চাপ অনেক বেশি পড়বে এবং সেভিংসের প্রতি নজর কমে যাবে। সবার চেষ্টা করা দরকার একের অধিক ইনকাম সোর্স তৈরি করার। যারা সেটা করেন না, তারা  গরিব থেকে আরও গরিব হন।

চার. শর্টকাট পন্থা অবলম্বন করা। আমাদের সবার চারপাশে অনেক মানুষ আছে, যারা  টাকা-পয়সা আয়ের জন্য খুব সহজ কোনও রাস্তার খোঁজ করেন। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, জীবনে সফল হওয়ার জন্য বা টাকা পয়সা আয় করার জন্য শর্টকাট কোনও পথ নেই। আমার পরিচিত এক ভদ্রলোক আছেন, অনেক টাকা আয় করেন কিন্তু উনি জুয়া খেলেন। ফলে যে ইনকাম তিনি করেন, হাতের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যায়।

জুয়াতে মাঝে মাঝে হঠাৎ করে তার অনেক লাভ হয়ে যায়। এই যে লোভ এই লোভ তাকে অন্য কাজে মনোযোগ দেওয়া থেকে, অন্য ইনকাম বাড়ানোর পথ থেকে দূরে রাখে। এবং সে প্রতিনিয়ত জুয়ায় পার্টিসিপেট করে। তার আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয় না। আসলে শর্টকাট ওয়েতে বড়লোক হওয়ার কোনও সুযোগ নেই এবং এই প্রচেষ্টা না করাই ভালো। আপনি যদি সেটা করে থাকেন তাহলে আলটিমেটলি আপনার নেটওয়ার্ক কমে যাবে বা আপনি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়বেন।

পাঁচ. সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা। দেখবেন, আমরা অনেকেই আছি, যারা কোনও একটা কাজ শুরু করতে গিয়ে চিন্তা করতে করতে অনেক সময় নিয়ে নিই। তারপর অনেকের সঙ্গে শেয়ার করি, বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ করি, পরে কাজটা শুরু করা হয় না। ফলে যেটা এই জানুয়ারিতে শুরু করার কথা ছিল, দেখা গেলো সেই কাজ শুরু করতে সামনের বছরের জানুয়ারি চলে এলো। এত সময় নেওয়ার কোনও যৌক্তিক কারণ ছিল না। এই যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দীর্ঘসূত্রতা এবং সিদ্ধান্ত নিতে না পারা, এগুলো  ইনকাম স্ট্রিমকে নষ্ট করে। যে কাজ এখন শুরু করার কথা, এক বছর পরে শুরু করার কারণে জীবন থেকে এক বছর চলে গেলো এবং পিছিয়ে পড়লেন। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সতর্ক হতে হবে, সিদ্ধান্ত দ্রুত নিতে হবে।

ছয়. কাজ না করে অভিযোগকে প্রাধান্য দেওয়া। দেখুন, আমাদের সংসারে‌, আশপাশে অনেক মানুষ আছেন যারা সবকিছুর মধ্যে দোষ ত্রুটি খুঁজে। নিজে কাজ করতে পারছেন না বা কাজ শুরু করতে পারছেন না, বা শুরু করলেও সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারছেন না, সেখানে নিজের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ না করে, এই কারণে করতে পারিনি, ওই কারণে হচ্ছে না, আমার কাছে পুঁজি নেই, আমার বাবা আমাকে হেল্প করছে না, আমার ভাই আমাকে টাকা দিচ্ছে না, এ ধরনের নানা অভিযোগ করে। যারা সফল হয়েছেন তাদের দিকে যদি দৃষ্টি দেন তাহলে দেখবেন যে কারোর প্রতি তাদের অভিযোগ নেই। তারা  নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়ে কাজ করেন। এবং যেটুকু আছে, যে অবস্থায় আছেন, সেখান থেকে তারা শুরু করেছেন। আপনিও তাই করুন। আপনার যে সামর্থ্য আছে, সেই সামর্থ্য দিয়ে আপনি শুরু করুন। যখন আপনি সামনে হাঁটা শুরু করবেন, দেখবেন অনেকেই আপনার সঙ্গী হচ্ছে। যেকোনও কিছু জোগান দেওয়ার জন্য দেখবেন তখন আর লোকের অভাব হচ্ছে না। আপনি ছোট কোনও কাজ শুরু করলেও দেখবেন যে সেই কাজই একসময় বড় হচ্ছে এবং অন্যান্য অনেক কাজের পথ খুলে গেছে।

সাত. খরচের সঠিক হিসাব না রাখা। দেখুন, আয়ের হিসাব খুব বেশি একটা না রাখলেও চলে। কারণ, আপনার অসংখ্য উৎস নেই আয় করার। কিন্তু সকালে বাসা থেকে বের হয়ে বাসায় ফিরে আসা পর্যন্ত দেখবেন অনেক খাতে টাকা খরচ হয়েছে। জাপানিজরা একটা কাজ করে। তারা  ছোট্ট একটা নোটবুক ব্যবহার করে এবং প্রত্যেকটা খরচ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লিখে রাখে। খরচের হিসাব করতে হবে। কিন্তু এই হিসাব করে শুধু রেখে দিলে হবে না। সম্পূর্ণ খরচের রিভিউ করতে হবে। একসময় মোট  খরচ দেখার পর আপনার মনে হবে, অনেক খরচ না করলেও পারা যেত। যে ভুল খরচগুলো হয়েছে, সেগুলো পরবর্তীতে যেন না হয় সেদিকে খেয়াল করতে হবে। কারণ, আয় তো আনলিমিটেড না। ফলে খরচও আনলিমিটেড করতে পারবেন না। যারা ভুল খরচ করেন, তারা  দুর্দশায় পড়েন, ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। আর যারা খরচে ভুল করেন না তারা আস্তে আস্তে আর্থিকভাবে সফল হতে থাকেন।

আট. সঙ্গী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অসতর্কতা। এখানে সঙ্গী বলতে শুধু স্পাউস বাছাইয়ের কথা বলিনি। এর পাশাপাশি বন্ধুবান্ধব, যাদের সাথে আপনি চলেন, তাদের কথা বলছি। মূলত, আপনি যাদের  সাথে চলেন, দেখবেন আপনার কাজকর্ম তাঁদের মতো হচ্ছে। আপনি যদি অপব্যয়ী কারও সাথে চলেন, দেখবেন আপনিও তাদের মতো অপব্যয়ী হচ্ছেন। তাদের যে অভ্যাস আপনার মধ্যে চলে আসছে। আপনি যদি মিতব্যয়ী লোকের সাথে চলেন, দেখবেন আপনিও তাদের মতো মিতব্যয়ী হচ্ছেন। আপনি যে স্পাউস নির্বাচন করেছেন, সে যদি অতি খরচ করে, দেখবেন আপনার অবস্থা খারাপ হচ্ছে।

এ জন্য সবারই খুব সচেতন হওয়া দরকার। যাদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন, তারা কি সফল মানুষ? তারা কি পজিটিভ দিকে উৎসাহিত করে নাকি খরচের দিকে উৎসাহিত করে। যেটা সঠিক, যেটা মঙ্গল, সেটাই ভেবে করা উচিত।

নয়. আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য করতে না পারা। এটি হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। ধরা যাক, কারও আয় ১০ হাজার টাকা কিন্তু ব্যয় ১২০০০ টাকা। দেখা যাচ্ছে, প্রতি মাসে ২০০০ টাকা করে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। যদি জমা টাকা থাকে, তাহলে সঞ্চয় ভেঙে খরচ করা খুব বাজে সিদ্ধান্ত হবে। যা আয় তার থেকে কম খরচ করতে হবে। আয়ের সাথে ব্যয়ের একটা সামঞ্জস্য থাকতে হবে। ওয়ারেন বাফেট বলেছেন, আপনার খরচের পর যা থাকবে তা সঞ্চয় করবেন না বরং সঞ্চয়ের পর যা থাকবে তাই খরচ করবেন। যারা এটা করেন না এবং খরচের সঠিক পরিকল্পনা করেন না, তারা আয় এবং ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্য রাখতে পারেন না।

অনেকের কাছে রিটায়েরমেন্টের পরে পর্যাপ্ত টাকা থাকে। আবার অনেকের অনেক ঋণ থাকে। এটা মূলত আয়ের ওপর নির্ভর করে না, এটা নির্ভর করে ব্যক্তির খরচের অভ্যাসের ওপরে এবং ফান্ড ম্যানেজমেন্টের দক্ষতার ওপর।

আজকের এই পরামর্শগুলো নিয়ে কেউ যদি একটু ভাবে এবং জীবনে প্রয়োগ করার চেষ্টা করেন তাহলে দেখা যাবে ধীরে ধীরে দারিদ্র্য হটে যাচ্ছে। যারা গরিব তারা আর গরিব থাকছেন না, আস্তে আস্তে ওয়েলদি হয়ে উঠছেন, ধনী হয়ে উঠছেন।  

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক, ফাইন্যান্স ও বিজনেস স্ট্রাটেজিস্ট; সিইও, ফিনপাওয়ার লিডারশিপ ইন্টারন্যাশনাল।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ভারতকে তিন গোলে হারিয়ে ফাইনালে বাংলাদেশ
ভারতকে তিন গোলে হারিয়ে ফাইনালে বাংলাদেশ
কৃষ্ণ সাগরে আরেকটি রুশ যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার দাবি ইউক্রেনের
কৃষ্ণ সাগরে আরেকটি রুশ যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার দাবি ইউক্রেনের
জাতীয় পাট দিবসে পুরস্কার পাচ্ছেন ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান
জাতীয় পাট দিবসে পুরস্কার পাচ্ছেন ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান
পুরো দেশটাই অগ্নিঝুঁকিতে: জিএম কাদের
পুরো দেশটাই অগ্নিঝুঁকিতে: জিএম কাদের
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ