X
বুধবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৪
৩ বৈশাখ ১৪৩১

ক্ষমতাকে প্রশ্ন করাই বুদ্ধিজীবীর কাজ

আমীন আল রশীদ
১৪ ডিসেম্বর ২০২৩, ১১:২৪আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০২৩, ১৭:২৩

১৯৭১ সালে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক বিজয়ের ঠিক আগ মুহূর্তে বাঙালি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার জন্য শিক্ষক-সাংবাদিক-চিকিৎসক-দার্শনিক-লেখক ও সংস্কৃতিকর্মীদের হত্যা করে ১৪ ডিসেম্বর তারিখটিকে রক্তাক্ত করে গেছে পাকিস্তানি মিলিটারিরা। সেইসব শহীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে বুদ্ধিজীবীর দায় ও দায়িত্ব নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই। এবং সেই আলোচনাটি বাংলাদেশের বিজয়ের ৫২ বছরে দাঁড়িয়ে এই সময়ের আলোকে।

বুদ্ধিজীবীর সংজ্ঞা কী বা বুদ্ধিজীবী কাকে বলা হয়?

‘বুদ্ধি’ ও ‘জীবিকা’র সমন্বয়ে বুদ্ধিজীবী। তার মানে বুদ্ধি দিয়ে যিনি জীবিকা নির্বাহ করেন। যার জীবিকা অর্জনে শারীরিক পরিশ্রমের চেয়ে বুদ্ধি বা মেধার কাজ বেশি। একজন দিনমজুর বা যেকোনও পেশার মানুষের সঙ্গে একজন শিক্ষক-সাংবাদিক-চিকিৎসক ও লেখকের মূল পার্থক্য বুদ্ধিতে, মেধায়, মননে। অতএব যিনি মেধা ও মনন, চিন্তা ও প্রজ্ঞা এবং জ্ঞান ও কাণ্ডজ্ঞান ব্যবহার করে জীবিকা নির্বাহ করেন—সহজ অর্থে তিনিই বুদ্ধিজীবী। তবে সেই বুদ্ধিজীবীর মধ্যে শ্রেণিবিন্যাস আছে।

একজন স্কুলশিক্ষকও বুদ্ধিজীবী। কিন্তু তিনি যদি নিতান্তই স্কুলে যান এবং নির্ধারিত ক্লাস নিয়ে বাড়ি ফেরেন; তিনি যদি নিয়মমাফিক পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরি করেন এবং খাতা দেখে মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে দায়িত্বটি শেষ করেন, তাহলে তাকে হয়তো ক্ষুদ্রার্থে বুদ্ধিজীবী বলা যাবে, কিন্তু বৃহৎ অর্থে বা কার্যত তিনি বুদ্ধিজীবী নন। কার্যত তিনিই বুদ্ধিজীবী, যিনি দেশ ও মানুষের স্বার্থের প্রশ্নে ক্ষমতাকে নির্ভয়ে প্রশ্ন করেন। যার কথা ও লেখা জাতিকে পথ দেখায়। বিপদে ভরসা জোগায়। সংকট উত্তরণে সহায়তা করে। অর্থাৎ যাদের জ্ঞান, চিন্তা ও প্রজ্ঞা দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণে আসে, তারাই বুদ্ধিজীবী।

তিনি বুদ্ধিজীবী নন, যিনি ক্ষমতাকাঠামোর মধ্যে থেকে যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে সুন্দর সুন্দর কথা বলেন এবং ক্ষমতাকাঠামোর সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে চুপ থাকেন বা অন্যায়ের পক্ষে কথা বলেন। প্রশ্ন হলো, সেই অর্থে এই সময়ের বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী কারা এবং সেই সংখ্যাটি কেমন?

সাম্প্রতিক বছরগুলোয়, বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়া বিপ্লবের পরে গালাগালি আর হুমকি ধমকির ভয়ে কিংবা কখনও ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা এবং কিছু নগদ সুবিধার লোভে বুদ্ধিজীবীরা সাধারণত সরকারের বিভিন্ন কাজ, নীতি ও পরিকল্পনার সমালোচনা করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকেন। একধরনের সেলফ সেন্সরশিপ বা স্বনিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন।

বস্তুত একটি সমাজ বা রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক অর্থাৎ সেই সমাজে গণতন্ত্রের চর্চা আসলেই কতটুকু আছে, তার প্রধান মানদণ্ড হচ্ছে সেখানে ভিন্ন মতের চর্চা কতটুকু আছে। কিন্তু রাষ্ট্র যদি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে যেখানে ভিন্নমত মানেই শত্রুপক্ষ—তখন সেখানে বুদ্ধিজীবীরা নানাভাবে আক্রমণের শিকার হতে পারেন।

এই বিতর্কটি বহু পুরনো যে, একজন প্রকৃত বুদ্ধিজীবীর কি রাজনৈতিক পক্ষপাত বা কোনও মতাদর্শের প্রতি আনুগত্য থাকতে পারে? নিশ্চয়ই পারে। কিন্তু শর্ত হলো সেই পক্ষপাত ও আনুগত্য দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থে হতে হবে। রাজনৈতিক পক্ষপাত ও আদর্শের কারণে তিনি যদি দেশ ও মানুষের বিপক্ষে দাঁড়ান বা তার সেই পক্ষপাত যদি দেশের জন্য অকল্যাণকর হয়, তাহলে তিনি আর বুদ্ধিজীবী থাকেন না। তিনি তখন দলীয় কর্মী অথবা পক্ষপাতদুষ্ট বুদ্ধিজীবী।

একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, একজন সাংবাদিক, একজন চিন্তাশীল লেখকের লেখা ও বক্তব্যের সঙ্গে যদি একজন রাজনৈতিক কর্মী বা ক্যাডারের বক্তব্যের কোনও পার্থক্য না থাকে; টেলিভিশনের টকশোতে যদি বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত মানুষেরাও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ভাষায় ও ঢংয়ে কথা বলতে থাকেন—তাহলে তাকে বুদ্ধিজীবী বলার সুযোগ নেই।

একজন প্রকৃত বুদ্ধিজীবী তার রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকা সত্ত্বেও সঠিক সময়ে সঠিক কথাটি নির্ভয়ে বলেন ও লেখেন। কারো পক্ষে নিয়ে লিখলেও তিনি ফ্যাক্ট বা তথ্য বিকৃত করেন না। কিন্তু এই সময়ের বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত অনেকের বিরুদ্ধেই তথ্য বিকৃত করা বা তথ্য গোপন করে বিশেষ কোনও গোষ্ঠীর পক্ষে সাফাই গাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। যাদের মূল উদ্দেশ্য ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা নয়, বরং ক্ষমতাকে প্রশ্নহীন রাখা।

সমাজে বুদ্ধিজীবী বলতে শিক্ষক, সাংবাদিক, লেখকদের এমন একটি অংশকে বোঝানো হয়, যারা সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জনগণের পক্ষে (সরকারের বিপক্ষে গেলেও) কথা বলেন ও লেখেন। কিন্তু এখন শিক্ষক ও সাংবাদিকদের বড় অংশই নিশ্চুপ অথবা তারা দীর্ঘদিন ভয়ের সংস্কৃতির ভেতরে বসবাসের কারণে হয় জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে চুপ থাকেন অথবা ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’র তত্ত্ব মেনে এমনভাবে কথা বলেন ও লেখেন, যা আখেরে কোনও সমাধান দেয় না। অনেকে সরাসরি ক্ষমতার পক্ষেই দাঁড়ান। এখানে কখনও যেমন ভয় কাজ করে, তেমনি জাগতিক নানা স্বার্থ বা লোভও থাকে। সবার পক্ষে লোভের ঊর্ধ্বে ওঠা কঠিন। আবার যারা এসব লোভ ও ভয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে থাকতে চান, তাদের অনেককেই নানারকম জটিলতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়।

অনেক সময় সুশীল সমাজ ও অ্যাকিভিস্টদেরকে আমরা বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলি। রাষ্ট্রে সুশীল সমাজ বা নাগরিক সমাজ কিংবা ড. আকবর আলি খানের ভাষায় সিভিল সমাজের ভূমিকাও অনেক। কিন্তু নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সবাই বুদ্ধিজীবী নাও হতে পারেন। আবার একটি নাগরিক সংগঠনের ভেতরে এক বা একাধিক বুদ্ধিজীবী থাকতে পারেন। অনেক বুদ্ধিজীবী মিলেও একটা নাগরিক সংগঠন বা ঐক্য গড়ে তুলতে পারেন।

ইংরেজি ‘সিভিল সোসাইটি’র যে বাংলা করা হয় সুশীল সমাজ, অনেকে সেটিকে পুরসমাজ, অরাষ্ট্রীয় সমাজ, জনসমাজ, লোকসমাজ বলতে পছন্দ করেন। তবে হালে বেশি প্রচলিত নাগরিক সমাজ। যদিও নাগরিক কারা এবং সংবিধান রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার মালিকানা যে জনগণ বা নাগরিকদের দিয়েছে, সেই ক্ষমতা কাঠামো ও প্রয়োগ নিয়েও বিস্তর বিভ্রান্তি ও জটিলতা রয়েছে। আর এইসব বিভ্রান্তি ও জটিলতা নিয়ে প্রশ্ন করাই বুদ্ধিজীবীর কাজ।

নাগরিক সমাজ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে দাবি-দাওয়া জানাতে পারে। প্রতিবাদ করতে পারেন। মিছিল সমাবেশ মানববন্ধন করতে পারে। এটা একধরনের অ্যাক্টিভিজম। ফলে তাদেরকে অ্যাক্টিভিস্ট বলাই ভালো। কিন্তু যখন কাউকে সুনির্দিষ্টভাবে বুদ্ধিজীবী বলা হবে, সেখানে প্রাধান্য পাবে তার মেধা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, চিন্তা ও দর্শন এবং সমাজের মানুষের ওপর তার প্রভাব।

কেউ একজন খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা বললেন, কিন্তু রাষ্ট্র তো বটেই, সাধারণ মানুষও আমলে নিলো না, তাতে ওই কথাটি যতই পাণ্ডিত্যপূর্ণ কিংবা চিন্তাশীল হোক না কেন, তাকে বুদ্ধিজীবী বলা যায় না। সমাজে যার কথার গুরুত্ব আছে, যিনি কোনও প্রশ্ন করলে ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা নড়েচড়ে বসেন, তারাই বুদ্ধিজীবী। যেকেউ নিজেকে বুদ্ধিজীবী বলে ঘোষণা করলেই কিংবা শিল্প সংস্কৃতি অঙ্গনের কোনও একটি ছোট গ্রুপ কাউকে বুদ্ধিজীবী উপাধি দিলেই তিনি বুদ্ধিজীবী হয়ে যান না।

মনে রাখা দরকার, প্রশ্নহীন সমাজের গন্তব্য অন্ধকার। আর কোনও দেশের বা জাতির অন্ধকার দূর করতে প্রধান ভূমিকা রাখতে হয় বুদ্ধিজীবীদের। কিন্তু বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিগণ যদি প্রশ্ন করা ছেড়ে দেন; যদি তারা প্রশ্ন করতে ভয় পান অথবা রাষ্ট্র যদি তাদেরকে ভয় পাইয়ে দিতে সক্ষম হয়—তাহলে তাকে বুদ্ধিজীবী না বলাই শ্রেয়।

একজন শিক্ষক, একজন সাংবাদিক, একজন লেখক যদি তার কথা বলা কিংবা লেখার কারণে, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার কারণে কোনও ধরনের হুমকির সম্মুখীন হয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হন; নিজেকে গুটিয়ে নেন; আপস করেন কিংবা বিবিধ রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও পুরষ্কারের লোভে সত্য গোপন করেন কিংবা মিথ্যার পক্ষে দাঁড়ান অথবা ইনিয়ে-বিনিয়ে খারাপ জিনিসের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন—তাহলে তাকে বুদ্ধিজীবী বলার সুযোগ নেই। তিনি হতে পারেন খ্যাতিমান শিক্ষক। হতে পারেন বিদগ্ধ সাংবাদিক কিংবা জনপ্রিয় লেখক। কিন্তু বুদ্ধিজীবী হিসেবে তাঁর যে প্রধান দায় ও দায়িত্ব—ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা; অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা; সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলা—সেই কাজটি করতে না পারলে তিনি আর যা-ই হোক, নিজেকে বুদ্ধিজীবী বলতে পারেন না। আমরাও তাকে বুদ্ধিজীবী বলতে পারি না।

লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে বার্সাকে কাঁদিয়ে সেমিফাইনালে পিএসজি
চ্যাম্পিয়নস লিগঅবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে বার্সাকে কাঁদিয়ে সেমিফাইনালে পিএসজি
গাজীপুরে ব্যাটারি কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণে চীনা প্রকৌশলীর মৃত্যু, অগ্নিদগ্ধ ৬
গাজীপুরে ব্যাটারি কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণে চীনা প্রকৌশলীর মৃত্যু, অগ্নিদগ্ধ ৬
নারিনকে ছাপিয়ে বাটলার ঝড়ে রাজস্থানের অবিশ্বাস্য জয়
নারিনকে ছাপিয়ে বাটলার ঝড়ে রাজস্থানের অবিশ্বাস্য জয়
সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে দুই কৃষকের মৃত্যু
সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে দুই কৃষকের মৃত্যু
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ