গ্যাং নয়, স্মার্টফোন নয়: লড়াইটা এবার বাবা-মায়ের!

Send
শারমিন শামস্
প্রকাশিত : ১৪:৩৫, জানুয়ারি ১৬, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০৯, জানুয়ারি ২৯, ২০১৭

শারমিন শামস্কী ভয়ংকর একটা খবর! উত্তরায় কিশোর গ্যাংয়ের নিজেদের মধ্যে রেশারেশির জেরে প্রকাশ্যে ক্লাস এইটে পড়া একটা বাচ্চা ছেলেকে কুপিয়ে মেরে ফেলেছে আরও কিছু কিশোর তরুণ। এই খবরের সূত্র ধরে একের পর এক বেরিয়ে আসছে বীভৎস সব তথ্য। এই কিশোরেরা নাকি গ্যাং বানায়, এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে, নিরীহ মানুষকে নাজেহাল থেকে শুরু করে মাদকের নেশা, ছিনতাই, ইভ টিজিং কোনও অপকর্মই বাদ নেই। এদের সবার বয়স তেরো চৌদ্দ থেকে বিশ বাইশ। সবাই সদ্য কিশোর, সদ্য তরুণ। কী আশ্চর্য! এদের এত ক্ষমতা! এরা উত্তরার মতো একটা এলাকায় ত্রাস আর আধিপত্যের ধারা চালু করেছে? তাহলে বড়রা কী করে? তাদের বাবা মা শিক্ষক প্রতিবেশি- এরা কী করে? চেয়ে চেয়ে দেখে? এদের বাড়িতে এদেরকে কি চোখে দেখা হয়? এরা তো শৈশবও পেরোয়নি ঠিকমত।
আদনান নামের যে ছেলেটিকে মেরে ফেলেছে, তার ছবি দেখলাম। নিতান্ত শিশুসুলভ মুখ। কিন্তু পোশাকের স্টাইল আর তাকানো, বসার ভঙ্গি দেখে বোঝা যায় নানা কায়দা রপ্ত করতে ব্যস্ত ছিল সে। অন্তত ওই তাকানোর দৃষ্টি কোনও সদ্য শৈশব পেরোনো কিশোরের হতে পারে না। আমি বহুক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। এই বাচ্চাটা নাইন স্টার গ্যাংয়ের সদস্য ছিল। ওইসব অপকর্ম সেও কিছু না কিছু করেছে। আজ যে মা কান্নায় ভেসে যাচ্ছেন, হয়তো সেই মায়ের হাত সে ছেড়ে দিয়েছে বহু আগে। অথচ এখনও ভাত খেয়ে মায়ের আঁচলেই মুখ মোছার বয়স তার। তবে? ভুলটা কোথায় হলো? কেন হলো?

কিছুদিন আগে আরেকটা খবর আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। নতুন মোটরসাইকেল কিনে না দেওয়ায় বাবা মায়ের গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল কিশোর ছেলে মুগ্ধ। ছেলেটিকে বাপ মা আগে সাত লাখ টাকা মূল্যের মোটরসাইকেল কিনে দিয়েছিলেন। তারপর সেই ছেলে আরও দামী মোটরসাইকেল দাবি করে। সেটি না পেয়ে রেগে গিয়ে বাপ-মাকে পুড়িয়ে দেয় ছেলে। বাবাটি মারা যান। ছেলেটির এখন কী অবস্থা আমার জানা নেই।

আমি খুব অবাক হয়ে ভাবি, ঠিক কোন পর্যায়ে চলে গেলে এরকম সব মারাত্মক ঘটনা ঘটে! সন্তানের দিকে কতটা অমনোযোগী হওয়ার পর আদনান, মুগ্ধর মতো ছেলে তৈরি হয়! আমরা দেখেছি, জঙ্গিবাদেও জড়িয়ে পড়েছে এই অল্প বয়সী কিশোর তরুণরা। দীর্ঘদিন ধরে তারা নানাভাবে জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত হয়েছে, তাদের আচরণ বদলে গেছে, তাদের ঘরে ফেরার সময় পাল্টে গেছে, অথচ বাবা-মাই টের পায়নি। এটা কিভাবে হয়? কেন হয়? বাবা-মা তবে ব্যস্ত থাকেন কিসে? কোন সে মহার্ঘ্য বস্তু যা সন্তানের চেয়ে বেশি তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে? সন্তানকে সময় না দিতে পারার, সঙ্গ না দিতে পারার ক্ষতি তারা কি সাত লাখ টাকা দামের মোটরসাইকেল দিয়ে পুষিয়ে দিতে চান? সেই ক্ষতি কি পুষিয়ে দেওয়া যায়? নাকি তার বদলে মুগ্ধ অথবা ঐশির জন্ম হয়, যারা নিজের বাবা মায়ের হন্তারক হয়ে ওঠে?

আজকাল অনেক শিশুকে দেখি, বলতে গেলে একটা বিশাল অংশ, যারা ছোট্টবেলা থেকেই স্মার্টফোনে আসক্ত। দেড় দুই বছরের বাচ্চা বাবা মায়ের ফোন নিয়ে গেইম ডাউনলোড করে খেলছে। বাবা-মা ভীষণ গর্বিত। সেই বাচ্চারা নিজের বাসায় সারাক্ষণ ফোনে মুখ গুঁজে পড়ে থাকে। এমনকি আত্মীয় বন্ধুর বাড়িতে গিয়েও ফোনখানা নিয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ করে খেলতে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তার বদলে বাবা মা কী পায়? পায় নিরবিচ্ছিন্ন আড্ডার সুযোগ। সন্তান তাদেরকে বিরক্ত করে না। তার বদলে ভবিষ্যতে বাবা মা আরও কী পায়? পায় এমন একটি ছেলে বা মেয়ে যে প্রযুক্তি ও পণ্য আসক্ত, কল্পনাশক্তিহীন এবং বইপাঠে অনিচ্ছুক। আজ যে স্মার্টফোনটা সে ব্যবহার করে, কাল নতুন ফোনের জন্য তার বায়না খুব স্বাভাবিক। আজ সে বাচ্চাটির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করার কোনও কারণ নেই, তারই একাধিক অ্যাকাউন্ট থাকে ফেসবুক টুইটারে। আর বাবা মা আনন্দে - আমার সন্তান প্রযুক্তি ব্যবহারে পারদর্শী!

যে বয়সে সন্তানের হাতে তুলে দেওয়ার কথা রঙবেরঙের বই, রঙিন পেন্সিল, সেই বয়সে তারা তুলে দেন স্মার্টফোন। কারণ কী? কারণ হলো, রঙিন বই, খাতা আর রং পেন্সিল দিয়ে বসিয়ে দিলেই হয় না, সেগুলো ব্যবহারের সময় সন্তানের পাশে থেকে তাকে সময় দিতে হয়। কিন্তু স্মার্টফোনে তো তা না করলেও চলে। ফলে ফোনটি তার হাতে দিয়ে নিজেদের জগতে চলে যাওয়া খুব সহজ। কিন্তু তারা জানেনও না, কত বড় ক্ষতি তারা সন্তানের করেন।

আমরা যখন ছোট ছিলাম, স্কুলে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইপড়া কর্মসূচিতে অংশ না নিলে আমাদের প্রাণ আঁইঢাই করতো। পাড়ার লাইব্রেরিতে যেতাম। বইয়ের দোকানে গিয়ে খোঁজ নিতাম বারবার কবে আসবে তিন গোয়েন্দার নতুন বই। বিলাসহীন একটা জীবন। সামর্থ্যবান ঘরের সন্তানরাও এভাবেই চলতো। ঈদে নতুন জামা জুতা পেতাম। অন্য সময় দরকার না হলে জামা কেনাই হত না। আজ আমাদের সন্তানদের ওয়ারড্রোব উপচে পড়ে পোশাকে, জুতায়, এক্সেসরিজে।

আমি খুব দমবন্ধ করা কষ্ট নিয়ে দেখি এই নতুন জীবন যাপন। যে ছেলেগুলো গ্যাং গড়েছে, তাদের গড়েছে কারা? যারা দিনের পর দিন যা ইচ্ছে তাই করেছে, তাদের বাবা মায়েরা, শিক্ষকেরা কি নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছেন? মা মানে কি জরায়ুতে কয়েক মাস রেখে তারপর নাইয়ে খাইয়ে প্রতিপালন? নাকি মা মানে সন্তানের আত্মার অংশ হয়ে যাওয়া? বাবা মানে কি জন্মদাতা? পোশাক, খাবার, লেখাপড়া আর শখের জোগানদার? নাকি বাবা মানে সন্তানের সবচেয়ে নির্ভরতার জায়গা, তার বন্ধু, কোনটা?

আমি জানি না। এই অস্থির, অশান্ত নগরে, স্বার্থপর দূষিত সমাজে কোন দুঃসাহসে সন্তানের প্রতি এত বেখেয়াল আর নির্লিপ্ত হতে পারেন বাবা মায়েরা? যে দেশে আইনের শাসন নেই, যে সমাজ থেকে উধাও হয়েছে নীতিবোধ, মূল্যবোধের শিক্ষা, সেই সমাজে তারা কোন আত্মবিশ্বাসে সন্তানকে মাত্র তেরো চৌদ্দ বছর বয়সে চোখের আড়াল, মনের আড়াল করে দেন?

আমি জানি, অনেক চেষ্টা, অনেক কষ্টের পরও অনেক বাবা মায়ের সন্তান সব ধরনের সোহাগ আর শাসনের দড়ি ছিঁড়ে ঢুকে পড়ে অন্ধকারে জগতে। কিন্তু তারপরও সেই বাবা মায়েরা, পরিবারের লোকেরা প্রাণপন চেষ্টা করেন তাকে ফেরাতে। আমার দেখা এমন পরিবার অনেক আছে, যে পরিবারের ছেলেটি বা মেয়েটি বাবা মায়ের অক্লান্ত চেষ্টা আর পরিশ্রমে ফিরে এসেছে মাদকাশক্তির পথ থেকে। আজ যে আঁধার ছেয়ে ফেলেছে আমাদের, সেই আঁধারে ডুবে যাওয়া সবচেয়ে সহজ আমাদের সন্তানদের পক্ষে। সন্তানকে সেই আঁধারের করাল গ্রাস থেকে বাঁচাতে বাবা মাকে বুঝতে হবে, শিক্ষিত হতে হবে। চাকচিক্যময় কৃত্রিম আলোকে যদি তারাই মনে করেন জীবন, আর সেই মরীচিকার পেছনে যদি তারাই ছোটেন, তবে সন্তানটিও একই পথে যাবে। আর এই মরীচিকার শেষে অন্ধকার পরিণতি ছাড়া আর কিছু নেই। এই সহজ সত্য যদি তারা উপলব্ধি করতে না পারেন, তবে সামনে আরও ঘোর অন্ধকার। যে সহজ সরল জীবন যাপনের পথে একদিন হেঁটেছি আমরা, আজ প্রয়োজন তাকে ফিরিয়ে আনা। সেই বইপড়া, সেই লাইব্রেরি, সেই পাড়ায় পাড়ায় স্পোর্টস আর বনভোজন, গোল্লাছুট আর দাড়িয়াবান্ধা। সেই মধুর শৈশব কৈশোর যা আমরা যাপন করে এসেছি, যেখানে ছিল কৈশোরের সরলতা আর বাবা মায়ের বন্ধন, তাকে ফিরিয়ে আনতে হবে আমাদের। সময় দিতে হবে সন্তানকে। বদলাতে হবে আমাদের নিজেদের জীবনধারাও। একই টেবিলে বসে বাবা মা সন্তান তিনজনের হাতে তিনটি মোবাইল ফোনে ঝুঁকে থাকার দৃশ্য কোনও সুস্থ জীবন নয়। আমাদের সন্তানদের বিভীষিকাময় অন্ধকার পথ থেকে আলোতে আনতে আমাদেরই লড়তে হবে এই নতুন লড়াই। আর তা না হলে বারবার দেখতে হবে আদনানের মায়ের কান্না আর গরাদের আড়ালে ঐশির বিপন্ন বিষণ্ন মুখ!

লেখক: প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ