কী হবে আগামী নির্বাচনের ফলাফল?

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৪:২৪, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২৮, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৮

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীএকাদশ সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ১৭ দিন বাকি। ভালো ভালো’য় এ পর্যন্ত এগিয়েছে। সামনে ভালো যাবে কিনা বলা মুশকিল। নির্বাচনি প্রচারের প্রথম দিনে আওয়ামী লীগের দুইজনকে হত্যা করেছে বিএনপি-জামায়াত। আর আওয়ামী লীগের লোকেরা মির্জা ফখরুলসহ অনেকের নির্বাচনি প্রচার কাজে হামলা করেছে। বাকি কয়টা দিন শেষে ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ নির্বাচনটা অনুষ্ঠিত হলে জাতি এক মহা-ক্রান্তিকাল অতিক্রম করলো বলে আমরা ধরে নেবো। নির্বাচনটা মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কারণ, সব দলই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। দশ বছর পর মুখোমুখি প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি।
এই রাষ্ট্রটাকে জন্মলগ্ন থেকে বহু দুর্যোগ পোহাতে হয়েছে। দুর্যোগ পোহাতে হয়েছে রাজনীতিবিদের কল্পনা বিলাসী কর্মকাণ্ডের কারণে। বাংলাদেশটার যখন জন্ম হয় তখন ভারতের পশ্চিম বাংলায় নকশাল আন্দোলন তুঙ্গে। নকশাল আন্দোলনের নেতারা তরুণ প্রজন্মের একটা অংশকে বোঝালেন যে গণতান্ত্রিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে তারা বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজের খোলনলচে পালটে দেবেন। পশ্চিম বাংলার প্রেসিডেন্সি কলেজের ৬০ শতাংশ ছাত্র নকশাল আন্দোলনে যোগদান করেছিল। সবচেয়ে মেধাসম্পন্ন ছেলেরাই এই প্রেসিডেন্সি কলেজে লেখাপড়া করতো। তারা পুলিশ খুনের নেশায়, জোদ্দারের মাথা কাটার ভাবনায় হারিয়ে গেল বনে-বাদড়ে।

আমরা যখন ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে যাই তখন পশ্চিম বাংলার রাজনৈতিক অবস্থাটাই ছিল অনুরূপ তমশাচ্ছন্ন। ইন্দিরা গান্ধীর সরকার প্রথম প্রথম বাঙালি যুবকদের অস্ত্র দিতে চায়নি– সে অস্ত্র নকশালীদের হাতে গিয়ে পড়ে, এই ভয়ে। শতভাগ জাতীয়তাবাদী এরূপ নিশ্চিত না হলে অস্ত্র দেওয়া নিষেধ ছিল। কলকাতায় মওলানা ভাসানীকে নজরদারিতে রাখার যে কথা প্রচারিত আছে তাও এই কারণেই।

যখন ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলো আর সবাই দেশে ফিরে আসলো তখন ‘কাকাবাবুদের’ থেকে বিপ্লবের দীক্ষা নিয়ে কিছু ‘দাদাবাবু’ বাংলাদেশে উদ্ভব হলো। তারা ছয় মাসের মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে দ্বিধাবিভক্ত করে প্রথমে পৃথক ছাত্রলীগ গঠন করলো, ক’ মাস পরে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল গঠন করে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কায়েমের পথ ধরলো। আবার অন্যদিকে আব্দুল হক, মোহাম্মদ তোয়াহা, আবদুল মতিন, আলাউদ্দীন, দেবেন সিকদার আর সিরাজ সিকদার বিপ্লব সংগঠিত করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ আরম্ভ করলেন।

যুদ্ধবিধ্বস্ত একটা দেশকে পুনর্গঠনের কোনও সুযোগই দিলেন না তারা সরকারকে। নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন বলেছেন খাদ্যশস্য চলাচলের পথ নির্বিঘ্ন না হলেও দুর্ভিক্ষ হয়। একে তো খাদ্য শস্যের ঘাটতি, তারপর বিধ্বস্ত রাস্তাঘাট- দুর্ভিক্ষ তো হতেই পারে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের কারণ মূলত এটাই। বিপ্লববাদীরা পাটের গুদামে আগুন দেওয়া আরম্ভ করলেন। তখন বাংলাদেশে একমাত্র বিদেশি মুদ্রা আসতো পাটখাত থেকে। মনে হচ্ছিলো পাঠখাতকে ধ্বংস করার এক সুপরিকল্পিত পকিল্পনা বিপ্লবীরা হাতে নিয়েছিলেন।

আবার উত্তরবঙ্গে জোদ্দারদের গলা কাটার কাজও আরম্ভ করেছিলেন। শুনেছি আত্রাইতে বিপ্লবীদের ওপর বোমা বর্ষণও করতে হয়েছিল। অবশ্য রক্ষীবাহিনীর আক্রমণের কথাই সবাই জানেন। বিরোধী পক্ষ যখন সীমা লঙ্ঘন করে রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে বিপন্ন করার চেষ্টা করে তখন রাষ্ট্রকে কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থায় অবতীর্ণ হতে হয়। একনায়কতন্ত্রী বাকশালের জন্ম হয়েছিল সে কারণেই। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রীদের আর বিপ্লবীদের তৎপরতাতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পটভূমিকা তৈরি হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পরে খন্দকার মোশতাক অধ্যাদেশ জারি করে বাকশাল ব্যবস্থা রহিত করে বহুদলীয় ব্যবস্থা ফিরিয়ে এনেছিলেন সত্য, তবে চতুর্থ সংশোধনীতে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা অক্ষুন্ন রেখেছিলেন, যে কারণে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতিই একক ক্ষমতার মালিক ছিলেন।

১৯৯১ সালে ষষ্ঠ সংসদ প্রতিষ্ঠিত হলে দেশে পুনরায় সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। সে থেকে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারের শুরু এবং তা এখনও অব্যাহত আছে।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরের ৩০ তারিখ একাদশ সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। মনোনয়নপত্র দাখিল, যাচাই-বাছাই প্রত্যাহার, মার্কা বিতরণ সব কর্মকাণ্ড শেষে ১১ ডিসেম্বর থেকে প্রচারণার কাজ শুরু হয়েছে, তা চলবে ২৮ তারিখ পর্যন্ত। এই নির্বাচনে মূলত সব দলই আওয়ামী ধারা এবং বিএনপি ধারায় বিভক্ত হয়ে নৌকা এবং ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছে। লাঙ্গল নিয়ে এরশাদের জাতীয় পার্টিও প্রায় ১৭০ আসনে নির্বাচন করছে। আওয়ামী জোট আর বিএনপি জোটের বাইরে শুধু দলীয় পরিচয়ে প্রায় সব আসনে হাতপাখা প্রতীকে নির্বাচন করছে চরমোনাইর পীরের দল ইসলামিক আন্দোলন। অবশ্য বামপন্থীরাও একটা জোট গঠন করে ১২০ আসনে নির্বাচন করছে কিন্তু মার্কা তাদের এক নয়– মই, কাস্তে, কোদাল। এখন একাদশ সংসদ নির্বাচনে মোট বৈধ প্রার্থী আছেন ১৭৪৫ জন। এরমধ্যে ১৬৪৯ জন দলীয় প্রার্থী আর অবশিষ্ট ৯৬ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী। এ হচ্ছে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরুর সময়ে নির্বাচনের দৃশ্য। এখন প্রচারণায় ডুবে যাচ্ছে গোটা দেশ।

কী হবে আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনের ফলাফল, সে চিত্র এখনও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। তবে নির্বাচনে দুই জোটের মাঝে তুমুল লড়াই হবে। লড়াইয়ের তীব্রতার কারণে নির্বাচনে হয়তোবা হানাহানির পরিমাণও বাড়বে। ইতোমধ্যে সেই লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বিএনপিতে নেতৃত্বের সংকট ছিল। আপাতত তারা ড. কামাল, আ স ম রব, কাদের সিদ্দিকী ও মাহমুদুর রহমান মান্নাকে নিয়ে জোট গঠন করে তা কেটে উঠেছে। বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন জেলে, তারেক জিয়াও অনেকটা নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন লন্ডনে। তাদের দুইজনের অবর্তমানে দলের স্থায়ী কমিটির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে দল মোটামুটি ভালোই চলেছে।

দলীয় চেয়ারম্যান বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য বিএনপি জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। তারা যদি একটা আন্দোলনের ঢেউ তুলতে পারতো তবে নিশ্চিত তার প্রভাব পড়তো নির্বাচনের ফলাফলে। এখন তা থেকে তারা বঞ্চিত হবে। নেতৃত্বের অভাব কতটুকু পূরণ করা যায় ড. কামাল, আ  স ম রব আর কাদের সিদ্দিকীকে দিয়ে তা বলা যাচ্ছে না। ড. কামাল অসুস্থ মানুষ, সারাদেশ চষে বেড়ানো তার পক্ষে সম্ভব হবে না। আ  স ম রব নিজে নির্বাচন করছেন। যতটুকু খবর নিয়েছি, তার অবস্থান এলাকায় ভালো নয়। বিএনপি কর্মীরা নাকি তার জন্য কাজ করবে না। সুতরাং নিজের এলাকায় রবকে প্রচুর সময় দিতে হবে।

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ঋণখেলাপি হয়ে নির্বাচন না করলেও তার মেয়ে কুঁড়ি সিদ্দিকী নির্বাচন করবে। তার মেয়ের নির্বাচন ফেলে বাইরে যাওয়া হয়তো তার পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে। তার লেখায় দেখি তিনি তার সন্তানদের কথার প্রসঙ্গ উঠলেই আত্মহারা হয়ে যান। তার মেয়ে কুঁড়ি সিদ্দিকীকে নির্বাচনি ময়দানে একা ফেলে তিনি কখনও কোথাও যাবেন বলে মনে হয় না। আর মানুষের কাছে ড. কামাল আর আ  স ম রবের কথার যে আবেদন সে আবেদন ও গুরুত্ব বঙ্গবীরের কথায় এখন আর নেই। সুতরাং বিএনপির প্রার্থীদের স্বল্প সময়, অগোচালো মাঠ আর নেতৃত্ব শূন্যতার মাঝেই নির্বাচন করতে হবে। তাতে আশাপ্রদ ফলাফল প্রত্যাশা করা কঠিন হবে বলে মনে হয়।

আওয়ামী লীগ দশ বছর টানা ক্ষমতায়। সুতরাং তাদের হাতে যেমন অনেক সুবিধা ভোগ করার উপাদান রয়েছে তেমনি প্রতিকূলতা মোকাবিলা করারও বহু বিষয় রয়েছে। টানা ক্ষমতা থাকার কারণে তারা স্বাভাবিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধিতার সম্মুখীন হবে। অবশ্য একটা সুবিধা আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা পাবেন যে, তাদের নেত্রীর কোনও দুর্নাম নেই। দেশের মানুষ তার নেতৃত্বের প্রতি আস্থা পোষণ করেন। মতভেদ না করে প্রতিটি কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করলে তাদের প্রার্থীদের পরাজয়ের কোনও সম্ভাবনা থাকবে না।

গত দুই সংসদের এমপিরাই তাদের প্রার্থী। তারা গত দশ বছরব্যাপী এলাকার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সুতরাং তাদের সঙ্গে নতুন মানুষ এসে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সুবিধা করার কথা নয়। সর্বোপরি ৭০ কেন্দ্রে বিএনপির প্রার্থী খুবই দুর্বল বলে মনে হলো। বিএনপির নমিনেশন বোর্ড কি মনে করেছেন যে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের মতো কলাগাছও পাস করে যাবে? বিএনপি এত আত্মবিশ্বাসী হতে গেলো কেন কী জানি? তাদের তো প্রার্থীর অভাব ছিল না।

অনেকে বলছেন বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচন করবে না। আবার জাতীয় পার্টি জোটবদ্ধ ২৭ প্রার্থী ছাড়াও দেড় শতাধিক প্রার্থী দিয়েছে। আওয়ামী লীগ তাতে দ্বিমত করেনি বরং বলছে বিএনপি নির্বাচন না করলে তাদের প্রয়োজন হবে। আবার দেখছি যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত চিফ ইলেকশন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। ঐক্যফ্রন্টের এক নেতাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম অবস্থা সম্পর্কে। তিনি বললেন ১৮ তারিখ পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে নির্বাচন বানচাল করার একটা ষড়যন্ত্রও আছে। উভয় জোটের উচিত নির্বাচন বানচালের যেকোনও ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা। মানুষের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে যে উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে তাকে থামিয়ে না দেওয়া।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ