জাইমা রহমান বিএনপির নেতৃত্ব দেবেন?

Send
বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৪:৫৮, ডিসেম্বর ২০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫৬, ডিসেম্বর ২৮, ২০১৯

বিভুরঞ্জন সরকারবিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নাতনি ও দলটির  ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান সম্প্রতি লন্ডনে ব্যারিস্টারি পাস করেছেন। তিনি ব্যারিস্টার হওয়ায় দেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে কিছুটা চনমনে ভাব দেখা দিয়েছে। জাইমা দেশে ফিরে বেহাল বিএনপির হাল ধরবেন বলে জল্পনাকল্পনাও শুরু হয়েছে। জাইমা সত্যি অচিরেই দেশে ফিরবেন কিনা, কিংবা ফিরলেও তাকে রাজনীতিতে যুক্ত হতে তার বাবা অনুমতি দেবেন কিনা, সে সব বিষয় এখনও অস্পষ্ট। মেয়ের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা সম্পর্কে তারেক এখনও মুখ খোলেননি। তবে জাইমা জিয়া পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের সদস্য হওয়ায় তার রাজনীতি করা না-করা নিয়ে আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। এছাড়া জিয়া পরিবার এখন রাজনৈতিকভাবে চরম দুর্দিন অতিক্রম করছে বলে একজন ত্রাতাও খোঁজা হচ্ছে দলটির জন্য।
বিএনপিতে বিকল্প নেতৃত্ব নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে কিছু আলোচনা ইদানীং শোনা যায়। খালেদা জিয়া এখন কারাগারে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের বাইরে। ‘পলাতক' হিসেবে লন্ডনে থেকে তিনি দল পরিচালনা করছেন। কিন্তু এভাবে প্রবাসী নেতৃত্ব দিয়ে বিএনপির মতো একটি বড় দল পরিচালনা করা কঠিন। বিএনপির সিনিয়র নেতারা বিষয়টি উপলব্ধি করলেও প্রকাশ্যে বলতে পারেন না। দলের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির পাঁচটি পদ শূন্য রয়েছে। বিভিন্ন টানাপড়েনের কারণে এই শূন্যস্থান পূরণ করা যাচ্ছে না। এরইমধ্যে স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমানও দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। বিএনপির কাউন্সিল বা জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠানের কোনও উদ্যোগ-আয়োজনের খবর নেই।

সর্বোচ্চ আদালত থেকে জামিন আবেদন খারিজ হওয়ার পর বিএনপিতে নেমে এসেছে চরম হতাশা। আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার কথা বলা হলেও বাস্তবে বিএনপি আন্দোলনের অবস্থায় নেই। আন্দোলন প্রশ্নে বিএনপিতে মত-ভিন্নতা আছে। শীর্ষ নেতাদের মধ্যেও আছে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ভাবনার সঙ্গে কেন্দ্রের ভাবনার মিল নেই। ফলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সহসা কারামুক্তির সম্ভাবনা কেউ দেখছেন না। কোনোভাবে তিনি যদি জেল থেকে বাইরেও আসেন, তাহলেও তার পক্ষে দলের নেতৃত্ব দেওয়া কতটুকু সম্ভব হবে সে প্রশ্নও আছে। তার বয়স হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা তিনি অসুস্থ। গত ১৬ ডিসেম্বর পরিবারের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বেগম জিয়ার শারীরিক অবস্থার যে করুণ বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে, তা বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে হতাশাই বাড়াবে। এই অবস্থায় খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত  ইচ্ছা এবং দলীয় কর্মী-সমর্থক-শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রবল আগ্রহ থাকলেও শারীরিক অবস্থা খালেদা জিয়ার জন্য বিএনপির নেতৃত্ব দানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

তারেক রহমান দলের অনেকের কাছেই জনপ্রিয়। যদিও তাকে অপছন্দ করেন এমন লোকের সংখ্যাও বিএনপিতে কম নেই। তবে, তারা প্রকাশ্যে তারেকের বিরুদ্ধে কিছু বলেন না। তারেক রহমানের সমালোচনা বা বিরোধিতা করে কারও পক্ষে বিএনপি করা সম্ভব নয়। লন্ডনে থেকে তারেক যেভাবে দল পরিচালনা করেন, সেটাও অনেকের কাছে অপছন্দ। মুখ ফুটে কেউ কিছু না বললেও তাকে নিয়ে উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়তে শুরু করেছে। বিএনপির সহ-সভাপতি  মোরশেদ খান দল ছেড়েছেন তারেকের বিরুদ্ধে স্কাইপের মাধ্যমেও দল পরিচালনার অভিযোগ এনে। তারেকের হাত ধরে যে বিএনপি বেশিদূর যেতে পারবে না, এটাও অনেকেই বুঝতে পারছেন। সেজন্য তারেকের  নির্দেশ অমান্য করার অবস্থাও বিএনপির মধ্যে তৈরি হতে শুরু করেছে। প্রায় সবার কাছেই এটা পরিষ্কার যে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকতে তারেক রহমানের পক্ষে দেশে ফেরা সম্ভব নয়। তারেক নিজেও সেটা জানেন এবং বোঝেন। সে জন্য যেকোনও উপায়ে সরকার পতনের চেষ্টা করেছেন তিনি।  বিএনপিকে সেভাবে নির্দেশনা দিচ্ছেন তারেক । তবে এখন বিএনপির অনেকেই এটা বুঝছেন যে, যেকোনও উপায়ে সরকার পতন ঘটানো যাবে না। আবার সরকারের বিরুদ্ধে প্রবল গণআন্দোলন গড়ে তোলার বাস্তব অবস্থাও দেশে বিরাজ করছে না। খুব দ্রুত অবস্থা বদল হবে বলেও মনে হয় না।

দিন দিন বিএনপি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। গত সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ফল খুবই হতাশাজনক। নির্বাচন শতভাগ সুষ্ঠু হলেও বিএনপির পক্ষে সরকার গঠন সম্ভব হতো বলে মনে হয় না। ডাকসু নির্বাচনেও বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্র দলের ফল লজ্জাজনক। বিএনপি ক্ষমতার বাইরে থেকে এরমধ্যেই ‘ক্লান্ত’ এবং ‘অবসন্ন'। আরও কত বছর বিএনপিকে ক্ষমতার বাইরে থাকতে হবে সেটাও অনিশ্চিত।

সব মিলিয়ে বিএনপি একটি নাজুক সময় পার করছে। দলটি কবে, কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, তা কেউ বলতে পারেন না। চরম হতাশা নিয়ে বিএনপি নেতারা এখন সুদিন ফেরার আশায় বসে আছেন। তবে কীভাবে সুদিনের দেখা মিলবে তার কোনও পথনির্দেশনা তাদের সামনে নেই। তারেক রহমান যে এখন বিএনপির জন্য বোঝা,  সেটা বুঝলেও কেউ বলতে পারছেন না। দেশের ভেতরে যেমন তারেকের নেতিবাচক ভাবমূর্তি, তেমনি দেশের বাইরেও তাকে সন্দেহের চোখেই দেখা হয়। তারেককে নিয়ে প্রতিবেশী ভারতের মনোভাবও নেতিবাচক। সেজন্যই তাকে সামনে  রেখে বিএনপি বেশিদূর এগুতে পারবে বলে অনেকেই মনে করছেন না।

বিএনপি নেতাকর্মীদের কাছে জিয়া পরিবারের একটি বিশেষ মর্যাদার অবস্থান রয়েছে। খালেদা ও তারেক দুই জনই যদি নেতৃত্ব থেকে দূরে থাকেন, তাহলে বিএনপির হাল কে ধরবে, তেমন যোগ্য ‘নেতা’ কই? বিকল্প নেতৃত্ব নিয়ে বিএনপির মধ্যে আলোচনা থাকলেও তা কোনোভাবেই জিয়া পরিবারের বাইরে নয়। তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান ও আরাফত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান সিঁথিকে নিয়ে মাঝেমধ্যে আলোচনা শোনা গেলেও তা হালে পানি পায়নি। তাদের কেউ একজন নেতৃত্বে এলে বিএনপিতে নতুন হাওয়া লাগার সম্ভাবনা আছে বলে মনে করা হলেও তারা ব্যক্তিগতভাবে রাজনীতিতে নামতে আগ্রহী কিনা, তা জানা যায়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একবার জোবাইদা রহমানের রাজনীতি আগমনের খবরে তাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।

সবশেষে বিএনপির কান্ডারি হিসেবে নাম উচ্চারিত হচ্ছে তারেক-জোবাইদা দম্পতির কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের নাম। তারেক গ্রিন সিগন্যাল দিলে সেটা সম্ভব হতে পারে। তারেক কি নতুন প্রাণ প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের মেয়ের হাতে বিএনপিকে সমর্পণ করবেন? নাকি ঝড়ে বক মরার অপেক্ষায় থাকবেন?

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক

/এসএএস/এমএনএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ
X