সরকারের নতুন গৌরী সেন

Send
রুমিন ফারহানা
প্রকাশিত : ১৬:২১, ফেব্রুয়ারি ০৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৩, ফেব্রুয়ারি ০৮, ২০২০

রুমিন ফারহানাগত ৫ ফেব্রুয়ারি বিরোধী দলের তীব্র বাধার মুখে সংসদে পাস হয়ে আইনে পরিণত হলো স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ পাবলিক নন-ফিন্যান্সিয়াল করপোরেশনসহ স্বশাসিত সংস্থাগুলোর তহবিলের উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান বিল ২০২০। বিলের মূল বক্তব্য ছিল স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত ৬১টি সংস্থার তহবিলের উদ্বৃত্ত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে, যার মোট পরিমাণ ২০১৯-এর মে মাসেই ছিল ২ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। এটা জুনে গিয়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১৮ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা, অর্থাৎ এক মাসে মুনাফা এবং সুদ যুক্ত হয় প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। সুতরাং জুন থেকে জানুয়ারির হিসাব ধরলে এই টাকা এখন আড়াই লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। যদিও সরকার বলছে প্রতিষ্ঠানগুলো খরচ চালাতে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে বছরে যে টাকা লাগে, তা প্রতিষ্ঠানগুলো জমা রাখতে পারবে।
এই আইন পাসের সময় যখন বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে তীব্র ভাষায় প্রতিবাদ জানানো হয়, তখন অর্থমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, একমাত্র রফতানি বাণিজ্য ছাড়া আর কোনও অর্থনৈতিক সূচকে দেশ পিছিয়ে নেই। যদিও তার এই বক্তব্য বাংলাদেশ ব্যাংক, পরিসংখ্যান ব্যুরো, রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো কর্তৃক প্রকাশিত পরিসংখ্যানের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তাদের তথ্য মতে কেবল একটি সূচক, রেমিট্যান্স ছাড়া আর সব সূচকই নিম্নমুখী। সম্ভবত সে কারণেই তার একদিন পরেই অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের  ‘ব্রাঞ্চ ম্যানেজারদের বার্ষিক কার্যক্রম প্রণয়ন সম্মেলন ২০২০’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্বীকার করেন, ‘দেশের অর্থনীতি এখন খারাপ অবস্থায়।’ তিনি স্বীকার করেন আমদানি-রফতানি কমে যাচ্ছে, ব্যাংক খাতের অবস্থাও ভালো না। দেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি বিনিয়োগ কমেছে।   

এই আইন প্রণয়নের পেছনে সরকারের উদ্দেশ্য এবং এর প্রভাব অর্থনীতিতে কী হবে সেটা আলোচনার আগে দেশের সার্বিক অর্থনীতির চিত্রটা দেখে নেওয়া যাক।  

গত এক দশকে এই বছর প্রথমবারের মতো রফতানি আয় আগের বছরের তুলনায় ৫.২১ কমেছে। এর মূল কারণ তৈরি পোশাক খাতের রফতানি ৮ শতাংশ হ্রাস পাওয়া। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানের ওপরও। দেশের লেনদেনের ভারসাম্য গত বছরের প্রায় পুরোটা সময়েই ছিল ঋণাত্মক। এর ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমান্বয়ে কমছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ২০১৮ সালের গড় প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার, এরপর ২০১৯ সালে এই গড় ৩২ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অনেক বৈদেশিক ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার কারণে রিজার্ভের ওপর চাপ আরও বাড়বে এবং এর মধ্যেই বাজারে ডলার সংকট চলছে।

রফতানির মতোই কমছে দেশের আমদানিও যা ইতোমধ্যে ৫.২৬ শতাংশ কমেছে। আমদানি কমে যাওয়া দেশের ভোগ কমে যাওয়াকে নির্দেশ করে। এদিকে পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত সিমেন্ট, ইস্পাত, জুতা, চামড়াজাত পণ্য, নিত্য ব্যবহার্য এবং ভোগ্যপণ্য খাতের দুই একটি কোম্পানি ছাড়া প্রায় সব কোম্পানির বিক্রি কমেছে। প্রশ্ন হলো সরকারের দাবি মতো দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি এবং মাথাপিছু আয় যদি এতোই বেড়েই থাকে, তাহলে অভ্যন্তরীণ ভোগ কমছে কেন? আশঙ্কার বিষয় হলো, শিল্প স্থাপনের মূলধনি যন্ত্রপাতি এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমেছে যথাক্রমে ১২.৪৮ এবং ৬.৫২ শতাংশ। দেশের বেসরকারি বিনিয়োগ পরিস্থিতি কতটা খারাপ, সেটা এতে স্পষ্ট।

দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে ঘাটতি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। গত এক বছরে এই ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। রাজস্ব আয়ে প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলিত লক্ষ্য ৪৫ শতাংশ থাকলেও হয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ।

সরকারের রাজস্ব আয় কমে যাওয়ার ফলে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। চলতি অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ৪৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার কথা থাকলেও প্রথম ৭ মাসেই এই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ঋণ সরকার নিয়ে নিয়েছে। সরকারের এই ঋণ নেওয়া বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ অনেক কমিয়ে দেবে, যেটা বেসরকারি বিনিয়োগকে চরমভাবে ব্যাহত করবে।

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির এই দুর্দশার চিত্র ফুটে উঠেছে বৈশ্বিক সংস্থার র‍্যাংকিংয়ে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম রিপোর্টের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় বাংলাদেশ এখন ৯৫তম অবস্থানে। অথচ এর আগের বছরই বাংলাদেশ ছিল আরও ৭ ধাপ ওপরে ৮৮তম অবস্থানে।

এই বিলটি আনার যুক্তি হিসেবে দেশে ব্যাপক আর্থসামাজিক এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। ওই সকল প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতেই এই সকল প্রতিষ্ঠানের তহবিল সরকারি কোষাগারে নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই বিল দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ার এবং ধারাবাহিক দুর্নীতির এক মূর্তপ্রতীক এবং ঠিক সে কারণেই জাতীয় পার্টির মতো মহাজোটে থাকা বিরোধী দলও বিলটির তীব্র সমালোচনা করে এটি প্রত্যাহারের দাবি জানায়।

দীর্ঘদিন ধরেই এই সরকার দাবি করে আসছে দেশে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বিশাল, মাথাপিছু আয়ও অনেক বেড়েছে। তাহলে প্রশ্ন জাগে, সরকার রাজস্ব থেকেই কেন তার তথাকথিত উন্নয়নের ব্যয় মেটাতে পারছে না। বাস্তবতা হলো রাজস্ব আয় হতাশাজনক। সরকারের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গল্প যদি সঠিক হয়, তাহলে রাজস্ব বোর্ডের অদক্ষতা এবং দুর্নীতির কারণে রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। তাহলে এই ব্যাপারে সরকার কেন কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না। আর যদি রাজস্ব বোর্ড দক্ষতার সঙ্গে রাজস্ব আহরণ করে তাহলে সরকারের দাবিকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়নের গল্প একেবারেই মিছে। এর মধ্যে কোনটি সত্য, সেটা সরকারকেই স্পষ্ট করতে হবে।

সরকারি দলের সদস্যরা ছাড়া আর সকলের তীব্র বিরোধিতার মুখে যে আইনটি গত ৬ ফেব্রুয়ারি পাস হয়ে গেলো, তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হবে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো যেখান থেকে অর্থ তুলে নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তার মধ্যে যেগুলো শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত তাদের শেয়ারের মূল্য পতন হবে। কারণ তাদের এফডিআর তুলে নেওয়ার কারণে তাদের সম্পদ কমে যাবে। একই সঙ্গে এটা সেইসব শেয়ার মালিকের সঙ্গেও এক ধরনের প্রতারণা, যারা এই প্রতিষ্ঠানগুলোর এই পরিমাণ সম্পদ দেখে শেয়ার কিনেছিলেন। এছাড়া ব্যাংকগুলোতে এফডিআর কমে যাওয়ার ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার জন্য ব্যাংকগুলোর হাতে পর্যাপ্ত তহবিল থাকবে না।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ আদৌ কতটুকু? কারণ আমরা জানি, দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ বহুদিন ধরে জিডিপির ২২ শতাংশে আটকে আছে। আমরা আগেই বলেছি মূলধনি যন্ত্রপাতি এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক, যার অর্থ দাঁড়ায় দেশে শিল্পে বিনিয়োগ স্থবির না, বরং কমে আসছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থানে। যে কারণে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর রিপোর্ট অনুযায়ী কর্মহীন মানুষের সংখ্যা ৪ কোটি ৮২ লাখ (২০১৬-১৭)। উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যার দিক দিয়ে বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটি। এদেশে স্নাতক পাস করা বেকারের হার ৪৭ শতাংশ (২০১৪ সালের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের রিপোর্ট)।

সংসদে টাকা পাচারের প্রশ্ন তোলা হলে অর্থমন্ত্রী তার জবাবে বলেন আইনজীবী হওয়া সত্ত্বেও এই প্রশ্ন কী করে সুনির্দিষ্ট পরিমাণ উল্লেখ করে তোলা হলো। তাহলে কি পাচারের সঙ্গে তারাও জড়িত। বিনীতভাবে অর্থমন্ত্রীকে এটুকু জানাই, ‘অতি ভালো ছাত্র’ অর্থমন্ত্রীর মুখে এই প্রশ্ন শোভা পায় না। টাকা পাচারের পরিসংখ্যান দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি, যারা প্রতি বছর বিভিন্ন দেশের অর্থ পাচারের তথ্য প্রকাশ করে এবং বিশ্বব্যাপী এই তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

টাকা পাচার, মন্দ ঋণে বিশ্বে প্রথম স্থান (আইএমএফের রিপোর্ট অনুযায়ী আড়াই লাখ কোটি টাকা), ব্যাংকে তারল্য সংকট, বছরের শুরুতেই ব্যাংক থেকে লক্ষ্যমাত্রার অধিক ঋণ গ্রহণ, নন-ব্যাংকিং ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউটের বেহাল দশা, শেয়ার মার্কেট লুটেরাদের দখলে অর্থাৎ সব রকম আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং শেয়ারবাজার ধ্বংসের পরে এখন সরকারের চোখ গেছে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে।

দশকের পর দশক ধরে এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে টাকা জমেছে, তা থাকতেই পারতো আপৎকালীন ফান্ড হিসেবে, কিন্তু সরকার এখন এটাকেও নয়-ছয় করতে ব্যস্ত।

অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন একটি জাতীয় দৈনিককে বলেন, “অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ঠিক ভালো যাচ্ছে না। খেলাপি ঋণ কমানোর বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপগুলো উল্টো দিকে হাঁটছে। সরকারি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যক্তি খাত বঞ্চিত থাকছে। অন্যদিকে আছে অপচয়। উন্নয়নের নামে এমন সব কর্মসূচি আছে, যেগুলো বাস্তবায়িত না হওয়াই ভালো।” আয় নেই, বেসরকারি বিনিয়োগ বন্ধ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমছে, কিন্তু একটার পর একটা প্রশ্নবিদ্ধ উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়ার উদ্দেশ্যই হচ্ছে প্রকল্পের নামে সীমাহীন লুটপাট চালানো।

কথায় বলে লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন। রাজস্ব, ব্যাংক, শেয়ারবাজার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, এই সকল গৌরী সেনের পকেট খালি হওয়ার পর সরকার এখন নতুন গৌরী সেনের খোঁজে হাত বাড়িয়েছে স্বায়ত্তশাশিত প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে। কেউ কারও কাছ থেকে ঋণ করেছে কিংবা কেউ সময়মতো বেতন না পেয়ে দেনায় জর্জরিত হয়ে আছে, এমন খবর পেলেই দেদার সেই অসহায় ব্যক্তিদের অর্থ দান করতেন সপ্তদশ শতকের আলোচিত পৌরাণিক চরিত্র গৌরী সেন। এই ক্ষেত্রে গৌরী সেন তার নিজের সম্পদ স্বেচ্ছায় দিতেন ঋণগ্রস্ত কিংবা বিপদাপন্নদের। এই রাষ্ট্রের সব গৌরীসেনের মালিক রাষ্ট্র অর্থাৎ জনগণ, অর্থাৎ জনগণই প্রকৃত গৌরী সেন। আর সব জবাবদিহিহীনতার মতো এই রাষ্ট্রীয় গৌরী সেনদের কাছে থেকে টাকা নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার জনগণের মতামতের ন্যূনতম তোয়াক্কা করছে না।

নাগরিক হিসেবে আমাদের জন্য শঙ্কার বিষয় হলো তথাকথিত উন্নয়নের নামে একের পর এক রাষ্ট্রীয় গৌরী সেনদের তহবিল শূন্য করে তোলার মাধ্যমে এই পুরো রাষ্ট্রকে এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সব সূচকের অধঃপতিত অবস্থার মধ্যে নাগরিকদের উচিত হবে এই আইনটি নিয়ে আরও সচেতন হয়ে এর গুরুত্ব অনুধাবন করা এবং এই আইন বাতিল করতে জোর দাবি জানানো।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ