করোনা বিস্তারে নষ্টের মূলে অবাধ বিমানবন্দর

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৬:১৩, মার্চ ২৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:১৩, মার্চ ২৪, ২০২০

আনিস আলমগীরবাংলাদেশের লাখ লাখ লোক বিদেশে থাকে। করোনা ভাইরাসের তাড়া খেয়ে কিংবা বেড়াতে তারা নিজ দেশে আসবে, এটাই স্বাভাবিক। বিমানবন্দরে বা জল-স্থল সীমান্তে তাদের পথ আটকানোর অধিকার রাষ্ট্রের নেই। তাই প্রবাসীদের দেশে প্রবেশকালে বিমানবন্দরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রেখে হেনস্তা করাও ঠিক না। এই সময়ে তাদের সবার ভ্রমণবৃত্তান্ত রাখা, যথাযথ পদ্ধতিতে শরীর পরীক্ষা করা, কেউ যদি অসুস্থ হয় তবে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং সরকারি উদ্যোগে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন বা সঙ্গনিরোধ অবস্থানে রাখাটাই ছিল রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজ। কারণ, বাংলাদেশে কোভিড-১৯-এর প্রধান বাহক এই প্রবাসীরা এবং যারা বিদেশ ভ্রমণ করছেন তারা। বিদেশ থেকে আসা লোকদের মনিটরিং, করোনাভাইরাসে ব্যাপকভাবে আক্রান্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশের সঙ্গে দ্রুত যাতায়াত বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং দেশে করোনায় আক্রান্তদের চিকিৎসার যথাসাধ্য পর্যাপ্ত সুবিধা নিশ্চিত করাটাই ছিল করোনাভাইরাস বিস্তাররোধে প্রধান দায়িত্ব।
কিন্তু আমরা কী দেখলাম! সারা বিশ্ব যখন বিমানবন্দরে বা দেশের প্রবেশপথগুলোতে নজরদারি বসিয়েছিল, আমরা ছিলাম উদাসীন। অবাধে কোভিড-১৯ বাহকদের আসতে দিয়ে শেষ বেলায় এসে ৪টি বাদে বাংলাদেশে আসা সব আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দিনের পর দিন বিমানবন্দর, স্থল ও জলবন্দর দিয়ে যারা প্রবেশ করেছে তাদের হদিস রাখিনি, স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিনি। কোয়ারেন্টিনের কথা ভাবিনি। নিজের ঘরে কোয়ারেন্টিনের উপদেশ দিয়ে বিমানবন্দর থেকে বিদেশফেরত ও প্রবাসীদের সারাদেশে ছড়িয়ে দিয়েছি। সঙ্গনিরোধের কাজটি কেমন করে করবে, তারও কোনও নির্দেশনা তাদের হাতে দেইনি আমরা। ফলে বিদেশ থেকে এসে আত্মীয়-স্বজন বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা মারছে, বাজারে ঘুরছে, ক্রিকেট খেলছে প্রবাসীরা—এমনই সংবাদ পড়ছি আমরা। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা গেছে সদ্য বিদেশফেরত লোককে।

আসুন এই সময়ে ঢাকা বিমানবন্দর দিয়ে আসা-যাওয়া করেছে এমন একজন বাংলাদেশি যাত্রীর অভিজ্ঞতা দেখি। গোধূলি খান একজন ফটোসাংবাদিক। এক সপ্তাহর ব্যবধানে দিল্লি থেকে ঢাকায় আসা যাওয়ার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে তিনি তার ফেসবুকে লিখেছেন—“২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা এয়ারপোর্টে কেউ একবারও জিজ্ঞেস করলো না আপনার জ্বর, সর্দি, কাশি কিছু আছে কিনা, টেম্পারেচার দেখার কিছু দেখলাম না, জিজ্ঞেস করলাম উল্টা, ভাই থার্মাল টারমাল কী কাজ করে, নাকি সেটাও গেছে? ভদ্রলোক হেসে বলল, আরে আপা, চিন্তা নেই, আমাদের কিচ্ছু হবে না। নিশ্চিন্তে চলে যান। এইটায় মনে হয় সেই অন্যতম প্রতিরোধ, ‘মৌখিক প্রতিরোধ’। বোর্ডিং ব্রিজের গেট থেকে বের হওয়া পর্যন্ত কাউকে দেখলাম না এ নিয়ে চিন্তিত। শুধু দুই-তিনজন নিজ দায়িত্বে মাস্ক পরে ঘুরছেন। এক সপ্তাহ পরে ফিরে আসলাম। দিল্লি এয়ারপোর্টে নামার আগে থেকে শুরু হলো ডিটেলস ফর্ম ফিলাপ, এক একজনের দুটি করে। প্লেন থেকে নামতেই মাস্ক, গ্লোভস ও অ্যাপ্রোন পরা এটেন্টেন্ড আলাদা পথে নিয়ে গেলো স্পেশাল চেকিং এরিয়াতে, সেখানে মেডিক্যাল কর্মীরা নিজেদের সুরক্ষিত রেখে সবার ট্র্যাভেল ডিটেলস চেক করে জ্বর মেপে ছেড়ে দিচ্ছেন বা যাকে সন্দেহ হচ্ছে তাকে অন্য স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন। আসলেই আমাদের মতো ‘মৌখিক প্রতিরোধ’ ব্যবস্থা উন্নত বিশ্বের কোথাও নেই।”

এই উদাহরণ দিয়েই বুঝতে পারেন আমাদের বিমানবন্দরগুলো কতটা উদাসীন ছিল করোনাভাইরাস মোকাবিলায়। অথচ এই কাজটি করার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয় কড়া নজরদারি করতে পারতো। প্রথমে তারা বিষয়টিকে পাত্তা দেয়নি, আবার যখন আমলে নিলো তখন শুরু করলো নারী-শিশু-বৃদ্ধাসহ সবাইকে বিমানবন্দরে হয়রানি। সিদ্ধান্ত না নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রেখেছে। সর্বশেষ বিদেশ ফেরতদের গায়ে কোয়ারেন্টিন সিল মারার নামে ‘ফাজলামি’, যেই সিল বিমানবন্দরে থেকে বের হওয়ার পরপরই মুছে যায়। দরকার ছিল অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের হেল্প, প্রয়োজন হলে তা নিয়ে সমন্বয়ের মাধ্যমে বিষয়টি সামাল দেওয়া। কিন্তু বিমান মন্ত্রণালয় চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে এই কাজে। অবশেষে সর্বনাশ করে বিদেশফেরত যাত্রীদের দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সেনাবাহিনীকে।

গত বছরের ডিসেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে করোনাভাইরাসের উৎপত্তি হলেও ক্রমেই তা ছড়িয়ে পড়ছে আজ প্রায় পুরো বিশ্বে। সবকিছু ঘটছে আমাদের চোখের সামনে, আমাদের পর্যাপ্ত তিন মাস সময় দিয়ে। চীনের সঙ্গে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে, পদ্মা সেতুসহ বড় বড় উন্নয়ন প্রজেক্টে চীনারা কাজ করছেন। দু’দেশের সম্পর্ক মজবুত। চীন বাংলাদেশের নিকটবর্তী দেশ। সুতরাং এই রোগ বাংলাদেশে ছড়াতে পারে তা একজন সাধারণ লোকও বুঝতে পারেন। সেই কারণে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া সরকারের উচিত ছিল। কিন্তু সরকারের মন্ত্রীরা বড় বড় বুলি আওড়ানোতে ব্যস্ত ছিলেন, আর দৃশ্যত ছিল ঘুমিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এই ব্যর্থতার আগামী ইতিহাস কীভাবে লেখা হবে আমি জানি না, কিন্তু আশঙ্কা করছি সেটা হতে যাচ্ছে ভয়াবহ।

গত ৩০ জানুয়ারি ২০২০ করোনার ভয়াবহতা নিয়ে আমি একটি কলাম লিখি—‘করোনাভাইরাস: মহাবিপদের সামনে মানবজাতি’ শিরোনামে। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় রাশিয়ার সাফল্যের কথা পড়তে গিয়ে দেখি ঠিক সেদিন থেকেই তারা চীনের সঙ্গে তাদের ২৬ শত মাইল সীমান্ত পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছিল। কোয়ারেন্টিন জোনের ব্যবস্থা করেছিল আক্রান্ত এবং সন্দেহভাজনদের জন্য। ১৪৬ মিলিয়ন জনসংখ্যার দেশে আক্রান্ত হয়েছে মাত্র ২৫৩ জন লোক। আমাদের কর্তারা না পড়ে আমাদের লেখা, না পড়ে আন্তর্জাতিক সংবাদ, না রাখে বিশ্বের হালচালের খবর।

সে কারণে তিন মাস ধরে এদের কারও কোনও তৎপরতা দৃশ্যমান ছিল না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘গোসসা’ করেছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর, তারা কেন জাপানের মতো বন্ধু রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য অন-এরাইভাল ভিসা বন্ধ করছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলছেন, করোনা  কোনও মারাত্মক রোগ নয় বরং এটি সর্দি-জ্বরের মতো, মিডিয়া ভীতি ছড়াচ্ছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকও বলেছেন, করোনাভাইরাস মারাত্মক নয়, ছোঁয়াচে। শুধু তা-ই নয়, তিনি অভিমত দিয়েছেন—করোনা নিয়ন্ত্রণে আমেরিকা-ইতালির চেয়েও নাকি বেশি সফল বাংলাদেশ। আর যারা ভিসা দেওয়ার অধিকার রাখে সেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশে অবাধে বিদেশি-প্রবাসী আসার পথ রোধ করতে দৃশ্যে অনুপস্থিত ছিল। মাত্র ২২ মার্চ তারা স্থলপথে বিদেশিদের আসা বন্ধের নোটিশ জারি করেছে। স্থলবন্দর দেখার দায়িত্ব নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের, তারাও ঘুমিয়ে ছিল গত তিন মাস।

পাক্কা আড়াই-তিন মাস হাতে থাকলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যে কোনও প্রস্তুতিই নেয়নি তার করুণ চেহারা বেরিয়ে আসছে এখন। বাংলাদেশে কোভিড-১৯-এর প্রথম রোগী শনাক্ত হয়েছে গত ৮ মার্চ। প্রথম থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ দেশ থেকে আসা যাত্রীদের বাধ্যতামূলক এবং প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন করার দাবি জানালেও সেটা মানা হয়নি। যারা আক্রান্ত হয়েছেন তারা বিদেশ থেকে আসা অথবা তাদের দ্বারা সংক্রমিত। অথচ তাদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোয়ারেন্টিন করে রাখলে দেশ এ হুমকিতে পড়তো না। এখন এটি ছড়িয়ে যাবে কমিউনিটির মধ্যে। তাই একের পর এক এলাকা লকডাউন করা হচ্ছে। ২৪ মার্চ থেকে প্রশাসনকে সহায়তা করতে সারা দেশে দায়িত্ব পালন করছে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী। সশস্ত্র বাহিনী দায়িত্ব পালন শুরু করায় অনেকের মধ্যে যদিও স্বস্তি এসেছে।

তারপরও চোরের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কারণে এমনিতে দেশের স্বাস্থ্যসেবা এবং স্বাস্থ্য অবকাঠামো ভঙ্গুর; এখন প্রতিষেধকহীন প্রাণঘাতী একটি ভাইরাসকে অবাধে প্রবেশ করতে দেওয়ার দায়িত্বহীনতা দেশটিকে কোথায় নিয়ে যাবে একমাত্র আল্লাহ জানেন! ২৩ মার্চ স্বাস্থ্যমন্ত্রী এক ভিডিও বার্তায় দেশবাসীকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, তাদের সব প্রস্তুতি আছে করোনা মোকাবিলায়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সত্যি সত্যি ২ মাস আগে ঢাকায় মিটিং করে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে একটি রেগুলেটরি নির্দেশনা দিয়েছে সারা দেশের হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রকে। কিন্তু এরপর কী! তার কোনও মনিটরিং কী ছিল? ফলোআপ যে হলো না তার দায় কে নেবে?

নিয়ম অনুযায়ী মন্ত্রী নয়, স্বাস্থ্যসেবা সচিবের এটি দেখার কথা, মন্ত্রীর কাজ সিদ্ধান্ত দেওয়া। স্বাস্থ্যসেবা সচিব কেন দেখেননি? করোনার প্রবেশপথ এয়ারপোর্ট, স্থল ও জলবন্দরে কেন করোনাভাইরাস চেক করার যথাযথ ব্যবস্থা বন্দর ও এয়ারপোর্ট কর্তৃপক্ষ নেয়নি, তারা কি তার খোঁজ নিয়েছেন? সচিব ছাড়াও তার কয়েক গণ্ডা অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, উপ-সচিব ছিল, তারা কে কী করেছেন? স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক এখন সচিবের মর্যাদা পেয়েছেন, এই সময়ে তিনি কী করেছেন? এন্ট্রি পয়েন্ট থেকে আক্রান্তদের হাসপাতালে এবং সন্দেহভাজনদের কেন কোয়ারেন্টিনে নেয়নি? যারা প্রবেশ করেছে তাদের বৃত্তান্ত কেন রাখা হয়নি? সবকিছুর জবাব দিতে হবে এদের। জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে এরা প্রতিনিয়ত টালবাহানা করছে, এর কড়ায় গণ্ডায় হিসাব দিতে হবে। একতরফা প্রবাসীদের উদাসীনতাকে দোষ দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব কীভাবে এড়িয়ে যাবেন বেসামরিক বিমান কর্তৃপক্ষ, স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তা?

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

 

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ