বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান: কৃচ্ছ্রসাধনই এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত

Send
মামুন রশীদ
প্রকাশিত : ১২:৩১, এপ্রিল ০১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:০৪, এপ্রিল ০১, ২০২০

মামুন রশীদসরকার এবং জনহিতৈষী প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে করোনা সংক্রান্ত জরুরি স্বাস্থ্যসেবা এবং দরিদ্রদের সহায়তায় ব্যস্ত, সেখানে বিশ্বের বৃহৎ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো অঙ্ক কষছে করোনা পরবর্তী দুর্দিন মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডায় ইতোমধ্যে অনেক লোক চাকরি হারিয়েছে।  অন্যান্য উন্নত দেশেও পরিস্থিতি এমনই হবে বলে আশঙ্কা। অতীতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকটকালে বা সংকট পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দায় দেশে দেশে প্রচুর লোককে চাকরি হারাতে হয়েছে কিংবা প্রতিষ্ঠানগুলোর কেউই নতুন নিয়োগ দেয়নি বা কেউ চাকরি ছেড়ে গেলে সেই শূন্যস্থান পূরণ করা হয়নি। নিদেনপক্ষে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতাদি কমানো হয় এবং বোনাস স্থগিত রাখা হয়।  কিছু কিছু বিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান সরকার বা তাদের ব্যাংকগুলো থেকে তারল্য সহায়তা বা বহুল পরিচিত ‘বেইল আউট’ সুবিধা  নিয়ে থাকে, আবার সুদিনে রাষ্ট্রের বা সরকারের টাকা ফেরত দিয়ে দেয়। উত্তর আমেরিকায় ‘শেয়ার সোয়াপ’ বা ইকুইটি রাইটস প্রদান বা ডেট-ইকুইটি সোয়াপ একটি পরিচিত শব্দ। নব্বইয়ের দশকে এশীয় সংকটকালে হংকংয়ের অনেক কোম্পানির শেয়ার সরকার তাদের বিশেষ বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিম্ন বাজার মূল্যে বা সস্তায় কিনে নিয়ে তাদের তারল্য সহায়তা জোগায় এবং পরবর্তীকালে ভালো সময়ে কোম্পানিগুলো তাদের শেয়ার কিছুটা বেশিদামে পুনঃক্রয় করে নেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৭-০৯ সংকটকালে সিটি গ্রুপ, এআইজি প্রমুখ ‘বেইল আউটের’ অর্থ নেয়, আবার পরবর্তী সময়ে ফেরতও দেয়। বর্তমানেও ইউরোপের অনেক বৃহৎ বাণিজ্যিক ব্যাংক আন্তঃব্যাংক তারল্যকে শুকিয়ে ফেলে নিজ নিজ গ্রাহকদের নতুন তারল্য প্রদান বা ঋণ পুনর্গঠনে অর্থায়নের জন্য আলাদা করে রাখছে।

দুনিয়ার প্রায় সব দেশেই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো সংকটকালে অভ্যন্তরীণ খরচ কমানো বা কৃচ্ছ্রসাধনের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। অনেকটা সক্রেটিসের ‘হাউ মেনি থিংস আই ক্যান ডু উইদাউট’। এতদসংক্রান্ত উদ্যোগ-ইতিহাস বিবেচনায় দেখা যায় প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই তার পরিচালন খরচের প্রায় ১০-২০ শতাংশ কমিয়ে ফেলতে পেরেছে। তার বেশিরভাগই সরবরাহকারীদের সঙ্গে চরম ‘বারগেইন’ বা দরদামের প্রতিফলন। দুর্দিনে কোম্পানিগুলোর ‘প্রকিউরমেন্ট’ বা ‘সাপ্লাই চেইন’ বা কমার্শিয়াল বিভাগের গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়। প্রকিউরমেন্ট বা সাপ্লাই চেইন প্ল্যানিং সামনের সারির বিবেচ্য বিষয় বা সিইও কনসার্ন বা প্রায়োরিটি হয়ে দাঁড়ায়।

সংকটকালে সাঁতরে ভেসে থাকতে পারা একটি বিরাট গুণ। ২০০৭-০৯ সংকটকালে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস এক বিরাট নজির স্থাপন করে। তাদের যখন রুট র‍্যাশনালাইজেশনের ফলে প্রতিষ্ঠানকে ছোট করে আনার তাগিদের মুখে লোক ছাঁটাইয়ের ব্যাপারটি চলে আসে, তখন তাদের সিইও সকল সহকর্মীকে নিয়ে লোক ছাঁটাইয়ের পরিবর্তে ২০ শতাংশের ওপর বেতন কর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। তা সবাই সাদরে মেনে নেয় এবং এতে প্রতিষ্ঠান ও ছোট ছোট চাকরিজীবী উভয়ই বেঁচে যান।

আমাদের দেশেও ইদানীংকালে বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ব্যয় দেশি- বিদেশি দক্ষ লোক নিয়োগ ও তাদের প্রণোদনা, সরকারের বা সরকারের নিকটবর্তী লোকজনদের চাঁদা বা ঘুষসহ বিভিন্ন কারণে অনেক বেড়ে গিয়েছে এবং নিট মুনাফা এমনকি অভ্যন্তরীণ ক্যাশ জেনারেশন বা নগদ অর্থায়ন অনেক কমে গেছে। তার ওপরে ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে এসেছে করোনা অভিঘাত।

ঋণ রিশিডিউল করা ইতিহাসের কোম্পানিগুলোকে যেমন ভালো ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দিতে চায় না, তেমনি সংকটকাল উত্তরণে ব্যর্থ বা লাগামহীন কোম্পানিগুলোকেও ব্যাংক ভালোবাসে না। তাই বাংলাদেশের ভালো বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলোকে সংকটে ভেসে থাকার কৌশল রপ্ত করতে হবে। সেক্ষেত্রে কৃচ্ছ্রসাধন বা ‘জিততে হয় কেনায়’ সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করতে হবে। ‘কস্ট অপটিমাইজেশন’ বা ‘বিজনেস প্রসেস রিইঞ্জিনিয়ারিং’ও হতে পারে আকাঙ্ক্ষিত পথ। আর এটি শুরু হতে হবে বড়দের দিয়েই। অফিসের টাকায় ব্যক্তিগত খরচ নির্বাহের অভ্যাসকে কবর দিতে হবে। ১ কোটি টাকা খরচের কোম্পানিও যদি ১০ শতাংশ খরচ অভিনব উপায়ে কমাতে পারে, তাহলে ১০ লাখ টাকা বাঁচবে, বাঁচবে অনেক জুনিয়র অফিসারের বা পিওনের চাকরি।  মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে হবে প্রতিষ্ঠান বাঁচলে আমি বাঁচবো। সংকটে তাই ব্যয় ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও কৃচ্ছ্রসাধনই মোক্ষম অস্ত্র।

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক।

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ
X