নন-কোভিড রোগীর চিকিৎসার নিশ্চয়তা চাই

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৮:৩৩, মে ১৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৩৪, মে ১৬, ২০২০

তুষার আবদুল্লাহঅস্থিরতার মধ্যে আছি। মানসিক অস্থিরতা শুধু আমাকে নয়, এখন বুঝি পৃথিবীর সকল মানুষই এই পাঁকে ঘুরপাক খাচ্ছে। কোভিড-১৯ সংক্রমণে বাংলাদেশে ৭০তম দিন আজ। আতঙ্ক-উদ্বেগ দিয়ে শুরু হয়েছিল অনিশ্চিত করোনাকাল। শুরুতে অনিশ্চিয়তার মাঝেও ভরসা ছিল দ্রুত কেটে যাবে অপরিচিত এই সময়। তাই ঘরে বসে থাকাকেও কিছু সময়ের বিচ্ছিন্নতা হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছিল।  বাংলাদেশ কিছুটা দেরিতে অঘোষিত লকডাউনে গেলেও, শুরুতে সবাই মোটামুটি ঘরে থাকার চেষ্টা করেছে। অঘোষিত লকডাউনে শতভাগ আশা করাও ঠিক নয়। সাধারণ ছুটি দিয়ে অফিস, কলকারখানা, দোকান-বাজার, গণপরিবহন, মসজিদ বন্ধ করায় লোক চলাচল কমে যায়। কিন্তু সেই কমতি ধরে রাখা যায়নি। আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা যখন বাড়তে শুরু করলো, তখন পথে ঘাটে ভিড় বাড়তে শুরু করলো। পোশাক শ্রমিকদের ওপর সামাজিক সংক্রমণের দায় চাপানোর চেষ্টা করেছেন অনেকে। কিন্তু যারা বাজারে ভিড় করলেন, সরকারি নির্দেশ উপেক্ষা করে মসজিদে নামাজ পড়লেন তাদের ওপর কেন দায় চাপবে না? সরকারি নির্দেশ না মেনে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় লোক চলাচলও বন্ধ হয়নি। এই সব কিছুর মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃতের সংখ্যাও বেড়েই চলেছে।

সামাজিক সংক্রমণ যত বাড়ছে চিকিৎসা সংকট বাড়ছে ততোই। যদিও কোভিড-১৯ চিকিৎসার হাসপাতালের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। রাজধানীতেই ১৪টি। এর বাইরে সারাদেশে আছে ৬৪টি কোভিড-১৯ হাসপাতাল। এই হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা চলছে এক প্রকার। বিশ্বের অন্যান্য কোভিড হাসপাতালে যেমন চিকিৎসা চলছে, এখানেও তেমন চিকিৎসা। সংকট আছে আইসিইউ, ভ্যান্টিলেশন, চিকিৎসক, নার্সের। প্রস্তুতিতে একটু দেরি হওয়ার কারণে কিংবা পূর্বাভাস বুঝতে দেরি হওয়ায় আয়োজন যথাযথভাবে সময় মতো করা যায়নি। আইসোলেশনের জায়গাগুলোও তৈরি হয়নি প্রত্যাশা মতো। তারপরও টেস্ট করার সুযোগ বেড়েছে,  কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে বেড়েছে আক্রান্তের সংখ্যা। সবার যে হাসপাতালের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে এমন নয়। মাত্র ১৩ থেকে ১৫ জনের হাসপাতাল চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। আইসিইউ ও ভ্যান্টিলেশনের প্রয়োজন পড়ছে ১-৩ জনের। এই পরিমাণ রোগীকেই হাসপাতাল ও আইসিইউ সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এখানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না সাধারণ রোগীরা। যাদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব আছে এই সুযোগের দৌড়ে আছেন তারাই। তবু তাদেরও একটি বড় অংশ লবিং করেও হাসপাতালে ভর্তি বা ভ্যান্টিলেশনের সুযোগ পাচ্ছেন না। সেবার  সাধ থাকলেও চিকিৎসক এবং হাসপাতালের সাধ্যতে কুলীয় ওঠা সম্ভব হচ্ছে না।

বিপদে আছেন সাধারন রোগীরা । কিডনি, হৃদরোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিকসের রোগীরা হাসপাতালে যেতে পারছেন না আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে। অতীব জরুরি ডায়ালাইসিস, রক্ত নেওয়া থেকেও বিরত থাকতে হচ্ছে। নিরুপায় হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়েও করোনা আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। শুরুতেই তথ্য গোপন করায় অনেক চিকিৎসক কোভিড পজিটিভ হয়েছেন। হাসপাতাল লকডাউন করার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এই অভিজ্ঞতা ও আতঙ্ক থেকে সাধারণ রোগীরা কোনও একটি সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে গেলে তাকে চিকিৎসা দিতে রাজি হচ্ছেন না চিকিৎসকরা। হাসপাতাল রোগী ফিরিয়ে দিচ্ছে। কোনও হাসপাতালে ভর্তি না হতে পেরে রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। কোভিড-১৯ পরীক্ষায় নেগেটিভ নিশ্চিত না হলে চিকিৎসা দেওয়ার ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না কেউ। ফলে গোটা চিকিৎসা সেবাতেই এক প্রকারের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। যা সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রবেশ করিয়েছে মানসিক আতঙ্ক। অসুস্থ হলে সেবা পাবো না। হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল ঘুরে বেড়াতে হবে এই আতঙ্ক ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। কোভিড-১৯ থেকে সহসা মুক্তির উপায় খুঁজে আপাতত হয়তো নেই। কতো সময় এই লড়াইতে থাকতে হবে জানি না। তাই বলে হাসপাতালের সাধারণ চিকিৎসাকে ঝুঁকিমুক্ত করা প্রয়োজন। সকল সাধারণ হাসপাতালে কোভিড-১৯  আলাদা চিকিৎসা কেন্দ্র খোলা যেতে পারে। ফলে যে রোগীদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাদের কোভিড পরীক্ষারও সুযোগ থাকবে। হাসপাতালের পরিচালনা ব্যবস্থাপনা ও সেবা পদ্ধতিকে ঝুঁকি ও আতঙ্ক মুক্ত করতে না পড়লে, আমরা আরো বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবো।

সেই বিপর্যয় থেকে রক্ষার ব্যবস্থাপত্র অনেক বিজ্ঞ চিকিৎসকরাই দিচ্ছেন। প্রয়োজন সে ব্যবস্থাপত্রগুলো আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার। সময় অপচয়ের সুযোগ দেয়নি কোভিড-১৯, আগামীতেও দেবে না।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

 

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ