করোনাকালের ঘর-বাইর: ‘ঘরে থেকে কাজ করা’

Send
ফাতেমা শুভ্রা
প্রকাশিত : ১৯:০৩, মে ২৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:০৬, মে ২৯, ২০২০

ফাতেমা শুভ্রাপুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা নিয়ে জহির রায়হানের লেখা ‘আরেক ফাল্গুন’ পড়ছিলাম। নিদারুণভাবে আকৃষ্ট করছিল বাংলাদেশের জন্মকাহিনি প্রসঙ্গে লেখা দুর্দান্ত এই গ্রন্থটি। তার চেয়েও বেশি ভালো লাগছিল প্রেক্ষাপটের কারণে, জহির রায়হান খুব চমৎকার করে ভিক্টোরিয়া পার্ক ও এর নামকরণ, বাংলা বাজার, জগন্নাথ কলেজ নানা কিছুর বর্ণনা দিয়ে গেছেন।
পুরান ঢাকার বুড়িগঙ্গা পার হলেই ওপারের কেরানীগঞ্জে এখনকার সময়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কম বেতনে কর্মরত রয়েছেন এমন কর্মচারীদের মাঝে কেউ কেউ বসবাস করেন। মেস করেই থাকেন। মেসে যখন পানি থাকে না কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয় মানে নিজের ভাড়া করা মেসবাড়ি থেকে বাইরে অফিসে এসেই ভোর ভোর চাকরি শুরু হওয়ার আগেই গোসল সেরে নেন, প্রাত্যহিক কাজ সেরে নেন। এমনই এক কর্মী বলছিলেন, আপা, আমগো বাড়িত আইজ ছয় দিন পানি নাই। এনে অফিসেই থাইক্কা যাওনের কাম।
২.

সুলতানা, মিরপুরের খুব বড় বস্তিতে থাকতেন। করোনাকালের আগে একটি বাসায় তার ডাক পড়েছে, সাক্ষাৎকারের জন্য। বাথরুম ধোয়া, ঘর মোছা আর কাপড় ধোয়া- মোটমাট তিন কাজ। গৃহস্থালি বাসায় মানুষ বেশি তাই কাজের মজুরিও বেশি। শর্ত একটাই। ছুটা বুয়া হিসেবে সব কাজ করার পর ওই বাসায় সুলতানা গোসল করতে পারবেন না। সুলতানা গজগজ করতে করতে জানাচ্ছিলেন, ‘বাথরুম দইল্লা ধুইয়া গোসল না কইরা বস্তিতে যদি পানি না থাকে? পানি তো কেবল সক্কালে আর সন্ধ্যায় দেয়!’

আমি সুলতানার কাছে জানতে চাইছিলাম তিনি কোন বাসায় কাজ করবেন। উত্তরে বললেন, ‘যে বাসায় তাকে কাজ করবার পর পরিষ্কার করে গোসল গা কাপড় ধুইতে দিবে... তার মানে আমারে মানুষ মনে করপে। ছুটা হইছি তার মানে আমি মানুষ না!’

৩.

২০১০ সালে আমার সঙ্গে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কর্মরত একজন মুক্ত গবেষক ও অত্যন্ত তুখোড় উন্নয়ন অধিপরামর্শকের আলাপ হলো। আমি চুক্তিভিত্তিক ওনার সঙ্গে কাজ করার জন্য যুক্ত হলাম। কাজ শিখেছি অনেক। ফ্রিল্যান্স কিংবা মুক্ত গবেষণা কাজ আদতে কী প্রথম আমি ওনাকে দেখেই শিখি। সুবিশাল একটি বাসা, তার মাঝে তিনি সন্তানদের নিয়ে বসবাস করেন। তাদের দেখাশোনা, বিদ্যালয়ে আসা এসবের জন্য সুব্যবস্থাপনা আছে। আর আছে বাসায় ওনার নিজের কাজের ‘স্টুডিও’। অনেক সময় কাজের জায়গায়, কখনও বা লাইব্রেরি রুমে তিনি তার সঙ্গে দলগতভাবে কাজ করা একাধিক কর্মীকে বসতে দিতেন কিংবা আমরা একসঙ্গে বসতাম। তিনি যেখানে কাজ করতেন বাসায় সেদিক এত বৃহৎ ছিল যে কখনোই কোনও সময় পরিবারের আর কাউকে সেদিকে আসতে দেখি নাই, যতক্ষণ না তিনি কাউকে বেল মারফত ডাকতেন। ঘর আলাদাভাবে ওনার জন্য ‘কাজের জায়গা’ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। আর এই সক্ষমতা নাদান কিছু নয়- অবশ্যই এর সঙ্গে শ্রেণি আভিজাত্য, অর্থনৈতিক আভিজাত্য, পারিবারিক কাঠামোগত সচ্ছলতা এবং দায়ভার ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। সোজা করে বললে যাকে আমরা রাজনৈতিক অর্থনীতি বলি।

করোনাকালে আমরা যে ‘ওয়ার্কিং ফ্রম হোম’ বলি,  বাসায় থেকে ‘বাইরের কাজ’ করতে চাই- সেটি কি এসব আভিজাত্য নিয়ে, আভিজাত্যের বৈশিষ্ট্য নিয়ে গঠিত নয়?

৪.

ঘর আমাদের কাছে একটি কাঠামোর মতো। তার একটি শক্তপোক্ত বিন্যাস আছে। যেমন ধরেন শোবার ঘর, রান্নাঘর। আর এসবের সঙ্গে মতাদর্শ মিলেমিশে থাকে। রান্নাঘরে চুলা থাকবে কিন্তু কেমন চুলা সেই বোঝাপড়া অবশ্যই প্রেক্ষিতগত- সেই প্রেক্ষিত নিজ নিজ প্রতিবেশ, সংস্কৃতি, লিঙ্গ, শ্রেণি ইত্যাদি নানা কিছু দিয়ে তৈরি হয়। বড়লোকের ঘরের চুলা আর মাটির চুলা- এই দুই ধরন বিপরীত জোড়ে আটকে থাকে। গুরুত্বপূর্ণ হলো, কোন চুলাকে আমরা আদর্শ কিংবা মানদণ্ড ভাবছি!

চুলার কথার অবতারণা করছি এ কারণে যে,  করোনাকালে কিংবা করোনা নাই এমন সময়েও, ঘরে থেকে অফিস এই ধারণা আমাদের একটি পরিবার বর্জিত, কোনোরকম শিশুর হট্টগোল বর্জিত, একটি সুন্দর ‘নির্মল কেজো’ পরিবেশকে চিহ্নিত কিংবা ইঙ্গিত করে। মজার বিষয় হলো, এই ঘরে থেকে কাজ এমনই একটি বাস্তবতা, যা ঘরে থেকে কাজ করাকে চায় কিন্তু ঘরের মানুষ চায় না। অনেকটা চুলায় বসে থাকার মতো অসহ্যকর!

পিতা যখন মিটিং করছে, চারপাশে তখন শিশুদের আটকে রাখতে হয় যাতে শিশুদের আওয়াজ ভার্চুয়াল বার্তা প্রদানের যন্ত্রপাতি মারফত বাইরের দুনিয়ায় না যায়; কিংবা ওই মা কাজে অংশ নিতে পারেন যিনি শিশু দেখভালের ভার অন্য কারও ওপর বর্তাতে পারেন। এই যে কেজো হয়ে থাকা- সেটি পুঁজিবাদী বিকাশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। টাকা পয়সা কামানোর সময়ে যদি বাচ্চা কোলে নিয়ে যায়- আমরা হরহামেশাই বলে থাকি মন্তব্যে ‘কেবল কী তোমারই বাচ্চা আছে! আমরা বাচ্চা পালি নাই? বাচ্চা পালার কেউ না থাকলে বাচ্চা ডে-কেয়ারে দাও!’

গুরুত্বপূর্ণ হলো, এখন এই সংকটকালে শিশু কিংবা কেয়ার অর্থনীতির যতরকম দেখভালের কাজ সেটি ‘বাইরের কাজ’ করার সময় কার ওপর বর্তানো সম্ভব? তবে কী ঘরে বাইরে এই যে বিভাজন সেটি মাঠে মারা যাচ্ছে? আর এই বিভাজন লেপ্টে গিয়ে লিঙ্গীয় সমেত যাবতীয় বৈষম্যকে কী আকৃতি দিচ্ছে?

৫.

বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত কর্মজীবী নারী, অনেকে শহুরে বাস্তবতায় শিশুদের বাসার বাইরে ডে-কেয়ারে রেখেছেন, কেউ বা সন্তানকে কোনও গৃহকর্মীর কাছে রাখেন (ক্ষণে ক্ষণে এসবের নেতিবাচক বাস্তবতার ভিডিও প্রকাশ পায়), কেউ বা কোন আত্মীয়ের কাছে রেখে সাংসারিক কাজ সামলে বাইরের কাজে গেছেন। কেবল মধ্যবিত্ত নয়, অনেক গার্মেন্টসকর্মী গার্মেন্টসে ডে-কেয়ারে বাচ্চা রেখেছেন, বস্তিতে না রেখে দুপুর পর্যন্ত শিশুকে প্রাক-প্রাথমিক স্কুলেও সবার আগে পাঠিয়েছেন। অর্থাৎ কেউ না কেউ শিশু কিংবা যেটাকে আমরা কেয়ার অর্থনৈতিক কাজ বলছি বা ঘর গৃহস্থালির কাজ বলছি সেগুলোয় কেউ ভাগ নিচ্ছেন বলেই নারী ঘরের বাইরে কাজ করতে পারছেন।

মধ্যবিত্ত নারীর জন্য গৃহকর্মী, তার সন্তানকে দেখে রাখার কর্মী কিংবা ডে-কেয়ারের মানুষজন, ছুটা বুয়া ইত্যাদি বহুমুখী ব্যবস্থাপনা বিশেষভাবে নারীর জন্য ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে মজুরি শ্রমকে (ঘরে হোক কিংবা বাইরে) সম্ভব করেছে। একইভাবে যারা মধ্যবিত্তের ঘরে এসব কাজ করেছেন তারা বাইরের কাজ করতে পেরেছেন। কারণ, তাদের ঘরের কাজে কেউ সাহায্য করেছেন। করোনাকালে এই বাস্তবতা ভেঙে গেছে। গৃহকর্মী যেহেতু নিম্নবিত্তের, ফলে তিনি ছুটা হলে ঘরে তাকে আসা যাওয়া করতে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ, তিনি করোনা বহন করতে পারেন। শিশুরা স্কুলে যাচ্ছে না। ঘরের ‘পুরুষ’ যারা আছেন তারা মজুরি শ্রম অনায়াসে করতে পারেন, কারণ তারা নারীর উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন উভয় শ্রমকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। ফলে নারীর ওপর ক্যাটাগরি হিসেবে, এই যে ঘর বাইর লেপ্টে যাওয়ার বাস্তবতা সেটি বহুমুখী চাপ তৈরি করছে। অনেকটা ‘পাটা পুতার ঘষাঘষি মরিচের মতো’ ক্যাটাগরি হিসেবে নারী পুরুষালী সমাজে তার ‘ব্যক্তিগত পরিসর’ হারিয়ে ফেলছে। প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, এই ছাড় দেওয়ার খেলায় ‘সুবিধাবাদী’ গোষ্ঠী মজুরি শ্রম প্রদানের যাবতীয় সুযোগ অর্জিত সমুন্নত রাখছে- আর নানাবিধ বৈষম্যের মধ্যে থাকা মানুষের এই মজুরি শ্রম দেওয়ার ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে।

একজন বুদ্ধিজীবী আন্তরিকভাবে জানতে চাইছিলেন বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবস্থা তো খারাপ। সময়ই তো দিতে পারছে না, বাইরের দেশগুলোতে সমানে একাডেমিক লেখা ছাপানো হচ্ছে। কারণ, ওরা এসময়টা বাসায় থেকে বাসার কাজ করে নষ্ট করছে না, প্রোডাকটিভ কাজ করছে। গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রশ্ন করা কবে থেকে সাংসারিক কাজ তথা ঘরের মানুষের দেখভালের কাজ কোন প্রেক্ষিতে একটি ‘সময় নষ্টযোগ্য কর্মে’ পরিণত হলো?

৫.

তাঁতি যখন নিজ বাড়িতে তাঁত বসান, সেটা আলাদা কক্ষে হয়। কুমার কামার এদেরটাও আলাদা। তবে ঘর গৃহস্থালির সঙ্গে একটা যোগাযোগ থাকে। কুমারের বাড়িতে যে নারী পুতুল গড়েন, তিনি ঘরের চুলায় ভাত বসিয়ে এসে পুতুলে রঙ করেন।

নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত এমনকি উচ্চবিত্তের এই যে সচলতা সেটি পুঁজিবাদী সমাজে পিরামিডিয় শ্রম বণ্টনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কখনও তা শোষণমূলকও। যে দরিদ্র তার জন্য গিঞ্জি মেসে পানি না থাকায় গোসল করতে না পারার চাইতে অফিসে গোসল করাই শ্রেয়, তার জন্য ঘর আর বাইরের সীমাগুলো আলগা। আর আলাদা করে কোনও শব্দহীন, প্যারাহীন কেজো জীবন তখনই এই মহামারিতে অর্জন সম্ভব, যখন আপনি একটি নব্য কেজো অভিজাত শ্রেণিতে বিদ্যমান থাকবেন- সেটি বুদ্ধিবৃত্তিক হতে পারে, বাণিজ্যিক হতে পারে, শিক্ষকের বেলাও হতে পারে, নানান পেশায় কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বেলায় হতে পারে। যদি তার ঘরের কাজ, তার জন্য নির্ধারিত (যা তিনি পিরামিডিয় ব্যবস্থায় করোনারকালের আগে অপরকে দিয়ে করাতেন), তিনি অন্য কাউকে শোষণমূলকভাবে করিয়ে নিতে পারেন। সে শোষণের তলে থাকতে পারে ক্যাটাগরিভাবে লিঙ্গভিত্তিক শ্রেণি হিসেবে নারী, সম্পর্কগতভাবে মা-বোন-মেয়ে, কিংবা সামাজিকভাবে কম শক্তিশালী কম আয়ের অধস্তন মানুষজন- যেমন ড্রাইভার, বান্ধা বুয়া ইত্যাদি ইত্যাদি।

নতুবা, অসমতার সঙ্গে যদি লড়াই করতে হয় তবে করোনাকালীন সময়ে ওয়ার্কিং ফ্রম হোম ঘরে থেকে কাজ, ঘরের যেসব কাজ মজুরি আনে- সেগুলোকে বাচ্চার শব্দ, বয়স্কের শব্দ, রান্নার আওয়াজ, ধান ভাঙার শব্দ, গরুর আওয়াজ সমেত সহ্য করে নিতে হবে; অন্তত সহনশীল হিসেবে নেওয়ার মনস্তত্ত্ব আমাদের মগজ মননে তৈরি করে নিতে হবে। ঘর এখন নতুন করে পুনর্ভাবনার বিষয়- ঘর মানে কেবল আবেগ অনুভূতি এসব বিষয় নয়, ছিলও না। ঘর এখন বাস্তবতা, রাস্তা, রোগ ও নিরাময়ের যুদ্ধের লড়াই ক্ষেত্র, টিকে থাকার ময়দান। যেমন করে বাইরের পরিবেশ খানিক বিনোদনের জায়গা থেকে, লড়াইয়ের ময়দান থেকে ভিন্ন লকডাউনের চেহারায় হাজির হয়েছে।

সম্ভবত, এটাই করোনাকালে আমাদের মতো “পশ” নন এমনদের জন্য “নব্য নতুন”।

লেখক: শিক্ষক, জগন্নাথ ‍বিশ্ববিদ্যালয়

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ