নারীর বাইক চালানোর স্বাধীনতা এবং বাস্তবতা

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৭:৩২, আগস্ট ২৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৩৪, আগস্ট ২৬, ২০২০

রেজানুর রহমানকথা সেটা নয়। কথা হলো একই কাজ ছেলেরা করতে পারলে মেয়েরা কেন পারবে না? ছেলেরা মোটরসাইকেল চালায়। তাহলে মেয়েরা চালালে দোষের কী? এক সময় মনে হতো পুলিশের কাজ মেয়েদের নয়। সেজন্য ঢাকার রাস্তায় যখন মেয়ে পুলিশকে দেখা গেলো তখন এক ধরনের ফিসফাস শুরু হয়ে গিয়েছিল। এমনও হয়েছে মেয়ে পুলিশকে পাহারা দিতে পুরুষ পুলিশকে তৎপর থাকতে হতো।
এখন ব্যাপারটা অনেক সহজ হয়ে গেছে। রাস্তায় অফিস, আদালতে দায়িত্ব পালনরত মেয়ে পুলিশের দিকে এখন আর কেউ চোখ বড় বড় করে তাকায় না। বরং শ্রদ্ধার চোখে দেখে। রেলের ইঞ্জিন চালাবে কোনও মেয়ে, এমনটা কি কেউ ভেবেছিল? এখন মেয়েরাও রেলগাড়িও চালায়। উড়োজাহাজ চালানোর কাজ তো এই দেশের মেয়েরা অনেক আগেই শুরু করেছে। এমন বাস্তবতায় একটি মেয়ে ব্যস্ত রাস্তায় পুরুষদের মতো প্রকাশ্যে ডেমকেয়ার ভঙ্গিতে মোটরসাইকেল চালালে সমাজের খুব কি বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে?
যশোর শহর ও আশেপাশের রাস্তায় একটি মেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে ফিল্মি স্টাইলে হোন্ডা চালিয়ে গায়ে হলুদের আনুষ্ঠানিকতা করেছেন। বিষয়টি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার বিষয়। কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন মেয়েটি কাজটা ঠিক করেনি। এটা এক ধরনের সামাজিক অধঃপতন। আবার কেউ কেউ মেয়েটির ভূয়সী প্রশংসা করে এভাবেই এগিয়ে যাওয়ার সাহস দিয়েছেন। মজার ব্যাপার হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেয়েটির ব্যাপারে নেগেটিভ পোস্টে যারা যুক্ত হয়েছেন তারা প্রায় সবাই নেগেটিভ কমেন্টস করেছেন। আবার যারা পজিটিভ পোস্টে যুক্ত হয়েছেন তারা প্রায় সবাই পজিটিভ কমেন্টস করেছেন। অর্থাৎ বরের বাড়িতে বাইক হাঁকিয়ে যাওয়া একটি মেয়ের পক্ষে-বিপক্ষে বাদানুবাদ শুরু হয়েছে। 

বাদানুবাদের একটি চিত্র তুলে ধরতে চাই। শহীদ শেখ নামে একজন তার ফেসবুক ওয়ালে ওই হোন্ডা আরোহী তরুণীর ছবি পোস্ট করে লিখেছেন–‘আদি বিন হাতিম নামে একজন খ্রিস্টান রাজার সাথে মোহাম্মদ (সা:) এর কথা বার্তা হচ্ছিলো। মোহাম্মদ তাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছিলেন। এটা মদীনা যুগের একেবারে প্রথম দিকের কথা। আদি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে মোহাম্মদ তোমার এই দাওয়াত কতদিন চলবে? রসুলুল্লাহ (সা.) জবাবে বলেছিলেন, সুদূর ইরাকের আল হিরা থেকে একজন নারী যেদিন একাকী উটে চড়ে মক্কায় তাওয়াফ করতে আসবে নির্ভয়ে, পথে কোনও ডাকাত, কোনও বিপদ তাকে স্পর্শ করবে না সেদিনই আমার উদ্দেশ্য সফল হবে। আদি বিন হাতিম পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং বুখারী শরীফে তার দেওয়া সাক্ষ্য আছে–নিজের জীবদ্দশায় এই দৃশ্য দেখেছিলেন তিনি, ইরাক থেকে মরুভূমি পাড়ি দিয়ে নারীরা মক্কায় আসছেন তোয়াফ করতে। হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর চেয়ে বড় মুসলমান পয়দা হয়েছে এই সময়ে, যারা একজন নারীর মোটর বাইক চড়ায় ইসলাম গেল বলে রব তোলে।’ শহীদ শেখের এই লেখায় অধিকাংশরাই পজিটিভ কমেন্টস করেছেন।

মোহাম্মদ গোলাম হাফিজ নামে একজন লিখেছেন, সকল নারী বিদ্বেষীদের জন্য শিক্ষণীয়। আজকের দিনের প্রেক্ষাপটে সেরা অনুভূতির প্রকাশ।

নাজমুল হুদা নাজিম নামে একজন তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, আগে ছেলেরা বিয়ে করতে যেতো এখন মেয়েরা বিয়ে করতে যায়। এটাকে বলে নারীর এগিয়ে যাওয়া। ইসলাম কী বলে? অন্য ধর্ম কী বলে? অবশ্য ড্যাম স্মার্টদের কোনো ধর্ম নেই। তারা তো বাহবা দিবেই। বাইকওয়ালীকে নিয়ে পোস্ট দেয়াতে অনেকের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হয়েছে আমি ধর্ষণকারী, বৌ পেটানো, নারী বিদ্বেষীদলের একজন। আর তারা প্রগতিশীল সুশীল...নাজমুল হুদা নাজিমের লেখার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন অনেকে। সোহান হাওলাদার লিখেছেন, রাইট ব্রাদার। রানা ইব্রাহীমও লিখেছেন, রাইট ইউ আর...

সামগ্রিক পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে একজন নববধূর বাইক চালিয়ে পাত্রের বাড়িতে বিয়ে হলুদ অনুষ্ঠানে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে বেশ কিছুদিন আলোচনা-সমালোচনা চলতেই থাকবে। যদিও ওই নববধূ এক্ষেত্রে তার কঠোর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। ফেসবুক বার্তায় তিনি বলেছেন, আমার বিয়ের হলুদ অনুষ্ঠানে বাইক শো করায় অনেকেই আমাকে চিনে ফেলেছেন। যদিও এটি আমি চাইনি। বিয়ের একটা স্মৃতি রাখার জন্য কাজটি করেছি। আমি চেয়েছিলাম আমার বিয়ের হলুদ অনুষ্ঠানে আনকমন কিছু করবো। আমার ফ্যামিলি মেম্বার, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দেখে খুশি হবে, এই আর কী! ছেলেরা যদি বাইক চালাতে পারে মেয়েরা কেন পারবে না? তবে আমার বাইকের শো যে এরকম বাজে সিচুয়েশন তৈরি করবে বুঝতে পারিনি। আমার ফ্যামিলি মেম্বার, শ্বশুরবাড়ির লোকজন বিষয়টিকে সাপোর্ট করেছে। তাই এনিয়ে আমার কোনও দুশ্চিন্তা নাই। বিষয়টি যেহেতু নতুন তাই কেউ পজিটিভ আবার কেউ নেগেটিভভাবে নিয়েছে। যারা পজিটিভভাবে নিয়েছে তাদের ধন্যবাদ। যারা নেগেটিভভাবে নিয়েছেন তাদের উদ্দেশে বলি–আমি একজন বাইকার। আমি বাইক চালাতে জানি। ঢাকা শহরে আমি ৩ বছর ধরে বাইক চালাচ্ছি। কাজেই আমার গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানে বন্ধুদের নিয়ে বাইক শো করার মাধ্যমে দোষের কিছু হয়েছে বলে তো মনে করি না।

আমি নিজের আনন্দের জন্য এটা করেছি। কাউকে তো বলিনি যে, আমার বাইক চালানো ছবি ভাইরাল করো। অনেকে ইসলামিক মাইন্ডের কথা বলছেন। আমার হাজবেন্ডকে নিয়ে অনেক বাজে কথাও বলছেন। আলটিমেটলি আমার শখ, আমি আমার মতো করে পূরণ করেছি। বিয়েটা আমার ছিল। আপনাদের না। বাইক চালাতে জানি বলেই আমি বাইক শো করেছি। এটাতো দোষের কিছু নয়। এই যে আপনারা এতো নেগেটিভ কথা বলছেন তাতে আমার শ্বশুরবাড়ি ও পরিবারের লোকজনের কিছুই যায় আসে না। কারণ আমি যদি একবেলা না খেয়ে থাকি তাহলে কেউ আমাকে সাহায্য করতে আসবেন না। বলবেন না যে, তুমি না খেয়ে আছো, এই যে খাও... আমার লাইফটাকে আমার মতো করে লিড করতে দেন। আপনারা আপনাদের মতো থাকেন। যারা আমার পরিচয়, আমার ক্যারেক্টার, আমার বংশ নিয়ে কথা বলছেন, তাদের প্রতি প্রশ্ন–ভাই আপনার বংশ ঠিক আছে তো? আপনার বংশ ঠিক থাকলেই হবে। আমার বংশ দেখতে হবে না। আমার বংশের হিসাব আপনাদের না রাখলেও চলবে। নিজের চরকায় আগে তেল দেন ভাই...

বাইকার গৃহবধূ যথার্থই বলেছেন। একজন ছেলে যদি এভাবে বাইক চালিয়ে হইচই করে বিয়ের হলুদ অনুষ্ঠানে যেতো তাহলে হয়তো প্রশংসাসূচক আলোচনা হতো সব জায়গায়। তাহলে একজন নারীর বেলায় কেন তা হবে না। প্রশংসা না হোক নিন্দা করার তো কোনও যুক্তি দেখি না।
আমরা আসলে সহজেই নারীর পরিবর্তন মেনে নিতে চাই না। এজন্য পুরুষ অপেক্ষা নারীরাই অনেকাংশে দায়ী বলে আমি মনে করি। সামাজিকভাবে নারীর পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অনেক সময় নারীরাই বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তার ভূরি ভূরি প্রমাণও আছে। 

প্রসঙ্গক্রমে কক্সবাজারে গরুচোর সন্দেহে মা ও মেয়েকে কোমরে রশি বেঁধে এলাকা ঘুরিয়ে নেওয়ার ঘটনাটি উল্লেখ করতে চাই। অভিযুক্ত মা ও মেয়ে যদি যথার্থই অপরাধী হয়ে থাকেন তাহলে তার বিচার করার নির্ধারিত প্রক্রিয়া আছে। সেই প্রক্রিয়ায় না গিয়ে এই যে বিচার ব্যবস্থা নিজের কাঁধে নিলেন প্রভাবশালীরা, এনিয়ে তো কোনও নারী সংগঠনকেই এখন পর্যন্ত তেমন সোচ্চার হতে দেখিনি। শুধু কক্সবাজারের ওই ঘটনাই নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় প্রতিদিনই নারীরা কোনও না কোনোভাবে লাঞ্ছিত হচ্ছে। কিন্তু সবার ক্ষেত্রে সমান প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না নারী সংগঠনগুলো।  

ইদানীং একটা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে আত্মকর্মসংস্থানে উদ্বুব্ধ অথবা চাকরিজীবী কিছু নারীর বেলায়। পুরুষকে গুরুত্ব দিতে নারাজ তারা। বরং পুরুষবিদ্বেষী ভূমিকায় সোচ্চার অনেকে। আবার নারীবিদ্বেষী পুরুষের সংখ্যাও তো কম নয়। অথচ নারী পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া পরিবার সমাজ এবং রাষ্ট্রের উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। যুগের প্রয়োজনে সকল পজিটিভ পরিবর্তনকে আমাদের স্বাগত জানানো উচিত।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ