ইউক্রেনের সীমান্তের কাছে প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার সেনা সমাবেশ ঘটিয়েছে রাশিয়া। ট্যাংক, কামান থেকে শুরু করে গোলাবারুদ এবং যুদ্ধবিমান নিয়ে সজ্জিত রুশ সেনারা। এর মধ্যে বেলারুশের সামরিক মহড়ায় অংশ নেওয়া প্রায় ৩০ হাজার রুশ সেনাও রয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, ‘যে কোনও সময়’ ইউক্রেনে হামলার জন্যই সেনাদের দেশটির সীমান্তে জড়ো করেছে রাশিয়া। মস্কোর পক্ষ থেকে অবশ্য বরাবরই এমন অভিযোগ নাকচ করে দেওয়া হয়েছে।
সেনাসমাবেশ
স্থায়ীভাবে ইউক্রেনের সীমান্তের কাছে অবস্থান করা প্রায় ৩৫ হাজার রুশ সেনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে রাশিয়ার বিভিন্ন স্থান থেকে আসা সামরিক ইউনিটগুলোকে। সেনারা ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত সংলগ্ন রাশিয়ার রোস্তভ শহরে সামরিক মহড়ায় অংশ নিচ্ছে। মোতায়েন করা হচ্ছে ট্যাংক ও ভারী অস্ত্রশস্ত্র।
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সীমান্তে জড়ো করা ইউনিটগুলোর কোনও কোনওটিকে চার হাজার মাইল দূর থেকে উড়িয়ে নিয়ে আসা হয়েছে।
বেশিরভাগ পশ্চিমা দেশের ধারণা, ইউক্রেনের সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় এক লাখ বা তারও বেশি সেনা মোতায়েন করেছে রাশিয়া। বৃহস্পতিবার পশ্চিমা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ সংখ্যা এক লাখ ৩০ হাজারে পৌঁছেছে, যা তাদের আগের অনুমানের চেয়ে ঢের বেশি।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস বলেছেন, ইউক্রেন সীমান্তের কাছে বেলারুশে রাশিয়া তার ‘অর্ধেক কমব্যাট ফোর্স’ মোতায়েন করেছে।
ইউক্রেনের পরিসংখ্যান বলছে, তাদের সীমান্তে রাশিয়ার এক লাখ ১২ হাজার সেনাসদস্য এবং নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রায় ১৮ হাজার সদস্য রয়েছে।
ইউক্রেনের লুহানস্ক এবং দোনেৎস্ক অঞ্চলে নিয়মিত রুশ সেনারা ছাড়াও প্রায় ১৫ হাজার রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদী রয়েছে বলে মনে করা হয়। যদিও ইউক্রেনের মতে, এই সংখ্যা আরও বেশি।
গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের এক গোয়েন্দা পর্যালোচনায় বলা হয়, সীমান্তে সামরিক উপস্থিতি দ্রুত এক লাখ ৭৫ হাজারে উন্নীত করতে পারে মস্কো।
রয়টার্সের বরাত দিয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, সীমান্ত অঞ্চলে রুশ ব্যাটালিয়নের কৌশলগত গ্রুপের সংখ্যা গত দুই সপ্তাহে ৬০ থেকে বেড়ে ৮৩টিতে দাঁড়িয়েছে। আসার পথে রয়েছে আরও কয়েকটি গ্রুপ।
কৌশলগত ব্যাটালিয়ন গ্রুপগুলোর সঙ্গে থাকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মতো সুবিধা। প্রতিটি গ্রুপে প্রায় ৮০০-এর মতো সদস্য থাকে।
কিছু পশ্চিমা বিশ্লেষক যুক্তি দিয়েছেন যে, রাশিয়ার কাছে বর্তমানে পূর্ণ মাত্রায় আগ্রাসনের জন্য যা যা প্রয়োজন তার সবকিছু নেই। তারা বিশেষ করে কিছু এলাকায় পূর্ণাঙ্গ মোবাইল ফিল্ড হাসপাতালের অনুপস্থিতির বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
কিছু প্রতিবেদনে অবশ্য বলা হয়েছে, হতাহতদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় রক্ত এবং অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করতে শুরু করেছে মস্কো। এটি হামলা প্রস্তুতির একটি ইঙ্গিত হতে পারে।
কিছু প্রতিবেদন বলছে, ট্যাংক মেরামতের কর্মশালার পাশাপাশি হামলার জন্য প্রয়োজনীয় কাদা পরিষ্কারের সরঞ্জাম এরইমধ্যে কিছু এলাকায় পৌঁছে গেছে।
অনেক বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস, সীমান্তে রাশিয়া এখন যে পরিমাণ সেনাসমাবেশ করেছে ইউক্রেনে একটি পূর্ণ মাত্রার আগ্রাসন পরিচালনার জন্য তার চেয়ে অনেক বেশি সেনাসদস্যের প্রয়োজন হবে।
স্যাটেলাইট ইমেজ
কখনও কখনও তাঁবুর রঙ থেকেই স্যাটেলাইট ইমেজে সেনাদের উপস্থিতির বিষয়টি শনাক্ত করা যায়। মূল যুদ্ধ ট্যাংকসহ কিছু প্রশিক্ষণ সামগ্রী স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়। সাঁজোয়া যানের আকৃতির ফলে সেগুলো চিহ্নিত করা যায়।
স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ক্রিমিয়ায় রাশিয়ার তৎপরতা বেড়েছে। জানুয়ারির শেষ দিকে এবং ফেব্রুয়ারির গোড়ার দিকে মিলিয়ে সেখানে অতিরিক্ত আরও ১০ হাজার রুশ সেনা গিয়ে পৌঁছেছে। দৃশ্যত সেখানে সেনাসদস্যদের পাশাপাশি বিমান বাহিনীর সদস্যরাও রয়েছে। কিছু ইউনিটকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রস্তুতির মধ্যে রাখা হয়েছে।
বেলারুশ ফ্যাক্ট
বেলারুশের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া শুরু করেছে রাশিয়া। এটি চলবে আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। দেশটির নেতা আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সমর্থক হিসেবে পরিচিত।
বেলারুশ সীমান্ত থেকে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের দূরত্ব ১০০ মাইল বা দেড়শ কিলোমিটারেরও কম। পশ্চিমা পর্যবেক্ষকরা বলছেন, রাশিয়ার সঙ্গে দেশটির মহড়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে মিশন পরিচালনার একটি রিহার্সেল হতে পারে।
ন্যাটো মহাসচিব জেন্স স্টোলটেনবার্গ বলেছেন, রুশ কমব্যাট ফোর্সের ৩০ হাজার সদস্য বেলারুশে পৌঁছেছে। শীতল যুদ্ধের অবসানের পর থেকে দেশটিতে এটিই মস্কোর সবচেয়ে বড় সামরিক উপস্থিতি।
স্যাটেলাইট ইমেজ থেকে ইউক্রেন সীমান্ত থেকে ৪৫ মাইল বা ৭২ কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে বেলারুশের ইয়েলস্কের কাছে রাশিয়ার স্বল্প পাল্লার ইস্কান্দার ব্যালিস্টিক মিসাইল লঞ্চারের উপস্থিতির ইঙ্গিত মিলেছে।
বেলারুশে রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতির মধ্যে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অস্ত্রশস্ত্র এবং চিকিৎসা সহায়তার মতো বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ন্যাটো মহাসচিব বলছেন, রাশিয়ার স্পেজনাজ স্পেশাল অপারেশন ফোর্সও বেলারুশের মাটিতে অবস্থান করছে।
সমুদ্রে তৎপরতা
আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত দুনিয়াজুড়ে নৌ মহড়ার আয়োজন করছে রাশিয়া। ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত চলমান এসব মহড়ায় থাকছে ১৪০টি জাহাজ ও সাপোর্ট জাহাজ, ৬০টি বিমান এবং সামরিক বাহিনীর ১০ হাজার সদস্য।
জানুয়ারিতে ইংলিশ চ্যানেলের মধ্য দিয়ে যাওয়া রাশিয়ান নৌবাহিনীর ছয়টি জাহাজ এরইমধ্যে কৃষ্ণ সাগরে পৌঁছেছে। এগুলোতে মূল যুদ্ধ ট্যাংক, জনবল এবং সাঁজোয়া যান অবতরণ করানো সম্ভব। বিবিসির ডেভিড ব্রাউনের নিবন্ধ অবলম্বনে।








