ইউক্রেনের বেশ কয়েকটি শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী। বৃহস্পতিবার ভোরে প্রেসিডেন্ট পুতিন সামরিক অভিযান ঘোষণার পরই ইউক্রেনের দক্ষিণ উপকূলে ঢুকে পড়েছে রুশ বাহিনী।
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যায় ইউক্রেন। তারপর থেকেই দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাস নানা চড়াই-উৎরাই পার করেছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স ইউক্রেনের রাজনৈতিক ইতিহাসের মূল ঘটনাক্রমগুলো একত্রিত করার চেষ্টা করেছে।
১৯৯১: সোভিয়েত রিপাবলিক অব ইউক্রেনের নেতা লিওনিদ ক্রাভচুক মস্কোর কাছ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এক গণভোট এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইউক্রেনের বাসিন্দারা স্বাধীনতা অনুমোদন করে এবং ক্রাভচুককে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে।
১৯৯৪: ক্রাভচুককে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত করেন লিওনিদ কুচমা। পর্যবেক্ষকরা এই নির্বাচনকে ব্যাপকভাবে অবাধ ও নিরপেক্ষ বলে সায় দেয়।
১৯৯৯: নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও পুনরায় নির্বাচিত হন কুচমা।
২০০৪: রুশপন্থী প্রার্থী ভিক্টর ইয়ানুকোভিচকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ভোটে জালিয়াতির অভিযোগে বিক্ষোভ শুরু হয়। ‘কমলা বিপ্লব’ নামে পরিচিত এই বিক্ষোভের জেরে পুনরায় ভোট হয়। তাতে পশ্চিমাপন্থী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ইয়োশেঙ্কো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
২০০৫: ক্রেমলিন ঘনিষ্ঠতার অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে শপথ নেন ইয়োশেঙ্কো। তিনি ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি জ্বালানি কোম্পানির সাবেক প্রধান ইউলিয়া টিমোশেঙ্কোকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেন। কিন্তু পশ্চিমাপন্থী শিবিরের অভ্যন্তরীণ বিরোধে তাকে বরখাস্ত করা হয়।
২০০৮: ন্যাটো ইউক্রেনকে প্রতিশ্রুতি দেয় যে, একদিন তাদের এই সামরিক জোটভুক্ত করা হবে।
২০১০: ইয়ানুকোভিচ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে টিমোশেঙ্কোকে পরাজিত করেন। গ্যাসের মূল্য নির্ধারণে এক চুক্তি সই করে রাশিয়া ও ইউক্রেন। এর বিনিময়ে ইউক্রেনের কৃষ্ণ সাগরের বন্দরে রাশিয়ার নৌবাহিনীর লিজ সম্প্রসারণ করা হয়।
২০১৩: ইয়ানুকোভিচের সরকার নভেম্বর মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য এবং সহযোগিতার আলোচনা বাতিল করে। একই সঙ্গে মস্কোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করেন। এতে কয়েক মাস ধরে কিয়েভের রাস্তায় চলে বিক্ষোভ।
২০১৪: মূলত কিয়েভের মূল স্কয়ারে চলা ওই বিক্ষোভ সহিংস হয়ে ওঠে। বহু বিক্ষোভকারী নিহত হয়।
ফেব্রুয়ারি ২০১৪: পার্লামেন্ট ইয়ানুকোভিচকে সরিয়ে দেওয়ার পক্ষে ভোট দেয়, তিনি পালিয়ে যান। কয়েক দিনের মধ্যে সশস্ত্র ব্যক্তিরা ইউক্রেনে ক্রিমিয়ার আঞ্চলিক পার্লামেন্ট দখল করে এবং সেখানে রাশিয়ার পতাকা ওড়ায়। ১৬ মার্চ এক গণভোটে ক্রিমিয়ার মানুষেরা ব্যাপকভাবে রাশিয়ান ফেডারেশনে যুক্ত হওয়ার পক্ষে সমর্থন দিলে অঞ্চলটি দখল করে মস্কো।
এপ্রিল ২০১৪: পূর্বাঞ্চলীয় ডনবাস এলাকার রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীরা স্বাধীনতা ঘোষণা করে। সংঘাত শুরু হয়। বারবার যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও এই সংঘাত বিচ্ছিন্নভাবে এখনও চলছে।
মে ২০১৪: ব্যবসায়ী পেট্রো পোরোশেঙ্কো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করেন। পশ্চিমাপন্থী কর্মসূচি নিয়ে জয় পান তিনি।
জুলাই ২০১৪: আমস্টারডাম থেকে কুয়ালা লামপুরগামী যাত্রীবাহী প্লেন এমএইচ১৭ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভূপাতিত হলে আরোহী ২৯৮ জন নিহত হয়। তদন্তকারীরা দেখতে পান এই অস্ত্র রাশিয়া ব্যবহার করে, তবে প্লেনটি ভূপাতিতের কথা অস্বীকার করে মস্কো।
২০১৭: ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি সই করে ইউক্রেন। এতে ইউক্রেনের পণ্য ও সেবার জন্য ইউরোপের বাজার উন্মুক্ত হয় এবং ইউক্রেনীয়রা ভিসা ছাড়াই ইইউ দেশগুলোতে ভ্রমণের সুযোগ পায়।
২০১৯: ইউক্রেনের একটি নতুন অর্থোডক্স চার্চ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করে, ক্ষুব্ধ হয় ক্রেমলিন।
সাবেক কৌতুক অভিনেতা ভলোদিমির জেলেনস্কি এপ্রিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পোরোশেঙ্কোকে পরাজিত করেন। জেলেনস্কি দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং পূর্ব ইউক্রেনে যুদ্ধ অবসানের প্রতিশ্রুতি দেন। তার সারভেন্ট অব দি পিপল পার্টি জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনে জয় পায়।
জুলাই মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রতিদ্বন্দ্বি জো বাইডেন এবং তার ছেলে হান্টারের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করতে জেলেনস্কিকে আহ্বান জানায়। ইউক্রেনে ব্যবসায়ীক সম্পর্ক নিয়ে এই তদন্ত করতে বলা হয়। এর জেরে ট্রাম্পকে অভিশংসনের চেষ্টা করা হলেও তা ব্যর্থ হয়।
জানুয়ারি ২০২১: জেলেনস্কি বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কাছে ইউক্রেনকে ন্যাটো জোটে যুক্ত করার অনুরোধ জানান।
ফেব্রুয়ারি ২০২১: জেলেনস্কির সরকার বিরোধী নেতা ভিক্টর মেদভেচুকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তিনি ইউক্রেনের অভ্যন্তরে ক্রেমলিনের সবচেয়ে প্রখ্যাত মিত্র।
২০২১: ইউক্রেন সীমান্তের কাছে সেনা জড়ো করে রাশিয়া। তাদের দাবি এটা প্রশিক্ষণ মহড়ার অংশ।
অক্টোবর ২০২১: ইউক্রেন প্রথমবারের মতো পূর্ব ইউক্রেনে তুরস্কের নির্মিত বায়রাখতার টিবি২ ড্রোন ব্যবহার করে, ক্ষুব্ধ হয় রাশিয়া।
২০২১: রাশিয়া আবারও ইউক্রেনের কাছে সেনা জড়ো করতে থাকে।
৭ ডিসেম্বর ২০২১: বাইডেন রাশিয়াকে হুঁশিয়ার করে বলেন ইউক্রেনে আগ্রাসন চালানো হলে ব্যাপক পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে।
১৭ ডিসেম্বর: রাশিয়া নিজেদের বিস্তারিত নিরাপত্তা চাহিদা উপস্থাপন করে। এতে ন্যাটোর কাছ থেকে মস্কো আইনসঙ্গত নিশ্চয়তা চায় যে তারা পূর্ব ইউরোপ এবং ইউক্রেনে সামরিক কার্যক্রম বর্জন করবে।
১৪ জানুয়ারি ২০২২: ইউক্রেনের সরকারি ওয়েবসাইটগুলো সাইবার হামলার শিকার হয়। হ্যাকাররা ইউক্রেনবাসীকে ভীত হতে এবং সবচেয়ে খারাপ কিছুর আশঙ্কা করার পরামর্শ দেয়।
১৭ জানুয়ারি: ইউক্রেনের উত্তরে বেলারুশে পৌঁছাতে শুরু করে রুশ বাহিনী, উদ্দেশ্য যৌথ মহড়া।
২৪ জানুয়ারি: নিজেদের বাহিনী প্রস্তুত রাখে ন্যাটো জোট। এছাড়া পূর্ব ইউরোপে আরও যুদ্ধ জাহাজ ও বিমান জড়ো করে।
২৬ জানুয়ারি: রাশিয়ার নিরাপত্তা দাবির লিখিত প্রতিক্রিয়া জানায় ওয়াশিংটন। এতে মস্কোর উদ্বেগ নিয়ে ‘ব্যবহারিক’ আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হলেও ফের জানিয়ে দেওয়া হয়, ন্যাটো জোটের দূয়ার সব সময় ‘খোলা থাকবে’।
২৮ জানুয়ারি: প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জানান রাশিয়ার মূল নিরাপত্তা দাবি আলোচনাতেই আনা হয়নি।
২ ফেব্রুয়ারি: যুক্তরাষ্ট্র জানায় তারা পোল্যান্ড ও রোমানিয়ায় অতিরিক্ত তিন হাজার সেনা পাঠাবে। পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা জোরালো করতে এই পদক্ষেপের ঘোষণা দেয় তারা।
৪ ফেব্রুয়ারি: বেইজিং শীতকালীন অলিম্পিকে পুতিন তার দাবির প্রতি চীনের সমর্থন লাভ করেন যে, ইউক্রেনকে কোনও ভাবে ন্যাটো জোটভুক্ত হতে দেওয়া যাবে না।
৭ ফেব্রুয়ারি: ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ক্রেমলিনে পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের পর সংকটের কূটনৈতিক সমাধানের বিষয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেন। পরে ম্যাক্রোঁ কিয়েভ সফর করেন এবং জেলেনস্কি ও ইউক্রেনের জনগণের প্রশংসা করেন।
৯ ফেব্রুয়ারি: বাইডেন বলেন সবকিছু দ্রুত পাল্টে যেতে পারে। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইউক্রেনে অবস্থানরত মার্কিনিদের অবিলম্বে দেশটি ছাড়ার পরামর্শ দেয়। অন্যান্য দেশও নিজ নাগরিকদের ইউক্রেন ছাড়ার আহ্বান জানায়।
১৪ ফেব্রুয়ারি: জেলেনস্কি ১৬ ফেব্রুয়ারি নিজ দেশের নাগরিকদের পতাকা ওড়ানোর এবং জাতীয় সংগীত গাওয়ার পরামর্শ দেয়। ওই তারিখে রুশ আগ্রাসন শুরু হতে পারে বলে পশ্চিমা মিডিয়া ধারণা দিতে থাকে।
১৫ ফেব্রুয়ারি: ইউক্রেন সীমান্ত থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় রাশিয়া। একই সঙ্গে পশ্চিমাদের আগ্রাসন শুরুর হুঁশিয়ারিকে উপহাস করে তারা। রাশিয়ার পার্লামেন্ট পুতিনকে পূর্ব ইউক্রেনের দুই অঞ্চলকে স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানায়।
১৮ ফেব্রুয়ারি: অর্গানাইজেশন ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড কোঅপারেশন ইন ইউরোপে (ওএসসিই) নিযুক্ত মার্কিন দূত মাইকেল কারপেন্টার জানান, রাশিয়া সম্ভবত ইউক্রেনের কাছে এক লাখ ৬৯ হাজার থেকে এক লাখ ৯০ হাজার সেনা জড়ো করেছে।
১৯ ফেব্রুয়ারি: রাশিয়ার পারমাণবিক কৌশলগত বাহিনী মহড়া চালায়, যা তদারকি করেন পুতিন।
২১ ফেব্রুয়ারি: ম্যাক্রোঁ জানান ইউক্রেন ইস্যুতে একটি সম্মেলন আয়োজনে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছেন পুতিন ও বাইডেন।
এক টেলিভিশন ভাষণে পুতিন বলেন, রাশিয়ার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ ইউক্রেন। যার নিজস্ব রাষ্ট্রের কোনও ইতিহাস নেই, বিদেশি শক্তি এটি চালায় এবং এর শাসকেরা পুতুল। পূর্ব ইউরোপের দুই অঞ্চলকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেওয়ার ডিক্রিতে সই করেন তিনি। একই সঙ্গে ওই এলাকায় সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দেন।
২২ ফেব্রুয়ারি: যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং তাদের মিত্ররা রাশিয়ার পার্লামেন্ট সদস্য, ব্যাংক এবং অন্য সম্পদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। জার্মানি নর্ড স্ট্রিম ২ পাইপলাইন চূড়ান্ত অনুমোদন স্থগিত করে দেয়।
২৩ ফেব্রুয়ারি: রুশ সমর্থিত বিদ্রোহী নেতারা ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর আগ্রাসন ঠেকাতে রাশিয়ার সহায়তা কামনা করেন।
২৪ ফেব্রুয়ারি: রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন পূর্ব ইউক্রেনে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ চালানোর অনুমোদন দেন। একই সঙ্গে তিনি ইউক্রেনীয় বাহিনীকে অস্ত্র নামিয়ে রাখার আহ্বান জানান। রুশ বাহিনী ইউক্রেনের বিমান ঘাঁটি ও বড় শহরগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলা বর্ষণ শুরু করে।









