ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধের সামরিক কৌশল বদলাচ্ছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বিশ্লেষকরা বলছেন, আক্রমণের কয়েক দিনের মাথায় জয়ের প্রত্যাশা করলে যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহে গড়ানোর পর হার এড়াতে নৃশংসতা বাড়ানোর দিকে ঝুঁকছেন তিনি। মার্কিন সাময়িকী নিউজউইক-এর এক প্রতিবেদনে বিষয়টি জানা গেছে।
ইউক্রেনে দায়িত্ব পালন করা সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত জন হার্বস্ট জানান, ২৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া অভিযানের পাঁচ সপ্তাহ পর পুতিন নতুন কৌশলের দিকে ঝুঁকছেন। এরমধ্যে রয়েছে অবরোধ ও বেসামরিক অবস্থানে হামলা। ইউক্রেনীয়দের কঠোর প্রতিরোধ ও রুশ সেনাদের দুর্বল মনোবলের কারণে কৌশল পাল্টাতে বাধ্য হচ্ছেন পুতিন।
বর্তমানে আটলান্টিক কাউন্সিলের ইউরোশিয়া সেন্টারের সিনিয়র পরিচালক হার্বস্ট বলেন, স্পষ্টভাবে বেসামরিক অবস্থানে ব্যাপক বোমাবর্ষণ আমরা দেখেছি। রুশ সেনারা যখন ইউক্রেনজুড়ে এগোতে পারছে না তখন এই কৌশল প্রাধান্য বিস্তার করেছে।
কয়েক সপ্তাহ ধরে রুশ বাহিনী বন্দর নগরী মারিউপোল অবরোধ করে কামান দাগছে। মেয়র ভাদিম বয়চেঙ্কো সোমবার সতর্ক করে বলেছেন, যদি আরও বেশি মানুষকে প্রত্যাহার সম্ভব না হয় তাহলে মানবিক বিপর্যয় আসন্ন।
ইস্তাম্বুলে আলোচনায় অগ্রগতি
ইউক্রেন ও রাশিয়ার চলমান যুদ্ধ অবসানে তুরস্কে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। মঙ্গলবারের বৈঠকের আলোচনার বিষয়ে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, কিয়েভ ও চেরনিহিভে সামরিক অভিযান ব্যাপকভাবে কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে রাশিয়া। আর হামলা থেকে সুরক্ষার আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা সাপেক্ষে নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে ইউক্রেন।
কিয়েভের আশা ছেড়ে দিয়েছেন পুতিন?
ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরুর পর মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আশঙ্কা করেছিলেন রাজধানী কিয়েভের পতন হতে পারে কয়েক দিনের মধ্যে। তিন মার্কিন কর্মকর্তা পরিচয় না প্রকাশের শর্তে বলেছিলেন, রুশ হামলার ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে কিয়েভের পতন হতে পারে এবং এরপর ইউক্রেনের প্রতিরোধ কার্যকরভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে।
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওলেক্সি রেজনিকভ ২১ মার্চ এক বিবৃতিতে বলেছেন, রাশিয়া এখন আর কিয়েভ দখলের স্বপ্ন দেখছে না।
হার্বস্ট মনে করেন, পুতিন এখনও কিয়েভ দখলের আশা ছাড়েননি। কিন্তু তা করার জন্য রসদের সংকটে পড়েছেন। তিনি বলেন, পুতিন কিয়েভ দখলের আশা একেবারে ছেড়ে দিয়েছেন তা বলতে আমার সংশয় রয়েছে। আমার মনে হয় না দ্রুত এই লক্ষ্য অর্জনের মতো সেনা তার রয়েছে। রুশরা এখন কিয়েভ দখলের মতো অবস্থায় নেই।
চাথাম হাউজ-এর রাশিয়া ও ইউরেশিয়া কর্মসূচির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো নিকোলাই পেট্রোভও প্রায় একই মত পোষণ করেছেন। তিনি বলেন, ইউক্রেনের সাহসী প্রতিরোধের কারণে মূলত পুতিনের প্রাথমিক পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে। আমি মনে করি রুশ সেনারা কিয়েভ দখল করতে পারেনি এবং সম্ভবত আর এই চেষ্টা করবে না।
পুতিনের পরের পদক্ষেপ কী?
চাথাম হাউজের রাশিয়া ও ইউরেশিয়া কর্মসূচির রিসার্চ ফেলো ম্যাথিউ বুলেগের মতে, রাশিয়ার এখন উচিত তারা কতদূর পর্যন্ত যাবে তা হিসাব করা। একই সঙ্গে পুতিনের প্রয়োজন পরের ধাপ কী হবে নির্দিষ্ট করা। কারণ, দেশটির কৌশলগত আভিযানিক লক্ষ্য অর্জনের মতো সেনা ও রসদ নেই।
তিনি উল্লেখ করেন, রাশিয়া নতুন করে কোনও শহরের দখল নিতে পারছে না। জয় দেখানোর জন্য মারিউপোল একটি সহজ নিশানা।
বুলেগ বলেন, এটি ছোট শহর। গত কয়েক দিন ধরে অবিরাম বোমাবর্ষণের শিকার হচ্ছে। ইউক্রেনের এই শহরেই অনেক বেশি সেনা কেন্দ্রীভূত অবস্থায় রয়েছে। আমি মনে করি, ২-৪ সপ্তাহের সংঘাতে আমরা যা দেখছি তাতে মারিউপোলের পতন হতে পারে, ডনবাসের সীমান্ত এলাকায় অভিযান জোরদার হতে দেখবো এবং একপর্যায়ে সম্ভবত অবস্থানগত বিবেচনায় সংঘাতের থেমে যাওয়া দেখতে পারি।
তিনি আরও মনে করেন, এরপর রাশিয়া অভিযানের লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে বলে ঘোষণা করতে পারে। তার কথায়, অবশ্যই এটি মিথ্যা। কিন্তু তাদের মুখ রক্ষা এবং সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধানের পথে পা বাড়াতে হবে। কিন্তু ক্রেমলিনের পক্ষে একটি পরাজয়ের ধরনকে সামরিক জয়ে পরিণত করার সহজ। কারণ, এটি তখনও ইউক্রেনের ভূখণ্ড দখল করে থাকবে, কিছু অংশের নিয়ন্ত্রণ থাকবে তাদের হাতে।









