ইউক্রেন ইস্যুকে কেন্দ্র করে ইউরোপের বাতাসে এখন যুদ্ধের গন্ধ। এর মধ্যেই পূর্ব ইউক্রেনের রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ন্ত্রিত দুইটি অঞ্চলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এখানেই ঘটনার শেষ নয়। পূর্ব ইউক্রেনের এসব বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চলে সেনা মোতায়েনেরও আদেশ দিয়েছেন তিনি। স্বভাবতই এতে ধাক্কা খেয়েছেন পশ্চিমা নেতারা। ফলে যতটা সম্ভব শক্তভাবে এর প্রতিক্রিয়া জানানোর উপায় খুঁজছেন তারা। অন্যভাবে বলা চলে, রাশিয়াকে শাস্তি দেওয়ার উপায় খুঁজছেন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর নেতারা।
রাশিয়া থেকে নর্ড স্ট্রিম ২ গ্যাস পাইপলাইন অনুমোদনের প্রক্রিয়া স্থগিত করেছে জার্মানি। বার্লিনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎস নিজেই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ইউক্রেনে রাশিয়ার পদক্ষেপের জবাবে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে এই পদক্ষেপ নিয়েছে তার দেশ।
নিষেধাজ্ঞা
ইউক্রেনের সঙ্গে মস্কোর আচরণে ক্ষুব্ধ ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য দেশগুলোও। রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীকে অর্থায়নকারী ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা করছে তারা। একইসঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূলধন এবং আর্থিক বাজারে মস্কোর প্রবেশ সীমিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
পশ্চিমা দুনিয়া বলছে, ইউক্রেনে বহু আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন করেছে রাশিয়া। কূটনৈতিক আলাপ ব্যর্থ হওয়ায় এখন পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে।
বিশ্বযুদ্ধের শঙ্কা
পশ্চিমা শক্তিগুলি দীর্ঘদিন ধরেই এটি স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার একটি উত্তপ্ত ও সরাসরি সামরিক সংঘর্ষের মধ্য দিয়েই হয়তো পরিস্থিতি শান্ত হবে না। বরং একটি বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা রয়েছে। ফলে তাদের হাতে বিকল্প খুবই সীমিত। বলা চলে একমাত্র বিকল্প ছিল রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা।
এ মাসেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, মস্কো যদি ইউক্রেনে অভিযান চালায়, তাহলে মার্কিন নাগরিকদের উদ্ধারে তিনি সেখানে কোনও সেনা পাঠাবেন না। তিনি বলেন, 'আমরা বিশ্বের সবচেয়ে বড় এক সামরিক বাহিনীর মোকাবিলা করছি। পরিস্থিতি খুবই সংকটজনক এবং যে কোনও সময় চরম পর্যায়ে মোড় নিতে পারে। আর যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া যখন পরস্পরের দিকে গুলি চালায়, তখন সেটা একটা বিশ্বযুদ্ধ। আমরা একেবারেই অন্য এক ধরনের বিশ্বে আছি, যেটা আমরা আগে কখনও দেখিনি।'
বিশ্বকে বিভ্রান্ত করছেন পুতিন!
পুতিন এমন একটি কৌশল নিয়ে বিশ্বকে ধাক্কা দিয়ে চলেছেন যেখানে আক্রমণের প্রকৃত মাত্রা সম্পর্কে বিভ্রান্তি রয়েছে। পূর্ব ইউক্রেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চলে এরইমধ্যে রুশ বাহিনী পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছেন পুতিন। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ ইউরোপীয় দেশগুলো।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেল বলেছেন, ‘রুশ সেনারা ডনবাসে প্রবেশ করেছে। আমি এটিকে পূর্ণ মাত্রার দখল বলবো না। তবে রুশ সেনারা ইউক্রেনের মাটিতে রয়েছে। নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে মঙ্গলবার সিদ্ধান্ত নেবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।’ পোলিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী মারিউস ব্লাসজ্যাক মঙ্গলবার এক রেডিও সাক্ষাৎকারে বলেছেন, রাশিয়ান বাহিনী ইউক্রেনের ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে। এটিকে ইউক্রেনের সীমান্ত এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। তবে পূর্ব ইউক্রেনে নিজ দেশের সেনাদের ‘শান্তিরক্ষী’ বলে মনে করে রাশিয়া।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলী ২৭ দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নকে উচ্চ সতর্কতার মোডে যেতে বাধ্য করার জন্য যথেষ্ট ছিল। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন মঙ্গলবার কিছু নিষেধাজ্ঞার কথা বলেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সিদ্ধান্ত নেবেন, প্রথম ধাপের নিষেধাজ্ঞাগুলো কতটা শক্ত হবে।
লিথুয়ানিয়ার প্রধানমন্ত্রী ইনগ্রিদা সিমোনিতে বলেছেন, ‘আমরা কিভাবে প্রতিক্রিয়া জানাই, সেটিই পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আমাদের সংজ্ঞায়িত করবে।’ অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর কার্ল নেহামার বলেন, ‘এখানে বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞার অপশন রয়েছে।’
ক্ষতি ইউরোপ, এশিয়ারও
একটি সংঘাত ইউক্রেনকে ধ্বংস করতে পারে এবং ইউরোপজুড়ে বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। আর এই অঞ্চল জ্বালানির জন্য রাশিয়ার ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। তবে এশীয় দেশগুলোও চিন্তিত।
ইউক্রেন সংকট আরও খারাপের দিকে গেলে এবং মার্কিন সমর্থিত দেশগুলো রাশিয়ার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে সিউলের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক পতনের জন্য প্রস্তুতি নিতে নিজ দেশের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে-ইন।
এদিকে বড় ধরনের সংঘাত এড়ানোর আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। ইউক্রেনের দুইটি বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চলকে স্বীকৃতি দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর সেখানে সেনা পাঠানোর রুশ উদ্যোগের ফলে পরিস্থিতি জটিল রূপ নিচ্ছে। আর এমন পদক্ষেপকে বিদ্যমান বিশ্ব ব্যবস্থার লঙ্ঘন বলে মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর নেতারা। রাশিয়ার রাশ টেনে ধরতে চাইছেন তারা। নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নানিয়া মাহুতা বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইনে পুতিনের ইউক্রেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চলকে স্বীকৃতি দেওয়ার কোনও ভিত্তি নেই।
ইউক্রেন ও রাশিয়া উভয়ের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে তুরস্কের। ন্যাটোভুক্ত এই দেশটিও পূর্ব ইউক্রেনের বিচ্ছিন্ন অঞ্চলগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়ার মস্কোর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেব এরদোয়ান বলেছেন, আমরা রাশিয়ার এই সিদ্ধান্তকে অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করছি। সাধারণ জ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক আইনের সম্মান প্রদর্শনের জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতি আমাদের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করছি।
বর্তমান সংকটের জন্য অবশ্য ন্যাটোকেই দায়ী করে আসছেন পুতিন। মার্কিন নেতৃত্বাধীন এই জোটকে তিনি রাশিয়ার জন্য অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এপি অবলম্বনে।









