‘আমাদের সম্পদ পুড়ে গেছে। এখন ধৈর্য ধরা ছাড়া আর কিছুই করার নাই। চোখের সামনে লাখ লাখ টাকার মালামাল নষ্ট হয়ে গেলো। কান্নাও এখন আর আসতেছে না। চোখে পানি নাই।’ নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চোখের সামনে পুড়তে দেখে শোকে স্তব্ধ হয়ে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ী জহির।
মঙ্গলবার (৪ এপ্রিল) ভোর ৬টায় আগুন লাগার পর থেকে বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ীদের ভিড় বাড়ছেই। সঙ্গে বাড়ছে ব্যবসায়ীদের আর্তনাদ আর আহাজারি। একদিকে ধোঁয়া, আরেকদিকে মানুষের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে বঙ্গবাজার এলাকার পরিবেশ।
হতাশা নিয়ে জহির বলেন, আমার কেনা দুইটা দোকান ছিল। ৪০ লাখ টাকার ইনভেস্ট ছিল। ২৪ বছর ধরে এখানে ব্যবসা করে আসছি। আজ আমার সবকিছুই শেষ।
চোখের সামনে পুড়ছে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে টিকে থাকার ও একমাত্র উপার্জনের উৎস। দূর থেকে চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের। হতাশা, ক্ষোভ, আর্তনাদ প্রকাশ ছাড়া নিরুপায় তারা। খবর শুনে ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি দেখে একজন হার্ট অ্যাটাকও করেন। তাকে নেওয়া হয়েছে হাসপাতালে।
ব্যবসায়ী ইসমাইল বলেন, বঙ্গবাজারে আমাদের বেশ কয়েকটি দোকান রয়েছে। আমার শ্বশুরের দোকান রয়েছে। আগুন লাগার খবর পেয়ে আমরা তাড়াতাড়ি বঙ্গবাজার চলে আসি। এসে পরিবেশ পরিস্থিতি দেখে আমার শ্বশুরের হার্ট অ্যাটাক হয়। আমাদের বংশ পরম্পরায় ব্যবসা এই বঙ্গবাজারে। সবই পুড়ে শেষ।
আগুনের কারণে ধোঁয়া মিলেমিশে অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ তৈরি হয় বঙ্গবাজার ও গুলিস্তানের আকাশে। যদিও আগুন লাগার পর থেকে ওই এলাকায় বন্ধ রয়েছে বিদ্যুৎ। তারপরও আগুনের তীব্রতায় ট্রান্সফর্মার কিংবা এসি বিস্ফোরণের শঙ্কা প্রকাশ করেন ব্যবসায়ীরা।
বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ী শফিক দেওয়ান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমার ১৭ লাখ টাকার মালামাল ছিল, দুটি দোকান ছিল। সবই এখন ছাই হয়ে গেছে। আগুন নেভানোর জন্য ফায়ার সার্ভিসের পানির স্বল্পতাও আমরা দেখতে পেয়েছি।
ব্যবসায়ী মাহিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমার একটি দোকান ছিল। পাঁচ লাখ টাকার মালামাল ছিল দোকানে। আমার আত্মীয়-স্বজনের দোকান ছিল। সবার দোকান শেষ হয়ে গেছে। সবাই এখন নিঃস্ব। এই দোকান এই ব্যবসা আমাদের আয়ের একমাত্র উৎস ছিল। এখন সবকিছুই শেষ।
ফায়ার সার্ভিস বলছে, আগুন নিয়ন্ত্রণে এখন পর্যন্ত ৪৮টি ইউনিট কাজ করছে। উৎসুক জনতার ভিড় এবং পানি স্বল্পতার কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে কিছুটা বেগ পেতে হয়।
মল্লিকা গার্মেন্টসের মালিক মালিক নূর আলম জানান, তার দুটি দোকানে অর্ধ কোটি টাকার মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। নগদ আট লাখ টাকা ছিল ক্যাশ বাক্সে। ২২ বছর যাবৎ তিনি বঙ্গবাজারে ব্যবসা করছেন।
ঈদের আগে ঘুরে দাঁড়াতে গিয়ে নিঃস্ব
বঙ্গবাজারের জিন্সের ব্যবসা করেন মিজানুর রহমান। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, করোনার পর ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্নে বিনিয়োগ করেছিলাম বড়। কিন্তু সব পুড়ে ছাই হয়ে গেলো। লাখ লাখ টাকার মালামাল, দোকানে ক্যাশ টাকাসহ অনেক ক্ষতি।
বঙ্গবাজার টিনশেড মার্কেটের আর এস ফ্যাশনের মালিক আবদুল মান্নান বলেন, ‘আমার দোকানের সব পুড়ে শেষ। আমি এমন আগুন জীবনেও দেখিনি। কীভাবে কী হয়ে গেলো।
নাশকতার অভিযোগ
মঙ্গলবার ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের সামনে বঙ্গবাজার শপিং কমপ্লেক্স দোকান মালিক সমিতির দফতর সম্পাদক বিএম হাবিব অভিযোগ করেন, জমি ফাঁকা করার জন্য অগ্নিসংযোগ বা নাশকতার ঘটনা হতে পারে এটা। দীর্ঘদিন একটি মহল অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে। মার্কেটের ভেতরে আগুন নিয়ন্ত্রণের জন্য গ্যাস ছিল। কিন্তু সকাল বেলা হওয়ায় ব্যবহার করা যায়নি।
বিএম হাবিব জানান, অন্তত ছয়টি মার্কেটে আগুন লেগেছে। এর মধ্যে বঙ্গ মার্কেটের আওতায় চারটি মার্কেটে অন্তত কয়েক হাজার দোকান ছিল। এ ছাড়া ইসলামিয়া মার্কেট ও এনেক্সকো মার্কেটে আগুন লেগেছে।
ব্যবসায়ীরা বলেন, বঙ্গ মার্কেটে ২৯০০ দোকানে প্রায় দেড় লাখ মানুষ কাজ করেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তারা অনুরোধ জানান, ক্ষতি কাটাতে ও ব্যবসা করার জন্য একটি পরিবেশ তৈরি করে দিন। আমরা সিটি করপোরেশনের বরাদ্দ পাওয়া মালিক। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি করেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা।
অগ্নিকাণ্ডের পর বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে বঙ্গ মার্কেটের এক ব্যবসায়ী দাবি করেন, ঈদকে সামনে রেখে কোটি-কোটি টাকার মালামাল তুলেছিলেন ব্যবসায়ীরা। এখন সবাই পথের ফকির। আমি নিজেও ছোট একটি ব্যবসা করি। দোকানে রাখা ছিল অন্তত আড়াই লাখ টাকা। সব পুড়ে গেছে।









