উধাও ‘গ্রিন কোজি কটেজ’-এর স্পেস ওনাররা

আতিক হাসান শুভ
০৩ মার্চ ২০২৪, ২৩:৪৫আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৪, ০৯:৫৪

রাজধানীর বেইলি রোডের ‘গ্রিন কোজি কটেজ’- এ অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জন নিহতের ঘটনায় ভবনের স্বত্বাধিকারী ও স্পেস ওনারদের নানা অব্যবস্থাপনার চিত্র ইতোমধ্যে গণমাধ্যমের সামনে এলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে ভবনটির স্পেস ওনাররা। পুলিশ বাদী হয়ে যে মামলাটি দায়ের করেছে সেখানেও নেই ভবনের স্পেস ওনারদের নাম। দুর্ঘটনার তদন্ত করতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং ফায়ার সার্ভিস থেকে যে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে তারা এখনও মাঠেই নামেনি।

জানা যায়, রান্নার কাজে ব্যবহারের জন্য ভবন স্বত্বাধিকারী এবং স্পেস ওনারদের যোগসাজশে ‘গ্রিন কোজি কটেজ’-এ রেস্টুরেন্ট মালিকরা ভবনটির নিচ তলায় জননিরাপত্তার তোয়াক্কা না করেই বিপুল পরিমাণে গ্যাস সিলিন্ডার মজুত করে। ভবন নির্মাণের পর থেকেই অবহেলা ও অসাবধানতায় বিপজ্জনক এই গ্যাস সিলিন্ডারগুলো নিচ তলায় সিঁড়ির প্রায় বেশিরভাগ অংশ জুড়ে রাখা হয়। আর এই সুযোগটি স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠান ও ‘গ্রিন কোজি কটেজ’- ভবনের স্পেস ওনারদের পক্ষ থেকে করে দেওয়া হয়।

নিচ তলায় চায়ের দোকান ‘চুমুক’ থেকে শুরু করে দোতলায় ‘কাচ্চি ভাই’, তার উপরে ‘মেজবানি রেস্টুরেন্ট’, ‘খানা’স ফ্লাগশিপ’, ‘স্ট্রিট ওভেন’, ‘জেষ্টি’, ‘হাক্কা ঢাকা’, ‘শেখহলি’, ‘ফয়সাল জুসবার’, ‘তাওয়াজ’, ‘পিজ্জাইন’, ‘ফোকো’, ‘অ্যাম্ব্যোশিয়া’ নামীয় সব রেস্টুরেন্টর গ্যাস সিলিন্ডার ছিল নিচ তলায় সিঁড়ির অর্ধেকজুড়ে। ফলে সিঁড়ির যে পর্যাপ্ত জায়গার প্রয়োজন ছিল তা সিলিন্ডারের কারণে ব্যাহত হয়।

‘গ্রিন কোজি কটেজ স্পেস ওনার অ্যাসোসিয়েশন’ বা তাদের অবহেলার বিষয়ে জানা ছিল না বলে প্রাথমিক তথ্য বিবরণীতে আসেনি বলে জানান অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মামলা দায়েরকারী রমনা মডেল থানার এসআই (নিরস্ত্র) মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘স্পেস ওনার অ্যাসোসিয়েশনের বিষয়ে আমার জানা ছিল না। তাৎক্ষণিক আমরা যে তথ্য পেয়েছি সেটা মামলাতেই উল্লেখ করেছি। এখন মামলার তদন্তে যিনি আছেন পুরো বিষয়টি তিনি দেখবেন।’

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রমনা মডেল থানার এসআই (নিরস্ত্র) আবু আনছার রবিবার (৩ মার্চ) বেলা সাড়ে তিনটায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্পেস ওনার অ্যাসোসিয়েশনের বিষয়টি আমরা অনুসন্ধান করছি। এখনও কাউকে খুঁজে পাইনি। আমরা খুব গুরুত্ব সহকারে বিষয়টি দেখছি। এই চাপে এখনও দুপুরের ভাত পর্যন্ত খাইনি।’

এদিকে বেইলি রোডে আগুনে হতাহতের ঘটনায় রাজউকের সাত এবং ফায়ার সার্ভিসের পাঁচ সদস্যের দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও রবিবার ঘটনাস্থলে কাউকেই পাওয়া যায়নি। রাজউকের তদন্ত কমিটির একজন কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, আমরা তদন্ত করছি। শিগগরিই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবো।

স্পেস অ্যাসোসিয়েশনের বিষয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন দিলে তখন জানতে পারবেন কে বা কারা জড়িত ছিল। স্পেস অ্যাসোসিয়েশন সম্পর্কেও এই কর্মকর্তা কোনও তথ্য দিতে পারেননি।

তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। তবে ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা মো. শাহজাহান শিকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নানা ব্যস্ততার কারণে এখনও তদন্ত প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। বলা চলে এখনও শুরুই করতে পারে নাই। তদন্ত প্রতিবেদন আসলে বা এর কি অগ্রগতি হয় তা আমরা মিডিয়াতে জানিয়ে দেবো।

বেইলি রোডের স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, আদতে ভবনটির স্পেস ওনার অ্যাসোসিয়েশন নামে যে সংগঠন তার অস্তিত্ব নিয়ে শঙ্কা আছে। অন্যান্য ফ্ল্যাট মালিকদের সঙ্গে ‘এএমপিএম’ গ্রুপের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে বৈঠক হতো। তবে আলাদা করে কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি জানা নেই, ভবনকেন্দ্রিক সব কিছু ম্যানেজার দেখতেন। দুর্ঘটনার পর যারা স্পেস ওনার ছিল তারা কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন কেউবা আত্মগোপনে।

এদিকে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের জনসংযোগ প্রধান গাজী আহমেদ উল্লাহ্ গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করে বলেন, ‘বিল্ডিংয়ের মালিক আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ নয়। শুধু জয়েন্ট ভ্যানচারে নির্মাণ কাজটি (ডেভেলপার হিসেবে) আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ সম্পন্ন করেছে। এই নির্মাণ প্রক্রিয়ায় রাজউকের বিল্ডিং কোডসহ সংশ্লিষ্ট সকল নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। ২০১৫ সালে অর্থাৎ ৯ বছর আগে ভবনটির নির্মাণ কাজ শেষ হলে মালিকানাও হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে ভবনটির কার্যক্রম পরিচালনাসহ সার্বিক তত্ত্বাবধান করছে ‘গ্রিন কোজি কটেজ স্পেস ওনার অ্যাসোসিয়েশন।’

আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের জনসংযোগ প্রধান গাজী আহমেদ উল্লাহর কাছে ‘গ্রিন কোজি কটেজ স্পেস ওনার অ্যাসোসিয়েশন’ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘এর সঠিক তথ্য আমার কাছে নেই। আমি আপনাকে জেনে জানাচ্ছি।’ নির্মাণ প্রক্রিয়ায় রাজউকের বিল্ডিং কোডসহ সংশ্লিষ্ট সকল নিয়ম অনুসরণ করা হলে ভবনে সেফটি সিকিউরিটি নেই কেন? ফায়ার ডোর কোথায়? মাত্র একটি সিঁড়ি। সেটিও সিলিন্ডারের দখল কেন ছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে গাজী আহমেদ উল্লাহ্ বলেন, ‘আমাদের কোম্পানি হস্তান্তর করে দেওয়ার পর সেটা পুরোপুরি গ্রিন কোজি কটেজ স্পেস ওনার অ্যাসোসিয়েশনের দায়িত্বে আছে। এখন আমাদের কোম্পানির কোনও দায়িত্ব নেই।’

ভবনটিতে অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কে স্থপতি ও ভিসতারা আর্কিটেক্টসের প্রধান মুস্তাফা খালিদ পলাশ বলেন, ‘বাণিজ্যিক ভবনে ন্যূনতম দুটি সিঁড়ি থাকতে হবে। বেইলি রোডের ভবনটির ছিল মাত্র একটি সিঁড়ি। তাছাড়া আগুন ও ধোঁয়া থেকে বাঁচতে বের হওয়ার জরুরি পথ (সিঁড়ি) ওখানে ছিল না। এখনকার অধিকাংশ ভবনে ফায়ার ডোর খুলে ফেলা হয়, যত্রতত্র রাখা হয় গ্যাস সিলিন্ডার। যার ফলে সবাই ঝুঁকিতে থাকে।’

বাণিজ্যিক ভবনে রেস্টুরেন্টের বিষয়ে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘বেইলি রোডে যে ধরনের ঘটনা ঘটেছে এরকম আবার না ঘটুক এটা আমরা সবাই চাই। কোথাও নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে শুধু নোটিশ না দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। যার ত্রুটি থাকবে তার বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নেবে। সেটা যদি কোনও ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে হয় তবে ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে, আর যদি সংস্থা বা ভবন মালিকের বিরুদ্ধে হয় তবে সেটা তার বিরুদ্ধে। সবকিছু বাণিজ্যিকীকরণ করা হবে আর সেটার মাধ্যমে মানুষের জীবন চলে যাবে, এটা হতে পারে না।’

/আরআইজে/
টাইমলাইন: বেইলি রোডে আগুন
০৩ মার্চ ২০২৪, ২৩:৪৫
উধাও ‘গ্রিন কোজি কটেজ’-এর স্পেস ওনাররা
০২ মার্চ ২০২৪, ২১:৫১
সম্পর্কিত
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
কদমতলীতে ইন্টারনেট সার্ভিসের ৩ কর্মীকে মারধর
কালশী বস্তিতে আগুন: একটি ঝগড়ার জেরে পথে শতাধিক পরিবার
সর্বশেষ খবর
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম