বেইলি রোড ট্র্যাজেডি

‘বাঁচার চেষ্টায় অনেকে লাফ দিচ্ছিলেন ছাদ থেকে’

সাদ্দিফ অভি
০৩ মার্চ ২০২৪, ১৭:৩৮আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৪, ১৮:০৫

বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজের চতুর্থ তলায় খানা’স রেস্টুরেন্টে পাঁচ মাস ধরে কাজ করতেন ফরিদপুরের মোজাহিদুল ইসলাম জোবায়ের। সেদিন রাতে আগুন লাগার পর জোবায়ের প্রাণ বাঁচাতে ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়েন নিচে। প্রাণে বেঁচে গেলেও হাসপাতালের বিছানায় আছেন চিকিৎসাধীন। তার মেরুদণ্ড এবং পায়ে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন আছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। 

রবিবার (৩ মার্চ) হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সে রাতের ভয়াবহ ঘটনার বর্ণনা দেন জোবায়ের। তিনি বলেন, ‘সেদিন যখন আগুন লাগে, তখন আমি কফি বানাচ্ছিলাম। আমাদের ক্যাশিয়ার সে সময় বিরতিতে ছিলেন। আমাদের সব স্টাফকেই সন্ধ্যায় ২০ মিনিটের জন্য ব্রেক দেওয়া হয়। সবাই এক-এক করে ব্রেকে যান। স্যারও (ক্যাশিয়ার) তখন ব্রেক নিতে গিয়েছিলেন। তিনি নিচে থেকে ফোন করে বললেন—আগুন লাগছে। তোমরা সবাই ওপরে যাও। আমরা সবাই তাড়াহুড়ো করে ওপরে গেলাম। প্রথমে আমরা নিচে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। এত পরিমাণ ধোঁয়া ছিল যে নিচে যাওয়ার মতো অবস্থা ছিল না। না পেরে ছাদে গেলাম সিঁড়ি দিয়ে। আমাদের সঙ্গে আরও অনেকে গিয়েছিলেন। অনেকেই ভয় পেয়ে ছাদ থেকে লাফ দিচ্ছিলেন। মানুষ চিৎকার করছিল, চোখে-মুখে অনেক আতঙ্ক ছিল। সবাই চেষ্টা করছিল বাঁচার জন্য। তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম একজন।’

তার মতে, একপর্যায়ে আগুন আর ধোঁয়া সমান তালে বাড়ছিল। আমি তখন ছাদ বেয়ে নামার চেষ্টা করি। ভেবেছিলাম নেমে যেতে পারবো। তখন নামতে গিয়ে হাত স্লিপ করে পড়ে যাই। ছাদের কোনায় এসি ছিল, সেটি ধরে নামতে যাই আমি। সেটা ধরার পরই পড়ে যাই নিচে। তারপর আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়।

ওপর থেকে পড়ে গিয়ে জোবায়ের পা এবং মেরুদণ্ডে আঘাত পান। তিনি বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। 

জোবায়েরের মতো প্রাণ বাঁচাতে লাফ দিয়েছিলেন ‘কাচ্চি ভাই রেস্টুরেন্ট’- এর কর্মী ইকবাল হোসেন। আগুন লাগার পর ইকবাল রেস্টুরেন্টের ভেতরেই ছিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি পাঁচতলা থেকে লাফ দিয়ে নামার সময় কোমর ও পায়ে আঘাত পান।

ইকবাল জানান, সিঁড়ি দিয়ে আরও দুটি তলা পর্যন্ত উঠে সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন তিনি। ততক্ষণে নিচের তলা আর দোতলায় থাকা রেস্টুরেন্টগুলো থেকে মানুষ বের হয়ে সিঁড়িতে জড়ো হচ্ছিলেন। মুহূর্তের মধ্যেই অনেক মানুষ সিঁড়িতে অবস্থান নেন। সিঁড়ি পুরোটা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল। তখন শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছিল। আমি তখন পাঁচতলার একটি রেস্টুরেন্টে যাই এবং গ্রিলের ফাঁক দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করি। আমার দেখাদেখি অনেকেই চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ফাঁক সরু হওয়ায় পারছিলেন না। তাই অনেকেই বের হতে পারেননি। আমি সেখান থেকে নামতে গিয়ে নিচে পড়ে যাই।

গত বৃহস্পতিবার (২৯ ফেব্রুয়ারি) রাত ১০টার দিকে বেইলি রোডের ‘গ্রিন কোজি কটেজ’ নামে একটি ভবনের নিচতলায় আগুনের সূত্রপাত হয়। এরপর খুব অল্প সময়েই পুরো ভবনে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। নিচতলায় আগুন লাগার কারণে ভবনটির ওপরের তলাগুলোতে আটকে পড়েন অনেকে। প্রাণ বাঁচানোর জন্য ওপর থেকে অনেক মানুষ লাফিয়ে পড়েন। সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করেও পারেনি অনেকে।

ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, সিঁড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার থাকার কারণে পুরো সিঁড়িটি ‘অগ্নি চুল্লির’ মতো হয়ে গিয়েছিল, যার কারণে কেউই সিঁড়ি ব্যবহার করে নামতে পারেনি।

ফায়ার সার্ভিস বলছে,  বেশিরভাগ মানুষ আগুনে পুড়ে নয়, বরং তারা ধোঁয়ার কারণে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে মারা গেছেন। এর আগে তারা অচেতন হয়ে পড়ে ছিলেন। ভবনটিতে আগুন নেভানোর তেমন কোনও ব্যবস্থা ছিল না বলেও জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।    

ঘটনার পর পর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নিয়ে আসা হয় ১৪ জনকে । এর মধ্যে ১১ জনকে ভর্তি করা হয়। তাদের মধ্যে ৮ জনকে চিকিৎসা শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তিন জন সেখানে চিকিৎসাধীন আছেন। চিকিৎসকরা জানান, আহত সবারই শ্বাসতন্ত্রে ইনজুরি হয়েছে। এখনও যারা চিকিৎসাধীন আছেন, তারা কেউই শঙ্কামুক্ত নন।

অপরদিকে বেইলি রোডের ঘটনায় আহত ২ জন বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বাকিদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকরা জানান, তাদের দুজনেরই অস্ত্রোপচার লাগবে।

প্রসঙ্গত, গত ২৯ ফেব্রুয়ারি রাতে বেইলি রোডের আগুনে নারী শিশুসহ ৪৬ জন মারা যান। তাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৪৪ জনের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি দুই জনের মরদেহ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মর্গে রাখা হয়েছে। দুই জনের মধ্যে একজন অজ্ঞাত হিসেবে রয়েছেন। অজ্ঞাত মরদেহ এবং অভিশ্রুতি শাস্ত্রী ওরফে বৃষ্টি খাতুনের শরীর থেকেও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

/এপিএইচ/এমওএফ/
টাইমলাইন: বেইলি রোডে আগুন
০৩ মার্চ ২০২৪, ১৭:৩৮
‘বাঁচার চেষ্টায় অনেকে লাফ দিচ্ছিলেন ছাদ থেকে’
০২ মার্চ ২০২৪, ২১:৫১
সম্পর্কিত
৩০০ ফিটে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় চীনা নাগরিকের মৃত্যু
দিল্লিতে আগুনে ৮ বাংলাদেশি আহত, গুরুতর অবস্থা তিন জনের
কদমতলীতে ইন্টারনেট সার্ভিসের ৩ কর্মীকে মারধর
সর্বশেষ খবর
কুমিরের আক্রমণে সন্তানের মৃত্যুর পর ফজিলাকে খুঁজে পেলো পরিবার
কুমিরের আক্রমণে সন্তানের মৃত্যুর পর ফজিলাকে খুঁজে পেলো পরিবার
ট্রাফিক আইন সবার জন্য সমান, পুলিশ সদস্য হলেও ব্যবস্থা: ডিএমপি কমিশনার
ট্রাফিক আইন সবার জন্য সমান, পুলিশ সদস্য হলেও ব্যবস্থা: ডিএমপি কমিশনার
ফ্রিল্যান্সারদের আয় থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কর কাটা নিয়ে যা বলছে এনবিআর 
ফ্রিল্যান্সারদের আয় থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কর কাটা নিয়ে যা বলছে এনবিআর 
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী