X
সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১, ৬ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

অন্ধদের দেশে সিদ্দিকুর রহমানের চোখ

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০১৭, ১৩:৫৮

আরিফ জেবতিক মাত্র ৩ বছর বয়সে বাবা হারা হয়েছিলেন সিদ্দিকুর রহমান। দরিদ্র সংসারের মা অন্যের বাড়িতে কাজ করেছেন, দিনমজুর বড় ভাই দিন আনি দিন খাইয়ের অনিশ্চয়তা ভরা জীবনে সংসার সামলেছেন। কিন্তু কোনও অবস্থাতেই সিদ্দিকুরের চোখের স্বপ্নকে তারা নিভে যেতে দেননি। সেই সিদ্দিকুর, পিতাহারা, গৃহকর্মী মা আর দিনমজুর ভাইয়ের সিদ্দিকুর; তাই হয়তো চেয়েছিলেন দ্রুত লেখাপড়া শেষ করতে, একটা কাজকর্মে ঢুকে মায়ের কষ্ট দূর করতে।
রাষ্ট্র এই সিদ্দিকুরের স্বপ্নকে ধারণ করেনি, লালন করেনি বরং উপহাস করেছে। সিদ্দিকুররা হয়ে পড়েছেন গিনিপিগ। হাজার হাজার সিদ্দিকুরের সোনালি তারুণ্য বৃথা যাচ্ছে খামখেয়ালিতে। দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ের টানপোড়নে আটকে আছে তাদের পরীক্ষা। একেকজন তরুণ, যাদের কাঁধে মায়ের প্রত্যাশা ভাইয়ের স্বপ্ন; যারা দাঁতে দাঁত চেপে দারিদ্র্য আর সুযোগহীনতার বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে অন্তত এই রাজধানীর বড় কোনও কলেজ পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছেন, তাদের স্বপ্নকে আটকে রেখেছে রাষ্ট্রের লাল ফিতা। আমার কাছে যা হয়তো একটা দিন, সিদ্দিকুরদের কাছে সেই দিনটিই একেকটা মাস কিংবা বছর।
এই অসহায় অবহেলিত ছাত্রদের খোঁজ নেওয়ার মতো করে কেউ নেয়নি। না সরকার, না মিডিয়া, না সুশীল সমাজ না আমাদের আত্মকেন্দ্রিক রাজনীতি।
মরিয়া সিদ্দিকুরদেরকে তাই নিজেদের পরীক্ষার দাবিতে পথে নামতে হয়েছে। আর এই সময়ে এসে আমাদের রাষ্ট্র, আমাদের সরকার শুধু সিদ্দিকুরদের উপহাস করে শেষ করে দেয়নি, তাদেরকে অন্ধ করে দেওয়ার নিষ্ঠুরতায় মেতেছে।
পরীক্ষার দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের দানবীয় হামলাকে কোনোভাবেই জায়েজ করার কোনও উপায় নেই। পুলিশ হামলা করে না বা হামলা করতে পারবে না, আমাদের বাস্তবতা এমন নয়। রাজধানী শহরে এই দেশের সবচাইতে বড় কলেজগুলোর ছাত্ররা যখন একজোট হয়ে রাস্তায় নামার চেষ্টা করবে, তখন সেই আন্দোলন যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায় সেটি অবশ্যই পুলিশ বিশেষ নজর দিয়ে দেখবে। কিন্তু সেদিনের ঘটনাপ্রবাহে দেখা যায় শাহবাগে জড় হওয়া এই ছাত্ররা কোনও উস্কানিতে যায়নি। তারা রাস্তায় নেমেই গাড়ি ভাংচুর শুরু করেনি, পুলিশের প্রতি আক্রমণাত্মক হয়নি। তারপরও তাদেরকে প্রচণ্ড চাপের মুখে কর্মসূচি সংক্ষিপ্ত করতে হয়েছে।এবং তারা ফিরে যাওয়ার সময়ে ন্যূনতম কারণ ছাড়াই পুলিশ সরাসরি তাদের দিকে তাক করে টিয়ার গ্যাসের সেল মেরেছে। সিদ্দিকুরের মাথায় তাক করে মারা এই টিয়ার গ্যাসের সেল আসলে টিয়ার গ্যাস ছড়ানোর জন্য মারা হয়নি, মারাই হয়েছে টিয়ারসেলের ভারি সেলের আঘাতে একজনকে মেরে ফেলার উদ্দেশ্য নিয়ে। সিদ্দিকুর মারা যাননি কিন্তু তার দুটো চোখ হয়তো চিরদিনের জন্য হারিয়েছেন।

জন্মের ৩ বছর পরে পিতা হারানো সিদ্দিকুর জীবনের বাকি সব চ‌্যালেঞ্জের মুখোমুখি বারবার দাঁড়াতে দাঁড়াতে যখনই স্বপ্নের কাছাকাছি এসেছেন তখনই এই রাষ্ট্রের দানবীয় উল্লাসে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেননি, চোখ ধরে পড়ে গেছেন রাজপথে।

টিয়ারগ্যাস মেরে ছত্রভঙ্গ করার ইতিহাস এদেশে নতুন নয়। কিন্তু গত কয়েকবছর ধরে যে নতুন ট্রেন্ড দাঁড়িয়েছে তা আগে ছিল না। আগে আরও অনেক বেশি উত্তেজনা ও সংঘাতপূর্ণ অবস্থাতেও পুলিশ যখন টিয়ারগ্যাস মারত তখন তা ওপরের দিকে তাক করে মারত। এতে সেল অনেক দূরে পড়ে ‌গ্যাস ছড়িয়ে দিত।

ইদানীং পুলিশ অনেক বেশি ‘ট্রিগার হ্যাপি’ হয়ে গেছে। গত কয়েকবছর ধরে টিয়ারগ্যাস আর ওপরের দিকে তাক করে মারা হয় না, সরাসরি আন্দোলনকারীদের ওপরে মারা হচ্ছে। গ্যাসের চাইতে গ্যাসবাহী ধাতব সেল দিয়ে মানুষকে হত্যা করার ইচ্ছেটাই এখানে প্রকট বলে মনে হয়। এর শুরু হয়েছে বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকালীন বিক্ষোভের নামে দেশব্যাপী টার্গেট করে পুলিশদের ওপর আক্রমণের পর থেকে। কিন্তু আত্মরক্ষা আর আক্রমণ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এই যে জিঘাংসায় উন্মত্ত হয়ে একটি অচেনা অজানা মানুষকে খুন করার জন্য তার দিকে তাক করে নির্বিকারে গ্যাসের সেলের ট্রিগার চেপে দেওয়া -এই পরিবর্তনটা কেন হচ্ছে সেটা আমাদের এখনই খুঁজে বের করতে হবে এবং এই পাশবিক মানসিকতাকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে হবে। এই উন্মত্ততাকে যদি রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয় দেওয়া হয় তাহলে ফ্রাংকেস্টাইনের হাত থেকে আমরা কেউই মুক্তি পাবো না।

বাংলাদেশে পুলিশদেরকে অনেক ধরনের সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বিশ্রামহীন অতিরিক্ত কাজের চাপ, অসাধু রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ, অভ্যন্তরীণ লজিস্টিকসের অভাব- সব মিলিয়ে তাদের মানসিক অবস্থা সুস্থ থাকার মতো নয়। কিন্তু সেই মানসিক সমস্যা যদি তাদের সদস্যদেরকে এমনভাবে প্রভাবিত করতে শুরু করে যে সাধারণ মানুষকে বিনা উস্কানিতে খুন করার পর্যায়ে নিয়ে যায়, তাহলে সেটিকে জরুরিভাবে মোকাবিলা করতে হবে। আর বিষয়টি যদি আসলে এমন হয় যে পুলিশকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কোনোভাবেই এই দেশে কোনও প্রতিবাদ করার সুযোগ দেওয়া হবে না, এমনকি শান্তিপূর্ণ মিছিল দেখলেও মারমুখী হয়ে নির্যাতন করতে হবে- তাহলে আমাদের উচিত বড় গলায় প্রশ্ন করা, ‘কী হচ্ছে এসব?’ পুলিশি বাড়াবাড়িকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য উন্নত বিশ্বে বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি রাখা হয়েছে। নির্যাতিত কেউ চাইলেই ক্ষতিপূরণ ও শাস্তির দাবিতে মামলা করতে পারে। যুক্তরাজ্যে আইপিসিসি নামে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন কমিশন আছে যারা পুলিশের যে কোনও আচরণকে তদন্ত করতে পারে। আমাদের দেশে এই ব্যবস্থাগুলো চালু করার জন্য দাবি জোরদার করা দরকার।

এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পুলিশ নাগরিকের সেবক, নাগরিকের হত্যাকারী হিসেবে যদি সে চিহ্নিত হতে থাকে তাহলে সেটিকে নিয়ন্ত্রণের জন্য নাগরিককেই তাই সোচ্চার হতে হবে।

সিদ্দিকুর তার চোখ হারিয়েছেন, আমরা যারা এখনও চোখে দেখতে পাচ্ছি, আমরা যেন চোখ বুজে বসে না থাকি।

লেখক: ব্লগার অ্যান্ড অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

ভারতকে হারানো জিডিপি: অহম নাকি আশঙ্কা করবো?

ভারতকে হারানো জিডিপি: অহম নাকি আশঙ্কা করবো?

সর্বশেষ

প্রধানমন্ত্রীর কাছে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর খোলা চিঠি

প্রধানমন্ত্রীর কাছে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর খোলা চিঠি

লকডাউন বাড়ানো হলো যে কারণে

লকডাউন বাড়ানো হলো যে কারণে

হাইকোর্টের নজরে আনা হলো চিকিৎসক-পুলিশ বাগবিতণ্ডা

হাইকোর্টের নজরে আনা হলো চিকিৎসক-পুলিশ বাগবিতণ্ডা

চলমান শর্ত প্রযোজ্য থাকবে পরবর্তী লকডাউনে

চলমান শর্ত প্রযোজ্য থাকবে পরবর্তী লকডাউনে

করোনায় আক্রান্ত ও মৃতের নতুন রেকর্ড ভারতের

করোনায় আক্রান্ত ও মৃতের নতুন রেকর্ড ভারতের

করোনায় স্বাস্থ্য সমস্যায় বিটিভির অনুষ্ঠান

করোনায় স্বাস্থ্য সমস্যায় বিটিভির অনুষ্ঠান

আরও ৭ দিন বাড়লো লকডাউন

আরও ৭ দিন বাড়লো লকডাউন

৩০টি কবর আগে থেকেই খুঁড়ে রাখা

৩০টি কবর আগে থেকেই খুঁড়ে রাখা

মামুনুলকে ইবাদতের উপযোগী জায়গায় রাখতে বললেন আদালত

মামুনুলকে ইবাদতের উপযোগী জায়গায় রাখতে বললেন আদালত

সুপার লিগ নিয়ে ইউরোপে তোলপাড়

সুপার লিগ নিয়ে ইউরোপে তোলপাড়

লকডাউন এক সপ্তাহ বাড়ানোর কথা ভাবা হচ্ছে: কাদের

লকডাউন এক সপ্তাহ বাড়ানোর কথা ভাবা হচ্ছে: কাদের

মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে দুষ্প্রাপ্য মণিরাজ ফুল

মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে দুষ্প্রাপ্য মণিরাজ ফুল

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune