X
মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল ২০২১, ৬ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

রোহিঙ্গা সন্ত্রাস, পরিণাম অশুভ

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৩:২৮

শান্তনু চৌধুরী কয়েকদিন পরেই বন্ধুরা পরিবার-পরিজন নিয়ে বেড়াতে যাচ্ছে কক্সবাজার। বেশ ইচ্ছে ছিল যাবার। কিন্তু ছুটি নেই অজুহাতে এগিয়ে গেলাম। প্রকৃতপক্ষে বিষয়টা হচ্ছে, রোহিঙ্গারা আসার পর থেকে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত দেখার যে ইচ্ছে, সেটা মরে গেছে। সে কারণে আর যাওয়াই হয়নি কক্সবাজার। যেহেতু রোহিঙ্গাদের ফেরার কোনও সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না, তাই কখ্নও যাওয়া হবে কিনা ভাবার বিষয়। যারা বাইরে থাকি, তাদের কথা বাদই দিলাম। স্থানীয়রা এখন সেখানে ‘নিজ গৃহে পরবাসী’ জীবনযাপন করছেন, আর ধীরে ধীরে যেটা বাড়ছে, সেটা হলো সন্ত্রাস। এই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী জনসংখ্যা উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে যে হারে সন্ত্রাসের দিকে ঝুঁকছে, তাতে যেকোনও সময় প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারকে স্বাধীন ভূখণ্ড দাবি করে বসতে পারে! এই ধারণা যে অমূলক নয়, তা দ্বিতীয়বার প্রত্যাবাসন ব্যর্থ হওয়ার পর রোহিঙ্গা শিবিরকে ঘিরে ঘটতে থাকা কর্মকাণ্ড এবং তাদের নিয়ে যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্বেগ রয়েছে, তাতে বোঝা যায়। আর তা নিয়ে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে কক্সবাজারবাসী বেশ আতঙ্কিত। কারণ প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী তো তারাই।
পুলিশের মাসিক প্রতিবেদন বলছে, রোহিঙ্গারা ক্যাম্পে অবস্থান করার পর থেকে জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধে। খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি, চোরাচালান, ধর্ষণ, ডাকাতি, মানবপাচারসহ নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে তারা। গত ২১ মাসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যেসব অপরাধ হয়েছে, তার মধ্যে ৩২৮টি ঘটনায় মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা ৭১১ জন। এর মধ্যে খুনের ঘটনা রয়েছে ৩১টি, অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে ১৯টি ও মাদক উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে ১১৮টি। কক্সবাজারের উখিয়া টেকনাফের ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে সক্রিয় রয়েছে ১৫টির বেশি সন্ত্রাসী বাহিনী। এসব গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে যেমন সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটাচ্ছে, তেমনি স্থানীয় অর্থাৎ দেশের জন্যও হুমকি হয়েছে উঠছে সন্ত্রাসী রোহিঙ্গারা। যার বড় প্রমাণ গত সাড়ে চার মাসে খুন হয়েছে ৩২ রোহিঙ্গা। ২০১৬ সালের ১৩ মে টেকনাফের মুছনী রোহিঙ্গা শিবিরের পাশে শালবন আনসার ক্যাম্পে হামলা চালায় হাকিম বাহিনী। সে সময় আনসার কমান্ডার আলী হোসেনকে গুলি করে হত্যা করে নিয়ে যায় ১১টি আগ্নেয়াস্ত্র। সেই নৃশংসতার কথা এখনো ভুলতে পারেন না স্থানীয়রা। তার মধ্যে স্থানীয় যুবলীগ কর্মী, যিনি রোঙ্গিাদের সব সময় সাহায্য সহযোগিতা করতেন, একই সঙ্গে তার বাবা আওয়ামী লীগ নেতা কয়েক একর পাহাড়ি জমি দিয়ে দিয়েছিলেন রোহিঙ্গাদের, তাকে কয়েকমাস আগে খুন করে রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গা সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসী যে দিন দিন বাড়ছে, সেটি আরো প্রমাণ হয় খোদ সংসদীয় কমিটি রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করায়। বিশেষ করে তাদের টিনেজ ছেলেদের মধ্যে যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে, এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তাদের ব্যবহার করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংসদীয় কমিটি। এই আশঙ্কা মোটেই অমূলক নয়। রোহিঙ্গারা ইতোমধ্যে সমাবেশ করে তাদের বিশালতা জানান দিয়েছে। আর তারা যে বিভিন্ন এনজিও সংস্থার মদতপুষ্ট, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, অনেক রোহিঙ্গাকে নাকি বলে দেওয়া হয়েছে স্থানীয় সাংবাদিক এলে কথা না বলতে, প্রয়োজনে তাদের মারধর করতে। এটা কতো বড় আতঙ্কের কথা!

অভিযোগ রয়েছে, রোহিঙ্গাদের মদত দিচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনীও। সেটা তারা তাদের স্বার্থে দিতেই পারে। কিন্তু চোখ কান খোলা রাখতে হবে। এরই মধ্যে এনজিও’র নাম করে দেশীয় অস্ত্রের নামে রোহিঙ্গাদের জন্য অস্ত্র বানাতে গিয়ে ধরা পড়ার ঘটনাও প্রকাশ হয়েছে। এসব অস্ত্র কোনও রাইফেল বা পিস্তল না হলেও এই অস্ত্রগুলো দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা বা জখমের ঘটনা ঘটানো যায় বেশি। ধারাবাহিক অপরাধের জন্য আলোচিত রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী বাহিনী যদি এখনই নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তবে তারা দেশের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠবে। কারণ স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে, যেসব সশস্ত্র ডাকাতদল রোহিঙ্গা শিবিরে রয়েছে, বিশেষ করে পুরাতন রোহিঙ্গাদের মধ্যে তারা অনেকেই মিয়ানমারের চর হিসেবে কাজ করে। তারা সাধারণ রোহিঙ্গাদের উদ্বুদ্ধ করে, যাতে তারা ফিরে না যায়। রোহিঙ্গাদের কারণে মাদক চোরাচালানের একটা বড় রুট হয়ে উঠেছে আমাদের দেশ। মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবাসহ নানা মাদক ঠেকাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারি বাহিনীকে। এর মধ্যে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারাও যাচ্ছে অনেকে। গত বুধবার রাতেও এমন তিন রোহিঙ্গা মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে।

আমরা অতিথিপরায়ণ জাতি। শুরুতে রোহিঙ্গার ঢলকে আমাদের দেশ স্বাগত জানালেও ধীরে ধীরে সেটি ‘হরিষে বিষাদে’ পরিণত হয়। এখন সবাই চান তাদের ঠেলে পাঠাতে। মন্ত্রীরা বলেন, তাদের সুবিধা বন্ধ করে দেবেন। প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের বিভিন্ন সম্মেলনে তাদের ফেরত নেওয়ার জন্য মিয়ানমারকে চাপ দিতে বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের ভয় দেখান, আর তাদের অত্যাচারে ইঁদুর ছানা হয়ে স্থানীয়রা ভয়ে মরেন। কিন্তু শুধু কথায় আর চিড়ে ভিজবে কি? এমনিতে তাদের আদর আপ্যায়ন করে অনেকটা সময় পার হলো। যত দিন যাচ্ছে, ভেতরে-বাইরে তাদের মদতদাতা বাড়ছে। মিয়ানমার তাদের পরাক্রমশালী বন্ধুদের কারণে বাংলাদেশকে থোড়াই কেয়ার করছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ উপস্থিতি তাই ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে বাংলাদেশকে। আমরা যেন ভুলে না যাই শান্তিবাহিনীর কথা। তারা এক সময় পাহাড়কে অস্থির করে রেখেছিল। সেখানে এখন কিছুটা হয়তো শান্তির সুবাস এসেছে। তেমনি রোহিঙ্গারা ধীরে ধীরে যদি সন্ত্রাস দানব হয়ে ওঠে, সেটি ঠেকানো দুঃসাধ্য হবে বৈকি। এখন রাতের আঁধারে নাকি আরো অনিরাপদ হয়ে উঠছে রোহিঙ্গা ক্যাম্প। তাদের প্রতি কঠোর মনোভাব নিয়ে এগোতে হবে সরকারকে। ক্যাম্পের ভেতরে অবৈধভাবে বাজার বসানো বন্ধ করতে হবে, ক্যাম্পে লাইট পোস্ট এবং সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা জরুরি। অবৈধ মোবাইল সিম বন্ধ করা দরকার। ক্যাম্পে কাঁটাতারের বেড়া তৈরি, মাদ্রাসা তৈরির ক্ষেত্রে দৃষ্টি রাখা এবং পুলিশের নিরাপত্তার কথা ভেবে বেশিসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতির পাশাপাশি নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। অশিক্ষা, ক্ষুধা, দারিদ্র্য রোহিঙ্গাদের ঠেলে দিচ্ছে সন্ত্রাসের পথে। কারণ ভালোভাবে বেঁচে থাকার যে সংগ্রাম, সেটা তাদের অনৈতিক পথ বেছে নিতে বাধ্য করছে। কিন্তু রাষ্ট্রের তো এসব প্রশ্রয় দিলে চলবে না। মুষ্টিমেয় মানুষের জন্য সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের অকল্যাণ কখনো কাম্য হতে পারে না। মদতদাতা এনজিও থেকে শুরু করে সবাইকে কঠোর আইনের মধ্যে এনে বাঁধতে হবে। মনোভাবেও আনতে হবে পরিবর্তন। তবেই হয়তো রোহিঙ্গারা সুযোগ পাবে না সন্ত্রাসী হিসেবে বেড়ে ওঠার। নইলে শেষের সেদিন কিন্তু হবে ভয়ঙ্কর।

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

কিশোরদের সামনে আদর্শ কারা?

কিশোরদের সামনে আদর্শ কারা?

‘এক ওসি কারাগারে, শত ওসি থানার পরে’

‘এক ওসি কারাগারে, শত ওসি থানার পরে’

আহারে ঈদ!

আহারে ঈদ!

যে-ই পারছে, সাংবাদিক মারছে!

যে-ই পারছে, সাংবাদিক মারছে!

শহর ছাড়ি, গ্রামে ফিরি!

শহর ছাড়ি, গ্রামে ফিরি!

সর্বশেষ

‘স্থিতিশীল পর্যায়ে খালেদা জিয়া’

‘স্থিতিশীল পর্যায়ে খালেদা জিয়া’

হাওরে ধান কাটা শ্রমিকের কোনও সংকট নেই: সিলেট বিভাগীয় কমিশনার

হাওরে ধান কাটা শ্রমিকের কোনও সংকট নেই: সিলেট বিভাগীয় কমিশনার

মোস্তাফিজের উদযাপন চলছে, তবে পথ হারিয়েছে রাজস্থান

মোস্তাফিজের উদযাপন চলছে, তবে পথ হারিয়েছে রাজস্থান

বিদ্যুৎস্পৃষ্টে সহকর্মীর মৃত্যু, গার্মেন্টস শ্রমিকদের বিক্ষোভ

বিদ্যুৎস্পৃষ্টে সহকর্মীর মৃত্যু, গার্মেন্টস শ্রমিকদের বিক্ষোভ

পদ্মায় গোসলে নেমে স্কুলছাত্রের মৃত্যু

পদ্মায় গোসলে নেমে স্কুলছাত্রের মৃত্যু

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরের মৃত্যু

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরের মৃত্যু

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে হেফাজত নেতারা বললেন ‘কিছু বলার নাই’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে হেফাজত নেতারা বললেন ‘কিছু বলার নাই’

মামুনুল হকের রিসোর্টকাণ্ড: সোনারগাঁও থানার ওসিকে বাধ্যতামূলক অবসর

মামুনুল হকের রিসোর্টকাণ্ড: সোনারগাঁও থানার ওসিকে বাধ্যতামূলক অবসর

ওয়ালটনের অল ইন ওয়ান পিসি

ওয়ালটনের অল ইন ওয়ান পিসি

সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি: যুক্তরাজ্যের রেড লিস্ট-এ ভারত

সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি: যুক্তরাজ্যের রেড লিস্ট-এ ভারত

ভাইয়ের হাতে পুলিশ কর্মকর্তা খুনের অভিযোগ

ভাইয়ের হাতে পুলিশ কর্মকর্তা খুনের অভিযোগ

ঘরে বসে আকর্ষণীয় ডিসকাউন্টে ওয়ালটনের পণ্য

ঘরে বসে আকর্ষণীয় ডিসকাউন্টে ওয়ালটনের পণ্য

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune