X
সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১, ৬ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

পশ্চিম বাংলার ক্ষেতে-খামারে যেন না ঢোকে গরুর রাজনীতি

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৭:৪৪

গর্গ চট্টোপাধ্যায় অনেকে হয়তো এই লেখাটি সকালে কাজে যেতে যেতে বাসে-ট্রামে-ট্রেনে-মেট্রোতে পড়বেন স্মার্টফোনে। কেউ হয়তো ল্যাপটপে পড়বেন সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরে, চান করে খাওয়ার টেবিলে। ভেবে দেখুন, খেতে বসেছেন। ফ্রিজে একটু মাংস রাখা আছে। কাল বা পরশু রান্না করা হবে। স্ত্রী খাবার বাড়ছেন। বুড়া বাপ সোফায় বসে। হঠাৎ শতশত লোক এসে আপনাকে, আপনার বাবাকে টেনে নিয়ে গেল। হঠাৎই।
তারপর অনেকে মিলে আপনাকে আধমরা করল, আপনার বাবাকে মেরেই ফেলল। তারপর চলে গেল। আপনার দুনিয়াটা শেষ হয়ে গেল। কারণ আপনার ফ্রিজে রাখা প্যাকেটে সেই মাংস এই খুনিদের, এই পাপীদের ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে’ আঘাত করেছে। উত্তর প্রদেশের দাদরিতে ঠিক এই ঘটনাটাই ঘটেছে। মুহম্মদ আখলাক খুন হয়েছেন। তার লাশের মাংসের চেয়ে তার ফ্রিজের মাংসকে শনাক্ত করতে যে পাপীষ্ঠদের বেশি মাথাব্যথা, তাদেরই গুরু-ভাইরা দিল্লির মাধ্যমে এই বাংলাকেও শাসান এবং কোনও একদিন শাসন করার স্বপ্ন দেখেন। দাদরি কোথায় জানেন? নয়ডা-তে। সেই নয়ডা যেখানে আপনি, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি, আপনার ছেলে-মেয়েকে আপনি পাঠাতে উৎসুক, যাতে তারা ‘আরও বড়’ হয়। এইটা হলো নয়ডা। শিকড়হীন যুব সমাজের ঝিনচ্যাক আর গরুর জন্য মানুষ খুন, এই নিয়ে সেখানকার সংস্কৃতি।

ভাগ্যিস ‘আরও বড়’ হইনি, রয়েছি বঙ্গবাসী হয়ে, নয়ডাবাসী হইনি। বিহারের মানুষের বড়ই দুর্ভাগ্য। একটা নির্বাচন যেটা কিনা তাদের সামনে শিক্ষা-স্বাস্থ্য-নারী অধিকার-জাতভিত্তিক বৈষম্য এবং আরও কত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচিত হবার সুযোগ এনে দিয়েছিল, কিছু ঘৃনার কারবারী সেই নির্বাচনকে গরু-কেন্দ্রিক নির্বাচনে পরিণত করতে চায় জনগণকে ভেড়া বানিয়ে। আর বাকি রাজ্যেও তারা ঢোকাতে চায় গরুর পাল, চালাতে চায় গরুর হাড়-শিং-মাংস নিয়ে ফেসবুক, এসএমএস, হওয়াট্সঅ্যাপের ছবি ও ঘৃনা চালাচালির রাজনীতি। যে সময়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও আয়ের দিক থেকে সামান্য এগিয়ে থাকা আফ্রিকা মহাদেশের সাথে মহাসম্মেলনে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও আয়ের দিক থেকে আফ্রিকার থেকেও গড়ে পিছিয়ে থাকা ভারতীয় সংঘরাষ্ট্র গরিব জনতার টাকায় সস্তা বারফাট্টাই করে আফ্রিকাকে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত ‘সাহায্য’ করার নানা চুক্তি করে, একই সময়ে আমাদের এই পোড়ার রাষ্ট্রে আত্মহত্যারত কৃষক, বেকার যুবক, ক্ষুধার্ত মা, রোগাক্রান্ত দাদু ও অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সামনে হাজির করা হচ্ছে তাদের সব সমস্যার এক দাওয়াই – গরুকে মা রূপে পুজো করা। আমরা যারা রোজ পেট পুরে খেতে পাই, যাদের আয় করার মোটামুটি একটা নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা আছে, তাদের একটা দায় আছে এই ষড়যন্ত্রের আগুনে হাওয়া না দেবার। বিজয়া দশমী, কালী পুজো সবে গেল। তার মাঝে মানুষের জীবনের ইস্যুগুলোকে তুচ্ছ করে গরু, গরু করা একটা পাপ। আমরা বাঙালি। মা দুর্গা আমাদের মা। মা দুর্গা আমাদের দেখেন এবং তিনি সবকিছুই দেখেন। হিন্দুস্তানি এলাকায় গরু নিয়ে রাজনীতি দেখে এখানে কিছু লোকের মনে কী কী ফন্দি মাথায় আসছে, তিনি সেটাও দেখছেন।

তিনি আমাদের হাড়ে হাড়ে চেনেন। আমাদের একটু সাবধান হওয়া উচিত। পাপ-পূণ্য বলে একটা ব্যাপার আছে, যেটা গরু-ভেড়া-ছাগলের-শুয়োরের অনেক উপরে।

আমরা বঙ্গবাসী। আমরা মাকে মা বলে জানি আর গরুকে গরু বলে জানি। আমার মায়ের দুটো পা। গরুর চারটে পা। দুটো যাতে গুলিয়ে না ফেলি, এবং দুনিয়াকে চেনার সঠিক শিক্ষা পাই, তার জন্য আমার মা ও ঠাকুমা ছোটবেলায় আমাকে অনেকবার ‘আস্ত একটা গরু’ বলে বকাবকি করেছেন, উচিত শিক্ষা দিয়েছেন।

অনেক ক্ষেত্রে ‘শুয়োর’ বলে গালি দিয়েছেন আমাকে আমার মা। সেই শিক্ষায় আমরা মানুষ হয়েছি। যে মা আমাকে ‘গরু’ বলে গালি দিয়ে শিক্ষা দিত, আজ কারোর প্ররোচনায় যদি গরুকে মা বলে ডাক দিই, তাহলে আমাদের মায়ের শিক্ষা ব্যর্থ। বাংলা মায়ের অযোগ্য সন্তান হবার শখ আমার নেই। আজ বাইরে থেকে নানা তত্ত্ব আমদানি করে বাঙালিকে কেউ কেউ মাকে ও গরুকে নতুন করে চেনানোর ঠিকাদারি নিয়ে বাংলায় ঘনঘন যাতায়াত করছে। এদের যাতায়াতের খাই-খরচা দিয়ে বাংলার মাটিতে বসেই ১৯৪৩-র মন্বন্তরে অশুভ লাভ করা গণশত্রু মজুতদারের নাতি-পুতিরা আরেকটা মহামৃত্যু ঘটানোর ফন্দি আটছে আরও বড় মুনাফার জন্য। তারা দিল্লির সাথে ষড়যন্ত্র করে এককালে বাংলা ভাগ করেছে, কলকাতাকে নিংড়ে নিয়েছে, তারা রক্ত শুষেছে বাংলার মানুষের, কিন্তু তাদের
রক্তের খাই মেটে নাই। পৃথিবীতে সবচেয়ে ভয়ানক হলো অহিংসার কীর্তন করা মানুষের চোরাগোপ্তা সহিংসতা। জল বেশি দূর গড়ানোর আগেই এই খেলার নেপথ্য খেলোয়াড়দের জার্সির রং, ক্লাবের তাঁবুর ঠিকানা, সব চিনে নেওয়া প্রয়োজন। বাংলার স্বার্থে। শান্তি-রক্ষার স্বার্থে। মানবতার স্বার্থে।

বাংলার বাইরে অর্থাৎ মুম্বাই, গুরগাঁও, ছত্তিসগড়, রাজস্থান ইত্যাদি নানা জায়গায় সম্প্রতি গরু পেরিয়ে ভেড়া, ছাগল ও মুরগির দিকেও হাত পড়েছে ধর্মের দোহাই দিয়ে। আমি শাক্ত, আমার চৌদ্দ পুরুষ শাক্ত, আমরা কালিঘাটে পাঠাবলি দিই মাকে তুষ্ট করতে, সেই বলির মাংস আমাদের কাছে মায়ের প্রসাদ। সেই প্রসাদকে যারা হেয় করে, ঘেন্না করে, সেটাকে নিষিদ্ধ করে ধর্মের দোহাই দিয়ে, তাদের ধর্ম আমাদের নয়। সে ধর্মের প্রভাব থেকে মা কালী আমাদের রক্ষা করে আসছেন, করে যাবেন। মা কালীর বাংলায় আমাদের যারা নিরামিষাশী গরু-ছাগল বানাতে চায়, তাদের ঠাঁই নাই। আজ কলকাতা শহরের বেসরকারি হাসপাতালে মুমূর্ষু রোগীকে নিরামিষ খেতে দেওয়া হয় মালিকের
ধর্মীয় ‘অনুভূতি’ অনুযায়ী, চিকিৎসা বিজ্ঞানে কিছু ক্ষেত্রে আমিষ-প্রোটিন পথ্য বলে দেওয়া সত্ত্বেও। আমাদের অজান্তেই আমাদের ঘর বেদখল হয়ে যাচ্ছে না তো? এরা গরুতে থামবে না, এরা ছাগলে থামবে না, এরা সুজলা সুফলা বাংলাকে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান বানিয়ে তবে থামবে।

শুয়োর-গরু-ছাগলের পাল যদি আমাদের এই বাংলার সোনালী-সবুজ ক্ষেতে ঢুকে শত শত বছর ধরে মানুষের রক্তে-ঘামে-ভালবাসায়-বোধে-বিশ্বাসে তৈরি করা সহাবস্থানের ফসল ধ্বংস করতে চায়, তাহলে মা কালীকে সাক্ষী রেখে কালিপটকার চেইন বাঁধা দরকার। সে কালী পটকার চেইন লাগিয়ে দেওয়া দরকার বাইরের শত্রুর লেজে। তারপর আলতো করতে একটু আগুন জ্বালালেই পাপাত্মা থেকে মুক্তি। ব্যাপারটা সিরিয়াস। অনেক কালের, অনেক যুগের, অনেক সিঞ্চনের, অনেক প্রেমের
ফসল এই বাংলার মাটি। এই মাটিতে আমরা খাল কেটে কুমির ডাকবো নাকি এ মাটির ফসল লালন করব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বঙ্গবাসীর জন্য, সিদ্ধান্তটা আমাদের।
ব্যক্তিগতভাবে সিদ্ধান্তটা আমি নিয়ে ফেলেছি। তাই ঘরে কালিপটকা মজুত রেখেছি জন্ম থেকেই। আসলে ওই মজুত করা কালী-পটকা আমি কিনিনি। কিনেছিল আমার পূর্বপুরুষেরা। অনেক শতক আগে। সেই থেকে ঘরে আছে। মাঝে মাঝে ওগুলোকে ছাদে নিয়ে রোদে তা দেওয়াই। কে জানে কখন কাজে লাগে। মা দুর্গাকে প্রার্থনা করি যেন কখনও কাজে না লাগে, কিন্তু হিন্দুস্তানি এলাকার হাল-হকিকত দেখে আজকাল একটু ঘনঘনই ছাদে উঠি। রোদে তা দিই এবং মেঘের রং দেখি। আমরা ঘরপোড়া। অনেকের সিঁথির সিঁদুর উজাড় হয়েছে, অনেকের সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হয়েছে, অনেকের জান-মাল নষ্ট হয়েছে, ভিটামাটি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে ১৯৪৭-এর আগেকার গরু-ভেড়ার রাজনীতিতে। পূর্ববঙ্গে সে রাজনীতি ধিকিধিকি আজও চলছে। ভিটা ছেড়ে তারা আজও আসছে এই বাংলায়। এই লেখাটা যেদিন লিখছি, তার আগের দিন ফেনীতে একটা ঘটনা ঘটে গেছে। পূর্ববঙ্গে
লক্ষ্মী পূজায় বাজি ফাটানোর ‘দোষে’ গর্ভাবস্থায় থাকা এক হিন্দু নারীকে প্রচণ্ড মারা হয়েছে, মারা গেছে তার গর্ভের অজাত শিশুটি। এও কি ৪৭-এর আগের সবর্ণ হিন্দু জমিদারের অত্যাচারের ফল? এখনও কি আমরা শাক দিয়ে মাছ ঢাকবো? এখনও বলব গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হলো ধর্মীয় সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত? আমরা আর কতদিন নিজেদের ভুল বোঝাব। নাকি ভুলটাই বুঝতে চাই, কারণ ঠিকটা আরও ভয়ানক। খুব পচা গন্ধ বেরোচ্ছে- আর ঢাকা যাচ্ছে না।আমাদের একটা দায়িত্ব আছে। রোগ না ছড়ানোর। রোগ সারানোর। মা কালী সবার মঙ্গল করুন।

লেখক: স্থিত মস্তিষ্ক-বিজ্ঞানী, কলকাতা, হার্ভার্ড থেকে পিএইচডি প্রাপ্ত।

.

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

সৌমিত্রের মৃত্যুতে যুগাবসান: ঠিক কোন যুগের অবসান?

সৌমিত্রের মৃত্যুতে যুগাবসান: ঠিক কোন যুগের অবসান?

সর্বশেষ

ময়মনসিংহের করোনা ইউনিটে বেড়েছে ৩ আইসিইউ বেড

ময়মনসিংহের করোনা ইউনিটে বেড়েছে ৩ আইসিইউ বেড

ঈদের আগে লকডাউন শিথিল হবে

ঈদের আগে লকডাউন শিথিল হবে

জান্তা সরকারের বন্দি নির্যাতনের ছবি প্রকাশ, মিয়ানমারে বাড়ছে ক্ষোভ

জান্তা সরকারের বন্দি নির্যাতনের ছবি প্রকাশ, মিয়ানমারে বাড়ছে ক্ষোভ

ফেসবুক অ্যাকাউন্টের জেরে পান্থ কানাইয়ের জিডি

ফেসবুক অ্যাকাউন্টের জেরে পান্থ কানাইয়ের জিডি

ব্যাংকে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার হচ্ছে না

ব্যাংকে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার হচ্ছে না

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আ.লীগের সম্পাদকের দুই পায়ে সন্ত্রাসীদের গুলি (ভিডিও)

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আ.লীগের সম্পাদকের দুই পায়ে সন্ত্রাসীদের গুলি (ভিডিও)

নাভালনির মৃত্যু হলে রাশিয়াকে ভুগতে হবে: যুক্তরাষ্ট্র

নাভালনির মৃত্যু হলে রাশিয়াকে ভুগতে হবে: যুক্তরাষ্ট্র

বার্সেলোনায় মেসির বাবা, ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত!

বার্সেলোনায় মেসির বাবা, ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত!

প্রধানমন্ত্রীর কাছে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর খোলা চিঠি

প্রধানমন্ত্রীর কাছে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর খোলা চিঠি

লকডাউন বাড়ানো হলো যে কারণে

লকডাউন বাড়ানো হলো যে কারণে

হাইকোর্টের নজরে আনা হলো চিকিৎসক-পুলিশ বাগবিতণ্ডা

হাইকোর্টের নজরে আনা হলো চিকিৎসক-পুলিশ বাগবিতণ্ডা

চলমান শর্ত প্রযোজ্য থাকবে পরবর্তী লকডাউনে

চলমান শর্ত প্রযোজ্য থাকবে পরবর্তী লকডাউনে

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune