সেকশনস

মৌসুমি বনাম আন্তরিক লেখক

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৫:৪৭

বিধান রিবেরু বইমেলা কাছাকাছি চলে এলে যদি মন আনচান করে বই বের করার জন্য, লেখক হিসেবে খ্যাতি পাওয়ার জন্য যদি বইমেলাকেই বেছে নিতে মন চায়, অথবা অন্য সব খ্যাতি থাকা সত্ত্বেও মেলা এলে যদি মনে হয়, একখানা বই বের না করলে চলছেই না, কতজনের তো দশ-বারোটা করে বেরুচ্ছে, তাছাড়া অন্য কর্মক্ষেত্রের খ্যাতি কাজে লাগিয়ে যদি মেলার সময় লেখক হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া যায়, মন্দ কী? এমন ভাবনা যদি আপনার মনে জাগ্রত হয়, তাহলে আপনি মৌসুমি লেখক। অর্থাৎ বইমেলার মৌসুমে আপনার লেখক হওয়ার সাধ জাগে।
আরেক ধরনের লেখকগোষ্ঠী আছে, যারা লেখালেখির ব্যাপারে আন্তরিক। তারা খ্যাতির মোহে লেখেন না। তারা নিজের নামের আগে আরও দশটা বিশেষণের মতো ‘লেখক’ শব্দটি যোগ করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন না। এমনকি তারা প্রকাশকের দ্বারে ‘মুরগি’ হয়ে কড়াও নাড়েন না। তারা যা করেন, তা হলো একনিষ্ঠ হয়ে নিজের কাজটি করে যান। লেখালেখিই তাদের ধ্যান ও জ্ঞান। এরপর সেই লেখা তারা কোনও পত্রিকা বা অনলাইন পোর্টালে পাঠিয়ে দেন ছাপানোর জন্য। কখনও সেটাও করেন না। জীবনানন্দের মতো ট্রাংকে ভরে রাখেন।

এই আন্তরিক লেখকদের ভেতর আবার আরেকটা ধরন আছে। যারা নিজের লেখালেখির ব্যাপারে আন্তরিক, পাশাপাশি লেখক হিসেবে সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠার জন্য হ্যাংলামো করতেও তাদের বাধে না, তারা নিজেদের লেখক পরিচয়ের প্রচার ও প্রসার ঘটাতে যতটা তন্নিষ্ঠ, লেখার মান উন্নয়নে ততটাই যেন উদাসীন।

মেলাতে বই এলেও কোনও কোনও লেখক নিজের প্রকাশনীর স্টলে তো দূরে থাক, মেলার দিকেও পা বাড়ান না। কিন্তু পাঠক ঠিক ঠিক তাদের বই খুঁজে খুঁজে সংগ্রহ করে, পাঠ করে, প্রতিক্রিয়া জানায়। আরেক কিসিমের লেখক আছেন, যারা দিনরাত স্টলের ভেতর বসে থাকেন, খ্যাতিমান ও অখ্যাত দুই শ্রেণিরই, তারা পাঠক আসামাত্র বইয়ে নিজেদের স্বাক্ষর দিয়ে বই বিক্রির পাঁয়তারা করেন। এতে মেলায় আগত অনেকে বিব্রত হন। কিন্তু বইটা তো বিক্রি হলো! তাতেই লেখকের চরম সুখ। মজার বিষয় হলো, এই লেখকরা কিন্তু মেলা থেকে অন্য লেখকদের বই কেনেন না। শুধু নিজের বই বিক্রিতেই তাদের আনন্দ!

তো এই খ্যাতির কাঙাল ও মৌসুমি লেখকদের অনেকেই মেলাতে অবিরাম টিভি ক্যামেরা আর পত্রিকার সাংবাদিকদের পেছনে পেছনে ঘুরঘুর করেন। যদি একটিবার তার চেহারা বা বইয়ের খবর প্রচার করা যায়। অবশ্য এতে দোষের কিছু দেখি না। নিজের বইয়ের খবর সবাই রাষ্ট্র করতে চায়। সমস্যা হলো এই প্রতিযোগিতায় ঢাকা পড়ে যায় সত্যিকারের আন্তরিক ও মুখচোরা লেখকরা। আর তাছাড়া লেখকরা যখন টিভি ক্যামেরার সামনে নিজেদের বদনখানি দেখানোর জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েন, তখন ব্যাপারটির মধ্যে কদর্য ভাবই বেশি ফুটে ওঠে। লেখকের কেন ক্যামেরার পেছনে ছুটতে হবে? ক্যামেরাই না ছুটবে লেখকের পেছনে!

ধ্যানমগ্ন ও আন্তরিক লেখকরা নিজেদের গুটিয়ে রাখার ফলে অনেক সময় আলোচনা বা পুরস্কারের আলো তাদের সৃষ্টিকর্মের ওপর এসে পড়ে না। সব আলো যে কেড়ে নিয়েছেন সেসব প্রচারবুভুক্ষু লেখকের দল! এই বুভুক্ষুরা শুধু যে মেলা চলাকালীন নিজেদের দিকে ফোকাস টেনে রাখতে চান, তা কিন্তু নয়, মেলা শেষে তাদের সদ্য প্রসব করা বইটি নিয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন, বিভিন্ন পুরস্কারের মঞ্চে। তদবির থেকে শুরু করে নানাজনকে দিয়ে বিচারকদের ফোনাঘাত করে যেতেই থাকেন। পারলে সশরীরে উপস্থিত হন আয়োজক বা বিচারকদের বাড়িতে। আবার উল্টোটাও হয়, পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে বণ্টন হয় পুরস্কার। এতে অনুল্লেখিত রয়ে যায় অনেক মানসম্পন্ন কাজ।

সাহিত্য ব্যবসা ও তার রাজনীতির ভেতর না ঢুকে যারা একাগ্রচিত্তে সাহিত্য সাধনা করে চলেছেন তিনিই প্রকৃত আন্তরিক লেখক। বাকিরা হয় ধান্দাবাজ লেখক, নয়তো মৌসুমি লেখক। বহু লেখক দেখবেন দেশের অনেক বড় বড় সাহিত্য পুরস্কার বাগানোর পর নিজেরাই ভাগাড়ে চলে গেছেন, মানে সাহিত্যের এলাকায় আর তাদের দেখা যায়নি। ভাবখানা এমন, যেন পুরস্কারটিই ছিল তাদের একমাত্র চাঁদমারি। আবার আরেক দল আছেন, যারা হারিয়ে যান না, কিন্তু পুরস্কারকে লক্ষ্য করেই সৃষ্টি করে চলেন। সৃষ্টির আগেই তারা হিসাব করে রাখেন এই বছর কোন পুরস্কারটি তার চাই। তারপর যেনতেন একখানা বই দিয়ে পুরস্কারটি বোগলদাবা করেন। যারা প্রভাবশালী ব্যক্তি, লেখক হিসেবে এসব পুরস্কার তো তাদের কাছে কোনও ব্যাপারই নয়, চাইলেই পান। আর নিভৃতে সৎ ও আন্তরিক লেখক ঘাড় গুঁজে শুধু লিখে যান।
তবে আমার বিশ্বাস, এই আন্তরিক লেখকরা যদি একবার আলোর নিচে চলে আসেন, জীবদ্দশায় বা মরণের পর, তাদের আর কেউ ঠেকাতে পারেন না। তাদের সেই সাফল্য তখন পুরস্কারের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসতে থাকে। অনেক জনপ্রিয় ও পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকই শেষ পর্যন্ত চর্চিত ব্যক্তিত্বের অধিকারী হন না, কিন্তু সৎ লেখক, তাদের লেখনীর ভেতর দিয়ে কাল্ট ফিগারে পরিণত হন। তবে এমন কোনও কথা নেই যে পুরস্কার কেবল ধান্দাবাজ, অসৎ ও মৌসুমি লেখকরাই পান। পুরস্কার পরিশ্রমী ও আন্তরিক লেখকরাও পান। আসলে পুরস্কারদাতাদের সেটি করতে হয়, নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষার খাতিরেই, অন্তত বাংলাদেশে।

ভালো লেখকের আসল পুরস্কার তো পাঠক সমাজ, সেটা আমরা জানি। কিন্তু মৌসুমি লেখক যারা, তারাও কিন্তু ব্যাপক পাঠক পান। তবে পার্থক্য হলো, প্রথমটি গড়ে ওঠে শক্ত ভিতের ওপর, কালকে অতিক্রম করতে করতে। আর মৌসুমি লেখকের পাঠকেরা মৌসুম শেষ হলে উবে যান কর্পূরের মতো। এসব লেখকের বই ধ্রুপদীর মর্যাদা পায় না। যে গাছ তর তর করে বাড়ে, ঝড়ে সেই গাছটিই আগে ভেঙে পড়ে। আর যে গাছের শেকড় অনেকদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয় ধীরে ধীরে, সেই গাছ কালের নানা ঘাত-প্রতিঘাতেও ভেঙে পড়ে না। বটবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে থাকে, আর পাঠকদের ছায়া, ফল ও শীতল বাতাস দিতে থাকে। এমন বটবৃক্ষ হবে না জেনেও, নগদ খ্যাতি প্রাপ্তির লোভে তারা অর্থ ব্যয় করেন পাঠককে আকৃষ্ট করার জন্য। এটা কখনও কখনও আন্তরিক লেখকদের জন্য বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বেদনা থাকা ভালো। আন্তরিক লেখকদের জন্য সেটা বটিকার মতো। আর ব্যথা, বেদনা ছাড়া কি লেখক হওয়া যায়?

শেষ কথা এটাই বলতে চাই, অজস্র মৌসুমি ও অর্ধশিক্ষিত লোকদের বইপত্র পাঠককে বিভ্রান্ত করে, এমনকি কদাচিৎ প্রতারিতও করে। এসব বইয়ের প্রচার ও প্রচারণার কারণে পাঠক ভালো বইয়ের খোঁজ পান না। এটা কাম্য নয়।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র সমালোচক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

‘মুগ্ধতার সড়ক’ সম্প্রসারণের নামে পাহাড় কেটে সাবাড়!

‘মুগ্ধতার সড়ক’ সম্প্রসারণের নামে পাহাড় কেটে সাবাড়!

সংকট নিরসনে আগাম নির্বাচনে সম্মত আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী

সংকট নিরসনে আগাম নির্বাচনে সম্মত আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী

টিভিতে আজ

টিভিতে আজ

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কলকাতার রূপঙ্করের গান (ভিডিও)

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রূপঙ্কর বাগচির গান (ভিডিও)

কলাবাগানে ধর্ষণের পর হত্যা: তদন্ত প্রতিবেদন ২১ মার্চ 

কলাবাগানে ধর্ষণের পর হত্যা: তদন্ত প্রতিবেদন ২১ মার্চ 

দুই ঘণ্টার আগুনে পুড়লো ৩০ দোকান, ক্ষতি ৫ কোটি টাকার 

দুই ঘণ্টার আগুনে পুড়লো ৩০ দোকান, ক্ষতি ৫ কোটি টাকার 

যুবককে ফাঁসাতে ভাঙা হলো ‍আশ্রয়ন প্রকল্পের ৩২ পিলার

যুবককে ফাঁসাতে ভাঙা হলো ‍আশ্রয়ন প্রকল্পের ৩২ পিলার

হোয়াইট হাউজে থাকতেই টিকা নেন ট্রাম্প ও মেলানিয়া

হোয়াইট হাউজে থাকতেই টিকা নেন ট্রাম্প ও মেলানিয়া

ট্রেনে ঘটছে ছিনতাই, থামছে না ঢিল ছোঁড়ার ঘটনা

ট্রেনে ঘটছে ছিনতাই, থামছে না ঢিল ছোঁড়ার ঘটনা

গুরুতর অসুস্থতা ৮০ শতাংশ কমাতে পারে করোনার টিকা

গুরুতর অসুস্থতা ৮০ শতাংশ কমাতে পারে করোনার টিকা

ভিক্ষুকের টাকা ছিনতাই!

ভিক্ষুকের টাকা ছিনতাই!

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ওআইসি বাংলাদেশের পাশে থাকবে

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ওআইসি বাংলাদেশের পাশে থাকবে

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.