X
রবিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২১, ৫ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

ব্যর্থ মিডিয়ায় তৈরি নির্লিপ্ত বাংলাদেশ

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০১৫, ১৭:২০

Arif Jebtikমিডিয়া আমাদেরকে জানায় ফাঁসির আগের দিন সাকা আর মুজাহিদের খাবারের মেনু ছিল মুরগির মাংস, গরুর মাংস, সাদাভাত আর সবজি। আমি সিলেট থেকে বাসে ফিরছিলাম, আমার সামনেই একজন খবরটি পড়ে পাশেরজনকে বলে, ‘আহা, ডাল দেওয়া উচিত ছিল, রাতের বেলা ডালমেখে দুইটা ভাত খাওয়া যায়।’ আমি লোকটির দিকে তাকাই। আমাদের মায়াবি বাঙালি, শত আঘাত সহ্য করেও তাঁর মায়া শেষ হয় না, তাই সাকা আর মুজাহিদ রাতের বেলা ডাল খায়নি, এই কষ্টটা লোকটির চোখেমুখে লেগে থাকবে আরও বহুদিন। সে ভুলে যাবে, এই সেই সাকা চৌধুরী, এই সেই মুজাহিদ-তাদের হাতে এবং তাদের প্ররোচনায় খুন হওয়া লোকগুলো ভাত পায়নি। শহীদ আজাদ নির্যাতনে মৃতপ্রায় হয়ে শেষ সময়ে ভাত খেতে চেয়েছিলেন, আজাদের মা পরদিন ভাত নিয়ে গিয়ে দেখেন আজাদকে ওরা মেরে ফেলেছে- সেই কষ্ট বুকে চেপে আজাদের মা আর কোনওদিন ভাত মুখে তুলেননি। এই বেদনা ফাঁসির রাতে বারংবার উচ্চারিত হওয়ার দরকার ছিল, তার বদলে আমরা সাকা চৌধুরীর ভাতের সঙ্গে মুরগির মাংস আর গরুর মাংসের খবর পড়েছি।

এই দুঃসময়ে জনতার যে মিডিয়া, সেই ফেসবুক বন্ধ করে রেখেছে সরকার, কিন্তু মূলধারার মিডিয়া সুকৌশলে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে সহানুভূতি তৈরির সব চেষ্টাই করে যাচ্ছে। ব্যালেন্সিংয়ের নামে সাকা-মুজাহিদের পক্ষের লোকজনকে টিভিতে ডেকে আনা হচ্ছে, যারা উদ্ভট সব কথা বলে ১% সত্যের সঙ্গে ৯৯% মিথ্যা মিশিয়ে যাচ্ছে এবং তার প্রতিবাদ করার মতো যথেষ্ট তথ্য যারা দিতে পারেন, তাঁদেরকে যথেষ্ট পরিমাণ সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। ফাঁসির রাতেই টিভিতে আমার সঙ্গে একজন বিএনপি সমর্থিত আইনজীবী নেত্রী বসেছিলেন, তিনি দাবি করলেন যে ট্রাইবুনাল এক ধরনের ক্যামেরা ট্রায়াল হচ্ছে, কারণ তিনি একবার ট্রাইবুনালের বিচারকাজ দেখতে গিয়েছিলেন, তাঁকে বলা হয়েছে যে তিনি আইনজীবীর গাউন পরে ঢুকতে পারবেন না, পরে তিনি গাউন খুলে ট্রাইবুনালের বিচারকাজ দেখতে সক্ষম হন। এমন নয় যে তাঁকে ট্রাইবুনালে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, তবু তিনি গাউন পরে ঢুকতে না পারার কথা তুলে মিডিয়ায় এমন ভাব করলেন যে ট্রাইবুনালের বিচার কাজ আসলে ক্যামেরা ট্রায়াল হচ্ছে। ট্রাইবুনালকে বিতর্কিত হিসেবে প্রমাণ করার হেন চেষ্টা নেই যুদ্ধাপরাধীরা করেনি। ট্রাইবুনালের কম্পিউটার থেকে ড্রাফট রায়ের কপি চুরি করে ‘রায় বাইরে থেকে তৈরি করা’ এরকম করে মিডিয়ার সামনে হাজির করেছিল সাকা চৌধুরীর পরিবার। আমাদের সেনশেনাল মিডিয়া সেটাকে হাইলাইটের চূড়ান্ত করেছে। কিন্তু পরে যখন দেখা গেল রায় ট্রাইবুনাল থেকে চুরি হয়েছে তখন মিডিয়া তেমন উচ্চবাচ্য করেনি।

মিডিয়া এমনভাবে পরিস্থিতি তৈরি করছে, যেখানে একাত্তরের এই নৃশংস খুনিরা চিত্রিত হচ্ছে মহামানবের কাছাকাছি। এরাই গোলাম আযমের জানাজাকে সরাসরি সম্প্রচার করেছে, কিন্তু জাতীয় মসজিদে কীভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণাকারী যুদ্ধাপরাধীদের জানাজা হতে পারে, সে ব্যাপারে কোনও প্রশ্ন তুলেনি। এরা যুদ্ধাপরাধীদের সন্তানদের সাক্ষাৎকার ঘণ্টায় ঘণ্টায় প্রচার করে, কিন্তু শহীদদের পরিবারের বেদনার কথা, এই ফাঁসির লগ্নে তাঁদের আবেগ অনুভূতির কথা তুলে ধরার ব্যাপারে তেমন কোনও আগ্রহ দেখায় না।

আর মিডিয়াকে এককভাবে অভিযুক্ত করার বাইরেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে একতাবদ্ধ বাদবাকিদেরও এই বিজয়লগ্নের উদাসীনতা দেখে আমি বিষ্মিত!

আশা করেছিলাম শহীদ পরিবারের সন্তানরা নিজ নিজ পিতা-মাতার ছবি বুকে ঝুলিয়ে সারারাত রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবেন। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদবেন, হাসবেন, চিৎকার দিবেন- যা খুশি করবেন। কিন্তু তাঁদেরকে আমি কোনও রাস্তায় দেখিনি। মিডিয়ায় আমি সাকা চৌধুরীর দুই ছেলেকে দেখি, মুজাহিদের ছেলেকে দেখি-এদের পেছনে দেখি এদের পরিবারের ডজন ডজন সদস্যের ছবি। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের নামে দেশে কয়েক ডজন সংগঠন আছে বলে আমার ধারণা, এদেরকে আমি জেগে উঠতে দেখি না।

৩০ শতাংশ সরকারি চাকুরি কোটা ভোগকারী সন্তানের ১ শতাংশকেও আমি রাস্তায় দেখি না। পরিচিত দুয়েকজনকে মিডিয়ায় দেখেছি বটে, কিন্তু বাকিরা এই শীতের রাতে কারাগারের সামনে ভিড় করেনি। এরা ক্ষুধার্ত মিডিয়ার চোখের সামনে ছুড়ে ফেলেনি তাঁদের শহীদ পিতার ছবি, বধ্যভূমিতে পড়ে থাকা স্তুপ করা লাশের ছবি।

আমি দেখিনি কবিদের সংগঠন একটি বিজয়ের কবিতা উৎসব করছে, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সংগঠনগুলো মাতিয়ে দিচ্ছে পথ প্রান্তর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নগরে ঘুরে ঘুরে যুদ্ধের সেই ভয়াবহতার দিনগুলোর ছবি প্রদর্শন করছে, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন কিংবা পথনাটকের জোট পথ নাটকে ফুটিয়ে তুলছে যুদ্ধদিনের কথাগুলো, মুভিক্লাবগুলো তথ্যচিত্র নিয়ে নেমেছে রাস্তায়।

অথচ এদের প্রত্যেকেই এই লড়াইয়ের বিজয়ী পক্ষ, এদের প্রত্যেকেই দশকের পর দশক ধরে বিচারের দাবিকে জিইয়ে রেখেছিলেন জন্ম থেকে প্রজন্মে। আজকে যে মিডিয়ার ভূমিকায় আমি বিরক্ত, সেই মিডিয়ায় আমার সতীর্থরাই নব্বই দশকে রাজাকার বিরোধী খবর-তথ্য-ছবি-কার্টুনে এই হায়েনার দলকে ঠেকিয়ে রেখেছিলেন।

বিচারের ফলভোগী হচ্ছে গোটা বাংলাদেশ, কিন্তু বিচার কার্যকরের সব দায় আমরা ছেড়ে দিয়েছি এককভাবে শেখ হাসিনার ঘাড়ে। মিডিয়া যখন সুকৌশলে সহানুভূতি তৈরির চেষ্টা করছে, তখন পাল্টা খবর তৈরি করতে এগিয়ে আসছে না কেউ। শাহবাগের মোড়ে শুধু রাতের পর রাত প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখছে একদল তরুণ, এর বাইরের গোটা বাংলাদেশ নীরব নিস্তব্ধ। উল্লাসে ফেটে পড়া বাংলাদেশ কোথায়?  তৃপ্তির ঘুম ঘুমিয়ে থাকা বাংলাদেশকে দেখি, কিন্তু বিজয়ী বাংলাদেশ যেন বিজয় অর্জনে একেবারেই নির্লিপ্ত। আর এই সুযোগে তলে তলে বেড়ে যাচ্ছে ঘাতকদলের সহানুভূতি তৈরির ষড়যন্ত্র।

একাত্তরের বিজয়ী বাঙালি ঘরে ফিরে গিয়েছিল বলেই অর্জিত বিজয়ের সুফল আমরা আজো ঘরে তুলতে পারিনি।

আজকে কয়েক দশকের সংগ্রামের ফলে যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজের বিজয় অর্জিত হয়েছে, তার তাৎপর্য যদি আমরা অনুধাবন না করি, আমাদের জনতার সঙ্গে যদি এই বিজয়কে ভাগাভাগি করতে না নিতে পারি, তাহলে হয়তো গুটিকয় যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি কার্যকর করা যাবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তাদের দেশবিরোধী হিংস্র চেতনাকে পরাজিত করা যাবে না।

বিজয়ী বাংলাদেশকে তার বিজয় উদযাপন করতে শিখতে হবে, কারণ বিজয়ী বাংলাদেশ যদি নির্লিপ্ত ঘুমিয়ে পড়ে, তাহলে সেই ঘুমের ঘোরেই তার ঘরের সিঁদ কেটে যাবে পরাজিত ঘাতকেরা-একথা কারও ভুলে গেলে চলবে না।

লেখক: ব্লগার অ্যান্ড অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

ভারতকে হারানো জিডিপি: অহম নাকি আশঙ্কা করবো?

ভারতকে হারানো জিডিপি: অহম নাকি আশঙ্কা করবো?

সর্বশেষ

আলেমদের গ্রেফতারে লকডাউন প্রশ্নবিদ্ধ: চরমোনাই পীর

আলেমদের গ্রেফতারে লকডাউন প্রশ্নবিদ্ধ: চরমোনাই পীর

বীর মুক্তিযোদ্ধারা পাবেন ডিজিটাল সনদ ও স্মার্ট পরিচয়পত্র

বীর মুক্তিযোদ্ধারা পাবেন ডিজিটাল সনদ ও স্মার্ট পরিচয়পত্র

আশা নিয়ে সৌদি এয়ারলাইনসের সামনে প্রবাসীদের ভিড়

আশা নিয়ে সৌদি এয়ারলাইনসের সামনে প্রবাসীদের ভিড়

১ কোটি ২৫ লাখ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে: কাদের

১ কোটি ২৫ লাখ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে: কাদের

২৪ ঘণ্টায় ১০২ মৃত্যুর রেকর্ড

২৪ ঘণ্টায় ১০২ মৃত্যুর রেকর্ড

গণমাধ্যমের ওপরে দায় চাপালেন মির্জা আব্বাস

গণমাধ্যমের ওপরে দায় চাপালেন মির্জা আব্বাস

করোনায় আক্রান্ত ৫ নারী ফুটবলার

করোনায় আক্রান্ত ৫ নারী ফুটবলার

নায়ক বাবার জানাজায় ব্যারিস্টার ছেলের আক্ষেপ

নায়ক বাবার জানাজায় ব্যারিস্টার ছেলের আক্ষেপ

আগে জীবন পরে জীবিকা: প্রধান বিচারপতি

আগে জীবন পরে জীবিকা: প্রধান বিচারপতি

এলোমেলো হেফাজত, এখনই ‘কর্মসূচি নয়’

এলোমেলো হেফাজত, এখনই ‘কর্মসূচি নয়’

যে মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে মামুনুল হককে

যে মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে মামুনুল হককে

হাসপাতালে কেমন আছেন আকরাম খান?

হাসপাতালে কেমন আছেন আকরাম খান?

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune