সেকশনস

আহ্ দুর্নীতি, বাহ্ দুর্নীতি!

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৫:১৪

রেজানুর রহমান গল্পটি আমার এক বন্ধুর কাছে শুনেছিলাম। অনেকে আছে সামান্য ঘটনাকেও অনেক রঙ চঙ দিয়ে উপস্থাপন করতে পারে। উপস্থাপনার গুণে সাধারণ ঘটনাও অসাধারণ হয়ে ওঠে। আমার ওই বন্ধুর আলাদা একটা গুণ আছে। যেকোনও ঘটনাকেই কৌতুকময় করে তুলতে পারে। তো, আসল ঘটনায় আসি। শীতকাল। মফস্বল শহরে একটি মাদ্রাসার মাঠে রাতে বার্ষিক ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। মাহফিলের একপর্যায়ে মাদ্রাসার উন্নয়ন কাজের জন্য এলাকার ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহের পর্ব শুরু হয়। এলাকার ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গ পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন অঙ্কের চাঁদা দিয়ে যাচ্ছিলেন। উপস্থাপক তাদের নাম উল্লেখ করে সৃষ্টিকর্তার কাছে রহমত কামনা করছিলেন। একপর্যায়ে তিনি মাইকে ঘোষণা দেওয়ার জন্য অতিমাত্রায় ব্যস্ত ও উৎসাহী হয়ে উঠলেন। একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের নাম জোরেশোরে উল্লেখ করে বললেন, ‘এবারের অমুক’ ব্যাংকের ম্যানেজার সাহেব আমাদের মাদ্রাসার উন্নয়ন কাজের জন্য এক লক্ষ টাকা দান করলেন। আসুন আমরা পরম করুণাময়ের নিকট প্রার্থনা করি। তিনি যেন ম্যানেজার থেকে ক্যাশিয়ার হয়ে যান। 

সেদিন আমার বন্ধুর কথায় উপস্থিত সকলে হো হো করে হেসেছিল। আমি হাসিনি। আমার বরং গল্পটা বিরক্তিকর মনে হয়েছিল। এ কেমন রসিকতা? কেউ কি কাউকে ম্যানেজার থেকে ক্যাশিয়ার হওয়ার জন্য প্রার্থনা করতে পারে? সেদিন বন্ধুর সঙ্গে তর্ক জুড়ে দিয়েছিলাম। বন্ধু, এরকম রসিকতা করা ঠিক নয়। বন্ধু সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলেছিল, শোনো এটা কিন্তু সত্য ঘটনা। আমি ওই মাহফিলে উপস্থিত ছিলাম। সবকিছু নিজের চোখে দেখেছি, নিজের কানে শুনেছি...বন্ধুকে থামিয়ে দিয়ে বলেছিলাম, তাই বলে ব্যাংকের ম্যানেজারকে কেউ ক্যাশিয়ার হবার জন্য প্রার্থনা করবে?

বন্ধু বলেছিল, শোনো উপস্থাপকের কাছে ব্যাংকের ম্যানেজার ও ক্যাশিয়ার পদ দুটি মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো টাকা। ব্যাংকে কার কাছে বেশি টাকা থাকে? ক্যাশিয়ারের কাছে। লাখ লাখ টাকা আগলে নিয়ে সে বসে থাকে অন্যকে দেওয়ার জন্য। কাজেই উপস্থাপক ভেবেছে ব্যাংকের এই লোকই সবচেয়ে বেশি ধনী ও পাওয়ারফুল। যার কাছে বেশি টাকা থাকে তাকেই উপস্থাপক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ভেবেছে এবং সেই অনুযায়ী ব্যাংকের ম্যানেজারের জন্য প্রার্থনা করেছে। 

সত্যি বলতে কী, সেদিন বন্ধুর কথায় মোটেও গুরুত্ব দেইনি। কিন্তু সম্প্রতি বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে একজন চিকিৎসকের ‘জীবনের লক্ষ্য’ শুনে শুধু অবাক নয়, বিস্মিত হয়েছি। সম্মানিত ওই চিকিৎসক প্রকাশ্যে টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে বললেন, ‘আমি ডাক্তার নই, ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ডিজির গাড়ির ড্রাইভার হতে চাই।’ এই চিকিৎসকের কথা শুনে মাদ্রাসা মাঠের সেই ওয়াজ মাহফিলের কথা মনে পড়ে গেলো। সেদিন ব্যাংক ম্যানেজারের ক্যাশিয়ার হওয়ার প্রার্থনায় অবাক হয়েছিলাম। কিন্তু আজ একজন ডাক্তারের ড্রাইভার হওয়ার ‘aim in life’ শুনে মোটেই অবাক হলাম না। কী নিষ্ঠুর বাস্তবতা। নাকি নিষ্ঠুর রসিকতা?

আসলে আমাদের দেশে অনিয়ম, দুর্নীতি, এক ধরনের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। একটা সময় দুর্নীতিবাজরা লোকলজ্জার ভয়ে জনসমক্ষে আসতে দ্বিধা করতো। আর এখন দুর্নীতিবাজরাই যেন হিরো। যে যত দুর্নীতিবাজ সে ততই বেপরোয়া। যেহেতু দুর্নীতিবাজদের সহজেই কোনও শাস্তি হয় না, তাই দুর্নীতিবাজ হওয়ার তীব্র প্রতিযোগিতা অনেকের মধ্যেই স্পষ্ট। স্বাস্থ্য অধিদফতরের গাড়িচালক মালেকের দুর্নীতিকে অনেকে পাহাড়ের সঙ্গে তুলনা করছেন। আর তাই সহজ একটি প্রশ্ন জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে তাহলো—পাহাড় তো ঢেকে রাখার কোনও বিষয় নয়। অথচ একজন ড্রাইভার দুর্নীতির পাহাড় গড়লেন। কেউ তা খেয়াল করলো না? ড্রাইভার মালেকের দুর্নীতির পাহাড় গড়ার উদ্যোগে ঘাটে ঘাটে নিশ্চয়ই অন্যদেরও সহায়তা ছিল। মালেক ধরা পড়লো। কিন্তু মালেকের মদতদাতারা কি আড়ালেই থাকবেন? আরও একটা সহজ প্রশ্ন এসেই যায়, একজন ড্রাইভার কী করে নিয়োগ বাণিজ্য করার সাহস পায়। নিয়োগপত্রে নিশ্চয়ই কোনও ড্রাইভারের স্বাক্ষর থাকে না। থাকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার স্বাক্ষর। তাহলে কি মালেকের অবৈধ কর্মকাণ্ডে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও যোগসাজশ আছে? এটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। 

একটি জাতীয় দৈনিকে ড্রাইভার মালেকের দুর্নীতি নিয়ে লিড স্টোরি প্রকাশ হয়েছে। শিরোনাম ছাপা হয়েছে ‘মালেকের পিছনে কারা?’ ঢাকা শহরের ফুটপাত ঘেঁষে একটি ব্যস্ত চায়ের দোকানে এই শিরোনামটি নিয়ে জোর তর্ক হচ্ছিল। চায়ের কাপে ঝড় তোলা তর্ক। একজন বললেন, শিরোনামটা ভালো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাজের কাজ কিছুই হবে না। দুর্নীতিবাজ সাহেদ যখন গ্রেফতার হয় তখনও পত্র-পত্রিকায় একই প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। কোনও লাভ হয়নি। সাহেদকে দুর্নীতিতে সহায়তাকারীরা আড়ালেই রয়ে গেছে। মালেক ড্রাইভারের ক্ষেত্রেও তাই হবে...বলেই ক্ষোভ ছড়ালেন বক্তা। উপস্থিত সকলেই তাকে সমর্থন জানিয়ে সমস্বরে বললো, বুঝলেন না, চোরে চোরে মাসতুতো ভাই। কাজেই চিন্তার কোনও কারণ নাই। 

এই যে চোরে চোরে মাসতুতো ভাইয়ের কথা বলা হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত চোরদের কি কোনোই বিচার হবে না? চোরদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে দেশটাতো এগোবে না। উন্নয়ন অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে। গত কয়েকদিনে দেশের প্রচার মাধ্যমে দুর্নীতির অনেক খবর ব্যাপক হতাশা ছড়িয়েছে। খবরের শিরোনামগুলো পড়লেই হতাশার চিত্রটা স্পষ্ট হবে। একটি পত্রিকায় ছাপা হয়েছে ‘খরচ বাড়লেও রেলের গতি দিন দিন কমছে।’ আরেকটি পত্রিকায় খবরের শিরোনাম হয়েছে ‘দালান ঘষা মাজাতেই দুই কোটি ৬২ লাখ টাকা।’ অন্য একটি পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ শিরোনাম হয়েছে ‘ধরা পড়া সব লুটেরার টাকাই বিদেশে।’ রাহুর গ্রাসে গরিবের ঘর। হত দরিদ্রের বরাদ্দে দুর্নীতি। বাংলাদেশের সড়ক নির্মাণ কার্যক্রমে সাধারণত কিলোমিটার প্রতি ১৮ থেকে ৩৪ কোটি টাকা খরচ হয়। কিন্তু সিলেট-তামাবিল ৪ লেনের সড়ক নির্মাণে খরচ করা হয়েছে কিলোমিটার প্রতি ৬৪ কোটি টাকা। সব শেষে গাড়িচালক আব্দুল মালেকের দুর্নীতির পাহাড় সবার মাঝে বিস্ময়ের পাশাপাশি আতঙ্কও ছড়িয়েছে। 

অতীত অভিজ্ঞতা বলে, নতুন কোনও দুর্নীতির পাহাড় সামনে না আসা পর্যন্ত আগামী কয়েকদিন হয়তো ড্রাইভার আব্দুল মালেক আলোচনা-সমালোচনার খোরাক হয়ে থাকবেন। যেমন আলোচনা-সমালোচনার খোরাক হয়েছিলেন বিশ্ব ‘টাউট’ সাহেদ। তখন মনে করা হয়েছিল এটাই বোধকরি দুর্নীতির বড় চিত্র। কিন্তু পরবর্তীতে ফরিদপুরের দুই ভাইয়ের অপরাধ ও দুর্নীতির চিত্রসহ অন্যান্য আরও কয়েকটি ঘটনা সাহেদকে আড়ালেই ফেলে দিয়েছে। এবার সামনে এলো ড্রাইভার মালেকের দুর্নীতির পাহাড়। দুয়েকদিনের মধ্যে নতুন কোনও দুর্নীতির পাহাড় কি ড্রাইভার মালেককেও ছাড়িয়ে যাবে? তাহলে দেশটা এগোবে কীভাবে?

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

করোনার যুগেও জনসমুদ্র!

করোনার যুগেও জনসমুদ্র!

আজ ভালোবাসার জন্মদিন

আজ ভালোবাসার জন্মদিন

মেয়েদের ছেলে বন্ধু!

মেয়েদের ছেলে বন্ধু!

ভুল মানুষের ডাকে ভুল পথে...

ভুল মানুষের ডাকে ভুল পথে...

নির্ভরতার ছাদগুলো সরে যাচ্ছে!

নির্ভরতার ছাদগুলো সরে যাচ্ছে!

ভালো আর আলো নিয়ে কথা!

ভালো আর আলো নিয়ে কথা!

এসব কীসের আলামত?

এসব কীসের আলামত?

কে শোনে কার কথা?

কে শোনে কার কথা?

সাকিব কেন ‘ক্ষমা’ চাইলেন?

সাকিব কেন ‘ক্ষমা’ চাইলেন?

যুক্তরাষ্ট্রেও ভোট চুরি হয়?

যুক্তরাষ্ট্রেও ভোট চুরি হয়?

ভয় কি পেলো অন্য যুবরাজেরা!

ভয় কি পেলো অন্য যুবরাজেরা!

এইখানে এক নদী ছিল

এইখানে এক নদী ছিল

সর্বশেষ

শিশু গৃহকর্মীর গায়ে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা!

শিশু গৃহকর্মীর গায়ে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা!

হারানো টাকা উদ্ধারে ‘চালপড়া’ খাইয়ে সন্দেহ, নারী শিক্ষকের জিডি

হারানো টাকা উদ্ধারে ‘চালপড়া’ খাইয়ে সন্দেহ, নারী শিক্ষকের জিডি

হ্যান্ডকাপ খুলে পালিয়েছে মাদক ব্যবসায়ী, চলছে চিরুনি অভিযান

হ্যান্ডকাপ খুলে পালিয়েছে মাদক ব্যবসায়ী, চলছে চিরুনি অভিযান

কারাগারে লেখক মুশতাকের মৃত্যু, মধ্যরাতে বিক্ষোভ

কারাগারে লেখক মুশতাকের মৃত্যু, মধ্যরাতে বিক্ষোভ

আপত্তির মুখে দেশে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা খোলার অনুমোদন

আপত্তির মুখে দেশে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা খোলার অনুমোদন

সংকট সামলাতে এলএনজি সরবরাহ বাড়ছে

সংকট সামলাতে এলএনজি সরবরাহ বাড়ছে

নির্বাচন থেকে মুখ ফিরিয়েও এবার তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বী তারা

ডিরেক্টরস গিল্ড নির্বাচন ২০২১নির্বাচন থেকে মুখ ফিরিয়েও এবার তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বী তারা

৬ বছর পর রাণীনগর আ. লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন

সভাপতি হেলাল সা. সম্পাদক দুলু৬ বছর পর রাণীনগর আ. লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন

ভেঙে পড়া গাছচাপায় নিহত ২

ভেঙে পড়া গাছচাপায় নিহত ২

প্রক্টর কার্যালয়ে শিক্ষার্থীকে পেটালো ছাত্রলীগকর্মী

প্রক্টর কার্যালয়ে শিক্ষার্থীকে পেটালো ছাত্রলীগকর্মী

ভবনের প্ল্যান পাস করিয়ে দেওয়ার নামে প্রতারণা

ভবনের প্ল্যান পাস করিয়ে দেওয়ার নামে প্রতারণা

করোনা শনাক্তের সংখ্যা ১১ কোটি ৩২ লাখ ছাড়িয়েছে

করোনা শনাক্তের সংখ্যা ১১ কোটি ৩২ লাখ ছাড়িয়েছে

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.