X
রবিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১ আশ্বিন ১৪২৮

সেকশনস

বিদেশি অনুদানে বাস্তবায়িত প্রকল্প ব্যয়ে ভ্যাট-ট্যাক্স কতটা যৌক্তিক!

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৬:৪৫

মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে ‘অনুদান’, ‘প্রকল্প’ ও ‘স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম’ বিষয়ে আইনগত ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন মনে করছি। বৈদেশিক অনুদান স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম রেগুলেশন আইন-২০১৬-এর ধারা ২-এর উপধারা–৩-এ প্রকল্পের সংজ্ঞা অনুসারে ‘প্রকল্প’ অর্থ এনজিও বিষয়ক ব্যুরো কর্তৃক অনুমোদিত কোনও প্রকল্প। একই আইনের ধারা ২-এর উপধারা ৫-এ ‘বৈদেশিক অনুদান’ অর্থ বিদেশি কোনও সরকার, প্রতিষ্ঠান বা নাগরিক অথবা প্রবাসে বসবাসরত কোনও বাংলাদেশি নাগরিক কর্তৃক বাংলাদেশের অভ্যন্তরে স্বেচ্ছাসেবামূলক বা দাতব্য কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে কোনও সংস্থা, এনজিও বা ব্যক্তিকে প্রদত্ত নগদ বা পণ্যসামগ্রী অথবা অন্য কোনোভাবে প্রদত্ত যেকোনও অনুদান, দান সাহায্য বা সহযোগিতা।

উপরোক্ত আইনি সংজ্ঞা ব্যাখ্যা করলে দেখা যায় যে, অনুদানের অর্থ নানাদিক দিয়ে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নাই। শুধু স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম বা দাতব্য কাজের ব্যবহারের উদ্দেশ্যে বৈদেশিক অনুদানের অর্থ প্রদান করা হয়। আর এনজিও বিষয়ক ব্যুরো আইন অনুযায়ী প্রস্তাবিত অনুদানভিত্তিক প্রকল্পসমূহের অনুমোদন দিয়ে থাকেন। তাই অনুদানকে অনুদানই বলা নিরাপদ। অনুদান গ্রহণ করার কতগুলো ক্ষেত্র থাকে। স্থান-কাল ও ক্ষেত্রভেদে অনুদানের বিভিন্ন রূপ হতে পারে, কিন্তু উদ্দেশ্য একই।

এনজিও বিষয়ক ব্যুরো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। যার প্রধান কাজই হচ্ছে বৈদেশিক অনুদানে স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এনজিওদের প্রস্তাবিত প্রকল্পসমূহের যথাযথভাবে যাচাই-বাচাই করে অনুমোদন প্রদান করা। এখন স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম সম্পর্কে আইনে কী বলা হয়েছে তা দেখা দরকার। বৈদেশিক অনুদান স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম রেগুলেশন আইন-২০১৬-এর ধারা ২-এর উপধারা-১০ এ-স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমের নিম্নবর্ণিত সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে: ‘স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম’ অর্থ অলাভজনক সামাজিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষামূলক কার্যক্রম, স্বাস্থ্যসেবা, সুপেয় পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন, ত্রাণ ও পুনর্বাসন, কৃষি ও কৃষি উন্নয়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, জনসচেতনতা, দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন, গণতন্ত্র ও সুশাসন, মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, প্রান্তিক ও সুবিধা বঞ্চিত মানুষের ক্ষমতায়ন ও অধিকার রক্ষা, শিশু ও কিশোর-কিশোরী, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের অংশগ্রহণ ও অধিকার রক্ষা, সম-অধিকার ও সম-অংশগ্রহণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক সম্পদ, দক্ষতা উন্নয়ন, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি, বৃত্তিমূলক কার্যক্রম, সমাজকল্যাণ, গবেষণামূলক কার্যক্রম, বিভিন্ন জাতিসত্তা, ভূমি অধিকার রক্ষা ও উন্নয়ন কার্যক্রম এবং সরকার কর্তৃক সময়ে সময়ে নির্ধারিত অন্য কোনও কার্যক্রমও ইহার অন্তর্ভুক্ত হইবে।

উপরোক্ত আইনি সংজ্ঞার বাইরে গিয়ে অনুদান ও অনুদানের মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমের নতুন করে ব্যাখ্যা বা সংজ্ঞা দেওয়ার প্রয়োজন নাই। বর্তমানে এনজিওগুলো বৈদেশিক অনুদানের এই আইনি সংজ্ঞার বাইরে কোনও কার্যক্রম পরিচালনা করছে না।

স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমের প্রয়োজন কেন? প্রয়োজন তখনই যখন কোনও দেশে সরকার কর্তৃক নাগরিকদের জন্য সার্বিকভাবে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষামূলক কার্যক্রম, স্বাস্থ্যসেবা, সুপেয় পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন, ত্রাণ ও পুনর্বাসন, কৃষি ও কৃষি উন্নয়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, জনসচেতনতা, দারিদ্র বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন, গণতন্ত্র ও সুশাসন, মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, প্রান্তিক ও সুবিধা বঞ্চিত মানুষের ক্ষমতায়ন ও অধিকার রক্ষা, শিশু ও কিশোর-কিশোরী, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের অংশগ্রহণ ও অধিকার রক্ষা, সম-অধিকার ও সম-অংশগ্রহণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক সম্পদ, দক্ষতা উন্নয়ন, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি, বৃত্তিমূলক কার্যক্রম, সমাজকল্যাণ, গবেষণামূলক কার্যক্রম, বিভিন্ন জাতিসত্তা, ভূমি অধিকার রক্ষা ও উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়ার সামর্থ্য থাকে না তখন উক্ত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অনুদান গ্রহণের মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্থা /সংগঠন/ ব্যক্তি বিচ্ছিন্নভাবে সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে অনুদান গ্রহণ করে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজগুলো বাস্তবায়ন করে থাকেন।

বর্তমানে প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমের প্রেক্ষাপট অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে। এখন মৌলিক চাহিদার পাশাপাশি মৌলিক অধিকার আদায়ের জন্য অনুদান দেওয়া হয়। অনুদান দেওয়ার জন্য বিভিন্ন দেশের সরকার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কর অব্যাহতি দিয়ে থাকেন। আমাদের দেশেও অনুদানের বিভিন্ন খাত নির্ধারিত করে দেওয়া হয়েছে, সরকার কর্তৃক অনুমোদিত খাতগুলোতে অনুদান প্রদান করলে অনুদানের অর্থ থেকে আয়কর প্রত্যাহার বা অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এটা একটা ভালো দিক।

স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যাবধি আমাদের দেশেও বিদেশি অনুদানে সরকার ও এনজিওদের মাধ্যমে ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। এসব কার্যক্রম বেশিরভাগই ব্যয় হচ্ছে নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা মেটানোর কাজে, নতুবা মৌলিক অধিকার আদায়ে সচেতনতার কাজে বা অবকাঠামো উন্নয়ন কাজে। বর্তমানে বৈশ্বিক পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে সাথে দক্ষ জনবল তৈরি করা একটি মৌলিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা তথা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা (এনজিও) তরুণদের দক্ষ করে গড়ে তোলার কাজ করছে। বিভিন্ন স্তরের কমিউনিটির সদস্যরা এখন নানাভাবে নিজ নিজ জায়গা থেকে দক্ষ হয়ে উঠছে। বেকারত্ব হ্রাসে ব্যাপক অবদান রাখছে বৈদেশিক অনুদানে পরিচালিত প্রকল্পসমূহ। যা সরকারের ৮ম পঞ্চম বার্ষিকী পরিকল্পনা ও এসডিজি অর্জনে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে।

এনজিও বিষয়ক ব্যুরো বিদেশি অনুদানে পরিচালিত এসব প্রকল্পের অনুমোদন প্রদানের সময় একটি শর্ত জুড়ে দেন এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সার্কুলার অনুযায়ী ভ্যাট-ট্যাক্স কর্তন করতে হবে। এনজিওগুলো অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণের চেষ্টা করেন। এছাড়া অনুমোদিত প্রকল্পের নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার সময় ভ্যাট-ট্যাক্স কর্তনের বিষয়টি কঠোরভাবে মনিটরিং করার জন্য অডিটর “টিওআর”-এর একটি দফা সংযুক্ত করা হয়েছে (দফা নং ২৫/ এনজিও বিষয়ক ব্যুরো’র পত্র নং ০৩.০৭.২৬৬৬৬.৬৫৭.০৪৩.২৫৩.১৩/২৫২৫, তারিখ ২০/০৩/২০১৮ইং)।

এখানে দুটো বিষয় লক্ষ করা গেছে–

১. এনজিও বিষয়ক ব্যুরো বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট স্বেচ্ছাশ্রম কার্যক্রমের প্রকল্পের অনুমোদন দিয়ে থাকে; তাহলে উক্ত স্বেচ্ছাশ্রমের কার্যক্রমের ওপর ভ্যাট-ট্যাক্স প্রযোজ্য হয় হওয়া কতটা যৌক্তিক?

২. এনবিআর থেকে এনজিওদের স্বেচ্ছাশ্রমের বা বৈদেশিক অনুদানে পরিচালিত কোনও প্রকল্পের খরচের ওপর ভ্যাট-ট্যাক্স দেওয়া বা কর্তন করা হবে কিনা, এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনও দিকনির্দেশনা/সার্কুলার বা এসআরও জারি করা হয়েছে কিনা তা আমার জানা নাই।

এনজিও বিষয়ক ব্যুরো অনুমোদন নিয়ে কাজ করেন এমন একাধিক এনজিও’র সাথে আলোচনা করে দেখা যায় যে, প্রকল্পের খাতভিত্তিক বাজেট বাস্তবায়নে ৫% থেকে ১৫% ভ্যাট ও ২% থেকে ১০% পর্যন্ত ট্যাক্স পরিশোধ করতে হয়। যার কারণে নির্ধারিত বাজেট ঘাটতি দেখা দেয় এবং ঘাটতি বাজেট দিয়ে টার্গেট অর্জন করা অনেক ক্ষেত্রে অসুবিধা হয়। প্রকল্পগুলোর কার্যক্রম শেষ করলেও মানসম্মত কাজ সম্পাদন ব্যাহত হয়। যার ফলে বঞ্চিত হয় সরাসরি উপকারভোগী তথায় দেশের প্রান্তিক জনগণ।

এছাড়া কিছু সংখ্যক আইএনজিও রয়েছে, যারা বাংলাদেশের দুই ধরনের অপারেশন করেন। এদিকে তারা নিজেরা সরাসরি প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করেন, অন্যদিকে স্থানীয় এনজিওদের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন। ইউএনওমেন, ইফাদ, জিআইজেড, জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি ইত্যাদি আইএনজিওগুলো স্থানীয় এনজিওদের মাধ্যমে যখন কাজ করতে যান তখন তারা অন্য এনজিওদের ভেন্ডর হিসেবে বা সেবা প্রদানকারী বা ঠিকাদার হিসেবে চুক্তি করেন। যার ফলে ১৫% ভ্যাট ও ১০% ট্যাক্স কর্তন করা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে। এ কারণে প্রকল্পের বাজেটের একটা বড় অংশ ভ্যাট ও ট্যাক্স পরিশোধে ব্যয় হয়ে যায়। মোট ২৫% বাজেট ঘাটতি থাকায় উন্নয়ন বা সেবামূলক কাজটি যথাযথভাবে করা সম্ভব হয় না। বঞ্চিত হয় সাধারণ উপকারভোগী। উপরে উল্লেখিত আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী এসব প্রকল্পের কাজগুলো যদি বৈদেশিক অনুদানে হয়ে থাকে, তাহলে এই প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের খাতগুলো জনকল্যাণে ব্যয় হয়, এখানে বিন্দুমাত্র ব্যবসা বা মুনাফার লেশমাত্র নাই। তাহলে সরকারকে ২৫% ভ্যাট ও ট্যাক্স পরিশোধ কতটা যৌক্তিক তা বিবেচনার বিষয়। দেশের প্রান্তিক মানুষের স্বার্থে বিষয়টিতে এনজিও প্রতিনিধি, এনজিও বিষয়ক ব্যুরো, সরকারি নীতিনির্ধারণী মহল, এমনকি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকেও নজর দেওয়া জরুরি।

লেখক: আয়কর আইনজীবী

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

আয়কর রিটার্নে অপ্রদর্শিত সম্পত্তি প্রদর্শন করুন

আয়কর রিটার্নে অপ্রদর্শিত সম্পত্তি প্রদর্শন করুন

সঠিক ও নির্ভুল আয়কর রিটার্ন করদাতার বড় সম্পদ

সঠিক ও নির্ভুল আয়কর রিটার্ন করদাতার বড় সম্পদ

আয়কর রিটার্ন ইমেইলে জমা নেওয়ার উদ্যোগ যে কারণে জরুরি  

আয়কর রিটার্ন ইমেইলে জমা নেওয়ার উদ্যোগ যে কারণে জরুরি  

ভ্যাট আদায়ে ন্যায্যতার ঘাটতি, নজর দেবে কে?

ভ্যাট আদায়ে ন্যায্যতার ঘাটতি, নজর দেবে কে?

আয়কর রিটার্নে অপ্রদর্শিত সম্পত্তি প্রদর্শন করুন

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৭:০৭

মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন আমাদের অনেক করদাতা বুঝে না বুঝে নিজের বৈধ সম্পত্তি আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন করা থেকে বিরত থাকেন। এটা কত বড় ক্ষতির কারণ, তা বুঝতে পারেন যখন বৈধ সম্পত্তি থেকে কোনও আয় করেন বা বিক্রি করে অন্য কোনও বৈধ কাজ করতে যান।

বর্তমানে সম্পত্তি বিক্রি বা ক্রয়ের ক্ষেত্রে ১২ ডিজিট ই-টিআইএন প্রদর্শন করার বিধান চলমান। কোনও কোনও ক্ষেত্রে আয়করের আপডেট সার্টিফিকেট প্রদর্শন করতে হচ্ছে।

করদাতাগণের মধ্যে কিছু ধারণা আছে। যেমন,আয়কর নথিতে বেশি সম্পত্তি দেখালে নাকি আয়কর অফিস থেকে হয়রানি করা হয়। বিষয়টি কতটুকু সত্য তা জানি না, তবে আমার কাছে মনে হয়েছে ওই হয়রানির চেয়েও করদাতা নিজের ক্ষতিই বেশি করছেন। কালো টাকা সাদা করার জন্য সরকার প্রতি বছর কিছু সুযোগ দিয়ে দেয়। অর্থাৎ এটা হলো অবৈধ আয়কে বৈধ করার সুযোগ।  এটা নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা হয়। কিন্তু যারা বৈধ সম্পত্তি আয়কর রির্টানে দেখাচ্ছেন না, এটা  যে কত বড় ক্ষতি তা নিয়ে কোনও আলোচনা নেই, নেই কোনও সমালোচনা। নিরবে বিপদগামী হচ্ছেন শত শত করদাতা। আমাদের করদাতাদের যেমন কর পরিশোধ করতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন, তেমনই তাদের ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে কোনও ক্ষতির মধ্যে না পড়েন তাও আমলে রাখা দরকার।

বৈধ সম্পত্তি অর্জিত বছরে আয়কর রিটার্নে না দেখালে সেটা অনেকটা অবৈধ সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয়ে যায়। যেটাকে আমরা অফিসিয়াল ভাষায় বলি অপ্রদর্শিত সম্পত্তি।  কোনও অবৈধ সম্পত্তি অর্জনকারী যদি অর্ধেক সম্পত্তি সরকারকে কর হিসেবে দিয়ে তার অবশিষ্ট সম্পত্তিকে নিজের জন্য বৈধ করার অধিকার অর্জন করতে পারে,তাতে সে মহাখুশি। কিন্তু মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে বেচারা সারা জীবন কিছু সম্পত্তি অর্জন করলেন শুধুমাত্র সুবুদ্ধির অভাবে বা কোনও কুবুদ্ধির ফাঁদে পড়ে বৈধ আয়কে অবৈধ করে এক মাথা চিন্তা রোগের ব্যবস্থা নিজেই করে বসেন।  তখন আর করার কিছুই থাকে না। এতে বড় অংক কর পরিশোধ বা জরিমানার মুখোমুখি হয়ে যান।

অনেকে বলেন চিন্তার কোনও কারণ নেই। সরকার এ ব্যবস্থাও করে রেখেছেন। সেটা হলো নির্দিষ্ট হারে কর পরিশোধ করে অপ্রদর্শিত সম্পত্তি প্রদর্শন করতে পারবেন। আসুন জেনে নেই সে সুযোগ কী? এ রকম করদাতাদের জন্য অর্থ আইন ২০২১ এ একটি সুযোগ রয়েছে। চলতি বছরের অর্থ আইনে আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ এর ১৯ ধারায়- ১৯এএএএএ নামে একটি নতুন ধারা সংযোজন করা হয়েছে (সূত্র: আয়কর পরিপত্র-২০২১-২০২২)। উক্ত নতুন ধারায় অপ্রদর্শিত সম্পত্তি প্রদর্শন করার জন্য কতিপয় সুযোগ রয়েছে। এতে করদাতা পূর্বের যে কোনও সময়ে আয়কর রিটার্নে অপ্রদর্শিত সম্পত্তি (জমি, বিল্ডিং, ফ্ল্যাট, নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার ইত্যাদি নির্ধারিত হারে কর পরিশোধ করে এ বছর আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন করতে পারবেন। এ সুযোগ সম্পত্তির এলাকা ভেদে বা অবস্থান ভেদে কিছুটা তারতম্য আছে। যেমন:

১. জমির/ভূমির ক্ষেত্রে:

ক) ঢাকার গুলশান মডেল টাউন, বনানী, বারিধারা, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা ও দিলকুশা এলাকার ভূমির জন্য প্রতি বর্গমিটারে বিশ হাজার টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

খ) ঢাকার ধানমন্ডি এলাকা, ডিওএইচএস মহাখালী, লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি, উত্তরা মডেল টাউন, পূর্বাচল, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, সিদ্ধেশ্বরী কারওয়ান বাজার, বিজয়নগর, ওয়ারী, সেগুনবাগিচা নিকুঞ্জ, এবং চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ, খুলশি, আগ্রাবাদ, নাসিরাবাদ এলাকায় অবস্থিত ভূমির জন্য প্রতি বর্গমিটারে পনের হাজার পাঁচ শত টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

গ) উপরোক্ত ‘ক’ এবং ‘খ’ ক্রমিকে উল্লেখিত এলাকা ব্যতিত সকল সিটি করপোরেশন এলাকার ভূমির জন্য প্রতি বর্গমিটারে পাঁচ হাজার টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

ঘ) সকল পৌরসভা বা জেলা সদর এলাকায় অবস্থিত ভূমির জন্য প্রতি বর্গমিটারে এক হাজার পাঁচ শত টাকা এবং এর ওপর নির্ধারিত ৫% অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে; টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

ঙ)  উপরোক্ত ক্রমিক নং ‘ক’, ‘খ’, ‘গ’ এবং ‘ঘ’- তে উল্লেখিত এলাকার ভূমি ব্যতিত অন্য সকল এলাকায় অবস্থিত ভূমির জন্য প্রতি বর্গমিটারে পাঁচ শত টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

২. বিল্ডিং ও অ্যাপার্টমেন্ট এর ক্ষেত্রে: 

ক) ঢাকার গুলশান মডেল টাউন, বনানী, বারিধারা, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা ও দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত অনধিক ২ শত বর্গমিটার প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারে  চার হাজার টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

খ) ঢাকার গুলশান মডেল টাউন, বনানী, বারিধারা, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা ও দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত ২শত বর্গমিটারের অধিক প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্ট এর জন্য প্রতি বর্গমিটারে ছয় হাজার টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

গ) ঢাকার ধানমন্ডি এলাকা, ডিওএইচএস মহাখালী, লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি, উত্তরা মডেল টাউন, পূর্বাচল, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, সিদ্ধেশ্বরী কারওয়ান বাজার, বিজয়নগর, ওয়ারী, সেগুনবাগিচা নিকুঞ্জ, এবং চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ, খুলশি, আগ্রাবাদ, নাসিরাবাদ এলাকায় অবস্থিত প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারে তিন হাজার টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

ঘ) ঢাকার ধানমন্ডি এলাকা, ডিওএইচএস মহাখালী, লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি, উত্তরা মডেল টাউন, পূর্বাচল, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, সিদ্ধেশ্বরী কারওয়ান বাজার, বিজয়নগর, ওয়ারী, সেগুনবাগিচা নিকুঞ্জ, এবং চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ, খুলশি, আগ্রাবাদ, নাসিরাবাদ এলাকায় অবস্থিত ২শত বর্গমিটারের অধিক প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারে তিন হাজার পাঁচ শত টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

ঙ) উপরোক্ত ক্রমিকে উল্লেখিত ‘ক’, ‘খ’, ‘গ’ এবং ‘ঘ’ এলাকা ব্যতিত সিটি করপোরেশন এলাকায় অনধিক ১শত ২০ বর্গমিটারের প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য সাত শত টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

চ) উপরোক্ত ক্রমিকে উল্লেখিত ‘ক’, ‘খ’, ‘গ’ এবং ‘ঘ’ এলাকা ব্যতিত সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত ১শত ২০ বর্গমিটার তবে অনধিক ২০০ বর্গমিটারের  প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area)  বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য আট শত পঞ্চাশ টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

ছ) উপরোক্ত ক্রমিকে উল্লেখিত ‘ক’, ‘খ’, ‘গ’ এবং ‘ঘ’ এলাকা ব্যতিত সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত ২শত বর্গমিটারের অধিক  প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারের জন্য এক হাজার তিন শত শত টাকা এবং এ করের ওপর ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করা;

জ) কোনও জেলা সদরের পৌরসভা এলাকায় অবস্থিত অনধিক ১শত ২০ বর্গমিটারের অধিক  প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারে তিন শত টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

ঝ) কোনও জেলা সদরের পৌরসভা এলাকায় অবস্থিত ১শত ২০ বর্গমিটারের অধিক তবে অনধিক ২০০ বর্গমিটারের  প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারে চার শত পঞ্চাশ টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

ঞ)  কোনও জেলা সদরের পৌরসভা এলাকায় অবস্থিত ২ শত বর্গমিটারের অধিক  প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারে ছয় শত টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

ট) ক্রমিক নং ‘ক থেকে ঞ’   উল্লেখিত এলাকা ব্যতিত অন্য যে কোনও এলাকায় অবস্থিত ১শত ২০ বর্গমিটারের প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারে দুই শত টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

ঠ) ক্রমিক নং ‘ক থেকে ঞ’ উল্লেখিত এলাকা ব্যতিত অন্য যে কোনও এলাকায় অবস্থিত ১শত ২০ বর্গমিটার কিন্তু অনধিক ২শত বর্গমিটারের প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারে তিন শত টাকা এবং এ করের উপর ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করা;

ণ) ক্রমিক নং ‘ক থেকে ঞ’ উল্লেখিত এলাকা ব্যতিত অন্য যে কোনও এলাকায় অবস্থিত ২শত বর্গমিটারের অধিক প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারে পাঁচ শত টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

৩. অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে:

ক) নগদ,ব্যাংকে রক্ষিত অর্থ, আর্থিক স্কিম ও ইন্সট্রুমেন্ট, সকল প্রকার ডিপোজিট বা সেভিং ডিপোজিট, সেভিং ইন্সট্রুমেন্ট বা সার্টিফিকেট (বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানির স্টক, স্টক শেয়ার, মিউসিয়াল ফান্ড ইউনিট ও অন্যান্য সিকিউরিটিজ, পুঁজিবাজারে ক্রয় বিক্রয়যোগ্য সকল প্রকার সিকিউরিটিজ ও বন্ড এবং যে কোনও প্রকার অগ্রিম ও ঋণ প্রদান আর্থিক ইন্সট্রুমেন্ট হিসেবে প্রদর্শন করা যাবে)। এর  মোট মূল্যের ওপর নির্ধারিত কর ২৫% এবং পরিশোধযোগ্য করের ওপর অতিরিক্ত ৫% হারে কর পরিশোধ করার মাধ্যমে। 

উপরোক্ত ক্ষেত্রসমূহের আওতায় কর পরিশোধ করার ফলে করদাতার অনুকূলে যেসকল সুবিধাদি থাকবে:

ক) নগদ অর্থ প্রদর্শনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ফরমে (আইটি-১০বি) হাতে নগদ, ব্যাংকে জমা বা ব্যবসায়ের পুঁজি হিসেবে দেখাতে পারবেন;

খ) এক্ষেত্রে নির্ধারিত কর পরিশোধ করে সম্পত্তি প্রদর্শন করার জন্য কোনও প্রকার ঘোষণার প্রয়োজন হবে না। যথানিয়মে সংশ্লিষ্ট ফরমের নির্ধারিত কলামে সম্পত্তির নির্ধারিত মূল্য দেখানো যাবে এবং অন্যান্য প্রাপ্তির ঘরে আয়ের উৎস হিসেবে দেখানো যাবে।

গ) প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ব্যাংক বিবরণী বা দলিলাদি বা প্রমাণাদি দাখিল করা যেতে পারে;

ঘ) এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সকল কর পরিশোধ করে সম্পত্তি প্রদর্শন করলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ এর অন্য কোনও ধারায় কোনও প্রকার কার্যক্রম গ্রহণ করবে না;

পরিশেষে সকল করদাতার প্রতি আকুল আবেদন কোনও প্রকার হয়রানি বা বিপদের সন্দেহ করে বা অনুমান করে আপনার কষ্টে অর্জিত সম্পত্তি আয়কর রিটার্নে দেখানো থেকে বিরত থাকবেন না। এ ব্যাপারে অন্য কারও পরামর্শ শুনবেন না। আপনি আপনার সিদ্ধান্ত নিন এবং আপনার সম্পত্তি প্রদর্শনে আপনার জন্য স্বস্তির ও নিরাপদের হোক এটাই কামনা।

লেখক: আয়কর আইনজীবী

[email protected]

/এসএএস/

সম্পর্কিত

সঠিক ও নির্ভুল আয়কর রিটার্ন করদাতার বড় সম্পদ

সঠিক ও নির্ভুল আয়কর রিটার্ন করদাতার বড় সম্পদ

আয়কর রিটার্ন ইমেইলে জমা নেওয়ার উদ্যোগ যে কারণে জরুরি  

আয়কর রিটার্ন ইমেইলে জমা নেওয়ার উদ্যোগ যে কারণে জরুরি  

ভ্যাট আদায়ে ন্যায্যতার ঘাটতি, নজর দেবে কে?

ভ্যাট আদায়ে ন্যায্যতার ঘাটতি, নজর দেবে কে?

‘ব্লকচেইন প্রযুক্তি’ হতে পারে রাজস্ব আদায়ের নতুন দিগন্ত

‘ব্লকচেইন প্রযুক্তি’ হতে পারে রাজস্ব আদায়ের নতুন দিগন্ত

গ্রামীণ সুদের অস্বাস্থ্যকর অর্থনীতি!

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৫:৩২

তুষার আবদুল্লাহ সেদিন এক গ্রামের বাজারে ঘুরছিলাম। কত পণ্যের খুচরা ও পাইকারি পশরা। মাছ, তরিতরকারি এসেছে আশপাশের গ্রাম থেকে। সেদিন ছিল হাটের দিন। ভিড়ের মাঝেই দুই জন মানুষ পেলাম যারা মুঠোতে, লুঙ্গির কোচড়ে টাকা নিয়ে ঘুরছেন। ভাবলাম হাট ঘুরে খুচরো টাকার ব্যবসা করেন তারা। কিন্তু খেয়াল করে দেখলাম পাঁচশ, হাজার টাকার নিচের কোনও নোট নেই তাদের কাছে। সন্দেহ হলো, খুচরা টাকার ব্যবসায়ীর কাছে তো খুচরো টাকা থাকার কথা। 

একজনের পিছু নিলাম, দেখি তিনি কোন দোকানে গিয়ে দাঁড়ান। আমি তাকে অনুসরণ করছি। তিনি একেকটি দোকানে গিয়ে দাঁড়ান আর কারও সঙ্গে ইশারায়, কারও সঙ্গে নিচু কণ্ঠে কথা বলেন। এক দোকানে দেখলাম টাকার একটা বান্ডেল ছুঁড়ে দিলেন। আমি ওই দোকানির পাশে গিয়ে বসলাম। জানতে চাইলাম- খুচরা নিতে কত বেশি দিতে হলো? দোকানি জানালেন, খুচরা না, টাকা কর্জ করলেন। সুদে টাকা নিলেন। হাটে মাল কিনবেন। হাজারে একশ টাকা সুদ দিতে হবে। 

একদিনেই একশ টাকা! মাল বিক্রি করে আজই শোধ দিতে হবে। না দিতে পারলে দ্বিগুণ হয়ে যাবে। জানতে চাই, যদি আরও বেশি দেরি হয়? বললেন- সুদে মাফ নেই। অতি দেরি হলে, এসে দোকানের মাল নিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। দোকানির কাছ থেকে সরে এসে চায়ের দোকানে খুঁজে পাই কর্জ দেওয়া বা সুদ ব্যবসায়ীকে। তিনি ৫ হাজার টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। এখন বাজারে তার পাওনা আট লাখ টাকা। নতুন টাকা বিনিয়োগ করতে হয়নি। সুদের টাকাতেই বিনিয়োগ বাড়ছে। টাকা তোলার জন্য কিছু মাস্তান পালতে হয়। কিছু হাত খরচ। মাসের লাখ টাকা আয়ের কাছে খুব সামান্য এই খরচ। বাজারের দোকানিরা ধীরে ধীরে ৬/৭ জন সুদ ব্যবসায়ীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। এককথায় বলা যায় বাজারটির এখন এই সুদ ব্যবসায়ীদের হাতে।

বাজারের নিয়ন্ত্রণ যেমন, তেমনই গ্রামও চলে গেছে সুদ ব্যবসায়ীদের কব্জায়। কৃষক একশ টাকায় ১০ থেকে ২০ টাকা সুদে টাকা নিচ্ছেন। চৈত্র মাসে কৃষক যে টাকা কর্জ নেন, তার সুদ পরিশোধ করেন ধানের বিনিময়ে। কোথাও কোথাও টাকা ও ধান দুটোই দিতে হয়। সময় মতো টাকা দিতে না পারলে, উঠোনে সুদ ব্যবসায়ীরা  এসে ঠিকই ঘুঘু চড়িয়ে যান। শুধু কৃষক নন, কন্যা দায়গ্রস্ত পরিবার, সন্তানের শিক্ষা, পরিবারের চিকিৎসার জন্যও সুদে টাকা কর্জ করেন গ্রামের মানুষ। জুয়া ও নেশার জন্যেও সুদে টাকা নেওয়ার অভ্যাস আছে। শুধু  ব্যক্তি নয়, সমিতির মাধ্যমেও চলে সুদ বাণিজ্য। গ্রামে গ্রামে সমিতি তৈরি হয়েছে। তারা সমবায়ের নামে টাকা তুলে, সেই টাকা সুদ ব্যবসায় বিনিয়োগ করছে। সমিতির সুদের টাকা না দিতে পারলে, পুরো সমিতিই গ্রহীতার ওপর হামলে পড়ে। সুদের টাকা না দিতে পারার প্রতিশোধ হিসেবে, ধর্ষণ- খুনের মতো ঘটনাও ঘটছে গ্রামে।

করোনাকালে এই সুদ ব্যবসা আরও রমরমা হয়েছে। মানুষের  কাজ শূন্য হওয়া, ব্যবসায় ধস বা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে গেলে কর্জ করে আবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, পরিবারের সংকট সামলে নেওয়া। ব্যবসায় পুনঃবিনিয়োগের জন্য মানুষ নিরুপায় হয়ে ব্যক্তি বা সমিতির কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়েছে, নিচ্ছে। যারা ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছেন, তারা চেষ্টা করছেন টাকা ফেরত দেওয়ার। যারা পারেননি, তারা অসহায় হয়ে প্রিয় সম্পদের যেটুকু আছে তাই কর্জদাতার হাতে তুলে দিচ্ছেন। যারা পারছেন না, তাদের কেউ কেউ ঘর ছাড়া। পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

গ্রামীণ সুদের এই অর্থনীতির কথা স্থানীয় প্রশাসনের অজানা নয়। অর্থনীতির চিন্তকদের কাছেও পরিচিত। গ্রামে কৃষি ও শিল্প অর্থনীতির প্রসার ঘটছে। নতুন ফসল যুক্ত হচ্ছে। কৃষি-শিল্প অর্থনীতি তৈরি করেছে নতুন সম্ভাবনা। টেকসই ইঙ্গিতও রয়েছে। কিন্তু  প্রান্তিক কৃষক ও উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণের জোগান নিশ্চিত করা যায়নি। কৃষকদের দশ টাকার একাউন্ট খুলে দেওয়ার পরও তাদের করা যায়নি ব্যাংকমুখী। সরকারি সমবায়ের জটিল আমলাতন্ত্র ও ভোগান্তি সমবায় বান্ধব করতে পারছে না  প্রান্তিকজনদের। তাদের কাছে সুদ ব্যবসায়ীরাই সহজলভ্য। এই সহজলভ্য অর্থের জোগানদারদের সহজ সেবায় কঠিন হচ্ছে প্রান্তিক মানুষের জীবন। নিঃস্ব এবং দেওলিয়া হচ্ছে মানুষ। করোনাকাল সুদের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করেছে। সেই চাঙ্গা অর্থনীতি আমাদের প্রান্তিক অর্থনীতির স্বাস্থ্যহানী ঘটাচ্ছে। জানি না অর্থ গবেষক ও সরকার স্বাস্থ্যের এই দিকটি নজরে রেখেছে কিনা।

লেখক: গণমাধ্যম কর্মী

/এসএএস/

সম্পর্কিত

শিক্ষক ও মর্যাদার সংকট

শিক্ষক ও মর্যাদার সংকট

ভোটের হাওয়া লাগলো মাঠে

ভোটের হাওয়া লাগলো মাঠে

গণমাধ্যমে বিভীষণ

গণমাধ্যমে বিভীষণ

শহর কেন গতিহীন?

শহর কেন গতিহীন?

দুর্বৃত্তরাই আফগানিস্তানে সরকার চালাবে

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৭:০৭
ফারাজী আজমল হোসেন আফগানিস্তানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মন্ত্রীদের নাম ঘোষণার মাধ্যমেই গোটা দুনিয়াকে নিজেদের স্বরূপ চিনিয়ে দিয়েছে তালেবানরা। দুর্বৃত্তরাই যে আফগানিস্তানে সরকার চালাবে এটা বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। ৩৩ সদস্যের তালেবান মন্ত্রিসভার ১৭ জনই রয়েছেন জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা তালিকায়।

বেশিরভাগ মন্ত্রীকেই আমেরিকা জঙ্গিবাদী বলে মনে করে। নামে সম্মিলিত আফগান সরকার হলেও তালেবান মন্ত্রিসভায় পশতুনদেরই রমরমা। আফগানিস্তানের জনসংখ্যার ৪৮ শতাংশ হচ্ছেন পশতুনরা। কিন্তু মন্ত্রিসভার ৩৩ জনের মধ্যে ৩০ জনই পশতুন। শতাংশের হিসাবে ৯০ শতাংশ। ৪৫ শতাংশ তাজিক এবং উজবেক জনসংখ্যা থাকলেও তাদের প্রতিনিধি মাত্র ৩ জন। ১০ শতাংশ শিয়া, ৪৮ শতাংশ নারী, তুর্কমেন ও বালুচদের ৫-৬ শতাংশ জনসংখ্যা থাকলেও তাদের কোনও প্রতিনিধি নেই। ফলে মন্ত্রিসভায় সব অংশের আফগানদের অন্তর্ভুক্তির দাবি এলে বাস্তব পরিস্থিতির বিপরীত।

তালেবান ও তাদের সমর্থকরাই শুধু মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পেয়েছে। বাকিদের দাবি অগ্রাহ্য করা হয়েছে। আশ্চর্যজনকভাবে জঙ্গিবাদী সংগঠন হাক্কানি নেটওয়ার্ককে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে মন্ত্রিসভায়। ৫টি গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন হাক্কানিরাই। আফগানিস্তানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়েছে সিরাজউদ্দিন হাক্কানিকে। এই সিরাজউদ্দিনের মাথার দাম ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঘোষণা করেছিল আমেরিকা। সিরাজউদ্দিন ছাড়াও আবুল বাকী হাক্কানি উচ্চশিক্ষামন্ত্রী, মৌলভী নজিবুল্লাহ হাক্কানি টেলিযোগাযোগমন্ত্রী, খলিল-উর-রেহমান হাক্কানি শরণার্থী মন্ত্রী এবং আবদুল হক ওয়াসেক গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে দায়িত্বভার পেয়েছেন। হাক্কানি গ্রুপের অন্যতম সক্রিয় সদস্য মোল্লা তাজমীর জাওয়াদকে করা হয়েছে গোয়েন্দা বিভাগের উপ-প্রধান।

জঙ্গিবাদী ও মানব সভ্যতার জন্য বিপজ্জনকদের নিয়ে তৈরি সরকারে একজনও নারী সদস্য নেই। অথচ দুনিয়ার বেশিরভাগ দেশই তালেবান সরকারের একপেশে মন্ত্রিসভা নিয়ে নীরব দর্শক। খুব স্পষ্ট করে বলতে গেলে, পশ্চিমা দুনিয়া, বিশেষ করে আমেরিকা তালেবানদের প্রতি এত কিছুর পরও আস্থাশীল। আমেরিকা মানুষকে বিশ্বাস করাতে চাইছে, তালেবানরা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে। ইসলামাবাদ সন্ত্রাসীদের মদত জুগিয়েও গত দু-দশকেরও বেশি সময় ধরে আমেরিকার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার কৌশল নিয়েছিল, পাকিস্তানেরই হাতের পুতুল তালেবানরাও এখন সেই পথে হাঁটছে। সব সম্প্রদায় ও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে সরকার গড়ার মিথ্যা বিভ্রান্তি তৈরিতেও তালেবানদের মদত দিচ্ছে পাকিস্তান।

তালেবানদের কথা ও কাজের মধ্যে অনেক ফারাক। এটা অতীতেও প্রমাণিত। আফগানিস্তান ছাড়ার জন্য ব্যস্ত আমেরিকা গোটা দুনিয়াকে বোঝাবার চেষ্টা করেছিল, দু-দশকে তালেবানরা অনেকটাই বদলে গিয়েছে। তারা নাকি সকলকে নিয়েই সরকার গঠন করতে চায়। আগের মতো শরিয়তের নামে জনজীবনকে বিধ্বস্ত করার রাস্তা নাকি পরিত্যাগ করেছে তালেবান। কিন্তু আফগান জয়ের পর তালেবানরাই বুঝিয়ে দিচ্ছে দুদশকে তাদের মানসিকতায় কোনও পরিবর্তন হয়নি। তাই পরাজিত আফগান নাগরিকদের ওপর অত্যাচার থেকে শুরু করে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর আগের মতোই চলছে তালেবানি সন্ত্রাস।

তালেবানরা বুঝিয়ে দিয়েছে, তাদের মনোভাব কিছুতেই বদলাতে পারে না। সবাইকে নিয়ে জাতি গঠনের কোনও চিন্তাভাবনাই নেই তাদের। আসলে তালেবানের ইসলামিক আমিরাতে গণতন্ত্রের কোনও স্থান নেই। ইসলাম ধর্মের নামে হিংসাত্মক, অসহনশীল এবং আধুনিক সভ্যতার বিরোধী কাজকর্মই তাদের পছন্দ। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিলেও আধুনিক চিন্তাধারার প্রতি তাদের বিশ্বাস নেই। পশ্চিমা দুনিয়ার অন্ধবিরোধী তালেবান। কিন্তু পশ্চিমা অস্ত্রের ঝলকানি তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। টেলিভিশনকে তারা শুধু ধর্মীয় প্রচারের হাতিয়ার হিসেবেই দেখতে চায়। সামাজিক গণমাধ্যম তালেবানদের কাছে তাদের কথা প্রচারেরই শুধু হাতিয়ার মাত্র। ইসলাম ধর্মের নামে তারা নিজেদের আধিপত্য বিস্তারকেই একমাত্র পথ বলে মনে করে। অন্য মতের কোনও গুরুত্ব নেই তাদের কাছে।

তাই আফগানিস্তানে মোটেই অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠন হয়নি। সকলকে নিয়ে সরকার গঠনের বিভ্রম ছড়ানোর চেষ্টায় অবশ্য কোনও কার্পণ্য নেই। বাস্তব বলছে, এটা তালেবান ও হাক্কানি জঙ্গিদের সরকার। তালেবানরা বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, নারী, সংখ্যালঘু বা অন্য রাজনৈতিক মতকে মোটেই আমল দিতে রাজি নয়। সম্মিলিত সরকার বলতে তালেবানরা দুই তাজিক ও এক উজবেক প্রতিনিধিকে মন্ত্রিসভায় রেখে বোঝাতে চেয়েছে এটা সবার সম্মিলিত অন্তর্বর্তী সরকার। নারীদের বাদ দিয়ে আজকের দিনে সম্মিলিত সরকার বাস্তবসম্মত নয়, সেটা মানতে নারাজ তালেবানরা। টেলিভিশন ভাষণে তাই তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ সাফ জানিয়েছেন, শুধু সন্তান ধারণ ও পালন করাই নারীদের কাজ। বাইরের কাজ পুরুষরাই করবেন। শুধু তা-ই নয়, নারীর নির্দেশ কোনও পুরুষের নাকি পালন করা উচিত নয়। মুজাহিদের এই বক্তব্যই প্রমাণ করে তালেবানদের আগের মানসিকতা একদম বদলায়নি।

তালেবানরা নারীদের স্বাধীনতায় বিন্দুমাত্র বিশ্বাসী নয়। তাই পশ্চিমা দুনিয়া নারীদের মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্বের দাবি তুললেও লাভ নেই। নারীদের অধিকার দেবে না তারা। তালেবান শাসনে নারীদের যাবতীয় স্বপ্ন ও অধিকার অধরাই থেকে যাবে। চাপে পড়ে দু-একজন নারীকে মন্ত্রিসভায় নিলেও মানসিকতার বদল সম্ভব নয়। নারীদের মতোই অন্যদের কাউকেই এই সরকারে নেবে না তালেবানরা। এমনিতেই পূর্বতন সরকারের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই বা চিফ এক্সিকিউটিভ ডা. আব্দুল্লাহ আবদুল্লাহর মতো উচ্চপদস্থ নেতারা কম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় সরকারে থাকতে রাজি হবেন না। তাই অন্যদের কথা ভাবতে পারতো তালেবানরা। কিন্তু নিজেদের হাতেই ক্ষমতা ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর তালেবানরা কিছুতেই অন্যদের সঙ্গে রাখতে চায় না।

আসলে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তালেবান নেতারা দুনিয়াকে বোকা বানাতে চাইছে। তারা বোঝাতে চাইছে বিশ বছর আগের সঙ্গে এখনকার তালেবানের পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয়বার সরকার গঠনের পর স্পষ্ট হয়ে ওঠে তালেবান-১ ও তালেবান-২ সরকারের মধ্যে আসলে কোনও পার্থক্য নেই। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে জঙ্গি হামলার সময়কার তালেবান প্রধানকে মন্ত্রিসভার মাথায় বসিয়ে তারা বুঝিয়ে দিয়েছে, সন্ত্রাসই তালেবানদের মূল কর্মসূচি। তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক পাকিস্তানের কাছ থেকে তালেবানরা শিখে নিয়েছে আমেরিকার চোখে ধুলো দেওয়ার কৌশল। আমেরিকাকে তারা বোঝাতে সক্ষম হয়েছে, কিছু দিনের মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারে অন্যদেরও ঠাঁই মিলবে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান নিজে দায়িত্ব নিয়ে সবার অন্তর্ভুক্তির বিভ্রম ছড়াচ্ছেন।

মনে রাখা দরকার, ১৯৯০ সালেও তালেবানরা শুধু নিজেদের অ্যাক্টিং বা ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের দিয়েই সরকার চালিয়েছিল। এটাই তালেবান কৌশল। আন্তর্জাতিক দুনিয়া যদি তালেবানদের পরিবর্তন সত্যিই মাপতে চান তবে তার পদ্ধতি ও মাপকাঠি আগে ঠিক করা জরুরি। মানবিক বা অন্যান্য সাহায্য দানের আগে তালেবানদের সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করাটা আন্তর্জাতিক দুনিয়ার কাছে খুব জরুরি। মনে রাখতে হবে, পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের মদতপুষ্ট হাক্কানি নেটওয়ার্কের মতো সন্ত্রাসীরা রয়েছে তালেবানদের সঙ্গে। তাই আফগানিস্তানে পাঠানো আন্তর্জাতিক সাহায্য জঙ্গিবাদীদের হাত আরও শক্ত করার আশঙ্কা থাকছেই। এমনিতে তালেবান উত্থানে দক্ষিণ এশিয়ায় অশান্তির আশঙ্কা অনেকটাই বেড়ে গেছে। জঙ্গিবাদীরা আফগানিস্তানে ফের সক্রিয় হতে শুরু করেছে। এ অবস্থায় আফগান জনগণকে সাহায্য করা জরুরি হলেও তালেবানকে মদত দেওয়া চলবে না। দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদে লাগাম টানতে হলে তালেবানরা উৎসাহিত হতে পারে এমন কোনও পদক্ষেপ নেওয়া চলবে না।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

বঙ্গবন্ধুর জীবনে 'শক্তিঘর' ছিলেন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব

বঙ্গবন্ধুর জীবনে 'শক্তিঘর' ছিলেন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব

চীনের বন্ধুত্ব, নাকি আধিপত্য

চীনের বন্ধুত্ব, নাকি আধিপত্য

বাঁধের বাধায় বন্দি চীনের ‘বন্ধুত্ব’

বাঁধের বাধায় বন্দি চীনের ‘বন্ধুত্ব’

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য পূরণেও এগিয়ে বাংলাদেশ

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য পূরণেও এগিয়ে বাংলাদেশ

ই-ধোঁকা ও গ্রাহকদের  ‘ডেসটিনি’

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৫:৫৮

এরশাদুল আলম প্রিন্স ‘সাইক্লোন’, ‘আর্থকোয়াক’, ‘পুরাই গরম’ ‘টি টেন’-এরকম আরও নানা চটকদার ক্যাম্পেইনে গ্রাহকদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা লুফে নিয়েছে ইভ্যালি। এ দৌড়ে পিছিয়ে নেই ই-অরেঞ্জ, ধামাকা। এদের আকর্ষণীয় ডিসকাউন্ট অফারের কাছে গ্রাহকরাও তাদের স্বাভাবিক বুদ্ধি-বিবেচনা হারিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন পণ্য কিনতে। এভাবে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা লোপাট করার পরে অবশেষে গ্রেফতার হয়েছেন ইভ্যালির সিইও ও চেয়ারম্যান দম্পতি। 

ইভ্যালির মতো অন্যান্য ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে। কিন্তু ইতোমধ্যে গ্রাহকরা যে শত শত কোটি খুইয়েছে তার কী হবে? অতীতের যুবক, ইউনিপে, ডেসটিনির সঙ্গেই কি যোগ হলো আরেকটি নাম- ইভ্যালি? 

ইভ্যালি ও ই-অরেঞ্জ বা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকাশ্যেই ব্যবসা করেছে। এমন নয় যে তারা নামে-বেনামে গোপনীয়তার সঙ্গে ব্যবসা করেছে। এমনও নয় যে তারা কোনও জেলা বা থানা পর্যায়ে খুচরা ব্যবসা করেছে। বলে-কয়ে, ঘোষণা দিয়ে জাতীয়ভাবে তারা তাদের ব্যবসা ও ক্যাম্পেইন চালিয়েছে। রাষ্ট্র, সরকার বা কোনও কর্তৃপক্ষের কাছেই বিষয়টি গোপন ছিল না। কিন্তু অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, সব দোষ গ্রাহকের।

এদিকে অনলাইন ব্যবসায়ীদের সংগঠন ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) বলছে, তারা আগেই অনুমান করেছিল যে ইভ্যালি একটা কেলেঙ্কারি করতে যাচ্ছে। প্রশ্ন, ই-ক্যাব তাহলে ইভ্যালির রাশ টেনে ধরেনি কেন? ইভ্যালি তো ই-ক্যাবের সদস্য। ই-ক্যাবের দাবি, তারা বিষয়টি সরকারের নজরে এনেছে। এমনকি তারা নাকি ইভ্যালির সঙ্গেও এ নিয়ে চিঠি চালাচালি করেছে। ইভ্যালি নিয়ে ই-ক্যাবের সঙ্গে চিঠি চালাচালি হয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েরও। এই দাবি করেছেন ই-ক্যাবের সভাপতি। এখন প্রশ্ন, ইভ্যালি কাণ্ডের জন্য দায় তাহলে কার? রেগুলেটরি বডির? বাংলাদেশ ব্যাংকের? বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের? কম্পিটিশন কমিশনের? ই-ক্যাব’র? নাকি আইসিটি মন্ত্রণালয়ের? আর এর রেগুলেটরি বডি বা নিয়ন্ত্রক সংস্থাই বা কে? অনিয়ম দেখার দায়িত্ব কার? গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের দায়ই বা কার?

২০১৮ সালে দেশে একটি ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা তৈরি করা হয়। এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট। এর অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে, ডিজিটাল কমার্সের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রচার, প্রসার ও উন্নতি সাধন। উল্লেখ্য, এই নীতিমালা হওয়ার বহু আগে থেকেই বাংলাদেশে ডিজিটাল কমার্সের বিকাশ হয়েছে। নীতিমালাটি হয়েছে মূলত ই-কমার্স খাতে শৃঙ্খলা আনয়নের জন্য। নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, ডিজিটাল কমার্সের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করাও এর উদ্দেশ্য। এছাড়া ডিজিটাল ব্যবসার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা (ধারা-৩) এই নীতির উদ্দেশ্য। কিন্তু ইভ্যালি ওই নীতির প্রতি কোনও ধরনের দায়বদ্ধতা প্রদর্শন না করে ব্যবসা চালিয়েছে।

পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপনে সহায়তা করা (ধারা-৪) ও ভোক্তা অধিকার রক্ষা করা (ধারা-৬) এই নীতিমালার অন্যতম উদ্দেশ্য। কিন্তু ইভ্যালিকাণ্ডে আমরা এসব নীতিমালার কোনও প্রয়োগ দেখি না।

২০২০ সালে নীতিমালাটি সংশোধিত হয়। সংশোধিত ওই নীতিমালা অনুযায়ী ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা-২০২১ প্রণয়ন করা হয়। এই নির্দেশিকা অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ বলতে 'সরকার’কে বোঝায়? সরকার কি এখন ইভ্যালিকাণ্ডের দায় নেবে? নিলে সরকারের কোন সংস্থা এই দায় বহন করবে?

ইভ্যালি একের পর এক ক্যাম্পেইন শুরু করলে নড়েচড়ে বসে কম্পিটিশন কমিশন। ২০১২ সালের আইনের মাধ্যমে কম্পিটিশন কমিশন বা প্রতিযোগিতা কমিশন প্রতিষ্ঠা হয়। এ আইনের অন্যতম উদ্দেশ্য ব্যবসা-বাণিজ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশকে উৎসাহিত করা ও এক্ষেত্রে মনোপলি বা প্রতিযোগিতা বিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ বা নির্মূল করা। এই কমিশন কি শুধু ই-ক্যাব চিঠি দিয়েই ক্ষান্ত হয়েছে? ইভ্যালির অনৈতিক ও বেআইনি বাণিজ্য বন্ধে কমিশনের ব্যবস্থা নিতে বাধা ছিল কোথায়? ইভ্যালি কি এ আইনের ব্যত্যয় করেনি?

জানা যায়, ই-ক্যাব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েও চিঠি দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক চিঠি দেয় ইভ্যালিকে। তার মানে আমরা দেখছি, বিষয়টি নিয়ে সব কর্তৃপক্ষের মধ্যেই একটা উদ্বেগ উৎকণ্ঠা ছিল। তারা দায়িত্বের অংশ হিসেবে নিজেদের মধ্যে চিঠি চালাচালি করেছে ঠিকই। এমনকি গত বছরের প্রথম দিকে ৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। কিন্তু সেই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ ব্যাংক বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কোনও পদক্ষেপ নিয়েছে বলে আমাদের জানা নেই।

এখানে একটি বড় সমস্যা হলো, দেশে ই-কমার্স-এর যথেষ্ট বিকাশ হলেও এর  অপারেটিং, মনিটরিং ও রেগুলেটিং প্রসিডিউর যথেষ্ট বিকশিত হয়নি। ফলে ইভ্যালির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ঢুকে পুরো ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ই-ক্যাব, বাাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বয়ে একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং, মনিটরিং ও রেগুলেটিং প্রসিডিউর তৈরি করা জরুরি।

ইভ্যালির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। কারণ, এখানে শক্ত একটি রেগুলেটরি বডি নেই। এছাড়া সব রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষেরই কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। যেমন ই-ক্যাব চাইলেও ইভ্যালির অ্যাকাউন্টে ঢুকতে পারে না। কিন্তু ই-ক্যাবের একজন সদস্য হয়ে ডিজিটাল কমার্স নীতিমালার কোনও পরোয়া না করে ইভ্যালি কীভাবে ব্যবসা করেছে- এটা দেখার এখতিয়ার নিশ্চয় ই-ক্যাবের আছে। মানলাম ই-ক্যাব দুর্বল। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বা কম্পিটিশন কমিশন তো দুর্বল না। মূলত শক্ত একটা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং, মনিটরিং ও রেগুলেটিং প্রসিডিউর সময়ের দাবি।

আসলে ইভ্যালি প্রথম থেকেই প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। তারা তাদের ব্যবসার মূল নীতিটি কখনোই প্রকাশ করেনি। তারা এক গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা এনে আরেক গ্রাহককে ডিসকাউন্ট দিয়েছে। আবার বাকিতে ডিলারের কাছ থেকে পণ্য কিনেছে। কিন্তু সবাইকে বলেছে যে তারা অনেক বেশি কমিশনে পণ্য কিনেছে, তাই গ্রাহককে বাজার মূ্ল্যের চেয়েও কম দামে পণ্য দিতে পারছে। কিন্তু বিষয়টি মোটেই সে রকম ছিল না। কারণ, তাহলে ইভ্যালি ডিলার  বা ভেন্ডরের  কাছে টাকা বাকি রাখতো না। ইভ্যালি পুরো ব্যবসার সঙ্গে যারা জড়িত সবার সঙ্গেই কোনও না কোনোভাবে প্রতারণা ও মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে।

পৃথিবীর সব দেশেই ই-কমার্সকে কিছু নিয়ম মানতে হয়। ইভ্যালি তা মানেনি। হাওয়া থেকে তারা পণ্য বিক্রি করেছে। তারা কখনও তাদের ওয়েবসাইটে পণ্যের স্টক ঘোষণা করেনি। তারা শুধু অর্ডার ও টাকা নিয়েছে। অন্যান্য দেশে পণ্যের পাশে লেখা থাকে কয়টি অবিক্রীত আছে। অর্ডারের সঙ্গে সঙ্গে স্টক কমতে থাকে। ইভ্যালি এ কাজটি করেনি। তারা এত পণ্য বিক্রি করেছে যা তারা ডিলারে কাছ থেকে নেয়নি অথবা বিদেশে থেকে আমদানিও হয়নি। এভাবে স্টক ঘোষণা না করা স্ট্যান্ডার্ড ই-কমার্স নীতিমালার পরিপন্থী। কিন্তু কোনও কর্তৃপক্ষই এ নিয়ে কথা বলেনি।

ইভ্যালিকাণ্ডে পণ্য সরবরাহকারী/ভেন্ডর/ডিলাররাও তাদের দায় এড়াতে পারেন না। তারা নিজেরাও হয়তো অনেকে ভুক্তভোগী। তারা নিজেরা যে দামে একটি পণ্য বিক্রি করতে পারেন না তারা কী করে ভাবলেন যে ইভ্যালি তার চেয়েও অনেক কম দামে ওই পণ্য বিক্রি করবে? তাদের বোঝা দরকার ছিল, এরমধ্যে একটা ফাঁকি আছে। ইভ্যালি নিশ্চয় নিজের পকেটের টাকা থেকে ভেন্ডরের দেনা শোধ করবে না। তার মানে, মাঝখানে অন্য গ্রাহকও আছেন যাদের টাকা এখানে খাটানো হচ্ছে। এখানে একটি না একটি পক্ষ সব সময়ই বাকিতেই রয়ে যাবে। সেটা কখনও গ্রাহক বা কখনও ভেন্ডর। এভাবে বাকির তালিকা বেড়েই গেছে। এখানে যোগ হয়েছে শত শত গ্রাহক। 

হ্যাঁ, গ্রাহকদেরও ভুল আছে। ইভ্যালি ভেন্ডরের টাকা শোধ করলেও আম গ্রাহকের বড় একটি অংশ এখনও পণ্য বা টাকা কোনোটিই পাননি। কারণ, সাধারণ গ্রাহক ঠকানো এখানে খুব সহজ। ভেন্ডর ঠকানো সহজ না, কারণ তারা তো বড় বড় কোম্পানি। 

গ্রাহকরা অবিশ্বাস্য ডিসকাউন্টে পণ্য পাবেন বলে ধরে নিয়েছেন। ফলে অনেক গ্রাহক বহু সংখ্যক অর্ডার দিয়ে ইভ্যালি থেকে পণ্য কিনে ব্যবসার কথাও ভাবতে শুরু করেন। এটা একটা অবাস্তব ব্যবসা মডেল। অনলাইন থেকে খুচরা পণ্য কিনে খুচরা ব্যবসা করা দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব নয়। ফলে হয়েছেও তা-ই। কেউ কেউ সফল হলেও অধিকাংশই এখন ধরা খেয়ে বসে আছেন।

ভেন্ডর  বলি আর গ্রাহক বলি সবারই দায় ছিল ইভ্যালির আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করে বিনিয়োগ করা। বিশেষ করে ভেন্ডর/সরবরাহকারীর এটা প্রাথমিক দায়িত্ব। আর যেসব গ্রাহক কমিশনের বদলে বাজার মূল্যের সমপরিমাণ টাকা পাওয়ার জন্য ইভ্যালিতে টাকা খাটিয়েছেন তারা শুধু লোভ নয়, ব্যবসার নৈতিক মানদণ্ডেও দণ্ডিত। দিয়েছেন কমিশন মূল্য, অথচ চাইবেন বাজার মূল্য- এটা কেমন কথা। ইভ্যালি কোত্থেকে দেবে এ টাকা?

কাজেই ইভ্যালি যুবক, ডেসটিনি, ইউনিপের মতো গ্রাহকদের জন্য আরেকটি হায় হায় কোম্পানি হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে। এলাম-খাইলাম-গেলাম-এই তিন নীতিতে কাজ করেছে ইভ্যালি। আর গ্রাহকরা? বরাবরের মতো এবারও দেখলাম-দিলাম-মরলাম- এই তার ডেসটিনি।

একটা অন্যায়ের ওপর কোনও ব্যবসা দাঁড়াতে পারে না। ইভ্যালি কোনও ব্যবসা করতে আসেনি, ব্যবসা করেওনি। তারা অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে লুটপাট করেছে। ইতোমধ্যে ইভ্যালির সাড়ে ৩শ’ কোটি টাকার হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। এই টাকা কোথায় গেছে তা বের করতে হবে। দেশের টাকা দেশে রাখতে হবে আর গ্রাহকদের টাকা গ্রাহকদের ফিরিয়ে দিতে হবে। ইভ্যালির অনিয়মের বিরুদ্ধে আগেই ব্যবস্থা নিতে হতো। তাহলে হয়তো এ পথে ই-অরেঞ্জ, ধামাকার জন্ম হতো না। অতীতের 'যুবক’ থেকে আমরা কেউ শিক্ষা নিতে পারিনি। ফলে বারবারই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন গ্রাহকরা। 

লেখক: আইনজীবী ও কলাম লেখক

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলছে, তবে...

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলছে, তবে...

তালেবানবিরোধীদের স্ববিরোধী অবস্থান

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৯:২১
মো. জাকির হোসেন ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র ইতিহাসের ভয়াবহতম সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়। ওই হামলার সঙ্গে তালেবানের সংশ্লিষ্টতা ছিল না। তবু মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোট ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর আফগানিস্তান আক্রমণ করে। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই আফগানিস্তানে তালেবানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তালেবানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ৯/১১ আক্রমণের মূল হোতা ওসামা বিন লাদেনকে তালেবান সরকার আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে। দীর্ঘ দুই দশক পর তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় পুনরায় ফিরে আসার পর বিশ্বের নানা প্রান্তে তালেবানের পক্ষে-বিপক্ষে নানা বক্তব্য-বিতর্ক চলছে। আমি তালেবানকে সমর্থন করি না। আমি কেন তালেবানকে সমর্থন করি না এ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনে আমার মতামত তুলে ধরেছি। তালেবান মুখে শরিয়াহ আইনের কথা বললেও তাদের অনেক কর্মকাণ্ড কেবল ইসলামের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণই নয়, কিছু ক্ষেত্রে তা কোরআন-হাদিসের বিধানের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। আবার তালেবানের বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার আমি তাদের পক্ষেও নই। তালেবানের বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার তাদের অবস্থানকে আমি যেসব কারণে সমর্থন করি না তা হলো –

এক. তালেবানের বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার তারা একচোখা, পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে। এরা কেবল ইসলামে ধর্মের অনুসারী জঙ্গিদের বিষয়ে সোচ্চার। মিয়ানমারের বৌদ্ধ উগ্রবাদীরা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিলো। বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা চার দশক ধরে গণহত্যা, গণধর্ষণ করে, জমি-সম্পদ-ব্যবসা কেড়ে নিয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে দেশ থেকে বিতাড়ন করলো। ‘ওয়ার অন টেরর’ ব্যবসায়ীরা মাঝে-মধ্যে ওষ্ঠ সেবা (লিপ সার্ভিস) ছাড়া এই ভয়ংকর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে পুরোপুরি নীরব। ব্রিটিশদের বিশ্বাসঘাতকতায় ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র জোর করে কেড়ে নিলো ইহুদি সন্ত্রাসীরা। রাষ্ট্র গঠনের জন্য পর্যাপ্ত ইহুদি ফিলিস্তিনে না থাকায় ব্রিটিশরা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইহুদিদের ফিলিস্তিনে নিয়ে আসে এবং ফিলিস্তিনিদের বিতাড়ন করতে থাকে। ব্রিটিশ বাহিনীর সহযোগিতায় ইহুদিরা গড়ে তোলে প্রশিক্ষিত গোপন সন্ত্রাসী সংগঠন। এরমধ্যে তিনটি প্রধান সংগঠন ছিল, হাগানাহ, ইরগুন ও স্ট্যার্ন গ্যাং, যারা হত্যা, সন্ত্রাস, ধর্ষণ আর ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টির মাধ্যমে নিরীহ ফিলিস্তিনদের বাধ্য করে নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে চলে যেতে।

ফিলিস্তিনিদের জমিজমা ইহুদিরা দখল করে নেয়। ১৯২২ সালে ইসরাইলে ইহুদি ছিল মাত্র ১২ শতাংশ, ১৯৩১ সালে তা হয় ২৩ শতাংশ, আর ১৯৪৭-এ তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ শতাংশে।

জাতিসংঘ এখতিয়ার-বহির্ভূতভাবে ৪৫ শতাংশ এলাকা নিয়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ইসরায়েল, তাও লঙ্ঘন করে ক্রমাগত ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি, জায়গা-জমি কেড়ে নিচ্ছে। মুসলমানদের প্রথম কিবলা আল-আকসা মসজিদে নামাজরত মুসল্লিদের গুলি-বোমায় প্রতিনিয়ত আহত-নিহত করছে ইহুদিরা। ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ ও তাদের জায়গা-জমি জোর করে বেদখল করাকে নিরাপত্তা পরিষদের একাধিক সিদ্ধান্তে ও আন্তর্জাতিক আদালতের অভিমতে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

কিন্তু ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইনকে ক্রমাগত বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস অব্যাহত রেখেছে। এই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া দূরে থাক, উপরন্তু অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েলের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে বিভিন্ন দেশকে চাপ দেবে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন ঘোষণা করেছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং মরক্কোকে অনুসরণ করার জন্য আমরা আরও দেশকে উৎসাহিত করবো। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত গত বছরের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে সম্মত হয়। এরপর বাহরাইন, সুদান ও মরক্কো আরব আমিরাতের পথ ধরে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। যুক্তরাষ্ট্র নানা রকম ‘তোফা’র বিনিময়ে এই তিনটি রাষ্ট্রকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে বাধ্য করে। পশ্চিম সাহারার ওপর মরক্কোর কর্তৃত্বের স্বীকৃতি দেওয়া, সুদানকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান সংক্রান্ত একটি চুক্তি সই করার মাধ্যমে রাষ্ট্র তিনটিকে রাজি করিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

তালেবানের বিরুদ্ধে সোচ্চাররা ইসরায়েলের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মুখে কুলুপ আঁটা। বছরে পর বছর ধরে চীনের উইঘুরে মুসলিম হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, ধর্মপালনে বাধাদান সন্ত্রাস হলেও তালেবানের বিরুদ্ধে বিপ্লবীরা এ ব্যাপারে উচ্চকিত নন। শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদীদের হাতে মসজিদে হামলা, নামাজরত মুসল্লিদের হত্যা, মুসলমানদের ওপর আক্রমণকে জঙ্গিবাদ বলতেই রাজি নন তালেবানের বিরুদ্ধে সোচ্চাররা। ভারতের বাড়ন্ত উগ্র হিন্দুত্ববাদ মুসলমানদের হত্যা-নির্যাতন করছে, মুসলিম নারীদের অবমাননা করছে। তালেবানকে জঙ্গি তকমা দিতে রগ ফুলিয়ে তর্ক করলেও উগ্র হিন্দুত্ববাদকে জঙ্গিবাদ বলতে বড়ই কুণ্ঠিত এরা।

দুই. জঙ্গিবাদের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মুসলমানদের গায়ে জঙ্গি, উগ্র, সন্ত্রাসী তকমা লাগার অনেক আগেই পৃথিবীতে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসের উত্থান হয়। আর বর্তমানে মুসলমান নামধারী জঙ্গিদের পাশাপাশি অন্য ধর্ম ও মতাদর্শের উগ্রবাদীরও হামেশাই দৃষ্টিগোচর হয়। কিন্তু মুসলমান জঙ্গিরা ছাড়া অন্য ধর্মের উগ্রবাদীরা মিডিয়ায় খুব একটা প্রচার-প্রচারণা পায় না। ২০১৮ সালে ইউনিভার্সিটি অব আলাবামা পরিচালিত একটি জরিপে দেখা গেছে, ২০০৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিকদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে সেখানে যে পরিমাণ খবর প্রচার করা হয়েছে, কোনও সন্ত্রাসী ঘটনায় মুসলমানরা জড়িত থাকলে সে তুলনায় ৩৫৭ গুণ বেশি খবর প্রচার করা হয়েছে।

এফবিআইয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৮০ থেকে ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যত সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে তার সর্বোচ্চ ৪২ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত ল্যাটিনো গ্রুপ। ২৪ শতাংশ চরম বামদল, ইহুদি চরমপন্থী গ্রুপ ৭ শতাংশ, ইসলামি জঙ্গি গ্রুপ ৬ শতাংশ, কমিউনিস্ট গ্রুপ ৫ শতাংশ ও অন্যান্য গ্রুপ ১৬ শতাংশ সন্ত্রাসী আক্রমণের সঙ্গে জড়িত।

National Consortium for the Study of Terrorism and Responses to Terrorism (START) এর পরিসংখ্যান বলছে ১৯৭০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে যে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে তার ২.৫ শতাংশ হামলার সঙ্গে জড়িত মুসলমানরা। মুসলমানদের সন্ত্রাসী হিসেবে ধারাবাহিকভাবে চিত্রায়িত করা এবং ইসলামভীতি ছড়ানোর জন্য ইসলামকে ভয়ংকর একটি মতাদর্শ হিসেবে তুলে ধরার একটি সুস্পষ্ট প্রবণতা দৃশ্যমান।

তিন. আলকায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে তালেবানের বিরুদ্ধে দুই দশক ধরে যুদ্ধ করলো। এই আল-কায়েদাকে সামরিক, আর্থিক ও প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান।

আফগানিস্তানে দখলদার রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রক্সি যুদ্ধে আল-কায়েদার কাজের পূর্ণ সহযোগী ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান। কট্টর ধর্মীয় গুরু আবদুল্লাহ আজমের সঙ্গে মিলে লাদেন মকতব আল-খিদামাত (এমএকে) নামে একটি বৈশ্বিক নিয়োগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। সংগঠনটি নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিন এবং অ্যারিজোনার টুকসনে তাদের কার্যালয় স্থাপন করেছিল। সেখান থেকে তারা ‘আফগান আরব’ নামে খ্যাত অভিবাসীদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছে। আল-কায়েদা তখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ছিল ‘পেয়ারের মুজাহিদিন’। সোভিয়েত বাহিনী পরাজিত হয়ে আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাওয়ার পর একই আল-কায়েদা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হয়ে গেলো জঙ্গি।

সোভিয়েত বাহিনী চলে যাওয়ার পর মুজাহিদিনদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এ রকম অবস্থায় দৃশ্যপটে আসে তালেবান। তালেবান হঠাৎ করে আকাশ থেকে টুপ করে পড়েনি, কিংবা মাটি ফুঁড়ে বের হয়নি। সৌদি আর্থিক সহায়তায় দীর্ঘদিন ধরে তালেবান গড়ার কারিগর হচ্ছে পাকিস্তান। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা কি এ খবর জানতো না?

চার. জঙ্গিবাদ দমনে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা মিত্রদের ‘ওয়ার অন টেরর’ সৎ ও পক্ষপাতহীন ছিল না। মুখে জঙ্গিবাদ দমনের কথা বললেও তারা বিশেষ ধর্ম-মতাদর্শ ও গ্রুপকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে, অর্থ-অস্ত্র-প্রশিক্ষণ দিয়ে সাহায্য-সহযোগিতা করেছে। তথাকথিত ‘ওয়ার অন টেরর’ ঘোষণার পেছনে মুসলিম বিশ্বকে পদানত রাখার পরিকল্পনা ছিল। এছাড়া যুদ্ধ অর্থনীতিকে চাঙা রাখতে অস্ত্র ব্যবসার কূটকৌশলও ছিল। ফলে জঙ্গিবাদ দমনের নামে ভয়ংকর এই রাজনীতির খেলা ব্যর্থ হয়েছে। উপরন্তু, জঙ্গিবাদের বিশ্বায়ন হয়েছে। নতুন নতুন জঙ্গি গ্রুপের উত্থান হয়েছে।

পাঁচ. ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র এবং তালেবানের মধ্যে তথাকথিত শান্তি চুক্তির মাধ্যমে তালেবান ক্ষমতাসীন হয়েছে। মার্কিন ও তার মিত্র সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই আফগান সরকারের পতন ঘটতে পারে এটা কি অজানা ছিল? আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন মিশনের অধিনায়ক জেনারেল অস্টিন মিলার গত জুন মাসেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে ‘দেশটি এক চরম নৈরাজ্যকর গৃহযুদ্ধের দিকে চলে যেতে পারে। এটি গোটা বিশ্বের জন্যই এক গভীর উদ্বেগের বিষয়।’

ওই মাসেই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার এক পর্যালোচনায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল, মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই আফগান সরকারের পতন ঘটতে পারে। শান্তি চুক্তির পর তালেবান বড় বড় শহর এবং সামরিক ঘাঁটির ওপর হামলার পরিবর্তে তারা টার্গেট করে করে হত্যা করছিল। তালেবানের হামলার টার্গেট ছিল সাংবাদিক, বিচারক, শান্তির জন্য আন্দোলনকারী এবং কিছু ক্ষেত্রে নারীরা। এ থেকে ধারণা পাওয়া যাচ্ছিল যে তালেবান তাদের চরমপন্থী মতাদর্শ পরিবর্তন করেনি, কৌশল বদলেছে মাত্র। তালেবানের সঙ্গে পাতানো ম্যাচ খেলে এখন উদ্বেগ প্রকাশ, মায়াকান্না পশ্চিমাদের দ্বিচারিতার নগ্ন প্রকাশ বৈ আর কিছু নয়।

ছয়. তালেবানবিরোধীরা মনে করে তালেবানকে ক্ষমতাচ্যুত এবং ইসলামের নামে পরিচালিত অন্য জঙ্গিদের দমন করতে পারলেই পৃথিবী থেকে জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস নির্মূল হবে। এটি ভ্রান্ত ধারণা। বৌদ্ধ, হিন্দু, ইহুদি ও খ্রিষ্ট ধর্মের অনুসারী ও শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদীদের দ্বারা মুসলমান হত্যা, ধর্ষণ, নিপীড়ন, নির্যাতন, মসজিদে হামলা বন্ধ না করা গেলে ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ নির্মূল হবে বলে প্রতীয়মান হয় না। ‘ওয়ার অন টেরর’-এর নামে  আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, মিসরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হলো। লাখ লাখ নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হলো। কোটি মানুষকে বাস্তুচ্যুত ও জীবনধারণের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলো। জঙ্গিবাদ কি দমন হলো? বরং, পক্ষপাতমূলক আচরণের প্রতিক্রিয়ায় জন্ম নিয়েছে আইএস, আইএসআইকেপি, বোকো হারাম, আল শাবাব।  

তালেবানের পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক যা-ই থাকুক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তালেবান ইস্যু এখন বড়ই গুরুত্বপূর্ণ। তালেবান, আল কায়েদা, হাক্কানি নেটওয়ার্ক সবারই নেপথ্যের কারিগর পাকিস্তানের আইএসআই। পাকিস্তান যেকোনও মূল্যে তালেবানের ওপর প্রভাব ধরে রাখতে চাইবে। অন্যদিকে, মধ্য এশিয়ায় অবস্থান ধরে রাখতে আফগানিস্তান রাশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চীন ও ভারতের ভূ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা ইস্যু জড়িত রয়েছে আফগানিস্তানের সঙ্গে। তালেবানকে কাছে টানতে চেষ্টা করছে দুই দেশই। ইরান ও আমিরাত সরকার গঠন, অনানুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও উদার সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে তালেবানের দিকে। এদিকে তালেবান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করে ক্ষমতায় এসেছে। ফলে কোন দেশ তালেবানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আর এর জের ধরে রুশ-মার্কিন-চীন সম্পর্ক তথা বৈশ্বিক রাজনীতি কোনদিকে মোড় নেবে, তা সময়ই বলে দেবে। আইএসআইর সবচেয়ে বড় শত্রু হলো বাংলাদেশ ও ভারত। বাংলাদেশ ও ভারতের বিষয়ে তালেবানের ভূমিকা কী হবে সেটা দেখতেও তালেবানপ্রেমী ও বিরোধীদের অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছু দিন।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: [email protected]
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

আমি কেন তালেবানকে সমর্থন করি না?

আমি কেন তালেবানকে সমর্থন করি না?

পরীমণি, ‘সরি মণি’

পরীমণি, ‘সরি মণি’

রাজনীতি ও ইতিহাসের ভুল পাঠ ও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শত্রুতা

রাজনীতি ও ইতিহাসের ভুল পাঠ ও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শত্রুতা

বিপদ ডেকে আনছে ভারত, ঝুঁকি বাংলাদেশেরও

বিপদ ডেকে আনছে ভারত, ঝুঁকি বাংলাদেশেরও

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

মেইল ট্রেনের নিরাপত্তায় পুলিশই থাকে না

মেইল ট্রেনের নিরাপত্তায় পুলিশই থাকে না

ভ্যাপসা গরমে অতীষ্ঠ জীবন

ভ্যাপসা গরমে অতীষ্ঠ জীবন

আফগানিস্তানের দরজায় দুর্ভিক্ষ: জাতিসংঘ

আফগানিস্তানের দরজায় দুর্ভিক্ষ: জাতিসংঘ

৪ ঘণ্টা পর পাবনা-রাজশাহী রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক

৪ ঘণ্টা পর পাবনা-রাজশাহী রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক

জাগো ফাউন্ডেশনে চাকরি, অফিস সপ্তাহে ৫ দিন, বেতন ৫০ হাজার

জাগো ফাউন্ডেশনে চাকরি, অফিস সপ্তাহে ৫ দিন, বেতন ৫০ হাজার

ফাইজারের আরও ২৫ লাখ টিকা আসছে সোমবার

ফাইজারের আরও ২৫ লাখ টিকা আসছে সোমবার

চাঁদে জমি কিনলেন নির্মাতা হিমু আকরাম, পেলেন নাগরিকত্বও!

চাঁদে জমি কিনলেন নির্মাতা হিমু আকরাম, পেলেন নাগরিকত্বও!

রাজধানীতে মাদক বিক্রি ও সেবনের অভিযোগে ৫২ জন গ্রেফতার

রাজধানীতে মাদক বিক্রি ও সেবনের অভিযোগে ৫২ জন গ্রেফতার

ডোবায় মাছ ধরা নিয়ে সংঘর্ষে নিহত ১

ডোবায় মাছ ধরা নিয়ে সংঘর্ষে নিহত ১

মঙ্গলবার থেকে দেশে আবারও গণটিকা কর্মসূচি: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

মঙ্গলবার থেকে দেশে আবারও গণটিকা কর্মসূচি: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

১৮ মাস পর খুললো ঢাবির কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি

১৮ মাস পর খুললো ঢাবির কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি

হোটেল-মেসে মিলছে না সিট, বিপাকে রাবির ভর্তিচ্ছুরা

হোটেল-মেসে মিলছে না সিট, বিপাকে রাবির ভর্তিচ্ছুরা

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune