X
মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর ২০২১, ১০ কার্তিক ১৪২৮

সেকশনস

দুনিয়া কাঁপানো মহাকাব্য

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২১, ১৫:৩২

তোফায়েল আহমেদ ১৯৭১-এর সাতই মার্চের দুনিয়া কাঁপানো ভাষণ বাঙালি জাতির মহান মুক্তি সনদ। ঐতিহাসিক এই ভাষণ জাতীয় সীমানা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক দিগন্তে বাঙালির গৌরবময় পতাকা মর্যাদার সঙ্গে উড্ডীন রেখেছে। ২০১৭-এর ৩০ অক্টোবর জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কো ’৭১-এর সাতই মার্চে প্রদত্ত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণকে (ওয়ার্ল্ড ডকুমেন্টারি হেরিটেজ) বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে, যা সমগ্র জাতির জন্য গৌরবের এবং আনন্দের। আজ ঐতিহাসিক সাতই মার্চেরও সুবর্ণজয়ন্তী। পঞ্চাশ বছর আগের এই দিনটির জন্যই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবনভর সংগ্রাম করেছেন। দীর্ঘ ১৩টি বছর কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সুনির্দিষ্ট করে রাজনীতি করেছেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরই তিনি লক্ষ্য নির্ধারণ করেন ‘একদিন বাংলার ভাগ্যনিয়ন্তা বাঙালিদেরই হতে হবে।’ সেই পথেই তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়েছেন। মহান ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করেন। ছয় দফার মধ্য দিয়ে বাংলার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেন। ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য’ তথা আগরতলা মামলার আসামি হিসেবে ফাঁসিকাষ্ঠে গিয়েছেন। কিন্তু বাঙালির জাতীয় মুক্তির প্রশ্নে আপস করেননি; বরং মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন। ’৬৯-এর প্রবল গণআন্দোলন-গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা তাঁকে কারামুক্ত করি। জাতীয় মুক্তি-সংগ্রামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখবো, একেকটা ঘটনার সঙ্গে একেকটা ঘটনা সম্পর্কিত। তিনি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন একটি লক্ষ্য নিয়ে। ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের অগ্রগামী বাহিনী। জাতীয় নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু যা বলতে পারতেন না, ছাত্রলীগ দিয়ে সেটা বলাতেন। আজকাল অনেকে অনেক কথা বলেন, অনেক কিছু লেখেন- কে তুলেছে ‘স্বাধীন বাংলার পতাকা’, কে বলেছে ‘জাতীয় সংগীত’ ইত্যাদি। ইতিহাসের সত্য হচ্ছে, এগুলো বঙ্গবন্ধু কর্তৃক নির্ধারিত। বঙ্গবন্ধুর অনুমোদন ছাড়া কোনও কিছু হয়নি। ১৯৬৬-এর মার্চে আওয়ামী লীগের সম্মেলনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা...’-পরবর্তীতে আমাদের জাতীয় সংগীত- এই গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সম্মেলন শুরু হয়। সম্মেলনের শেষদিন পল্টন ময়দানে জনসভার শুরুতে এই গান পরিবেশনের পর বঙ্গবন্ধু বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘ছয় দফা বাংলার মানুষের মুক্তি-সনদ’। তারপরে এলো ’৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচন। একটি কথা দ্বিধাহীনচিত্তে বলতে চাই, ’৭০-এর নির্বাচনে যদি বঙ্গবন্ধু একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেতেন, তাহলে কি আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেতাম? হয়তো পেতাম, কিন্তু অনেক সময় লাগতো। নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেই বঙ্গবন্ধু ’৭০-এর নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। ’৭০-এর ৩০ মার্চ রাষ্ট্রপতির আদেশ নং-২ অনুযায়ী লিগ্যাল ফ্রেম ওয়ার্ক অর্ডার বা সংক্ষেপে এলএফও জারি হয়। সর্বমোট ৪৮টি অনুচ্ছেদ সংবলিত এই এলএফও-তে-৬ ও ১১ দফার দুটি দফা-

এক. ‘প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার’ এবং দুই. ‘জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্ব’ মেনে নেওয়া হয়। ফলত, জাতীয় পরিষদে ৩১৩টি আসনের মধ্যে জনসংখ্যার অনুপাতে আমরা পাই ১৬৯টি আসন। কিন্তু ভবিষ্যতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েও যাতে বঙ্গবন্ধু ৬ দফা ও ১১ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করতে না পারেন সেজন্য ইয়াহিয়া খান এলএফও-তে বিতর্কিত ২৫ ও ২৭নং দু’টি অনুচ্ছেদ সন্নিবেশিত করেন। ২৫নং অনুচ্ছেদের শিরোনাম ছিল, ‘শাসনতন্ত্রের প্রমাণীকরণ’। যাতে বলা হয়েছিল, ‘জাতীয় পরিষদে গৃহীত শাসনতন্ত্র বিল, প্রমাণীকরণের জন্য প্রেসিডেন্টের নিকট উপস্থাপিত হবে। এ পর্বে প্রমাণীকরণে প্রত্যাখ্যাত হলে জাতীয় পরিষদের অবস্থান লুপ্ত হবে।’ আর ২৭নং অনুচ্ছেদের শিরোনাম ছিল, ‘আদেশের সংশোধন এবং ব্যাখ্যা, ইত্যাদি’; এর  ক-ধারায় ছিল, ‘এই আদেশের কোন আইনের ধারা সম্পর্কে কোন ধারণা, কোন ব্যাখ্যা বা কোন প্রশ্ন উত্থাপিত হলে সে সম্পর্কে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে এবং এ ব্যাপারে কোন আদালতে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।’ একই অনুচ্ছেদের খ-ধারায় ছিল, ‘জাতীয় পরিষদ নয় বরং রাষ্ট্রপতিই এই আদেশের সংশোধনের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী।’ এলএফও-তে সন্নিবেশিত দুটি ধারাই ছিল আসন্ন নির্বাচনে বিজয়ী দলকে ঠেকানোর অপপ্রয়াস। যার জন্য অনেকেই বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, ‘এই নির্বাচন করে কোনও লাভ নেই।’ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমার এই নির্বাচন ক্ষমতায় যাওয়ার নির্বাচন নয়। এই নির্বাচন হলো গণভোট এবং নির্বাচনের পরপরই আমি এই এলএফও টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলবো।’ ’৭০-এর ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ ও ১৭ ডিসেম্বর ছিল প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচন। ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের নির্বাচন ৭ ডিসেম্বর না হয়ে ’৭১-এর ১৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। ফলে নির্বাচনি প্রচারাভিযানে বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে থেকে সারা বাংলাদেশ সফরের সুযোগ পাই। আমরা সংরক্ষিত মহিলা আসনসহ জাতীয় পরিষদে ১৬৯টি আসনের ১৬৭টি আর প্রাদেশিক পরিষদে ২৯৮টি আসনে জয়লাভ করি। বিজয়ের পর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ’৭১-এর ৩ জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শপথ অনুষ্ঠান। সেদিনের শপথসভায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘৬ দফা আজ আমার না, আমার দলেরও না। এই নির্বাচনের মাধ্যমে ৬ দফা জনগণের সম্পত্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। কেউ যদি এর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তবে তাকে জ্যান্ত কবর দেওয়া হবে এবং আমি যদি করি আমাকেও।’ এই শপথ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ৬ দফাকে তিনি আপসহীন অবস্থায় উন্নীত করেন। এরপর অনেক ঘটনা ঘটেছে। ভুট্টো-ইয়াহিয়া ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। ’৭১-এর ১ মার্চ ৬ দফার ভিত্তিতে সংবিধান প্রণয়নের জন্য হোটেল পূর্বাণীতে আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক চলাকালে পূর্বাহ্নে ডাকা ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ইয়াহিয়া খান এক বেতার ভাষণে একতরফা স্থগিত ঘোষণা করেন। তৎক্ষণাৎ দাবানলের মতো আগুন জ্বলে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আমরা পল্টন ময়দানে যাই। সেখানে পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করি। বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগ ও ডাকসু’র সমন্বয়ে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনের নির্দেশ দেন। ৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুকে সামনে রেখে ‘স্বাধীনতার ইশতেহার’ পাঠ করা হয়। এরপর আসে ঐতিহাসিক সাতই মার্চ।

সাতই মার্চ একদিনে আসেনি। ধাপে ধাপে এসেছে। এই সাতই মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তিনি বিচক্ষণ নেতা ছিলেন। সব সময় সতর্ক ছিলেন যাতে তিনি আক্রমণকারী না হয়ে আক্রান্ত হন। আন্তর্জাতিক বিশ্বের সাহায্য-সহযোগিতা ও স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য তিনি বিশেষভাবে যত্নবান ছিলেন। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে কেউ যেন বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যায় আখ্যায়িত করতে না পারে সে জন্য তিনি সতর্কতার সাথে বক্তৃতা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এখানে শ্রদ্ধাভরে বঙ্গমাতাকে মনে পড়ে। ৬ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু বারান্দায় পায়চারী করে আগামীকালের বক্তৃতা নিয়ে ভাবছিলেন। শ্রদ্ধেয়া বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব অভয় দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমার ভাববার কী আছে। সারা জীবন তুমি একটা লক্ষ্য নিয়ে রাজনীতি করেছ। জেল-জুলুম-অত্যাচার সহ্য করেছ। বারবার ফাঁসির মঞ্চে গিয়েছ। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছ। বিশ্বাসী আত্মা থেকে তুমি যা বিশ্বাস করো, তা-ই বলবা।’ ঠিকই বঙ্গবন্ধু বিশ্বাসী অন্তর থেকে সাতই মার্চের বক্তৃতা করেছিলেন। এটি দুনিয়া কাঁপানো বক্তৃতা। পৃথিবীর কোনও ভাষণ এতবার উচ্চারিত হয়নি। একটি অলিখিত বক্তৃতা তিনি দিলেন বিশ্বাসী অন্তর থেকে। যা তিনি বিশ্বাস করতেন তা-ই বলতেন। শত্রুপক্ষ গোলা-বারুদ, মেশিনগান, কামান, হেলিকপ্টার-গানশিপ, ট্যাংকসহ সবকিছু নিয়ে প্রস্তুত। সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে নিরস্ত্র জনসাধারণের ওপর। অনেকেই তো বঙ্গবন্ধুকে বলতে চেয়েছেন, আজকেই যেন বলেন, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।’ কিন্তু বঙ্গবন্ধু কারো দ্বারা প্ররোচিত হননি। সাতই মার্চ সকাল থেকেই রেসকোর্স ময়দানে জনস্রোত আসতে থাকে। তখন সব মানুষের মুখে মুখে স্বাধীনতা। একটি ঘটনা আমার মনে পড়ে। সাতই মার্চ দুপুরে আমি এবং আমারই আরেক প্রিয় নেতা- নামোল্লেখ করলাম না- আমরা দু’জন বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধু আমাদের দুজনের কাঁধে হাত রেখে কথা বলছিলেন। আমাদের সেই নেতা যখন বঙ্গবন্ধুকে বললেন, (তিনি তাঁকে ‘লিডার’ বলে সম্বোধন করতেন) ‘লিডার, আজকে কিন্তু পরিপূর্ণ স্বাধীনতার ঘোষণা ছাড়া মানুষ মানবে না।’ আমাদের কাঁধে রাখা হাত নামিয়ে তাঁর নামোচ্চারণ করে বঙ্গবন্ধু ইংরেজিতে বললেন, ‘আই অ্যাম দ্য লিডার অব দ্য পিপল। আই উইল লিড দেম। দে উইল নট লিড মি। গো অ্যান্ড ডু ইউর ডিউটি।’ এই বলে তিনি আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে উপরে চলে গেলেন।

আমরা ধানমন্ডি থেকে রওনা করি পৌনে তিনটায়। রেসকোর্স ময়দানে পৌঁছাই সোয়া তিনটায়। বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা আরম্ভ করেন সাড়ে তিনটায়। দশ লক্ষাধিক জনতার গগনবিদারী স্লোগানে মুখরিত রেসকোর্স ময়দান। সেদিনের সভামঞ্চে জাতীয় চার নেতা- সর্বজনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা দেওয়ার জন্য দাঁড়ালেন, চারদিকে তাকালেন। মাউথপিসের সামনে পোডিয়ামের ওপর চশমাটি রাখলেন। হৃদয়ের গভীরতা থেকে-যা তিনি বিশ্বাস করতেন, যার জন্য সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন, ফাঁসির মঞ্চে গিয়েছেন, সেই বিশ্বাসী আত্মা দিয়ে, বাংলার মানুষকে ডাক দিলেন, ‘ভাইয়েরা আমার’। তারপর একটানা ১৯ মিনিট ধরে বলে গেলেন দুনিয়া কাঁপানো মহাকাব্য। বক্তৃতায় তিনি মূলত স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন। বঙ্গবন্ধুর সামনে ছিল দুটি পথ। এক. স্বাধীনতা ঘোষণা করা। দুই. পাকিস্তান ভাঙার দায়িত্ব না নিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে আখ্যায়িত না হয়ে সুচিন্তিত বক্তব্য প্রদান করা। তিনি দুটোই করলেন। বঙ্গবন্ধু জানতেন সেদিনের পরিস্থিতি। যেটা তিনি আমাদের বলেছিলেন। সেনাবাহিনী তখন প্রস্তুত। মাথার উপর বোমারু বিমান এবং হেলিকপ্টার গানশিপ টহল দিচ্ছে। যখনই বঙ্গবন্ধু এই ভাষায় বলবেন যে, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন’, তখনই তারা গোলাবর্ষণ শুরু করবে। সেজন্য বঙ্গবন্ধু সবকিছু জেনেই বক্তৃতা করেছেন। এতো বিচক্ষণ নেতা ছিলেন যে, সমস্ত ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে সামরিক শাসকের উদ্দেশে চারটি শর্ত আরোপ করলেন–মার্শাল ল’ প্রত্যাহার কর, সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরিয়ে নাও, এ কয়দিনে যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে তার বিচার বিভাগীয় তদন্ত কর এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর কর। এই চারটি শর্ত আরোপ করে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যায় আখ্যায়িত হলেন না। পাকিস্তানিরা তাঁকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যায় আখ্যায়িত করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তিনি ছিলেন সদা সতর্ক এবং সচেতন। অপরদিকে পুরো বক্তৃতাজুড়ে ছিল আসন্ন জনযুদ্ধের রণকৌশল এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা। সুস্পষ্টভাবেই বলেছেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই।’ ‘আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দেবার চাই যে, আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট-কাচারি, আদালত-ফৌজদারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে।’ ‘তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু, আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে মারবো।’  ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে’ তোলার আহ্বান জানিয়ে বললেন, ‘সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্ট, সেমি গভর্নমেন্ট দফতরগুলো ওয়াপদা কোনও কিছু চলবে না।’ নির্দেশ দিলেন ‘আটাশ তারিখে কর্মচারীরা গিয়ে বেতন নিয়ে আসবেন।’ সরকারি কর্মচারীদের উদ্দেশে বললেন, ‘আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হবে, খাজনা, ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো, কেউ দেবে না।’ গরিবের কথা খেয়াল রেখে বলেছেন, ‘গরিবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে’ সেজন্য শিল্প কল-কারখানার মালিকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘এই সাত দিন হরতালে যে সমস্ত শ্রমিক ভাইয়েরা যোগদান করেছেন প্রত্যেকটা শিল্পের মালিক তাদের বেতন পৌঁছায়া দিবেন।’ জীবনভর লালিত প্রগাঢ় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমুন্নত রেখে বিরোধী রাজনীতিকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও একজন যদিও সে হয়, তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেবো।’ আর রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায়, প্রত্যেক ইউনিয়নে, প্রত্যেক সাবডিভিশনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলো এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।’ বক্তৃতার শেষে বজ্রকণ্ঠে স্বাধীনতা ঘোষণা করে বলেছেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ অর্থাৎ সামগ্রিকতায় জাতীয় মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে জনসাধারণ কর্তৃক নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতার ভারসাম্যপূর্ণ বক্তৃতা। সেদিনের সেই স্মৃতি মানসপটে ভেসে ওঠে। অভূতপূর্ব দৃশ্য, কল্পনা করা যায় না। এটিই মানুষ প্রত্যাশা করেছিল। একটা কথা আমার বারবার মনে হয়। একজন নেতা কত দূরদর্শী যে, তিনি সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে জানতেন। কোন সময় কোন কথা বলতে হবে এটা তার মতো ভালো জানতেন এমন মানুষ আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে দেখিনি। আমি লক্ষ করেছি, বঙ্গবন্ধু জীবনে কখনও স্ববিরোধী বক্তব্য দেননি। একটি বক্তব্য দিয়ে পরে সেই বক্তব্য অস্বীকার করা বা বক্তব্যের মধ্যে পরস্পর বিরোধিতা এটি তাঁর কোনোদিন হয়নি। কারণ, যা তিনি বিশ্বাস করেছেন, ভেবেছেন, মনে করেছেন যে এটিই বাস্তবসম্মত, সেটিই তিনি বলেছেন সুচিন্তিতভাবে। আর যা একবার বলেছেন, মৃত্যুর কাছে গিয়েও আপসহীনভাবে সেই কথা তিনি বাস্তবায়ন করেছেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর হৃদয়ে ধারিত গভীর বিশ্বাস থেকেই সেদিন বক্তৃতা করেছেন।

আমরা যদি বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের বক্তৃতা বিশ্লেষণ করি তবে দেখবো, অলিখিত একটি বক্তৃতা। ভাষণের সময় ১৯ মিনিট। শব্দ সংখ্যা ১৩০৮টি।  আব্রাহাম লিংকনের Gettysburg Address -এর শব্দ সংখ্যা ২৭২, সময় ৩ মিনিটের কম এবং লিখিত। অপরদিকে, মার্টিন লুথার কিং-এর ‘I have a dream’ ভাষণটির সময় ১৭ মিনিট, শব্দ সংখ্যা ১৬৬৭। কিন্তু বিশ্বের কোনও নেতার ভাষণ এমন সংগ্রামমুখর ১০ লক্ষাধিক মুক্তিকামী নিরস্ত্র মানুষের সামনে হয়নি। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণটি প্রদান করে মানুষকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে, নিরস্ত্র বাঙালিকে সশস্ত্র জাতিতে রূপান্তরিত করে মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনা দিলেন। কী বিচক্ষণ একজন নেতা! আইএসআই ৭ই মার্চ ঢাকা ক্লাবের সামনে ছিল। তারা অপেক্ষা করেছিল- যে ঘোষণাটি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে বলেছিলেন, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন’- তারা মনে করেছিল সেই কথাটি তিনি সাতই মার্চ বলবেন। আমি আগেই বলেছি বঙ্গবন্ধু ছিলেন সতর্ক। তিনি সবই বলেছেন, কিন্তু শত্রুর ফাঁদে পা দেননি। উল্টো শত্রুকেই ফাঁদে ফেলেছেন। যার জন্য পরদিন আইএসআই রিপোর্ট করলো ‘চতুর শেখ মুজিব চতুরতার সাথে বক্তৃতা করে গেলো। একদিকে স্বাধীনতা ঘোষণা করলো, আরেকদিকে ৪টি শর্ত আরোপ করে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যায় আখ্যায়িত হলো না এবং পাকিস্তান ভাঙার দায়িত্ব নিলো না। আমাদের নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করা ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না। আমরা যে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলাম সেটা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো।’ এই ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। একটি বক্তৃতার মধ্য দিয়ে তিনি একটি গণতান্ত্রিক-রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছেন। একটি বক্তৃতার মধ্য দিয়ে তিনি নিরস্ত্র বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র বাঙালি জাতিতে রূপান্তরিত করেছেন। এই একটি বক্তৃতার মধ্য দিয়ে বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষকে তিনি স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে একই মোহনায় দাঁড় করিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন ঠিকই কিন্তু বিচ্ছিন্নতাবাদের দায় এড়িয়ে।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের কালপর্বে এই মার্চ মাস থেকেই শুরু হলো স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। এই মার্চ মাসই তো রক্তঝরা মাস। আজ সাতই মার্চেরও সুবর্ণজয়ন্তী। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতের দেরাদুনে আমাদের ট্রেনিং হতো। সেখানে আমরা মুজিব বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে বক্তৃতায় বলতাম, ‘বঙ্গবন্ধু মুজিব তুমি কোথায় আছ, কেমন আছ জানি না। কিন্তু তোমার নির্দেশিত পথে যুদ্ধ চালিয়ে যতক্ষণ আমরা বাংলা মাকে মুক্ত করতে না পারবো, ততক্ষণ মায়ের কোলে ফিরে যাবো না।’ প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন ও বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করেই আমরা মায়ের কোলে ফিরে এসেছিলাম। সাতই মার্চের দুনিয়া কাঁপানো বক্তৃতা ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের চলার পথের দিকনির্দেশনা, যা আমরা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করেছি। দুটি মহান লক্ষ্য সামনে নিয়ে বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করেছেন। এক. বাংলাদেশের স্বাধীনতা। দুই. অর্থনৈতিক মুক্তি। প্রথম লক্ষ্য পূরণ করে যখন তিনি দ্বিতীয় লক্ষ্য পূরণের দ্বারপ্রান্তে ঠিক তখনই ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা তাঁকে সপরিবারে হত্যা করে। জাতির জনকের দুই কন্যা তখন বিদেশে অবস্থান করায় রক্ষা পান। ’৮১-এর ১৭ মে জাতির জনকের জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনার হাতে আওয়ামী লীগের রক্তে ভেজা পতাকা আমরা তুলে দেই। সেই সংগ্রামী পতাকা হাতে নিয়ে নিষ্ঠা ও সততার সাথে চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করে আজ বাংলাদেশকে তিনি উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় অভিষিক্ত করে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত করেছেন। সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ হবে জাতির জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলা।


লেখক: আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।


[email protected]

/এসএএস/

সম্পর্কিত

বঙ্গবন্ধুর চেতনা চলার পথের প্রেরণা

বঙ্গবন্ধুর চেতনা চলার পথের প্রেরণা

বঙ্গমাতার জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

বঙ্গমাতার জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

নির্লোভ নিরহংকারী প্রতিভাবান শেখ কামাল

নির্লোভ নিরহংকারী প্রতিভাবান শেখ কামাল

আমার জীবনে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ

আমার জীবনে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ

করোনাকালীন ১০ কোটি উদ্যোক্তার গল্প

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২১, ১৯:১৯

ফাতেমা আবেদীন এই শিরোনাম পড়ে নিশ্চয় পাঠক হিসেবে আপনি চোখ কুঁচকে ফেলেছেন। ১৬ কোটি (আনঅফিসিয়ালি ১৭  বা ১৯ কোটি) জনগণের দেশে ১০ কোটি উদ্যোক্তা! নিশ্চয়ই আপনি ধন্দে পড়ে গেছেন। ব্যক্তিগতভাবে একজন অনলাইন উদ্যোক্তা হিসেবে আমিও এই হিসাবের মারপ্যাঁচে পড়ে আছি।

আসলে কত অনলাইন এবং কতজন অফলাইন উদ্যোক্তা আছেন বাংলাদেশে, সেই তথ্য কারও জানা নেই। হুজুগের দেশে এই মুহূর্তের ট্রেন্ড অনলাইন উদ্যোগ। মোবাইলে ৯ টাকায় এক জিবি ডাটা, ৯৯৯ টাকার টাচফোন আর বউয়ের বা বোনের রান্না করা কৈ মাছের বাটি চচ্চরির বিনিয়োগ আপনাকে উদ্যোক্তা বানিয়ে ছাড়বে। এই হুজুগ বা ট্রেন্ডই এই মুহূর্তে চলছে।

সম্প্রতি মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, এই করোনাকালে মোবাইল কলের চেয়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বেড়েছে প্রায় ১০ গুণ। ২০১৮ সালে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বাংলাদেশি ছিলেন ৩ কোটি, ৩ বছরে সেটি বেড়েছে তিনগুণের বেশি। এই মুহূর্তে ১০ কোটির বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী।

সম্প্রতি বিটিআরসি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জুলাই মাস শেষে দেশে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৯ কোটি ৮৭ লাখ ৪০ হাজার। জুন মাস শেষে যা ছিল ৯ কোটি ৪৯ লাখ ৫ হাজার। এই হিসাব থেকে দেখা যায়, দেশে এক মাসে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বেড়েছে ২৯ লাখ ৩৫ হাজার। তবে দেশে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটি ৬৪ লাখ ১০ হাজার। অবশিষ্ট ৮৫ লাখ ৭১ হাজার হলো ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। (তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন।)

মনে রাখবেন, এসব ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর প্রত্যেকেই ‘ঝানু ব্যবসায়ী’। আর প্রত্যেকেই অন্তর্জালে একেকজন ‘ঝানু ব্যবসায়ী’– এই বাক্যটিকে নেহায়েত তির্যক মন্তব্য বলে বিবেচনা করলে লেখাটি সুখপাঠ্য হবে। এসব ‘ঝানু’ অন্তর্জালিক (অনলাইন) ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে পড়ার আগে কিছু তথ্য জেনে রাখা ভালো।

ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) জানায়, ২০১৭ সালে অনলাইন ব্যবসা বা অন্তর্জালিক কেনাবেচার লেনদেন এক হাজার কোটির বেশি। এরমধ্যে নারী উদ্যোক্তাদের আয় ৩০০ কোটি টাকার বেশি। (তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন)। তবে পর পর দুই বছর এই লেনদেনে ২/৪ কোটির মতো বেড়েছে।

কিন্তু ২০২০ সালে এই চিত্র একেবারেই পাল্টে গেছে বলে জানিয়েছে ই-ক্যাব। এক হাজার কোটির সামান্য বেশি  লেনদেন বছরের প্রথমার্ধেই চার হাজার কোটির দিকে এগিয়েছে। এ বছর বাজারের আকার দাঁড়াচ্ছে ১৬ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। ২০১৯ সালে এর আকার ছিল ১৩ হাজার কোটি টাকার (তথ্যসূত্র: প্রথম আলো)।

মাত্র ৬ মাসে করোনার স্থবির হয়ে যাওয়া অর্থনীতিকে একা হাতে সচল রেখেছেন এই ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা। যিনি শিক্ষক ছিলেন, করোনায় আয় বন্ধ হয়ে গেছে, অনলাইনে কোচিং চালাচ্ছেন, বা কাঁচা তরকারি হোম ডেলিভারি দিচ্ছেন। যিনি ডাক্তার ছিলেন, চেম্বার বন্ধ, আয় বন্ধ। তিনি হোমশেফ হয়ে যাচ্ছেন। কিংবা করোনার প্রভাবে ছাঁটাই হয়েছেন, তিনিও স্টার্টআপ ব্যবসা শুরু করেছেন। করোনার এই বন্দি সময়ে যখন একদল পেশাজীবী ব্যবসায়ীতে রূপান্তরিত হয়ে অর্থনীতির লাগাম টেনে ধরেছেন, তখন সম্ভাবনার পাশাপাশি আতঙ্কও ভর করে।

নিশ্চিতভাবেই পরিস্থিতি করোনাময় থাকবে না। স্বাভাবিক সময় বা নিউ নরমালে মানিয়ে নেওয়ার অবস্থা সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই হবে। সেই সময় ছাঁটাই হওয়া বা বেতন বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো নিশ্চয়ই আবার চালু হবে। পেশায় ফিরতে হবে পেশাজীবীদের। চিকিৎসকটি নিশ্চয়ই চেম্বারে ফিরে যাবেন। গার্মেন্টসের অর্ডার কমে গেছে বলে চাকরিচ্যুত হওয়া লোকটিও নিশ্চিতভাবেই সরিষার তেল আর মধু বিক্রি বন্ধ করে কাজে ফিরে যাবেন। যেতেই হবে, কারণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই বিশ্বে কাপড়ের চাহিদা বাড়বে। গার্মেন্টস আরও বড় ভেঞ্চারে যাবে। ট্রাভেল এজেন্সি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যিনি বাড়িতে মমো বিক্রি করছিলেন হোমমেকার হিসেবে, তিনিও নিশ্চয় আবার টিকিট/ট্রাভেল জোরদারভাবে শুরু হলে পুরনো কাজে ফিরেই যাবেন। এই ফিরে যাওয়া মানুষগুলোর সংখ্যা ৭৫ শতাংশ।

৭৫ শতাংশ করোনাকালীন স্টার্টআপ উদ্যোক্তা কীভাবে জানলাম, এই প্রশ্ন আসতেই পারে।

গত তিন বছরের ১ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা যখন মাত্র ৬ মাসে ৪ হাজার কোটিতে উন্নীত হয়, তখন সেটি ৭৫ শতাংশ আয়। তাহলে হিসাবের খাতায় বাকি থাকে ২৫ শতাংশ লোক। এই ২৫ শতাংশ মানুষও যে খুব দক্ষতার সঙ্গে ব্যবসা করছেন তা কিন্তু নয়। তাদের ৯৯ শতাংশই এফ কমার্সভিত্তিক। অর্থাৎ ফেসবুকের জোরে ব্যবসা চলছে। যদি কখনও ফেসবুক বন্ধ করা হয়, সেদিন কয়েক মুহূর্তের মধ্যে অনলাইন ব্যবসায় লেনদেন ৯০ শতাংশ বা তারও বেশি কমে আসবে।

হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ছাড়া কমবেশি সবারই অনলাইন ব্যবসা এফ কমার্সভিত্তিক। তাই বুঝে নিতে হবে কী তুমুল ঝুঁকির ওপর দাঁড়িয়ে আছে অনলাইনের ১৬ হাজার কোটি টাকার বাজার।  

আরও ভয়ংকর দিক হচ্ছে, অনলাইন ব্যবসার নামে সুবিশাল অঙ্ক লেনদেন হচ্ছে দেশের মূল অর্থনীতিকে স্পর্শ না করে।  ১৬ হাজার কোটি টাকার যে বাজার তৈরি হয়েছে তার ৯০ শতাংশ স্টার্টআপ উদ্যোক্তা। যাদের লাইসেন্স, ব্যবসায়িক অনুমোদন নেই। কারা এসব এফ-কমার্স, ই-কমার্সকে অনুমোদন দেবে সেই প্রতিষ্ঠানও গড়ে ওঠেনি। ই-ক্যাবের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো হয় নিজ উদ্যোগে কিছু তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছে কিন্তু তাদের অনুমোদন দেবে কে, সেই হদিস গত ১০ বছরে হয়নি। এমন কোনও উদ্যোগ কোনও সংগঠন বা রাষ্ট্র থেকে নেওয়া হয়নি, যাতে এই সম্ভাবনাময় বিশাল বাজার টিকে যেতে পারে। চরম দুর্যোগ মুহূর্তে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকতে পারে।

মৌসুমি ব্যবসায়ীরা যখন খুশি আসছেন, কিছু দিন ব্যবসা করছেন, এরপর পুরনো পেশায় ফিরে যাচ্ছেন। তাদের নিয়ন্ত্রণ বা অনুমোদন দেওয়ার বালাই থাকছে না। ফলে রাজস্বের বাইরে থাকছে এই ১৬ হাজার কোটি টাকার হিসাব।

তবে অনেক অনলাইন উদ্যোক্তাই নিজেদের উদ্যোগকে প্রতিষ্ঠিত করতে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়ার আবেদন করেন। কিন্তু সেই আবেদনপত্রে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের এস্টাবলিশমেন্ট ঠিকানা চাওয়া হয়। কিন্তু এফ-কমার্সে তো ঠিকানা বলতে ওই ফেসবুক। তাহলে তাদের ব্যবসার জন্য কেন এখনও নীতিমালা করা হলো না।

অপার সম্ভাবনার আই বাণিজ্য খাতটিকে হেলায় না হারিয়ে সামান্য কয়েকটি নিয়ম তৈরি করে বাজার নিয়ন্ত্রণে এনে অনায়াসে রাজস্ব বৃদ্ধির সুব্যবস্থা করা যাবে।

এদিকে তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রতিও একান্ত অনুরোধ, হুটহাট ব্যবসায় নেমে একটু ভ্যাকুয়াম তৈরি করার আগে কয়েকবার ভেবে নেবেন। সারা জীবন যে কৈ মাছ ফ্রি পেয়ে আসছেন, অনলাইনে ১০০ টাকায় বিক্রি করা যায় বলেই হুজুগে মেতে উঠবেন না।

যে বাজার দাঁড়াতে যাচ্ছে সেটিকে দাঁড়াতে দিন। নতুবা সেই ফেসবুকে শেয়ার করা বন্ধুর স্ট্যাটাসটিরই পুনরাবৃত্তি করি- পেইজে ইনভাইটেশন দিচ্ছেন দেন। ভালোবেসে লাইক দিবো। উদ্যোক্তা হওয়ার হোন, সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য দিবো। কিন্তু করোনা শেষ, সব ছেড়ে চাকরির লাইনে দাঁড়িয়েছেন তো...।

লেখক: সাংবাদিক ও উদ্যোক্তা।

[email protected]

 

/এসএএস/এমওএফ/

বসুরহাট ও গাজীপুরের মেয়র দেশটাকে কী মনে করেন?

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২১, ১৭:২০

ডা. জাহেদ উর রহমান গাজীপুরের মেয়র এবং গাজীপুর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম ‘ঝামেলা’য় পড়েছেন। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে থেকে জানা যায়, তিনি এক ঘরোয়া আলোচনায় দলের শৃঙ্খলাবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। এর জেরে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে আওয়ামী লীগ। এর কিছু দিন আগে তার ঘটানো আরেকটি কাণ্ডের জন্য জনাব জাহাঙ্গীরের আরও শক্ত কারণ দর্শানোর নোটিশ পাওয়া উচিত ছিল দলের পক্ষ থেকে, কিন্তু পাননি। বর্তমান বাংলাদেশে সেটা হবে এমন প্রত্যাশা করার মতো বোকা আমি নই। সে বিষয়টা জানার আগে জেনে নেওয়া যাক একই ধরনের আরেকটি ঘটনার কথা।

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা, যিনি ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদকের ভাই, অনেক দিন থেকেই নানা আলোচনা-সমালোচনায় আছেন। নানা বক্তব্য আর কাণ্ডকীর্তির কারণে মিডিয়ায় সংবাদ হন নিয়মিত। কিছু দিন আগের একটা সংবাদ মিডিয়ার বেশি মনোযোগ না পেলেও আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে।

গত মাসে কোম্পানীগঞ্জের ‘হুমায়ুন টিম্বার মার্সেন্ট অ্যান্ড স মিল’ নামের প্রতিষ্ঠানটি খাসজমিতে করা হয়েছে দাবি করে কাদের মির্জার লোকজন কারখানাটি জোর করে উচ্ছেদ করে ‘শিশুপার্কের জন্য নির্ধারিত স্থান’ লেখা সংবলিত একটি সাইনবোর্ড টানিয়ে দেন।

জমির মালিক জানান, এর আগে জমি খাস দাবি করে সেখান থেকে তার স্থাপনা সরানোর আদেশ দেন জনাব কাদের মির্জা। আদেশের বিরুদ্ধে তারা জেলা জজ আদালতে গত ২৫ মার্চ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। আদালত মামলা আমলে নিয়ে বিরোধপূর্ণ ভূমিতে বিবাদী পক্ষের প্রবেশে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

এই ভূমিতে আদালতের নিষেধাজ্ঞা ছিল তার প্রমাণ আছে। এই ঘটনা প্রসঙ্গে কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, তাকে প্রতিষ্ঠানটির মালিক ফোনে ঘটনাটি জানানোর পর তিনি পুলিশ পাঠিয়ে মেয়রকে আদালতের নিষেধাজ্ঞার বার্তাটি পৌঁছান। এরপর পুলিশ সেখান থেকে চলে আসে। অর্থাৎ ওসি নিশ্চিত করেছেন, এই জমিতে আদালতের নিষেধাজ্ঞা ছিল। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, তিনি মেয়রের লোকজনকে বাধা না দিয়ে নিষেধাজ্ঞার বার্তা পৌঁছে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেন।

যে পত্রিকাটি এই রিপোর্টে করেছে তারা জানায়, নানাভাবে চেষ্টা করেও তারা জনাব কাদের মির্জা সাথে যোগাযোগ করতে পারেননি, তাই এই ব্যাপারে তার বক্তব্য জানা যায়নি। অর্থাৎ মিডিয়ার প্রশ্নের সামনে পড়ে জবাব দেওয়ার ‘সাহস’ জনাব কাদের মির্জার ছিল না। ঠিক এই জায়গায় গাজীপুরের মেয়র আবার অনেক বেশি সাহসী, আগ্রাসী।

গাজীপুর সিটি করপোরেশন (জিসিসি)-এর অধীনে ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে গৃহীত দুটি প্রকল্পের অধীনে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার রাস্তা প্রশস্তকরণ এবং ড্রেন ও ফুটপাত নির্মাণের কাজ চলছে।

ভূমি অধিগ্রহণ না করেই চলতি বছরের শুরুতে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা হয় নিজেরাই বিভিন্ন স্থাপনা ভেঙে দিয়েছে, না হয় মালিকদের যার যার আবাসিক ভবন, কারখানা, দোকান বা সীমানা প্রাচীর আংশিকভাবে ভাঙতে বাধ্য করেছে। 

তবে, বেশিরভাগ বাসিন্দাই কোনও ক্ষতিপূরণ পাননি। উল্টো নিজেদের জমিতে সিটি করপোরেশনের ফেলে যাওয়া ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করতে শ্রমিক নিয়োগ করতে হয়েছে অনেককে। এছাড়া, ব্যক্তিগত জমির কয়েকশ’ গাছও কেটে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

অবশ্য গাজীপুর সিটি করপোরেশনের (জিসিসি) দাবি, এই প্রকল্প দুটিতে ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোনও বিধান নেই। ক্ষতিপূরণ ছাড়া ব্যক্তির সম্পত্তি দখল নিয়ে রাষ্ট্রীয় আইন ভাঙা হয়েছে। শুধু সেটাই নয়, এখানে ঘটেছে আরও বড় ঘটনা– লঙ্ঘন করা হয়েছে দেশের হাইকোর্টের রায়ও।

কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে হাইকোর্টের স্থিতাবস্থা ছিল, কিন্তু ভাঙা হয়েছে সেগুলোও। ঘটনার পরপরই ভুক্তভোগী কোম্পানি কোনাবাড়ী থানায় মামলা করতে যান। কিন্তু পুলিশ মামলা বা সাধারণ ডায়েরি নেয়নি। পরে তার কোম্পানি গাজীপুর আদালতে মামলা করে।

বসুরহাট পৌরসভার ঘটনাটিতে জনাব কাদের মির্জাকে চেষ্টা করেও ফোনে পাওয়া যায়নি। ভিন্ন নম্বর থেকে পাওয়া গেলেও সেই পত্রিকার পরিচয় পাবার পর ফোন কেটে দেন তিনি। মিডিয়াকে ফেইস করার ‘সাহস’ পাননি তিনি। কিন্তু গাজীপুরের মেয়র এসব ব্যাপার থোড়াই কেয়ার করেন। ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মেয়র সাফ জানিয়ে দেন, ‘আপনি যদি সরকারি আইন মেনে চলেন, তাহলে এখানে কিছু করতে পারবেন না।’

আবার একটু মনে করে নিই, বসুরহাটের ঘটনাটিতে পুলিশ আদালতের রায় কাদের মির্জার লোকজনের কাছে পৌঁছে দিয়ে ফিরে চলে এসেছিল। অথচ কথা ছিল আদালতের রায় অনুযায়ী প্রয়োজনে বল প্রয়োগ করে কাদের মির্জার লোকজনকে থামানো এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা। আর গাজীপুরে পুলিশ মামলা নেয়নি ভুক্তভোগীদের।

‘মগের মুল্লুকে’র সাথে একটা আধুনিক রাষ্ট্রের পার্থক্য হচ্ছে, আধুনিক রাষ্ট্র কতগুলো আইন দ্বারা পরিচালিত হয় এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক সেই আইন মেনে চলতে বাধ্য। আইনভঙ্গ হওয়াজনিত কারণে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে সে আদালতে যাবে এবং আদালত যদি তার পক্ষে রায় দেয় তাহলে রাষ্ট্রের প্রশাসন বিভাগের অবশ্য কর্তব্য হবে আদালতের রায় অক্ষরে অক্ষরে পালন করা।

একটা রাষ্ট্রের ক্ষমতাবান মানুষ দুর্বল মানুষের ওপর, এমনকি রাষ্ট্রও কখনও নাগরিকের ওপর নিষ্পেষণ চালাতে পারে। এমন ক্ষেত্রে বিচার বিভাগই পারে হুমকির মুখে থাকা নাগরিকদের রক্ষা করতে। তাই এই রাষ্ট্রকে সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক এবং জনগণের জন্য কল্যাণকর একটি রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে গেলে বিচার বিভাগেরও আমূল সংস্কার করতে হবে, কোনও সন্দেহ নেই এতে।

কিন্তু সবকিছুর পরও বিচার বিভাগের সংবিধান স্বীকৃত ক্ষমতায় অসাংবিধানিক/বেআইনি কোনও চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। অথচ এই দেশে দায়িত্বপূর্ণ পদে থেকে এক মেয়র আদালতকে ‘থোড়াই কেয়ার’ করে তার বিরুদ্ধাচরণ করেন আর আরেক মেয়র একই কাজ করার পর আবার বড় গলায় ঘোষণা করেন সরকারি আইন তিনি মানবেন না।

দুই মেয়র এই দেশটাকে কী মনে করছেন? যেটাই মনে করেন না কেন, তাদের বিরাট লাভ হতে পারে– কারণ এর ফলে তারা আইন-কানুন, রীতি-নীতি সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে করতে পারে যা খুশি তা। কিন্তু আমরা সাধারণ নাগরিকরা কেন মেনে নেবো সেটা? কেন আমরা এই দুটি ভয়ংকর ঘটনাকে ছোট বিষয় বলে মনে করবো?

লেখক: শিক্ষক ও অ্যাকটিভিস্ট

 

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

সরকারি কর্মকর্তাদের কী নামে সম্বোধন করা হবে?

সরকারি কর্মকর্তাদের কী নামে সম্বোধন করা হবে?

প্রতিটি আত্মহত্যায় দায় আছে আপনার-আমার

প্রতিটি আত্মহত্যায় দায় আছে আপনার-আমার

দরিদ্র মৃত্যুপথযাত্রী ছাত্র যদি ‘মেধাবী’ না হয়?

দরিদ্র মৃত্যুপথযাত্রী ছাত্র যদি ‘মেধাবী’ না হয়?

পরীমণি’র মুক্তির আন্দোলন কি কেবলই ‘স্টান্টবাজি’?

পরীমণি’র মুক্তির আন্দোলন কি কেবলই ‘স্টান্টবাজি’?

এই আগুনের পেছনে কে?

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২১, ১৭:১৪

আমীন আল রশীদ এই লেখাটি যারা পড়ছেন, তাদের কাছে প্রশ্ন: ধরা যাক আপনি শুনতে পেলেন আপনার এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনও একজন লোক ফেসবুকে ইসলাম সম্পর্কে খারাপ কথা লিখেছেন। আপনি কি লাঠিসোঁটা আর আগুন নিয়ে ওই লোকের বসতবাড়িতে গিয়ে হামলা চালাবেন? ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেবেন? পিটিয়ে মানুষ মেরে ফেলবেন? সহজ উত্তর হচ্ছে– না। কারণ, একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আপনি এতটা হিংস্র বা উগ্র নন। আপনি জন্মের পর থেকে যাদের সঙ্গে একই আলো-হাওয়া, একই পানি ও জলে বেড়ে উঠেছেন, কথিত ধর্ম অবমাননার গুজবে আপনি তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিতে পারেন না। এটা আপনি করেননি। যদি না করেন তাহলে কুমিল্লার মন্দিরে কে কোরআন  নিয়ে গেলো এবং সেই সংবাদ বা গুজবে কারা পরবর্তীতে ওই মন্দিরে হামলা চালালো? কুমিল্লার এই আগুন কী করে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে গেলো? রংপুরের পীরগঞ্জে কারা উসকানি দিলো এবং কারা গিয়ে পুরো পল্লিটি জ্বালিয়ে দিলো?

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বরাবরই অসাম্প্রদায়িক। হাজার বছর ধরে এই ভূখণ্ডে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। কিন্তু তারপরও দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক উসকানি, মন্দিরে আগুন, প্রতিমা ভাঙচুর, হিন্দুদের কথিত ‘সংখ্যালঘু’ তকমা দিয়ে তাদের জায়গা-জমি দখল করে দেশছাড়া করার মতো ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের আগে এবং নির্বাচনের পরে এরকম অনাকাঙ্ক্ষিত যেসব ঘটনা ঘটেছে—সেখানে সাধারণ হিন্দু-মুসলমানের কোনও দায় ছিল না। এর নেপথ্যে বরাবরই কাজ করে ভোটের রাজনীতি। কখনও ব্যক্তিগত বিরোধও রাজনীতির মোড়কে রঙ পাল্টায়। কখনও এসব ঘটনার পেছনে থাকে ভূ-রাজনীতি। থাকে এই অঞ্চলের শক্তিমান রাষ্ট্রগুলোর নানা স্বার্থ। কিন্তু প্রশ্ন হলো,  অতীতে যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেসব ঘটনার মূল হোতাদের কি চিহ্নিত করে বিচার করা গেছে? নাকি প্রতিটি ঘটনাই রাজনীতির মারপ্যাঁচে হারিয়ে গেছে? মাঝখানে প্রাণ গেছে কিছু নিরীহ মানুষের। অনেক সময় কিছু রাজনৈতিক নেতাকর্মীও ভিকটিম হয়েছেন—যাদের সবাই হয়তো প্রকৃত অপরাধী নন।

দুর্ভাগ্যের বিষয়, যখনই এ রকম ঘটনা ঘটে, বিশেষ করে মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুর বা কথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটে, তখন দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক পক্ষ পৌনঃপুনিকভাবে একইরকম কথাবার্তা বলে। কম্পিউটারের প্রোগ্রামিংয়ের মতো তাদের বক্তব্যও নির্ধারিত। ঘটনা যাই ঘটুক, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের কোনও ব্যত্যয় হয় না। এবারও তা-ই।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অভিযোগ, এর পেছনে উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী তথা তাদের ভাষায় বিএনপি-জামায়াতের লোকজন জড়িত। তারাই দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে রাজনৈতিক ফায়দা নিতে চায়। পক্ষান্তরে বিএনপির দাবি, সরকার তাদের লাগামহীন অনিয়ম-দুর্নীতি-লুটপাট থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। মধ্যপন্থীদের অনেকে মনে করেন, এটা বিদেশি কোনও রাষ্ট্রের উসকানি। কেউ কেউ মনে করেন, বিশ্বব্যাপী যে ধর্মীয় উগ্রবাদ বিস্তৃত হচ্ছে, তারই প্রতিফলন।

অস্বীকার করার উপায় নেই, ভূ-প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর জায়গায় অবস্থান করছে। বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি কেবলই পানের অযোগ্য লবণাক্ত জলের আধার নয়। বরং এর নিচে রয়েছে বিশাল সম্পদ। ব্লু ইকোনমির বিরাট সম্ভাবনা। বাংলাদেশের রয়েছে ১৭ কোটি লোকের বাজার। বাংলাদেশ এখন উপভোগ করছে পপুলেশন ডিভিডেন্টের সুবিধা—অর্থাৎ দেশের বিরাট জনগোষ্ঠী যখন তরুণ-উদ্যমী-শক্তিশালী-সাহসী—যে সুযোগ কোনও একটি জাতির জীবনে শত বছরেও আসে না এবং যে সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে; উদযাপন করছে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী; করোনার অতিমারিতে বিশ্বের অনেক শক্তিশালী অর্থনীতির দেশও যখন বিপর্যস্ত, তখন বাংলাদেশ যে বিশাল জনগোষ্ঠীর চাপ নিয়েও দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে—এসব সফলতা অনেকেরই হয়তো মন খারাপের কারণ হতে পারে।

সুতরাং কে কোথা থেকে কোন উদ্দেশ্যে কলকাঠি নাড়ছে তা বোঝা মুশকিল। তবে বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে কোনও রাষ্ট্রের সঙ্গে অনেক বেশি যুক্ত হয়ে যাচ্ছে এবং তার সঙ্গে এই অঞ্চলের অন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর রসায়ন কেমন—এটিও ভাবনার বাইরে রাখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ স্থিতিশীল থাকলে; অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যেতে থাকলে; নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো বিশাল অবকাঠামো নির্মাণের স্পর্ধা দেখাতে পারলে যদি কারও মন খারাপ হয়—তখন তারা বাংলাদেশের সেই স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করার চেষ্টা করতে পারে। তাদের সেই অর্থ-লোকবল ও কৌশল আছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ শান্ত থাকলে যদি কারও মন খারাপ হয়; কেউ যদি মনে করে যে বাংলাদেশ খারাপ থাকলেই তার ভালো—তাহলে গতকাল রামু, আজ কুমিল্লা, কাল পীরগঞ্জ—চলতেই থাকবে। সুতরাং বাংলাদেশ যদি সত্যিই কারও মন খারাপের বলি হয়ে থাকে, এবং ব্যক্তি-গোষ্ঠী-দল বা রাষ্ট্রকে চিহ্নিত করা না যায়—তাহলে এই আগুন সহজে নিভবে না।
মনে রাখা দরকার, কারণ সাধারণ মানুষ বরাবরই অসাম্প্রদায়িক। তারা তাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থের অবমাননা করে না। কোনও সাধারণ মুসলমান মন্দিরে কোরআন শরিফ রেখে আসে না। কোনও সাধারণ হিন্দু মন্দিরে কোরআন শরিফ নিয়ে তাদের মূর্তির পায়ের নিচে রাখে না। বরং এই কাজগুলো করেন ‘অসাধারণরা’। সেই ‘অসাধারণ’দের চেনা দরকার এবং তাদের সম্পর্কে সজাগ থাকা দরকার।

কেউ যদি ধর্মের মতো স্পর্শকাতর ইস্যু নিয়ে মানুষকে বিভক্ত করে ভোটের রাজনীতি করতে চায়—তাহলে তাদের প্রতিহত করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হচ্ছে সব ধর্মের সাধারণ মানুষের মধ্যে ঐক্য। সোশ্যাল মিডিয়ায় সৃষ্টিকর্তা, ধর্ম, ধর্মীয় গ্রন্থ বা ধর্মের অবতারের কথিত অবমাননার গুজব উঠলেই লাঠিসোঁটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে ভাবতে হবে, আপনি কার মন্দিরে আগুন দিচ্ছেন? আপনি কার বাড়িঘরে হামলা চালাচ্ছেন? আপনি কাকে পিটিয়ে মেরে ফেলছেন? সে তো আপনারই প্রতিবেশী। আপনি কেন অন্যের রাজনীতির ঘুঁটি হচ্ছেন?

এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান— সব ধর্মের মানুষের ঐক্য। কার কী ধর্মীয় পরিচয়, সেটি বিবেচনায় না নিয়ে প্রত্যেকের প্রধান পরিচয় যে ‘মানুষ’, সেই মানুষ পরিচয়টিকে সামনে নিয়ে আসা দরকার এবং মানুষ হিসেবে প্রত্যেককে সম্মান করতে পারলেই এবং হুজুগ ও গুজবে কান না দিয়ে বরং প্রত্যেকে তার নিজের ধর্ম নিজের মতো করে পালন করতে পারলেই দেশি-বিদেশি-রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক কোনও উসকানিই সফল হবে না। আর এটা করতে না পারলে আরও অনেক বিপদ দেখার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।

 লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।

 
 
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

নির্বাচন কমিশন আইন হতে বাধা কোথায়?

নির্বাচন কমিশন আইন হতে বাধা কোথায়?

অপুর মৃত্যু, শওকতের প্রতিবাদ, আমাদের ‘সিস্টেম’

অপুর মৃত্যু, শওকতের প্রতিবাদ, আমাদের ‘সিস্টেম’

সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোয় সাধারণ মানুষের ক্ষতি কতটুকু?

সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোয় সাধারণ মানুষের ক্ষতি কতটুকু?

ইভ্যালি: গ্রাহকের টাকা ফেরত দেবে কে?

ইভ্যালি: গ্রাহকের টাকা ফেরত দেবে কে?

ভাইরাল লেগ স্পিনার এবং দু’চার কথা

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২১, ২১:৩৩

জনি হক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, টুইটার ও ইনস্টাগ্রামে ভারতের ক্রিকেট গ্রেট শচীন টেন্ডুলকারের একটি পোস্ট বেশ কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ চলছে বলেই যে আগ্রহটা তৈরি হয়েছে তা নয়। গত ১৪ অক্টোবর তার শেয়ার করা একটি ভিডিও ক্লিপে রয়েছে বাংলাদেশি খুদে বালকের ক্রিকেট প্রতিভা। সেজন্যই এ নিয়ে এত আলোচনা। এটি এক বন্ধুর কাছ থেকে পাওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। সেই ভিডিওতে সবাই দেখেছে বরিশালের খুদে লেগ স্পিনারের বোলিংয়ে সতীর্থদের অসহায়ত্ব। কখনও গুগলিতে, কখনও ফ্লিপারে বা লেগ স্পিনের মায়াজালে কুপোকাত করেছে সে। ক্রিকেটের প্রতি ছোট্ট ছেলেটির আবেগ ও ভালোবাসায় মুগ্ধ ভারতের কিংবদন্তি ক্রিকেটার।

অনেকে ভেবেছিলেন, শচীনের শেয়ার করা ভিডিওতে বল হাতে কারিকুরি দেখানো খুদে ক্রিকেটার ভারতেরই কেউ হবে! ভারতীয় নেটিজেনদের অনেকে তো এই দক্ষতা দেখে বিস্মিত। শচীনের পোস্টটির মন্তব্যের ঘরে আফগানিস্তানের তারকা লেগ স্পিনার রশিদ খান প্রশংসা করেছেন বাংলাদেশি ছেলেটির। কিংবদন্তি লেগ স্পিনার শেন ওয়ার্ন মুগ্ধ হয়ে নিজের টুইটার অ্যাকাউন্টে একই ভিডিও শেয়ার করেছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন, খুদে বালকটি কে?

ছেলেটির নাম আসাদুজ্জামান সাদিদ। খুদে এই লেগ স্পিনারের বয়স এখন ৬ বছর। এটুকু বয়সেই লেগ স্পিন ও গুগলিতে অসামান্য পারদর্শিতা তার। ভাগ্নের বোলিং নৈপুণ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করে ফেসবুকে পোস্ট করেন মামা। এরপর দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ভিডিওটি শচীনের হাতে যাওয়ার পর ভাইরাল খুদে লেগি। এখন অস্ট্রেলিয়া অবধি তার দক্ষতার তারিফ চলছে।

শচীন টেন্ডুলকার কিংবা শেন ওয়ার্নের পোস্ট থেকে আমরা আসলে কী বার্তা পেলাম? ভারতে কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় এমন প্রতিভা তাদের চোখে পড়ার ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। তবু দুই কিংবদন্তির কাছে ভিডিওটি আলাদা মনে হলো কেন? কারণ, বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে এমন প্রতিভা ছড়িয়ে থাকার পরও জাতীয় দলে লেগ স্পিনার সংকট কাটেনি। দু’জনই যেন লেগ স্পিনার অন্বেষণে আমাদের ব্যর্থতা বা সদিচ্ছার অভাবকে চিমটি কেটে ধরিয়ে দিলেন! ভিডিওটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো, লেগ স্পিনের প্রতিভা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার পরও আমরা নিজেরাই নিজেদের দরিদ্র করে রেখেছি।

অথচ টি-টোয়েন্টিতে এখন জিততে হলে লেগ স্পিনারের বিকল্প যেন নেই। ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত ফরম্যাট শাসন করছেন এই কব্জির মোচড় ঘোরানো বোলাররা। যেকোনও দলের অধিনায়কের কাছে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার লেগিরা। তারা রান আটকান, উইকেটও এনে দেন। তাই ক্রিকেট বিশ্বে চলছে ব্যাটারদের নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানো লেগ স্পিনারদের দাপট। এক্ষেত্রে অস্বাভাবিক ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। এ কারণেই হয়তো মাঠে প্রতিপক্ষের লেগ স্পিন জাদুতে ভড়কে যায় টাইগাররা।

টি-টোয়েন্টিতে সত্যিই বাংলাদেশ দলের ব্যাটাররা থাকেন বাড়তি চিন্তায়। বাংলাদেশে ভালো মানের লেগ স্পিনার নেই বলেই হয়তো ক্রিকেটাররা এই শিল্পকে অতো ভালো সামলাতে পারেন না। ঘরোয়া লিগে লেগ স্পিনার বিরল। জাতীয় ক্রিকেটে নিয়মিত লেগিদের মুখোমুখি না হওয়ার কারণে অন্য দলের লেগ স্পিনারের সামনে নাকানি-চুবানি খেতে হয় টাইগারদের।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশকে কম-বেশি বিশ্বের সব লেগ স্পিনারই ভুগিয়েছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ঘূর্ণিবলের গোলকধাঁধায় পড়ে ব্যাটারদের খাবি খেতে দেখা যায় হরহামেশা। কব্জির মোচড়ে বল ঘোরানো ক্রিকেটারদের কাছে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসেন টাইগাররা। এই তো সেদিন বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডে স্কটল্যান্ডের কাছে ৬ রানের হতাশাজনক হারের অন্যতম কারণ লেগ স্পিনে ধরাশায়ী হওয়া। স্কটিশ লেগ স্পিনার ক্রিস গ্রিভস তার ঘূর্ণিতে সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিমকে প্যাভিলিয়নে পাঠিয়ে জয়টা নিশ্চিত করে ফেলেন।

বড় দলের কথা পরে বলি, স্কটল্যান্ডের মতো ছোট দলগুলোতেও কমপক্ষে একজন করে লেগ স্পিনার আছে, যাদের বোলিংয়ের টার্ন দেখে মাথা ঘোরায়! বলা চলে লেগিরাই তাদের তুরুপের তাস। আরেক ছোট দল নেপালের লেগ স্পিনার সন্দীপ লামিচান চলতি মাসে আইসিসির ‘প্লেয়ার অব দ্য মান্থ’ নির্বাচিত হয়েছেন। আইপিএলে তিন বছর ধরে দল পান তিনি। আইপিএলে সব দলই কব্জির মোচড় ঘোরানো লেগিদের দলে ভিড়াতে চায়। সেখানে তাদের চাহিদা বেশ রমরমা। টি-টোয়েন্টি অলরাউন্ডার র‌্যাংকিংয়ে ছোট দলের তিন জন লেগ স্পিনার আছেন। ওমানের খাওয়ার আলি ৪ নম্বরে, আয়ারল্যান্ডের গারেথ ডেলানি ১২ নম্বরে এবং পাপুয়া নিউগিনির চার্লস আমিনির অবস্থান এখন ১৯ নম্বরে।

আগেই বলেছি, সীমিত ওভারের ক্রিকেটে এখন লেগি বোলাররা সাফল্য পাচ্ছেন বেশি। লেগ স্পিনে বাইশ গজ কাঁপাচ্ছেন তারাই। টি-টোয়েন্টি বোলার র‌্যাংকিংয়ের দিকে চোখ রাখলেই তা বোঝা যায়। ২ থেকে ৪ নম্বরে থাকা সবাই লেগ স্পিনার। দুই নম্বরে শ্রীলঙ্কার ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা ডি সিলভা, তিনে আফগানিস্তানের রশিদ খান এবং চার নম্বরে আছে ইংল্যান্ডের আদিল রশিদের নাম। সাত নম্বরে আছেন আরেক লেগ স্পিনার অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডাম জাম্পা। শীর্ষে থাকা তাব্রেইজ শামসি বাঁ-হাতি রিস্ট স্পিনার, সেক্ষেত্রে তিনিও এক অর্থে লেগ স্পিনারই! আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তারা সবাই নিজ নিজ দলের মূল স্কোয়াডের সদস্য। অন্য দলগুলোর মূল স্কোয়াডে কমপক্ষে একজন দক্ষ লেগি আছে।

টি-টোয়েন্টি র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষ দল ইংল্যান্ড দিয়ে শুরু করি। গত এক বছরে দলটির হয়ে সবচেয়ে বেশি (১৬) উইকেট নিয়েছেন আদিল রশিদ। তাদের মারকুটে দুই ব্যাটার ডেভিড মালান ও লিয়াম লিভিংস্টোন লেগ স্পিনার হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারেন। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টি-টোয়েন্টিতে গত একবছরে সবচেয়ে বেশি (১৭) উইকেট নিয়েছেন অ্যাডাম জাম্পা। অজিদের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে আছেন আরেক স্বীকৃত লেগ স্পিনার মিচেল সোয়েপসন। এছাড়া দলটির অন্যতম দুই ব্যাটার ডেভিড ওয়ার্নার ও স্টিভেন স্মিথ গুগলি দিতে পারেন ভালো। দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটার রাসি ভ্যান ডার ডুসেন লেগব্রেক করতে পারেন।

অন্য দলগুলোর মধ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হেডেন ওয়ালশ (গত একবছরে দেশের হয়ে তৃতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি), পাকিস্তানের সহ-অধিনায়ক শাদাব খান, নিউজিল্যান্ডের ইশ সোধি (গত একবছরে দেশের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২০ উইকেট) ও টড অ্যাসেল আছেন লেগি হিসেবে। পাকিস্তানের হয়ে গত একবছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২০ উইকেট শিকারি উসমান কাদির আছেন রিজার্ভ। ভারতের মূল স্কোয়াডের দুই সদস্য রাহুল চাহার ও বরুণ চক্রবর্তী কার্যকর দুই লেগ স্পিনার। দলটির স্ট্যান্ডবাই তালিকায় অন্যতম আরেক লেগি যুজবেন্দ্র চাহাল।

বাংলাদেশের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে রিজার্ভ হিসেবে একজন স্বীকৃত লেগ স্পিনার (আমিনুল ইসলাম বিপ্লব) ছিলেন। কিন্তু তাকে ওমান নিয়ে যাওয়ার কয়েকদিন পর ফেরত নিয়ে এসেছে বিসিবি। এ কারণে কর্তাব্যক্তিরা সমালোচিত হয়েছেন। অথচ তিনি দলের সঙ্গে থাকলে ব্যাটাররা অনুশীলনে সুবিধাই পেতেন। লেগ স্পিনারদের আলোয় নিয়ে আসতে জাতীয় ক্রিকেট লিগের ম্যাচে ও বিপিএলে প্রতি দলের একাদশে একজন করে লেগ স্পিনার রাখার নিয়ম বাধ্যতামূলক রেখেছে বিসিবি। বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থাই বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে লেগ স্পিনার রাখেনি! তাহলে কি সব নিয়ম-কানুন লোক দেখানো? লেগ স্পিনারদের জন্য আত্মবিশ্বাস খুব দরকারি। টানা ম্যাচ খেলার সুযোগ না পেলে তাদের আত্মবিশ্বাস আসবে কোত্থেকে? বিসিবি সেটা কতটা নিশ্চিত করতে পারে?

প্রায় সব দেশে যখন ভালো মানের লেগিদের জয়জয়কার, সেখানে বাংলাদেশের শূন্য। জাতীয় ক্রিকেট দলে লেগ স্পিন বহু বছর ধরেই সবচেয়ে আক্ষেপের নাম। আমাদের দেশে ঠিক কতজন লেগ স্পিনার ছিলেন তা বের করতে গলদঘর্ম হয়ে যেতে হয়। বাইনোকুলার দিয়ে খোঁজার পর টেনেটুনে কয়েকটা নাম হয়তো বলা যাবে। হাতে গোনা সেই কয়েকজন হারিকেনের মতো মৃদু আলো ছড়ালেও সেই অর্থে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের জাত চেনাতে পারেননি। তাদের মধ্যে অন্যতম অলক কাপালি। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রথম হ্যাটট্রিক এই লেগ স্পিনারের। তার পাশাপাশি মোহাম্মদ আশরাফুল মাঝে মধ্যে ভেলকি দেখাতেন। কেউ কেউ কালেভদ্রে দলে জায়গা পেলেও আসন পাকা হয়নি। যেমন লেগ স্পিনার জুবায়ের হোসেন লিখন। অল্প বয়সে ২০১৪-২০১৫ সালে ছয়টি টেস্ট, তিনটি ওয়ানডে ও একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলার সুযোগ পান তিনি। এরপর আর জায়গাটা ধরে রাখতে পারেননি। সম্প্রতি রিশাদ হোসেন ও মিনহাজুল আবেদিন আফ্রিদি লেগ স্পিন করেন বলেই কিছুটা আলোচনায় এসেছেন। কিন্তু লেগ স্পিনারের সংকট আদৌ দূর হবে কিনা সংশয় থেকেই যায়।

দেশে লেগ স্পিনারের অভাব যায়নি বলেই লেগি পাওয়া যায় না! ভালো আইডল না থাকায় উঠতি খেলোয়াড়রা অনুপ্রেরণা খুঁজে পাবে কীভাবে। কাকে সামনে রেখে এগোবে তারা? কব্জির মোচড়ে ভেলকি দেখানো লেগ স্পিনারের তালিকায় কেউই যে নেই! লেগ স্পিনারদের বরাবরই বেশ পরিকল্পনা মাফিক বল করতে হয়। সেই অনুশীলন হয় জাতীয় ক্রিকেট ম্যাচে। লেগ স্পিনের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ করা ঘরোয়া লিগের ক্লাবগুলো কব্জি ঘোরানো বোলারদের গুরুত্ব দেয় না। খেলার সুযোগ না পেলে তারা হাত পাকাবেন কোথায়? একজন লেগ স্পিনার বছরের পর বছর অনুশীলনের মাধ্যমে পরিপক্বতা পায়। অনেক ছোট বয়স থেকেই এই শিল্পের চর্চা করলে সুফল আসে বেশি। আসাদুজ্জামান সাদিদের মতো খুদে ক্রিকেটারদের আরও ভালো বোলার হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা প্রদানে এগিয়ে আসা প্রয়োজন বিসিবির। শচীন ও ওয়ার্নের শেয়ার করা ভিডিওটি বুঝিয়ে দিয়েছে, মানসম্পন্ন লেগ স্পিনার পেতে হলে তৃণমূল পর্যায় থেকে খুঁজতে হবে। আসাদুজ্জামান সাদিদের মতো আরও অনেকে নিশ্চয়ই আছে যাদের কথা আমরা এখনও হয়তো জানি না।

বিসিবিকে এ নিয়ে অনুসন্ধান চালাতে হবে। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে শুধুই লেগ স্পিন নিয়ে কাজ করবেন এমন কিছু কোচ নিয়োগ দেওয়া যায়। জাতীয় অ্যাকাডেমির ছায়াতলে স্বনামধন্য কোচের মাধ্যমে অনুশীলন করানো যেতে পারে এই বোলারদের। চোখে পড়ার মতো লেগ স্পিনার পেলে তাকে ঘরোয়া লিগে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার দায়িত্ব কাঁধে নিতে হবে বোর্ডকেই। লেগ স্পিনারের জন্য বাংলাদেশের হাহাকার ঘুচিয়ে ফেলতে বিসিবিকে আরও মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। আমাদের সাবেক ক্রিকেটাররাও পরামর্শ দিতে পারেন। অন্য দেশের ক্রিকেটারদের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও সঠিক মানুষের সহায়তা পেলে এই খুদে বালকরা আগামীতে উদ্ভাসিত হয়ে রাঙিয়ে দেবে দেশের ক্রিকেট। 

শুধু টি-টোয়েন্টিই নয়; ক্রিকেটের অন্য ফরম্যাটেও লেগ স্পিনের কার্যকারিতা শেন ওয়ার্ন, অনিল কুম্বলে, মুশতাক আহমেদ, শহিদ আফ্রিদিরা দেখিয়ে গেছেন। তাদের মুগ্ধকর বোলিংয়ে লেগ স্পিন পেয়ে এসেছে শিল্পের মর্যাদা। লেগ স্পিন সত্যিই একটি শিল্প। কিন্তু বাংলাদেশে এই শিল্প কবে প্রাণ পাবে কে জানে! ক্রিকেটের এই সৌন্দর্য বাংলাদেশিদের হাতে দেখতে তীর্থের কাকের মতো তাকিয়ে থাকতে হবে আর কতদিন? এ নিয়ে কেবলই যে দীর্ঘশ্বাস বাড়ে।

 

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

করোনাকালীন ১০ কোটি উদ্যোক্তার গল্প

করোনাকালীন ১০ কোটি উদ্যোক্তার গল্প

বসুরহাট ও গাজীপুরের মেয়র দেশটাকে কী মনে করেন?

বসুরহাট ও গাজীপুরের মেয়র দেশটাকে কী মনে করেন?

এই আগুনের পেছনে কে?

এই আগুনের পেছনে কে?

বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার

বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার

বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২১, ১৫:৫৮

তুষার আবদুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) দুলে উঠেছে। সেই দুলুনি দূরে থেকেও অনুভূত হয়েছে। যে গানের দল সুর তৈরি করেছে, কণ্ঠ ছেড়েছে জোরে, তারা আমার চেনা। টেলিভিশনে তাদের সঙ্গে ঢাকার কাছে এক কাশবনে আড্ডা হয়েছিল। তখন আকাশে ছিল শরতের মেঘ। আড্ডা দিয়েছি মেঘদলের সঙ্গে। গতকাল শুক্রবার সেই মেঘদলই টিএসসি এলাকায় সুরের মূর্ছনা ছড়িয়েছিল। আওয়াজ ছিল প্রতিবাদের। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের। প্রতিবাদের এই ভাষা আমার পছন্দের। আমি বিশ্বাস করি- মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে পরাজিত ও নির্মূল করতে সাংস্কৃতিক অস্ত্রই উপযুক্ত। এই অস্ত্র প্রতিরোধ ও মোকাবিলার শক্তি তাদের নেই।

যে টিএসসিতে গানে গানে শুক্রবার প্রতিবাদ জানানো হলো, সেই টিএসসি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম তীর্থভূমি। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ রাষ্ট্রের যেকোনও বিপন্নতা ও দুর্যোগে এখান থেকে নবীন-প্রবীণের সম্মিলনে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়েছে। সেই প্রতিরোধ কোনও অপশক্তি কখনও ডিঙাতে পারেনি।

আমাদের সাংস্কৃতিক চর্চা ও আন্দোলনে জোয়ার প্রবাহমান থাকেনি। রাজধানীতে চিন্তক শ্রেণি, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও কর্মীরা রাজনৈতিকভাবে বিভাজিত হয়ে আছে। তাদের কাছে একাত্তর ও বাংলাদেশের চেয়ে ব্যক্তিগত লাভ-লোকসান মিটিয়ে নেওয়াটাই যেন জরুরি বিষয় এখন। পদ-পদবি আর তারকা ইমেজের একটা ঘোরের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে সবাই।

সাংস্কৃতিক চর্চার ভাটাকালকে অপচয় করতে চায়নি মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী। তারা সমাজ, পরিবার ও রাজনীতিতে চিন্তার মেরুকরণ ঘটিয়ে ফেলে। আমাদের জীবনযাপন, শিক্ষায় ধর্মীয় অন্ধত্ব, কট্টর লু’হাওয়া বইয়ে দিতে শুরু করে, যা সমাজ ও রাজনীতিকে অসহিষ্ণু করে তোলে। আমরা ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের দুই নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশের সঙ্গে ২০০১ পরবর্তী বাংলাদেশের মিল খুঁজে পাবো না। এ সময়টায় ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহারে মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃতির বদলে একটি পরগাছা সংস্কৃতিতে নিজেদের জড়িয়ে ফেলতে শুরু করি। দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো- রাজনীতিবিদরা না হয় ভোট ও ক্ষমতার লোভে পরগাছা তুলে নিলো, কিন্তু দেশের চিন্তক শ্রেণিরাও কেন সেই সুবাসে মোহিত হতে চাইলেন? তাহলে কি আমাদের চিন্তক শ্রেণির কোনও টেকসই বা শক্তিশালী মনন তৈরি হয়নি? পুরোটাই ছিল ভেসে বেড়ানো জলজ উদ্ভিদ?

স্রোতের প্ররোচনায় এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ানো অভ্যাস আমাদের চিন্তক শ্রেণির আগেও ছিল, এখনও আছে। সংশয়ে ডুব দিয়ে তাদের নীরব থাকাটা একাত্তর ও নব্বইতে যেমন দেখেছি, এখনও একই চিত্র। যখন গণজোয়ার ওঠে, সেই গণজোয়ার কোনও স্বর্ণদ্বীপ আবিষ্কার করলে তারা সেই দ্বীপের নকশাকার কিংবা পূর্বাভাস দাতা হয়ে যান চট করেই। আমরাও যেন কোন মন্ত্রে সেই বচন বিশ্বাস করতে শুরু করি। এমন মন্ত্র বসে কতো চিন্তককে যে রাষ্ট্রের বিধাতা করে তুলেছি‍! অবশ্য নিজ গুণে তাদের পতনও হয়েছে।

তাই কোনও চিন্তক বা রাজনীতির বাঁশিতে মোহিত হতে চাই না। বরাবরই কান পেতে রাখি কখন কোন তরুণদল হাঁক দিয়ে বলবে– ‘জাগো বাহে কোনঠে সবাই’। তখন বজ্রমুঠি নিয়ে মিছিলে নেমে পড়তে রাজি যেকোনও বয়সেই। কারণ প্রতিরোধ আর প্রতিবাদের কোনও বয়স নেই। মাতৃভূমির বিরুদ্ধে যেকোনও ষড়যন্ত্র প্রতিরোধের সব কণ্ঠস্বরের বয়স এক। সমবয়সী। এমন সমবয়সীদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে আবারও জড়ো করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে এই সুরের মূর্ছনা ছড়িয়ে পড়ুক আমার ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, রংপুর হয়ে এই জনপদের দোঁয়াশ, এঁটেল, প্রতিটি ধূলিকোনায়। জয়তু বাংলাদেশ। তুমি জাগ্রত জনতার।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

/এসএএস/জেএইচ/

সম্পর্কিত

সবার ভেতরেই পোশাকি বচন

সবার ভেতরেই পোশাকি বচন

আমরা ‘নোবেল’ পেশাতেই আছি

আমরা ‘নোবেল’ পেশাতেই আছি

দৃশ্যমাধ্যম আপন শক্তিতে আলোকিত হোক

দৃশ্যমাধ্যম আপন শক্তিতে আলোকিত হোক

গ্রামীণ সুদের অস্বাস্থ্যকর অর্থনীতি!

গ্রামীণ সুদের অস্বাস্থ্যকর অর্থনীতি!

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

চল্লিশদিন উপন্যাসের সঙ্গে সহবাস, মৃত্যু পর্যন্ত

পর্ব—একচল্লিশদিন উপন্যাসের সঙ্গে সহবাস, মৃত্যু পর্যন্ত

নয়া পল্টনে বিএনপি নেতাকর্মীদের সাথে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া

নয়া পল্টনে বিএনপি নেতাকর্মীদের সাথে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া

এইচএসসি পাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির সুযোগ

এইচএসসি পাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির সুযোগ

‘সম্প্রীতির স্বার্থে’ বিক্ষোভ মিছিল করেনি বিএনপি

‘সম্প্রীতির স্বার্থে’ বিক্ষোভ মিছিল করেনি বিএনপি

চাহিদা থাকায় হিলি দিয়ে আসছে শুকনা মরিচ

চাহিদা থাকায় হিলি দিয়ে আসছে শুকনা মরিচ

মিয়ানমারের জান্তাপ্রধানকে বাদ দিয়েই পর্দা উঠলো আসিয়ান সম্মেলনের

মিয়ানমারের জান্তাপ্রধানকে বাদ দিয়েই পর্দা উঠলো আসিয়ান সম্মেলনের

ময়মনসিংহ মেডিক্যালে আরও ৪ মৃত্যু

ময়মনসিংহ মেডিক্যালে আরও ৪ মৃত্যু

ডোবার পানিতে ঠান্ডা হতো মিষ্টির ছানা

ডোবার পানিতে ঠান্ডা হতো মিষ্টির ছানা

নয়া পল্টনে মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা

নয়া পল্টনে মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা

বাড়ির পাশে ফল ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা

বাড়ির পাশে ফল ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা

তবু আগ্রাসী ব্যাটিং ছাড়বে না ওয়েস্ট ইন্ডিজ

তবু আগ্রাসী ব্যাটিং ছাড়বে না ওয়েস্ট ইন্ডিজ

আসছে অন-ডিমান্ড টিউটরিং প্ল্যাটফর্ম ‘পড়াই’

নতুন স্টার্টআপআসছে অন-ডিমান্ড টিউটরিং প্ল্যাটফর্ম ‘পড়াই’

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune