X
বৃহস্পতিবার, ০৫ আগস্ট ২০২১, ২১ শ্রাবণ ১৪২৮

সেকশনস

ছবিটা পরিষ্কার হলো কি?

আপডেট : ৩১ মার্চ ২০২১, ১৭:০১

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
এবার দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হেফাজত যে দাঙ্গা করলো, বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, তা বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্পর্কের ধারণায় একটা বাঁক আনলো বলেই মনে করা হচ্ছে। ঘোড়াসওয়ার, হাতে ঢাল-তলোয়ার, আরও সব অস্ত্রসহ যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া যত বালক, নাবালক সৈনিক দেখা গেলো, যত সম্পত্তি ধ্বংস হলো, অতীতে তার নজির মেলে না। দেশজুড়ে দাঙ্গার রাজধানী হয়ে গেলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
 
এই নিরিখে এবারের সহিংসতার রাজনৈতিক যুক্তি যারা খুঁজছেন গণতন্ত্র ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে কী নেই তার ভেতর, তারা ভুলে যাচ্ছেন যে এই হেফাজতে ইসলাম সংগঠনটি যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রশ্নে গড়ে ওঠা শাহবাগ আন্দোলনকে নাস্তিকদের আন্দোলন বলে ঘোষণা দিয়ে সারাদেশে ভয়ংকর সহিংসতা ছড়িয়ে দিয়েছিল। তখন সংসদ ছিল, বিরোধী দল ছিল, মত প্রকাশ নিয়ে কোনও সংশয় ছিল না। এবং ২০১৩ সালের ৫ মে কোনও প্রকার উসকানি ছাড়াই দেশের সম্পদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, নারীদের ওপর হামলে পড়েছিল, মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর আক্রমণ করেছিল।  
হেফাজতের এবারকার সহিংস রূপের ইতিবাচক দিক আছে অনেক। প্রথমত, হেফাজত নিজেকে যতই শান্তিপূর্ণ অরাজনৈতিক সংগঠন বলে দাবি করুক, এর মাধ্যমে প্রমাণিত হলো এটি উগ্রবাদে বিশ্বাসী একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কাছে এটি পরিষ্কার নিশ্চয়ই হয়েছে যে যতই তাদের কওমি ডিগ্রিকে স্বীকৃতি দেওয়া হোক, তাদের কথায় পাঠ্যবই বদলে ফেলা হোক, তারা বদলাবে না। তারা বঙ্গবন্ধুকে কীভাবে দেখে, মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে তাদের অবস্থান কী, এ দেশের অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি ও কৃষ্টির জায়গায় তারা কোন নীতি অনুসরণ করে সবই পরিষ্কার হয়েছে।  

যারা সরকারের বিরুদ্ধে তারাও বুঝলো, তাদের মতো করে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরের বিরোধিতা করলেও হেফাজত আসলে তাদের রাজনীতির ধারে-কাছেও নেই। যেসব আন্তর্জাতিক সংগঠন বাংলাদেশের বিরাজমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে অনেক কথা বলেন, তারাও দেখলেন বাংলাদেশের রাজনীতিটা এখন কোথায়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বাইরের রাজনীতির শক্তি কোনটি সেটাও দেখতে পেলো দুনিয়া। বাংলাদেশের সরকারবিরোধী রাজনীতি আসলে কোনটি সেটিও পরিষ্কার হলো এবার।

২০১০ সালে সরকার ঘোষিত নারী নীতির বিরুদ্ধে কিছু ইসলামি দল একত্রিত হয়ে হেফাজতে ইসলাম গঠন করে। এরা যে ১৩ দফা তখন দিয়েছিল, তা পুরোপুরি মধ্যযুগীয়, যদিও হঠকারী দু’একজন বাম বুদ্ধিজীবী সেই দফাগুলোর প্রতি সমর্থনও জানিয়েছিল।

এরপর ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করতে এই সংগঠনটিকে মাঠে নামায় যুদ্ধাপরাধের বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক শক্তি। সে বছরের ৫ মে শাপলা চত্বরে তাদের ডাকা সমাবেশের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী। সরকারের কড়া অবস্থানের কারণে তাদের ছত্রভঙ্গ করা গিয়েছিল।
 
সেদিন যারা মতিঝিলে ছিলেন কিংবা টেলিভিশনে হেফাজতের তাণ্ডব দেখেছেন তাদের মানুষের সামগ্রিক স্মৃতিতে গভীর ভাবে গেঁথে গিয়েছে সেদিনের সহিংসতা। সেদিনের স্মৃতি, অনুভব, মনে ছাপ-পড়া ছবি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে বেড়াবেন তারা, যেমন করে বয়ে বেড়াবেন এবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রামের হাটহাজারী কিংবা আরও বেশ কিছু জায়গার মানুষ। কিন্তু দুটি ঘটনাতেই প্রমাণ হয় যে বাংলাদেশের শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে তাদের প্রতি একটি সহানুভূতি আছে। যাকে তাকে যখন তখন নাস্তিক বলা, সমাজবিরোধী ফতোয়া দেওয়ার প্রতিও এদের সমর্থন শুধু সরকার বিরোধিতার জায়গা থেকে। আবার ২০১৩ সালের পর হেফাজতের প্রতি ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের যে নমনীয় মনোভাব তার ভিত্তিও কিন্তু অন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য। উভয়েই যে ভুল পথে হাঁটছে সেটা নিশ্চয়ই এবার বুঝতে পারার কথা।
 
২০১৩ সালের ৫ মে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যে দৃঢ়তা দেখিয়েছিলেন সেটা ছিল আওয়ামী লীগের আসল রাজনীতি। তার বিদায়ের মধ্য দিয়ে সেই রাজনীতিটাই যেন বিদায় নিয়েছে। বিভিন্ন ইস্যুতে হেফাজতের আবদার রক্ষা বা তাদের আসকারা দেওয়ার পরিণতি হলো আজ বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের ওপর হামলা, স্বাধীনতা, সংস্কৃতির ওপর হামলা। বিএনপি ও জামাতের কাছে হেফাজতে ইসলামর গ্রহণযোগ্যতা আগে থেকেই ছিল। এবার দুঃখজনকভাবে তারা বাম শক্তিরও সমর্থন পেলো পরোক্ষভাবে।

হেফাজতের এই আন্দোলনে সবার অবস্থানই পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি শরিফুজ্জামান শরীফ তার ফেসবুক পেইজে লিখেছেন ‘গত কয়দিনের সামগ্রিক পরিস্থিতির পর বাম দলগুলোর সাথে হেফাজতে ইসলামের ভেতরের সম্পর্ক পরিষ্কার হওয়া উচিত। সাইফুল হক ও জুনায়েদ সাকী বাম জোট করবেন আবার হেফাজতের হরতাল সমর্থন করে ভাসানী অনুসারী পরিষদের সভায়ও যাবেন, এটা হয় না’। তিনি বলেন, আর কারও কথা না বললেও সিপিবি নেতৃত্ব বলুক পার্টি কোন লাইন বলে সমর্থন করছে সেই কৈফিয়ত চাওয়া উচিত। শরীফের পরিষ্কার কথা, ‘আমরা গণতন্ত্রের জন্য, ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে লড়বো, সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধেও লড়বো’।
 
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যে ছবি আমরা দেখলাম তা সুপরিকল্পিত হিংসার ছবি। সম্পূর্ণ অরাজক, বিস্ফোরক এক পরিস্থিতির ছবি, যার গতি-প্রকৃতি আগাগোড়াই ছিল হেফাজত নেতাদের নিয়ন্ত্রণে। উল্টোদিকে সরকারি দল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কল্পনার বাইরে এবং যথারীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। অবাধে সন্ত্রাস হয়েছে, লুটতরাজ চলেছে। আর ছিল অনবরত ঘুরপাক-খাওয়া গুজব, যা ভয় ছড়ালো, সহিংসতা আরও উসকে দিলো।
যখন থানায় আক্রমণ হয়, সরকারি স্থাপনা ধ্বংস করা হয়, রেলস্টেশন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, যখন জেলা আওয়ামী লীগের নেতার বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যায়, তখন মানুষের ভয় পাওয়া স্বাভাবিক। ঘোরার পিঠে চড়ে, তলোয়ার হাতে এ যুগের বখতিয়ার খিলজিদের যারা লালন করেছে, শিক্ষা তাদের যদি হয়, তবে সেটাই প্রাপ্তি।

সহিংসতার যে উন্মত্ততা দেখা গেলো, তাকে আমরা কী করে ব্যাখ্যা করবো? আমার মনে হয়, তা বুঝতে হলে আমাদের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহকে আর একটু বড় পরিসরে দেখতে হবে। কারা কীভাবে সহিংসতার প্রতি রাজনৈতিক প্রণোদনা দেয়, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের জোয়ার আনতে চায়, তাদের বুঝতে হবে। মাদ্রাসার ছাত্ররা কেন উসকানিদাতা নেতাদের হাতের পুতুল হলো সেটা ভেবে দেখা দরকার। উসকানিতে উত্তেজিত হওয়ার জন্য তাদের কতটা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, কীভাবে তাদের প্রস্তুত করা হয়েছে এবং হচ্ছে, তা এক বহুমাত্রিক প্রশ্ন, যা বহুমাত্রিক উত্তর দাবি করে ক্ষমতায় যারা আছেন তাদের কাছ থেকেই।

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

মাস্ক, করোনা পরীক্ষা ও টিকা

মাস্ক, করোনা পরীক্ষা ও টিকা

ঘটনা সত্য এবং ক্ষতি সামান্য নয়

ঘটনা সত্য এবং ক্ষতি সামান্য নয়

করোনার উৎসব

করোনার উৎসব

আগুন লাগাই স্বাভাবিক

আগুন লাগাই স্বাভাবিক

তারুণ্য ও আধুনিকতার মডেল শেখ কামাল

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২১, ১৪:১৫

আশরাফ সিদ্দিকী বিটু সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠপুত্র, বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ক্যাপ্টেন শেখ কামালের জন্ম ৫ আগস্ট ১৯৪৯ সালে টুঙ্গিপাড়ায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার থেকে দুই বছরের ছোট শেখ কামাল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্রসন্তান শেখ কামালের জন্মগ্রহণ প্রসঙ্গে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখেছেন, ‘মন চলে গিয়েছে বাড়িতে। কয়েক মাস পূর্বে আমার বড় ছেলে কামালের জন্ম হয়েছে, ভালো করে দেখতেও পারি নাই ওকে। হাচিনা তো আমাকে পেলে ছাড়তেই চায় না। অনুভব করতে লাগলাম যে আমি ছেলেমেয়ের পিতা হয়েছি।’

নিরহংকার শেখ কামালের জীবন অধ্যায়ের শুরুর কথা বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে আরও লিখেছেন, ‘একদিন সকালে আমি ও রেণু বিছানায় বসে গল্প করছিলাম। হাচু ও কামাল নিচে খেলছিল। হাচু মাঝে মাঝে খেলা ফেলে আমার কাছে আসে আর ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ বলে ডাকে। কামাল চেয়ে থাকে। একসময় কামাল হাচিনাকে বলছে, ‘হাচু আপা, হাচু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি।’ আমি আর রেণু দুজনেই শুনলাম। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে যেয়ে ওকে কোলে নিয়ে বললাম, ‘আমি তো তোমারও আব্বা।’ কামাল আমার কাছে আসতে চাইতো না। আজ গলা ধরে পড়ে রইলো। বুঝতে পারলাম, এখন আর ও সহ্য করতে পারছে না। নিজের ছেলেও অনেক দিন না দেখলে ভুলে যায়! আমি যখন জেলে যাই তখন ওর বয়স মাত্র কয়েক মাস। রাজনৈতিক কারণে একজনকে বিনা বিচারে বন্দি করে রাখা আর তার আত্মীয়স্বজন, ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে দূরে রাখা যে কত বড় জঘন্য কাজ তা কে বুঝবে? মানুষ স্বার্থের জন্য অন্ধ হয়ে যায়।’

বাংলাদেশে তারুণ্যের প্রতীক শেখ কামাল, পিতার পরিচয়ে পরিচিত না হয়ে বরং নিজ মেধা-মনন-কর্মে আলোকিত হয়েছেন এবং সদ্য স্বাধীন দেশের তরুণদের আলোর পথ দেখিয়েছেন। যে অঙ্গনেই তিনি কাজ করেছেন সে ক্ষেত্রেই সফল হয়েছেন এবং নতুনত্ব আনতে সক্ষম হয়েছে। পড়াশোনা থেকে শুরু করে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিসহ ক্রীড়াঙ্গনেও তিনি উজ্জ্বল হয়ে বিচরণ করেছেন। তিনি একসাথে অনেক পরিচয়ে পরিচিত হয়েছেন, ছিলেন ক্রীড়াবিদ, ক্রীড়া সংগঠক, ছাত্রনেতা, মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তা, সেতারবাদক, বিতার্কিক, গায়ক এবং অভিনেতা।

তাঁর সময়ে শেখ কামাল ছিলেন আধুনিক ও সময়ের চেয়ে আগানো তারুণ্য, যা অপকটে তাঁর পরিচিত ও বন্ধুজনেরা আজও স্বীকার করেন। জাতির পিতার সন্তান হয়েও তিনি ছিলেন অমায়িক, ভদ্র এবং বন্ধুবাৎসল। এক বহুমাত্রিক প্রতিভা শেখ কামাল- যিনি আজ বেঁচে থাকলে দেশ ও জাতিকে আরও বহু শুভ ও সাফল্যময় র্কীতি উপহার দিতে সক্ষম হতেন। জাতির পিতার পরিবারে জন্ম নিয়েও অহংকার তাকে স্পর্শ করতে পারেনি; বরং জীবনাচার ছিল খুবই সহজ-সরল ও সাদামাটা যা বঙ্গবন্ধু পরিবারের সবার মধ্যেই ছিল এবং এখনও আছে। যারাই তাঁর সাথে মিশেছে বা চলেছে তাঁর গুণাবলিতে মুগ্ধ হয়েছে।

বিনয়ী, ভদ্র ও স্বল্পবাক শহীদ শেখ কামালসহ ভাইবোনদের শৈশবের স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমরা পিঠাপিঠি ভাইবোন ছিলাম। একসঙ্গে উঠাবসা, খেলাধুলা, একসঙ্গে চলাফেরা, ঝগড়াঝাটি সবই আমরা করতাম। একসঙ্গে সাইকেল চালানো, একসঙ্গে ক্রিকেট খেলা, ব্যাডমিন্টন খেলা সবই করতাম। যেহেতু আমরা দুই ভাইবোন কাছাকাছি, আমার পুতুল খেলাতেও কামাল যেমন আমার সঙ্গে থাকতো, ছোটবেলা থেকে বাকি সব খেলায় আমিও ওর সঙ্গে একসঙ্গে খেলতাম।’ (তথ্যসূত্র: ০৫ আগস্ট ২০২০ তারিখে শহীদ শেখ কামালের ৭১তম জন্মদিন উপলক্ষে ভার্চুয়াল আলোচনা সভা। )

বঙ্গবন্ধু পরিবার

আপন আলোয় উদ্ভাসিত শেখ কামালের এক বন্ধু লিখেছেন, ‘আমি যতই তাঁর কাছে যাই, তাঁর আচার-আচরণে মুগ্ধ হই। বঙ্গবন্ধুর সন্তান ছাড়াও যদি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, তাহলেও বলতে হবে, ব্যক্তি কামালের মতো সৎ, যোগ্য ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ তৎকালীন সময়ে খুব দুর্লভ ছিল।’ তিনি ছোটবেলা থেকেই দায়িত্ববান ছিলেন এবং সাংসারিক কাজে তাঁর মা বেগম ফজিলাতুন নেছাকেও নিয়মিত সহযোগিতা করতেন।

সাহসী শেখ কামাল রাজপথে অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসেবে ’৬৯-র গণঅভ্যুত্থান এবং মাত্র ২১ বছর বয়সে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন। দেশ স্বাধীনের ব্রত নিয়ে তিনি ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঐতিহাসিক ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাসভবনে আক্রমণ করার পূর্ব মুহূর্তে বাড়ি থেকে বের হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ওয়ার কোর্সে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে মুক্তিবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন ও মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় অর্থ সংগ্রহের জন্য গঠন করা হয়েছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। এই দলের মোহনবাগানের সঙ্গে দ্বিতীয় খেলায় সে সময় মাঠে উপস্থিত ছিলেন শেখ কামাল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ১৯ ডিসেম্বর দুই ভাই মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন শেখ কামাল ও লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল ধানমন্ডির ১৮ নম্বর সড়কের বাসায় ফিরেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর লে. শেখ কামাল ক্যাপ্টেন হিসেবে সেনাবাহিনী ছেড়ে লেখাপড়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এর আগে ঢাকার শাহীন স্কুল থেকে ১৯৬৭ সালে মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৬৯ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে বিএ অনার্স পরীক্ষা পাস করেন। তবে ১৯৬৯ সালে তিনি ভর্তি হন এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় স্নাতক (সম্মান ) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। মাস্টার্স পরীক্ষাও দিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন শিক্ষা সংস্কারে কাজ করেছেন।

তিনি শৈশব থেকে ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, ভলিবল, বাস্কেটবলসহ নানারকম খেলাধুলায় প্রচণ্ড উৎসাহী ছিলেন। ফলে হয়ে ওঠেন দারুণ ক্রীড়াবিদ।

স্বাধীন বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে আধুনিকতার প্রতীক তিনি। ধানমন্ডি এলাকায় খেলাধুলার তেমন ব্যবস্থা ছিল না। শেখ কামাল সেজন্য উদ্যোগ নেন। ১৯৬৮ সালে তিনি ধানমন্ডি ক্লাবের যুগ্ম-সম্পাদক হন। স্বাধীনতা পর ১৯৭২ সালে তিনি ‘আবাহনী সমাজকল্যাণ সমিতি’ গঠন করেন, যা তিন বছর পর হয় আবাহনী ক্রীড়াচক্র। শেখ কামাল ও আবাহনী একে অপরের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে রয়েছে। এ দেশের ফুটবলকে আধুনিকতার স্পর্শ দেন তিনি। ১৯৭৩ সালে আয়ারল্যান্ড থেকে প্রথম বিদেশি কোচ বিল হার্টসকে দেশে এনে ফুটবলে নবধারা তৈরি করেন। তিনি আমৃত্যু ক্রীড়াক্ষেত্রের উন্নয়নে কাজ করে গেছেন। নতুন নতুন খেলোয়াড় তৈরি এবং তাদের প্রশিক্ষণের জন্য প্রচুর পরিশ্রম করতেন এবং নিজেও তাদের সাথে প্রশিক্ষণে অংশ নিতেন। তিনি দীর্ঘদিন প্রথম বিভাগ ক্রিকেট খেলেছেন এবং ক্রিকেটের উন্নয়ন ও ভবিষ্যতের জন্য অনেক কাজ  এবং পরিকল্পনাও করেছিলেন। খেলোয়াড়দের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করতে  এবং তাদের জন্য অবসর ভাতা প্রদানেরও উদ্যোগ নেন তিনি। খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার জন্য তিনি জাতির পিতার কাছ থেকে ১০ লাখ টাকার অনুদান নিয়ে ‘খেলোয়াড় কল্যাণ তহবিল’ গঠন করেছিলেন। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক অবিস্মরণীয় নাম শেখ কামাল।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও শেখ কামালের ছিল দৃপ্ত পদচারণা। পশ্চিম পাকিস্তানি সরকার রবীন্দ্রসংগীতকে এ দেশে সে সময় নিষিদ্ধ করলে, এর প্রতিবাদে সংগঠিত আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন তিনি। দেশ স্বাধীন হবার পূর্বে তিনি মৃদঙ্গ নামের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন করেন। অভিনেতা হিসেবেও সুখ্যাতি ছিল তাঁর। নাটক, বিশেষ করে মঞ্চনাটকে দারুণ অভিনয় করতেন, ছিলেন ঢাকা থিয়েটারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। অভিনেতা হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যাঙ্গনেও ভালো প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। ডাকসুর উদ্যোগে পেশাদারি নাট্যসংস্থা ‘নাট্যচক্র’ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন শেখ কামাল। ‘এক নদী রক্ত’, ‘পলাতক’,  ‘আমি মন্ত্রী হবো’, ‘অতৃপ্ত কান্না’, ‘ইতিহাসের জয় জনতার জয়’সহ বিভিন্ন মঞ্চনাটকে তিনি অভিনয় করে খ্যাতি অর্জন করেন। কলকাতায়ও মঞ্চনাটকে অভিনয় করে প্রশংসিত হয়েছিলেন। সংগীতানুরাগী শেখ কামাল ভালো সেতার বাজাতেন, যা তিনি শিখেছিলেন ছায়ানট থেকে। বন্ধু শিল্পীদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন স্পন্দন শিল্পীগোষ্ঠী, যার মাধ্যমে বাংলা গানে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছিল।

তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য ছিলেন এবং মৃত্যুর সময়ও বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন জাতীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। সদ্য-স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন কর্মসূচির পাশাপাশি সমাজের পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে তিনি কাজ করেছেন।

শেখ কামাল যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন তখন পরিচয় হয় একই বিভাগের ছাত্রী, ক্রীড়াবিদ সুলতানা খুকীর সাথে, যাকে সবাই পূর্ব পাকিস্তানের গোল্ডেন গার্ল বলে ডাকতো। ১৯৭৫ সালের ১৪ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লু দেশবরেণ্য অ্যাথলেট সুলতানা খুকীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে ঘটে মানব ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড। মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি, দেশি-বিদেশি কুচক্রী মহল জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে। সেই বর্বরতম ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডে পরিবারের অন্যদের সাথে শেখ কামাল ও সুলতানা কামাল খুকীও নিহত হন। সে সময় দু’জনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ করেছিলেন। তবে সুলতানা কামাল ভাইভা পরীক্ষা দিতে পারেনি। ভাইভা হবার আগেই বুলেট তার জীবন কেড়ে নিয়েছিল। তাদের ফল প্রকাশের আগেই তারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। পরের বছর যখন ফল প্রকাশ হয় তখন জানা যায় শেখ কামাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।

মাত্র ২৬ বছরের জীবন ছিল শেখ কামালের। এই অল্প সময়ে তিনি সবার হৃদয় জয় করেছেন। সাদামাঠা জীবনাচারের পাশাপাশি তার পোশাক-পরিচ্ছদও ছিল খুবই সাধারণ। অমিত প্রাণশক্তি ছিল তাঁর মাঝে, আধুনিকতা ও উচ্চ মননশীলতার প্রতীক ছিলেন তিনি। বাঙালির শোকের মাস আগস্ট। আগস্টেই এই মেধাবী-প্রতিভাবান ব্যক্তির জন্ম হয়, আগস্ট মাসেই ঘাতকের বুলেট তাঁর প্রাণ নিয়ে নেয়। অত্যন্ত মেধাবী ও পরিমিতবোধসম্পন্ন শেখ কামাল আগামীর বাংলাদেশ নিয়ে ভাবতেন এবং পরিকল্পনা করে কাজ করতেন, যা তাঁর ২৬ বছরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড থেকে সহজেই অনুধাবন করা যায়। সময়ে থেকে এগিয়ে থাকা এই মানুষ ছিলেন খুবই প্রাণবন্ত, পরিশ্রমী এবং দূরদর্শী।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পরে বঙ্গবন্ধু পরিবার ও শহীদ শেখ কামালকে নিয়ে অনেক অপপ্রচার চালানো হয়। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী সেনাশাসক জিয়াউর রহমান নানা কূটকৌশল করে শেখ কামালের বিরুদ্ধে যেসব কুৎসা রটায় তার কোনও কিছুরই সত্যতা কোনও দিন পাওয়া যায়নি। কোনও মিথ্যাচার শেখ কামালের কীর্তিকে  ম্লান করতে পারেনি। তিনি জাতির পিতার সন্তান হয়েও ছিলেন সৎ, বিনয়ী, নির্লোভ, পরোপকারী ও অহমিকাহীন মানুষ এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য সব সময়ই অনুসরণীয়। তিনি নিজ কর্মগুণে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। তাঁর ৭২তম জন্মবার্ষিকীতে জানাই অতল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

লেখক: মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব

তথ্যসূত্র:

১. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’।
২. ০৫ আগস্ট ২০২০ তারিখে শহীদ শেখ কামালের ৭১তম জন্মদিন উপলক্ষে ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ।
৩. দৈনিক জনকণ্ঠ, ০৬ আগস্ট ২০২০।
৪. ০৫ আগস্ট ২০২০, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা।
৫. ডাকসু সংগ্রহশালা

/এসএএস/এমওএফ/

তারুণ্যের প্রতীক সব্যসাচী শেখ কামাল

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২১, ১২:৪৫

ড. জেবউননেছা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে যে দুটো সিমেন্টের সাইনবোর্ড রয়েছে। সে সাইনবোর্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় পোস্টার লাগানো হয়েছিল সত্তর দশকে। কলাভবনে ছাত্র সংসদের সভা সমাবেশের কারণে ক্লাসে শিক্ষার্থীদের অসুবিধার কারণে বর্তমানে বাণিজ্য ভবনের পশ্চিমে ‘মল চত্বরে’ মুক্তিযুদ্ধ ভাস্কর্য নির্মাণের জন্য ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল, উদ্দেশ্য ছিল এই মঞ্চে দর্শক শ্রোতাবৃন্দ বিভিন্ন রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। চত্বরে   রাধাচূড়া, কৃষ্ণচূড়া এবং একটি মহুয়া রোপন করা হয়েছিল। দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার লিখন বন্ধ করা হয়েছিল যে আন্দোলন, সে আন্দোলনের  নাম ছিল ‘শিক্ষা সংস্কার আন্দোলন’। এই আন্দোলনের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী শেখ কামাল। যিনি ডাকসুর উদ্যোগে  নাট্য সংস্থা ‘নাট্যচক্রের’ প্রতিষ্ঠাতা সহ সভাপতি  এবং ‘ঢাকা থিয়েটারের’ অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। একজন নাট্যাভিনেতা হিসেবে বাংলা একাডেমির আমন্ত্রণে ভাষা সপ্তাহ উপলক্ষ্যে ১৯৭৫’র ১৮ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ডাকসু’র সাংস্কৃতিক সম্পাদক ম. হামিদ পরিচালিত ‘নবান্ন’ নাটকে অভিনয় ছাড়াও তিনি আরও বেশ কয়েকটি নাটকে অভিনয় করেন। কলকাতায় অভিনয় করেছেন বার্নাড শ র লেখা ‘ইউ নেভার ক্যান টেল’ এর শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর অনুবাদ ‘কেউ কিছু বলতে পারে না’ নাটকে। 

দেশের প্রথম বাংলা ব্যান্ড সংগীত সংগঠন ‘স্পন্দন’ এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। বিদেশ থেকে এই ব্যান্ড দলের জন্য বাদ্যযন্ত্র আনার ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি বিভাগীয় উপস্থিত বক্তৃতা এবং বিতর্ক অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রথম স্থান দখল করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্কেটবল টিমের প্রধান ছিলেন তিনি। হকি এবং ক্রিকেট খেলার প্রতি ঝোঁক ছিল তাঁর। ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামে তিনি ক্রিকেট খেলতে যান। আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগের লিগে খেলেছেন। ১৯৬৮ সালে তিনি প্রথম ধানমন্ডি ক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ঢাকা কলেজে অধ্যয়নকালীন ১৯৬৯ এর গণ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে সংগঠক হিসেবে ছিলেন। তৎকালীন সময়ে যখন রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ ঘোষণা হয়েছিল, তখন সকল সংস্কৃতিকর্মীদের সঙ্গে তিনি এর প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিলেন। ছায়ানটের যন্ত্রসঙ্গীত বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে সেতারবাদনে তালিম নিয়েছেন।

ধানমন্ডি ক্লাবের হয়ে খেলেছেন ফুটবল, উদিতি, আজাদ বয়েজের হয়ে খেলেছেন ক্রিকেট, মোহামেডানের হয়ে বাস্কেটবল খেলেছেন, খেলেছেন বাস্কেটবল লিগের অন্যতম সেরা দল ‘স্পার্সে’। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ এ ‘আবাহনী সমাজকল্যাণ’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংস্থার নামে গঠিত হয় ফুটবল দল ‘ইকবাল স্পোটিং’। মুক্তিযুদ্ধকালীন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের বেশ কিছু কৃতি খেলোয়াড়কে এনে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘আবাহনী ক্রীড়া চক্র’। ১৯৭৩ সালে আবাহনীর জন্য আয়ারল্যান্ড থেকে প্রথিতযশা কোচ বিল হার্টকে এনে বাংলাদেশের ফুটবলে আধুনিকায়নের সূচনা করেছিলেন। ১৯৭৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগরে আবাহনীর পক্ষ হয়ে তিনি আইএফএ শিল্ডে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ভারতের বেলুনিয়া থেকে যে ব্যাচটি কমিশন লাভ করে, সেই ব্যাচের একজন শেখ কামাল। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ওয়্যার কোর্সে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে কমিশন লাভ করে সেকেন্ড লেফট্যানান্ট থাকা অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী দবির উদ্দিন আহমেদের কন্যা পূর্ব পাকিস্তানের ‘গোল্ডেন গার্ল’ নামে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্স্ট ফিমেল ব্লু দেশবরেন্য এ্যাথলেট সুলতানা কামাল খুকুর সঙ্গে দুই পরিবারের সম্মতিতে ১৯৭৫ সালের ১৪ জুলাই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তার বিয়েতে প্রাপ্ত সব উপহার বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের তদারকিতে জমা দেওয়া হয় রাষ্ট্রীয় তোষাখানায়। শুধুমাত্র একটি সোনার নৌকা এবং সোনার মুকুট স্মৃতি হিসেবে রাখা হয়।

বিয়ের ৩১ দিন পর ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট তিনি ও তাঁর স্ত্রী ঘাতকের গুলীতে প্রাণ হারান। এই মানুষটি জন্মগ্রহণ করেন গোপালগঞ্জ জেলার বাইগার নদীর তীর ঘেষে টুঙ্গিপাড়া গ্রামে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি এবং বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুননেসার ঘরে ১৯৪৯ সালের ৫ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তাঁর বড় বোন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘একটানা ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তিনি বন্দী ছিলেন। সেই সময়ে আমাদের দুই ভাই বোনকে নিয়ে আমার মা দাদা-দাদীর কাছেই থাকতেন। একবার একটা মামলা উপলক্ষ্যে আব্বাকে গোপালগঞ্জ নিয়ে যাওয়া হয়। কামাল তখন অল্প অল্প কথা বলা শিখেছে। কিন্তু আব্বাকেও কখনো দেখেনি, চেনেও না। আমি যখন বারবার আব্বার কাছে ছুটে যাচ্ছি, ‘আব্বা আব্বা’ বলে ডাকছি ও শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে। গোপালগঞ্জ থানায় একটা বড় পুকুর আছে, যার পাশে বড় খোলা মাঠ। ওই মাঠে আমরা দুই ভাই বোন খেলা করতাম ও ফড়িং  ধরার জন্য ছুটে বেড়াতাম। আর মাঝে মাঝেই আব্বার কাছে ছুটে আসতাম। অনেক ফুল-পাতা কুঁড়িয়ে এনে থানার বারান্দায় কামালকে নিয়ে খেলতে বসেছি। ও হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, ‘হাসু আপা, তোমার আব্বাকে আমি আব্বা বলি?’ কামালের সেই কথা আজ যখন মনে পড়ে, তখন চোখের পানি ধরতে পারি না। আজ  ও নেই। আমাদের আব্বা বলে ডাকারও কেউ নেই।’

কতটুকু বেদনাতুর স্মৃতি বয়ে বেড়াতে হয় একজন বোনের। এই অনুভূতি একমাত্র তারাই বুঝতে পারবেন যাদের স্বজন হারিয়েছে। শেখ কামালের আর এক বোন শেখ রেহানা তাঁর স্মৃতিচারণে বলেছেন, ‘কামাল ভাই খুব সৌখিন ছিলেন। খুব গুছিয়ে রাখতেন সবকিছু। কিন্তু বেশি কিছু চাইতেন না। আমার কাছেই এসেই হয়তো কোনোদিন বললেন, ‘দশটা টাকা দিবি?’ বিড়ি-সিগারেট কোনও দিন নেয়নি। আমার মনে পড়ে সেই সব দিন। আমরা সবাই ছাদে। কামাল ভাই সেতার বাজাচ্ছেন। আমাকে বললেন, তুই একটা গান ধর। মায়ের পছন্দ জগন্ময় মিত্র। ‘যত লিখে যাই, চিঠি না ফুরায় কথা তো হয় না শেষ..তুমি আজ কত দূরে।’ হ্যাঁ সতিই বোনের কাছ থেকে তার ভাই আজ কত দূরে। যেখান থেকে কেউ কাউকে দেখতে পায় না। এই ক্ষণজন্মা মানুষটি সম্পর্কে বিশিষ্টজনেরা স্মৃতিচারণ করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম একজন তাঁর সরাসরি শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোহাব্বত খান। তিনি বলেন, ৭০ দশকে কলাভবনের ২০২১ নম্বর শ্রেণিকক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে ফিরছেন। হঠাৎ করে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখেন, তাঁর ছাত্র শেখ কামাল তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে। স্যারকে সালাম দিয়ে বললেন, স্যার, বাংলা ভাষার জন্য আমাদের ভাইয়েরা শহীদ হয়েছেন, অথচ আপনি পুরো পাঠদানে একটিও বাংলা ভাষা ব্যবহার করলেন না? স্যার সেদিন বলেছিলেন, কামাল, তুমিও বাংলা জানো, আমিও জানি, কিন্তু তোমাকে ইংরেজিতে দক্ষ করার জন্যই ইংরেজি ভাষায় পাঠদান করেছি। ‘এই ঘটনাটুকু যদি বিশ্লেষণ করি তাহলে বুঝা যায়, শেখ কামাল কতটা মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। স্যার যখন ১৯৭২ এর দিকে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে যান। তখন একদিন কলাভবনের করিডোরে শেখ কামাল এসে স্যারের পা ছুঁয়ে কদমবুচি করেন। স্যার জানতে চাইলেন কেন,কদমবুচি করলে? শেখ কামাল বলেছিলেন, স্যার আর যদি দেখা না হয়।’ শেখ কামালের কথা সত্যি হয়েছিল, স্যারের সাথে কোনোদিন  শেখ কামালের দেখা হয়নি। প্রবাসে থাকা অবস্থায় জানতে পারেন, শেখ কামাল হারিয়ে গিয়েছেন।’ এখনও স্যার আফসোস করেন আর বলেন, ‘শেখ কামাল বঙ্গবন্ধুর সন্তান হয়েও তাকে কোনোদিন দেখিনি কারও চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে। সে ছিল চঞ্চল এবং সহজ-সরল।’ অথচ কতিপয় স্বাধীনতা বিরোধীরা শেখ কামাল সম্পর্কে অপবাদ ছড়িয়েছিল। তিনি নাকি ব্যাংক ডাকাতি নামক কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। তৎকালীন জাসদের মুখপত্র ‘গণকণ্ঠ’ এবং ভাসানী ন্যাপের ‘হক কথা’ পত্রিকা বিকৃতভাবে সংবাদ পরিবেশন করেছিল। অথচ ‘দৈনিক মর্নিং নিউজ’ পত্রিকার প্রকাশিত সংবাদ সত্য ঘটনাকে কুৎসার নিচে চাপা দিয়েছিল কামালের চরিত্র হননকারীরা। লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফের তৎকালীন সাংবাদিক পিটার হেজেল হাস্ট তখন ছিলেন ঢাকায়। সেদিন পত্রিকায় ছাপানো সংবাদটি স্বাধীনতা বিরোধীরা বুঝিয়ে দেবার জন্য চেষ্টা করলে তিনি টেলিগ্রাফে প্রকাশ করে বলেন, ‘একজন প্রধানমন্ত্রীর ছেলের ব্যাংক ডাকাতির দরকার কী? টাকা চাইলে তো ব্যাংক ম্যানেজাররাই তাঁকে টাকা এনে দেবেন।’

মেজর ডালিমের স্ত্রীর সাথে জড়িয়ে শেখ কামাল সম্পর্কে সংবাদ প্রকাশ হয়। অথচ মেজর ডালিম তাঁর লিখিত ‘যা দেখেছি যা বুঝেছি যা করেছি’ গ্রন্থে তাঁর স্ত্রী অপহরণের ঘটনাকে খোলাসা করে দিলেও শেখ কামালকে মিথ্যা অপবাদে জড়িয়েছিল কুচক্রীরা। এই অসত্যকে পুঁজি করে নিজেদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করেছে। কিন্তু সত্যের দাপট চিরস্থায়ী, অসত্যের দাপট ক্ষণস্থায়ী। এই মহান বানীই সত্য হয়েছে ইতিহাসের পরতে পরতে। ১৯৭৩ এর ৩০০ আসনের সংসদ নির্বাচনে বাবার আদেশে তিনি ফেনী যান। ফেনী থেকে বিলোনিয়া ২০ মাইল পথ মুগ্ধ জনতার সালাম দিয়েছেন আর নিয়েছেন। কোথাও ভোট চাননি, জনসভা করেননি। নির্বাচন সম্পর্কে একটি কথাও বলেননি। এই হলো শেখ কামাল। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন ভাবুক ধরনের। তৎকালীন সময়ে বাবার সাথে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে ২২দিন অবস্থান করেন। তখনকার সময়ে জেনেভায় বাংলাদেশ মিশন প্রধান ওয়ালিউর রহমানের কাছে তিনি দু’বার গাড়ি চেয়েছিলেন দুলর্ভ কিছু বইয়ের সন্ধান করতে। তার কাছে বইও চেয়েছেন বেশ কয়েকবার। এই সব্যসাচী মানুষটি শান্তিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তার একটি উদাহরণ- কলাভবনের সম্মুখে বটতলায় জাসদ ছাত্রলীগ ও ভাসানী ন্যাপপন্থী জাতীয় ছাত্রদলের কর্মীদের লাঠালাঠি সমাধান করতে গিয়ে মাথায় লাঠির আঘাত পেলেও কোনও উচ্চবাচ্য না করে সেদিনের ঝামেলা সমাধান করেছিলেন। নয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমগ্র ক্যাম্পাসে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ত।

১৯৭৪ এর দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির পেছনে শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনের সামনে চট পড়া কবি সাবদার সিদ্দিকী বঙ্গবন্ধুকে এবং তার পরিবার নিয়ে কটুক্তি আপত্তিকর মন্তব্য করলে ছাত্রলীগের কর্মীরা রাগান্বিত হয়ে কবিকে ধরেন। ঘটনার সময় কলাভবনের বারান্দায় ছাত্রলীগের কর্মীদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে শেখ কামাল কথা বলছিলেন, তাকে গিয়ে ঘটনাটি জানালে তিনি সাবদারকে ভিড় থেকে হাত ধরে নিয়ে এলেন এবং গাড়ির পেছনে বসিয়ে প্রেসক্লাব নামালেন, গাড়ি থেকে নামিয়ে তার হাতে টাকা দিয়ে বললেন, ‘এত সুন্দর কবিতা লিখেন, গাঁজা খান কেন?’ সাবদারকে যখন ভীড় থেকে তিনি বের করছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘কবিরা অনেক দ্ব্যর্থবোধক অর্থে কথা বলেন,কিন্তু তারা আমাদের কবিতা উপহার দেন। তাছাড়া একজন কবি কী লিখলেন না লিখলেন তাতে বঙ্গবন্ধু ছোট হয়ে যান না’। শেখ কামালের এই উক্তিটি প্রমাণ করে তিনি কতটা উদার ছিলেন। 

শেখ কামাল কখনও ঢাকা কলেজের ছাত্রলীগের সক্রিয় সদস্য, কখনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সংস্কার আন্দোলনের উদ্যোক্তা, কখনও সলিমুল্লাহ হলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নাটকে ঘটকের ভূমিকায়, কখনও টিএসসির লনে সঙ্গীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিনের গানের আয়োজক, কখনো ৩০ মিরপুর রোডে ছাত্রলীগের অফিসে, কখনও ভাবুক মন নিয়ে কবি নজরুল ইসলামের সাথে সাক্ষাৎ করতে যাওয়া একজন ভক্ত, কখনও খেলার মাঠে একজন খেলোয়াড়, একজন মগ্ন পাঠক, কখনও বন্ধুদের সাথে আড্ডায়, সব কিছু ছাপিয়ে অতি সাধারণ একজন সেতারবাদক শেখ কামাল। ৫ ফিট সাড়ে ১০ ইঞ্চির মানুষটি মাত্র ২৬ বছর বয়সে তাঁর জীবন প্রদীপ থেমে যায়। সে বেঁচে থাকলে হতে পারতেন বাংলাদেশের একজন সেতার বাদক, বরেণ্য ক্রীড়াবিদ, সংগঠক অথবা অভিনেতা। শেখ কামাল বেঁচে থাকলে তার বয়স হতো ৭২। ইতিহাসের পাতায় শেখ কামাল বেঁচে থাকবেন ২৬ বছরের টগবগে তরুণ হয়ে।

বঙ্গবন্ধুর সন্তান হয়েও তিনি ছিলের ছাত্রলীগের একজন সাধারণ সদস্য, চাইলে বড় কোনও পদে তিনি অধিষ্ঠিত হতে পারতেন। শেখ কামাল তরুণের পথ প্রদর্শক। ঢাকার শাহীন স্কুলের শিক্ষার্থী নিজ প্রতিভায় ছড়িয়ে পড়েছিলেন প্রজাপতির মতো পাখা মেলে। এ প্রজন্ম তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে সংগঠক হিসেবে গড়তে পারে সোনার বাংলাদেশ।

শেষ করবো কবি ও নাট্যকার মু. জালাল উদ্দিন নলুয়া’র শেখ কামালকে নিয়ে লিখিত কবিতার কয়েকটি চরণ দিয়ে, ‘অবারিত খেলার মাঠ, সংস্কৃতি প্রাঙ্গন, শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ, মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গন/আজ ও কাঁদে। অন্তহীন কান্নায় স্মৃতি সাগরে/শুভার্থীরা আজ ও খোঁজে তোমাকে। তুমি ভেসে গেছো শোক সিন্ধুতে/বেদনার বারি ঝরে অগণিত জনমনে/পাশবিক জিঘাংসায়, হিংস্র থাবায় / হারায় কামাল, হায় কামাল! শেখ কামাল/ তুমি বেঁচে আছো ভক্তের অশ্রু বিন্দুতে/ মল চত্বরের রাধাচূড়া, কৃষ্ণচুড়া,মহুয়া ফুলের সুভাসে।'

 লেখক: অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

 

/এসএএস/

সম্পর্কিত

ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে ভাবনা ও কিছু কথা

ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে ভাবনা ও কিছু কথা

লকডাউন ভাবনা ও একটি প্রার্থনা

লকডাউন ভাবনা ও একটি প্রার্থনা

প্রজন্ম ধ্বংসের হাতিয়ার সব গেমস-অ্যাপসকে ‘না’ বলি

প্রজন্ম ধ্বংসের হাতিয়ার সব গেমস-অ্যাপসকে ‘না’ বলি

নতুন অর্থবছরের বাজেটে আমার প্রত্যাশা

নতুন অর্থবছরের বাজেটে আমার প্রত্যাশা

নির্লোভ নিরহংকারী প্রতিভাবান শেখ কামাল

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২১, ০০:০২

তোফায়েল আহমেদ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জ্যেষ্ঠপুত্র শেখ কামাল গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়া গ্রামে ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ৫ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। আজ তার ৭৩তম শুভ জন্মদিন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে শেখ কামাল দ্বিতীয় ছিলেন। তিনি শাহীন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

ছাত্রলীগের একনিষ্ঠ কর্মী ও সংগঠক হিসেবে ৬ দফা ও ১১ দফা আন্দোলন এবং ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে শেখ কামাল সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। আমার স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে ’৬৯-এর অগ্নিঝরা গণআন্দোলনের স্মৃতি। যে আন্দোলনে শেখ কামালের প্রতিদিনের উপস্থিতি ছিল সবার জন্য তুমুল উৎসাহব্যঞ্জক। এই আন্দোলনে ঢাকা কলেজের ছাত্রদের সংগঠিত করে মিছিলসহ বটতলায় সমবেত হতেন তিনি। আমার পরম স্নেহভাজন ছিলেন শেখ কামাল। মনে পড়ে, ’৬৯-এ পাকিস্তান সামরিক জান্তা সরকার ধর্মীয় উগ্রতার পরিচয় দিয়ে রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করে। শেখ কামাল তখন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীদের সংগঠিত করেন এবং রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি খ্যাতিমান শিল্পী জাহিদুর রহিমকে দিয়ে বিভিন্ন সভা ও অনুষ্ঠানে গাওয়ানোর উদ্যোগ নেন। বাঙালি জাতির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতার সন্তান তিনি, জন্ম থেকেই তার ধমনীতে নেতৃত্বগুণ আর বাঙালি জাতীয়তাবোধের চেতনা। সংস্কৃতিবান শেখ কামালের প্রতিবাদের ভাষা ছিল রবীন্দ্রসংগীত। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে যখন যেখানে সুযোগ পেয়েছেন, সেখানেই বিশ্বকবির গান গেয়ে অহিংস প্রতিবাদের অসাধারণ উদাহরণ রেখেছেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হিসেবে ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করে হাতিয়ার তুলে নিয়ে দেশমাতৃকার মুক্তির যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর এডিসি ছিলেন শেখ কামাল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলকে সংগঠিত করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তার আশাবাদ ছিল, দেশ স্বাধীন হলে বাংলাদেশের ক্রীড়াক্ষেত্রের ছবিটাই পাল্টে দেবেন এবং দেশকে অনন্য উচ্চতায় আসীন করবেন। মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া দেশ পুনর্গঠনে নিজের অসামান্য মেধা ও অক্লান্ত কর্মক্ষমতা নিয়ে জাতির পিতার আদর্শ বুকে ধারণ করে ঝাঁপিয়ে পড়েন শেখ কামাল। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি সেনাবাহিনী ত্যাগ করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যান। সেখান থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

স্বাধীন বাংলাদেশের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে শেখ কামালের অবদান অনস্বীকার্য। তিনি ছায়ানট থেকে সেতার শিক্ষার তালিম নেন। পড়াশোনা, সংগীতচর্চা, অভিনয়, বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা থেকে শুরু করে বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরবার চেষ্টায় সদা-সর্বদা নিয়োজিত ছিলেন শেখ কামাল। অধ্যয়নের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তার পদচারণায় ছিল মুখর। স্বাধীনতার পর শেখ কামাল তার বন্ধুদের সহযোগে প্রতিষ্ঠা করেন নাট্যদল ‘ঢাকা থিয়েটার’ এবং আধুনিক সংগীত সংগঠন ‘স্পন্দন শিল্পী গোষ্ঠী’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যাঙ্গনে তিনি ছিলেন সুপরিচিত সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া  সংগঠক এবং অভিনেতা। আবাহনী ক্রীড়াচক্র প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি দেশের ক্রীড়াজগতে স্মরণীয় হয়ে আছেন। ‘স্পন্দন শিল্পীগোষ্ঠী’র প্রতিষ্ঠাও তাকে অমরত্ব দান করেছে। প্রকৃতপক্ষে শেখ কামাল ছিলেন একজন ক্রীড়া ও সংস্কৃতিমনা সুকুমার মনোবৃত্তির মানুষ। তিনি কখনও ব্যবসায়িক কার্যকলাপে জড়িত হননি, অনর্থক ছোটেননি অর্থের পেছনে।

শাহীন স্কুলের ছাত্র থাকাকালে স্কুলের প্রতিটি খেলায় তিনি ছিলেন অপরিহার্য। এরমধ্যে ক্রিকেট ছিল তার প্রিয়। তৎকালের অন্যতম উদীয়মান পেসার ছিলেন তিনি। ‘আজাদ বয়েজ ক্লাব’ তখন কামালদের মতো উঠতি প্রতিভাদের আশ্রয়স্থল। এখানেই শেখ কামাল প্রথম বিভাগ ক্রিকেট খেলেছেন দীর্ঘদিন। দেশ স্বাধীনের পর ’৭২-এ ‘আবাহনী সমাজকল্যাণ সংস্থা’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংস্থার নামে সংগঠিত করেন ফুটবল দল ‘ইকবাল স্পোর্টিং’, আর ক্রিকেট, হকির দল ‘ইস্পাহানী স্পোর্টিং’। পরে এসব দলের সমবায়ে নবোদ্যমে যাত্রা শুরু করে ‘আবাহনী ক্রীড়া চক্র’। ফুটবল, ক্রিকেট, হকি এই খেলাগুলোতে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল কামালের। তার স্বপ্ন ছিল একদিন আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশ হবে অপরাজেয় অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রীড়াশক্তি। সত্যিই সে বেঁচে থাকলে সেটা সম্ভব ছিল। স্বপ্ন তার দৃষ্টিসীমা ছাড়িয়ে বিস্তৃত হয়েছিল বহুদূর অবধি। ফুটবলের উন্নতির জন্য ’৭৩-এ আবাহনীতে বিদেশি কোচ বিল হার্ট-কে নিযুক্ত করেন। যোগ্যতা, দক্ষতা আর দেশপ্রেমের অসামান্য স্ফুরণে শেখ কামাল অল্প দিনেই বদলে দিয়েছিলেন সদ্য স্বাধীন একটা দেশের ক্রীড়াক্ষেত্র। শুধু ক্রীড়াই নয়, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির সব শাখাতেই ছিল তার মুন্সিয়ানা ও অসামান্য সংগঠকের ভূমিকা।

শেখ কামালের নবপরিণীতা বধূ সুলতানা খুকু ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। দেশজোড়া খ্যাতি ছিল তার। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার পরিচিতি ছিল এক প্রতিভাবান অ্যাথলেট হিসেবে। নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেছিলেন। ’৭৫-এর ১৪ জুলাই যেদিন গণভবনে শেখ কামাল ও শেখ জামাল দুই ভাইয়ের বিয়ে হয় সেদিন আমি সেই বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারিনি। কেননা, ওই বছরের ১১ জুলাই আমার বড় ভাই পিজি হাসপাতালে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) মৃত্যুবরণ করেন। আমি তখন ভোলায়। বিয়ের দিন ভোলার পুলিশ স্টেশনে ফোন করে বঙ্গবন্ধু আমার খবর নিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘জামাল-কামালের বিয়ের আসরে সকলেই আছে। শুধু তুই নাই।’

কত বড় মহান নেতা যে আমার মতো ক্ষুদ্র কর্মীর কথাও সেদিন তিনি ভোলেননি। বিয়ের অল্প কিছু দিন পর ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫-এ সেনাবাহিনীর কতিপয় বিশ্বাসঘাতক উচ্ছৃঙ্খল সেনা সদস্যের হাতে পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মাতা বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ও নববিবাহিতা দুই বধূ, দুই ভাই শেখ জামাল, শেখ রাসেলসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নির্মম মৃত্যুকে বরণ করতে হয় তাকেও।

জাতির পিতা জীবনের যৌবনের বারোটি বছর কারান্তরালে কাটিয়েছেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে শত-দুঃখ-কষ্টের মধ্যে থেকেও বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যরা কখনোই কোনও খেদোক্তি প্রকাশ করেননি। বরং পরিবারের সদস্যরা সে সব সগৌরবে মেনে নিয়ে বাঙালির জাতীয় মুক্তি-সংগ্রামের অংশে পরিণত হয়েছেন। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, দেশ স্বাধীনের পর কুচক্রী মহল শেখ কামালের বিরুদ্ধে মিথ্যা-বানোয়াট অপপ্রচার চালাবার চেষ্টা করেছিল। যা ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং বাস্তবে টেকেনি।

শেখ কামালের আচার-আচরণ কেমন ছিল সে-সম্পর্কে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আবুল ফজল রচিত ‘শেখ মুজিব : তাঁকে যেমন দেখেছি’ গ্রন্থ থেকে কিছু অংশ তুলে ধরছি। নাতিদীর্ঘ এই গ্রন্থটির ৪৭-৪৮ এই দুই পৃষ্ঠা জুড়ে আছে একটি স্মৃতিচারণমূলক লেখা। লেখাটির শিরোনাম ‘শেখ কামাল : স্মৃতিচারণ’।

তিনি লিখেছেন, “১৭ই মার্চ শেখ সাহেবের জন্মদিন। স্বাধীনতার পর ছাত্রলীগ প্রতি বছর এ দিনটি পালন করে থাকে। ১৯৭৪-এর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হওয়ার জন্য ঢাকার ছাত্রলীগ আমাকে অনুরোধ জানায়। আমি রাজি হলাম, তবে দিনে দিনে ফিরে আসতে চাই এ শর্তে। তারা সেভাবে বিমানের টিকিট পাঠিয়ে দিয়েছিল।

১৭ তারিখ ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে আমি চিন্তা করতে লাগলাম, ওরা আমাকে নিতে আসবে কিনা, এলেও আমি চিনতে পারবো কিনা। ওদের কারো সঙ্গে তো আমার দেখা নেই। ...একধারে দেখলাম একটা ছিপছিপে গোঁফওয়ালা ছেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বেশ লম্বা বলে সহজে চোখে পড়ে। ছেলেটাকে আমি চিনতে পারলাম না। লাউঞ্জের প্রবেশপথে ছেলেটি এগিয়ে এসে বলে: ‘আপনাকে নিতে এসেছি।’ একথা বলেই হাত থেকে ব্যাগটি আমার আপত্তি অগ্রাহ্য করে নিজের হাতে নিয়ে নিলো। নিশ্চিন্ত হওয়ার জন্য জিজ্ঞাসা করলাম : তুমি ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে এসেছ? ‘জি হ্যাঁ।’ নম্র কণ্ঠে জবাব দিলো ছেলেটি।

ওর পেছনে পেছনে হেঁটে এসে একটা গাড়িতে উঠে বসলাম। ড্রাইভারের সিটে গিয়ে বসলো ও নিজে এবং শুরু করলো ড্রাইভ করতে। তার আগে ও জেনে নিয়েছে আমি কোথায় উঠবো। গাড়িতে তৃতীয় ব্যক্তি নেই। কিছু দূর যাওয়ার পর আমার মনে হঠাৎ কৌতূহল হলো, জিজ্ঞাসা করলাম : তুমি কি করো? বললে : ‘অনার্স পরীক্ষা দিয়েছি সোশিয়োলজিতে।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে? ‘জি হ্যাঁ।’ শেখ সাহেবের সঙ্গে ছেলেটির দৈহিক সাদৃশ্য আমার মনে ধীরে ধীরে স্পষ্টতর হয়ে উঠেছিল। জিজ্ঞাসা করলাম : তোমার নাম। ‘শেখ কামাল।’ ও তুমি আমাদের শেখ সাহেবের ছেলে।” এই ছিলেন শেখ কামাল। জাতির পিতার সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তার মধ্যে কোনও অহমিকাবোধ ছিল না। তিনি ছিলেন বিনয়ী ও মার্জিত। দাম্ভিকতা ছিল তার স্বভাববিরুদ্ধ। পরোপকারী, বন্ধুবৎসল ও মার্জিত শেখ কামালের বিনম্র আচরণে মুগ্ধ হতো সকলেই।  

পরিশেষে, কামালের শৈশবের একটি স্মৃতি উদ্ধৃত করছি। যে স্মৃতিকথাটি পাঠ করলে দু’চোখ পানিতে ভরে আসে, অশ্রু সংবরণ দুঃসাধ্য হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ শিরোনামের লেখায় এই স্মৃতি উল্লেখ করেছেন। “১৯৪৯ সালে আমার আব্বা গ্রেফতার হন। আমি তখন খুবই ছোট্ট আর আমার ভাই কামাল কেবল জন্মগ্রহণ করেছে। আব্বা ওকে দেখারও সুযোগ পাননি। একটানা ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তিনি বন্দি ছিলেন। সে সময় আমাদের দুই ভাইবোনকে নিয়ে আমার মা দাদা-দাদির কাছেই থাকতেন। একবার একটা মামলা উপলক্ষে আব্বাকে গোপালগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হয়। কামাল তখন অল্প কথা বলা শিখেছে। কিন্তু আব্বাকে ও কখনও দেখেনি, চেনেও না। আমি যখন বারবার আব্বার কাছে ছুটে যাচ্ছি, আব্বা-আব্বা বলে ডাকছি, ও শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে। গোপালগঞ্জ থানায় একটা বড় পুকুর আছে, যার পাশে বড় খোলা মাঠ। ওই মাঠে আমরা দুই ভাইবোন খেলা করতাম ও ফড়িং ধরার জন্য ছুটে বেড়াতাম। আর মাঝে মাঝেই আব্বার কাছে ছুটে আসতাম। অনেক ফুল, পাতা কুড়িয়ে এনে থানার বারান্দায় কামালকে নিয়ে খেলতে বসেছি। ও হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, ‘হাসু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি।’ কামালের সেই কথা আজ যখন মনে পড়ে আমি তখন চোখের পানি রাখতে পারি না।”

ঘাতকের বুলেট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করার মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল। ঘাতকেরা চেয়েছিল বাংলাদেশকে নেতৃত্বশূন্য করতে। তারা জানতো জাতির পিতার সন্তানেরা মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ধারক-বাহক। সেজন্য তারা শেখ কামাল, শেখ জামাল, শিশু শেখ রাসেল কাউকেই রেহাই দেয়নি। সেদিন জাতির পিতার দুই কন্যা বিদেশে থাকায় ঘাতকের বুলেট তাদের স্পর্শ করতে পারেনি। ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের পর ’৮১তে আমরা দলীয় ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনার হাতে শহীদের রক্তেভেজা দলীয় পতাকা তুলে দেই। সেই পতাকা যথাযথ মর্যাদার সাথে হাতে তুলে নিয়ে জাতির পিতার আদর্শ সমুন্নত রেখে তিনি আজ দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনকে বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে আসীন করার যে স্বপ্ন শেখ কামাল দেখতেন সেই অসমাপ্ত কাজটিও তারই পৃষ্ঠপোষকতায় সাফল্যের সাথে করে চলেছেন।

লেখক: আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

আমার জীবনে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ

আমার জীবনে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ

জাতির মুক্তিসনদ ছয় দফা

জাতির মুক্তিসনদ ছয় দফা

বিশ্ব শান্তির প্রতীক ‘জুলিও কুরি শেখ মুজিব’

বিশ্ব শান্তির প্রতীক ‘জুলিও কুরি শেখ মুজিব’

‘ঝড় বৃষ্টি আঁধার রাতে আমরা আছি তোমার সাথে’

‘ঝড় বৃষ্টি আঁধার রাতে আমরা আছি তোমার সাথে’

মিথ্যাচারে আক্রান্ত শেখ কামাল

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২১, ২০:১৭

হায়দার মোহাম্মদ জিতু উইলিয়াম ডোনাল হ্যামিলটনের হ্যারাল্ড থিউরির অর্থ দাঁড়ায় নির্লিপ্ত এবং নির্বোধের মতো পূর্বেরজনকে অনুসরণ বা অনুকরণ করা। যাকে গড্ডালিকা প্রবাহও বলা যায়। সচরাচর এই প্রবণতা পশুশ্রেণির মাঝে দেখা যায়। তথ্যমতে, এই অন্ধ অনুকরণের ফলে তুরস্কে প্রায় ১৫০০ ভেড়া মারা পড়েছিল। বিষয়টি ছিল এমন যে একপাল ভেড়া পাহাড়ের পাশে চরে বেড়াচ্ছিল। এর মাঝে হঠাৎ একটি ভেড়া পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়ে। ব্যস, তার দেখাদেখি একেবারে নির্লিপ্ত এবং নির্বোধের মতো সেখানকার ১৫০০ ভেড়ার সবক’টি একে একে লাফিয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষেত্র বিশেষে বহুকাল যাবৎ এই তত্ত্ব প্রয়োগের অপচেষ্টা চলছে। যদিও এ ধরনের আচরণ এখানকার জনগণ বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। কিন্তু তবু এই তত্ত্বের বাস্তবায়ন চেষ্টা আজও বন্ধ হয়নি; বরং চোরাগোপ্তাভাবে চলে আসছে। তবে আনন্দের বিষয় হলো, বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশের কল্যাণে অর্থাৎ তথ্যের অবাধ প্রবাহের ফলে মানুষ এখন মুহূর্তেই বুঝে যায় সাদা ও কালোর তফাৎ।

বেশ দীর্ঘকাল যাবৎ বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামালকে নিয়ে এমন তত্ত্ব প্রয়োগের চেষ্টা চলে আসছে। মিথ্যাচারের মধুচন্দ্রিমায় মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বীরত্বকে নাই করে দেওয়ার পরিকল্পনা হচ্ছে। অথচ বঙ্গবন্ধুপুত্র শেখ কামাল মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর প্রথম ব্যাচের একজন ক্যাডেট অফিসার ছিলেন এবং সেকেন্ড লেফট্যানেন্ট থাকা অবস্থায় প্রধান সেনাপতি এমএজি ওসমানীর এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

সাংস্কৃতিক বোধ সঞ্চালনের তাগিদে মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব এবং পরবর্তী সময়টায় নিরলসভাবে কাজ করেছেন বাঙালি সংস্কৃতিকে ধারণ ও ছড়িয়ে দিতে। নাটক, কবিতা, গান সব মাধ্যমকেই সমাদৃত করেছেন অংশগ্রহণকারী, সংগঠক এবং দর্শক হিসেবে। সংগঠক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘নাট্যচক্র’ নামের নাটকের সংগঠন প্রতিষ্ঠায় যুগ্ম আহ্বায়ক এবং আরেক নাট্য সংগঠন ঢাকা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠার অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি।

অভিনয় শিল্পী হিসেবে টিএসসি থেকে কলকাতার মঞ্চ সব জায়গায় আলো ছড়িয়েছেন। কলকাতার মঞ্চে ফেরদৌসি মজুমদারসহ অভিনয় মুগ্ধতায় সারি সারি লাইনে অটোগ্রাফ দিয়েছেন। সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁর সচেতনতার মাত্রা এতটাই জোরদার ছিল যে পাকিস্তানি সামরিক সরকার কর্তৃক রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ ঘোষণায় সংস্কৃতি কর্মী জড় করে জায়গায় জায়গায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন এবং সেখানে নিজে অন্যদের নিয়ে রবীন্দ্রসংগীত গেয়েছেন। ছায়ানটে সেতার বাজানোর তালিমও নিচ্ছিলেন।

খেলাধুলায়ও অনুরাগ ছিল অপ্রতিরোধ্য। ঢাকার শাহীন স্কুলে পড়াকালীন নিখুঁত লাইন লেন্থের ফাস্ট বল করতেন। আজাদ বয়েজ ক্লাবের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটও খেলেছিলেন। ফুটবল, ক্রিকেট, হকি খেলারও খেলোয়াড় এবং সংগঠক ছিলেন। তাঁর হাত ধরেই দেশের ঐতিহ্যবাহী আবাহনী ক্রীড়া চক্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

তবে এত অর্জনের বাইরে যে বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে জঘন্য মিথ্যাচার করা হয় তা হলো, ডালিমের স্ত্রী অপহরণের মিথ্যা অপবাদ। এ নিয়ে খোদ ডালিম তার ‘যা দেখেছি যা বুঝেছি যা করেছি’ বইতে পরিষ্কার লিখেছেন, অপহরণের ঘটনার দিন ঢাকা লেডিস ক্লাবে তার খালাতো বোন তাহমিনার বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল। সেখানে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের নেতা ও রেডক্রসের সভাপতি গাজী গোলাম মোস্তফার পরিবারসহ সামরিক ও বেসামরিক অতিথিরা।

ডালিমের কানাডা ফেরত শ্যালক বাপ্পির চুল টানা নিয়ে গাজী গোলাম মোস্তফার ছেলেদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি ও হাতাহাতি হয়। বিষয়টা সেখানেই নিষ্পত্তি হয় না। গাজী গোলাম মোস্তফা সশস্ত্র লোকজন নিয়ে ক্লাবে এসে ডালিম, ডালিমের স্ত্রী ও তাদের পরিবারের আরও কয়েকজনকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল।

অথচ জুড়ে দেওয়া হয়েছিল শেখ কামালের নাম! আসলে এসব রসালো গল্পের ব্যাপ্তি দ্রুত হবে জেনেই তৎকালীন প্রতিক্রিয়াশীল, প্রতিবিপ্লবী সংখ্যালঘুরা এমনটা করেছিল। কারণটাও পরিষ্কার ছিল। বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে হিসেবে শেখ কামাল যেভাবে মহীরুহ হয়ে উঠছিলেন, আলো ছড়াচ্ছিলেন, তাতে তাদের কুকর্মের পরিধি ছোট হয়ে আসছিল এবং ভবিষ্যৎ ছিল শঙ্কার মাঝে।

তবে ট্র্যাজেডি হলো, ২৬ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি যেভাবে মুক্তিযুদ্ধ, সংস্কৃতি এবং খেলাধুলাকে এগিয়ে নিয়েছেন, সেটাকে তাঁর সম্পর্কিত এক-দুটি মিথ্যাচারে ঢেকে ফেলার চেষ্টা চলে আসছে। যদিও এখন তথ্যের অবাধ প্রবাহ আছে। কাজেই তথ্যপ্রবাহের এই সময়ে কেউ যেন আবারও সেই পুরনো মিথ্যাচারগুলোকে গড্ডালিকা প্রবাহ বা নির্বোধ-নির্বুদ্ধিতার সঙ্গে ব্যবহার করতে না পারে সেদিকে সতর্ক থাকা জরুরি। পাশাপাশি প্রকৃত সত্যকে সবার কাছে পৌঁছানোর উদ্যোগ নিতে হবে আরও জোরালোভাবে।

লেখক: প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ

[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

মানুষগুলোর শূন্যতাই বিশৃঙ্খলার কারণ

মানুষগুলোর শূন্যতাই বিশৃঙ্খলার কারণ

উদ্যোক্তা-নির্ভর দেশ বিনির্মাণের পরিকল্পনা

উদ্যোক্তা-নির্ভর দেশ বিনির্মাণের পরিকল্পনা

শেখ হাসিনা: অজান্তের লড়াইটাও তাঁর

শেখ হাসিনা: অজান্তের লড়াইটাও তাঁর

ছবি সর্বস্ব বিনিয়োগ বা খ্যাতি রোগ

ছবি সর্বস্ব বিনিয়োগ বা খ্যাতি রোগ

মাস্ক, করোনা পরীক্ষা ও টিকা

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২১, ১৬:১৪
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা সরকারি ভাষায় বিধিনিষেধ, মিডিয়ার ভাষায় ‘লকডাউন কাল থেকে আবার বাড়ছে’। বাংলা ছোটগল্প সম্পর্কে বলা হয়, এমন কাহিনি যেন পাঠকের মনে হবে গল্পটা শেষ হয়েও হলো না। আমাদের এবারের লকডাউনটিকে বলা যায় শেষের আগেই শেষ হয়ে গেলো।

নিজের ভাষায় যা ছিল ‘কঠোর’ তাকে কোমল নয় শুধু, যেন হঠাৎ করে ভেঙে ফেললো সরকার নিজেই পোশাক কারখানার মালিকদের দাবি মেনে নিয়ে। একদিন আগেও কর্তাব্যক্তিরা বলেছেন, কোনোভাবেই ৫ আগস্টের আগে লকডাউন শিথিল হবে না, কোনও কারখানা খুলবে না। কিন্তু তারাই আবার ৩০ জুলাই বলে দিলো ১ আগস্ট থেকে কারখানা খোলা থাকবে। যা হওয়ার তাই হলো। লক্ষ লক্ষ মানুষ যার যার বাড়ি থেকে ছুটলো কারখানার দিকে। রাস্তায়, লঞ্চঘাটে, ফেরিঘাটে শুধু মানুষ আর মানুষ।

করোনা থেকে বাঁচতে প্রথম কথা– মুখে মাস্ক পরতে হবে এবং শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। কিন্তু আমরা যেন ভিড়ের মধ্যেই করোনাকে পরাস্ত করার জ্ঞান খুঁজে পেয়েছি।

সরকার পোশাক কারখানা মালিকদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলছে, এখন রফতানির পিক সিজন। কিন্তু জানতে ইচ্ছে করে এটা কি করোনাভাইরাস সংক্রমণেরও পিক সিজন নয়? বিধিনিষেধ চলার মাঝপথে একটি ব্যবসার কাছে এই নতি স্বীকার বেশ কিছু ভুল সংকেত দেয়:

১. পোশাক কারখানা খোলা এবং শ্রমিকদের সঙ্গে এই আচরণ মানুষকে ধারণা দেয়, দেশে মহামারি বলে কিছু নেই।  

২. সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যবিধি না মানলে সেটা মানতে বলার নৈতিক শক্তি আর থাকে না।

৩. চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা ১৭ মাস ধরে জীবন বাজি রেখে যে যুদ্ধটা করছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে পরিশ্রম করছেন– তাদের কাজের আর স্বীকৃতি থাকছে না।

৪. মানুষ ধারণা করতে পারে– সরকারের যেকোনও সিদ্ধান্ত বদলে দেওয়ার ক্ষমতা আছে ব্যবসায়ীরা তাদের নিজেদের স্বার্থে।

আমরা দেখেছি, ৩০ তারিখ সরকার-বিজিএমইএ সমঝোতার পরপরই  বিধিনিষেধ ভেঙে পড়ে। দোকানপাট খুলতে শুরু করে, গণপরিবহন না থাকলেও রাস্তায় বাড়তে থাকে যানবাহনের সংখ্যা। মোড়ে মোড়ে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। অনেকটা শিথিল হয়ে পড়েছে পুলিশের চেকপোস্টগুলো। তল্লাশি বা কাউকে বাসা থেকে বের হওয়ার কারণ জানতে চাওয়া হচ্ছে না। সাধারণ নাগরিকরা যেন বিধিনিষেধ বলে যে কিছু একটা ছিল সেটাই এবার মনে করতে পারছে না। অর্থনীতি গোষ্ঠীস্বার্থের যে মনোভাবকে পুষ্ট করতে চায়, করোনা অতিমারিতে সেটাই আরও একবার আমাদের সামনে নিয়ে এলো। তবে এ কথাও ঠিক যে, স্বার্থপরতার এই পরিমণ্ডলের মধ্যেও কিছু মানুষ করোনায় বিপদগ্রস্ত মানুষদের পাশে দাঁড়াতে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স, অক্সিজেন সিলিন্ডার বা ওষুধ নিয়ে দৌড়ে বেড়ায়।

লকডাউন কাল থেকে আরও পাঁচদিনের জন্য বাড়ানো হয়েছে অর্থাৎ চলবে ১০ আগস্ট পর্যন্ত। এরপর কোনও বিধিনিষেধ আর কার্যকর করা সরকারের পক্ষে সম্ভব হবে না। ১১ আগস্ট থেকে লকডাউন পর্বের ইতি টানতে হবে বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু করোনা শেষ হবে না। প্রতিদিন ২০০’র ওপর মৃত্যু, সংক্রমণের হার ৩০ শতাংশ থেকে নামার কোনও লক্ষণ নেই। তবু প্রমাণ করার চেষ্টা করছি আমরা করোনার চেয়ে শক্তিশালী। অতিমারি মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা পদে পদে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। শুরুর দিন থেকে দূরত্ববিধির কথা বলে আসছে, অন্যদিকে মানুষের ভিড়কে বিভিন্ন উৎসব ছুটির সময় অনুমোদন দিয়েছে। যারা করোনা সুরক্ষাবিধির কথা বলে, তারাই বিধি ভাঙার দৃষ্টান্ত তৈরি করছে।

ভারতের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের দাপটে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বলতে গেলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। হাসপাতালে আর সিট নেই, আইসিইউ বা অক্সিজেন ফ্লো-তো অনেক দূরের কথা। বিধিনিষেধ যেহেতু সরকার নিজেই কার্যকর করতে পারছে না, তাহলে করণীয় কী সেটাই এখন ভাবার বিষয়। সরকার টিকার ওপর জোর দিচ্ছে এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন এটা করতেই হবে। জনস্বাস্থ্যের বিধিগুলো গোল্লায় যেহেতু গেছে, একটা কৌশল তো ঠিক করতেই হবে বিপদের মুখে করোনাবিধি মেনে চলার বিষয়টি কীভাবে নিশ্চিত করা যায় সেটা নিয়ে।

সবাই বলছে মানুষ করোনাবিধি মানছে না। কিন্তু মানুষ কেন করোনাবিধি অগ্রাহ্য করছে, তার সম্ভাব্য কারণ কী হতে পারে তা ভেবে দেখা দরকার। একটা কথা কিন্তু মানতেই হবে, গত ১৭ মাস ধরে এই ভাইরাস বাংলাদেশে আছে এবং গ্রাম-শহর নির্বিশেষে দেশের বেশিরভাগ মানুষ কোভিড-১৯-এর সুরক্ষাবিধি ও সাধারণ উপসর্গগুলো সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। এই রোগটি যে একটি সংক্রামক রোগ এবং মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়, তাও বেশিরভাগ মানুষ জানেন। কিন্তু তারপরও করোনা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে মানুষের অনীহা থেকে এটা স্পষ্ট যে, শুধু রোগের উপসর্গ বা সুরক্ষাবিধি সম্পর্কে মানুষের ধারণাই যথেষ্ট নয়। মানুষ তথ্য জানে, কিন্তু ঠিক বার্তাটি পায়নি। করোনা মোকাবিলায় সরকারি প্রচেষ্টার বিশ্বাসযোগ্যতা কার্যত গড়েই ওঠেনি। বিভিন্ন উদ্ভট কাণ্ডকারখানা থেকে মানুষ তার নিজের মতো করে করোনার বিপদ সম্পর্কে, তার থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার উপায় সম্পর্কে ধারণা করে নিয়েছে, যেখানে সবার কোনও স্থান নেই, অন্যের বিপদ সম্পর্কে কোনও ভাবনা নেই। বেঁচে থাকার দৈনন্দিন লড়াই ব্যক্তিগতভাবে চালাতে গিয়ে সবার কথা ভাববার চিন্তা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

প্রতিদিন শত শত মানুষের মৃত্যু সংবাদ পাচ্ছে মানুষ। করোনা উপসর্গে মারা যাচ্ছে তার চেয়েও বেশি। কিন্তু খুব ভাবনার বিষয় এই যে, অতিমারি বা মহামারির কথা বললে আমাদের মাথায় সাধারণভাবে যে ভয়াবহতার চিত্র আসে, করোনা সেই ভয়াবহতা তৈরি করেনি। একটা কারণ হলো, এই রোগে উপসর্গহীন রোগীর সংখ্যা বেশি। সংক্রমিত মানুষ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বুঝতেই পারে না তার ভেতর অসুখটা আছে। ফলে সেই রোগটাকে মানুষ খুব বিপজ্জনক বলে মেনে নেবেন, এমনটা স্বাভাবিক নয়।

মানুষের এই মনোভাব, বিধিনিষেধ ঠিকভাবে বাস্তবায়নে সরকারের ব্যর্থতা, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল। সরকার বললেই মানুষ সুরক্ষাবিধি মেনে চলবে না। তাকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এবং সেটার সময় আসলে অনেকটাই চলে গেছে। তবে দেরিতে হলেও শুরু করা যায় আমাদের বিশাল স্থানীয় সরকার কাঠামোকে যুক্ত করে। এখন একটা মালা গাঁথতে হবেই এবং সেটি  হলো: মাস্ক -করোনা পরীক্ষা-টিকা। সবাইকে মাস্ক পরাতে হবে, বেশি করে পরীক্ষা করতে হবে এবং দ্রুততম সময়ে গণটিকা কার্যক্রম শুরু করতে হবে।


লেখক: সাংবাদিক
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

ঘটনা সত্য এবং ক্ষতি সামান্য নয়

ঘটনা সত্য এবং ক্ষতি সামান্য নয়

করোনার উৎসব

করোনার উৎসব

আগুন লাগাই স্বাভাবিক

আগুন লাগাই স্বাভাবিক

মহামারি ছড়াচ্ছে দ্রুত অথচ প্রচেষ্টার গতি কম

মহামারি ছড়াচ্ছে দ্রুত অথচ প্রচেষ্টার গতি কম

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

সিসিএবির মোবাইল ফোন ভিত্তিক সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ

সিসিএবির মোবাইল ফোন ভিত্তিক সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ

তথ্য প্রকাশে এনজিও’র চেয়ে সরকারি সংস্থা এগিয়ে: টিআইবি

তথ্য প্রকাশে এনজিও’র চেয়ে সরকারি সংস্থা এগিয়ে: টিআইবি

পরীমনির বাসায় নিয়মিত পার্টিতে মাদক সরবরাহ করতেন রাজ

পরীমনির বাসায় নিয়মিত পার্টিতে মাদক সরবরাহ করতেন রাজ

অক্সিজেনের অভাবে অক্সিজেন ব্যবসায়ীর মৃত্যু

অক্সিজেনের অভাবে অক্সিজেন ব্যবসায়ীর মৃত্যু

আফগান ইস্যুতে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র, চীন, পাকিস্তানকে আমন্ত্রণ রাশিয়ার, বাদ ভারত

আফগান ইস্যুতে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র, চীন, পাকিস্তানকে আমন্ত্রণ রাশিয়ার, বাদ ভারত

ঢাবি উপাচার্যকে মার্কিন দূতাবাসের অভিনন্দন

ঢাবি উপাচার্যকে মার্কিন দূতাবাসের অভিনন্দন

সব রেকর্ড ভেঙে করোনায় একদিনে ২৬৪ জনের মৃত্যু

সব রেকর্ড ভেঙে করোনায় একদিনে ২৬৪ জনের মৃত্যু

ভারতকে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করতে দেওয়া হয়নি: মরিশাস

ভারতকে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করতে দেওয়া হয়নি: মরিশাস

আকবরের কাছে এই পুরস্কার গর্বের, অনুপ্রেরণার

শেখ কামাল ক্রীড়া পুরস্কারআকবরের কাছে এই পুরস্কার গর্বের, অনুপ্রেরণার

প্যানেল মেয়রের কারখানায় কাঠমিস্ত্রির লাশ

প্যানেল মেয়রের কারখানায় কাঠমিস্ত্রির লাশ

মডেল পিয়াসার দুই সহযোগী মিশু ও জিসান রিমান্ডে

মডেল পিয়াসার দুই সহযোগী মিশু ও জিসান রিমান্ডে

নিশিতার কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুকে হারানোর শোক

নিশিতার কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুকে হারানোর শোক

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune