X
সোমবার, ২৫ অক্টোবর ২০২১, ৯ কার্তিক ১৪২৮

সেকশনস

হেফাজতি ভাইরাস এবং মামুনুলে বিশ্বাস

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২১, ১৬:৪৫

আনিস আলমগীর ডেটিং ঠিক করার আগে মামুনুল হককে ফোনে মহিলাটি প্রশ্ন করছেন, ‘ফুর্তিতে আছেন মনে হইতাছে? এত ঝামেলার মধ্যে এত রস আহে কোত্থেকে?’ ঝামেলা যে ছিল সেটা দেশবাসীও দেখেছে। নরেন্দ্র মোদির ঢাকা আগমনের বিরোধিতা করে টানা আন্দোলন করেছেন হেফাজত নেতা মামুনুল হকরা। ২৬ মার্চ থেকে টানা তিনদিন দেশে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছেন, কমপক্ষে ১৪ জন সমর্থকের প্রাণ ঝরিয়েছেন এবং সর্বশেষ ২ এপ্রিল এই হত্যার প্রতিবাদে বায়তুল মোকাররমে জুমা শেষের সমাবেশে গরম বক্তৃতা দিয়ে পরদিন তিনি প্রেমিকাকে নিয়ে সোনারগাঁয়ে এক রিসোর্টে অভিসারে গিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী এ ঘটনার উদাহরণ টেনে ৪ এপ্রিল ২০২০ সংসদে হেফাজত নেতা মামুনুল হক সম্পর্কে যথার্থই বলেছেন, ‘জ্বালাও-পোড়াও করে তিনি বিনোদন করতে গেলেন একটি রিসোর্টে, একজন সুন্দরী মহিলা নিয়ে।’ তার ভাষায়, শনিবার মামুনুল হক ‘অপবিত্র কাজ করে সোনারগাঁয়ের রিসোর্টে’ ধরা পড়েছেন।

ব্যক্তিগতভাবে দুটি প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের সম্মত-সম্পর্ক নিয়ে আমার কোনও মাথাব্যথা নেই, যদি না এদের সংশ্লিষ্ট কেউ সেটা নিয়ে অভিযোগ তোলেন। কিন্তু মামুনুল হকের ব্যাপারে মাথা ঘামাতে হয়। কারণ, তিনি অতি সাধারণ মানুষ না, একজন ধর্মীয় রাজনৈতিক নেতা। ইসলামি আন্দোলনের নেতা। তার অপকর্ম ধর্মের গায়ে লাগে, লাগে ওই ধর্মে বিশ্বাসী লক্ষ কোটি মানুষের গায়েও। আল্লাহ আছে কী নেই সেটা নিয়ে যখন ভোট করা যায় না, তখন ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের রাজনীতিতে ধর্মও চলে না। মামুনুল হকরা সেটা বুঝে না বুঝে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করতে গিয়ে ধর্মকে কলুষিত করছেন দীর্ঘদিন থেকে। তাদের চরিত্র দিয়ে ধর্মের গায়ে দুশ্চরিত্রের কলঙ্ক লাগাচ্ছেন।

মাত্র পড়া শেষ করেছি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে পাকিস্তানি এক লেখিকার উপন্যাস (Of Martyrs and Marigolds by Aquila Ismail)। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো এবং ৬০-এর দশকের পূর্ব পাকিস্তানের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং এখানকার মানুষের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়নমূলক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়েছে ইতিহাসনির্ভর এই উপন্যাসে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসগুলো একতরফা কিন্তু এই বইটি ইতিহাসকে উল্টো চোখে দেখতেও শেখায়। উপন্যাসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংসতার সঙ্গে আরেকটি বেদনার দিক ছিল এই দেশে বাস করা উর্দুভাষী মানুষগুলোর পরিণতির দিকটি। ১৯৪৭ সালে তারা ভারত থেকে এখানে এসেছেন, এই দেশকে নিজের দেশ মনে করে।

দেশ ভাগের পর তারা এই অধিকারটুকু পায়নি, তাদের মতামত নেওয়া হয়নি যে যারা বাংলাদেশে থাকতে চায় তারা এখানে থাকতে পারবে কিনা? কারণ, এই দেশটি তো তাদেরও ছিল। গড়ে তাদের আমরা বিহারি বানিয়ে বাসস্থানহীন করেছি, পাকিস্তানি সেনাদের বাঙালি হত্যার প্রতিশোধ নিতে উর্দুভাষী নিরীহ লোকদেরও হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতন করেছি। হোক সেটা পরিমাণে কম। উর্দুভাষীরা সবাই ধোয়া তুলসি পাতা ছিল তা নয়, সেনাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাদের অনেকেও বাঙালি নিধন করেছে নয় মাসজুড়ে। আর তাদের ভুল পথে পরিচালনা করার জন্য দায়ী ছিল তথাকথিত ইসলামি নেতারা, বিশেষ করে গোলাম আযমসহ জামায়াতে ইসলামী দলটির নেতারা। তারাই সৃষ্টি করেছে আলবদর, আলশামস নামের জল্লাদ বাহিনী। এমনকি, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৭২-এর ফেব্রুয়ারি মাসে জামাতিরা মিরপুরের উর্দুভাষী এলাকায় উর্দুভাষীদের নিয়ে অস্ত্র, পাকিস্তানি পতাকা উঁচিয়ে পাকিস্তানের নামে স্লোগান দিয়েছে।

পরিণতিতে সব উর্দুভাষীরা হয়ে গেছে গৃহচ্যুত বিহারি, সবাই হয়ে গেছে পাকিস্তানি দালাল। এই দেশকে ভালোবেসে অনেকে এই মাটিতে থাকতে চাইলেও উর্দু তাদের মাতৃভাষা এই অপরাধে ছাড়তে হয়েছে বাংলাদেশ। যারা যেতে পারেনি, দখলদারদের কাছ থেকে বাড়ি ফেরত পায়নি, তাদের স্থান হয়েছে রিফিউজি ক্যাম্পে। এখনও কয়েক লক্ষ উর্দুভাষী বিহারি নামেই ক্যাম্পে জীবনযাপন করছে, যদিও তাদের সবাই বিহার থেকে আসেনি। আর বাংলা মাতৃভাষা বলে একই দোষে অভিযুক্ত হয়েও জামাতিরা রয়ে গেছে এই দেশে। কেউ তাদের দেশছাড়া করার কথা বলেনি।

হেফাজতিরা অতি সম্প্রতি টানা তিন দিন যা করেছে এবং করোনার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য অপসারণ আন্দোলন, নরেন্দ্র মোদির সফরের বিরোধিতা বা তারও আগে সংগঠনটির জন্মের গোড়ার দিকে ৫ মে ২০১৩ ঢাকার মতিঝিলে যে তাণ্ডব চালিয়েছে, সবকিছুতে মাদ্রাসার ছাত্রদের হাতিয়ার করে মামুনুলরা যা করছেন, তাতে আমার মনে হয়েছে তারা ১৯৭১ সালের সেই জামাতিদের প্রতিনিধি, যারা নিরীহ উর্দুভাষীদের উসকানি দিয়ে বিপদে ফেলে পালিয়েছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই মানুষকে ধর্মের নামে ধোঁকা দেওয়া, মিথ্যা ফতোয়া জারি, হিন্দু-মুসলিম বিদ্বেষ ছড়ানোই ছিল এদের কাজ। মানুষের বিপদে এরা কখনই থাকে না, বরং অনুসারীদের বিপদে ফেলে এরা পালায় এবং বিনোদন করতে রিসোর্টে যায়।

মামুনুল হক লাশ নিয়ে রাজনীতি করেছেন কিন্তু মৃতদের স্বজনকে সমবেদনা জানাতে তাদের বাড়ি যাননি। জানি না কেন তারা সমবেদনা জানাতে যাননি সেসব তরুণদের পরিবারের সদস্যদের, যাদের তারা অকারণে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছেন, তাদের দিয়ে মানুষের বাড়ি পুড়িয়েছেন, গাড়ি পুড়িয়েছেন, সরকারের সম্পত্তি পুড়িয়েছেন, ধ্বংস করেছেন নানা স্থাপনা, আক্রমণ করেছেন থানা। এমনকি স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির দিনে জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে খুনতি-কুড়াল দিয়ে আঘাত করে তার ম্যুরাল নষ্ট করেছে। বাংলাদেশের ৫০ বছর পূর্তির স্বাধীনতা দিবসে, একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে হায়নাদের প্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্ব নিয়েছেন মামুনুল হকরা?

পুরো রাষ্ট্র আজ করোনাভাইরাসের সঙ্গে হেফাজতি ভাইরাসেও যে আক্রান্ত, সেটা আবার বুঝা গেলো মামুনুল হকের রিসোর্ট অভিসারের পর। যারা এটা বিশ্বাস করতে পারছেন না যে মামুনুল হক এমন কাজ করতে পারেন তারাই ‘হেফাজতি ভাইরাসে’ আক্রান্ত। একের পর এক টেলিফোন ফাঁসে মামুনুল ফেঁসে গেলেও, সবকিছু পরিষ্কার হলেও, তিনি ভুল করতে পারেন এটা বিশ্বাস করতে পারছে না তার অনুসারীরা। ধর্মের ওপর অন্ধ বিশ্বাস রাখা যায়, ধর্ম নিয়ে যুক্তি-তর্ক চলে না, ধর্ম বিশ্বাস এমনই। কিন্তু ধর্মের সঙ্গে ধর্মীয় রাজনৈতিক নেতাদের ওপরও অন্ধ বিশ্বাস স্থাপনই হচ্ছে ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া।

হেফাজতি ভাইরাসে আক্রান্ত মামুনুল হকের অনুসারীদের মূর্খতা তাদের এমন পর্যায়ে নামিয়েছে যে মামুনুল নিজে ফাঁস হওয়া টেলিফোন নিয়ে চ্যালেঞ্জ করার সাহস না পেলেও তারা করছে। মামুনুলের স্ত্রী, পরিবারের সদস্যরা তার দ্বিতীয় বিয়ে সম্পর্ক না জানলেও এরা জেনেছে। কথিত দ্বিতীয় স্ত্রীর পুলিশে দেওয়া বয়ান নিয়ে তার মা-বাবা, সন্তানের সন্দেহ না থাকলেও এদের কাছে মনে হচ্ছে এটা সরকারের চাল। সন্তানের সঙ্গে মায়ের সংলাপ, সন্তানের ভিডিও ম্যাসেজ এদের মনে হয় এডিট করা।

ভাইরাসে আক্রান্তরা বুঝতে পারছে না যে মামুনুল হক একজন মিথ্যাবাদী, এটা জাতির কাছে তিনি নিজেই প্রমাণ দিয়েছেন। ওই মহিলা যে তার স্ত্রী তা নিয়ে প্রমাণিক দলিল না থাকলেও, দুনিয়ার কেউ না জানলেও, ধরে নিলাম তারা বিয়ে করেছেন। কিন্তু মামুনুল হক সমবেত লোকজনের কাছে, হোটেলের রেজিস্টারে মহিলাটির নাম তার আসল স্ত্রীর নাম বলেছেন, স্ত্রীকে এই ঘটনায় মিথ্যা বলার পরামর্শ দিয়েছেন, সেখানে কি তাকে একজন ধর্মীয় নেতা হিসেবে গণ্য করা যায়? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তো যথার্থই প্রশ্ন তুলেছেন, ‘যারা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস করে, এ রকম মিথ্যা কথা তারা বলতে পারে? অসত্য কথা বলতে পারে? যারা মিথ্যা বলতে পারে, তারা কী ধর্ম পালন করবে? মানুষকে কী ধর্ম শেখাবে?’

প্রশ্ন হচ্ছে, করোনাভাইরাসের টিকা চলমান আছে, হেফাজতি ভাইরাস তাড়ানোর টিকা সরকার কবে শুরু করবে?

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

[email protected]

 

 

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া না যাওয়া

৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া না যাওয়া

দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন তৃণমূলে সন্ত্রাস-দুর্নীতি বাড়িয়েছে

দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন তৃণমূলে সন্ত্রাস-দুর্নীতি বাড়িয়েছে

মিডিয়ার সংকট এবং বিদেশি টিভি চ্যানেল

মিডিয়ার সংকট এবং বিদেশি টিভি চ্যানেল

রোহিঙ্গা ইস্যুতে কূটনৈতিক তৎপরতা হতাশার

রোহিঙ্গা ইস্যুতে কূটনৈতিক তৎপরতা হতাশার

বসুরহাট ও গাজীপুরের মেয়র দেশটাকে কী মনে করেন?

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২১, ১৭:২০

ডা. জাহেদ উর রহমান গাজীপুরের মেয়র এবং গাজীপুর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম ‘ঝামেলা’য় পড়েছেন। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে থেকে জানা যায়, তিনি এক ঘরোয়া আলোচনায় দলের শৃঙ্খলাবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। এর জেরে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে আওয়ামী লীগ। এর কিছু দিন আগে তার ঘটানো আরেকটি কাণ্ডের জন্য জনাব জাহাঙ্গীরের আরও শক্ত কারণ দর্শানোর নোটিশ পাওয়া উচিত ছিল দলের পক্ষ থেকে, কিন্তু পাননি। বর্তমান বাংলাদেশে সেটা হবে এমন প্রত্যাশা করার মতো বোকা আমি নই। সে বিষয়টা জানার আগে জেনে নেওয়া যাক একই ধরনের আরেকটি ঘটনার কথা।

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা, যিনি ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদকের ভাই, অনেক দিন থেকেই নানা আলোচনা-সমালোচনায় আছেন। নানা বক্তব্য আর কাণ্ডকীর্তির কারণে মিডিয়ায় সংবাদ হন নিয়মিত। কিছু দিন আগের একটা সংবাদ মিডিয়ার বেশি মনোযোগ না পেলেও আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে।

গত মাসে কোম্পানীগঞ্জের ‘হুমায়ুন টিম্বার মার্সেন্ট অ্যান্ড স মিল’ নামের প্রতিষ্ঠানটি খাসজমিতে করা হয়েছে দাবি করে কাদের মির্জার লোকজন কারখানাটি জোর করে উচ্ছেদ করে ‘শিশুপার্কের জন্য নির্ধারিত স্থান’ লেখা সংবলিত একটি সাইনবোর্ড টানিয়ে দেন।

জমির মালিক জানান, এর আগে জমি খাস দাবি করে সেখান থেকে তার স্থাপনা সরানোর আদেশ দেন জনাব কাদের মির্জা। আদেশের বিরুদ্ধে তারা জেলা জজ আদালতে গত ২৫ মার্চ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। আদালত মামলা আমলে নিয়ে বিরোধপূর্ণ ভূমিতে বিবাদী পক্ষের প্রবেশে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

এই ভূমিতে আদালতের নিষেধাজ্ঞা ছিল তার প্রমাণ আছে। এই ঘটনা প্রসঙ্গে কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, তাকে প্রতিষ্ঠানটির মালিক ফোনে ঘটনাটি জানানোর পর তিনি পুলিশ পাঠিয়ে মেয়রকে আদালতের নিষেধাজ্ঞার বার্তাটি পৌঁছান। এরপর পুলিশ সেখান থেকে চলে আসে। অর্থাৎ ওসি নিশ্চিত করেছেন, এই জমিতে আদালতের নিষেধাজ্ঞা ছিল। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, তিনি মেয়রের লোকজনকে বাধা না দিয়ে নিষেধাজ্ঞার বার্তা পৌঁছে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেন।

যে পত্রিকাটি এই রিপোর্টে করেছে তারা জানায়, নানাভাবে চেষ্টা করেও তারা জনাব কাদের মির্জা সাথে যোগাযোগ করতে পারেননি, তাই এই ব্যাপারে তার বক্তব্য জানা যায়নি। অর্থাৎ মিডিয়ার প্রশ্নের সামনে পড়ে জবাব দেওয়ার ‘সাহস’ জনাব কাদের মির্জার ছিল না। ঠিক এই জায়গায় গাজীপুরের মেয়র আবার অনেক বেশি সাহসী, আগ্রাসী।

গাজীপুর সিটি করপোরেশন (জিসিসি)-এর অধীনে ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে গৃহীত দুটি প্রকল্পের অধীনে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার রাস্তা প্রশস্তকরণ এবং ড্রেন ও ফুটপাত নির্মাণের কাজ চলছে।

ভূমি অধিগ্রহণ না করেই চলতি বছরের শুরুতে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা হয় নিজেরাই বিভিন্ন স্থাপনা ভেঙে দিয়েছে, না হয় মালিকদের যার যার আবাসিক ভবন, কারখানা, দোকান বা সীমানা প্রাচীর আংশিকভাবে ভাঙতে বাধ্য করেছে। 

তবে, বেশিরভাগ বাসিন্দাই কোনও ক্ষতিপূরণ পাননি। উল্টো নিজেদের জমিতে সিটি করপোরেশনের ফেলে যাওয়া ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করতে শ্রমিক নিয়োগ করতে হয়েছে অনেককে। এছাড়া, ব্যক্তিগত জমির কয়েকশ’ গাছও কেটে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

অবশ্য গাজীপুর সিটি করপোরেশনের (জিসিসি) দাবি, এই প্রকল্প দুটিতে ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোনও বিধান নেই। ক্ষতিপূরণ ছাড়া ব্যক্তির সম্পত্তি দখল নিয়ে রাষ্ট্রীয় আইন ভাঙা হয়েছে। শুধু সেটাই নয়, এখানে ঘটেছে আরও বড় ঘটনা– লঙ্ঘন করা হয়েছে দেশের হাইকোর্টের রায়ও।

কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে হাইকোর্টের স্থিতাবস্থা ছিল, কিন্তু ভাঙা হয়েছে সেগুলোও। ঘটনার পরপরই ভুক্তভোগী কোম্পানি কোনাবাড়ী থানায় মামলা করতে যান। কিন্তু পুলিশ মামলা বা সাধারণ ডায়েরি নেয়নি। পরে তার কোম্পানি গাজীপুর আদালতে মামলা করে।

বসুরহাট পৌরসভার ঘটনাটিতে জনাব কাদের মির্জাকে চেষ্টা করেও ফোনে পাওয়া যায়নি। ভিন্ন নম্বর থেকে পাওয়া গেলেও সেই পত্রিকার পরিচয় পাবার পর ফোন কেটে দেন তিনি। মিডিয়াকে ফেইস করার ‘সাহস’ পাননি তিনি। কিন্তু গাজীপুরের মেয়র এসব ব্যাপার থোড়াই কেয়ার করেন। ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মেয়র সাফ জানিয়ে দেন, ‘আপনি যদি সরকারি আইন মেনে চলেন, তাহলে এখানে কিছু করতে পারবেন না।’

আবার একটু মনে করে নিই, বসুরহাটের ঘটনাটিতে পুলিশ আদালতের রায় কাদের মির্জার লোকজনের কাছে পৌঁছে দিয়ে ফিরে চলে এসেছিল। অথচ কথা ছিল আদালতের রায় অনুযায়ী প্রয়োজনে বল প্রয়োগ করে কাদের মির্জার লোকজনকে থামানো এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা। আর গাজীপুরে পুলিশ মামলা নেয়নি ভুক্তভোগীদের।

‘মগের মুল্লুকে’র সাথে একটা আধুনিক রাষ্ট্রের পার্থক্য হচ্ছে, আধুনিক রাষ্ট্র কতগুলো আইন দ্বারা পরিচালিত হয় এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক সেই আইন মেনে চলতে বাধ্য। আইনভঙ্গ হওয়াজনিত কারণে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে সে আদালতে যাবে এবং আদালত যদি তার পক্ষে রায় দেয় তাহলে রাষ্ট্রের প্রশাসন বিভাগের অবশ্য কর্তব্য হবে আদালতের রায় অক্ষরে অক্ষরে পালন করা।

একটা রাষ্ট্রের ক্ষমতাবান মানুষ দুর্বল মানুষের ওপর, এমনকি রাষ্ট্রও কখনও নাগরিকের ওপর নিষ্পেষণ চালাতে পারে। এমন ক্ষেত্রে বিচার বিভাগই পারে হুমকির মুখে থাকা নাগরিকদের রক্ষা করতে। তাই এই রাষ্ট্রকে সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক এবং জনগণের জন্য কল্যাণকর একটি রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে গেলে বিচার বিভাগেরও আমূল সংস্কার করতে হবে, কোনও সন্দেহ নেই এতে।

কিন্তু সবকিছুর পরও বিচার বিভাগের সংবিধান স্বীকৃত ক্ষমতায় অসাংবিধানিক/বেআইনি কোনও চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। অথচ এই দেশে দায়িত্বপূর্ণ পদে থেকে এক মেয়র আদালতকে ‘থোড়াই কেয়ার’ করে তার বিরুদ্ধাচরণ করেন আর আরেক মেয়র একই কাজ করার পর আবার বড় গলায় ঘোষণা করেন সরকারি আইন তিনি মানবেন না।

দুই মেয়র এই দেশটাকে কী মনে করছেন? যেটাই মনে করেন না কেন, তাদের বিরাট লাভ হতে পারে– কারণ এর ফলে তারা আইন-কানুন, রীতি-নীতি সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে করতে পারে যা খুশি তা। কিন্তু আমরা সাধারণ নাগরিকরা কেন মেনে নেবো সেটা? কেন আমরা এই দুটি ভয়ংকর ঘটনাকে ছোট বিষয় বলে মনে করবো?

লেখক: শিক্ষক ও অ্যাকটিভিস্ট

 

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

সরকারি কর্মকর্তাদের কী নামে সম্বোধন করা হবে?

সরকারি কর্মকর্তাদের কী নামে সম্বোধন করা হবে?

প্রতিটি আত্মহত্যায় দায় আছে আপনার-আমার

প্রতিটি আত্মহত্যায় দায় আছে আপনার-আমার

দরিদ্র মৃত্যুপথযাত্রী ছাত্র যদি ‘মেধাবী’ না হয়?

দরিদ্র মৃত্যুপথযাত্রী ছাত্র যদি ‘মেধাবী’ না হয়?

পরীমণি’র মুক্তির আন্দোলন কি কেবলই ‘স্টান্টবাজি’?

পরীমণি’র মুক্তির আন্দোলন কি কেবলই ‘স্টান্টবাজি’?

এই আগুনের পেছনে কে?

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২১, ১৭:১৪

আমীন আল রশীদ এই লেখাটি যারা পড়ছেন, তাদের কাছে প্রশ্ন: ধরা যাক আপনি শুনতে পেলেন আপনার এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনও একজন লোক ফেসবুকে ইসলাম সম্পর্কে খারাপ কথা লিখেছেন। আপনি কি লাঠিসোঁটা আর আগুন নিয়ে ওই লোকের বসতবাড়িতে গিয়ে হামলা চালাবেন? ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেবেন? পিটিয়ে মানুষ মেরে ফেলবেন? সহজ উত্তর হচ্ছে– না। কারণ, একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আপনি এতটা হিংস্র বা উগ্র নন। আপনি জন্মের পর থেকে যাদের সঙ্গে একই আলো-হাওয়া, একই পানি ও জলে বেড়ে উঠেছেন, কথিত ধর্ম অবমাননার গুজবে আপনি তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিতে পারেন না। এটা আপনি করেননি। যদি না করেন তাহলে কুমিল্লার মন্দিরে কে কোরআন  নিয়ে গেলো এবং সেই সংবাদ বা গুজবে কারা পরবর্তীতে ওই মন্দিরে হামলা চালালো? কুমিল্লার এই আগুন কী করে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে গেলো? রংপুরের পীরগঞ্জে কারা উসকানি দিলো এবং কারা গিয়ে পুরো পল্লিটি জ্বালিয়ে দিলো?

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বরাবরই অসাম্প্রদায়িক। হাজার বছর ধরে এই ভূখণ্ডে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। কিন্তু তারপরও দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক উসকানি, মন্দিরে আগুন, প্রতিমা ভাঙচুর, হিন্দুদের কথিত ‘সংখ্যালঘু’ তকমা দিয়ে তাদের জায়গা-জমি দখল করে দেশছাড়া করার মতো ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের আগে এবং নির্বাচনের পরে এরকম অনাকাঙ্ক্ষিত যেসব ঘটনা ঘটেছে—সেখানে সাধারণ হিন্দু-মুসলমানের কোনও দায় ছিল না। এর নেপথ্যে বরাবরই কাজ করে ভোটের রাজনীতি। কখনও ব্যক্তিগত বিরোধও রাজনীতির মোড়কে রঙ পাল্টায়। কখনও এসব ঘটনার পেছনে থাকে ভূ-রাজনীতি। থাকে এই অঞ্চলের শক্তিমান রাষ্ট্রগুলোর নানা স্বার্থ। কিন্তু প্রশ্ন হলো,  অতীতে যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেসব ঘটনার মূল হোতাদের কি চিহ্নিত করে বিচার করা গেছে? নাকি প্রতিটি ঘটনাই রাজনীতির মারপ্যাঁচে হারিয়ে গেছে? মাঝখানে প্রাণ গেছে কিছু নিরীহ মানুষের। অনেক সময় কিছু রাজনৈতিক নেতাকর্মীও ভিকটিম হয়েছেন—যাদের সবাই হয়তো প্রকৃত অপরাধী নন।

দুর্ভাগ্যের বিষয়, যখনই এ রকম ঘটনা ঘটে, বিশেষ করে মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুর বা কথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটে, তখন দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক পক্ষ পৌনঃপুনিকভাবে একইরকম কথাবার্তা বলে। কম্পিউটারের প্রোগ্রামিংয়ের মতো তাদের বক্তব্যও নির্ধারিত। ঘটনা যাই ঘটুক, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের কোনও ব্যত্যয় হয় না। এবারও তা-ই।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অভিযোগ, এর পেছনে উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী তথা তাদের ভাষায় বিএনপি-জামায়াতের লোকজন জড়িত। তারাই দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে রাজনৈতিক ফায়দা নিতে চায়। পক্ষান্তরে বিএনপির দাবি, সরকার তাদের লাগামহীন অনিয়ম-দুর্নীতি-লুটপাট থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। মধ্যপন্থীদের অনেকে মনে করেন, এটা বিদেশি কোনও রাষ্ট্রের উসকানি। কেউ কেউ মনে করেন, বিশ্বব্যাপী যে ধর্মীয় উগ্রবাদ বিস্তৃত হচ্ছে, তারই প্রতিফলন।

অস্বীকার করার উপায় নেই, ভূ-প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর জায়গায় অবস্থান করছে। বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি কেবলই পানের অযোগ্য লবণাক্ত জলের আধার নয়। বরং এর নিচে রয়েছে বিশাল সম্পদ। ব্লু ইকোনমির বিরাট সম্ভাবনা। বাংলাদেশের রয়েছে ১৭ কোটি লোকের বাজার। বাংলাদেশ এখন উপভোগ করছে পপুলেশন ডিভিডেন্টের সুবিধা—অর্থাৎ দেশের বিরাট জনগোষ্ঠী যখন তরুণ-উদ্যমী-শক্তিশালী-সাহসী—যে সুযোগ কোনও একটি জাতির জীবনে শত বছরেও আসে না এবং যে সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে; উদযাপন করছে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী; করোনার অতিমারিতে বিশ্বের অনেক শক্তিশালী অর্থনীতির দেশও যখন বিপর্যস্ত, তখন বাংলাদেশ যে বিশাল জনগোষ্ঠীর চাপ নিয়েও দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে—এসব সফলতা অনেকেরই হয়তো মন খারাপের কারণ হতে পারে।

সুতরাং কে কোথা থেকে কোন উদ্দেশ্যে কলকাঠি নাড়ছে তা বোঝা মুশকিল। তবে বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে কোনও রাষ্ট্রের সঙ্গে অনেক বেশি যুক্ত হয়ে যাচ্ছে এবং তার সঙ্গে এই অঞ্চলের অন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর রসায়ন কেমন—এটিও ভাবনার বাইরে রাখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ স্থিতিশীল থাকলে; অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যেতে থাকলে; নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো বিশাল অবকাঠামো নির্মাণের স্পর্ধা দেখাতে পারলে যদি কারও মন খারাপ হয়—তখন তারা বাংলাদেশের সেই স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করার চেষ্টা করতে পারে। তাদের সেই অর্থ-লোকবল ও কৌশল আছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ শান্ত থাকলে যদি কারও মন খারাপ হয়; কেউ যদি মনে করে যে বাংলাদেশ খারাপ থাকলেই তার ভালো—তাহলে গতকাল রামু, আজ কুমিল্লা, কাল পীরগঞ্জ—চলতেই থাকবে। সুতরাং বাংলাদেশ যদি সত্যিই কারও মন খারাপের বলি হয়ে থাকে, এবং ব্যক্তি-গোষ্ঠী-দল বা রাষ্ট্রকে চিহ্নিত করা না যায়—তাহলে এই আগুন সহজে নিভবে না।
মনে রাখা দরকার, কারণ সাধারণ মানুষ বরাবরই অসাম্প্রদায়িক। তারা তাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থের অবমাননা করে না। কোনও সাধারণ মুসলমান মন্দিরে কোরআন শরিফ রেখে আসে না। কোনও সাধারণ হিন্দু মন্দিরে কোরআন শরিফ নিয়ে তাদের মূর্তির পায়ের নিচে রাখে না। বরং এই কাজগুলো করেন ‘অসাধারণরা’। সেই ‘অসাধারণ’দের চেনা দরকার এবং তাদের সম্পর্কে সজাগ থাকা দরকার।

কেউ যদি ধর্মের মতো স্পর্শকাতর ইস্যু নিয়ে মানুষকে বিভক্ত করে ভোটের রাজনীতি করতে চায়—তাহলে তাদের প্রতিহত করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হচ্ছে সব ধর্মের সাধারণ মানুষের মধ্যে ঐক্য। সোশ্যাল মিডিয়ায় সৃষ্টিকর্তা, ধর্ম, ধর্মীয় গ্রন্থ বা ধর্মের অবতারের কথিত অবমাননার গুজব উঠলেই লাঠিসোঁটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে ভাবতে হবে, আপনি কার মন্দিরে আগুন দিচ্ছেন? আপনি কার বাড়িঘরে হামলা চালাচ্ছেন? আপনি কাকে পিটিয়ে মেরে ফেলছেন? সে তো আপনারই প্রতিবেশী। আপনি কেন অন্যের রাজনীতির ঘুঁটি হচ্ছেন?

এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান— সব ধর্মের মানুষের ঐক্য। কার কী ধর্মীয় পরিচয়, সেটি বিবেচনায় না নিয়ে প্রত্যেকের প্রধান পরিচয় যে ‘মানুষ’, সেই মানুষ পরিচয়টিকে সামনে নিয়ে আসা দরকার এবং মানুষ হিসেবে প্রত্যেককে সম্মান করতে পারলেই এবং হুজুগ ও গুজবে কান না দিয়ে বরং প্রত্যেকে তার নিজের ধর্ম নিজের মতো করে পালন করতে পারলেই দেশি-বিদেশি-রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক কোনও উসকানিই সফল হবে না। আর এটা করতে না পারলে আরও অনেক বিপদ দেখার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।

 লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।

 
 
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

নির্বাচন কমিশন আইন হতে বাধা কোথায়?

নির্বাচন কমিশন আইন হতে বাধা কোথায়?

অপুর মৃত্যু, শওকতের প্রতিবাদ, আমাদের ‘সিস্টেম’

অপুর মৃত্যু, শওকতের প্রতিবাদ, আমাদের ‘সিস্টেম’

সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোয় সাধারণ মানুষের ক্ষতি কতটুকু?

সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোয় সাধারণ মানুষের ক্ষতি কতটুকু?

ইভ্যালি: গ্রাহকের টাকা ফেরত দেবে কে?

ইভ্যালি: গ্রাহকের টাকা ফেরত দেবে কে?

ভাইরাল লেগ স্পিনার এবং দু’চার কথা

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২১, ২১:৩৩

জনি হক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, টুইটার ও ইনস্টাগ্রামে ভারতের ক্রিকেট গ্রেট শচীন টেন্ডুলকারের একটি পোস্ট বেশ কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ চলছে বলেই যে আগ্রহটা তৈরি হয়েছে তা নয়। গত ১৪ অক্টোবর তার শেয়ার করা একটি ভিডিও ক্লিপে রয়েছে বাংলাদেশি খুদে বালকের ক্রিকেট প্রতিভা। সেজন্যই এ নিয়ে এত আলোচনা। এটি এক বন্ধুর কাছ থেকে পাওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। সেই ভিডিওতে সবাই দেখেছে বরিশালের খুদে লেগ স্পিনারের বোলিংয়ে সতীর্থদের অসহায়ত্ব। কখনও গুগলিতে, কখনও ফ্লিপারে বা লেগ স্পিনের মায়াজালে কুপোকাত করেছে সে। ক্রিকেটের প্রতি ছোট্ট ছেলেটির আবেগ ও ভালোবাসায় মুগ্ধ ভারতের কিংবদন্তি ক্রিকেটার।

অনেকে ভেবেছিলেন, শচীনের শেয়ার করা ভিডিওতে বল হাতে কারিকুরি দেখানো খুদে ক্রিকেটার ভারতেরই কেউ হবে! ভারতীয় নেটিজেনদের অনেকে তো এই দক্ষতা দেখে বিস্মিত। শচীনের পোস্টটির মন্তব্যের ঘরে আফগানিস্তানের তারকা লেগ স্পিনার রশিদ খান প্রশংসা করেছেন বাংলাদেশি ছেলেটির। কিংবদন্তি লেগ স্পিনার শেন ওয়ার্ন মুগ্ধ হয়ে নিজের টুইটার অ্যাকাউন্টে একই ভিডিও শেয়ার করেছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন, খুদে বালকটি কে?

ছেলেটির নাম আসাদুজ্জামান সাদিদ। খুদে এই লেগ স্পিনারের বয়স এখন ৬ বছর। এটুকু বয়সেই লেগ স্পিন ও গুগলিতে অসামান্য পারদর্শিতা তার। ভাগ্নের বোলিং নৈপুণ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করে ফেসবুকে পোস্ট করেন মামা। এরপর দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ভিডিওটি শচীনের হাতে যাওয়ার পর ভাইরাল খুদে লেগি। এখন অস্ট্রেলিয়া অবধি তার দক্ষতার তারিফ চলছে।

শচীন টেন্ডুলকার কিংবা শেন ওয়ার্নের পোস্ট থেকে আমরা আসলে কী বার্তা পেলাম? ভারতে কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় এমন প্রতিভা তাদের চোখে পড়ার ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। তবু দুই কিংবদন্তির কাছে ভিডিওটি আলাদা মনে হলো কেন? কারণ, বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে এমন প্রতিভা ছড়িয়ে থাকার পরও জাতীয় দলে লেগ স্পিনার সংকট কাটেনি। দু’জনই যেন লেগ স্পিনার অন্বেষণে আমাদের ব্যর্থতা বা সদিচ্ছার অভাবকে চিমটি কেটে ধরিয়ে দিলেন! ভিডিওটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো, লেগ স্পিনের প্রতিভা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার পরও আমরা নিজেরাই নিজেদের দরিদ্র করে রেখেছি।

অথচ টি-টোয়েন্টিতে এখন জিততে হলে লেগ স্পিনারের বিকল্প যেন নেই। ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত ফরম্যাট শাসন করছেন এই কব্জির মোচড় ঘোরানো বোলাররা। যেকোনও দলের অধিনায়কের কাছে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার লেগিরা। তারা রান আটকান, উইকেটও এনে দেন। তাই ক্রিকেট বিশ্বে চলছে ব্যাটারদের নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানো লেগ স্পিনারদের দাপট। এক্ষেত্রে অস্বাভাবিক ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। এ কারণেই হয়তো মাঠে প্রতিপক্ষের লেগ স্পিন জাদুতে ভড়কে যায় টাইগাররা।

টি-টোয়েন্টিতে সত্যিই বাংলাদেশ দলের ব্যাটাররা থাকেন বাড়তি চিন্তায়। বাংলাদেশে ভালো মানের লেগ স্পিনার নেই বলেই হয়তো ক্রিকেটাররা এই শিল্পকে অতো ভালো সামলাতে পারেন না। ঘরোয়া লিগে লেগ স্পিনার বিরল। জাতীয় ক্রিকেটে নিয়মিত লেগিদের মুখোমুখি না হওয়ার কারণে অন্য দলের লেগ স্পিনারের সামনে নাকানি-চুবানি খেতে হয় টাইগারদের।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশকে কম-বেশি বিশ্বের সব লেগ স্পিনারই ভুগিয়েছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ঘূর্ণিবলের গোলকধাঁধায় পড়ে ব্যাটারদের খাবি খেতে দেখা যায় হরহামেশা। কব্জির মোচড়ে বল ঘোরানো ক্রিকেটারদের কাছে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসেন টাইগাররা। এই তো সেদিন বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডে স্কটল্যান্ডের কাছে ৬ রানের হতাশাজনক হারের অন্যতম কারণ লেগ স্পিনে ধরাশায়ী হওয়া। স্কটিশ লেগ স্পিনার ক্রিস গ্রিভস তার ঘূর্ণিতে সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিমকে প্যাভিলিয়নে পাঠিয়ে জয়টা নিশ্চিত করে ফেলেন।

বড় দলের কথা পরে বলি, স্কটল্যান্ডের মতো ছোট দলগুলোতেও কমপক্ষে একজন করে লেগ স্পিনার আছে, যাদের বোলিংয়ের টার্ন দেখে মাথা ঘোরায়! বলা চলে লেগিরাই তাদের তুরুপের তাস। আরেক ছোট দল নেপালের লেগ স্পিনার সন্দীপ লামিচান চলতি মাসে আইসিসির ‘প্লেয়ার অব দ্য মান্থ’ নির্বাচিত হয়েছেন। আইপিএলে তিন বছর ধরে দল পান তিনি। আইপিএলে সব দলই কব্জির মোচড় ঘোরানো লেগিদের দলে ভিড়াতে চায়। সেখানে তাদের চাহিদা বেশ রমরমা। টি-টোয়েন্টি অলরাউন্ডার র‌্যাংকিংয়ে ছোট দলের তিন জন লেগ স্পিনার আছেন। ওমানের খাওয়ার আলি ৪ নম্বরে, আয়ারল্যান্ডের গারেথ ডেলানি ১২ নম্বরে এবং পাপুয়া নিউগিনির চার্লস আমিনির অবস্থান এখন ১৯ নম্বরে।

আগেই বলেছি, সীমিত ওভারের ক্রিকেটে এখন লেগি বোলাররা সাফল্য পাচ্ছেন বেশি। লেগ স্পিনে বাইশ গজ কাঁপাচ্ছেন তারাই। টি-টোয়েন্টি বোলার র‌্যাংকিংয়ের দিকে চোখ রাখলেই তা বোঝা যায়। ২ থেকে ৪ নম্বরে থাকা সবাই লেগ স্পিনার। দুই নম্বরে শ্রীলঙ্কার ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা ডি সিলভা, তিনে আফগানিস্তানের রশিদ খান এবং চার নম্বরে আছে ইংল্যান্ডের আদিল রশিদের নাম। সাত নম্বরে আছেন আরেক লেগ স্পিনার অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডাম জাম্পা। শীর্ষে থাকা তাব্রেইজ শামসি বাঁ-হাতি রিস্ট স্পিনার, সেক্ষেত্রে তিনিও এক অর্থে লেগ স্পিনারই! আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তারা সবাই নিজ নিজ দলের মূল স্কোয়াডের সদস্য। অন্য দলগুলোর মূল স্কোয়াডে কমপক্ষে একজন দক্ষ লেগি আছে।

টি-টোয়েন্টি র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষ দল ইংল্যান্ড দিয়ে শুরু করি। গত এক বছরে দলটির হয়ে সবচেয়ে বেশি (১৬) উইকেট নিয়েছেন আদিল রশিদ। তাদের মারকুটে দুই ব্যাটার ডেভিড মালান ও লিয়াম লিভিংস্টোন লেগ স্পিনার হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারেন। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টি-টোয়েন্টিতে গত একবছরে সবচেয়ে বেশি (১৭) উইকেট নিয়েছেন অ্যাডাম জাম্পা। অজিদের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে আছেন আরেক স্বীকৃত লেগ স্পিনার মিচেল সোয়েপসন। এছাড়া দলটির অন্যতম দুই ব্যাটার ডেভিড ওয়ার্নার ও স্টিভেন স্মিথ গুগলি দিতে পারেন ভালো। দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটার রাসি ভ্যান ডার ডুসেন লেগব্রেক করতে পারেন।

অন্য দলগুলোর মধ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হেডেন ওয়ালশ (গত একবছরে দেশের হয়ে তৃতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি), পাকিস্তানের সহ-অধিনায়ক শাদাব খান, নিউজিল্যান্ডের ইশ সোধি (গত একবছরে দেশের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২০ উইকেট) ও টড অ্যাসেল আছেন লেগি হিসেবে। পাকিস্তানের হয়ে গত একবছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২০ উইকেট শিকারি উসমান কাদির আছেন রিজার্ভ। ভারতের মূল স্কোয়াডের দুই সদস্য রাহুল চাহার ও বরুণ চক্রবর্তী কার্যকর দুই লেগ স্পিনার। দলটির স্ট্যান্ডবাই তালিকায় অন্যতম আরেক লেগি যুজবেন্দ্র চাহাল।

বাংলাদেশের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে রিজার্ভ হিসেবে একজন স্বীকৃত লেগ স্পিনার (আমিনুল ইসলাম বিপ্লব) ছিলেন। কিন্তু তাকে ওমান নিয়ে যাওয়ার কয়েকদিন পর ফেরত নিয়ে এসেছে বিসিবি। এ কারণে কর্তাব্যক্তিরা সমালোচিত হয়েছেন। অথচ তিনি দলের সঙ্গে থাকলে ব্যাটাররা অনুশীলনে সুবিধাই পেতেন। লেগ স্পিনারদের আলোয় নিয়ে আসতে জাতীয় ক্রিকেট লিগের ম্যাচে ও বিপিএলে প্রতি দলের একাদশে একজন করে লেগ স্পিনার রাখার নিয়ম বাধ্যতামূলক রেখেছে বিসিবি। বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থাই বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে লেগ স্পিনার রাখেনি! তাহলে কি সব নিয়ম-কানুন লোক দেখানো? লেগ স্পিনারদের জন্য আত্মবিশ্বাস খুব দরকারি। টানা ম্যাচ খেলার সুযোগ না পেলে তাদের আত্মবিশ্বাস আসবে কোত্থেকে? বিসিবি সেটা কতটা নিশ্চিত করতে পারে?

প্রায় সব দেশে যখন ভালো মানের লেগিদের জয়জয়কার, সেখানে বাংলাদেশের শূন্য। জাতীয় ক্রিকেট দলে লেগ স্পিন বহু বছর ধরেই সবচেয়ে আক্ষেপের নাম। আমাদের দেশে ঠিক কতজন লেগ স্পিনার ছিলেন তা বের করতে গলদঘর্ম হয়ে যেতে হয়। বাইনোকুলার দিয়ে খোঁজার পর টেনেটুনে কয়েকটা নাম হয়তো বলা যাবে। হাতে গোনা সেই কয়েকজন হারিকেনের মতো মৃদু আলো ছড়ালেও সেই অর্থে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের জাত চেনাতে পারেননি। তাদের মধ্যে অন্যতম অলক কাপালি। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রথম হ্যাটট্রিক এই লেগ স্পিনারের। তার পাশাপাশি মোহাম্মদ আশরাফুল মাঝে মধ্যে ভেলকি দেখাতেন। কেউ কেউ কালেভদ্রে দলে জায়গা পেলেও আসন পাকা হয়নি। যেমন লেগ স্পিনার জুবায়ের হোসেন লিখন। অল্প বয়সে ২০১৪-২০১৫ সালে ছয়টি টেস্ট, তিনটি ওয়ানডে ও একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলার সুযোগ পান তিনি। এরপর আর জায়গাটা ধরে রাখতে পারেননি। সম্প্রতি রিশাদ হোসেন ও মিনহাজুল আবেদিন আফ্রিদি লেগ স্পিন করেন বলেই কিছুটা আলোচনায় এসেছেন। কিন্তু লেগ স্পিনারের সংকট আদৌ দূর হবে কিনা সংশয় থেকেই যায়।

দেশে লেগ স্পিনারের অভাব যায়নি বলেই লেগি পাওয়া যায় না! ভালো আইডল না থাকায় উঠতি খেলোয়াড়রা অনুপ্রেরণা খুঁজে পাবে কীভাবে। কাকে সামনে রেখে এগোবে তারা? কব্জির মোচড়ে ভেলকি দেখানো লেগ স্পিনারের তালিকায় কেউই যে নেই! লেগ স্পিনারদের বরাবরই বেশ পরিকল্পনা মাফিক বল করতে হয়। সেই অনুশীলন হয় জাতীয় ক্রিকেট ম্যাচে। লেগ স্পিনের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ করা ঘরোয়া লিগের ক্লাবগুলো কব্জি ঘোরানো বোলারদের গুরুত্ব দেয় না। খেলার সুযোগ না পেলে তারা হাত পাকাবেন কোথায়? একজন লেগ স্পিনার বছরের পর বছর অনুশীলনের মাধ্যমে পরিপক্বতা পায়। অনেক ছোট বয়স থেকেই এই শিল্পের চর্চা করলে সুফল আসে বেশি। আসাদুজ্জামান সাদিদের মতো খুদে ক্রিকেটারদের আরও ভালো বোলার হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা প্রদানে এগিয়ে আসা প্রয়োজন বিসিবির। শচীন ও ওয়ার্নের শেয়ার করা ভিডিওটি বুঝিয়ে দিয়েছে, মানসম্পন্ন লেগ স্পিনার পেতে হলে তৃণমূল পর্যায় থেকে খুঁজতে হবে। আসাদুজ্জামান সাদিদের মতো আরও অনেকে নিশ্চয়ই আছে যাদের কথা আমরা এখনও হয়তো জানি না।

বিসিবিকে এ নিয়ে অনুসন্ধান চালাতে হবে। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে শুধুই লেগ স্পিন নিয়ে কাজ করবেন এমন কিছু কোচ নিয়োগ দেওয়া যায়। জাতীয় অ্যাকাডেমির ছায়াতলে স্বনামধন্য কোচের মাধ্যমে অনুশীলন করানো যেতে পারে এই বোলারদের। চোখে পড়ার মতো লেগ স্পিনার পেলে তাকে ঘরোয়া লিগে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার দায়িত্ব কাঁধে নিতে হবে বোর্ডকেই। লেগ স্পিনারের জন্য বাংলাদেশের হাহাকার ঘুচিয়ে ফেলতে বিসিবিকে আরও মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। আমাদের সাবেক ক্রিকেটাররাও পরামর্শ দিতে পারেন। অন্য দেশের ক্রিকেটারদের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও সঠিক মানুষের সহায়তা পেলে এই খুদে বালকরা আগামীতে উদ্ভাসিত হয়ে রাঙিয়ে দেবে দেশের ক্রিকেট। 

শুধু টি-টোয়েন্টিই নয়; ক্রিকেটের অন্য ফরম্যাটেও লেগ স্পিনের কার্যকারিতা শেন ওয়ার্ন, অনিল কুম্বলে, মুশতাক আহমেদ, শহিদ আফ্রিদিরা দেখিয়ে গেছেন। তাদের মুগ্ধকর বোলিংয়ে লেগ স্পিন পেয়ে এসেছে শিল্পের মর্যাদা। লেগ স্পিন সত্যিই একটি শিল্প। কিন্তু বাংলাদেশে এই শিল্প কবে প্রাণ পাবে কে জানে! ক্রিকেটের এই সৌন্দর্য বাংলাদেশিদের হাতে দেখতে তীর্থের কাকের মতো তাকিয়ে থাকতে হবে আর কতদিন? এ নিয়ে কেবলই যে দীর্ঘশ্বাস বাড়ে।

 

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

বসুরহাট ও গাজীপুরের মেয়র দেশটাকে কী মনে করেন?

বসুরহাট ও গাজীপুরের মেয়র দেশটাকে কী মনে করেন?

এই আগুনের পেছনে কে?

এই আগুনের পেছনে কে?

বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার

বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার

সাম্প্রদায়িকতা ও মনোজগৎ

সাম্প্রদায়িকতা ও মনোজগৎ

বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২১, ১৫:৫৮

তুষার আবদুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) দুলে উঠেছে। সেই দুলুনি দূরে থেকেও অনুভূত হয়েছে। যে গানের দল সুর তৈরি করেছে, কণ্ঠ ছেড়েছে জোরে, তারা আমার চেনা। টেলিভিশনে তাদের সঙ্গে ঢাকার কাছে এক কাশবনে আড্ডা হয়েছিল। তখন আকাশে ছিল শরতের মেঘ। আড্ডা দিয়েছি মেঘদলের সঙ্গে। গতকাল শুক্রবার সেই মেঘদলই টিএসসি এলাকায় সুরের মূর্ছনা ছড়িয়েছিল। আওয়াজ ছিল প্রতিবাদের। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের। প্রতিবাদের এই ভাষা আমার পছন্দের। আমি বিশ্বাস করি- মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে পরাজিত ও নির্মূল করতে সাংস্কৃতিক অস্ত্রই উপযুক্ত। এই অস্ত্র প্রতিরোধ ও মোকাবিলার শক্তি তাদের নেই।

যে টিএসসিতে গানে গানে শুক্রবার প্রতিবাদ জানানো হলো, সেই টিএসসি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম তীর্থভূমি। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ রাষ্ট্রের যেকোনও বিপন্নতা ও দুর্যোগে এখান থেকে নবীন-প্রবীণের সম্মিলনে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়েছে। সেই প্রতিরোধ কোনও অপশক্তি কখনও ডিঙাতে পারেনি।

আমাদের সাংস্কৃতিক চর্চা ও আন্দোলনে জোয়ার প্রবাহমান থাকেনি। রাজধানীতে চিন্তক শ্রেণি, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও কর্মীরা রাজনৈতিকভাবে বিভাজিত হয়ে আছে। তাদের কাছে একাত্তর ও বাংলাদেশের চেয়ে ব্যক্তিগত লাভ-লোকসান মিটিয়ে নেওয়াটাই যেন জরুরি বিষয় এখন। পদ-পদবি আর তারকা ইমেজের একটা ঘোরের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে সবাই।

সাংস্কৃতিক চর্চার ভাটাকালকে অপচয় করতে চায়নি মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী। তারা সমাজ, পরিবার ও রাজনীতিতে চিন্তার মেরুকরণ ঘটিয়ে ফেলে। আমাদের জীবনযাপন, শিক্ষায় ধর্মীয় অন্ধত্ব, কট্টর লু’হাওয়া বইয়ে দিতে শুরু করে, যা সমাজ ও রাজনীতিকে অসহিষ্ণু করে তোলে। আমরা ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের দুই নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশের সঙ্গে ২০০১ পরবর্তী বাংলাদেশের মিল খুঁজে পাবো না। এ সময়টায় ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহারে মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃতির বদলে একটি পরগাছা সংস্কৃতিতে নিজেদের জড়িয়ে ফেলতে শুরু করি। দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো- রাজনীতিবিদরা না হয় ভোট ও ক্ষমতার লোভে পরগাছা তুলে নিলো, কিন্তু দেশের চিন্তক শ্রেণিরাও কেন সেই সুবাসে মোহিত হতে চাইলেন? তাহলে কি আমাদের চিন্তক শ্রেণির কোনও টেকসই বা শক্তিশালী মনন তৈরি হয়নি? পুরোটাই ছিল ভেসে বেড়ানো জলজ উদ্ভিদ?

স্রোতের প্ররোচনায় এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ানো অভ্যাস আমাদের চিন্তক শ্রেণির আগেও ছিল, এখনও আছে। সংশয়ে ডুব দিয়ে তাদের নীরব থাকাটা একাত্তর ও নব্বইতে যেমন দেখেছি, এখনও একই চিত্র। যখন গণজোয়ার ওঠে, সেই গণজোয়ার কোনও স্বর্ণদ্বীপ আবিষ্কার করলে তারা সেই দ্বীপের নকশাকার কিংবা পূর্বাভাস দাতা হয়ে যান চট করেই। আমরাও যেন কোন মন্ত্রে সেই বচন বিশ্বাস করতে শুরু করি। এমন মন্ত্র বসে কতো চিন্তককে যে রাষ্ট্রের বিধাতা করে তুলেছি‍! অবশ্য নিজ গুণে তাদের পতনও হয়েছে।

তাই কোনও চিন্তক বা রাজনীতির বাঁশিতে মোহিত হতে চাই না। বরাবরই কান পেতে রাখি কখন কোন তরুণদল হাঁক দিয়ে বলবে– ‘জাগো বাহে কোনঠে সবাই’। তখন বজ্রমুঠি নিয়ে মিছিলে নেমে পড়তে রাজি যেকোনও বয়সেই। কারণ প্রতিরোধ আর প্রতিবাদের কোনও বয়স নেই। মাতৃভূমির বিরুদ্ধে যেকোনও ষড়যন্ত্র প্রতিরোধের সব কণ্ঠস্বরের বয়স এক। সমবয়সী। এমন সমবয়সীদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে আবারও জড়ো করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে এই সুরের মূর্ছনা ছড়িয়ে পড়ুক আমার ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, রংপুর হয়ে এই জনপদের দোঁয়াশ, এঁটেল, প্রতিটি ধূলিকোনায়। জয়তু বাংলাদেশ। তুমি জাগ্রত জনতার।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

/এসএএস/জেএইচ/

সম্পর্কিত

সবার ভেতরেই পোশাকি বচন

সবার ভেতরেই পোশাকি বচন

আমরা ‘নোবেল’ পেশাতেই আছি

আমরা ‘নোবেল’ পেশাতেই আছি

দৃশ্যমাধ্যম আপন শক্তিতে আলোকিত হোক

দৃশ্যমাধ্যম আপন শক্তিতে আলোকিত হোক

গ্রামীণ সুদের অস্বাস্থ্যকর অর্থনীতি!

গ্রামীণ সুদের অস্বাস্থ্যকর অর্থনীতি!

সাম্প্রদায়িকতা ও মনোজগৎ

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২১, ২২:৫২
স্বদেশ রায় আলেকজান্ডারকে তার বাবা ছোটবেলায় যেমন যুদ্ধবিদ্যা শেখার ব্যবস্থা করেছিলেন তেমনই তার মনোজগৎ গড়ে তোলার জন্যে এরিস্টটলের মতো শিক্ষকের কাছেও তাঁর শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের একটি সভ্যতায় মনোজগৎ গড়ে তোলার গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। আর এরিস্টটল কখনোই আলেকজান্ডারের মনোজগৎ কোনও অন্ধ বিশ্বাস দিয়ে গড়ে তোলেননি। তিনি বাস্তবতা ও প্রকৃতির আচরণ থেকে আলেকজান্ডার যাতে শিক্ষা নিতে পারে সে চেষ্টাই করেছিলেন। উদার এবং অসম্ভবকে জয় করার একটি মনোজগৎ তাঁর ভেতর তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন।

এখন যেমন ধর্ম, বর্ণ, গোত্রের ভেদবুদ্ধি ও নানান সংকীর্ণতা মানুষের মনোজগৎকে সংকীর্ণ করে; অতীতের ওই সভ্যতাগুলোতেও দেখা যায়, নানান কুসংস্কার সমাজ ও মানুষের মনকে সংকীর্ণ করতো। আর এর বিপরীতেই ছিল উদার চিন্তার একটি যাত্রা। আবার ইতিহাসে এর পরের সময়ে দেখা যায়, ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও ধর্মের একাধিপত্য বা ধর্মের নামে রাষ্ট্র ও সমাজকে বেঁধে ফেলার এক ভয়াবহ যুগ। এর আগে নানান কুসংস্কারে রাষ্ট্র ও সমাজকে যতটা না আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধতে পেরেছিল, তার থেকে অনেক বেশি আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে ধর্মের একাধিপত্য। বাস্তবে রাজতন্ত্রের বদলে পুরোহিততন্ত্র ও চার্চতন্ত্রই তখন চালু হয়। ধর্মীয় নেতা পেছনে থাকলেও তারাই রাজাকে বা রাষ্ট্র ও সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। সেই নিয়ন্ত্রণের বাঁধন এতই শক্ত হয় যে ধর্মের তথাকথিত বিধানের বলে রাষ্ট্র নরহত্যার যেমন একক অধিকার পায়, তেমনি নারীকে বেঁধে ফেলা হয় নানান শেকলে। যে নারীর হাত ধরে গৃহসভ্যতা ও কৃষিসভ্যতার জন্ম সেই নারীকে পরাধীনও অসহায় করে সমাজকে একটি অন্ধকার যুগে নিয়ে যাওয়া হয়। যা থেকে আজও  সমাজ বের হয়ে আসতে পারেনি। ধর্ম সাম্প্রদায়িকতার নামে আমরা মাঝে মাঝে পৃথিবীর নানান দেশে ধর্মীয় হামলা, মানুষের ওপর হামলা ও সম্পদ দখলের নগ্নতা দেখি। কিন্তু প্রতিদিন ধর্মের নামে নারী’র ওপরে যে আঘাত এখনও পৃথিবীর নানান রাষ্ট্রে ও সমাজে করা হচ্ছে, তা আমরা সঠিক দেখতে পাই না। কারণ, এটা আমাদের সহজাত হয়ে গেছে। আমরা এই অন্ধকারকে স্বাভাবিক অন্ধকার মনে করি বা বুঝতেই পারি না এটা অন্ধকার। যেমন, যে রাতকানা রোগে ভোগে তার চোখে রাতের আকাশ তারাহীন। কিন্তু সে সেটা বোঝে না।

রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর ধর্মের নামে এই ছোবলকে বাঁচানোর জন্যে পনের শতকে ইউরোপের অনেক বুদ্ধিনায়করা আন্দোলন শুরু করেন। তাদের এই আন্দোলনের ফলে তখন পাশ্চাত্যের দেশগুলো ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে অনেকটা আলাদা করা শুরু করে। কিন্তু শতভাগ তারা এখনও করতে পারেনি। গণতন্ত্রের অন্যতম জন্মভূমি ব্রিটেনে ব্লাসফেমি আইন তুলে দেওয়া হয়েছে ২০০৮ সালে। আর প্রকৃতপক্ষে এটা নর্দান আয়ারল্যান্ড ছাড়া সর্বত্র তাদের কমন ল’ থেকে বাদ যায় ২০২১-এর মার্চে।  তবে শুধু পার্থক্য ছিল আধুনিক যুগে এসে তারা পাকিস্তানের মতো হয়তো কথায় কথায় এই ব্লাসফেমি আইন ব্যবহার করতো না। রাষ্ট্র পরিচালকদের শিক্ষাদীক্ষা কিছুটা হলেও তাদের সংযত করে রেখেছে এ ক্ষেত্রে। তারপরেও ক্যামেরুনের মতো তরুণ নেতাও চার্চ শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনিও বোঝেননি, শিক্ষাকে হতে হয় ইহজাগতিক ও আধুনিক। এই ইহজাগতিক ও আধুনিক শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের দায় ব্যক্তির নিজের। এ দায়ভার যখনই আধুনিক রাষ্ট্র নিজ হাতে তুলে নেয় তখনই বৈপরীত্য দেখা যায়। এবং ক্যামেরুনকে কিন্তু তার ফল ভোগ করতে হয়েছে। তার সমাজ পরোক্ষভাবে উগ্র হয়েছে। যে উগ্রতার কারণে তাকে ব্রেক্সিটে হারতে হয়েছে। ক্যামেরুন ব্রেক্সিটের পক্ষের জয়ে নিশ্চিত ছিলেন বলেই তিনি ব্রেক্সিটের পক্ষে-বিপক্ষে গণভোট দিয়েছিলেন। তিনি জানতেন না তার সমাজে এখন উগ্রবাদীরা সংখ্যায় বেশি। যেকোনও উগ্রবাদ, তাই সে উগ্র জাতীয়তাবাদ হোক না, সেটাও কিন্তু ভয়াবহ এক সাম্প্রদায়িকতা। পৃথিবীতে এই উগ্র জাতীয়তাবাদের নামেও কম ধ্বংসযজ্ঞ, কম নরহত্যা হয়নি। পার্থক্য শুধু এখানে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা থেকে মানবতাবাদে পৌঁছাতে একটি রাষ্ট্র বা সমাজকে যে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, উগ্র জাতীয়তাবাদ থেকে মানবতাবাদে পৌঁছাতে তার থেকে সামান্য কিছু কম পথ পাড়ি দিলে হয়তো চলে।

এ কারণে যেকোনও আধুনিক রাষ্ট্রকে প্রথমেই তার শিক্ষাকে আধুনিক করতে হয়। সেখানে কোনোভাবে ধর্মীয় শিক্ষার যোগ থাকলে চলে না। যে রাষ্ট্র তার শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষা রাখে ওই রাষ্ট্রকে পশ্চাৎপদ রাষ্ট্র হিসেবেই ধরতে হবে। ওই রাষ্ট্রকে আর যাই হোক আধুনিক রাষ্ট্র বলা যাবে না। কারণ, শিক্ষা সম্পূর্ণরূপে ইহজাগতিক ও আধুনিক বিষয়। এর সঙ্গে ধর্মের কোনও সম্পর্ক নেই। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকা থেকে শুরু করে অনেক দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু কিছু শিক্ষার ভেতর দিয়ে যে অবৈধ পুঁজি সৃষ্টি বা সম্পদ দখলের একটা তাড়না শুরু হয়েছে, এটাও কিন্তু শিক্ষার অঙ্গ নয়। কারণ, অবৈধ সম্পদ দখল ও দখলের তাড়নাও একটি রাষ্ট্র ও সমাজকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। ধর্মীয় উগ্রতা যেমন মানুষের মানবতা ধ্বংস করে তাকে রাষ্ট্রের ও সমাজের ক্ষতিকর কাজের দিকে ঠেলে দেয়, এই অবৈধ সম্পদ দখলের মানসিকতাও রাষ্ট্র ও সমাজকে সমান ক্ষতি করে। এবং একটা অদ্ভুত যোগাযোগ এখানে দেখা যায়, কোনও সমাজে উগ্র ধর্মীয়বাদ যেমন অবৈধ সম্পদ দখলের দিকে ছুটিয়ে নিয়ে যায় মানুষের মানসিকতাকে বা সেই সুযোগ করে দেয়, উগ্র-জাতীয়তাবাদও একই কাজ করে। ধর্মীয় মৌলবাদে যেমন রাষ্ট্রীয় ও সমাজের সম্পদ দখলের একটা তাড়না আছে, উগ্র জাতীয়তাবাদেও সেই একই বিষয় দেখা যায়। উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদে যেমন মানুষের সহজাত নৈতিকতা নষ্ট করে, অন্যের মানসিকতার ওপর, অন্যের সম্পদের ওপর অবৈধ দখলদারিত্ব সৃষ্টি করার একটা তাড়না দেখা যায়, উগ্র জাতীয়তাবাদেও তেমনই। পার্থক্য শুধু উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদের বয়স দুই হাজার বছরের বেশি, তার শেকড় অনেক গভীরে আর উগ্র জাতীয়তাবাদের বয়স কয়েকশ’ বছর ছুঁতে চলেছে, তার শেকড় অতটা গভীরে নয়।

পনের শতকের পর থেকে ধীরে ধীরে রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে ধর্মকে অনেকটা দূরে ঠেলে দিতে পেরেছিল পাশ্চাত্যের দেশগুলো। কিন্তু গত একশ’ বছরে সেখানেও উগ্র জাতীয়তাবাদের নামে প্রচ্ছন্নভাবে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ও বর্ণ সাম্প্রদায়িকতা বাড়ছে। যেমন, আমেরিকায় ট্রাম্পের বিজয়ের কারণ শুধু ডেমোক্র্যাটদের দুর্বল প্রার্থীই ছিল না, ধর্মীয় ও বর্ণ সাম্প্রদায়িকতাও কাজ করেছিল। যদিও ওবামা বলেছিলেন, তিনি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হলে ট্রাম্প জিততে পারতো না। তবে তারপরেও বাস্তবতা হলো, ট্রাম্প যে ভোট পান ওই ভোটের একটি অংশে কিন্তু এই ধর্ম ও বর্ণ সাম্প্রদায়িকতার ভোট ছিল। সেখানে সামনে আনা হয়েছিল উগ্র জাতীয়তাবাদকে। এবং সেটা এখনও আমেরিকায় আছে। এমনিভাবে পাশ্চাত্যের অধিকাংশ দেশগুলোর রাজনীতি লক্ষ করলে দেখা যাবে, সেখানে একটা ধর্ম ও বর্ণ সাম্প্রদায়িকতার ভোট জন্ম নিচ্ছে প্রতিদিন। আর এশিয়া ও আফ্রিকার পশ্চাৎপদ দেশগুলোতে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা অনেক বেশি উগ্রভাবে বাড়ছে।

এই ধর্ম, বর্ণ ও গোষ্ঠী সাম্প্রদায়িকতা জন্ম নেয় মানুষের ভেতর যে সহজাত ভালো গুণগুলো অর্থাৎ উদারতা, সহমর্মিতা, সহযোগিতা, পবিত্রতা ও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা এগুলো নষ্ট হওয়ার ফলে। মানুষের সমাজের ও চরিত্রের বিবর্তনের ইতিহাস বলে, মানুষ সহজাতভাবে তার এই ভালো গুণগুলো নিয়ে সংঘবদ্ধ হতে শিখেছে। এবং সংঘবদ্ধ মানুষ তাদের এই ভালো গুণগুলো দিয়েই সমাজ থেকে, মানুষের মন থেকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বার্থপরতা ও অন্ধত্বকে পরাজিত করেই এগিয়েছে। আবার পাশাপাশি মানুষের সমাজের চলার পথে দেখা যায়, স্বার্থপর হিপোক্রেটরা তাদের প্রতারণা দিয়ে মানুষের এই সহজাত ভালো গুণগুলো নষ্ট করে চলেছে। মানুষের ভেতর যে সহজাতভাবে ফুলের মধু আহরণের একটা গুণ থাকে, এটা ওই স্বার্থপর হিপোক্রেটরা নষ্ট করে দিচ্ছে। মানুষের ভেতর পশুত্ব জাগাচ্ছে।

মানুষের ভেতর যারা স্বার্থপর হিপোক্রেট তারা এই কাজটি করছে মোটা দাগে দুটো বিষয়কে আশ্রয় করে।

এক. ‘ধর্ম’, দুই, ‘রাজনীতি’। এবং এখানে এই ‘ধর্ম’ ও ‘রাজনীতির’ এক অদ্ভুত মিল দেখা যায়। এই ‘ধর্ম’ ও ‘রাজনীতি’ বর্তমানের এ সময়ে মানুষকে মানুষ না রেখে ভোটারে পরিণত করার বা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার ক্যাডারে পরিণত করার যন্ত্র বানানোর চেষ্টা করছে প্রতি মুহূর্তে। যে কারণে তারা রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষের ভেতরকার ভালো গুণগুলো নষ্ট হওয়ার সবকিছুকে উৎসাহিত করছে পৃথিবীর নানান ভূখণ্ডে। তারা সমাজে আধুনিক শিক্ষার বদলে অজ্ঞতাকে, মূঢ়তাকে উৎসাহিত করছে। সমাজে যোগ্যতার অর্জনের বিপরীতে অবৈধ দখলকে উৎসাহিত করছে। রাষ্ট্র ও সমাজে নিয়মতান্ত্রিকতার বদলে এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। রাষ্ট্র ও সমাজের জ্ঞান বিস্তারের প্রতিটি অঙ্গকে মূঢ়দের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করছে। এবং সাধারণ মানুষ যাতে রাষ্ট্র ও মূঢ়চিন্তার দাস হয় সেদিকেই তারা রাষ্ট্র ও সমাজকে নিয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় নেতাদের একটি বড় অংশ আধুনিক মানুষগোষ্ঠী তৈরি হওয়ার বদলে এক ধরনের মানসিক প্রতিবন্দ্বী দাসগোষ্ঠী বা সমাজ সৃষ্টির কাজ করছে। তাদের চেষ্টার উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্র ও সমাজের আধুনিক ও উদার চিন্তার মানুষগোষ্ঠীর বিপরীতে এই দাসগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ানো। যে কারণে সমাজের একটি বড় অংশে উদার চিন্তা ও বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তা প্রবেশের সব পথ তারা বন্ধ করতে সমর্থ হচ্ছে। ধর্ম ও রাজনীতির নানান কৌশলে তারা সমাজের বহুমুখী চিন্তাকে নষ্ট করছে।

কোনও রাষ্ট্রে ও সমাজে যখন এই চিন্তা চেতনায় দাসশ্রেণি গড়ে ওঠা শুরু হয় তখন ওই সমাজের মানুষ শুধু পেছন দিকে হাঁটতে শুরু করে না, সমাজের সব ধরনের সভ্যতা ও শৃঙ্খলাও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। এমন একটি সময়ে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনা খুবই কঠিন। কারণ, তখন অবচেতনভাবেও অনেক দায়িত্বশীল মানুষের মনোজগতের শুভ গুণগুলো নষ্ট হওয়া শুরু হয়ে যায়। রাষ্ট্র ও সমাজের নানান অঙ্গে এই দাসরাই বসে যায়। তারা সব সময়ই নানানভাবে মূঢ়তাকে সাহায্য করে। রাষ্ট্র ও সমাজকে পেছন দিকে ঠেলতে শুরু করে। তখন অতি সহজে রাষ্ট্র ও সমাজে যেকোনও ধরনের উগ্রবাদীরা সামনে চলে আসতে থাকে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এটা ছোঁয়াচে। কখনোই কোনও নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না।

এ মুহূর্তে গোটা পৃথিবীতে কম-বেশি নানান ধরনের উগ্রতা দেখা যাচ্ছে। আরও ছোট পরিসরে নিয়ে এলে দেখা যাবে, দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর অধিকাংশ দেশে ধর্মীয় উগ্রতা। দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের ভেতর আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলংকা ও বাংলাদেশে বেশি ও কম আকারে হলেও ধর্মীয় উগ্রতার ‘লাঠি’ দেখা যাচ্ছে। যা রাষ্ট্র ও সমাজের মানুষকে ধীরে ধীরে ধর্মীয় উগ্রতার দাস বানানোর চেষ্টা করছে। আবার রাজনীতিরও বড় অংশ ওই উগ্রতাকে ব্যবহার করে মানুষকে ‘দাস-ভোটার’ বানানোর চেষ্টা করছে। আর এর কুফলগুলো মাঝে মাঝেই এই দেশগুলোতে দেখা যাচ্ছে। এই দেশগুলোতে রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করবে যে রাজনীতি ওই রাজনীতি থেকে উদারনীতি, পবিত্রতা, সহনশীলতা, বহুত্বকে গ্রহণ করার ক্ষমতা বিদায় নিয়ে সেখানে উগ্রতা, মূঢ়তার দাসতন্ত্র স্থান নিচ্ছে ধীরে ধীরে।

আর এ অবস্থার কুফল হয়তো দুই একটা জায়গায় মোটা দাগে দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবে এর কুফল অনেক গভীরে। এর কুফলে প্রতি মুহূর্তে রাষ্ট্র ও সমাজ অযোগ্য ও মূঢ়দের হাতে চলে যায়। সমাজের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে আধুনিকতার বদলে পশ্চাৎপদ চিন্তাচেতনা। একটা বিরাট অংশ মানুষ ভুলে যায় তার একটি মনোজগৎ আছে। যা তাকে প্রতি মুহূর্তে বিকশিত করতে হয়। এবং এই বিকাশ হবার ভেতর দিয়েই মানব সমাজ ও প্রগতি এগিয়ে চলে। মানুষের মনোজগৎ বিকশিত না হলে কখনোই কোনও রাষ্ট্র ও সমাজের কোনও স্তরেই শৃঙ্খলা আনা যায় না। ধীরে ধীরে ওই রাষ্ট্র ও সমাজের সব অর্জন নষ্ট হতে থাকে। কারণ, মানুষের  আধুনিক শিক্ষা, মানুষের উন্নত মনোজগৎই রাষ্ট্র ও সমাজের সব উন্নয়নকে ধরে রাখে এবং সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। পৃথিবী থেকে ডাইনোসররা হারিয়ে গেছে খাদ্যাভাবে, বিপরীতে মানুষের বহু সভ্যতা, বহু অর্জন নষ্ট হয়েছে মনোজগৎ ধ্বংস হওয়ার ফলে।       

লেখক: রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও মিডিয়ার স্বাধীনতার সপক্ষে নোবেল

উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও মিডিয়ার স্বাধীনতার সপক্ষে নোবেল

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

কোকেন মামলার চার্জ গঠন পেছালো

কোকেন মামলার চার্জ গঠন পেছালো

৫ জেলায় ৫ জনের মৃত্যু

৫ জেলায় ৫ জনের মৃত্যু

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে পদযাত্রা

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে পদযাত্রা

শিশুশ্রম নিরসনে ১১২ এনজিও’র সঙ্গে চুক্তি কাল

শিশুশ্রম নিরসনে ১১২ এনজিও’র সঙ্গে চুক্তি কাল

বিদ্যুৎ সম্পর্কিত সব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির সুপারিশ

বিদ্যুৎ সম্পর্কিত সব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির সুপারিশ

ফরিদপুরের চর-ঝাউকান্দা ইউপি নির্বাচন স্থগিত

ফরিদপুরের চর-ঝাউকান্দা ইউপি নির্বাচন স্থগিত

‘বঙ্গমাতা’র নামে সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণের প্রস্তাব অনুমোদন

‘বঙ্গমাতা’র নামে সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণের প্রস্তাব অনুমোদন

চট্টগ্রামে পূজামণ্ডপে হামলাচেষ্টা মামলার ১৬ আসামি রিমান্ডে 

চট্টগ্রামে পূজামণ্ডপে হামলাচেষ্টা মামলার ১৬ আসামি রিমান্ডে 

সুদানে সরকার ভেঙে জরুরি অবস্থা জারি

সুদানে সরকার ভেঙে জরুরি অবস্থা জারি

শনাক্ত ২৮৯ জনের ২১০ জনই ঢাকার

শনাক্ত ২৮৯ জনের ২১০ জনই ঢাকার

অবৈধভাবে ভারত থেকে প্রবেশকালে বাংলাদেশি আটক

অবৈধভাবে ভারত থেকে প্রবেশকালে বাংলাদেশি আটক

বোরো সংগ্রহে অনিয়মকারী চালকল মালিকের লাইসেন্স বাতিল

বোরো সংগ্রহে অনিয়মকারী চালকল মালিকের লাইসেন্স বাতিল

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune