X
শনিবার, ২৪ জুলাই ২০২১, ৯ শ্রাবণ ১৪২৮

সেকশনস

থানা হেফাজতে নির্যাতন একটি ‘পাপ’

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২১, ২৩:২৪

জীবনানন্দ জয়ন্ত সম্প্রতি বরিশালের উজিরপুর থানা হেফাজতে নারী আসামিকে শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে।  প্রকাশিত সংবাদে জানা গেছে, হত্যা মামলায় রিমান্ড শেষে ওই নারী আসামিকে আদালতে উপস্থাপন করা হলে আসামির শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টি আদালতের নজরে আসে। আদালত আসামির বক্তব্য শুনে তার শারীরিক পরীক্ষা করে জখম, নির্যাতনের চিহ্ন ও নির্যাতনের সম্ভাব্য সময় উল্লেখ করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বরিশাল শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালককে নির্দেশ দেয়। হাসপাতালের প্রতিবেদনেও নির্যাতনের সত্যতা পাওয়া গেছে বলেও গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে নির্যাতনের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে, প্রায়ই ঘটে এবং প্রচলিত ব্যবস্থাপনায় ভবিষ্যতেও ঘটতেই থাকবে। রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের বিপরীতে ব্যক্তি ও ক্ষমতায় অনুগত থেকে আনুগত্য লাভের প্রকাণ্ড সংস্কৃতি যখন যার পর নেই– জেঁকে বসে তখন আর কি-ই-বা ঘটবে!

ব্যক্তিগত লাভ, নিজেকে বা কাউকে ক্ষমতাশালী প্রমাণ করা, ব্যক্তি-ক্ষমতা-রাজনীতির প্রতিপক্ষ মোকাবিলা, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব-বিরোধ, কিংবা ভিন্নমত প্রকাশ– সে যাই হোক না কেন, সকল ক্ষেত্রেই ক্ষমতার বলয়ে থাকা বা এর ঘনিষ্ঠ মানুষগুলো সবসময়ই নির্যাতন-নিপীড়নসহ সহিংস পন্থাকেই বেছে নেয়।

এগুলোর সবটাই ব্যক্তির অপরাধ প্রবণতা হিসেবেই থাকতে পারতো, যা প্রতিরোধ্য। কিন্তু প্রতিরোধের বিপরীতে রাষ্ট্র যখন দায়মুক্তির চর্চা করে তখন তা রাষ্ট্রের অপরাধ প্রবণতায় পরিণত হয়ে রাষ্ট্র পাপের জন্ম দেয়; মানবাধিকার বিপন্ন হয়। 

রাষ্ট্রের অপরাধ প্রবণতা সরকারের ভেতরে ‘সরকার’ সৃষ্টি করে। ফলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও ক্ষমতাকেন্দ্রিক খুশিতে পরিচালিত হবে– এমনটাই স্বাভাবিক।

ফরমায়েশি আটক, কথিত ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুক যুদ্ধে’র মৃত্যু, স্বীকারোক্তি আদায়ে ভয়-ভীতি আর নির্যাতন, নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু, যৌন নিপীড়ন, একের অপরাধে অপরের সাজাভোগ, অপরাধীর প্রক্সি দেওয়ার মতো রাষ্ট্রপাপ সংঘটিত হচ্ছে। এই সময়ে বিচারিক দীর্ঘসূত্রিতা, ক্ষমতাশালীদের অপরাধ আড়ালের সুযোগ এবং দরিদ্র ক্ষমতাহীন মানুষের বিচার প্রাপ্তির বিড়ম্বনা– সব মিলিয়ে বিচারহীনতার সংস্কৃতি রাষ্ট্রপাপের বৈধতা তৈরি করছে। আমরা বন্দুক যুদ্ধের স্ক্রিপ্ট শুনে থমকে যাই না বরং বন্দুকযুদ্ধই আমাদের প্রত্যাশিত হয়ে ওঠে! পাপের কলেবর ক্রমাগত বাড়ছেই। বড় অদ্ভুত সময়ে আমরা অবতীর্ণ!

রাষ্ট্র কখনও কখনও তার পাপ মোচনের চেষ্টা করে সত্য, কিন্তু তুলনার বিচারে তা নগন্য। একইসাথে চড়ামূল্যে ক্ষতিগ্রস্তের জীবন বিপন্ন নিঃশেষ করেই কেবল সেই চেষ্টা। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণে মানব জীবনের প্রতি মর্যাদা এবং মানবাধিকার সমুন্নত রাখার রাষ্ট্রীয় নীতিবোধের চর্চা অপরিহার্য।

প্রায় ছাব্বিশ বছর আগে দিনাজপুরে টহল পুলিশের হেফাজতে ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যা, ১৯৯৮ সালে ডিবি পুলিশ হেফাজতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শামিম রেজা রুবেল হত্যাকাণ্ড, ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জে র‌্যাব কর্তৃক আইনজীবী চন্দন সরকারসহ ৭ জনকে হত্যা করে শিতলক্ষ্যায় লাশ গুম, একই বছর ঢাকার পল্লবী থানায় পুলিশ হেফাজতে ইশতিয়াক হোসেন জনিকে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা, ২০১৮ সালে কথিত বন্দুকযুদ্ধে টেকনাফের একরামুল হক হত্যা, ২০২০ সালে কোটালীপাড়ার রামশীল গ্রামের নিখিল তালুকদারকে আটক পরবর্তী পুলিশ সদস্যের নির্যাতনে মৃত্যু এবং সাম্প্রতিক উজিরপুর থানা হেফাজতে আটক নারী আসামি নির্যাতন কিংবা এর আগে-পরে প্রকাশিত-অপ্রকাশিত আরও অনেক ঘটনার প্রকৃতি একই। সবগুলোই অপরাধ প্রবণ রাষ্ট্র ব্যবস্থার দায়-রাষ্ট্রপাপ। এগুলোর কোনও কোনোটিতে বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও অপরাধ প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ শূন্যের কোঠায়। ফলে কয়েকটি ঘটনার বিচারে কারোই কিছু এসে যায়নি। চরম মূল্য তো ক্ষতিগ্রস্তপক্ষকেই দিতে হয়েছে। আজও বাতাসে ভেসে বেঁড়ায়– ‘আব্বু তুমি কান্না করতেছো যে’। কিংবা আরও কোনও বিভৎস আর্তনাদ-গোঙানি। অথচ এমনটি হওয়ার ছিল না। ৩০ লাখ জীবন-মুক্তিকামী মানুষের আর্তনাদ। মা-বোনের করুন চিৎকার আর রক্তে ভেজা সংবিধান থেকে আমাদের যেখানে প্রতি মুহূর্তেই মানবিক হয়ে ওঠার কথা– আমরা তা হইনি, আমরা মানবিক হয়ে উঠি না অথবা উঠতে চাই না অথবা হয়ে ওঠা যায় না!

১৯৯৮ সালে ডিবি হেফাজতে শামিম রেজা রুবেল হত্যাকাণ্ডসহ সমসাময়িক আরও কয়েকটি ঘটনার প্রেক্ষিতে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার এবং ১৬৭ ধারায় আটক ব্যক্তির রিমান্ডের ক্ষেত্রে আইনের অপপ্রয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান হাইকোর্ট বিভাগে জনস্বার্থে রিট পিটিশন নং– ৩৮০৬/১৯৯৮ দায়ের করলে হাইকোর্ট ২০০৩ সালে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার ও রিমান্ড বিষয়ে পর্যবেক্ষণসহ নির্দেশনা দিয়ে রায় ঘোষণা করে। পরবর্তীতে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলে ১৩ বছর পর ২০১৭ সালের ২৪ মে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন খারিজ হয়ে যায়। হাইকোর্টের রায়ে রাষ্ট্র-জনগণ-সরকারের স্বার্থ বিরোধী কিছু ছিল না। যা ছিল তা একটি মানবিক রাষ্ট্রে অবশ্য পালনীয়। কিন্তু আমরা তা পালন করতে চাইনি বা করতেও চাই না বা পালন করা যায় না– এ কারণেই ১৩ বছর কেটে গেছে।

আপিল বিভাগ তার রায়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং ম্যাজিস্ট্রেট, বিচারক ও ট্রাইব্যুনালের জন্য গ্রেফতার ও রিমান্ড বিষয়ে পৃথক নির্দেশনাসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্তব্য বিষয়ক ৭ দফা নির্দেশনায় বলেছে– In the performance of their duty, law enforcement agencies shall respect and protect human dignity and maintain and uphold the human rights of all persons (অর্থাৎ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহ তাদের দায়িত্ব পালনকালে মানুষের মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও তা রক্ষা করবে এবং প্রত্যেক ব্যক্তির মানবাধিকার সমর্থন ও সমুন্নত রাখবে); The law enforcing agencies must not only respect but also protect the rights guaranteed to each citizen by the constitution (অর্থাৎ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহকে অবশ্যই প্রত্যেক নাগরিকের জন্য সংবিধান স্বীকৃত অধিকারগুলির প্রতি শুধু সম্মান প্রদর্শনই নয় বরং তা রক্ষা করতে হবে); এবং Human life being the most precious resource, the law enforcing agencies will place its highest priority on the protection of human life and dignity (অর্থাৎ মানবজীবন সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হওয়ায়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহ মানবজীবন ও মর্যাদার সুরক্ষায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিবে)। এই তিন কর্তব্য অনুযায়ী আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার যেমন আচরণ হওয়া উচিত– তার কতটা আমরা দেখতে পাই?

উজিরপুরে আসামি নির্যাতন, কিংবা একরামুল হক হত্যা কিংবা নিখিল তালুকদার নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনাসহ অসংখ্য ঘটনাই প্রমাণ করে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের কোনও প্রতিফলন নেই। তবে রিমান্ড প্রদানকারী আদালত অধস্তন সম্পর্কের বাধ্যবাধকতায় আসামির রিমান্ড আদেশে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুসরণপূর্বক সতর্কতার সাথে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দিয়ে রায়ের প্রতিফলন ঘটায় মাত্র। কিন্তু রিমান্ড চলাকালে সেই নির্দেশ কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে বা হচ্ছে না, সেটি দেখার কেউ নেই। এমনকি রিমান্ড শেষে আসামিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণ করার খুব একটা নজিরও নেই। ফলে সংবিধান, আইন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা সবকিছুই কাগুজে বাস্তবতা হিসেবে টিকে থাকে!

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫ (৪) এ “কোন অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাবে না”– বলা হলেও, আমাদের রিমান্ড চর্চা নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতেই এমনটি বলা বোধ করি অমূলক নয়। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫(৫) “কোন ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাইবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লঞ্ছনাকর দন্ড দেওয়া যাইবে না কিংবা কাহারও সহিত অনুরূপ ব্যবহার করা যাবে না” এবং নির্যাতন ও অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক অথবা অমর্যাদাকর আচরণ অথবা শাস্তির বিরুদ্ধে জাতিসংঘ ঘোষিত সনদের অনুচ্ছেদ ২(১) ও ৪ এর বাধ্যবাধকতায় বাংলাদেশে “নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩” প্রণীত হয়েছে। কিন্তু আইন প্রণয়নের পর দীর্ঘ ৮ বছরে আইনের প্রত্যাশিত প্রয়োগ হয়নি; আমরা শুধু বলতে পারি আমাদের একটি আইন আছে।

নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে সর্বপ্রথম রায় আসে গত বছর। পল্লবী থানায় পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের শিকার ইশতিয়াক হোসেন জনির মৃত্যুতে ২০১৪ সালে নির্যাতনকারী পুলিশ কর্মকর্তা ও পুলিশের সোর্সের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় গত বছর ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালত তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও প্রত্যেককে দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণসহ দুই সোর্সকে সাত বছরের কারাদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন। এই রায়টি পেতে আমাদের সময় লেগেছে ৬ বছর। যদিও আইনের ১৪ ধারার বিধান অনুযায়ী মামলা দায়েরের সর্বোচ্চ ২১০ দিনের মধ্যেই বিচার সম্পন্ন হওয়ার কথা।

উজিরপুরের ঘটনায় শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি যৌন নিপীড়নের অভিযোগও উঠছে। এক্ষেত্রে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনের প্রয়োগ দৃশ্যমান হলেও যৌন নিপীড়নের ঘটনায় পৃথক আইনের প্রয়োগ দৃশ্যমান নয়। ফলে তদন্তে যৌনপীড়নের প্রমাণ পাওয়া গেলে অপরাধীর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা এ নিয়ে শঙ্কা থেকেই যায়। আর ভুক্তভোগী যখন ক্ষমতাহীন তখন শঙ্কাটাই বাস্তবতা। এ জন্য শারীরিক নির্যাতনের জন্য নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন এবং যৌন নিপীড়নের জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে পাশাপাশি অপরাধের তদন্ত হওয়া আবশ্যক।

নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় সাধারণত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রথমে অপরাধের বিষয়টি অস্বীকার করেন, না হলে তা চেপে যান অথবা স্থানীয়ভাবে মিটিয়ে ফেলেন। উজিরপুরও এর ব্যতিক্রম নয়। সেখানকার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগকে ভিত্তিহীন দাবি করে অপরাধ অস্বীকার করেছেন। এভাবে যারা অপরাধ আড়াল-গোপন অথবা অস্বীকার করেন বা আপস-মীমাংসা করেন, তাদের অপরাধের সহযোগী হিসেবে গণ্য করার সুযোগ প্রচলিত আইনে নেই। এ জন্য নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ এর সংস্কারও প্রয়োজন।

লেখক: আইনজীবী ও অ্যাকটিভিস্ট

/এসএএস/

সম্পর্কিত

মহামারির বিপর্যয় মোকাবিলায় স্থানীয় সরকারের সম্পৃক্ততা জরুরি

মহামারির বিপর্যয় মোকাবিলায় স্থানীয় সরকারের সম্পৃক্ততা জরুরি

করোনাকালে গণমাধ্যম: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

করোনাকালে গণমাধ্যম: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

বডি শেমিং ও আমাদের ‘বাজারি মন’

বডি শেমিং ও আমাদের ‘বাজারি মন’

ঈদ আনন্দে ভেসে যাক করোনার মহামারি

ঈদ আনন্দে ভেসে যাক করোনার মহামারি

মহামারির বিপর্যয় মোকাবিলায় স্থানীয় সরকারের সম্পৃক্ততা জরুরি

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২১, ২০:১৯

ড. প্রণব কুমার পান্ডে একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নে স্থানীয় সরকারের ভূমিকা অপরিসীম। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকার নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে এবং সেগুলো স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে- এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আর এই কারণেই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে কেন্দ্রীয় সরকারের সম্প্রসারিত একক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত না করতে পারলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন অনেক ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হয়।

বিকেন্দ্রীকরণের অন্যতম শর্ত হচ্ছে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষমতা প্রদান করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানসমূহকে স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা প্রদান করা হয় না। তবে বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ অন্য দুই প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি স্বাধীনতা ভোগ করে। যদিও সরকারের হাতে এই প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করার বেশ কিছু ক্ষমতা রয়েছে।

যেকোনও ধরনের মহামারি, অতিমারি কিংবা দুর্যোগের সময় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দুর্যোগ চলাকালীন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ কী ভূমিকা পালন করবে সেটি আইনে সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এই কারণেই ২০১৯ সালের প্রথম দিক থেকে চলমান করোনা অতিমারির সময় বিভিন্ন দেশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জনসাধারণকে রক্ষা করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা যদি আমরা চিন্তা করি তাহলে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে স্থানীয় সরকারের প্রত্যেকটি একককে আপৎকালীন কিংবা দুর্যোগকালীন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের জন্য আইনের মাধ্যমে ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে।  আমরা যদি ইউনিয়ন পরিষদের কথা চিন্তা করি তাহলে দেখা যাবে যে ২০০৯ সালের ইউনিয়ন পরিষদ আইনের ৬, ৩৫, ৩৬, ৩৮ এবং ৩৮ ধারায় দুর্যোগকালে ইউনিয়ন পরিষদসমূহ কি ভূমিকা পালন করবে তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা রয়েছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে গত প্রায় দেড় বছর ধরে চলমান করোনা অতিমারির সময় আমরা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে কতটুকু ব্যবহার করতে পেরেছি? গত দেড় বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায় যে এই প্রতিষ্ঠানসমূহ অতিমারি মোকাবিলায় যে পরিমাণ সহায়তা সরকারকে প্রদান করতে পারে তা এখন পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়নি। এ প্রতিষ্ঠানসমূহকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সামাজিক সুরক্ষা জালের অন্তর্ভুক্ত সেবাসমূহ বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে গোটা দেশ যখন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সেই সময় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা কীভাবে ব্যবহার করতে পারি? সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা যা প্রত্যক্ষ করেছি তা হলো বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে একটি বড় অংশের করোনা সম্পর্কিত সচেতনতার অভাব রয়েছে। করোনাভাইরাস মানুষের শরীরে বাসা বাঁধলে কতটা ক্ষতি করতে পারে সেই সম্পর্কে অনেকেরই ধারণা নেই। কিংবা সরকার অথবা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক করোনা সুরক্ষাবিধি সম্পর্কে জনগণের সুস্পষ্ট ধারণা নেই। আরও স্পষ্টভাবে বললে বলা যায় যে কীভাবে মাস্ক পরতে হবে, কেন মাস্ক পরতে হবে, কেন বারবার হাত ধুতে হবে এবং কেন জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে- এই বিষয়গুলো সম্পর্কে জনগণের পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব রয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ যেহেতু জনগণের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে, তাদের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত জনগণকে সচেতন করার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জরুরি।

করোনার ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট বাংলাদেশের গ্রাম অঞ্চলে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি গ্রামাঞ্চলে ভয়ংকর আকার ধারণ করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনা সম্পর্কে মানুষের কুসংস্কার। ইতোমধ্যে আমরা লক্ষ করেছি, এই কুসংস্কারের কারণে স্বজনরা করোনা আক্রান্ত হলে অনেকেই তাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমরা দেশব্যাপী বেশ কয়েকটি ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি, যেখানে দেখা গেছে পরিবারের সদস্যরা করোনা আক্রান্ত রোগীর লাশ পর্যন্ত গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। কিংবা বাবা-মা করোনা আক্রান্ত হওয়ায় সন্তানরা তাদের খোঁজ নেওয়া পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছে।

এমতাবস্থায়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে কাজে লাগিয়ে জনগণকে যে বিষয়টি বোঝানো দরকার সেটি হলো করোনা আক্রান্ত মানুষ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সুস্থ হয়ে যায় এবং করোনা সুরক্ষাবিধি মেনে চললে এই রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। এই কাজটি সম্পাদন করা কেন্দ্রীয় সরকার অথবা কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানসমূহের পক্ষে কঠিন হলেও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সম্পাদন করা অনেক সহজ। কারণ, জনপ্রতিনিধি তার এলাকার সবাইকে চেনেন এবং তাদের কথা জনগণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মেনে চলেন।

করোনার স্বাস্থ্যগত দিকের পাশাপাশি খেটে খাওয়া মানুষের জীবিকার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ দিন আনে দিন খায়। লকডাউন চলাকালীন জীবিকার বিষয়টি তাদের কাছে মুখ্য। এই দরিদ্র খেটে খাওয়া মানুষকে সহায়তা করার ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ গ্রামের যুবকদের নিয়ে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গঠন করে তহবিল সংগ্রহ করতে পারে এবং সেই অর্থ দিয়ে খেটে খাওয়া মানুষদের সাহায্য প্রদান করতে পারে। এমনকি যেসব পরিবার করোনা আক্রান্ত হয়েছে, তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদিসহ খাবার সরবরাহ করতে পারে। আমাদের একটি কথা মনে রাখা দরকার যে এই অতিমারির সময়ে আমরা সবাই যদি সরকারের সাহায্যের ওপর নির্ভর করে থাকি তাহলে সরকারের পক্ষে সপ্তাহের পর সপ্তাহ কিংবা মাসের পর মাস সহায়তা প্রদান করা সম্ভব নয়। ফলে অতিমারি থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। সে ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।

এমনকি যেসব কৃষক লকডাউন চলাকালীন কিংবা করোনাকালীন তাদের জমির ফসল তুলতে কষ্ট পাচ্ছেন, তাদেরও সহায়তা প্রদান করতে পারে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রে তারা এলাকার যুবকদের সংগঠিত করে কিংবা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে কৃষকদের সাহায্য করতে পারে। আমাদের মনে রাখা উচিত, কৃষি আমাদের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। কৃষি ক্ষেত্রে আমাদের উৎপাদন ব্যাহত হলে বিপর্যয় আরও বেড়ে যাবে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের এখন পর্যন্ত সফলভাবে এই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হওয়ার অন্যতম মূল কারণ হচ্ছে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত না হওয়া। ফলে এই বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে আরও বেশি কাজে লাগানো প্রয়োজন।

এছাড়াও সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী টিকা প্রদান কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাধ্যমে টিকা প্রদান করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে স্থানীয় পর্যায়ে ক্যাম্প করে আরও অধিক সংখ্যক জনগণকে টিকা প্রদান করার। সেই ক্ষেত্রে ক্যাম্প তৈরিসহ জনগণের মধ্যে টিকা গ্রহণের ক্ষেত্রে সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, যতক্ষণ না পর্যন্ত দেশের বেশিরভাগ মানুষকে টিকার আওতায় না নিয়ে আসা হবে ততক্ষণ পর্যন্ত অতিমারি সময়ের ব্যবধানে ব্যাপক আকার ধারণ করবে। আর সরকার যেহেতু প্রাণান্তকর চেষ্টা করে যাচ্ছে বিভিন্ন উৎস থেকে টিকা সংগ্রহ করে মাধ্যমে দেশের ৮০ শতাংশ জনগণকে টিকার আওতায় নিয়ে আসার, এই কার্যক্রমকে স্থানীয় পর্যায়ে সফলভাবে সম্পন্ন করতে হলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের সহায়তা অত্যন্ত জরুরি।

দেশের দুর্যোগকালে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ যে দায়িত্ব পালন করতে পারে, কিংবা আইনের মাধ্যমে তাদের যে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে, কোভিড-১৯-এর বিপর্যয় মোকাবিলায় তার পরিপূর্ণ ব্যবহার এখন করা হয়নি। আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি যে সরকার স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে কমিটি গঠনের মাধ্যমে  করোনা মোকাবিলায় তাদের সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। তবে এই বিপর্যয় মোকাবিলায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি অন্তর্ভুক্ত করা গেলে সরকারের দায়িত্ব অনেকাংশে লাঘব হতো। বর্তমান পরিস্থিতির ব্যাপকতা গভীরভাবে উপলব্ধি করে সরকারের উচিত করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে স্থানীয় জনগণের করোনা অতিমারি সম্পর্কে সচেতন বৃদ্ধির মাধ্যমে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটানো।

লেখক: অধ্যাপক, লোক-প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

করোনাকালে জীবন, জীবিকা এবং লকডাউন দ্বন্দ্ব

করোনাকালে জীবন, জীবিকা এবং লকডাউন দ্বন্দ্ব

আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

উচ্চশিক্ষা স্তরে শিক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তা ও করণীয়

উচ্চশিক্ষা স্তরে শিক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তা ও করণীয়

লকডাউন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত যে কারণে যুক্তিযুক্ত

লকডাউন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত যে কারণে যুক্তিযুক্ত

করোনাকালে গণমাধ্যম: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২১, ১৬:৩০
মো. সামসুল ইসলাম এই করোনাকালে আমাদের মিডিয়া জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে কিনা সেটা নিয়ে গণমাধ্যমের শিক্ষক, সমালোচক, ব্যবহারকারীরা প্রশ্ন তুলতে পারেন। তবে এসব প্রশ্নের উদ্দেশ্য কোনও ব্যক্তি সাংবাদিকদের বোধবুদ্ধিকে চ্যালেঞ্জ করা নয়। বরং শিল্প হিসেবে গণমাধ্যম যখন বহুমুখী সমস্যার সম্মুখীন তখন এ ধরনের আলোচনা গণমাধ্যমকে জনগণের প্রকৃত চাহিদা জানানোর প্রয়াস বলা যেতে পারে।

প্রথমেই বলতে চাই, এই করোনাকালে প্রাথমিকভাবে যে কয়েকটি শিল্প খাত অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছিল তার মধ্যে গণমাধ্যম নিঃসন্দেহে একটি। শুধু তা-ই নয়, করোনায় অনেক সাংবাদিক আক্রান্ত হয়েছেন, অনেকে মারাও গিয়েছেন। তবে গণমাধ্যমের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা কিন্তু লক্ষণীয়।      

স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন দুর্নীতি উদঘাটনসহ, ভ্যাকসিন ইস্যুতে বাংলাদেশের মিডিয়া কভারেজ যেকোনও বিচারেই প্রশংসনীয় বলা যায়। দেশের পলিটিক্যাল-ইকোনমিক ইস্যুসমূহ আলোচনায় আমাদের গণমাধ্যমের রয়েছে বিশাল অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্য। সমসাময়িক বিভিন্ন ম্যাক্রো ইস্যুতে আমাদের গণমাধ্যম জনমত তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্বাস্থ্য খাত, ভ্যাকসিন বা লকডাউনের পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা অবশ্যই জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এবং সেখানে গণমাধ্যম তার ভূমিকা বেশ ভালোভাবেই পালন করেছে।

এ পর্যন্ত স্বীকার করতে আমার কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু গণমাধ্যম বিষয়ের একজন শিক্ষক বা সমালোচক হিসেবে নয়, বরং একজন সাধারণ পাঠক বা দর্শক হিসেবে  এই করোনাকালে মূলধারার গণমাধ্যমের আমি খুব একটা উপযোগিতা দেখিনি। পত্রিকার পাঠক সংখ্যা এ সময়ে হ্রাস পায়, রেডিও বা টেলিভিশনও জনগণের বিপদকালের বন্ধু হয়ে উঠতে পারেনি।  তৃতীয় বিশ্বে গণমাধ্যমের কাজতো শুধু জাতীয় ইস্যু আলোচনার মাধ্যমে নীতিনির্ধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করা নয়, বরং বিভিন্ন সংকট মুহূর্তে জনগণের পাশে থেকে সমস্যার বাস্তব সমাধান দেওয়া।

আমাদের কিন্তু এটা প্রথমেই বুঝতে হবে যে দেশের সাধারণ মানুষ এখন একদিকে করোনা ও অপরদিকে অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত। করোনা সংকট এখন দীর্ঘমেয়াদি হয়ে পড়েছে, দেশের গ্রামগঞ্জে করোনা ছড়িয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে করোনার প্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা ও কর্মসংস্থানে সংকট। শহর ছাড়ছে মানুষ। কিন্তু গ্রামে কর্মসংস্থান যথাযথ চিকিৎসা সেবা পাওয়া যথেষ্ট কঠিন। আবারও লকডাউন শুরু হয়েছে। সরকারি সাহায্য যে অপ্রতুল সেটা তো মিডিয়ায় অহরহই আসছে।

এরকম অবস্থায় গণমাধ্যম যদি তার প্রথাগত সাংবাদিকতার ধারণা থেকে বের হয়ে এসে জনগণের পাশে দাঁড়াতো তাহলে সাধারণ জনগণ নিশ্চয়ই উপকৃত হতো। পত্রিকায় একদিনে খুব বেশি আলোচনার অবকাশ নেই। আমি শুধু দুই একটা উদাহরণ দেই।

যেমন কোরবানি ঈদের আগে আমি দেখছিলাম ফেসবুকে কেউ কেউ জানতে চাইছিলেন যে তাদের কোরবানিটা গরিবদের মাঝে দেওয়ার কোনও ব্যবস্থা আছে কিনা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যদি নিজের নামে কোরবানি দিয়ে সেখানকার গরিবদের মাঝে মাংস বিতরণের কোনও ব্যবস্থা থাকে, আমার বিশ্বাস অনেকেই এগিয়ে আসতেন। আমি দেখেছি আমার পরিচিতদের মধ্যে অনেকেই এরকম চিন্তা করছিলেন।  কিন্তু দুই একটা ছাড়া খুব বেশি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠানের আমি নাম দেখলাম না।

গণমাধ্যম তো পারতো মানুষজনকে এতে উদ্বুদ্ধ করতে। আমাদের মূলধারার গণমাধ্যমের দেশব্যাপী যে বিশাল নেটওয়ার্ক, তাদের পক্ষে সহজ ছিল চ্যারিটি প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপারে ভেরিফাই করে শহরবাসীকে তাদের দানের ব্যাপারে আশ্বস্ত করা। ধর্মীয় নিয়ম অনুসারে কোরবানির টাকা মানুষকে সরাসরি দান করা যায় না। আমি এ কারণেই এটা লিখছি যে  এই ঈদে ঢাকায় আমার এলাকায় খুব বেশি ভিক্ষুক দেখি না। লকডাউনের ঘোষণায় অনেকেই ঢাকা ছেড়ে গেছে। করোনায় আক্রান্তদের ডাক্তাররা প্রোটিন খেতে বলছেন। সঠিক ব্যবস্থাপনায় ধনীরা পারতো গ্রামাঞ্চলে গরিবদের প্রোটিনের চাহিদা কিছুটা পূরণ করতে। এ ব্যাপারে মিডিয়া একটা ভূমিকা রাখতে পারতো।

তবে এসব বলার অর্থ এই নয় যে আমি জনগণের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্র বা সরকারের দায়িত্বকে অস্বীকার করতে চাইছি। গণমাধ্যম অবশ্যই সরকারকে চাপ দিবে খাদ্য সাহায্য, আর্থিক প্রণোদনা, চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে। কিন্তু আমরা তো বাস্তব অবস্থা দেখছি। জানছি মানুষজনের দুর্দশার অবস্থা, গণমাধ্যমেই পড়ছি বিভিন্ন পরিসংখ্যান। সাহায্য প্রত্যাশী আর সাহায্য প্রাপ্তদের সংখ্যায় রয়েছে বিশাল ফারাক। সর্বোপরি সরকারি নেতারাই তো প্রতিদিন বিত্তবানদের এগিয়ে আসতে বলছেন।

কোরবানি তো একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, কিন্তু সহায়তা  তো সারা বছরই করা যেতে পারে বা উচিত। একজন নাগরিক তো প্রশ্ন করতেই পারেন যে গণমাধ্যম খবর দিচ্ছে শ্রমজীবী মানুষের কষ্টের কথা, জানাচ্ছে সন্তানকে খাবার দিতে না পেরে অসহায় পিতার আত্মহত্যার কথা, কিন্তু কার কী কর্তব্য আর বিত্তবানরা কোথায় কীভাবে কাকে সাহায্য করতে পারেন সে তথ্য দিচ্ছে না। অনেক শহুরে মধ্যবিত্তের অনেকেই খুব কষ্ট পান যখন গণমাধ্যমে এ ধরনের খবর দেখেন এবং নিজেকে অপরাধী মনে করেন এটা ভেবে যে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বা কর্মহীন মানুষদের রেখে সবাই তিনবেলা পেটপুরে খাচ্ছেন। আমি দেখেছি অনেকেই চান যে এই ক্রান্তিকালে তাদের সামান্য আয়ের কিছু অংশ প্রকৃত অনাহারীর কাছে যাক। কিন্তু গণমাধ্যমের কাছে এ তথ্য কেউ পাচ্ছে না। কেউ নিশ্চয়তা দিচ্ছে না তার অর্থ প্রকৃত অভাবীরা পাবেন।

বাঙালি দানশীল, আবেগপ্রবণ। তারা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছেন। কিছু দিন আগে আমি দেখলাম যে নির্যাতিত প্যালেস্টাইনিদের নামে সোশ্যাল মিডিয়ায় টাকা উঠানো হচ্ছে এবং অনেকেই নাকি বিশাল অংক দান করেছে। যদিও পরে এ টাকা আদতে কে পাবে সেটা নিয়েও ফেসবুকে বিতর্ক দেখেছি। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়াকে তো বিশ্বাস করা যায় না। আমার এক পরিচিত ব্যক্তি শুনলাম ফেসবুক দেখে করোনা রোগীদের দাফন কাফনের জন্য নাকি বিশাল অংক দান করেছেন। যেহেতু মূলধারার মিডিয়া এ সংক্রান্ত কোনও তথ্য দেয়নি তার টাকা আসলে কে পেয়েছে, সেটা নিয়ে আমিও সন্দিহান।

যাহোক সঠিকভাবে উপস্থাপনা করতে পারলে গণমাধ্যম কিন্তু মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে। আমি আমার একটা নিজের ঘটনাই বলি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার পরপরই আমি একটা ইংরেজি সাপ্তাহিকে সম্পাদনা সহকারী বা এডিটোরিয়াল এসিস্ট্যান্ট হিসেবে যোগ দেই। সেই সাপ্তাহিকেরই একজন প্রতিনিধি একদিন আমাকে এক রিকশাওয়ালাকে সাহায্যের আবেদন জানিয়ে এক লেখা এনে দেয়, যার দুই মেয়ে থ্যালাসেমিয়ায় ভুগছে। সেই সাংবাদিক আমাকে অনুরোধ করেন লেখাটিকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে সাপ্তাহিকে প্রকাশ করতে। আমি খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে লেখাটিকে ডেস্কে ফেলে রাখি। এরকম কত লেখাই তো পত্রিকায় আসে! তাছাড়া এই দুর্বল বাংলাকে কষ্ট করে ইংরেজি করতে হবে, সেই ঝামেলা তো ছিলই।    

আমি যথারীতি সেই লেখার কথা ভুলে যাই। দুই এক সপ্তাহ পরে সেই সাংবাদিক আবার আমাকে বলেন যে মেয়ে দুইটার অবস্থা ভালো না, অমুক হাসপাতালে তারা ভর্তি আছে, আপনি দেখেন কোনও নিউজ করা যায় কিনা!

আমার মনে হলো যে আমি হুঁশ ফিরে পেলাম। সেদিন ছিল সাপ্তাহিকটি প্রকাশের দিন। সব কাজ ফেলে আমি আগে সেটিকে অনুবাদ করলাম। তারপর সেদিনই সংবাদটি প্রকাশিত হলো।

এরপর যা হলো তা অভাবনীয়! দেশ-বিদেশ থেকে বিভিন্নজন আমাদের ফোন করা শুরু করলো। আমি শুনলাম অনেকে হাসপাতালে ছুটে গিয়েছে তাদের সাহায্য করতে। কিছু দিন পর এক পাঁচতারকা হোটেল তাদের পুরনো ঝাড়বাতি বিক্রির সমস্ত টাকা সেই মেয়ে দুইটাকে দান করে। তারা নিঃসন্দেহে উপকৃত হয়েছেন। আমি এটুকুই জানি। এরপরে কী ঘটেছে তা আমি জানি না।

সাংবাদিকতা বিষয়ে পড়াশোনা করলেও এই ঘটনার মাধ্যমে গণমাধ্যম বা সাংবাদিকতার শক্তি সম্পর্কে আমার প্রথম চাক্ষুষ ধারণা হয়। পরবর্তীতে এরকম আরও ঘটনা দেখেছি বা জেনেছি। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে গিয়ে সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীদের আমি প্রায়শই বলি, সঠিক ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য এবং স্টোরিটেলিংয়ের মাধ্যমে একজন সাংবাদিক পারেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের আবেগ, অনুভূতিকে আলোড়িত করতে, আর্ত মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসতে।

এক্ষেত্রে পশ্চিমা সাংবাদিকতার টেক্সট আর তাদের সাংবাদিকতা শিক্ষার হুবহু অনুকরণ আমাদের জন্য ফলদায়ক হবে না। পশ্চিমা দেশগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী আর আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি দুর্বল। সুতরাং সব দেশে একই ধরনের সাংবাদিকতা চলতে পারে না।  একদিকে ভয়াবহ করোনা পরিস্থিতি অন্যদিকে লকডাউন, এ সময়ে আর্তমানবতার পাশে দাঁড়াতে আমাদের সাংবাদিকতাকে ভিন্নভাবে চিন্তা করতে হবে বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি।

লেখক: কলামিস্ট; প্রধান, সাংবাদিকতা বিভাগ, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

ইমেইলঃ [email protected]
 
       
/এসএএস/এমওএফ/

বডি শেমিং ও আমাদের ‘বাজারি মন’

আপডেট : ২২ জুলাই ২০২১, ১৭:২৪

জোবাইদা নাসরীন স্কুলে সহপাঠীরা, শিক্ষকরা তাকে বুলিং করতো। স্কুলের খেলায় অংশ নিতে চাইলেও শিক্ষকরা তাকে বুলিং করেন। তারপর থেকে সামীন খুব বেশি আপসেট হয়ে পড়ে এবং ওজন কমানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। বাবা-মা প্রথম দফায় তার ওজন কমাতে খুশি হলেও বুঝতে পারেননি তার সন্তান কীভাবে মানসিক এবং শারীরিকভাবে মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে। তারপর আমরা জেনেছি সেই সামীনের মৃত্যুর কথা। আমরা আরও জেনেছি বিরল রোগ অ্যানোরেক্সিয়া নারভোসায় আক্রান্ত হয়ে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বনশ্রী শাখার দশম শ্রেণির ছাত্র সামীনের মৃত্যুর কথা।

স্কুলের সহপাঠী ও শিক্ষকদের বুলিংয়ের শিকার হয়ে সামীনের এই মর্মান্তিক পরিণতি। সামীনের মৃত্যুর মাধ্যমে আমরা এই রোগ সম্পর্কে তথ্যও জেনেছি। অ্যানোরেক্সিয়া নারভোসা একটি বিরল রোগ, যা ব্যক্তির মনোজগতে খাওয়া-দাওয়া নিয়ে ভয়াবহ ভীতি ও নানা ধরনের মানসিক সমস্যা তৈরি করে। আক্রান্ত ব্যক্তি অনেক সময়ই না খেয়ে কিংবা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম খেয়ে ওজন কমাতে চান এবং নিজের ওজন নিয়ে সব সময় মানসিক অস্বস্তিতে থাকেন। ওজন বেড়ে যাওয়া নিয়ে সব সময় এক ধরনের ভয়ে থাকেন।  

শুধু সামীন নয়, আশপাশের অনেককেই দেখি মোটা বলে, গায়ের রঙ কালো বলে, খাটো বলে নানা ধরনের বুলিংয়ের শিকার হন। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও এ ধরনের ঘটনার শিকার হয়ে গত দুই বছর আগে একজন ছাত্র আত্মহত্যা করেছিল। সেই ছেলেটির গায়ের রঙ কালো ছিল, দেখতে প্রচলিত ধারায় ‘স্মাট’ ছিল না। সে গ্রাম থেকে আসা– আরও কত কী! সে জন্য সব সময় বুলিংয়ের শিকার হতো।

আমার বিভাগের  এক শিক্ষার্থী বেশ কয়েক মাস ক্লাসে অনুপস্থিত ছিল বলে আমি তখন তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানতে পারি, ওই শিক্ষার্থী তার সহপাঠীদের দ্বারা নানা ধরনের বডি শেমিংয়ের শিকার হন। এমনকি সে যখন সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতো তার সহপাঠীরা বলতো সিঁড়ি ভেঙে যাবে, লিফটে উঠলে বলতো লিফট ছিঁড়ে পড়ে যাবে। এরপর সেই শিক্ষার্থী ক্লাসে আসা বন্ধ করে দিলো এবং মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। তার পিতামাতা সচেতন ছিলেন বলে হয়তো বিষয়টি পরবর্তীতে সামাল দেওয়া গেছে এবং মেয়েটি বড় কোনও দুর্ঘটনার শিকার হয়নি।

‘বডি শেমিং’ শব্দটার সঙ্গে এ দেশের মানুষ খুব বেশি পরিচিত ছিল না, বরং আমাদের ছোটবেলায় বাচ্চাদের ক্ষেত্র নাদুস-নুদুস অথবা ‘সুইট ফ্যাট’ শব্দগুলোর প্রচলন ছিল বেশি। কিন্তু তখন বডি শেমিং বা শরীর নিয়ে নানা ধরনের ব্যঙ্গ বিদ্রুপের চল খুব একটা ছিল না। এমনকি আমরা শুনতাম ঢাকাই ছবির নায়িকাদের মানুষের কাছে আরও আদৃত হওয়ার জন্য বাড়তি প্যাড পরিয়ে স্বাস্থ্যবান বানানো হতো। কারণ, তখন পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষ এই বডি শেমিংয়ের মধ্যে নিজেদের ঢুকাতে পারেনি।

এখন আমরা যদি দেখি এই বডি শেমিং কী এবং কেন এটি এখন এত বেশি চর্চিত হচ্ছে? বডি শেমিং নামক নিপীড়ন থেকে কোনও বয়সের মানুষই রেহাই পাচ্ছে না। বডি শেমিং হলো কোনও ব্যক্তির শরীর নিয়ে মন্তব্য করে তাকে হেনস্তা করা। পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশে কারও শরীর নিয়ে যেকোনও মন্তব্য করাকে যৌন হয়রানি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অথচ আমাদের দেশে জারি থাকা বডি শেমিংকে অনেক সময় ঠাট্টা-মশকরার বিষয় হিসেবে পাঠ করা হয় এবং এর মধ্য দিয়ে কাউকে তার শরীরের বিষয়ে লজ্জা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বিষয়টি যে মোটেও কোনও হাস্যকর কিংবা ঠাট্টার নয়, এটি এত বেশি রাজনৈতিক বিষয়, সামীনের মৃত্যু আমাদের তা দেখিয়ে দিলো।

কবে থেকে এই বডি শেমিং শুরু হলো। মানুষকে দেহের মাপকাঠিতে মাপা এবং এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা। বেশ কয়েক বছর আগে একটি ফার্নিচার কোম্পানির বিলবোর্ডে দেওয়া একটি খাটের বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল , ‘স্লিম ইজ বিউটিফুল’। তাহলে কোম্পানিগুলো প্রচার করতে থাকে যে স্লিম হওয়াই কাঙ্ক্ষিত। তখন সমাজ সেটিকেই আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে। কিংবা  বিপরীতটাও হতে পারে। খুব মজার বিষয় হলো, আমাদের ছোটবেলায় আমরা বেশ ‘নাদুস-নুদুস’ পুতুল বাজারে দেখতাম। কিন্তু যখন থেকে বার্বিডল বাজারে এলো, সেভাবে নারীর শরীরের স্ট্যান্ডার্ড পরিমাপ নির্ধারণ করা শুরু হলো। শুরুটা নারীকে নিয়ে হলেও এখন বাদ যাচ্ছে না পুরুষও।

শুধু শরীরের বাড়তি ওজন নিয়েই নয়, গায়ের রঙ নিয়ে সবচেয়ে বেশি শেমিং হয় তবে আমাদের সমাজে অনেকটাই গা সওয়া হয়ে গেছে। তবে এটি এখন পৌঁছেছে বিভিন্ন অঙ্গ -প্রত্যঙ্গ পর্যায়ে। বিশ কয়েক বছর আগে আমাদের এক নারী শিক্ষার্থী মুখে নেকাব পরে আসতে। নেকাবের কারণে তার কথা বোঝা যেত না। একদিন তাকে বললাম এখন তো আশপাশে কেউ নেই, তুমি নেকাব খুলে কথা বলতে পারো। মেয়েটি কিছু বললো না, নেকাবও খুললো না। পরে জানতে পারলাম মেয়েটির দাঁত কিছুটা উঁচু বলে তার রুমমেটসহ অন্যরা তাকে নিয়ে খুব হাসাহাসি করতো। এই হাসাহাসির কারণে মেয়েটির মানসিক অবস্থা পরবর্তীতে এমন হয়েছিলে যে সে রাতে ঘুমানোর সময়ও নেকাব পরতো। মানে তার দাঁত যেন কেউ দেখতে না পায়। এর বাইরেও যাদের কথা বলায় একটু জড়তা আছে তাদের ‘তোতলা’ কিংবা অন্য যেকোনও ধরনের শারীরিক অসামর্থ্যতা আছে তাদের নানা কটু ‘পদবি’ দিয়ে হেয় করার প্রবণতা খুবই প্রকট।

শরীর নিয়ে লজ্জা, গায়ের রঙ নিয়ে লজ্জা, দাঁত-চোখ নিয়ে লজ্জা দিয়ে, হেয় করে আমরা একে অপরকে মৃত্যুর দিকে যেমন নিয়ে যাই, তেমনই নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসের পরিবর্তে ঘৃণা করার মনস্কতা তৈরি করাই।

স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন বুলিং, শেমিং অহরহ ঘটছে। এটি রোধে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এবং কর্মক্ষেত্রে ডিসিপ্লিনারি কমিটিগুলোকে জোরালোভাবে কাজ করতে হবে। এই বুলিং এবং শেমিংয়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা অত্যন্ত জরুরি।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ইমেইল: [email protected]gmail.com

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

কয়লা হয়ে বস্তায় ঢোকা জীবন

কয়লা হয়ে বস্তায় ঢোকা জীবন

তদন্ত কমিটির রিপোর্টগুলো কোথায় যায়?

তদন্ত কমিটির রিপোর্টগুলো কোথায় যায়?

মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছেন ‘কেন গেলো’ প্রশ্নে

মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছেন ‘কেন গেলো’ প্রশ্নে

কল্পনা চাকমা সব সময়ই জাগরুক

কল্পনা চাকমা সব সময়ই জাগরুক

ঈদ আনন্দে ভেসে যাক করোনার মহামারি

আপডেট : ২২ জুলাই ২০২১, ১৭:২১
সালেক উদ্দিন ২১ জুলাই পালন হলো পবিত্র ঈদুল আজহা। সারা দুনিয়ার মুসলমানদের জন্য  আনন্দ উৎসবগুলোর মধ্যে একটি হলো ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। ছোট-বড় ধনী-গরিব সবাই একসঙ্গে সমবেত হয়ে ঈদের জামাতে নামাজ আদায়, খুৎবা শোনা, কোলাকুলি করা, পশু কোরবানি করা, কোরবানির মাংস বণ্টন ইত্যাদি মিলিয়ে সে এক আনন্দঘন দিন ঈদুল আজহা।

মুসলিম বিশ্ব এমন একটি সময়ে এই আনন্দ উৎসবে যোগ দিয়েছে যখন পৃথিবী করোনা মহামারিতে জর্জরিত। তারপরও কোরবানির ঈদ তো ঈদই। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মুসলমানদের জন্য এটি একটি বড় ইবাদতের দিবস। এই দিন সারা বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান ঈদের জামাতে নামাজ আদায় করবেন এবং মহান আল্লাহতালার কাছে বিশ্ববাসীর শান্তির জন্য প্রার্থনা করবেন। প্রার্থনা করবেন মানুষের কল্যাণের জন্য, প্রার্থনা করবেন ভ্রাতৃত্ববোধ সমন্বিত রাখার জন্য, ক্ষুধা যুদ্ধ-বিগ্রহমুক্ত শান্তিময় পৃথিবীর নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের মঙ্গলের জন্য। সর্বোপরি বর্তমান করোনা মহামারির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য।

ইসলাম ধর্মের ঈদুল আজহার ঈদ অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। মহান আল্লাহ  তার দুই প্রিয় বান্দার পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের জন্য ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ প্রবর্তন করেছেন। আল্লাহ তার নবী হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে নির্দেশ করেছিলেন তার শিশুপুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে আল্লাহর রাস্তায় কোরবানি দেওয়ার জন্য। যেমন নির্দেশ তেমন কাজ। ইমানের জোরে হজরত ইব্রাহিম (আ.) তার শিশুপুত্রকে মক্কা নগরীর মিনা প্রান্তরে নিয়ে গেলেন আল্লাহর রাস্তায় কোরবানি করতে। ইসমাইল (আ.) চুলমাত্র বিচলিত হলেন না বরং স্বতঃস্ফূর্তভাবে আল্লাহর হুকুমে কোরবানি হওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন। বৃদ্ধ পিতা ইব্রাহিম (আ.) নিজের চোখ বন্ধ করে তার শিশুপুত্রের গলায় আল্লাহু আকবার বলে ছুরি চালালেন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন হজরত ইব্রাহিম (আ.)। উত্তীর্ণ হলেন হজরত ইসমাইল (আ.)। মহান আল্লাহ’র কুদরতে হজরত ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি পশু কোরবানি হয়ে গেলো সেখানে। আর সেই থেকেই প্রবর্তিত হলো মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের জন্য আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদে পশু কোরবানি করার রীতি।

আল্লাহ পবিত্র কোরআনে কোরবানি করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। কোরবানির সম্পর্কে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন,  ‘সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কোরবানি করলো না সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।’ ঈদুল আজহা হলো কোরবানির মাধ্যমে মহান আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের উৎসব।

পৃথিবীময় করোনা মহামারির সময় এই কোরবানি হোক শুধু পশু কোরবানি নয়। মানুষের ক্ষুদ্রতা-নীচতা, স্বার্থপরতা-হীনম্মন্যতা, দীনতা, অর্থ ও অহংকারের কোরবানি। সর্বোপরি এই মহামারির সময় মানুষের পাশে দাঁড়াবার প্রত্যয়। এই কোরবানির ঈদের পর করোনা মহামারির প্রকোপ আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা বিশেষজ্ঞরা করছেন। আল্লাহ আমাদের সেই মহাবিপদের হাত থেকে রক্ষা করুন। ঈদ আনন্দে  করোনার মহামারিকে পৃথিবী থেকে ভাসিয়ে নিয়ে যাক দূরে বহু দূরে।
 
আমরা আশা করবো ‘পিছে লোকে কিছু বলে’ নীতি পরিহার করে এ সময়ে দেশের সরকারের সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং তার শতভাগ বাস্তবায়ন করবে। সংসদ সদস্যদের  চাইবো নিজ নির্বাচনি এলাকায় অবস্থান এবং মহামারির হাত থেকে জনসাধারণকে রক্ষায় আত্মনিয়োগ। এক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা অনেক বেশি কার্যকর হবে। দেশের সরকার, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি যে যাই হোন তারা জনগণের সেবক। এখনই সময় সেবকের সেবার উত্তম স্বাক্ষর রাখার।
 
লেখক: কথাসাহিত্যিক
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

ঈদযাত্রা এবারের জন্য বন্ধ হোক

ঈদযাত্রা এবারের জন্য বন্ধ হোক

দৃষ্টি এখন কঠোর লকডাউনের ওপর

দৃষ্টি এখন কঠোর লকডাউনের ওপর

বাবাদের যেন বৃদ্ধাশ্রমে যেতে না হয়

বাবাদের যেন বৃদ্ধাশ্রমে যেতে না হয়

ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের ছোবল

ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের ছোবল

আহা জীবন, আহা কলেজ জীবন!

আপডেট : ২২ জুলাই ২০২১, ১৬:৫৯

প্রভাষ আমিন বাচ্চাদের সঙ্গে দেখা হলে আমরা প্রথম যে প্রশ্নটি করি, কোন ক্লাসে পড়ো? তবে ইদানীং এই প্রশ্নটি করতে আমার অস্বস্তি লাগে। যাকে প্রশ্নটি করা হয়, সে বিব্রত হয়। কোন ক্লাসে পড়ে বা কোন ক্লাসে পড়তো, এই প্রশ্নে তারা তালগোল পাকিয়ে ফেলে। ১৫ মাসেরও বেশি সময় দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় কে কোন ক্লাসে পড়তো, কোন ক্লাসে উঠেছে; সব এলোমেলো হয়ে যায়।

করোনা সংক্রমণ শুরুর পর গত বছর ১৭ মার্চ থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। তারপর দফায় দফায় বেড়েছে বন্ধের মেয়াদ। বিভিন্ন সময়ে স্কুল খোলার, পরীক্ষা নেওয়ার নানান পরিকল্পনা করা হলেও করোনার দাপটে কোনোটাই বাস্তবায়ন করা যায়নি। ক্লাস তো নয়ই, এই সময়ে কোনও পরীক্ষাও হয়নি। সবাই অটো পাস করে ওপরের ক্লাসে উঠে গেছে। ওপরের ক্লাসে উঠলেও ক্লাসরুমের দেখা পায়নি। ক্লাসরুম বলতে তারা বোঝে, জুম বা গুগল ক্লাস।

আগে শিক্ষার্থীরা স্কুল কবে বন্ধ হবে সেই অপেক্ষায় থাকতো। আর এখন কবে স্কুল খুলবে, সেই অপেক্ষায় তাদের দিন কাটে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন সংগ্রামও করেছে। তাদের অবস্থা হয়েছে হুমায়ূন আহমেদের নাটকের মতো। বহুব্রীহি নাটকে আসাদুজ্জামান নূরের চরিত্রের সংসার ছিল মা-মরা দুই বাচ্চা নিয়ে। একদিন বাচ্চা দুটি তাদের বাবাকে এসে বললো, বাবা স্বাধীনতা মানে কী? আসাদুজ্জামান নূর জবাব দিলেন, স্বাধীনতা মানে ইচ্ছামত যা ভালো লাগে তাই করা। বাচ্চা দুটি বললো, আমরা তো স্বাধীন। কিন্তু আমাদের স্কুলে যেতে ভালো লাগে না। তখন তাদের বাবা বললেন, তাহলে স্কুলে যেও না। তারা খুব খুশি। মনের আনন্দে তারা স্বাধীনতা উপভোগ করতে লাগলো। তিন দিন যেতে না যেতেই দুজন কাচুমাচু হয়ে বাবার কাছে এসে বললো, বাবা স্বাধীনতা আর ভালো লাগছে না। আমরা স্কুলে যাবো। এখন দেশের চার কোটি শিক্ষার্থীরও আর ছুটি ভালো লাগছে না। তারা সবাই স্কুলে ফিরতে চায়। অবশ্য চাইলেও সবার আর ফেরা হবে না কখনও। সরকারের নানা উদ্যোগের কারণে স্কুলে ঝরে পড়ার হার কমে এসেছিল। আশঙ্কা করা হচ্ছে, করোনার কারণে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার আবার বেড়ে যাবে। এরইমধ্যে বাল্য বয়সেই অনেক মেয়ে শিক্ষার্থীর বিয়ে হয়ে গেছে। গরিব পরিবারের অনেকে পড়াশোনা ছেড়ে পরিবারকে সহায়তা করতে কাজে লেগে গেছেন। কয়েকদিন আগে রূপগঞ্জে হাসেম ফুড ফ্যাক্টরির আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া ৫২ জনের বেশিরভাগই শিশু, যারা করোনার আগে স্কুলে যেতো, এখন কারখানায় যায়। আসলে বর্তমানকে সুরক্ষিত রাখতে চার কোটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে আমরা জিম্মি করে ফেলেছি।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার ক্ষতি পোষাতে অনলাইন ক্লাস হচ্ছে বটে; কিন্তু দুধের স্বাদ যেমন ঘোলে মেটে না, তেমনি ক্লাসরুমের শিক্ষা অনলাইন ক্লাসে মেটে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তো শুধু বইয়ের পড়া শেখায় না, জীবন শেখায়। শুধু বই পড়েই যদি জ্ঞানী হওয়া যেতো, তাহলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আর দরকারই থাকতো না। একটি শিশুকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পরিবারের পরেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়, তারপর মহাবিদ্যালয়, তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা বিশ্বকে চিনবে, জীবনকে জানবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা নতুন বন্ধু পাবে, নতুন সমাজ পাবে, নেতৃত্ব দিতে শিখবে, বিপদে বন্ধুর পাশে দাঁড়াবে, সমস্যা এলে তার সমাধানের পথ খুঁজবে। অনলাইন ক্লাসে যা কখনোই সম্ভব না। মাসের পর মাস শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও তারা প্রমোশন পেয়ে যাচ্ছে। যাতে তাদের শিক্ষায় মারাত্মক ঘাটতি থেকে যাচ্ছে, ভবিষ্যৎ জীবনে যা তাদের অনেক দুর্ভোগ ফেলতে পারে। ক্লাসরুমের বিকল্প হিসেবে অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা হলেও, এই ব্যবস্থা বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিদ্যমান বৈষম্যকে আরও প্রকট করেছে। অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে ডিজিটাল ডিভাইস লাগে, হাইস্পিড ইন্টারনেট লাগে। শহরের শিক্ষার্থীরা পেলেও গ্রামের অনেক শিক্ষার্থী সব সুবিধা পান না। অথচ মূল্যায়নের সময় সবাইকে এক পাল্লায়ই মাপা হবে।  

দেড় বছরের করোনা আসলে তিন বছরের শিক্ষাসূচি লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। সব পর্যায়ে জট লেগে গেছে। করোনায় অন্য সব ক্ষতি হয়তো পুষিয়ে নেওয়া যাবে। সময়ে স্বজন হারানোর বেদনাও হয়তো প্রশমিত হয়ে যাবে। কিন্তু শিক্ষার যে ক্ষতি তা কোনোদিনই পূরণ হবে না। এই ঘাটতির ক্ষতি বয়ে বেড়াতে হবে দীর্ঘদিন। গত বছর অটোপাস নিয়ে তুমুল সমালোচনার মুখে সরকার এবার যেকোনও মূল্যে অন্তত পাবলিক পরীক্ষা নেওয়ার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপুমনি নভেম্বরে এসএসসি এবং ডিসেম্বরে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। বিষয় কমিয়ে, সিলেবাস কমিয়ে হলেও পরীক্ষা নেওয়া হবে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা উচিত কী উচিত না, এ নিয়ে গণভোট হলে দুই পক্ষেই সমান ভোট পড়বে। দুই পক্ষেই যুক্তির অভাব নেই। প্রতিদিন যেখানে দুইশ জন মানুষ মারা যাচ্ছে, তখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার আবদার করাটা কেউ মেনে নেবে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের আসলে প্রথম সুযোগেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার সুযোগ নিতে হবে। সরকার করোনার অনেক ব্যাপারে অনেক ছাড় দিলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে কোনও ঝুঁকি নেয়নি। যখন গার্মেন্ট কারখানা খোলা, শপিং মল খোলা, গণপরিবহন খোলা; তখনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধই রয়ে গেছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনের ব্যাপারে সরকারের অতি স্পর্শকাতরতা অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু বর্তমানকে সুরক্ষিত রাখতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ জিম্মি করা কোনও কাজের কথা নয়। গত বছরের ১৭ মার্চের পর নানা সময়ে সাধারণ ছুটি হয়েছে, বিধিনিষেধ হয়েছে, কঠোর বিধিনিষেধ হয়েছে, শিথিল লকডাউন হয়েছে, কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর খোলেনি। দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে, বিশ্বের এমন ১৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে। তবে এখন ইউনিসেফ আর ইউনেসকোও দ্রুত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে।

সম্প্রতি এক যৌথ বিবৃতিতে এ দুই প্রতিষ্ঠানের প্রধান এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, ‘বন্ধের ক্ষেত্রে স্কুলগুলো সবার শেষে এবং পুনরায় খোলার ক্ষেত্রে সবার আগে থাকা উচিত। স্কুলগুলো পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে সব শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর টিকা দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করা যায় না। স্কুল খোলার জন্য করোনা শূন্যের কোঠায় যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা যায় না।’

তবে বাংলাদেশে হয়েছে উল্টো। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে সবার আগে। কবে খুলবে তাও কেউ জানে না। আমারও মনে হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার সময় চলে এসেছে। পরবর্তী প্রথম সুযোগেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। যে শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি বিবেচনা করে মাসের পর মাস শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হচ্ছে, তারা তো আর ঘরে বসে থাকছে না। তারা বেড়াচ্ছে, খেলছে, শপিং মলে যাচ্ছে, গরিবরা কারখানায় যাচ্ছে। তাহলে আর স্কুল বন্ধ রেখে লাভ কী। বরং স্বাস্থ্যবিধি মেনে কীভাবে স্কুলে যাওয়া যায়, কীভাবে বাড়তি ক্লাস করে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া যায়, সেটাই ভাবতে হবে। ইউনিসেফ-ইউনেসকো প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার জন্য টিকা পর্যন্ত অপেক্ষা না করার কথা বললেও আমার মনে হয়, বাংলাদেশের টিকার যে সরবরাহ তাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের টিকা কর্মসূচির আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। ইউনিসেফ আর ইউনেসকো প্রধানের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, ‘স্কুলে যেতে না পারার কারণে শিশু এবং তরুণ জনগোষ্ঠী যে ক্ষতির সম্মুখীন হবে, তা হয়তো কখনোই পুষিয়ে নেওয়া যাবে না। শেখার ক্ষতি, মানসিক সংকট, সহিংসতা ও নির্যাতনের সম্মুখীন হওয়া থেকে শুরু করে স্কুলভিত্তিক খাবার ও টিকা না পাওয়া বা সামাজিক দক্ষতার বিকাশ কমে যাওয়া—শিশুদের ক্ষেত্রে তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি তাদের শিক্ষাগত অর্জন এবং সামাজিক সম্পৃক্ততায় এর প্রভাব দেখা যাবে।’ আমিও একমত তাদের এই যুক্তির সঙ্গে।

আগেই বলেছি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুধু পাঠ্যবই শেখায় না, জীবন শেখায়। আমার সবচেয়ে মায়া লাগছে, কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য। যেকোনও মানুষকে জিজ্ঞাসা করে দেখুন, তার জীবনের সেরা সময় কোনটা? সবাই বলবে, কলেজ জীবন। স্কুল পর্যন্ত সবাই অভিভাবকের কঠোর শাসনে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পুরো স্বাধীন হয়ে যায়। মাঝখানে কলেজ জীবন হলো, স্বাধীনতা আর পরাধীনতার দোলাচল, বৃহত্তর জগতের হাতছানি, এক রহস্যময় জগৎ। আমার ছেলে প্রসূন এবার এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। ১ এপ্রিল তাদের পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। সর্বশেষ পরিকল্পনা অনুযায়ী সেটা ডিসেম্বরে হওয়ার কথা। ডিসেম্বরে হবে কিনা বা আদৌ হবে কিনা কেউ জানে না। প্রসূনরা তবু কিছু দিন কলেজের দেখা পেয়েছে, তার পরের ব্যাচ এখনও কলেজ কাকে বলে জানে না। নিজের কলেজ জীবনের স্মৃতির সঙ্গে মিলিয়ে এই অসহায় প্রজন্মের জন্য আমার বড্ড মায়া  হয়। মনে আছে কলেজে ওঠার পর আমরা কত দুষ্টুমি করেছি। অনেক আপাত নিষিদ্ধ জিনিসের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়েছে কলেজে। আমাদের কলেজ জীবনে বাংলাদেশ ছিল স্বৈরাচার কবলিত। এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ব্যয় করেছি আমার যৌবনের উজ্জ্বল অধ্যায়। আর এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা জানলোই না কলেজ জীবন কাকে বলে। কলেজের চেহারা না দেখেই হয়তো কেটে যাবে তাদের কলেজ জীবন।

আহা জীবন, আহা কলেজ জীবন।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

লকডাউন থামলেও মৃত্যু থামেনি

লকডাউন থামলেও মৃত্যু থামেনি

তৈলাক্ত বাঁশের অঙ্ক !

তৈলাক্ত বাঁশের অঙ্ক !

হলি আর্টিজান: জঙ্গিবাদের উত্থান-পতন

হলি আর্টিজান: জঙ্গিবাদের উত্থান-পতন

স্মার্ট ডিভাইস গড়ে তুলছে আনস্মার্ট প্রজন্ম 

স্মার্ট ডিভাইস গড়ে তুলছে আনস্মার্ট প্রজন্ম 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

হাইতির নিহত প্রেসিডেন্টের শেষকৃত্যেও গুলির শব্দ

হাইতির নিহত প্রেসিডেন্টের শেষকৃত্যেও গুলির শব্দ

ক্ষমা চাইলেন সেই জার্মান সাংবাদিক

ক্ষমা চাইলেন সেই জার্মান সাংবাদিক

শহীদ মিনারে ফকির আলমগীরকে জানানো হবে শেষ শ্রদ্ধা 

শহীদ মিনারে ফকির আলমগীরকে জানানো হবে শেষ শ্রদ্ধা 

প্রবল বর্ষণে মহারাষ্ট্রে মৃত বেড়ে ১১০

প্রবল বর্ষণে মহারাষ্ট্রে মৃত বেড়ে ১১০

লকডাউনে বগুড়া থেকে হিলিতে চকলেট কিনতে যাওয়ায় জরিমানা

লকডাউনে বগুড়া থেকে হিলিতে চকলেট কিনতে যাওয়ায় জরিমানা

শেষ জন্মদিনে যে কথা দিয়েছিলেন অসহায়দের...

স্মরণে ফকির আলমগীরশেষ জন্মদিনে যে কথা দিয়েছিলেন অসহায়দের...

শনিবার তালতলা কবরস্থানে সমাহিত হবেন ফকির আলমগীর

শনিবার তালতলা কবরস্থানে সমাহিত হবেন ফকির আলমগীর

সিঁধ কেটে ঘরে ঢুকে গরু বিক্রির ১৫ লাখ টাকা লুট

সিঁধ কেটে ঘরে ঢুকে গরু বিক্রির ১৫ লাখ টাকা লুট

জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় মুখ্য হিট অফিসার নিয়োগ

জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় মুখ্য হিট অফিসার নিয়োগ

আ. লীগ বলছে জোট অটুট, শরিকরা বলছে অকার্যকর

আ. লীগ বলছে জোট অটুট, শরিকরা বলছে অকার্যকর

তরুণীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে যুবকের গলায় জুতার মালা

তরুণীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে যুবকের গলায় জুতার মালা

করোনায় শিক্ষা কর্মকর্তার মৃত্যু

করোনায় শিক্ষা কর্মকর্তার মৃত্যু

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune