X
বুধবার, ০৪ আগস্ট ২০২১, ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮

সেকশনস

এবারের ঈদটাও অন্যরকম!

আপডেট : ২১ জুলাই ২০২১, ১৫:৫১

রেজানুর রহমান সরল মনে কিছু সরল কথা বলতে চাই। কথাগুলো প্রশ্নের মতো মনে হতে পারে। কবিতার ভাষায় অনেকটা এরকম- ‘মাথায় কত প্রশ্ন আসে দিচ্ছে না কেউ জবাব তার’। আসলেই মাথায় অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। খুবই সহজ প্রশ্ন। কিন্তু উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না। অনেকেই হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, আজ বাদে কাল ঈদ। কাজেই ঈদ নিয়ে কথা বলুন। তা না করে কী সব ‘প্রশ্ন’ বলেই যাচ্ছেন। কথায় যুক্তি আছে। ঈদ মানে খুশি। ঈদ মানে আনন্দ। কাজেই খুশি আর আনন্দ নিয়েই কথা বলা যুক্তিযুক্ত। কিন্তু এবারের ঈদটাও অন্যরকম। আর দশটা স্বাভাবিক ঈদের মতো নয়। ঈদ মানেই নামাজ শেষে কোলাকুলি। এ বাড়ি থেকে ও বাড়িতে আনন্দমুখর ছোটাছুটি। কিন্তু করোনা সতর্কতায় এবারের ঈদেও কোলাকুলি না করতে বলা হয়েছে। দেশের মানুষ সরকারের এই নির্দেশ অথবা পরামর্শ যাই বলি না কেন বাস্তবে মানবে কি?

স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। ভিড়ের মাঝে যাবেন না। ঘরের বাইরে বের হলে অবশ্যই মাস্ক পরবেন- অন্তত এই তিন সতর্কতা মেনে চললেই করোনার সংক্রমণ রোধ করা সম্ভব। কিন্তু কে শোনে কার কথা?

আমাদের দেশে হাট-বাজার ও রাস্তাঘাটে জনারণ্য দেখলে সত্যি বোঝার উপায় নেই প্রতিদিন হু হু করে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। বলা হচ্ছে ভিড় এড়িয়ে চলুন। কিন্তু হাট-বাজারে ভিড়ই হচ্ছে বেশি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখলাম শত শত মানুষ ছাগল নিয়ে রুদ্ধশ্বাসে যে যেদিকে পারে দৌড়াচ্ছে। ঘটনা কী? কেন তারা এভাবে দৌড়াচ্ছে? খোঁজ নিয়ে জানা গেলো কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পশুর হাট বসানো হয়েছে। সেজন্য ঝটিকা অভিযানে এসেছেন সরকারি লোকজন। তাই দেখে গরু ছাগল নিয়ে যে যেভাবে পারে হাট থেকে পালাচ্ছে। মানুষ পালাচ্ছে। সাথে সাথে গরু, ছাগলও পালাচ্ছে। কিছু সময় পর সবাই আবার ফিরে এসেছে হাটে। পুকুরে ঢিল দেওয়ার মতো অবস্থা। ঢিল পড়তেই পানির ঢেউ সরে যায় চারদিকে। পরক্ষণেই পুকুর শান্ত হয়। যেন একটু আগে কিছুই ঘটেনি!

এবার মাথায় যে প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে সে ব্যাপারেই বলি! ইভ্যালি নামে একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের মালিককে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা হয়েছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ইভ্যালির অধিকাংশ আউটলেট। ইভ্যালির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, সাধারণ মানুষের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। অভিযোগের ভূরি ভূরি প্রমাণও আছে। ইভ্যালির চটকদার বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পা দিয়ে দেশের অনেক মানুষ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। শোনা যাচ্ছে ইভ্যালি নাকি নিজেও দেনার মধ্যে আছে। তা যদি সত্যি হয় তাহলে যারা প্রতিষ্ঠানটির কাছে টাকা পাবে তাদের টাকা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা কী? একেবারে প্রকাশ্যে এই যে একটি প্রতারণামূলক ব্যবসার জাল সারাদেশে বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল–সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতর, বিশেষ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কি ব্যাপারটা একবারও টের পায়নি? ডেসটিনির প্রতারণামূলক ঘটনার কথা সবাই জানেন। ইভ্যালি ডেসটিনিরই আধুনিক সংস্করণ। বাজার মূল্যের অর্ধেক কমে যখন কোনও প্রতিষ্ঠান পণ্য সরবরাহের নিশ্চয়তা দেয়, একটা কিনলে পাঁচটা ফ্রি দেওয়ার কথা বলে বিজ্ঞাপন প্রচার করে, তখন তো স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে এটা কীভাবে সম্ভব? এখানে কোনও প্রতারণা হচ্ছে না তো? দেশের হাজার হাজার মানুষ প্রতারণার শিকার হওয়ার পর সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের টনক নড়েছে। ইভ্যালির মালিকদ্বয়কে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা হয়েছে। ধরা যাক, শেষ পর্যন্ত ইভ্যালির মালিকদ্বয়ের সাজা হলো। তাতে কি সাধারণ মানুষ তাদের হাজার হাজার টাকা ফেরত পাবে? ইভ্যালিকে কি আগে থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা যেত না? যাতে প্রতিষ্ঠানটি দেশের সাধারণ মানুষকে প্রতারণা করার সুযোগ না পায়। অবস্থাটা কি শেষ পর্যন্ত ডেসটিনির মতোই হবে? প্রতারণার দায়ে কারাগারে যাবেন ইভ্যালির মালিক। শারীরিক অসুস্থতার কথা বলে কারাগার থেকে হাসপাতালের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে আয়েশী জীবনযাপন করবেন। অনলাইনে কর্মীদের সাথে কথা বলে নতুন ব্যবসার ফাঁদ পাতবেন! অন্যদিকে টাকা ফেরত চাইতে চাইতে ক্লান্ত জনগণ একদিন বিধাতার কাছে বিচার দিয়ে শুধুই কাঁদবেন। একদিন হয়তো তাদের কান্নাও শুকিয়ে যাবে। কেউ হয়তো টাকার শোক ভুলতে না পেরে মারাও যাবেন। তারপরও হয়তো একদিন ভিন্ন নামে আরেক প্রতারণার জাল বিছানো হবে সারাদেশে।

নারায়ণগঞ্জে সজীব গ্রুপের কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৫২ জন  শ্রমিক পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেলো। কে ছেলে কে মেয়ে বোঝার উপায় নেই। প্রতিটি লাশ বড় কয়লা খণ্ডের মতো দেখতে হয়েছে। লাশ শনাক্তে ডিএনএ টেস্ট করতে হবে। এরপরও ২০/২২ দিন পর বোঝা যাবে কে ছেলে কে মেয়ে। কোন লাশ কার? উদ্বেগজনক বিষয় হলো, পুড়ে যাওয়া লাশগুলো বেশি দিন মর্গে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিয়েছে। এদিকে প্রচার মাধ্যমেই শুনলাম সজীব গ্রুপের মালিক নাকি বলেছেন, কারখানা থাকলে অগ্নিকাণ্ড হবে, মানুষ মারা যাবে এটাই স্বাভাবিক। এখানে আমার দায় কোথায়? মানুষের মৃত্যু নিয়ে এ কেমন তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য খেলা? অবাক হচ্ছি প্রতিষ্ঠানটির অনিয়মের ফিরিস্তি শুনে। একটা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বানাতে কিছু নিয়ম-কানুন মানতে হয়। অথচ ন্যূনতম নিয়মও নাকি অনুসরণ করেনি সজীব গ্রুপের প্রতিষ্ঠান। কারখানার গুদামে নাকি অনেক দাহ্য পদার্থ ছিল, যা নিয়ম-বহির্ভূত। একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা এবং ৫২ জন মানুষের করুণ মৃত্যুর পর জানা গেলো প্রতিষ্ঠানটিতে কোনও নিয়ম-কানুনের বালাই নেই। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন এ ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ইতোপূর্বে একাধিক প্রতিষ্ঠানে ঘটেছে। সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে রাষ্ট্রের কোনও নিয়ম-কানুন অনুসরণ করেনি অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান। তাহলে কি একটি প্রশ্ন জরুরি হয়ে দাঁড়ায় না? বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নিয়ম-নীতি অনুসরণ করছে কিনা তার দেখভালের জন্য রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট দফতর আছে। এই দফতরের আদৌ কাজ কী? ‘রোগী মরিবার পর ডাক্তার আসিলো’ বলে অনিয়ম বোঝাতে একটি বচন আছে। প্রতিষ্ঠানগুলো কি অক্ষরে অক্ষরে এই বচন অনুসরণ করে? তা না হলে যখনই কোনও দুর্ঘটনা ঘটে, মানুষ মারা যায়, তারপর অনিয়মের গল্প প্রকাশ হয় কেন? আগে কেন হয় না? এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তিরা কেন সঠিক দায়িত্ব পালন করেন না। চোর পালানোর পর বুদ্ধি বাড়লে তো কাজের কাজ কিছু হবে না। আমাদের দেশে সাধারণত কী হয়? কোনও ঘটনা ঘটলে প্রচারমাধ্যম থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। দুই একদিন তোলপাড় থাকে। তদন্ত কমিটি গঠনের সংবাদ আসে। তারপর আস্তে আস্তে ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়। পুরনো ঢাকার নিমতলীসহ একাধিক স্থানে ইতোপূর্বে বারবার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। অসংখ্য মানুষের করুণ মৃত্যু হয়েছে। প্রতিটি ঘটনার পরই আবাসিক এলাকায় দাহ্য পদার্থ বিক্রির দোকান অথবা প্রতিষ্ঠান রাখা যাবে না বলে প্রচারমাধ্যমে সংবাদ প্রচার/প্রকাশ হয়েছে। অথচ পুরনো ঢাকা থেকে একটিও কেমিক্যালের দোকান, প্রতিষ্ঠান সরে যায়নি। অচিরেই হয়তো বা আবারও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটবে। অসহায় কিছু মানুষ আগুনে পুড়ে মারা যাবে। পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা আসবে। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ হলেও কার্যত কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।

দেশে এই ধরনের অপরাধ অনিয়ম, দুর্নীতি অব্যাহত গতিতে বাড়তে থাকায় আস্থাহীনতার সংস্কৃতি বেগবান হচ্ছে! কোনও অপরাধ সংঘটিত হলে দেশের মানুষ এর তাৎক্ষণিক বিচার দেখতে চায়। দোষী ব্যক্তির শাস্তি হয়েছে এটাই আশা করে। কিন্তু তাদের সামনে এ ধরনের কোনও নজির নেই। বরং অপরাধীরাই প্রকাশ্যে দাপট দেখাচ্ছে। এ ধরনের নজির ভূরি ভূরি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের অসহায় গরিব, দুঃখী মানুষের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প চালু করেছেন। বিনে পয়সায় জমি ও বসতবাড়ি পেয়েছে দেশের অসহায় ভূমিহীন মানুষ। পৃথিবীর আর কোনও দেশে বোধকরি এ ধরনের জনবান্ধব কর্মসূচি চালু নেই। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, প্রধানমন্ত্রীর এই আন্তরিক উদ্যোগকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা ভূমিহীনদের ঘরবাড়ি অনেক স্থানে নির্মাণের পরপরই ধসে পড়েছে অথবা ঘরের দেয়ালে ফাটল ধরেছে। ভেবে পাই না মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই আন্তরিক উদ্যোগকে যারা প্রশ্নবিদ্ধ করলেন তাদের সাহসটা আসে কোত্থেকে?

আমাদের দেশে মৌসুমভিত্তিক কিছু সংকট তৈরি হয়। এটা যতটা না প্রাকৃতিক তার চেয়ে বেশি মানুষ্যসৃষ্ট সংকট। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে উৎসব-পার্বণে দ্রব্যমূল্যের  দাম কমিয়ে দেওয়া হয়। এটা হলো জনগণের জন্য উৎসব বোনাস। আর আমাদের দেশে উৎসব পার্বণ মানেই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। উৎসব-পার্বণ মানেই ক্রেতাকে ঠকানোর দুর্দান্ত প্রতিযোগিতা। উৎসব-পার্বণ  মানেই মহাসড়কে ভয়াবহ যানজট। বছরের পর বছর চলছে এই অনিয়ম, অস্থিরতা। পত্র-পত্রিকাসহ প্রচারমাধ্যমসমূহে দেশের সড়ক পথে ভয়াবহ যানজট ও মানুষের সীমাহীন ভোগান্তির চিত্র দেখানো হচ্ছে। প্রতি ঈদে এভাবেই দেখানো হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীসহ কর্মকর্তারা প্রতিশ্রুতি দেন আগামী বছর জনগণকে আর ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হবে না। পুরনো বছর যায়। নতুন বছর আসে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। কয়েকদিন আগে সড়ক পথে ঢাকা থেকে সৈয়দপুর পর্যন্ত গিয়েছিলাম। লকডাউনের মধ্যেও পথে পথে সীমাহীন যানজটের মুখোমুখি হয়েছি। লকডাউনেও কেন সড়কে যানজট? কারণ খোঁজার চেষ্টা করে দেখলাম, ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গগামী হাইওয়ের রাস্তাঘাট আগের চেয়ে বেশ উন্নত হয়েছে। একমুখী চলাচলের প্রশস্ত রাস্তা দেখে মন প্রাণ জুড়িয়ে গেলো। কিন্তু সমস্যার সৃষ্টি করেছে কিছু কালভার্ট অথবা ব্রিজ। কাজ থেমে আছে। ফলে বিশাল আকারের রাস্তা দিয়ে দূরপাল্লার গাড়ি সাই সাই করে ছুটে এসে কালভার্ট অথবা ব্রিজ নির্মাণের অপেক্ষাকৃত সরু রাস্তায় থেমে যাচ্ছে। এরকম বহু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে দেশের অধিকাংশ মহাসড়কে। করোনাকালে দেশের উন্নয়নমূলক কাজ তো আর থেমে নেই। উত্তরবঙ্গগামী মহাসড়কের কাজও চলেছে। কিন্তু কাজের গতি খুবই শ্লথ! অধিকাংশ জায়গায় দেখলাম রাস্তা নির্মাণের রড, ইট, বালু নিয়ন্ত্রণহীনভাবে পড়ে আছে। বৃষ্টিতে ধুয়ে নিচ্ছে বালু! দেখার কেউ নেই। ‘সরকারি মাল দরিয়া মে ঢাল’ এমন অবস্থা। অথচ কর্তৃপক্ষ একটু তৎপর হলেই উত্তরবঙ্গগামী মহাসড়কের তীব্র যানজট এবার ঠেকাতে পারতেন। এটা করা গেলে মানুষের এত ভোগান্তি হতো না।

মানুষের ভোগান্তি কি শুধু পথেই হচ্ছে? না, তা নয়। বাজারেও চলছে ভোগান্তি। ঈদ উপলক্ষে অধিকাংশ দ্রব্যমূল্যের দাম বেড়েছে। প্রচারমাধ্যমেই ‘দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই নাকি চালের দাম বেশি’– এমন খবর বেরিয়েছে। অথচ চাল উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে আমরাই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এগিয়ে আছি। তাহলে অন্য দেশের চেয়ে আমাদের দেশে চালের দাম কেন বাড়বে? এই প্রশ্নের উত্তর পাবো কার কাছে?

ঈদ মানেই খুশি, ঈদ মানেই আনন্দ। আর ঈদ মানেই ছুটি আর ছুটি। ঈদের ছুটিকে বাড়িয়ে দিতে দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা সাজিয়েছে। কিন্তু আমরা কি থাকবো দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সাথে? আমরা জেনে না বুঝে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন নিয়ে অনেক ভুল তথ্য দেই। ভুল কথা বলি। আমাদের টেলিভিশন নাটক নিয়ে অনেকের নাক সিটকানো ভাব লক্ষ করি। ভাবটা এমন- আমাদের নাটক, সিনেমা সেই অর্থে কিছুই হয় না। যারা এ ধরনের মন্তব্য করেন তারা না বুঝে করেন। না দেখে করেন। এই লেখাটির প্রয়োজনে আমি ১৫ জন নানা পেশার মানুষের সাথে কথা বলেছি। এদের ৯ জনই দেশের টেলিভিশন দেখেন না। কেন দেখেন না প্রশ্ন করে সন্তোষজনক উত্তর পাইনি। কয়েকজন দায়সারা উত্তর দিয়েছেন। বলেছেন, আমাদের দেশে আবার নাটক সিনেমা হয় নাকি? পাল্টা প্রশ্ন করেছি– আপনি শেষ কোন টিভি নাটক অথবা সিনেমা দেখেছেন তার নাম বলুন। ৯ জনই এর উত্তর দিতে পারেননি। অথচ জোর দিয়ে বললেন, এই দেশে নাকি কিছুই হয় না।

এটা এক ধরনের উন্নাসিকতা। আমরা কথায় কথায় অন্য দেশের উদাহরণ দেই। কিন্তু সেই উদাহরণটা দেশে সৃষ্টি করতে চাই না। বিদেশে গেলে নিয়ম মানি, দেশে এসে একই নিয়ম মানতে চাই না। বরং যে যত নিয়ম ভাঙে, নিয়ম অমান্য করে। দুর্নীতি করে, মানুষকে ঠকায় সেই যেন নায়ক। সত্যি কি সে নায়ক? এই প্রশ্নের উত্তর পাবো কার কাছে?

আগেই বলেছি এবারের ঈদটা অন্যরকম- এই শিরোনামে একটি গান বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সত্যি এবারের ঈদটা অন্যরকম। এবারও কোলাকুলি হবে না। জনসমাগম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সামাজিক দূরত্ব মানতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি মাস্ক পরার জন্য জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সরকারের এই নির্দেশ অথবা পরামর্শ অনুযায়ী নিয়ম-কানুন মানছি কি আমরা? না মানছি না। বরং অনিয়মকেই নিয়মে পরিণত করেছি। সেজন্যই নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় ৫২ জন অগ্নিদগ্ধ হওয়ার পরও নির্ভার হয়ে আছি যেন কিছুই হয়নি। প্রতারকরা প্রতারণার জাল ফেলে সাধারণ মানুষকে প্রকাশ্যে ঠকাচ্ছে দেখেও না দেখার ভান করছি। করোনার সংক্রমণ বেড়েই চলেছে। সেই সাথে প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। তবু আমাদের হুশ হচ্ছে না। এই যে অনিয়ম আর অনাচার, শেষ পর্যন্ত আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে বলা মুশকিল।

প্রিয় পাঠক, মাফ করবেন পবিত্র ঈদের খুশির দিনে এমন ভারী ভারী কথা লেখার জন্য। এবারের অন্যরকম ঈদটা আনন্দময় হোক। শুভ কামনা থাকলো সবার জন্য। ঈদ মোবারক।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক: আনন্দ আলো।

 

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

খুন, ধর্ষণ, পরকীয়া দর্শক নাকি ‘খাচ্ছে’ বেশ...

খুন, ধর্ষণ, পরকীয়া দর্শক নাকি ‘খাচ্ছে’ বেশ...

পরীমণির একটি প্রশ্ন!

পরীমণির একটি প্রশ্ন!

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সময় মতো খুলবে তো?

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সময় মতো খুলবে তো?

রোজিনা কি কারও আক্রোশের শিকার?

রোজিনা কি কারও আক্রোশের শিকার?

স্বাস্থ্যমন্ত্রী কি একাই ব্যর্থ?

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২১, ১৭:৫২

রুমিন ফারহানা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন খারাপ। করোনার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত সব অব্যবস্থাপনা, ব্যর্থতা, অদক্ষতা, মৃত্যু, আক্রান্তসহ সবকিছুর জন্য এককভাবে দায়ী করা হয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে এবং মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসেবে মূল দায় গিয়ে ঠেকেছে মন্ত্রীর ওপরে। যদিও করোনা ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে সরাসরি জনপ্রশাসন, পরিকল্পনা, অর্থ, বাণিজ্য, স্বরাষ্ট্র এবং সর্বোপরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জড়িত।

সংসদ চলাকালীন সংসদে এবং এরপর সংসদের বাইরে বিভিন্ন সময়ে রাজনীতিবিদ, গণমাধ্যম, সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সর্বত্র তিনি এত বেশি সমালোচিত হয়েছেন যে একপর্যায়ে জনগণের করের টাকা খরচ করে গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে মন্ত্রণালয়ের অবস্থান জানান দিতে হয়েছে তাকে। সেই বিজ্ঞাপনও এতটাই মিথ্যা আর ভুল তথ্যে ভরা যে সেটিও তাকে আরেক দফা সমালোচনার মুখে ফেলেছে।

ঈদের আগে এক দফা লকডাউন শেষে ঈদোত্তর পর পর ২৩ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সরকার প্রাথমিকভাবে ঘোষণা দিয়েছিল ‘সবচেয়ে কঠোরতম বিধিনিষেধ’-এর। পৃথিবীর সব দেশের জন্য যেখানে ‘লকডাউন’ শব্দটি যথেষ্ট সেখানে আমাদের দেশে কঠোর, কঠোরতম, সর্বাত্মক, পুরোপুরি ইত্যাদি বিশেষণ ব্যবহার করেও লকডাউন/বিধিনিষেধ কার্যকর করা যায়নি। অবশ্য কার্যকর করার বিষয়ে সরকার কতটুকু আন্তরিক ছিল সে প্রশ্ন নিশ্চিতভাবেই উঠতে পারে। এমনকি যখন আক্রান্ত এবং মৃত্যু দু’টিই ঊর্ধ্বমুখী, তখনও মাত্র ১৫ দিনের একটি লকডাউন কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। শেষমেশ মুখ খুলেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

এক জাতীয় দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যতবারই আমরা চাই সংক্রমণের লাগাম টানতে, বৈজ্ঞানিক পরামর্শ মতো সংক্রমণের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে, কোনোবারই তা শেষ পর্যন্ত নিতে পারলাম না। ক্ষতি তো সবার হচ্ছেই। পূর্বনির্ধারিত মেয়াদ অনুসারে আর পাঁচটা দিন কেন ধৈর্য ধরা গেলো না! সামনে পরিস্থিতি কী হবে তা নিয়ে খুবই শঙ্কিত। শুধু একটি সেক্টরের কারণে আমরা বারবার পিছিয়ে পড়ছি, অন্য সব সেক্টর ধৈর্য ধরে সহ্য করলেও একটি সেক্টর যেভাবে লাখ লাখ শ্রমিককে অমানবিকভাবে টানাহেঁচড়া করে নানাভাবে ঝুঁকি-দুর্ভোগের মুখে ঠেলে দেয়, তাদের চলাচল প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে পড়া লাখো মানুষের মধ্যে সংক্রমণের গতি ঊর্ধ্বমুখী করে তোলে, তার চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে! আমরা একদিকে রোগ কমাই, অন্যরা আবার রোগ ছড়িয়ে দিয়ে হাসপাতাল ভরে ফেলে, আর দোষ হয় আমাদের। রোগের উৎস যারা বন্ধ করতে পারে না তাদের যেন কোনও দোষই কেউ দেখে না!

শেষে একপর্যায়ে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেই ফেলেছেন, ‘করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যু বৃদ্ধির জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় দায়ী নয়’।

প্রথমে যখন ‘সবচেয়ে কঠোরতম বিধিনিষেধ’ জারি করা হয়, তখন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, কোনোভাবেই এই বিধিনিষেধে কাউকে ন্যূনতম ছাড় দেওয়া হবে না। এমনকি গার্মেন্ট কারখানা মালিকদের উপর্যুপরি অনুরোধের পরও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সাফ জানিয়ে দিয়েছিল ৫ আগস্টের আগে কোনোভাবেই কিছুই খোলা রাখা যাবে না। ঈদের সময় মানুষ বাড়ি গিয়েছিল এ তথ্য মাথায় রেখে। অথচ ৭ দিন পার হতে না হতেই ৩০ জুলাই ঘোষণা এলো ১ আগস্ট থেকে রফতানিমুখী শিল্প (পড়ুন গার্মেন্ট কারখানা) খোলা হবে। আশ্চর্য এই যে,

১) বারবার বলার পরেও সরকার তার নিজের দুই সপ্তাহের লকডাউনের সিদ্ধান্ত ধরে রাখতে পারেনি।

২) সরকার খুব ভালো জানে সব রফতানিমুখী শিল্পকারখানার, মূলত গার্মেন্টকর্মীরা সবাই গ্রামে গেছে। গণপরিবহন না খুলে এ ধরনের ঘোষণা যে মানুষের জন্য কতটা বিপর্যয়কর হতে পারে, সেটুকু না বোঝার কোনও কারণ নেই। ৩১ জুলাই আমরা দেখতে পেলাম লক্ষ লক্ষ গার্মেন্টকর্মী বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রিকশা, অটো, ট্রাক, পিকআপ, হাঁটা মিলিয়ে ভেঙে ভেঙে অবর্ণনীয় কষ্টের শিকার হয়ে ঢাকায় ফিরছে। এই বীভৎস কষ্টের ‘বোঝার’ ওপরে যুক্ত হয়েছে স্বাভাবিক ভাড়ার ৪/৫ গুণ বেশি খরচের ‘শাকের আঁটি’।

৩) এ পরিস্থিতিতে সরকার ৩১ জুলাই সন্ধ্যায় প্রথমে লঞ্চ চালুর ঘোষণা দেয়। খবর শুনে নানা লঞ্চঘাটে যখন হাজার হাজার মানুষ হাজির হন, তখন তারা জানতে পারেন এভাবে হুট করে সিদ্ধান্ত নিয়ে লঞ্চ চালানো সম্ভব নয়। এর যুক্তি দিতে গিয়ে মালিকরা জানান, ৫ তারিখ পর্যন্ত লকডাউন থাকার সিদ্ধান্তের কারণে লঞ্চের চালক এবং অন্য কর্মচারীরা ছুটিতে চলে গেছে।

৪) তারপর আসে গণপরিবহন খোলার সিদ্ধান্ত। কিন্তু এরমধ্যে মানুষ যে যেভাবে পেরেছে ঢাকায় আসতে গিয়ে নিজের জন্য, পরিবারের জন্য এবং আরও বহু মানুষের জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে। 

৫) তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যাক ১ আগস্ট গার্মেন্ট কারখানা না খুললে এই সেক্টরে প্রলয় ঘটে যেত, তাই সরকার আর ৪টি দিনও অপেক্ষা করতে পারেনি। সে পরিস্থিতিতেও কারখানা খোলার ঘোষণা অন্তত ৩/৪ দিন হাতে রেখে, সব ধরনের গণপরিবহন চালু করে দেওয়া দরকার ছিল, যাতে গার্মেন্টকর্মীরা তাদের সুবিধা মতো সময়ে এসে কাজে যোগ দিতে পারে। এতে তাদের যাত্রার দুর্ভোগ যেমন এড়ানো যেত, তেমনি অনেকটা কমিয়ে আনা যেত করোনা ঝুঁকিও।

৬) এই সরকারকে সব সময়ই দেখা গেছে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করতে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে গার্মেন্ট শিল্প। তাদের আধিপত্য যেমন সংসদের বাইরে, তেমন সংসদের ভেতরেও। এই সংসদের দিকে তাকালে বোঝা যায় তারাই মূলত সরকার। সুতরাং প্রণোদনার অর্থের সবচেয়ে বড় ভাগ তাদের, ব্যাংক ঋণের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী তারা। বিদেশে টাকা পাচার, ঋণখেলাপি হওয়ার ক্ষেত্রেও সামনের সারিতেই আছেন তারা।

এই যাচ্ছেতাই পরিস্থিতির জন্য নিশ্চিতভাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দায়ী নয়। এবং এ ধরনের পরিকল্পনাহীন হঠকারী সিদ্ধান্ত নিশ্চিতভাবেই করোনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে এবং দিনের শেষে চাপটা যাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর। এখন প্রশ্ন হলো, গত দেড় বছর করোনার সঙ্গে বসবাসের পর করোনা চিকিৎসা এবং করোনার টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অর্জন কতটুকু। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, মানুষ চিকিৎসার জন্য গেলে তারা চিকিৎসা দেন, টিকার ব্যবস্থা করেন। এই বক্তব্য কতটুকু সত্য? প্রতি জেলায় সরকারি পর্যায়ে আইসিইউ তৈরি করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর উপর্যুপরি নির্দেশনার পর এখনও দেশের অর্ধেকের বেশি জেলায় সরকারি পর্যায়ে একটি আইসিইউ বেড নেই। এখনও ১৭টি জেলায় কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা নেই, অর্থাৎ সেই জেলাগুলোতে হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা দিয়ে উচ্চমাত্রার অক্সিজেন দেওয়া সম্ভব না। ১৭ কোটি মানুষের দেশে হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা আছে মাত্র দেড় হাজারের কিছু বেশি। কোভিড চিকিৎসা দেওয়ার হাসপাতালে বেড নেই পর্যাপ্ত সংখ্যার আশপাশেও। নেই পর্যাপ্ত ডাক্তার, নার্স এবং অন্যান্য চিকিৎসাকর্মী। এখন এর মাশুল দিচ্ছে জনগণ।

এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নাই যে দেশের আর সব মন্ত্রণালয়ের মতো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও অদক্ষতা, অযোগ্যতা, সর্বোপরি দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ব্যর্থ, যেমন ব্যর্থ দেশের আর সব মন্ত্রী। এই কলামের আলোচনায় এটা নিশ্চয়ই স্পষ্ট যে সরকারের আরও অনেক মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা, সমন্বয়হীনতার অনিবার্য ফলই হচ্ছে করোনার সাম্প্রতিক বিপর্যয়। দিনের শেষে আক্রান্ত সবাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আসে বলেই, এই মন্ত্রণালয়ের অধীনে মারা যায় বলেই আমাদের ফোকাসে থাকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। যৌক্তিক কারণেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আর এর মন্ত্রী সমালোচনার শিকার হয়। কিন্তু একটা বিষয় মনে রাখা জরুরি, এটা করতে গিয়ে আমাদের যেন অন্য সব মন্ত্রণালয়, মন্ত্রী আর সরকারের সার্বিক, সামষ্টিক ব্যর্থতা ভুলে না যাই।        

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি দলীয় হুইপ

                   

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

‘আমি রাজনীতি করা মেয়ে, আমি কিন্তু ভদ্র না’

‘আমি রাজনীতি করা মেয়ে, আমি কিন্তু ভদ্র না’

আশ্রয়ণ প্রকল্প: দুর্নীতি কি আর্থিক নাকি ‘তেলবাজি’র?

আশ্রয়ণ প্রকল্প: দুর্নীতি কি আর্থিক নাকি ‘তেলবাজি’র?

স্বাস্থ্যমন্ত্রী, আপনি দয়া করে চুপ থাকুন!

স্বাস্থ্যমন্ত্রী, আপনি দয়া করে চুপ থাকুন!

‘কাজকাম না থাকলে খাওনও নাই’

‘কাজকাম না থাকলে খাওনও নাই’

তালেবানের উত্থান-পতন-পুনরুত্থান

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২১, ১৬:৫১

আনিস আলমগীর কয়েক মাস ধরে সারা বিশ্বকে আফগানিস্তানে তাদের মজবুত ভিত্তির জানান দিচ্ছে তালেবান। অন্যদিকে আফগান সরকার তার নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে পুরো দেশের ওপর। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, দেশের সিংহভাগ এলাকা এখন তালেবানের দখলে, সীমান্তের ৯০ শতাংশ তাদের কব্জায়। তারা এখন লড়াই করছে হেরাত, কান্দাহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখলের। তালেবান কারা সবাই জানি কিন্তু তাদের উত্থান-পতন এবং পুনরুত্থানের কাহিনি নতুন করে বলতে চাই আজকের কলামে।

কাহিনি শুরু করতে হলে ১৯৭৯ সালে ফিরে যেতে হবে। ওই সালে আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট এবং কমিউনিস্ট নেতা নূর মোহাম্মদ তারাকিকে হত্যা করা হয়েছিল। আর এ ঘটনার মধ্য দিয়ে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানের ব্যাপারে ব্যাপক নাক গলাতে শুরু করে। তারাকি নিজে কমিউনিস্ট নেতা হলেও তাকে হত্যার নেতৃত্ব দিয়েছেন আরেক কমিউনিস্ট নেতা হাফিজুল্লাহ আমিন। হাফিজুল্লাহ প্রথমে তাকে গ্রেফতার করে। তারপর হত্যা করে তাকে।

আফগানিস্তানের বাম রাজনৈতিক দল- পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (পিডিপিএ) ছিল তখন দুই ভাগে বিভক্ত। তাদের নিজেদের মধ্যে হানাহানি চলছিল প্রচুর। তারাকি নিজেই যে সাধু ছিলেন তা নয়, তিনিও দলে তার প্রতিপক্ষকে মারার চেষ্টা করেছেন, এরমধ্যে হাফিজুল্লাহ আমিন একজন। তখন কমিউনিস্টদের নিজেদের মধ্যে যেমন অভ্যন্তরীণ লড়াই চলছিল তেমনি কমিউনিস্টদের সঙ্গে ইসলামিস্টদের বিরোধ ছিল তুঙ্গে। আবার ঠিক ওই সময়ে আফগানিস্তানের প্রতিবেশী ইরানে ইসলামিক বিপ্লব সংঘটিত হয়। বিশ্ব মানচিত্রে শক্তিশালী একজন ইসলামি নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন আয়াতুল্লাহ খোমেনি। এটাই ছিল ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব, সেই বিপ্লবীরা এখনও বহাল তবিয়তে ইরানে ক্ষমতায় রয়েছে।

আফগানিস্তানের যে পরিস্থিতি ইরানের পরিস্থিতি তখন তা-ই ছিল। সেখানেও একদিকে ইসলামিস্টরা অন্যদিকে লেফটিস্ট-কমিউনিস্টরা মুখোমুখি ছিল। ইরানের রাজা শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি আধুনিকতা এবং সেক্যুলারিজমে বিশ্বাস করতেন। তিনি সেক্যুলারিজমের পাশাপাশি দেশের জন্য অনেক অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে এসেছিলেন। পশ্চিমাদের সঙ্গে তার ছিল সুসম্পর্ক। কিন্তু তার ক্ষমতায় চিরস্থায়ী হওয়ারও লক্ষ্য ছিল, সেই কারণে প্রতিপক্ষকে খতম করে দেওয়ার ক্ষেত্রে সিদ্ধহস্ত ছিলেন তিনি। রেজা পাহলভি তার বিরুদ্ধে গণরোষ ঠেকাতে রাজনৈতিক দলগুলোকে অবৈধ ঘোষণা করেন এবং পার্লামেন্ট বাতিল করে দেন। কিন্তু ইসলামি বিপ্লবীদের প্রতিরোধে তিনি দেশ থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। খোমেনি ফ্রান্স থেকে ফিরে আসার দুই সপ্তাহ আগে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। মার্চে, খোমেনি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের জন্য একটি সংবিধান প্রণয়নে নেতৃত্ব দেন। ১৯৭৯ সালের গণভোটের পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

ইরানের এই পরিস্থিতি দেখে আফগানিস্তানে ভীত হয়ে পড়েন হাফিজুল্লাহ। তিনি ইসলামিস্টদের ছাড় দেওয়া শুরু করেন। মসজিদ সংস্কার, কোরআন শরিফ বিতরণ এবং কথাবার্তায়, বক্তৃতায় আল্লাহর নাম নেওয়া শুরু করেন। তার এই চেষ্টার উদ্দেশ্য ছিল কমিউনিস্ট হলেও ইসলামিস্টদের পাশে পাওয়া। কিন্তু জনতা তাকে মোটেই পছন্দ করতো না। তিনি উগ্র মার্ক্সবাদী এবং নৃশংস হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

ইসলামিস্টরা ক্ষমতা দখলের আগেই, ২৪ ডিসেম্বর ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে হস্তক্ষেপ করে এবং হাফিজুল্লাহর জায়গায় বাবরাক কারমালকে প্রেসিডেন্ট পদে বসায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন এটা করার দুটো কারণ ছিল। প্রথম কারণ, হাফিজুল্লাহর কর্মকাণ্ড কমিউনিস্টদের বদনাম হচ্ছিল, যেখানে সোভিয়েত রাশিয়া কমিউনিজমে বিশ্বাসী। দ্বিতীয় কারণ ভূ-রাজনৈতিক। যেহেতু তখন আমেরিকা এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ঠান্ডাযুদ্ধ চলছিল তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে নিজের প্রভাব বিস্তার করতে পারলে লাল ঝাণ্ডার আরও একটি দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বহরে যোগ দিতে পারে।

কারমালের সূচনাটা ভালোই হয়েছিল। তিনি ক্ষমতায় এসে প্রায় ২৭০০ রাজবন্দিকে মুক্তি দেন, টকটকে লাল রঙের কমিউনিস্ট মার্কা আফগান পতাকা পরিবর্তন করে নতুন এক পতাকা দেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে আফগানিস্তানকে একটি নতুন সংবিধান দেওয়া হবে। এছাড়াও অবাধ নির্বাচন, বাকস্বাধীনতা, প্রতিবাদের অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেন। মনে হচ্ছিল যেন আফগানিস্তান তখন একটি নতুন মাত্রা পেয়েছে এবং সঠিক রাস্তায় চলা শুরু করেছে কারমালের হাত ধরে। কিন্তু আফগানিস্তানকে এই পরিস্থিতিতে দেখে নিশ্চয়ই আমেরিকার শান্তিতে থাকার কথা নয়। মার্কিনিরা দেখে যে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে তার প্রভাব পূর্ণমাত্রায় প্রতিস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়াও এরমধ্যে তারা ভিয়েতনাম, ইথিওপিয়ায় আমেরিকাকে বড় ধরনের শিক্ষা দিয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধে তখন আমেরিকারকে কিছুটা পরাস্ত দেখাচ্ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে।

আমেরিকা তখন আফগানিস্তানকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে বদলা নেওয়ার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করার কথা ভাবে। শুরু হয়ে যায় আফগানিস্তানে আমেরিকা ও রাশিয়ার প্রক্সি ওয়ার। আমেরিকা আশ্রয় নেয় ইসলামিস্টদের কাছে, তারা মুজাহিদীনকে সমর্থন করে তাদের নেপথ্যে সহযোগিতা দিতে থাকে। তারও আগে থেকে পাকিস্তান ও সৌদি আরব মুজাহিদীনকে সাপোর্ট করে আসছিল।

এখানে বলে রাখা দরকার, সেই সময় বাংলাদেশ থেকেও প্রচুর সংখ্যক যুবক মুজাহিদীনের পক্ষে যুদ্ধ করতে আফগানিস্তানে চলে যায়। সিআইএ তার বড় ধরনের অর্থবিত্ত নিয়ে এই গোপন অপারেশন পরিচালনায় নামে, যার নাম দিয়েছিল ‘অপারেশন সাইক্লোন’। সিআইএ পরিচালক রবার্ট গেটস কীভাবে প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ৩ জুলাই ১৯৭৯ সালে পাঁচ লাখ মার্কিন ডলারের একটি সিক্রেট ফান্ড মুজাহিদীনকে বরাদ্দ করেছিলেন সেটি ফাঁস করেন। আমেরিকায় ক্ষমতা বদলের পর জিমি কার্টারের জায়গায় রোনাল্ড রিগ্যান এলেও মুজাহিদীনকে তাদের সমর্থন এবং অর্থ অব্যাহত রাখে। ১৯৮৩ সালে মুজাহিদীন নেতাদের সঙ্গে রিগানের বৈঠকের ছবিও এখন নেটে পাওয়া যায়। সিআইএ’র সঙ্গে পাকিস্তানের আইএসআই, ব্রিটিশ সিক্রেট এজেন্সি এমআইসিক্স এই অপারেশন সফল করতে একযোগে কাজ করতে থাকে। তার বাইরে সৌদি আরবও মুজাহিদীনকে তাদের সমর্থন অব্যাহত রাখে।

কারা ছিল এই মুজাহিদীন? শুরুতে এরা গেরিলা যোদ্ধা ছিল। পাহাড়ে পর্বতে লুকিয়ে অপারেশন চালাতো। তারা শুধু বাইরের সাপোর্ট নয়, তাদের তাদের হাতে শুধু বন্দুক নয়, অ্যান্টি-মিসাইল অস্ত্র চলে আসে। তখনই লড়াইয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের বড় ধরনের ধাক্কা লাগে।

১৯৮৮ সালে আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট যখন মো. নজিব উল্লাহ, তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে জেনেভা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই শান্তি চুক্তি অনুযায়ী দুই দেশ একে অপরের বিষয়ে নাক গলাবে না। চুক্তির গ্যারান্টার হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিনিরা প্রতিশ্রুতি দেয়, যদি সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান থেকে তার সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয় তাহলে আমেরিকাও মুজাহিদীনকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করবে।

অবশেষে ১৯৮৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান থেকে তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করে চলে যায়। তার চলে যাওয়ার পেছনে কারণ শুধু এই নয় যে তারা সেখানে বিপদের সম্মুখীন ছিল; বরং তাদের দেশেও তখন শুরু হয়ে যায় ভাঙনের শব্দ। ১৯৮৮ থেকে ৯১ সালের মধ্যে তারা আলাদা আলাদা দেশে রূপান্তরিত হতে থাকে। তার মধ্যে বড় অংশ রাশিয়া এখনও টিকে আছে হালকা পুরনো গরিমা নিয়ে। নজিবুল্লাহ পুরো চেষ্টা করেন দেশে সংঘর্ষ কমিয়ে আনতে। তিনি নিজের ক্ষমতাও কমিয়ে আনেন। নতুন একটি সংবিধান দেওয়া হয় ১৯৮৭ সালে। আফগানিস্তান তখন আর একদলীয় সরকারের দেশ নয়, অন্যান্য রাজনৈতিক দল ইলেকশনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। ১৯৮৮ সালের নতুন সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানে তার দল পিডিপিএ ২৩৪ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে নজিবুল্লাহ পুনরায় সরকার গঠন করেন।

১৯৯০ সালে আফগানিস্তানকে একটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ঘোষণা দেওয়া হয় আর কমিউনিজমের যাবতীয় রেফারেন্স মুছে দেওয়া হয়। নজিবুল্লাহ চেষ্টা করেন যত ইসলামি গ্রুপ আছে তাদের শান্ত করে যাতে দেশে শান্তি আনা যায় এবং বিদেশি সাহায্য পাওয়া যায়। তিনি প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট যাতে বাড়ে সেই চেষ্টাও করেন। কিন্তু এত কিছুর পরেও আমেরিকা মুজাহিদীনকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করেনি। মুজাহিদীনও এক ইঞ্চি পিছু হটেনি। তারা নির্বাচন বয়কট করে এবং গৃহযুদ্ধ অব্যাহত রাখে। সোভিয়েত ইউনিয়ন পেছন থেকে নজিবুল্লাহকে সমর্থন, সাহায্য-সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে, কিন্তু তাতে কোনও সুফল আসেনি। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন পুরোপুরি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় আর ১৯৯২ সালে মুজাহিদীন এই জনযুদ্ধে জিতে যায়।

মুজাহিদীন একটা ইসলামিক গ্রুপ ছিল এটা সত্য, তবে সেই গ্রুপে নানা মতের লোক ছিল এবং সেখানে ক্ষমতালিপ্সা কারও কম ছিল না। এই গ্রুপের বড় সমস্যা ছিল এক ধর্মের হলেও জাতিগত পার্থক্য ছিল তাদের প্রচুর। এই নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যেই দ্বন্দ্ব লেগে যায় কে ক্ষমতার স্বাদ নেবে। অবশেষে ১৯৯২ সালের জুন মাসে বোরহান উদ্দিন রব্বানী সেই ক্ষমতার অধিকারী হন। তিনি ইসলামিক স্টেট অব আফগানিস্তানের নতুন নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন।

কয়েক বছর যেতেই আফগানিস্তানে আবির্ভাব হয় নতুন এক শত্রুর। নাম তার তালেবান। পশতুন ভাষায় তালেব মানে ছাত্র। তালেবান এসেছে ছাত্রের বহুবচন হিসেবে। ১৯৯৬ সালে মুজাহিদীন সরকারকে হটিয়ে এই তালেবান ক্ষমতা দখল করে। শুরুতেই তালেবান গ্রুপের নেতা ছিলেন মোল্লা ওমর। ৫০ জন ছাত্র দিয়েই শুরু হয়েছিল তার অভিযাত্রা। ক্ষমতা দখলের অভিযাত্রা শুরু করতে না করতে পাকিস্তান থেকে আফগান শরণার্থীরা এসে যোগ দেয় তার পেছনে। তারা ছিল মুজাহিদীনের তুলনায় আরও বেশি ধর্মীয় গোঁড়া। এই তালেবান গোষ্ঠী পাকিস্তানের বিভিন্ন মাদ্রাসা থেকেই গোঁড়ামির প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে আসে।

মুজাহিদীনে যে আলাদা আলাদা জাতিগোষ্ঠী ছিল তাদের মধ্যে পশতুনরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং পুরো আফগানিস্তানেও পশতুনরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। পশতুন জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী বলে তারা হাজারাসহ অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীকে নিধন শুরু করে। পাকিস্তানে যে পশতুনরা রয়েছে তাদের সঙ্গে আফগান পশতুনদের একটা আত্মিক যোগাযোগ রয়েছে। তারা দুই দেশের মধ্যে মোটামাটি বাধাহীন চলাফেরাও করতো। আফগান যুদ্ধের সময় আমি নিজেও তা স্বচক্ষে দেখেছি।

তালেবান আমেরিকার সৃষ্টি এটা যেমন জোরালোভাবে দাবি করার সুযোগ নেই, তেমনি অস্বীকারও করা যাবে না। আমেরিকা-সৌদি আরব-পাকিস্তান মিলে আফগানিস্তানে মুজাহিদীনকে অস্ত্র সরবরাহ করে তালেবানদের উত্থানে যেমন ভূমিকা রেখেছে তেমনি আফগানিস্তানের গণতন্ত্রকে তছনছ করে দিয়েছে। তাদের দ্বারাই আফগানিস্তানে তালেবান জন্ম নেওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। কারণ, তারা মিলিয়ন ডলার খরচ করে টেক্সট বুক তৈরি করেছিল ইসলামিস্টদের জন্য, যেখানে জেহাদ, বন্দুক, গুলি, সৈন্য, ভায়োলেন্ট ইমেজ ছিল এবং পরে এ ধরনের এক্সট্রিমিস্ট আইডিওলজির সব বইপত্র তালেবান নিজেরাও স্কুল পাঠ্যক্রমে রেখে দেয়।

১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ তালেবানরা কাবুল দখল করতে সক্ষম হয় এবং ইসলামিক আমিরাত অব আফগানিস্তান সৃষ্টি করে। অনেক এলাকায় তারা শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। জনসমর্থনও পেয়েছিল।

তবে শুরুতেই যতটা তারা ভালো চেহারা নিয়ে এসেছিল আস্তে আস্তে সে চেহারার আসল রূপ প্রকাশিত হয়ে পড়ে তাদের একের পর এক উদ্ভট নির্দেশনায়। তারা আফগানিস্তানে অনেক কিছু নিষিদ্ধ করে দেয়। তার মধ্যে অনেক বিষয় হাস্যকরও। তাদের নিষিদ্ধের দীর্ঘ তালিকায় ছিল, সিনেমা, টিভি, গান-বাজনা, ভিসিআর, ফুটবল, দাবা, ঘুড়ি ওড়ানো, ছবি আঁকা, ফটোগ্রাফি, কাপড়চোপড়ে এমব্রয়ডারি করা, দাড়ি কাটা। তারা বিদেশিদের আসা নিষিদ্ধ করে, জাতিসংঘের অফিসগুলোকে নিষিদ্ধ করে, এনজিও নিষিদ্ধ করে। এমনকি ইন্টারনেট এবং ১০ বছরের বেশি বয়সী মেয়েদের শিক্ষা নিষিদ্ধ করে। পুরুষদের দাড়ি টুপি পরা এবং মেয়েদের পুরো শরীর আবৃত করে বোরকা পরতে বাধ্য করে। পুরুষ আত্মীয় ছাড়া মেয়েদের বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ করে।

ধর্মীয় কারণ না থাকলেও জাতিগত কারণে পশতুনদের বাইরে হারাজারাসহ অন্যান্য মুসলমান জাতিকে হত্যা করে। পাশাপাশি খ্রিষ্টানদের হত্যা করে, হিন্দুদের তারা আলাদা ব্যাজ দেয় যাতে ভিন্নধর্মী হিসেবে সহজে চিহ্নিত করা যায়। আফগানিস্তানের কালচারাল হিস্ট্রি অনেক সমৃদ্ধ, কিন্তু তালেবান ক্ষমতায় এসে তাদের ঐতিহাসিক বুদ্ধ মূর্তিগুলো ধ্বংস করে। তারা সাবেক প্রেসিডেন্ট নজিবুল্লাহকেও হত্যা করে। সারা দুনিয়া তাদের এসব কার্যক্রম দেখে নিন্দায় মেতে ওঠে এবং তাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে। তবে শুধু তিনটি দেশ তাদের কূটনৈতিক স্বীকৃতি দিয়ে রাখে। সেই তিন দেশ হচ্ছে- পাকিস্তান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।

নব্বইয়ের শেষ দিকে কিছু মুজাহিদীন ফোর্স তালেবানদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে। তাদের বলা হয় নর্দান অ্যালায়েন্স। তাদের প্রধান হয়ে আসেন আহমদ শাহ মাসুদ কিন্তু ২০০১ সালে নর্দান অ্যালায়েন্স তালেবানের সঙ্গে এই লড়াইয়ে হেরে যায় এবং আহমদ শাহ মাসুদকে খুন করা হয়। এই হত্যার মাত্র দুই দিন পরে ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১ সালে আল কায়দা নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ারসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলা চালায়, যা আজ পর্যন্ত পুরো বিশ্বকে বদলে রেখেছে।

আল-কায়েদার নেতা ছিলেন এক সৌদি নাগরিক ওসামা বিন লাদেন। তালেবান ওসামা বিন লাদেনকে তাদের দেশে আশ্রয় দিয়েছিল। থাকতো পাহাড়ের গুহায়। লাদেন আমেরিকাকে চিঠি দিয়ে জানায় যে তারা নাইন-ইলেভেন ঘটিয়েছে প্রতিশোধ হিসেবে, আমেরিকা যেটা সোমালিয়া, লিবিয়া ও আফগানিস্তানে করছে। সঙ্গত কারণেই আমেরিকা তার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আফগানিস্তানে হাজির হয় তাৎক্ষণিকভাবে। শুরু হয় ‘ওয়ার অন টেরর’। সন্দেহজনক তালেবান আস্তানাগুলোতে আকাশ থেকে বোমা হামলা করতে থাকে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে এয়ার স্ট্রাইক করলে সাধারণ মানুষও মরে।

নর্দান অ্যালায়েন্সের সহযোগিতা নিয়ে আমেরিকা তালেবানকে পুরোপুরি হটিয়ে দেয় এবং আহমদ শাহ মাসুদের সমর্থক হামিদ কারজাই আফগানিস্তানের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হন। তিনি ২০১০ সালের নতুন একটি নির্বাচন দেন, দেশকে নতুন একটি সংবিধান দেন। মোটামুটি গ্রহণযোগ্য ওই নির্বাচনে ৬০ লাখ আফগান ভোট দান করে। হামিদ কারজাই প্রেসিডেন্ট হন। কারজাই ভারতে লেখাপড়া করেছেন। ভারতের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক ছিল এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ক্রমেই মজবুত ভিত্তি পেয়েছে তার আমলে।

আমেরিকানরা আফগানিস্তানের পাশাপাশি তালেবান ধ্বংস করার জন্য পাকিস্তানেও বিমান হামলা চালায়। ২০১১ সালে তারা ওসামা বিন লাদেনকে পাকিস্তানে হত্যা করে। ২০১৫ সালে আবিষ্কৃত হয় তালেবান নেতা মোল্লা ওমর ২০১৩ সালে শারীরিক অসুস্থতায় পাকিস্তানে মারা গেছেন।

এই পুরো সময়ে আমেরিকা শান্তি বজায় রাখা, সরকারকে সহযোগিতা এবং তালেবান দমনের জন্যে আফগানিস্তানে তার সৈন্যদের রেখে দেয়। এত বছর পরেও দেখা যাচ্ছে তালেবান পুরোপুরি খতম হয়নি বরং আগের থেকে শক্তিশালী রূপে আবির্ভূত হয়েছে। তালেবান আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে তো বটেই এবং মাঝে মধ্যে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতেও বোমা হামলা চালিয়েছে। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় এসে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন তালেবানদের সঙ্গে কাতারের সহযোগিতায় আলোচনা শুরু করে।

গত বছর ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তালেবানের চুক্তি হয়েছিল যে পয়লা মে-র মধ্যে সব সৈন্য প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে জো বাইডেন ক্ষমতায় এসে সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখে ওয়ান-ইলেভেনের ২০ বছর পূর্তিকালে ২০২১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ন্যাটোভুক্ত সব সৈন্যকে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন। বাইডেন বলেছেন, আফগানিস্তানে এখন ৩ লক্ষ প্রশিক্ষিত আধুনিক সেনাবাহিনী রয়েছে, ৭৫ হাজার তালেবান সৈন্যকে প্রতিরোধ করা তাদের পক্ষে সম্ভব।

বাস্তবতা হচ্ছে সরকারি সৈন্যরা লড়ছে আবার ভয়ে পালাচ্ছেও। দোভাষীসহ আমেরিকানদের সহযোগীরা দেশ ছাড়ছে। সবার বুঝতে বাকি নেই লেজ গুটিয়ে পালাচ্ছে সিংহ আমেরিকা। ওয়ান-ইলেভেনের প্রতিশোধ নেওয়া যদি আমেরিকার প্রধান ইস্যু হতো তাহলে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার পর পরই তারা আফগানিস্তান ছাড়তে পারতো। কিন্তু তালেবান খতম করার মিশন তাদের অসম্পূর্ণ, আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা আসেনি। মাঝখানে তারা আমেরিকার জনগণের ২ ট্রিলিয়ন ডলার বরবাদ করেছে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত। [email protected]

 

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

পেগাসাস আতঙ্ক বিশ্বজুড়ে, নীরব বাংলাদেশ

পেগাসাস আতঙ্ক বিশ্বজুড়ে, নীরব বাংলাদেশ

তালেবান উত্থানে একঘরে ভারত

তালেবান উত্থানে একঘরে ভারত

কারখানার আগুনের দায় তাহলে কার?

কারখানার আগুনের দায় তাহলে কার?

টিকা ছাড়া লকডাউন-শাটডাউনে কাজ হবে না

টিকা ছাড়া লকডাউন-শাটডাউনে কাজ হবে না

কুল্লাপাথরে শায়িতদের জাতীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা হোক

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২১, ১৭:৫৬

মোস্তফা হোসেইন যুদ্ধশেষের যুদ্ধে জড়িয়ে আছেন অনেক মুক্তিযোদ্ধা। তাদের যুদ্ধটা মূলত মহান এই লড়াইয়ের বীরত্বকে প্রজন্মান্তরে তুলে ধরা এবং বীরদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন। তেমনি এক যোদ্ধা ছিলেন আব্দুল করিম। সীমান্তবর্তী কসবা উপজেলার কুল্লাপাথরে পিতার দেওয়া একটি টিলার ওপর শায়িত ৫২ শহীদ মুক্তিযোদ্ধাকে আগলে রেখেছিলেন অর্ধশতাব্দীকাল। বাঁশের খুঁটি দিয়ে চিহ্নিত করা কবরগুলো ধীরে ধীরে পাকা হলো। কবরস্থান সীমানা দেয়ালে ঘেরা হলো। হলো আরও কিছু স্থাপনা। কিন্তু একটা অতৃপ্তিবোধ ছিল বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল করিমের মনে। শুধু বলতেন, কী করলে এই বীরদের প্রতি যথাযথ সম্মান জানানো হবে। মাঝে মাঝেই ফোন দিতেন। প্রস্তাব করতেন এবং প্রস্তাব চাইতেন। কী করা যায় সেখানে। মাস দুয়েক আগেও ফোন করে বললেন, আরও কিছু করা দরকার।  

জিজ্ঞেস করেছিলাম, কী করতে চান করিম ভাই?

বললেন, বাংলাদেশের বৃহত্তম মুক্তিযোদ্ধা কবরস্থান এখানে। এটাকে কেন্দ্র করে এখানে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর হোক। বললেন, আমাদের এই অঞ্চলে অনেক মুক্তিযোদ্ধার কবর কাছে, অনেক যুদ্ধস্মারক অযত্নে পড়ে আছে। সেগুলো যদি বৈজ্ঞানিক উপায়ে সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করা যেতো তাহলে অনেক যুদ্ধস্মারক ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা পেতো। জাদুঘর প্রতিষ্ঠার জন্য অবকাঠামোগত ব্যয় খুব বেশি হবে না। বর্তমান গেস্ট হাউজকে বর্ধিত করে সেটা করা সম্ভব। আমারও মনে হয়েছিল, ঠিকই তো। এখানে গবেষণা কেন্দ্র হতে পারে একটা। প্রয়োজনে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তত্ত্বাবধান করতে পারে।

বলেছিলেন করিম ভাই, করোনা পরিস্থিতি একটু ভালো হলে তিনি ঢাকা আসবেন। আমি যেন তাকে সহযোগিতা করি। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি আরও খারাপ হলো। শুধু তাই নয়, মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী এই বীরও পরাজিত হলেন করোনার কাছে। ২২/২৩ জুলাই করিম ভাই’র ছেলে মাহবুব করিম ফোন করে জানালো ওর বাবাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ২৭ তারিখ বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল জামিল ডি আহসান বীর প্রতীক বললেন, করিম সাহেবের অবস্থা ভালো না। তাকে ডিএনসিসি হাসপাতালে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে। মধ্যরাতে খবর পেলাম তিনি পরপারে চলে গেছেন।

তার মৃত্যু সংবাদটা কাঁটার মতো বিঁধলো মনে। একই হাসপাতালে মাত্র ৪ দিন আগে আমার মেঝ ভাইও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

তাঁর মৃত্যুতে দেশব্যাপী কোনও নাড়া পড়েনি। প্রতিষ্ঠিত ও সমাজের উঁচুস্তরের মানুষের মৃত্যুর পর যেমন শোকবার্তা কিংবা সংবাদ হয়, তেমনও হয়নি। কিন্তু যখন তাঁর ও তাঁর বাবা আব্দুল মান্নানের অবদানের কথা মনে হয়, তখন ভাবি- এসব মানুষকে মূল্যায়ন আমরা করতে পারিনি, করার কোনও সংস্কৃতিও নেই। সেই অপারগতা যে জাতি হিসেবে আমাদের দায়বদ্ধ করে বলতে দ্বিধা হওয়ার কথা নয়। বাংলাদেশের আনাচে কানাচে অরক্ষিত আছে অসংখ্য গণকবর। কত ভয়াবহ যুদ্ধস্মৃতি হারিয়ে যাচ্ছে সংরক্ষণের অভাবে। আর আব্দুল মান্নান আর তার ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল করিমের ঐকান্তিক চেষ্টায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কবরস্থান সংরক্ষণ হয়ে আসছিল এতদিন। এর কি মূল্যায়ন হয়েছে?  

কিছুটা বোঝা যাবে কুল্লাপাথরে মুক্তিযোদ্ধা কবরস্থানের ইতিহাসের দিকে তাকালে।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে যুদ্ধ প্রস্তুতি এবং যুদ্ধ সংগঠিত করার পাশাপাশি কিছু অতি প্রয়োজনীয় বিষয়ের দিকে নজর দিতে হয় মুক্তিযুদ্ধের পরিচালকদের। কুল্লাপাথর ছিল সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফের এলাকা।  ওই শহীদদের ভারতীয় এলাকায় দাফন করা হচ্ছে। এটা তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। কিন্তু নিরাপদ জায়গাও পাওয়া যাচ্ছিল না। সেই সুবাদে ক্যাপ্টেন এটিএম হায়দার কথা বলেন আব্দুল করিমের বাবা আব্দুল মান্নানের সঙ্গে। তারপর মান্নান সাহেব খালেদ মোশাররফের সঙ্গেও কথা বলেন। আর সেই কাজটিকে দ্রুততর করে এক মহান শহীদের শেষ চাওয়া পূরণ করতে গিয়ে। তিনি বীর শহীদ প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম। যুদ্ধে গুরুতর  আহত হওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, তাঁর মৃত্যু হলে যেন বাংলাদেশের মাটিতে দাফন করা হয়। সেই কাজটিই করা হলো একাত্তরে। কবরস্থানের জায়গা হিসেবে খালেদ মোশাররফ কুল্লাপাথরের তিনটি পাহাড়ের পশ্চিমের অংশকে পছন্দ করেন। জায়গাটা নোম্যান্স ল্যান্ড-সংলগ্ন হওয়ার পরও নিরঙ্কুশ নিরাপদ ছিল এমনটা নয়। তবে তুলনামূলক নিরাপদ তো অবশ্যই। কুল্লাপাথর থেকে মাত্র দেড় দুই কিলোমিটার পশ্চিমে সালদানদী রেলস্টেশন। ওখানে পাকিস্তানিদের শক্তিশালী ঘাঁটি। ওখান থেকে পাকিস্তানিরা মুক্তিবাহিনীকে লক্ষ্য করে সারাক্ষণ মর্টার নিক্ষেপ করে, পূর্বদিকে ভারতীয় সীমান্ত লক্ষ্য করে। আবার মুক্তিবাহিনী পাল্টা গুলি করে ভারতীয় সীমান্ত থেকে। মাঝখানেই বলা যায় কুল্লাপাথরের করিম সাহেবদের বাড়িটিকে। তারপরও বাংলাদেশ এলাকায় এর চেয়ে ভালো জায়গা খুঁজে পাননি খালেদ মোশাররফ। সেখানেই শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের দাফন শুরু হয়।

এই গুরুদায়িত্বটি গ্রহণ করেন আব্দুল মান্নান। সঙ্গী হিসেবে পান গ্রামের দুয়েকজনকে। প্রত্যেক শহীদকে ইসলামি বিধান অনুযায়ী দাফন করা হয় সেখানে। দুয়েকজনের দাফনকালে আব্দুল করিমও সহযোগিতা করেন বাবাকে। কিন্তু নিজে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার কারণে যুদ্ধকালে সেখানে থাকতে পারেননি তিনি।

বিজয়ের পর একসময় আব্দুল করিম স্থানীয় একটি হাইস্কুলে শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত হলেন। ওই সময় ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামে চাকরি নিয়ে চলে যাওয়ার চিন্তা করতে পারেননি তিনি অনেকটা এই কবরস্থানের কারণেও। এক ধরনের আকর্ষণ তাকে পেয়ে বসে। এরমধ্যে তাঁর বাবা আব্দুল মান্নান ইন্তেকাল করেন। সেই থেকে পুরো কবরস্থানের দেখভালের দায়িত্ব পড়ে আব্দুল করিমের ওপর। তিনি ভাবতে থাকেন এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের কবরগুলোর সৌধ নির্মাণ করা জাতি হিসেবে আমাদের দায়িত্বভুক্ত। দৌড়াদৌড়ি করতে থাকেন বিভিন্ন বিভাগ ও দফতরে। সবশেষে সরকারি সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত হয়। পাহাড়ের ওপর কবরগুলোকে পাকা করা হয়। পাহাড়ে ওঠার জন্য সিঁড়ি তৈরি হয় পাকা। কবরস্থানের উত্তর-পশ্চিম কোণে বেদি তৈরি হয়, যেখানে এপিটাফ কিংবা ম্যুরাল তৈরির সুযোগ রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশের বৃহত্তম মুক্তিযোদ্ধা কবরস্থানকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য স্থির করে সরকার একসময় সালদানদী থেকে কুল্লাপাথর পর্যন্ত রাস্তা পাকা করে। যদিও অনেকেই মনে করছেন, এই রাস্তার কাজটি গতিশীল করে দিয়েছে সেখানকার গ্যাসফিল্ড। উন্নয়নমূলক কাজ হিসেবে সেখানে তৈরি হয়েছে মসজিদ, গেস্টহাউজ ও পাকাঘাট।

তিনটি পাহাড়ের একটিতে বাস আব্দুল করিমের পরিবারের। মাঝখানে ছোট এক চিলতে সমতলভূমি। ওখানে গাছ লাগিয়ে সৌন্দর্যবৃদ্ধি করা হয়েছে।

দুর্ভাগ্যজনক সংবাদ পাওয়া গেছে সেখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিষয়ে। সীমান্তঘেঁষা এলাকা হওয়ায় সেখানে অহিতকর নানাকাজ হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। যা বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনকে উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে শহীদদের কবরস্থানের পবিত্রতা নষ্ট হয় এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল করিমের মৃত্যুর পর বারবার মনে হচ্ছে– এভাবে প্রতিটি শহীদকে সহোদর ভাববেন কি অন্য কেউ? কবরস্থানকে পরিত্যক্ত না ভেবে এখান থেকে আমাদের আগামী প্রজন্মকে দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ করতে এগিয়ে আসবে কি কেউ?

জাতীয় বীরদের স্থায়ী ঠিকানা জাতীয়ভাবেই সংরক্ষণ হওয়ার কথা। যতটা জেনেছি, এই কবরস্থানের দায়িত্ব পালন করছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পরিষদ। এ নিয়ে আব্দুল করিমেরও বক্তব্য ছিল। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় কিংবা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এর দায়িত্ব নেওয়া উচিত। আর অত্যন্ত মনোরম পরিবেশের কুল্লাপাথরে গবেষণা কেন্দ্র এবং সরকারিভাবে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠাও প্রয়োজন বলে মনে করি। সবশেষে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল করিমের যুদ্ধশেষের যুদ্ধ যেন সফল হয়, সেটাই কামনা করছি।

লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক।

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

গরিবের কথা একটু হলেও ভাবুন

গরিবের কথা একটু হলেও ভাবুন

গণপরিবহনে দলবদ্ধ ধর্ষণের প্রতিকার কি নেই?

গণপরিবহনে দলবদ্ধ ধর্ষণের প্রতিকার কি নেই?

লাল সবুজের আবেগে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান

লাল সবুজের আবেগে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান

হেফাজতের নতুন কৌশল

হেফাজতের নতুন কৌশল

গ্রেফতার মানেই মদ কেন?

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২১, ১৬:৪৫

আমীন আল রশীদ গৃহকর্মীকে নির্যাতনের অভিযোগে একসময়ের চিত্রনায়িকা একাকে আটক করেছে হাতিরঝিল থানা পুলিশ। ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে শনিবার (৩১ জুলাই) বিকালে তাকে রাজধানীর উলনের বাসা থেকে আটক করা হয়। হাতিরঝিল থানার ওসি জানান, একার বাসা থেকে পাঁচ পিস ইয়াবা, ৫০ গ্রাম গাঁজা ও মদ উদ্ধার করা হয়েছে।

এর ঠিক একদিন আগে রাজধানীর গুলশান থেকে গ্রেফতার করা হয় সমালোচনার মুখে আওয়ামী লীগের উপ-কমিটির সদস্য পদ হারানো ব্যবসায়ী হেলেনা জাহাঙ্গীরকে। অভিযান শেষে র‌্যাব জানায়, হেলেনা জাহাঙ্গীরের বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ মদ, বিয়ার, বিদেশি মুদ্রা, চাকু, মোবাইল সেট, ক্যাসিনো সরঞ্জাম, এটিএম কার্ড ও হরিণের চামড়া উদ্ধার করা হয়েছে।

একই সময়ে পিয়াসা ও মৌ নামে আরও দুই নারীকে আটক করা হয়, যাদের একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য বলে দাবি করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী—যারা রাতে বিভিন্ন পার্টিতে গিয়ে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের টার্গেট করে বাসায় ডেকে আনতেন। এরপর বাসায় গোপনে তাদের আপত্তিকর ছবি তুলতেন। সেই ছবি বাবা-মা বা পরিবারের সদস্যদের দেখানোর ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করতেন। পয়লা আগস্ট রাতে রাজধানীর বারিধারা ও মোহাম্মদপুরে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। পুলিশ বলছে, তাদের বাসায় বিদেশি মদ ও ইয়াবা পাওয়া গেছে।

স্মরণ করা যেতে পারে, প্রয়াত বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদসহ অনেক রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এমনকি যুবলীগ নেতা সম্রাটসহ আরও অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে আটক বা গ্রেফতারের সময় তাদের বাসা থেকে মদ উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছে। অথচ তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই অন্য অনেক অভিযোগ ছিল। প্রশ্ন হলো, এত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বাসা থেকে মদ উদ্ধারের কথা কেন বলা হয়? বড় ব্যবসায়ী বা প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের বাসায় দুই চার বোতল মদ থাকা কি খুব অস্বাভাবিক?

গৃহকর্মীকে নির্যাতন করা হয়েছে—শুধু এই অভিযোগই কি সাবেক চিত্রনায়িকা একার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেত না? বাসা থেকে মদ ও গাঁজা উদ্ধারের কথা কেন বলতে হলো? আসলেই কি বাসায় মদ ছিল? পিয়াসা ও মৌ নামে যে দুই নারীকে আটক করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে যদি ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ থাকে, তাহলে এই অভিযোগেই কি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না? নাকি আসলেই তাদের বাসা থেকে মাদক উদ্ধার করা হয়েছে?

বাস্তবতা হলো, যেহেতু বাংলাদেশ একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশ এবং এ দেশের মানুষের বড় অংশই ধর্মভীরু—ফলে কাউকে গ্রেফতারের সময় যদি মদ উদ্ধারের কথা বলা হয়, সেটি সামাজিকভাবে ওই ব্যক্তির প্রতি মানুষের ক্ষোভ তৈরিতে সহায়তা করে। তাকে সামাজিকভাবে অসম্মানিত করে। যাতে মানুষ তার আসল অপরাধটি আমলে না নিয়ে বরং তার বাসায় যে মদ পাওয়া গেছে এবং তিনি যে মদপান করেন, এটিই মুখ্য হয়ে ওঠে।

সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বাসায় গণহারে তল্লাশি চালানো হলে সম্ভবত অধিকাংশের বাসায়ই দুই চার বোতল মদ পাওয়া যাবে। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী লাইসেন্স ছাড়া মদপান করা বেআইনি হলেও অসংখ্য মদের দোকান বা বার রয়েছে। প্রতিটি অভিজাত ক্লাবেই বার রয়েছে। এসব ক্লাব ও বারে গিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ মদপান করেন বা কিনে নিয়ে আসেন—যাদের অধিকাংশেরই মদপানের লাইসেন্স নেই। এসব বার ক্লাবে প্রতিদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালায় না। যদি চালাতো তাহলে লাইসেন্স ছাড়া মদপান ও মদ কেনার অপরাধে প্রতিদিন কয়েক হাজার লোককে গ্রেফতারের করতে হতো।

মদ উদ্ধারের বিষয়ে হেলেনা জাহাঙ্গীরের মেয়ে জেসিয়া আলম সাংবাদিকদের বলেছেন, তার ভাই মদ পান করেন। সেগুলোই বাসায় ছিল। তবে ভাইয়ের মদপানের লাইসেন্স রয়েছে। আর হরিণের চামড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, তার ভাইয়ের বিয়ের সময়ে তার মায়ের সঙ্গে রাজনীতি করা নেতানেত্রীরা মিলে ওই চামড়াটি উপহার দিয়েছিলেন। যেটি দেয়ালে ঝোলানো ছিল। ক্যাসিনোর সরঞ্জামের বিষয়ে তিনি বলেন, সময় কাটানোর জন্য তারাই ক্যাসিনো খেলতেন। জেসিয়া বলেন, এটা বাসায় বসে তাস খেলার মতো।

জেসিয়ার এই কথার কতটুকু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আমলে আর সাধারণ মানুষ কতটুকু বিশ্বাস করবে—তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, দেশের আইন কী বলছে? ঘরে বসে খেলার জন্য কেউ কি ক্যাসিনো সরঞ্জাম রাখতে পারেন? ক্যাসিনো মূলত জুয়া। দেশের অসংখ্য ক্লাবে প্রতিনিয়তই জুয়া খেলা হয়। বাংলাদেশের সংবিধানে জুয়া খেলা নিষিদ্ধে রাষ্ট্র ব্যবস্থা নেবে বলে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু কতগুলো ক্লাবে জুয়া বন্ধ করা সম্ভব? মূলত পয়সাওয়ালারাই জুয়া খেলেন। পৃথিবীর অনেক দেশেই ক্যাসিনো বৈধ। সারা পৃথিবীর ধনী লোকেরা যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাস শহর এবং ইউরোপের ক্ষুদ্র রাষ্ট্র মোনাকোয় যান ক্যাসিনো খেলতে।

দেশে বন্যপ্রাণী আইন অনুযায়ী হরিণ শিকার নিষিদ্ধ। সেই হিসেবে কারও বাসায় হরিণের চামড়া পাওয়া গেলে এটা অবৈধ। কিন্তু কেউ যদি বিদেশ থেকে হরিণের চামড়া কিনে আনেন বা কেউ যদি এরকম উপহার পান, সেটি কি অবৈধ? অসংখ্য বড়লোকের বাসার ড্রয়িংরুমের দেয়ালে হরিণের চামড়া আছে। সব বাসায় অভিযান চালিয়ে কি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হরিণের চামড়া আটক করে বন্যপ্রাণী আইনে ওই বাড়ির মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করবে? হরিণ শিকার আর বাসার দেয়ালে শখের বশে হরিণের চামড়া ঝুলিয়ে রাখা কি এক? অনুসন্ধানের বিষয় হলো, ওই হরিণের চামড়ার উৎস কী? কেউ যদি হরিণ শিকার করে তার চামড়া ঝুলিয়ে রাখেন বা দেশের কোনও বাজার থেকে হরিণের কাঁচা চামড়া কিনে নেন, সেটি নিশ্চয়ই বেআইনি। হেলেনা জাহাঙ্গীরের বাসার দেয়ালে ঝুলানো হরিণের চামড়াটি কি অবৈধ?

হেলেনা জাহাঙ্গীরকে ধরার জন্য বা তাকে আইনের মুখোমুখি করার জন্য তার বাসা থেকে মদ, ক্যাসিনো সরঞ্জাম বা হরিণের চামড়া উদ্ধার করতে হবে কেন? তার বিরুদ্ধে মূল যেসব অভিযোগ, তার একটি বড় অংশই ক্ষমতার অপব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও প্রতারণার। সুতরাং এই অভিযোগেই তো তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়। নাকি দেশের প্রচলিত আইনে মদ উদ্ধারের বিষয়টি বেশি স্পর্শকাতর এবং এই ইস্যুতে আসামিকে ‘সাইজ’ করা সহজ হয়?

হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে আরেকটি বড় অভিযোগ, তিনি ‘জয়যাত্রা’ নামে যে আইপি টেলিভিশন চালাতেন, সেটি অবৈধ। যদিও সম্প্রচার চ্যানেল হিসেবে যেসব সেটআপ থাকা দরকার তার সবকিছুই রয়েছে। সুতরাং একটি অবৈধ গণমাধ্যম চালানোর অভিযোগেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতো। যদিও দেশে আরও অসংখ্য আইপি টিভি রয়েছে, যেগুলোর আইনি বৈধতা নেই। এসব আইপি টিভির মূল কাজ চাঁদাবাজি—এমন অভিযোগও নতুন নয়। সুতরাং, যে যুক্তিতে ‘জয়যাত্রা’র বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেই একই যুক্তিতে অন্য সব আইপি টিভিও বন্ধ করে দেওয়া দরকার। অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, অনেক আইপি টিভির পেছনেই কোনও না কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তি রয়েছেন।
উল্লেখ্য, গ্রেফতারের সময় শুধু মদ নয়, কারও কারও ক্ষেত্রে নারী ইস্যুও সামনে আনা হয়। যেমন, সম্প্রতি অভিনেত্রী পরীমনির দায়ের করা মামলায় ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের সঙ্গে তিন নারীকেও গ্রেফতার করা হয়— যাদের ‘রক্ষিতা’ বলে পরিচয় দেওয়া হয়। প্রথম কথা হচ্ছে, পুলিশ কোনও নারীকে ‘রক্ষিতা’ বলে গণমাধ্যমের সামনে পরিচয় দিতে পারে কিনা? রক্ষিতা মানে কী? রাষ্ট্রের কোন আইনে রক্ষিতা শব্দটি রয়েছে এবং কোন কোন মানদণ্ডে একজন নারীকে রক্ষিতা বলা যায়? তারও চেয়ে বড় প্রশ্ন, পরীমনির মামলা ব্যবসায়ী নাসিরের বিরুদ্ধে। তাহলে ওই তিন নারীকে কেন গ্রেফতার করা হলো? তাদের অপরাধ কী? ঘটনার সময় কি তারা নাসির উদ্দিনের সঙ্গে ছিলেন? কেন তাদের রিমান্ডে নেওয়া হলো?
সুতরাং, কোনও অপরাধীকে গ্রেফতার করা হলে আমরা খুশি হই এটা যেমন ঠিক, তেমনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোন শব্দ ব্যবহার করে, কী কী তথ্য দেয়, কোন প্রক্রিয়ায় কাকে গ্রেফতার বা আটক করে, সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয় কিনা, রিমান্ডের নামে আসলে কী হয়—এসব প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।  

লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন। 

 
 
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

মহামারিকালে হাসপাতাল বন্ধ!

মহামারিকালে হাসপাতাল বন্ধ!

বুদ্ধিজীবী তর্কের লাভ-ক্ষতি

বুদ্ধিজীবী তর্কের লাভ-ক্ষতি

আমলাতন্ত্র নিয়ে সমালোচনার তির কার দিকে যাচ্ছে?

আমলাতন্ত্র নিয়ে সমালোচনার তির কার দিকে যাচ্ছে?

সমাজে ইসলামিক বক্তাদের প্রভাব ও জনসংস্কৃতির তর্ক

সমাজে ইসলামিক বক্তাদের প্রভাব ও জনসংস্কৃতির তর্ক

লকডাউনের শিথিলতা মহাবিপদের পূর্বাভাস

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২১, ১৭:৪০
সালেক উদ্দিন ‘শিথিল হয়ে আসছে কঠোর লকডাউন’ খবরের কাগজের এমন শিরোনামকে ভয়ংকরই বলতে হবে। শুধু খবরের কাগজে, অনলাইন পোর্টালের নিউজে বলবো কেন? চোখ মেলে যা দেখছি তাতে এমনই মনে হচ্ছে। প্রতিদিনই  রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে যানবাহন বেড়ে চলছে, চেকপোস্টে গাড়ির জট বাড়ছে, পদ্মার দুই নৌ-রুটে, ফেরিঘাটে মানুষের লাইন প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে। ঢাকার রাস্তা তো এখন প্রাইভেট কার, রিকশা, অটোরিকশা, বাইসাইকেল, মোটরসাইকেলের দখলে। রাস্তায় রাস্তায় হাজার হাজার রিকশা আর  মানুষের অবাধ চলাচল ইত্যাদি কি আর এই খবরের সত্যতা যাচাইয়ের অপেক্ষা রাখে?

ঈদের একদিন পর অর্থাৎ ২৩ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত দেশব্যাপী কঠোর লকডাউন চলছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন, লকডাউন কঠোর থেকে কঠোরতর হবে।

শুরুতে দুই তিন দিন মনে হয়েছিল বোধহয় সত্যিই তাই। এখন আর সে রকম মনে হয় না। টেলিভিশনের খবর, সংবাদপত্রের খবর, রাস্তায় চোখ মেলে দেখা- যেভাবেই দেখুন না কেন এই লকডাউনও আগের লকডাউনের মতোই একই পথে হাঁটছে, যা জাতির জন্য মহাবিপর্যয়ের অশনি সংকেত।

বাংলাদেশের তো বটেই, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিপর্যয় এখন করোনার মহামারি। পৃথিবীকে স্বস্তি দিচ্ছে না এই ব্যাধি। বাংলাদেশে এখন প্রতিদিনই সংক্রমণের রেকর্ড ভাঙছে। রেকর্ড ভাঙছে মৃত্যুর। এর ফলাফল কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে কেউ জানে না। তবে কিছুটা আন্দাজ করা যেতে পারে। আর সেই আন্দাজের আলোকেই এই ঈদের আগেই বাংলা ট্রিবিউনেই ‘এবার ঈদযাত্রা বন্ধ হোক’ শিরোনামে লিখেছিলাম- ‘যদি গত রোজার ঈদের মতো কোরবানির ঈদেও লাখ লাখ মানুষ ঢাকাসহ শহর অঞ্চল থেকে গ্রামে, গ্রাম থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঈদযাত্রায় অংশ নেয় তবে তা হবে করোনার কাছে আত্মাহুতি দেওয়ার শামিল। রোজার ঈদের সময় দেশে করোনা অবস্থা নিয়ন্ত্রণে ছিল। এবার রয়েছে নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায়। এমন কঠিন অবস্থায়ও যদি এবারের ঈদযাত্রার  মানুষদের ঠেকানো না যায় তবে বলতেই হবে করোনার কাছে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া দেশের মানুষের আর কোনও উপায় নেই।’

আমার সেই লেখাটি পাঠকদের কাছে সমালোচিত হয়েছিল। অনেক পাঠকই তাদের মতামতে নিন্দার তীরটি নিক্ষেপ করতে ভুল করেননি। কেউ কেউ আমি মুসলমান কিনা তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। সম্ভবত তারা শুধু ঈদে বাড়ি যাওয়ার কথাই ভেবেছেন। একবারও ভাবেননি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মানুষকে মহামারি আক্রান্ত এলাকায় প্রবেশ করতে বারণ করেছেন এবং আক্রান্ত এলাকা থেকে বের না হওয়ার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। যার ফলে ধর্মযুদ্ধে গিয়ে হজরত ওমর (রা.) যখন জানলেন সেই এলাকায় মহামারি চলছে, তখন তিনি সৈন্যবাহিনী নিয়ে আর মহামারি আক্রান্ত যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করেননি। যুদ্ধ না করে ফিরে এসেছিলেন।

সময় এসেছে ভেবে দেখার- আমরা ধর্মের নির্দেশনা মানছি কিনা?

যাহোক, তারপরও  ঈদের কারণে সরকারকে লকডাউন শিথিলের নামে মূলত লকডাউন তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে ঈদের একদিন পর থেকে ১৪ দিনের কঠোর  লকডাউনের ঘোষিতও হয়েছে। এই ঘোষণায় কিছুটা হলেও আশ্বস্ত হয়েছিলাম।

আশ্বস্ত হয়ে আরেকটি অনলাইন পোর্টালে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দিল্লির লকডাউনের উদাহরণ টেনে লিখেছিলাম, সর্বশেষ ঘোষিত এই লকডাউন যদি দিল্লির মতো সত্যিই কঠোর থেকে কঠোরতর হয় এবং টিকার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা যায় তবে দেশ করোনা মহামারির মহাবিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচতে পারে। আর তা না হলে করোনায় দৈনিক সংক্রমণের সংখ্যা ১২/১৩ হাজার থেকে ৫০ হাজার  ছড়ানো এবং মৃত্যু দুই শতকের ঘর থেকে হাজারের ঘর পার হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। করোনার ক্রমবর্ধমান সংক্রমণ ও মৃত্যুর বিচারে মনে হচ্ছে পরিস্থিতি সে পথেই যাচ্ছে।
 
সবাইকে মাঠ পর্যায়ে করোনার টিকা দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ, টিকা কার্যক্রমে নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত হওয়ার নির্দেশ, ৭ আগস্ট থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে টিকাদান কেন্দ্রে এনআইডি কার্ড নিয়ে গেলেই টিকা দেওয়ার ঘোষণা, আগস্টের আগে শিল্প কারখানা না খোলার সিদ্ধান্ত সঠিকভাবে পালিত হলে করোনা দৌড়ের গতি কিছুটা হলেও কমবে। কিন্তু লকডাউন বর্তমানে যেভাবে চলছে যদি সেভাবে চলে অথবা আরও শিথিল হয়, তবে এতে খুব একটা কাজ হবে বলে মনে হয় না।

লকডাউন কঠোর থেকে কঠোরতর হওয়ার  প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে। লকডাউনে মানুষ যদি ঘর থেকে বের হতে না পারে তাহলে মানুষের কষ্ট হবে ঠিকই, কিন্তু খাদ্যাভাবে মারা যাওয়ার কথা যারা বলছেন তাদের কথা ঠিক নয়। এরও বিকল্প আছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নেতৃত্বে আগ্রহী সাধারণ মানুষদের নিয়ে পাড়ায়-মহল্লায় গ্রামগঞ্জে স্বেচ্ছাসেবক  দল গঠন করা যেতে পারে। এদের দ্বারা খাদ্য চিকিৎসাসহ সরকারি বেসরকারি খাতের সহায়তা সামগ্রী সংকটে পড়া মানুষদের দুয়ারে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। শুধু নিম্নবিত্ত নয়, মধ্যবিত্তকেও এর আওতায় আনতে হবে। মধ্যবিত্ত এমন একটি শ্রেণি, তারা কষ্টের কথা না বলতে পারে, না সইতে পারে!

প্রকৃতপক্ষে এদের একটা বিরাট অংশ বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে। বিষয়টি আমাদের মাথায় থাকতে হবে।

করোনার সঙ্গে যুদ্ধে সবার আগে প্রয়োজন শতভাগ জনসচেতনতা। এ ব্যাপারে অন্তহীন প্রচেষ্টা আমরা দেখেছি। কাজ হয়নি। এখন সেই পদক্ষেপ নেওয়া দরকার যাতে কাজ হয়। বৃহত্তর স্বার্থের জন্য ক্ষুদ্রতর স্বার্থকে ত্যাগ করার কথা গুণীজনেরা বহুবার বলেছেন। করোনার রশি টেনে ধরা জাতির জন্য বৃহত্তর স্বার্থ। এতে যদি কিছু দিন মানুষকে ঘরে বসে কাটাতে হয়, খাদ্যাভাবের কষ্ট করতে হয়, তবে এই ত্যাগটুকু করতেই  হবে।

করোনা নিয়ন্ত্রণের উপায়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো টিকা প্রদান এবং জীবনযাত্রায় নিয়মতান্ত্রিকতা নিশ্চিত করা। এরইমধ্যে টিকার সহজলভ্যতার নিশ্চয়তা সরকার দিয়েছে। এবার নিশ্চিত করতে হবে জীবনযাত্রার নিয়মতান্ত্রিকতা। এর জন্য এই মুহূর্তে অন্তত লকডাউনের সময়টুকুতে মানুষকে ঘরে রাখার বিকল্প নেই। তারপরও মানুষ যদি ঘরে না থাকে তবে জোর প্রয়োগসহ সরকারের যা যা করা দরকার তাই করতে হবে। যতটা কঠোর হওয়া দরকার অবশ্যই ততটা হতে হবে। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে এ নিয়ে কে কী বললো তা নিয়ে ভাবা সরকারের উচিত হবে না।

করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় হোক আমাদের সবার।

লেখক: কথাসাহিত্যিক
 
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

ঈদ আনন্দে ভেসে যাক করোনার মহামারি

ঈদ আনন্দে ভেসে যাক করোনার মহামারি

ঈদযাত্রা এবারের জন্য বন্ধ হোক

ঈদযাত্রা এবারের জন্য বন্ধ হোক

দৃষ্টি এখন কঠোর লকডাউনের ওপর

দৃষ্টি এখন কঠোর লকডাউনের ওপর

বাবাদের যেন বৃদ্ধাশ্রমে যেতে না হয়

বাবাদের যেন বৃদ্ধাশ্রমে যেতে না হয়

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

আমিরাতি জাহাজ ছিনতাই, অভিযোগ ইরানের বিরুদ্ধে  

আমিরাতি জাহাজ ছিনতাই, অভিযোগ ইরানের বিরুদ্ধে  

পেন্টাগনের কাছে হামলায় পুলিশ কর্মকর্তা নিহত

পেন্টাগনের কাছে হামলায় পুলিশ কর্মকর্তা নিহত

নাসুমের সাফল্যে গর্বিত সুনামগঞ্জবাসী

নাসুমের সাফল্যে গর্বিত সুনামগঞ্জবাসী

নিউ ইয়র্ক গভর্নরের বিরুদ্ধে একাধিক নারীকে যৌন হয়রানির প্রমাণ

নিউ ইয়র্ক গভর্নরের বিরুদ্ধে একাধিক নারীকে যৌন হয়রানির প্রমাণ

ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে রাজশাহী মেডিক্যালে ভর্তি

ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে রাজশাহী মেডিক্যালে ভর্তি

মিতু হত্যা মামলা: গায়ত্রী সম্পর্কে পিবিআইকে তথ্য দিয়েছে ইউএনএইচসিআর

মিতু হত্যা মামলা: গায়ত্রী সম্পর্কে পিবিআইকে তথ্য দিয়েছে ইউএনএইচসিআর

স্বামীর ৪ ঘণ্টা পর শ্বাসকষ্টে স্ত্রীরও মৃত্যু

স্বামীর ৪ ঘণ্টা পর শ্বাসকষ্টে স্ত্রীরও মৃত্যু

দশ টাকার ভাড়া নিয়ে রিকশাচালককে রডের আঘাতে হত্যা

দশ টাকার ভাড়া নিয়ে রিকশাচালককে রডের আঘাতে হত্যা

কাবুলে শক্তিশালী বিস্ফোরণ, গোলাগুলি, নিহত ৩

কাবুলে শক্তিশালী বিস্ফোরণ, গোলাগুলি, নিহত ৩

বৃদ্ধ বাবা-মাকে আশ্রয়হীন করায় ৩ ছেলেকে পুলিশে দিলেন ইউএনও

বৃদ্ধ বাবা-মাকে আশ্রয়হীন করায় ৩ ছেলেকে পুলিশে দিলেন ইউএনও

মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের বাইরে গোলাগুলি

মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের বাইরে গোলাগুলি

৩ থেকে ১৭ বছর বয়সীদেরও টিকা দেবে আমিরাত

৩ থেকে ১৭ বছর বয়সীদেরও টিকা দেবে আমিরাত

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune