X
সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২ আশ্বিন ১৪২৮

সেকশনস

বিপদ ডেকে আনছে ভারত, ঝুঁকি বাংলাদেশেরও

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২১, ১৬:০৫

মো. জাকির হোসেন যুগে যুগে দেশে দেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিন্দিত হয়েছে। রাষ্ট্র শাসনে ধর্মের অপব্যবহার ভয়ংকর পরিণতি ডেকে এনেছে। এসব জেনেও ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার উগ্র হিন্দুত্ববাদকে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে। ফলে হিন্দু ধর্মের সারকথা ‘অহিংসা পরম ধর্ম’ এখন ভারতের ত্রি-সীমানা ছেড়ে পালিয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতা কাগুজে নীতিতে পরিণত হয়ে সংবিধানে বৃত্তাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদ ক্রমেই গ্রাস করছে সমগ্র ভারতবর্ষকে। তৃণমূলে ছড়িয়ে পড়ছে উগ্রবাদ, জন্ম নিয়েছে ভয়ংকর মুসলিম বিদ্বেষ। ২০০৫ সালে মনমোহন সিং সরকার কেন্দ্র, রাজ্য, অঞ্চল ও জেলা স্তরে মুসলমানদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত ক্ষেত্রে বিরাজমান অবস্থার ওপর প্রতিবেদন তৈরির জন্য দিল্লি হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি রাজেন্দ্র সাচারের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেন, যা ‘সাচার কমিটি’ নামে পরিচিত।

সাচার কমিটি কেন্দ্রীয় সরকারি দফতর, রাজ্য সরকারি দফতর থেকে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি প্রকাশিত সংখ্যাগণিত, গবেষণাপত্র ও পুস্তকাদি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ৪৫০ পাতার তথ্যভিত্তিক এক প্রতিবেদন তৈরি করেন। প্রতিবেদনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মুসলমানদের বঞ্চনা ও বৈষম্যের নৈরাশ্যজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, ভারতীয় মুসলমানদের অবস্থা তফসিলি সম্প্রদায় ও তফসিলি উপজাতীয়দের চেয়েও খারাপ অবস্থায় রয়েছে। দলিতরাও মুসলমানদের চেয়ে ভালো আছে। এই প্রতিবেদনে ভারতীয় মুসলমানদের ওপর পরিচালিত বৈষম্যের বিষয়টি জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কমিটির একটি সুপারিশ ছিল, বৈষম্যের বিষয়গুলো আইনিভাবে সমাধান করার জন্য একটি কৌশল উদ্ভাবন করার লক্ষ্যে একটি ‘ইকুয়াল অপারচ্যুনিটি কমিশন’ (ইওসি) গঠন করতে হবে।

এ ছাড়াও মুসলমানদের ‘মূলস্রোতে’ নিয়ে আসার জন্য বেশ কিছু সুপারিশ করা হয় প্রতিবেদনে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় মুসলমানদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ব্যবস্থা করা, শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো, মাদ্রাসা শিক্ষার যথাযথ গুরুত্ব, ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক সংস্থায় ঋণের সুবন্দোবস্ত, সরকারি ও আধা সরকারি চাকরিতে মুসলমানদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং পরিকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো। প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, এই পশ্চাৎপদতা রাষ্ট্র কর্তৃক অনুসৃত বৈষম্যের নীতির ফল। রাষ্ট্র তার নীতি বদল না করলে এ পশ্চাৎপদতা দূর হতে পারে না। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই সুবিশাল জনগোষ্ঠী যদি স্থায়ী দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও বুভুক্ষের মধ্যে বসবাস করেন তাহলে যে কেবল বিরাট মানবসম্পদের অপচয় ঘটছে তাই নয়, একই সঙ্গে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর নিজেদের ‘আলাদা’ বলে ভাববার বাস্তব ভিত্তি থেকে যাচ্ছে। এতে জাতীয় ঐক্য বিঘ্নিত হচ্ছে এবং সমাজের রূপান্তরের পথে বাধা তৈরি হচ্ছে। অপরদিকে অন্য জনগোষ্ঠীর মানুষদের মধ্যেও মুসলমানদের সম্পর্কে নানারকম বিদ্বেষমূলক ধারণা গড়ে উঠছে।

বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে মুসলমানদের মূল স্রোতে আনার পরিবর্তে বিজেপি সরকারের উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিদ্বেষমূলক নীতি ভারতীয় সমাজকে বিভক্ত, বিষাক্ত ও রক্তাক্ত করেছে। কল্পকাহিনির ওপর ভিত্তি করে ভারতের শাসক দলের হঠাৎ করে আমদানি করা বৈধ নাগরিকত্বের ধারণা জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) ও সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) ভারতের নাগরিক ও সমাজের বন্ধনে নজিরবিহীন ভাঙন সৃষ্টি করেছে। হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে ঘৃণা, আর ঘৃণা থেকে দাঙ্গা-সহিংসতা। এর মাধ্যমে ভারতের গণতন্ত্র ও সভ্যতা লজ্জার মধ্যেই পড়ছে। ২০২০-এর ফেব্রুয়ারিতে দিল্লিতে সাম্প্রদায়িক ঘটনা তার একটি উদাহরণ মাত্র। ভারতের একটি বড় অংশে প্রায় তিনশ’ বছর রাজত্ব করেছিল মুঘল সাম্রাজ্য। প্রায় তিনশ’ বছর রাজত্ব করা মুঘল সাম্রাজ্য দেশের ইতিহাসের একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভারতের বেশিরভাগ সৌধ মুঘল আমলে তৈরি হয়েছিল। মুঘল সম্রাট শাহজাহানের অনন্য সৃষ্টি তাজমহল। মুঘল শাসনামল ভারতবর্ষের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। অথচ ভারতের মহারাষ্ট্রের স্কুলের সিলেবাস থেকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে মুঘল আমলের ইতিহাস। মুঘল সুলতানদের ইতিহাস সরিয়ে দিয়ে সেখানে নিয়ে আসা হয়েছে হিন্দু শাসক ছত্রপতি শিবাজীর প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যের ইতিহাস। কমিটির চেয়ারম্যান সদানন্দ মোরে জানাচ্ছিলেন, ‘আমাদের ছাত্রছাত্রীরা মহারাষ্ট্রের বাসিন্দা। তাই মারাঠা ইতিহাসের সঙ্গে তাদের সরাসরি যোগ আছে। সমস্যাটা হলো বইয়ে পৃষ্ঠা সংখ্যা সীমিত। তাই দুটো ইতিহাসই রাখা কঠিন, আবার মুঘল ইতিহাস রেখে মারাঠা ইতিহাস তো সরিয়ে দেওয়া যায় না!’ ইতিহাস পাঠ্যপুস্তক কমিটি বলছে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কোনও কারণ নেই।

প্রশ্ন হলো, মুসলমানদের ইতিহাস বাদ না দিয়ে, কয়েক পৃষ্ঠার মুঘল ইতিহাস পড়ানো হলে খুব কী ক্ষতি হয়ে যেত? কেবল স্কুলের সিলেবাসে নয়, মুসলিম বিদ্বেষের প্রভাব পড়েছে ভারতের আদালতেও। অকাট্য প্রমাণ ও প্রামাণ্য নথিপত্রের ভিত্তিতে নয়, বরং হিন্দু ধর্মের কিছু মানুষের বিশ্বাসকে মান্যতা দিয়ে বাবরি মসজিদ মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট মসজিদের জায়গায় মন্দির নির্মাণের বিতর্কিত রায় দিয়েছেন। পরস্পরবিরোধী, পক্ষপাতমূলক রায়টি ছিল অসঙ্গতিপূর্ণ। আদালত নিজেই স্বীকার করেছেন, মসজিদের নিচে যে কাঠামোর সন্ধান মিলেছিল, তা কোনও মন্দিরেরই কাঠামো ছিল, এমনটা আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার (এএসআই)-এর রিপোর্টে স্পষ্ট হয়নি। তাহলে বিতর্কিত জায়গায় মন্দির নির্মাণের পক্ষে রায়ের ভিত্তি কী?

আদালত বলেছেন, ‘তবে ওই স্থানকে যে হিন্দুরা ভগবান রামের জন্মস্থান হিসেবে বিশ্বাস করেন, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই।’ আদালতের আরেকটি যুক্তি ছিল, ‘তবে বিতর্কিত জমির ওপর রামলালার অধিকার স্বীকার করে নেওয়াটা আইনশৃঙ্খলা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বহাল রাখার প্রশ্নের সঙ্গে সম্পৃক্ত।’ বাবরি মসজিদ মামলার রায়ে একটি ভয়ংকর ‘বিপজ্জনক তত্ত্ব’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যদি কেউ প্রশ্ন তোলেন যে অমুক মসজিদের নিচে মন্দির কিংবা অমুক মন্দিরের নিচে মসজিদের কাঠামো আছে, তাহলে এই রায়ের তত্ত্ব অনুযায়ী মাটির ওপর খাড়া ভবন ভেঙে পরীক্ষা করতে হবে এবং বিশ্বাসকে মান্যতা দিতে কিংবা আইনশৃঙ্খলা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বহাল রাখার স্বার্থে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী গোষ্ঠীর পক্ষে রায় দিতে হবে, তাতে প্রামাণ্য নথিপত্র থাকুক আর না থাকুক। সুপ্রিম কোর্টের এই বিপজ্জনক তত্ত্বের প্রয়োগ শুরু হয়েছে ভারতে।

সম্প্রতি  ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের বরাবাঁকিতে যোগী আদিত্যনাথের সরকার ১০০ বছরের প্রাচীন একটি মসজিদ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। প্রশাসন দাবি করছে, ওই মসজিদের কাঠামোটি অবৈধভাবে নির্মিত হয়েছিল এবং এলাহাবাদ হাইকোর্টের অনুমতি নিয়েই তারা সেই স্থাপনাটি ভেঙেছে। কিন্তু মসজিদের খাদেম রমজান আলি বলেছেন, তাদের বক্তব্য পেশ করার কোনও সুযোগই দেওয়া হয়নি। আইনজীবী জাফরিয়াব জিলানির মতে, নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা অবস্থায় এই মসজিদ ভেঙে আদালতের রায়ের অবমাননা করা হয়েছে। অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, ওই মসজিদটি নিয়ে কখনও কোনও বিতর্ক ছিল না এবং সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে সেটি ধূলিসাৎ করা হয়েছে। সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মৌলানা খালিদ সাইফুল্লা রেহমানি আরও বলেছেন, ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মুসলিমরা সেখানে নামাজ পড়ে আসছেন– যে বক্তব্য নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যেও কোনও দ্বিমত নেই। বিবিসির প্রতিবেদন মসজিদের পাশের হিন্দু প্রতিবেশী বেণী শর্মার উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করেছে, ‘সেই ছোটবেলা থেকে এখানে কখনও নামাজ পড়া বন্ধ হয়েছে বলে দেখিনি।’

২০১৪ সালে বরাবাঁকির মসজিদের একটি দরগা থেকেই নির্বাচনি প্রচারের সূচনা করেছিলেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। বাবরি মসজিদ ও বরাবাঁকির গরিব নেওয়াজ মসজিদ ছাড়াও আরও দুটি মসজিদ ভাঙার হুমকিতে পড়েছে। এই মসজিদ দুটি ভাঙতে সুপ্রিম কোর্টের বিপজ্জনক তত্ত্বের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। মসজিদ দুটি হলো বারানসির জ্ঞানবাপী মসজিদ বা আলমগিরি মসজিদ ও আগ্রা জামে মসজিদ বা জাহানারা মসজিদ।

সম্প্রতি ভারতের বারানসির একটি আদালত নির্দেশ দিয়েছে যে জ্ঞানবাপী মসজিদ কোনও মন্দির ভেঙে গড়া হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ চালাতে হবে। এ ঘটনার এক সপ্তাহ পর উত্তর প্রদেশের মথুরার একটি আদালতে আরেকটি পিটিশন দায়ের করা হয়েছে। যেখানে রাজ্যটির আগ্রায় অবস্থিত জাহানারা মসজিদের নিচে হিন্দু দেবতা কৃষ্ণের মূর্তি আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে একই ধরনের জরিপ চালানোর অনুমতি চাওয়া হয়েছে। মসজিদটি আগ্রা জামে মসজিদ নামেই বেশি পরিচিত। পিটিশনে বলা হয়েছে, মথুরা জামানস্থান মন্দিরে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে সেখান থেকে কৃষ্ণের মূর্তি নিয়ে আসেন মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব। পরে আগ্রায় জাহানারা মসজিদের নিচে সেটিকে পুঁতে রাখেন তিনি। জ্ঞানবাপী মসজিদে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ চালানোর বিষয়ে বারানসির আদালতের রেফারেন্স দিয়ে পিটিশনে বলা হয়েছে, জাহানারা মসজিদের নিচে দেব-দেবীর মূর্তি আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

মসজিদ ভাঙার টার্গেটের পাশাপাশি ভারতীয় মুসলিম নারীদের বিরুদ্ধে আরেকটি ভয়ংকর বিদ্বেষ ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অতি সম্প্রতি অনেক মুসলিম নারীদের অনলাইনে অবমাননাও করতে দেখা যায়।  ‘সুল্লি ডিলস’ নামে অ্যাপ ব্যবহারকারীদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, অনলাইনে একজন ‘সুল্লি’ কেনার এখনই সুযোগ। ভারতে উগ্র হিন্দুদের অনেকে ট্রলে মুসলিম নারীদের অবমাননা করতে ‘সুল্লি’ শব্দটি ব্যবহার করে। যদিও ভারত সরকার ‘সুল্লি ডিলস’ অ্যাপ বন্ধ করেছেন। কিন্তু আশঙ্কার বিষয় হলো, হিন্দুত্ব উগ্রবাদের বিদ্বেষ তৃণমূলে পৌঁছে গিয়েছে ও ক্রমেই বেড়ে চলেছে।

মহাভারতের প্রবাদে আছে, ‘তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে।’ মহাভারতের এই প্রবাদটির অন্তর্নিহিত অর্থ হলো, মানুষ তার কৃতকর্মের পরিণতি থেকে কোনোভাবেই রেহাই পায় না।

আফগানিস্তানে তালেবানরা ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করছে। তালেবানের সঙ্গে সুসস্পর্ক রয়েছে পাকিস্তানের। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তালেবানরা বৈঠক করেছে। পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বন্ধুত্বের নয়। তালেবানের পাশাপাশি রয়েছে আল-কায়েদা, হাক্কানী গ্রুপ, লস্কর-ই তৈয়্যেবা। এদিকে ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’ বা ‘হিন্দুস্থানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’কে সামনে রেখে সংগঠিত হচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারতের জঙ্গিরা। বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত দুই জঙ্গি সংগঠন জামাতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ-জেএমবি, আনসার আল ইসলাম ও ভারতের জামআতুল মুজাহিদীন ইন্ডিয়া-জেএমআই একজোট হয়ে এই অপতৎপরতা শুরু করেছে বলে খবরে প্রকাশ।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে গ্রেফতার হওয়া চার জঙ্গির কাছ থেকে এ তথ্য পেয়েছে ভারতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ অবস্থায় ভারতে মসজিদ ভাঙা, মুসলিম নারীদের অপদস্থ করা তথা মুসলিম বিদ্বেষের নীতি থেকে দৃশ্যমানভাবে সরে না এলে জঙ্গি হামলার বিপদের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাত-উল-জিহাদ-আল-ইসলামির সঙ্গে তালেবানের সখ্য রয়েছে। সিলেটের বুলবুলি হুজুর নামে খ্যাত মুফতি হাবিবুর রহমান হরকাত-উল-জিহাদ-আল-ইসলামি এবং তালেবান ও আল-কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা নিজেই স্বীকার করেছেন। ২০০৪ সালে ইসলামি বিপ্লব নামে একটি বুলেটিনে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তার সঙ্গে ওসামা বিন লাদেন ও পাকিস্তানের হরকাত-উল-জিহাদ-আল-ইসলামির সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিনি সেই সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘হরকাত-উল-জিহাদ-আল-ইসলামির আমন্ত্রণের কারণেই আমার আফগানিস্তান ভ্রমণ সম্ভব হয়েছে। ...আমরা যারা আফগানিস্তানের যুদ্ধক্ষেত্র ভ্রমণ করেছি তারা হলেন শাইখুল হাদিস আজিজুল হক, আতাউর রহমান খান (কিশোরগঞ্জ-৩ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির সাবেক এমপি), চট্টগ্রামের সুলতান যাউক, ফরিদপুরের আবদুল মান্নান, নোয়াখালীর হাবিবুল্লাহ, আমি নিজে এবং আরও তিন জন।’

তিনি পাকিস্তানে অবস্থিত মুজাহিদিন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, সেখানে অনেক বাংলাদেশি মুজাহিদিনের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছে। সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেছেন, ‘তালেবানের পথ ধরে খেলাফতভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল জাতির ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব।’ তালেবানের বিজয় বাংলাদেশের জঙ্গিদের উজ্জীবিত করবে সন্দেহ নেই। শঙ্কার কথা, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিশ্চিত করেছে যে কিছু জঙ্গি ও সন্ত্রাসী সংগঠন হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে যুক্ততা বজায় রেখে চলছে। এদের বেশিরভাগই আফগানিস্তান ফেরত। এদের মধ্যে রয়েছে হরকাতুল জিহাদ বা হুজি।

গত ২৬ থেকে ২৮ মার্চ টানা তিন দিন দেশজুড়ে হেফাজত যে তাণ্ডব চালায়, তার সঙ্গে হুজির যোগসূত্র পাওয়া গেছে। আরেকটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন বলছে, হেফাজতের প্রায় ডজনখানেক নেতার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের।

বাংলাদেশে জঙ্গি সংগঠনগুলোর প্রধান শত্রু আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু পরিবার। বঙ্গবন্ধু কন্যাকে যে ১৯ বার হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে তার বেশ কয়েকটির সঙ্গে হরকাতুল জিহাদ, জামায়াতুল মুজাহিদিনসহ কয়েকটি জঙ্গি সংগঠন সম্পৃক্ত ছিল। অথচ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ইসলামের প্রচার-প্রসারে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকার। বঙ্গবন্ধুর রক্তে ছিল ইসলামের প্রচার-প্রসারের তাগিদ। আর তাই বঙ্গবন্ধু সংবিধানে মদ-জুয়া নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামের প্রচার-প্রসারের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তিনি তার সংক্ষিপ্ত শাসনামলে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে যে অসামান্য অবদান রেখেছেন তার মধ্যে অন্যতম হলো, ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড পুনর্গঠন, টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমার স্থান বরাদ্দ, হজ পালনের জন্য সরকারি অনুদানের ব্যবস্থা, সিরাত মজলিস প্রতিষ্ঠা, বেতার-টেলিভিশনে ধর্মীয় অনুষ্ঠান প্রচার, ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.), শবে কদর, শবে বরাত উপলক্ষে সরকারি ছুটি ঘোষণা, মদ জুয়া নিষিদ্ধকরণ ও শাস্তির বিধান, রাশিয়ায় প্রথম তাবলীগ জামাত প্রেরণের ব্যবস্থা, ইসলামি সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) অধিবেশনে যোগদান করে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে এই সংস্থার অন্তর্ভুক্ত করা। বঙ্গবন্ধুর ইসলাম প্রচার ও প্রসারের ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ইসলাম ও আলেম সমাজের জন্য যা কিছু করেছেন, অন্য কোনও সরকার তা করেনি।

বঙ্গবন্ধু কন্যার নির্দেশে দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় মডেল মসজিদ নির্মাণ হচ্ছে। দেশে প্রায় এক লাখ মসজিদভিত্তিক মকতব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। খতিব-ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের জাতীয় স্কেলে বেতন নির্ধারিত হয়েছে। ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আলেমদের দীর্ঘ সময়ের দাবি কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অথচ বঙ্গবন্ধু প্রবর্তিত মদ-জুয়া নিষিদ্ধের বিধান যারা বাতিল করলেন, হজের সরকারি অনুদান বন্ধ করলেন, তারা ইসলামের সেবক বলে পরিচিত আর বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার ইসলামবিরোধী বলে মিথ্যা অপপ্রচারের শিকার হলেন। এর দুটো কারণ হলো, স্বাধীনতাবিরোধীদের হাত ধরে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান। পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টি করায় জঙ্গিদের টার্গেট আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবার। বাংলাদেশ সৃষ্টিতে ভারতের সক্রিয় সহযোগিতা থাকায় ভারতও জঙ্গিদের প্রতিপক্ষ। আবার ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকার কারণেও আওয়ামী লীগ জঙ্গিদের শত্রুপক্ষ।

ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ ও ভারতের ভাগ্য একসূত্রে গাঁথা। উগ্র হিন্দুত্ববাদের বিদ্বেষে মসজিদ ভাঙা, মুসলিম নারীদের অবমাননা ও মুসলিম নির্যাতনের ঘটনার মাধ্যমে ভারত নিজের জন্য বিপদ ডেকে আনার পাশাপাশি বাংলাদেশকেও জঙ্গিবাদের ঝুঁকির মুখে ফেলছে, এ কথা জোর দিয়ে বলা যায়।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: [email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

তালেবানবিরোধীদের স্ববিরোধী অবস্থান

তালেবানবিরোধীদের স্ববিরোধী অবস্থান

আমি কেন তালেবানকে সমর্থন করি না?

আমি কেন তালেবানকে সমর্থন করি না?

পরীমণি, ‘সরি মণি’

পরীমণি, ‘সরি মণি’

রাজনীতি ও ইতিহাসের ভুল পাঠ ও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শত্রুতা

রাজনীতি ও ইতিহাসের ভুল পাঠ ও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শত্রুতা

চীনা ত্রাণের ক্ষমতা

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৮:১৮

আশিষ বিশ্বাস দক্ষিণ চীন সমুদ্র এবং হিমালয় অঞ্চলে চীনের প্রভাবে বাধ্য হয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রভাবিত কোয়াড গ্রুপে যোগ দিতে হয়েছে ভারতকে। কোয়াডে যোগ দিলে সমুদ্রে কিংবা পর্বতের উচ্চতায় ভারতকে আর এককভাবে চীনের অস্ত্রশক্তির বিশালতার মুখোমুখি হতে হবে না, অথচ প্রায়ই বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতে দিল্লিকে এই কাজের মুখোমুখি হতে হয়। যাহোক, আরেক পর্যায়ে দক্ষিণ এশিয়া এবং আশপাশের এলাকায় একটি বিপরীত রাজনৈতিক ধারা উন্মোচিত হচ্ছে। বিপুল প্রভাবের সঙ্গে মৃদু কূটনৈতিক শক্তি ব্যবহার করছে চীন, বিশেষ করে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকে মোকাবিলায়। অপেক্ষাকৃত ছোট আঞ্চলিক প্রতিবেশীগুলোকে কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় সহায়তা দিয়েছে। বিপুল আর্থিক সহায়তা এবং সময় মতো প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন দিয়ে দেশটি এখন পর্যন্ত জনবহুল অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের হৃদয় ও মন জয়ের মতো আরও বড় যুদ্ধে প্রভাব বিস্তার করেছে।

এই পরিস্থিতিতে তাদের সবচেয়ে কাছের ও সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত, কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও চীনের পরই ভারতের অবস্থান। দীর্ঘমেয়াদে যেকোনও দুই শক্তিশালী এবং অসম শত্রুতার চেয়ে এটি আলাদা নয়।

তবে দিল্লিভিত্তিক নীতিনির্ধারকদের এটাও বুঝতে পারছেন যে রাজনৈতিকভাবে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে চীনের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে তারা। গত কয়েক বছরে ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতার অপেক্ষাকৃত ধীর অগ্রগতি এশিয়ার দুই বড় দেশের একে অপরের বিরোধিতার ক্ষেত্রে তাদের বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উঠে এসেছে। আকার অবশ্যই বিষয়। চীনের অর্থনীতির বর্তমান আকার ভারতের চেয়ে প্রায় পাঁচগুণ বড়, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সরাসরি চ্যালেঞ্জের।

কিন্তু ৭০ বছর আগে স্বাধীনতা পাওয়া ভারতের এতে লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই। যুগ যুগ ধরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং ব্যাপক বহুত্ববাদী মূল্যবোধ টিকিয়ে রেখে বড় আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে উত্থান তাদের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক এক যাত্রা।

এছাড়া বিশালাকার নেতিবাচক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও চীনের সঙ্গে রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের বিরোধেও ভারত খুব একটা খারাপ করেনি। সব সময়ই নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেশীদের সহায়তা আর আঞ্চলিক গুরুত্ব ধরে রাখতে তাদের সূক্ষ্ম আর কৌশলগত পদক্ষেপ দেখা গেছে মিয়ানমার থেকে আফগানিস্তানে। সব সময়ই এসব ছিল কঠিন কাজ। চীন কখনোই ভারতের আঞ্চলিক প্রভাব কিংবা প্রতিবেশীদের কাছে তাদের ইতিবাচক মনোভাবকে পুরোপুরি উপেক্ষা করতে পারেনি।

কিছু পর্যবেক্ষক মনে করেন, ভারতের উচিত এশিয়া কিংবা আফ্রিকার অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে চীনের বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন না করা। হিমালয় সীমান্তে নতুন করে চীনা অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে তাদের সুসংহত প্রতিরোধ আন্তর্জাতিক প্রশংসা কুড়িয়েছে। তবে ভিন্নমতও রয়েছে। কোয়াডের মতো নির্দিষ্ট সামরিক জোটে ভারতের প্রবেশ উচিত কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রাকৃতিকভাবে বেশিরভাগ ভারতীয় চান না তাদের দেশ অন্য বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে বড় কোনও আঞ্চলিক বিরোধে জড়িয়ে পড়ুক। অনেক মানুষই মনে করেন, কম মনোযোগ আকর্ষণ করে কার্যকর অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে পারাই ভারতের জন্য সুবিধাজনক।

কিন্তু ভারতের বর্তমান ‘জাতীয়তাবাদী’ নেতাদের কাছে কম মনোযোগ কাড়ার দৃষ্টিভঙ্গিটি দৃশ্যত গ্রহণযোগ্য নয়। পশ্চিমা মূলধারার পর্যবেক্ষকদের পর্যবেক্ষণে হতাশাজনকভাবে তাদের ‘ডানপন্থী’ হিসেবে দেখে থাকে।

তবে এমন নয় যে ভারতের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে কোনও উন্নয়নই হয়নি। কিন্তু এই উন্নয়ন এসেছে খুব ধীরে। বর্তমান মহামারি আসার আগেও ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে জগাখিচুড়ি পেকেছিল। ভারতের সরকারপন্থী মূলধারার গণমাধ্যম শেয়ার বাজারের চাঙাভাব, ধনকুবেরের সংখ্যা বৃদ্ধিতে জোর দিতে থাকে। বিশেষ করে নতুন এবং বিশেষত গুজরাটি উদ্যোক্তাদের উত্থান ভারতের প্রচারণাযন্ত্রে উৎসাহ জোগায়। এগুলোর অনেকই বাস্তবতার চেয়ে অনেক বেশি প্রতীকী। যেমন প্রয়াত সরদার প্যাটেলের সবচেয়ে বড় মূর্তি কিংবা মুম্বাই-আহমেদাবাদের মধ্যে বুলেট ট্রেন প্রকল্প।

রাফায়েল যুদ্ধবিমান ক্রয় কিংবা কয়েক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের আর্থিক উন্নয়ন নিয়ে, আর্থিক দুর্নীতি নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনও সরকারি প্রতিক্রিয়া নেই। প্রাথমিক প্রস্তাবিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ দিয়ে ফ্রান্সের কাছ থেকে এগুলো কেনা হয়েছে। কিংবা কয়েকজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর আত্মীয়দের পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। নেই বর্তমানে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা ৬০ কোটি মানুষের কথারও কোনও উল্লেখ। চীন ও অন্য দেশগুলোর সঙ্গে এসব নিয়ে কোনও তুলনাই চলে না।

২০২১ সালের প্রথম চার মাসের কঠিন সময়ে ছোট প্রতিবেশীদের দেওয়া ভারত ও চীনের সহায়তার পরিসংখ্যান দেখলেই তাদের উদ্দেশ্য বোঝা যাবে।

ভারত: শ্রীলঙ্কাকে ২৬ টন প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সামগ্রী পাঠিয়েছে। এরসঙ্গে ৪০ কোটি ডলারের মুদ্রা বিনিময় করে দ্বীপরাষ্ট্রটির অর্থনীতিতে সহায়তা করেছে। রফতানি করেছে একশ’ টনের অক্সিজেন উৎপাদন সামগ্রী; ভুটানকে দেড় লাখ ডোজ টিকা, পরে আরও চার লাখ ডোজ, এবং এর সঙ্গে গ্লাভস, মাস্কের মতো অন্যান্য সামগ্রী। এছাড়া নেপালের আরও বড় জনগোষ্ঠীর জন্য আরও বড় সহায়তা দিয়েছে। বাংলাদেশের জন্য জানুয়ারিতে ২০ লাখ ডোজ কোভিড ১৯ ওষুধ, এরপরে ৩ লাখ টেস্ট কিট, একই পরিমাণ মাস্ক, দেড়লাখ ক্যাপ, ৫০ হাজার গ্লাভস এবং এক হাজার টন হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ওষুধ পাঠিয়েছে।

অন্যদিকে চীনা সহায়তার দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতিবেশীদের সহায়তা/ত্রাণ কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি কৌশলী মনোভাব রয়েছে।

চীন: এশিয়া ইনফ্রাসট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)-এর মাধ্যমে প্রতিবেশীদের উদার অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশকে ২৫ কোটি ডলার দিয়েছে, এছাড়া ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তা দিতে ঢাকা সফর করে মেডিক্যাল বিশেষজ্ঞদের একটি টিম। বেইজিংয়ের সূত্র অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে পাঁচশ’ কিট এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠানো হয়। শ্রীলঙ্কায় আর্থিক সহায়তা হিসেবে ৫০ কোটি ডলার পাঠানো ছাড়াও মুদ্রা বিনিময় হিসেবে পাঠানো হয়েছে ১৫৪ কোটি ডলার। নেপাল ও ভুটান প্রাথমিকভাবে যথাক্রমে আট লাখ ও ছয় লাখ ডোজ টিকা পেয়েছে। এছাড়া ভারতকেও সহায়তা করেছে চীন: পাঁচ হাজার ভেন্টিলেটর, ২১৫৬৯টি অক্সিজেন উৎপাদন যন্ত্র এবং তিন হাজার টন প্রয়োজনীয় মেডিক্যাল সরঞ্জাম এপ্রিলে পাঠায়। এসব সামগ্রীর বেশিরভাগই চীনের তৈরি, কিন্তু আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে গ্রহণকারী দেশগুলো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তাদের নিজস্ব বিকল্প গ্রহণ করেছে।

যদিও প্রতিবেশীদের সহায়তার ক্ষেত্রে ভারতের সহায়তা চীনের পরিমাণের তুলনায় অনেক কম হলেও এগুলো অকার্যকর বলে বিবেচনার সুযোগ নেই। চীনের প্রতি ভারত এক ধরনের অবমূল্যায়িত প্রতিযোগিতা আরোপ করতে পেরেছে, বেইজিংকে আরও বেশি মানবিক সহায়তায় ব্যয় করতে বাধ্য করেছে, যাতে উপকৃত হয়েছে সবাই।

ব্যানডং কনফারেন্সের পর থেকেই চীনের পররাষ্ট্র নীতিতে মর্যাদা কিংবা প্রথম অবস্থান লাভ বড় করেই দেখা হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে এশিয়ার শীর্ষ আলোকবর্তিকা বলে প্রশংসা করা হলে চীনের প্রয়াত নেতা চৌ এন লাই ক্ষুব্ধ হন। দিল্লির কূটনৈতিক জয়ের জন্য এরপরে চীন কখনোই ক্ষমা করেনি। কোনও কোনও পর্যবেক্ষকের বিশ্লেষণে সেখানেই নিহিত থাকতে পারে চীনের ছোট প্রতিবেশীদের সর্বোচ্চ সহায়তার নীতির সারবত্তা। চীন জোরালোভাবেই ইঙ্গিত দিচ্ছে তারা এই অঞ্চলের অবিসংবাদিত এক নম্বর অবস্থান চায়। বিদেশে তাদের সহায়তা কেবল এশিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। সামগ্রিকভাবে তারা এখন পর্যন্ত দেড়শ’ দেশে ১১ হাজার পাঁচশ’ কোটি ডলার সহায়তা দিয়েছে।

তবে ত্রাণ দেওয়ায় ভারতের চেয়ে চীনের এগিয়ে থাকায় বেইজিং কেবল শীর্ষ অবস্থান নয় আরও বেশি কিছু অর্জন করছে। তাদের ব্যাপক সহায়তা কর্মসূচিতে এসব দেশের বহু মানুষ তাদের মানবাধিকার নিপীড়ন ভুলে যাচ্ছে বা অন্ততপক্ষে উপেক্ষা করছে। ফলে রাজনৈতিক বিরোধী/ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে তাদের কঠোর অবস্থান, অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের নিপীড়নমূলক দিক, নিজেদের সীমানায় আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত ঘটনা আড়ালের প্রবণতা, দুর্ভিক্ষে মৃত মানুষের পরিমাণ, কিংবা নিজ দেশের মানুষের দুর্ভোগও আড়ালে পড়ে যাচ্ছে।

এখন পর্যন্ত চীনের অভ্যন্তরে করোনার বিস্তার, তাদের সরকারি হিসাব নিয়ে পশ্চিমাদের উদ্বেগ রয়েছে। কিন্তু চীন এখানে হাসতে পারে, যে অর্থ এবং চিকিৎসা সামগ্রী নিয়ে তাদের প্রস্তুতি চীনবিরোধী প্রচারণা থেকে বেশি শক্তিশালী।

চীনের ভাবমূর্তি তৈরিতে এগুলো মারাত্মক সমস্যা, যা খুব সহজে ভোলানো যাবে না। তবে পরিচিত বাংলা প্রবাদ যেমনটা বলে থাকে ‘পেটে খেলে, পিঠে সয়’ সেভাবেই নিপীড়ন সহ্য করে যাচ্ছে অন্যরা।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, কলকাতা

/জেজে/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

তালেবান ফ্যাক্টর: ভারতে যেভাবে দেখা হচ্ছে

তালেবান ফ্যাক্টর: ভারতে যেভাবে দেখা হচ্ছে

তালেবান ফ্যাক্টর: ভারতের জন্য কঠিন হলেও বিজেপির জন্য ইতিবাচক?

তালেবান ফ্যাক্টর: ভারতের জন্য কঠিন হলেও বিজেপির জন্য ইতিবাচক?

সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোয় সাধারণ মানুষের ক্ষতি কতটুকু?

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৫:৪৯
আমীন আল রশীদ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। আমার ফুপা সরকারি চাকরি করতেন। অবসরে যাওয়ার বছর কয়েক আগে তিনি মারা যান। তার কোনও সন্তান নেই। ফলে স্বামীর মৃত্যুর পরে ফুপু অনেকটা অকূলপাথারে পড়েন। চাকরি বা ব্যবসা করার মতো অবস্থা নেই। কারণ, তিনি নিজেও একটা জটিল রোগে আক্রান্ত। দ্রুততম সময়ে পেনশনের টাকাটা পাওয়া যায় এবং সেই টাকা দিয়ে পরিবার সঞ্চয়পত্র কেনা হয়। এখন ফুপু ওই টাকা দিয়ে চলছেন। এ রকম সঞ্চয়পত্র-নির্ভর মানুষের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। কিন্তু মুদ্রার অন্য পিঠও আছে এবং সঞ্চয়পত্রের মুনাফার নামে রাষ্ট্রের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়, সেই আলোচনাও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সামগ্রিক বিষয়ের একটা নির্মোহ বিশ্লেষণ দেওয়ার চেষ্টা করা হবে এই লেখায়। তার আগে দেখা যাক, এই ইস্যুতে সরকার সম্প্রতি কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে?  

গত ২১ সেপ্টেম্বর সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমানো সংক্রান্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বর্তমানে তিন বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্রে মেয়াদ শেষে মুনাফার হার ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ হলেও সেটি ১৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কমিয়ে করা হয়েছে ১০ শতাংশ। যাদের বিনিয়োগ ৩০ লাখ টাকার বেশি, তারা মেয়াদ শেষে মুনাফা পাবেন ৯ শতাংশ হারে।

অবসরভোগীদের জন্য নির্ধারিত পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশনার সঞ্চয়পত্রে মেয়াদ শেষে এত দিন ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ হারে মুনাফা পাওয়া যেত। এখন এই সঞ্চয়পত্রে যাদের বিনিয়োগ ১৫ লাখ টাকার বেশি তারা মেয়াদ শেষে মুনাফা পাবেন ১০ দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে। আর ৩০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ থাকলে এই হার হবে ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

দেশে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় যে পরিবার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি এই সঞ্চয়পত্রে মেয়াদ শেষে মুনাফার হার বর্তমানে ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ। এখন এই সঞ্চয়পত্রে ১৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মুনাফার হার কমিয়ে করা হয়েছে সাড়ে ১০ শতাংশ। আর ৩০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই হার সাড়ে ৯ শতাংশ। তবে যারা নতুন করে সঞ্চয়পত্র কিনবেন, শুধু তাদের জন্য পরিবর্তিত এই হার কার্যকর হবে।

এখন পরিবার সঞ্চয়পত্রে কর কেটে নেওয়ার পরে প্রতি লাখে পাওয়া যায় ৮৬৪ টাকা। যার ২০ লাখ টাকা আছে তিনি মাসে পান ১৭ হাজার ২৮০ টাকা। কিন্তু নতুন নিয়মে কেউ ১৫ লাখ টাকার বেশি পরিবার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করলে বা চলমান সঞ্চয়পত্র মেয়াদান্তে পুনঃবিনিয়োগ করলে তিনি কর কেটে নেওয়ার পরে প্রতি লাখে পাবেন ৭৮৭.৫০ টাকা। তার মানে ২০ লাখ টাকায় পাবেন ১৫ হাজার ৭৫০ টাকা। অর্থাৎ বর্তমানে যা পান তার চেয়ে ১৫৩০ টাকা কম। যিনি শুধু এই সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপরেই নির্ভরশীল, তার জন্য দেড় হাজার টাকাও কম নয়।

তবে এই মুনাফা কমবে নতুনদের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ এ বছরও যারা ৫ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্র কিনেছেন, আগামী ৫ বছর পর্যন্ত তারা আগের নিয়মেই, অর্থাৎ লাখে ৮৬৪ টাকাই পাবেন। কিন্তু এটার মেয়াদান্তে পুনঃবিনিয়োগ করলে পাবেন ৭৮৭.৫০ টাকা। আবার এখন কেউ যদি ১৫ লাখ টাকার কম মূল্যের সঞ্চয়পত্র কেনেন তাহলে তিনি লাখে ৮৬৪ টাকাই পাবেন। কিন্তু কেউ যদি ১৫ লাখ টাকার বেশি মূল্যের সঞ্চয়পত্র কেনেন, তাহলে লাখে পাবেন ৭৮৭.৫০ টাকা। অর্থাৎ ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগকারীদের মুনাফা কমছে না।

তবে নতুন নিয়মে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন যাদের সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বেশি। এটিও বাস্তবতা যে, সঞ্চয়পত্রে যাদের নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের নামে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করা আছে, তারা সাধারণ মানুষ নন। তারা উচ্চমধ্যবিত্ত ও ধনী। সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, বরং কম লাভবান হবেন।

সরকার বলছে, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা দিতে গিয়ে সরকারের সুদ ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। তাছাড়া এতে অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে বলে অর্থনীতিবিদদেরও অনেকে সঞ্চয় কর্মসূচিতে অতিমাত্রায় বিনিয়োগ এবং বিনিয়োগের ক্রমবর্ধমান ঊর্ধ্বগতি রোধ করার তাগিদ দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের বলেছেন, নতুন সিদ্ধান্তে মধ্যবিত্ত বিশেষ করে অবসরভোগীদের আয় কমে গেলেও দেশের সুষ্ঠু অর্থনীতি বজায় রাখার স্বার্থে মুনাফা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সঞ্চয়পত্রে যারা বিনিয়োগ করেন, সেখানে বিরাট অংশ সাধারণ মানুষ এবং প্রকৃত অর্থেই তারা সঞ্চয়পত্রের মুনাফা দিয়ে সংসার চালান এটি যেমন ঠিক, তেমনি বিপুল অঙ্কের অবৈধ ও কালো টাকা, অসৎ পথে উপার্জিত টাকা অথবা বৈধ পথে উপার্জিত সচ্ছল ব্যক্তিদের টাকাও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করা আছে। তারা কোনও না কোনোভাবে আয়ের উৎস দেখিয়েই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেন। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কেন এই লোকগুলোকে সঞ্চয়পত্র কেনার সুযোগ দিয়ে মাসে মাসে তাদের মোটা অংকের মুনাফা দেবে? যে লোক ভালো চাকরি   করেন, যার ব্যবসা আছে, যার উপার্জনের আরও একাধিক পথ আছে, রাষ্ট্র কেন তাকে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সুযোগ দিয়ে আরও বেশি পয়সা আয়ের সুযোগ দেবে?

বরং সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সুযোগ দিতে হবে অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী এবং যাদের সংসারে উপার্জনকারী নেই; যাদের আয় কম কিন্তু জমিজমা বিক্রি করে কিছু টাকা জোগাড় করেছেন এবং সেই টাকা ব্যাংকে রাখলে যেহেতু ওই অর্থে কোনও লাভ হয় না, তাই তাদের সঞ্চয়পত্র কেনার সুযোগ দিতে হবে। অনেক নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত বৈধ পথেই কিছু কিছু টাকা সঞ্চয় করে একটা সময় সেই টাকা কোথাও রেখে মাসে মাসে একটা ফিক্সড আয়ের ব্যবস্থা করতে চান। সেসব মানুষকেও সঞ্চয়পত্রের সুবিধা দিতে হবে। কিন্তু সচ্ছল ও ধনী লোকেরা কেন সঞ্চয়পত্র কিনবেন এবং রাষ্ট্র কেন তাদের সেই সুযোগ দেবে?

অনেক সচ্ছল মানুষও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেন বছর শেষে কর সুবিধা পাওয়ার জন্য। কারণ, চাকরিজীবীদের (যেকোনও পেশায়) মধ্যে এটা খুব সাধারণ প্রবণতা যে, আয়ের বিপরীতে তাদের ওপরে যে কর ধার্য হয়, তারা সেটি পুরোপুরি দেন না বা দিতে চান না। অর্থাৎ কোনও না কোনোভাবে সেই টাকা তারা কমাতে চান। সেই কমানোর যেসব আইনি তরিকা আছে, তার অন্যতম এই সঞ্চয়পত্র। অর্থাৎ নির্দিষ্ট অংকের টাকা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করা থাকলে কর মওকুফ পাওয়া যায়। এখানে প্রশ্ন অন্য। যেমন মানুষ কেন তার ওপর নির্ধারিত করের পুরো টাকাটা রাষ্ট্রকে দিতে চায় না? কারণ, সে মনে করে তার করের টাকা সঠিক পথে খরচ হচ্ছে না। কারণ, সে মনে করে তার করের টাকা সরকারি কর্মকর্তারা লুটপাট করে নিয়ে যায়। সে মনে করে কর দেওয়ার পরেও রাষ্ট্র থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা ও সুবিধা পাচ্ছে না। কর দেওয়ার পরেও সে সরকারি কোনও প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বিনা হয়রানিতে বা বিনা ঘুষে সেবা পায় না। সুতরাং সে কেন কর দেবে?

যেহেতু কর না দিয়ে তার উপায় নেই, অতএব সে কর কমানোর জন্য নানা ফন্দিফিকির করে। তার মানে মানুষের এই যে করভীতি বা করবিরক্তি—তার পেছনে দায়ী রাষ্ট্রের সামগ্রিক সিস্টেম। এসব জায়গা সংস্কার করতে হবে। না হলে শুধু সঞ্চয়পত্রে মুনাফা কমিয়ে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো যাবে না।

মানুষ কেন সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে তার আরেকটি বড় কারণ প্রচলিত ব্যাংকিং সিস্টেমে মুনাফা অনেক কম। কিন্তু যাদের বাড়তি টাকা আছে তারা কী করবেন? কোথায় সঞ্চয় করবেন? রাষ্ট্র চায় মানুষ ব্যাংকে টাকা না রেখে অন্য খাতে বিনিয়োগ করুক। কিন্তু সেই জায়গাগুলো কী? শেয়ার বাজার বরাবরই ঝুঁকিপূর্ণ। এটা জুয়ার মতো। সবার পক্ষে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ সম্ভব নয়। দ্বিতীয় উপায় ব্যবসা। বাংলাদেশে ক্ষুদ্র-মাঝারিসহ যেকোনও ব্যবসা করতে গেলে যে কত ধরনের হয়রানি ও বিপত্তির মধ্যে পড়তে হয়—তা ভুক্তভোগী ছাড়া কারও পক্ষে আন্দাজ করাও সম্ভব নয়। সুতরাং মানুষ কী করবে? বিনা পরিশ্রমে বেশি মুনাফার আশায় ডেসটিনি, ইউনিপে, যুবক এবং সবশেষ এহসান গ্রুপের মতো ফটকা প্রতিষ্ঠানে টাকা রেখে অসংখ্য মানুষ প্রতারিত হয়েছে।

তার মানে একদিকে প্রচলিত ব্যাংকে মুনাফা কম, শেয়ার বাজারে ঝুঁকি, ফটকাবাজ প্রতিষ্ঠানের দৌরাত্ম্য বাদ দিলে বাকি থাকে সঞ্চয়পত্র। ফলে মানুষ সেখানেই যায়। প্রতিবছর বাজেটে সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে যে পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে, বছর শেষে তার চেয়ে অনেক বেশি সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়। তাতে সুদ পরিশোধ বাবদ সরকারের খরচ অনেক বেড়ে যায়—এ কথাও ঠিক। কিন্তু মুদ্রার অন্য পিঠ হলো সঞ্চয়পত্রের সুদ বেশি হওয়ায় ধনীদের একটি বড় অংশ নামে–বেনামে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে রেখেছেন। ফলে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে সরকারের দেওয়া উচ্চ মুনাফার সুবিধা প্রকৃত অর্থে যাদের কাছে যাওয়া উচিত, তার বদলে ধনীদের পকেটে চলে যাচ্ছে।

সুতরাং সঞ্চয়পত্র কারা কিনতে পারবেন, সেটি সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া দরকার এবং এখানে শতভাগ স্বচ্ছতা বজায় রেখে যারা প্রকৃতই সঞ্চয়পত্রনির্ভর, তাদের জন্য মুনাফার পরিমাণ বাড়ানো দরকার। প্রতি লাখে তারা যাতে হাজার দেড়েক টাকা পান, সেই ব্যবস্থা করা দরকার। এটা হলে একটা ইনসাফভিত্তিক অর্থব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। না হলে আমাদের অর্থনীতিতে যে বিশাল দুষ্টুচক্র ভর করেছে, লুটেরা-অসৎ-অবৈধ পথে উপার্জনকারী এবং বৈধ-অবৈধ উভয় পথে উপার্জনকারী ধনী লোকেরা যেভাবে আমাদের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন, সেটির কোনও পরিবর্তন হবে না। সবাই যাতে সঞ্চয়পত্র কিনতে না পারে এবং যাতে প্রকৃত চাহিদাসম্পন্ন মানুষেরাই এই সুবিধা পান, রাষ্ট্রকে সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।
 
 
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

ইভ্যালি: গ্রাহকের টাকা ফেরত দেবে কে?

ইভ্যালি: গ্রাহকের টাকা ফেরত দেবে কে?

ঘুষ খেলে নামাজ হবে না, নাকি চাকরি থাকবে না?

ঘুষ খেলে নামাজ হবে না, নাকি চাকরি থাকবে না?

সাংবাদিকদের এত ভয় কেন?

সাংবাদিকদের এত ভয় কেন?

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে পরিবারেই বুলিং বেশি

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে পরিবারেই বুলিং বেশি

আয়কর রিটার্নে অপ্রদর্শিত সম্পত্তি প্রদর্শন করুন

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৭:০৭

মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন আমাদের অনেক করদাতা বুঝে না বুঝে নিজের বৈধ সম্পত্তি আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন করা থেকে বিরত থাকেন। এটা কত বড় ক্ষতির কারণ, তা বুঝতে পারেন যখন বৈধ সম্পত্তি থেকে কোনও আয় করেন বা বিক্রি করে অন্য কোনও বৈধ কাজ করতে যান।

বর্তমানে সম্পত্তি বিক্রি বা ক্রয়ের ক্ষেত্রে ১২ ডিজিট ই-টিআইএন প্রদর্শন করার বিধান চলমান। কোনও কোনও ক্ষেত্রে আয়করের আপডেট সার্টিফিকেট প্রদর্শন করতে হচ্ছে।

করদাতাগণের মধ্যে কিছু ধারণা আছে। যেমন,আয়কর নথিতে বেশি সম্পত্তি দেখালে নাকি আয়কর অফিস থেকে হয়রানি করা হয়। বিষয়টি কতটুকু সত্য তা জানি না, তবে আমার কাছে মনে হয়েছে ওই হয়রানির চেয়েও করদাতা নিজের ক্ষতিই বেশি করছেন। কালো টাকা সাদা করার জন্য সরকার প্রতি বছর কিছু সুযোগ দিয়ে দেয়। অর্থাৎ এটা হলো অবৈধ আয়কে বৈধ করার সুযোগ।  এটা নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা হয়। কিন্তু যারা বৈধ সম্পত্তি আয়কর রির্টানে দেখাচ্ছেন না, এটা  যে কত বড় ক্ষতি তা নিয়ে কোনও আলোচনা নেই, নেই কোনও সমালোচনা। নিরবে বিপদগামী হচ্ছেন শত শত করদাতা। আমাদের করদাতাদের যেমন কর পরিশোধ করতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন, তেমনই তাদের ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে কোনও ক্ষতির মধ্যে না পড়েন তাও আমলে রাখা দরকার।

বৈধ সম্পত্তি অর্জিত বছরে আয়কর রিটার্নে না দেখালে সেটা অনেকটা অবৈধ সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয়ে যায়। যেটাকে আমরা অফিসিয়াল ভাষায় বলি অপ্রদর্শিত সম্পত্তি।  কোনও অবৈধ সম্পত্তি অর্জনকারী যদি অর্ধেক সম্পত্তি সরকারকে কর হিসেবে দিয়ে তার অবশিষ্ট সম্পত্তিকে নিজের জন্য বৈধ করার অধিকার অর্জন করতে পারে,তাতে সে মহাখুশি। কিন্তু মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে বেচারা সারা জীবন কিছু সম্পত্তি অর্জন করলেন শুধুমাত্র সুবুদ্ধির অভাবে বা কোনও কুবুদ্ধির ফাঁদে পড়ে বৈধ আয়কে অবৈধ করে এক মাথা চিন্তা রোগের ব্যবস্থা নিজেই করে বসেন।  তখন আর করার কিছুই থাকে না। এতে বড় অংক কর পরিশোধ বা জরিমানার মুখোমুখি হয়ে যান।

অনেকে বলেন চিন্তার কোনও কারণ নেই। সরকার এ ব্যবস্থাও করে রেখেছেন। সেটা হলো নির্দিষ্ট হারে কর পরিশোধ করে অপ্রদর্শিত সম্পত্তি প্রদর্শন করতে পারবেন। আসুন জেনে নেই সে সুযোগ কী? এ রকম করদাতাদের জন্য অর্থ আইন ২০২১ এ একটি সুযোগ রয়েছে। চলতি বছরের অর্থ আইনে আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ এর ১৯ ধারায়- ১৯এএএএএ নামে একটি নতুন ধারা সংযোজন করা হয়েছে (সূত্র: আয়কর পরিপত্র-২০২১-২০২২)। উক্ত নতুন ধারায় অপ্রদর্শিত সম্পত্তি প্রদর্শন করার জন্য কতিপয় সুযোগ রয়েছে। এতে করদাতা পূর্বের যে কোনও সময়ে আয়কর রিটার্নে অপ্রদর্শিত সম্পত্তি (জমি, বিল্ডিং, ফ্ল্যাট, নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার ইত্যাদি নির্ধারিত হারে কর পরিশোধ করে এ বছর আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন করতে পারবেন। এ সুযোগ সম্পত্তির এলাকা ভেদে বা অবস্থান ভেদে কিছুটা তারতম্য আছে। যেমন:

১. জমির/ভূমির ক্ষেত্রে:

ক) ঢাকার গুলশান মডেল টাউন, বনানী, বারিধারা, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা ও দিলকুশা এলাকার ভূমির জন্য প্রতি বর্গমিটারে বিশ হাজার টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

খ) ঢাকার ধানমন্ডি এলাকা, ডিওএইচএস মহাখালী, লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি, উত্তরা মডেল টাউন, পূর্বাচল, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, সিদ্ধেশ্বরী কারওয়ান বাজার, বিজয়নগর, ওয়ারী, সেগুনবাগিচা নিকুঞ্জ, এবং চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ, খুলশি, আগ্রাবাদ, নাসিরাবাদ এলাকায় অবস্থিত ভূমির জন্য প্রতি বর্গমিটারে পনের হাজার পাঁচ শত টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

গ) উপরোক্ত ‘ক’ এবং ‘খ’ ক্রমিকে উল্লেখিত এলাকা ব্যতিত সকল সিটি করপোরেশন এলাকার ভূমির জন্য প্রতি বর্গমিটারে পাঁচ হাজার টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

ঘ) সকল পৌরসভা বা জেলা সদর এলাকায় অবস্থিত ভূমির জন্য প্রতি বর্গমিটারে এক হাজার পাঁচ শত টাকা এবং এর ওপর নির্ধারিত ৫% অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে; টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

ঙ)  উপরোক্ত ক্রমিক নং ‘ক’, ‘খ’, ‘গ’ এবং ‘ঘ’- তে উল্লেখিত এলাকার ভূমি ব্যতিত অন্য সকল এলাকায় অবস্থিত ভূমির জন্য প্রতি বর্গমিটারে পাঁচ শত টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

২. বিল্ডিং ও অ্যাপার্টমেন্ট এর ক্ষেত্রে: 

ক) ঢাকার গুলশান মডেল টাউন, বনানী, বারিধারা, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা ও দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত অনধিক ২ শত বর্গমিটার প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারে  চার হাজার টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

খ) ঢাকার গুলশান মডেল টাউন, বনানী, বারিধারা, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা ও দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত ২শত বর্গমিটারের অধিক প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্ট এর জন্য প্রতি বর্গমিটারে ছয় হাজার টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

গ) ঢাকার ধানমন্ডি এলাকা, ডিওএইচএস মহাখালী, লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি, উত্তরা মডেল টাউন, পূর্বাচল, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, সিদ্ধেশ্বরী কারওয়ান বাজার, বিজয়নগর, ওয়ারী, সেগুনবাগিচা নিকুঞ্জ, এবং চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ, খুলশি, আগ্রাবাদ, নাসিরাবাদ এলাকায় অবস্থিত প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারে তিন হাজার টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

ঘ) ঢাকার ধানমন্ডি এলাকা, ডিওএইচএস মহাখালী, লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি, উত্তরা মডেল টাউন, পূর্বাচল, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, সিদ্ধেশ্বরী কারওয়ান বাজার, বিজয়নগর, ওয়ারী, সেগুনবাগিচা নিকুঞ্জ, এবং চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ, খুলশি, আগ্রাবাদ, নাসিরাবাদ এলাকায় অবস্থিত ২শত বর্গমিটারের অধিক প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারে তিন হাজার পাঁচ শত টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

ঙ) উপরোক্ত ক্রমিকে উল্লেখিত ‘ক’, ‘খ’, ‘গ’ এবং ‘ঘ’ এলাকা ব্যতিত সিটি করপোরেশন এলাকায় অনধিক ১শত ২০ বর্গমিটারের প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য সাত শত টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

চ) উপরোক্ত ক্রমিকে উল্লেখিত ‘ক’, ‘খ’, ‘গ’ এবং ‘ঘ’ এলাকা ব্যতিত সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত ১শত ২০ বর্গমিটার তবে অনধিক ২০০ বর্গমিটারের  প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area)  বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য আট শত পঞ্চাশ টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

ছ) উপরোক্ত ক্রমিকে উল্লেখিত ‘ক’, ‘খ’, ‘গ’ এবং ‘ঘ’ এলাকা ব্যতিত সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত ২শত বর্গমিটারের অধিক  প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারের জন্য এক হাজার তিন শত শত টাকা এবং এ করের ওপর ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করা;

জ) কোনও জেলা সদরের পৌরসভা এলাকায় অবস্থিত অনধিক ১শত ২০ বর্গমিটারের অধিক  প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারে তিন শত টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

ঝ) কোনও জেলা সদরের পৌরসভা এলাকায় অবস্থিত ১শত ২০ বর্গমিটারের অধিক তবে অনধিক ২০০ বর্গমিটারের  প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারে চার শত পঞ্চাশ টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

ঞ)  কোনও জেলা সদরের পৌরসভা এলাকায় অবস্থিত ২ শত বর্গমিটারের অধিক  প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারে ছয় শত টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

ট) ক্রমিক নং ‘ক থেকে ঞ’   উল্লেখিত এলাকা ব্যতিত অন্য যে কোনও এলাকায় অবস্থিত ১শত ২০ বর্গমিটারের প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারে দুই শত টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

ঠ) ক্রমিক নং ‘ক থেকে ঞ’ উল্লেখিত এলাকা ব্যতিত অন্য যে কোনও এলাকায় অবস্থিত ১শত ২০ বর্গমিটার কিন্তু অনধিক ২শত বর্গমিটারের প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারে তিন শত টাকা এবং এ করের উপর ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করা;

ণ) ক্রমিক নং ‘ক থেকে ঞ’ উল্লেখিত এলাকা ব্যতিত অন্য যে কোনও এলাকায় অবস্থিত ২শত বর্গমিটারের অধিক প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারে পাঁচ শত টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

৩. অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে:

ক) নগদ,ব্যাংকে রক্ষিত অর্থ, আর্থিক স্কিম ও ইন্সট্রুমেন্ট, সকল প্রকার ডিপোজিট বা সেভিং ডিপোজিট, সেভিং ইন্সট্রুমেন্ট বা সার্টিফিকেট (বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানির স্টক, স্টক শেয়ার, মিউসিয়াল ফান্ড ইউনিট ও অন্যান্য সিকিউরিটিজ, পুঁজিবাজারে ক্রয় বিক্রয়যোগ্য সকল প্রকার সিকিউরিটিজ ও বন্ড এবং যে কোনও প্রকার অগ্রিম ও ঋণ প্রদান আর্থিক ইন্সট্রুমেন্ট হিসেবে প্রদর্শন করা যাবে)। এর  মোট মূল্যের ওপর নির্ধারিত কর ২৫% এবং পরিশোধযোগ্য করের ওপর অতিরিক্ত ৫% হারে কর পরিশোধ করার মাধ্যমে। 

উপরোক্ত ক্ষেত্রসমূহের আওতায় কর পরিশোধ করার ফলে করদাতার অনুকূলে যেসকল সুবিধাদি থাকবে:

ক) নগদ অর্থ প্রদর্শনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ফরমে (আইটি-১০বি) হাতে নগদ, ব্যাংকে জমা বা ব্যবসায়ের পুঁজি হিসেবে দেখাতে পারবেন;

খ) এক্ষেত্রে নির্ধারিত কর পরিশোধ করে সম্পত্তি প্রদর্শন করার জন্য কোনও প্রকার ঘোষণার প্রয়োজন হবে না। যথানিয়মে সংশ্লিষ্ট ফরমের নির্ধারিত কলামে সম্পত্তির নির্ধারিত মূল্য দেখানো যাবে এবং অন্যান্য প্রাপ্তির ঘরে আয়ের উৎস হিসেবে দেখানো যাবে।

গ) প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ব্যাংক বিবরণী বা দলিলাদি বা প্রমাণাদি দাখিল করা যেতে পারে;

ঘ) এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সকল কর পরিশোধ করে সম্পত্তি প্রদর্শন করলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ এর অন্য কোনও ধারায় কোনও প্রকার কার্যক্রম গ্রহণ করবে না;

পরিশেষে সকল করদাতার প্রতি আকুল আবেদন কোনও প্রকার হয়রানি বা বিপদের সন্দেহ করে বা অনুমান করে আপনার কষ্টে অর্জিত সম্পত্তি আয়কর রিটার্নে দেখানো থেকে বিরত থাকবেন না। এ ব্যাপারে অন্য কারও পরামর্শ শুনবেন না। আপনি আপনার সিদ্ধান্ত নিন এবং আপনার সম্পত্তি প্রদর্শনে আপনার জন্য স্বস্তির ও নিরাপদের হোক এটাই কামনা।

লেখক: আয়কর আইনজীবী

[email protected]

/এসএএস/

সম্পর্কিত

সঠিক ও নির্ভুল আয়কর রিটার্ন করদাতার বড় সম্পদ

সঠিক ও নির্ভুল আয়কর রিটার্ন করদাতার বড় সম্পদ

আয়কর রিটার্ন ইমেইলে জমা নেওয়ার উদ্যোগ যে কারণে জরুরি  

আয়কর রিটার্ন ইমেইলে জমা নেওয়ার উদ্যোগ যে কারণে জরুরি  

ভ্যাট আদায়ে ন্যায্যতার ঘাটতি, নজর দেবে কে?

ভ্যাট আদায়ে ন্যায্যতার ঘাটতি, নজর দেবে কে?

‘ব্লকচেইন প্রযুক্তি’ হতে পারে রাজস্ব আদায়ের নতুন দিগন্ত

‘ব্লকচেইন প্রযুক্তি’ হতে পারে রাজস্ব আদায়ের নতুন দিগন্ত

গ্রামীণ সুদের অস্বাস্থ্যকর অর্থনীতি!

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৫:৩২

তুষার আবদুল্লাহ সেদিন এক গ্রামের বাজারে ঘুরছিলাম। কত পণ্যের খুচরা ও পাইকারি পশরা। মাছ, তরিতরকারি এসেছে আশপাশের গ্রাম থেকে। সেদিন ছিল হাটের দিন। ভিড়ের মাঝেই দুই জন মানুষ পেলাম যারা মুঠোতে, লুঙ্গির কোচড়ে টাকা নিয়ে ঘুরছেন। ভাবলাম হাট ঘুরে খুচরো টাকার ব্যবসা করেন তারা। কিন্তু খেয়াল করে দেখলাম পাঁচশ, হাজার টাকার নিচের কোনও নোট নেই তাদের কাছে। সন্দেহ হলো, খুচরা টাকার ব্যবসায়ীর কাছে তো খুচরো টাকা থাকার কথা। 

একজনের পিছু নিলাম, দেখি তিনি কোন দোকানে গিয়ে দাঁড়ান। আমি তাকে অনুসরণ করছি। তিনি একেকটি দোকানে গিয়ে দাঁড়ান আর কারও সঙ্গে ইশারায়, কারও সঙ্গে নিচু কণ্ঠে কথা বলেন। এক দোকানে দেখলাম টাকার একটা বান্ডেল ছুঁড়ে দিলেন। আমি ওই দোকানির পাশে গিয়ে বসলাম। জানতে চাইলাম- খুচরা নিতে কত বেশি দিতে হলো? দোকানি জানালেন, খুচরা না, টাকা কর্জ করলেন। সুদে টাকা নিলেন। হাটে মাল কিনবেন। হাজারে একশ টাকা সুদ দিতে হবে। 

একদিনেই একশ টাকা! মাল বিক্রি করে আজই শোধ দিতে হবে। না দিতে পারলে দ্বিগুণ হয়ে যাবে। জানতে চাই, যদি আরও বেশি দেরি হয়? বললেন- সুদে মাফ নেই। অতি দেরি হলে, এসে দোকানের মাল নিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। দোকানির কাছ থেকে সরে এসে চায়ের দোকানে খুঁজে পাই কর্জ দেওয়া বা সুদ ব্যবসায়ীকে। তিনি ৫ হাজার টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। এখন বাজারে তার পাওনা আট লাখ টাকা। নতুন টাকা বিনিয়োগ করতে হয়নি। সুদের টাকাতেই বিনিয়োগ বাড়ছে। টাকা তোলার জন্য কিছু মাস্তান পালতে হয়। কিছু হাত খরচ। মাসের লাখ টাকা আয়ের কাছে খুব সামান্য এই খরচ। বাজারের দোকানিরা ধীরে ধীরে ৬/৭ জন সুদ ব্যবসায়ীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। এককথায় বলা যায় বাজারটির এখন এই সুদ ব্যবসায়ীদের হাতে।

বাজারের নিয়ন্ত্রণ যেমন, তেমনই গ্রামও চলে গেছে সুদ ব্যবসায়ীদের কব্জায়। কৃষক একশ টাকায় ১০ থেকে ২০ টাকা সুদে টাকা নিচ্ছেন। চৈত্র মাসে কৃষক যে টাকা কর্জ নেন, তার সুদ পরিশোধ করেন ধানের বিনিময়ে। কোথাও কোথাও টাকা ও ধান দুটোই দিতে হয়। সময় মতো টাকা দিতে না পারলে, উঠোনে সুদ ব্যবসায়ীরা  এসে ঠিকই ঘুঘু চড়িয়ে যান। শুধু কৃষক নন, কন্যা দায়গ্রস্ত পরিবার, সন্তানের শিক্ষা, পরিবারের চিকিৎসার জন্যও সুদে টাকা কর্জ করেন গ্রামের মানুষ। জুয়া ও নেশার জন্যেও সুদে টাকা নেওয়ার অভ্যাস আছে। শুধু  ব্যক্তি নয়, সমিতির মাধ্যমেও চলে সুদ বাণিজ্য। গ্রামে গ্রামে সমিতি তৈরি হয়েছে। তারা সমবায়ের নামে টাকা তুলে, সেই টাকা সুদ ব্যবসায় বিনিয়োগ করছে। সমিতির সুদের টাকা না দিতে পারলে, পুরো সমিতিই গ্রহীতার ওপর হামলে পড়ে। সুদের টাকা না দিতে পারার প্রতিশোধ হিসেবে, ধর্ষণ- খুনের মতো ঘটনাও ঘটছে গ্রামে।

করোনাকালে এই সুদ ব্যবসা আরও রমরমা হয়েছে। মানুষের  কাজ শূন্য হওয়া, ব্যবসায় ধস বা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে গেলে কর্জ করে আবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, পরিবারের সংকট সামলে নেওয়া। ব্যবসায় পুনঃবিনিয়োগের জন্য মানুষ নিরুপায় হয়ে ব্যক্তি বা সমিতির কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়েছে, নিচ্ছে। যারা ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছেন, তারা চেষ্টা করছেন টাকা ফেরত দেওয়ার। যারা পারেননি, তারা অসহায় হয়ে প্রিয় সম্পদের যেটুকু আছে তাই কর্জদাতার হাতে তুলে দিচ্ছেন। যারা পারছেন না, তাদের কেউ কেউ ঘর ছাড়া। পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

গ্রামীণ সুদের এই অর্থনীতির কথা স্থানীয় প্রশাসনের অজানা নয়। অর্থনীতির চিন্তকদের কাছেও পরিচিত। গ্রামে কৃষি ও শিল্প অর্থনীতির প্রসার ঘটছে। নতুন ফসল যুক্ত হচ্ছে। কৃষি-শিল্প অর্থনীতি তৈরি করেছে নতুন সম্ভাবনা। টেকসই ইঙ্গিতও রয়েছে। কিন্তু  প্রান্তিক কৃষক ও উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণের জোগান নিশ্চিত করা যায়নি। কৃষকদের দশ টাকার একাউন্ট খুলে দেওয়ার পরও তাদের করা যায়নি ব্যাংকমুখী। সরকারি সমবায়ের জটিল আমলাতন্ত্র ও ভোগান্তি সমবায় বান্ধব করতে পারছে না  প্রান্তিকজনদের। তাদের কাছে সুদ ব্যবসায়ীরাই সহজলভ্য। এই সহজলভ্য অর্থের জোগানদারদের সহজ সেবায় কঠিন হচ্ছে প্রান্তিক মানুষের জীবন। নিঃস্ব এবং দেওলিয়া হচ্ছে মানুষ। করোনাকাল সুদের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করেছে। সেই চাঙ্গা অর্থনীতি আমাদের প্রান্তিক অর্থনীতির স্বাস্থ্যহানী ঘটাচ্ছে। জানি না অর্থ গবেষক ও সরকার স্বাস্থ্যের এই দিকটি নজরে রেখেছে কিনা।

লেখক: গণমাধ্যম কর্মী

/এসএএস/

সম্পর্কিত

শিক্ষক ও মর্যাদার সংকট

শিক্ষক ও মর্যাদার সংকট

ভোটের হাওয়া লাগলো মাঠে

ভোটের হাওয়া লাগলো মাঠে

গণমাধ্যমে বিভীষণ

গণমাধ্যমে বিভীষণ

শহর কেন গতিহীন?

শহর কেন গতিহীন?

দুর্বৃত্তরাই আফগানিস্তানে সরকার চালাবে

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৭:০৭
ফারাজী আজমল হোসেন আফগানিস্তানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মন্ত্রীদের নাম ঘোষণার মাধ্যমেই গোটা দুনিয়াকে নিজেদের স্বরূপ চিনিয়ে দিয়েছে তালেবানরা। দুর্বৃত্তরাই যে আফগানিস্তানে সরকার চালাবে এটা বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। ৩৩ সদস্যের তালেবান মন্ত্রিসভার ১৭ জনই রয়েছেন জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা তালিকায়।

বেশিরভাগ মন্ত্রীকেই আমেরিকা জঙ্গিবাদী বলে মনে করে। নামে সম্মিলিত আফগান সরকার হলেও তালেবান মন্ত্রিসভায় পশতুনদেরই রমরমা। আফগানিস্তানের জনসংখ্যার ৪৮ শতাংশ হচ্ছেন পশতুনরা। কিন্তু মন্ত্রিসভার ৩৩ জনের মধ্যে ৩০ জনই পশতুন। শতাংশের হিসাবে ৯০ শতাংশ। ৪৫ শতাংশ তাজিক এবং উজবেক জনসংখ্যা থাকলেও তাদের প্রতিনিধি মাত্র ৩ জন। ১০ শতাংশ শিয়া, ৪৮ শতাংশ নারী, তুর্কমেন ও বালুচদের ৫-৬ শতাংশ জনসংখ্যা থাকলেও তাদের কোনও প্রতিনিধি নেই। ফলে মন্ত্রিসভায় সব অংশের আফগানদের অন্তর্ভুক্তির দাবি এলে বাস্তব পরিস্থিতির বিপরীত।

তালেবান ও তাদের সমর্থকরাই শুধু মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পেয়েছে। বাকিদের দাবি অগ্রাহ্য করা হয়েছে। আশ্চর্যজনকভাবে জঙ্গিবাদী সংগঠন হাক্কানি নেটওয়ার্ককে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে মন্ত্রিসভায়। ৫টি গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন হাক্কানিরাই। আফগানিস্তানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়েছে সিরাজউদ্দিন হাক্কানিকে। এই সিরাজউদ্দিনের মাথার দাম ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঘোষণা করেছিল আমেরিকা। সিরাজউদ্দিন ছাড়াও আবুল বাকী হাক্কানি উচ্চশিক্ষামন্ত্রী, মৌলভী নজিবুল্লাহ হাক্কানি টেলিযোগাযোগমন্ত্রী, খলিল-উর-রেহমান হাক্কানি শরণার্থী মন্ত্রী এবং আবদুল হক ওয়াসেক গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে দায়িত্বভার পেয়েছেন। হাক্কানি গ্রুপের অন্যতম সক্রিয় সদস্য মোল্লা তাজমীর জাওয়াদকে করা হয়েছে গোয়েন্দা বিভাগের উপ-প্রধান।

জঙ্গিবাদী ও মানব সভ্যতার জন্য বিপজ্জনকদের নিয়ে তৈরি সরকারে একজনও নারী সদস্য নেই। অথচ দুনিয়ার বেশিরভাগ দেশই তালেবান সরকারের একপেশে মন্ত্রিসভা নিয়ে নীরব দর্শক। খুব স্পষ্ট করে বলতে গেলে, পশ্চিমা দুনিয়া, বিশেষ করে আমেরিকা তালেবানদের প্রতি এত কিছুর পরও আস্থাশীল। আমেরিকা মানুষকে বিশ্বাস করাতে চাইছে, তালেবানরা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে। ইসলামাবাদ সন্ত্রাসীদের মদত জুগিয়েও গত দু-দশকেরও বেশি সময় ধরে আমেরিকার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার কৌশল নিয়েছিল, পাকিস্তানেরই হাতের পুতুল তালেবানরাও এখন সেই পথে হাঁটছে। সব সম্প্রদায় ও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে সরকার গড়ার মিথ্যা বিভ্রান্তি তৈরিতেও তালেবানদের মদত দিচ্ছে পাকিস্তান।

তালেবানদের কথা ও কাজের মধ্যে অনেক ফারাক। এটা অতীতেও প্রমাণিত। আফগানিস্তান ছাড়ার জন্য ব্যস্ত আমেরিকা গোটা দুনিয়াকে বোঝাবার চেষ্টা করেছিল, দু-দশকে তালেবানরা অনেকটাই বদলে গিয়েছে। তারা নাকি সকলকে নিয়েই সরকার গঠন করতে চায়। আগের মতো শরিয়তের নামে জনজীবনকে বিধ্বস্ত করার রাস্তা নাকি পরিত্যাগ করেছে তালেবান। কিন্তু আফগান জয়ের পর তালেবানরাই বুঝিয়ে দিচ্ছে দুদশকে তাদের মানসিকতায় কোনও পরিবর্তন হয়নি। তাই পরাজিত আফগান নাগরিকদের ওপর অত্যাচার থেকে শুরু করে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর আগের মতোই চলছে তালেবানি সন্ত্রাস।

তালেবানরা বুঝিয়ে দিয়েছে, তাদের মনোভাব কিছুতেই বদলাতে পারে না। সবাইকে নিয়ে জাতি গঠনের কোনও চিন্তাভাবনাই নেই তাদের। আসলে তালেবানের ইসলামিক আমিরাতে গণতন্ত্রের কোনও স্থান নেই। ইসলাম ধর্মের নামে হিংসাত্মক, অসহনশীল এবং আধুনিক সভ্যতার বিরোধী কাজকর্মই তাদের পছন্দ। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিলেও আধুনিক চিন্তাধারার প্রতি তাদের বিশ্বাস নেই। পশ্চিমা দুনিয়ার অন্ধবিরোধী তালেবান। কিন্তু পশ্চিমা অস্ত্রের ঝলকানি তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। টেলিভিশনকে তারা শুধু ধর্মীয় প্রচারের হাতিয়ার হিসেবেই দেখতে চায়। সামাজিক গণমাধ্যম তালেবানদের কাছে তাদের কথা প্রচারেরই শুধু হাতিয়ার মাত্র। ইসলাম ধর্মের নামে তারা নিজেদের আধিপত্য বিস্তারকেই একমাত্র পথ বলে মনে করে। অন্য মতের কোনও গুরুত্ব নেই তাদের কাছে।

তাই আফগানিস্তানে মোটেই অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠন হয়নি। সকলকে নিয়ে সরকার গঠনের বিভ্রম ছড়ানোর চেষ্টায় অবশ্য কোনও কার্পণ্য নেই। বাস্তব বলছে, এটা তালেবান ও হাক্কানি জঙ্গিদের সরকার। তালেবানরা বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, নারী, সংখ্যালঘু বা অন্য রাজনৈতিক মতকে মোটেই আমল দিতে রাজি নয়। সম্মিলিত সরকার বলতে তালেবানরা দুই তাজিক ও এক উজবেক প্রতিনিধিকে মন্ত্রিসভায় রেখে বোঝাতে চেয়েছে এটা সবার সম্মিলিত অন্তর্বর্তী সরকার। নারীদের বাদ দিয়ে আজকের দিনে সম্মিলিত সরকার বাস্তবসম্মত নয়, সেটা মানতে নারাজ তালেবানরা। টেলিভিশন ভাষণে তাই তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ সাফ জানিয়েছেন, শুধু সন্তান ধারণ ও পালন করাই নারীদের কাজ। বাইরের কাজ পুরুষরাই করবেন। শুধু তা-ই নয়, নারীর নির্দেশ কোনও পুরুষের নাকি পালন করা উচিত নয়। মুজাহিদের এই বক্তব্যই প্রমাণ করে তালেবানদের আগের মানসিকতা একদম বদলায়নি।

তালেবানরা নারীদের স্বাধীনতায় বিন্দুমাত্র বিশ্বাসী নয়। তাই পশ্চিমা দুনিয়া নারীদের মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্বের দাবি তুললেও লাভ নেই। নারীদের অধিকার দেবে না তারা। তালেবান শাসনে নারীদের যাবতীয় স্বপ্ন ও অধিকার অধরাই থেকে যাবে। চাপে পড়ে দু-একজন নারীকে মন্ত্রিসভায় নিলেও মানসিকতার বদল সম্ভব নয়। নারীদের মতোই অন্যদের কাউকেই এই সরকারে নেবে না তালেবানরা। এমনিতেই পূর্বতন সরকারের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই বা চিফ এক্সিকিউটিভ ডা. আব্দুল্লাহ আবদুল্লাহর মতো উচ্চপদস্থ নেতারা কম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় সরকারে থাকতে রাজি হবেন না। তাই অন্যদের কথা ভাবতে পারতো তালেবানরা। কিন্তু নিজেদের হাতেই ক্ষমতা ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর তালেবানরা কিছুতেই অন্যদের সঙ্গে রাখতে চায় না।

আসলে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তালেবান নেতারা দুনিয়াকে বোকা বানাতে চাইছে। তারা বোঝাতে চাইছে বিশ বছর আগের সঙ্গে এখনকার তালেবানের পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয়বার সরকার গঠনের পর স্পষ্ট হয়ে ওঠে তালেবান-১ ও তালেবান-২ সরকারের মধ্যে আসলে কোনও পার্থক্য নেই। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে জঙ্গি হামলার সময়কার তালেবান প্রধানকে মন্ত্রিসভার মাথায় বসিয়ে তারা বুঝিয়ে দিয়েছে, সন্ত্রাসই তালেবানদের মূল কর্মসূচি। তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক পাকিস্তানের কাছ থেকে তালেবানরা শিখে নিয়েছে আমেরিকার চোখে ধুলো দেওয়ার কৌশল। আমেরিকাকে তারা বোঝাতে সক্ষম হয়েছে, কিছু দিনের মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারে অন্যদেরও ঠাঁই মিলবে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান নিজে দায়িত্ব নিয়ে সবার অন্তর্ভুক্তির বিভ্রম ছড়াচ্ছেন।

মনে রাখা দরকার, ১৯৯০ সালেও তালেবানরা শুধু নিজেদের অ্যাক্টিং বা ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের দিয়েই সরকার চালিয়েছিল। এটাই তালেবান কৌশল। আন্তর্জাতিক দুনিয়া যদি তালেবানদের পরিবর্তন সত্যিই মাপতে চান তবে তার পদ্ধতি ও মাপকাঠি আগে ঠিক করা জরুরি। মানবিক বা অন্যান্য সাহায্য দানের আগে তালেবানদের সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করাটা আন্তর্জাতিক দুনিয়ার কাছে খুব জরুরি। মনে রাখতে হবে, পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের মদতপুষ্ট হাক্কানি নেটওয়ার্কের মতো সন্ত্রাসীরা রয়েছে তালেবানদের সঙ্গে। তাই আফগানিস্তানে পাঠানো আন্তর্জাতিক সাহায্য জঙ্গিবাদীদের হাত আরও শক্ত করার আশঙ্কা থাকছেই। এমনিতে তালেবান উত্থানে দক্ষিণ এশিয়ায় অশান্তির আশঙ্কা অনেকটাই বেড়ে গেছে। জঙ্গিবাদীরা আফগানিস্তানে ফের সক্রিয় হতে শুরু করেছে। এ অবস্থায় আফগান জনগণকে সাহায্য করা জরুরি হলেও তালেবানকে মদত দেওয়া চলবে না। দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদে লাগাম টানতে হলে তালেবানরা উৎসাহিত হতে পারে এমন কোনও পদক্ষেপ নেওয়া চলবে না।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

বঙ্গবন্ধুর জীবনে 'শক্তিঘর' ছিলেন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব

বঙ্গবন্ধুর জীবনে 'শক্তিঘর' ছিলেন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব

চীনের বন্ধুত্ব, নাকি আধিপত্য

চীনের বন্ধুত্ব, নাকি আধিপত্য

বাঁধের বাধায় বন্দি চীনের ‘বন্ধুত্ব’

বাঁধের বাধায় বন্দি চীনের ‘বন্ধুত্ব’

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য পূরণেও এগিয়ে বাংলাদেশ

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য পূরণেও এগিয়ে বাংলাদেশ

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

কাবুলে বন্ধ হচ্ছে নারীদের ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র

কাবুলে বন্ধ হচ্ছে নারীদের ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র

যশোর রোডে সুবাতাসের পদযাত্রা শুরু

যশোর রোডে সুবাতাসের পদযাত্রা শুরু

অনিবন্ধিত ঋণ বিতরণকারী সংস্থা বন্ধে ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্টের নির্দেশ

অনিবন্ধিত ঋণ বিতরণকারী সংস্থা বন্ধে ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্টের নির্দেশ

পর্যটন কর্মীদের শ্রম অধিকার আদায়ে সাত দফা দাবি

পর্যটন কর্মীদের শ্রম অধিকার আদায়ে সাত দফা দাবি

ছেলের জন্মদিনে আবেগাপ্লুত শাকিব খান

ছেলের জন্মদিনে আবেগাপ্লুত শাকিব খান

ট্রাফিক পুলিশের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে নিজের বাইকে আগুন দিলেন চালক

ট্রাফিক পুলিশের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে নিজের বাইকে আগুন দিলেন চালক

টেস্ট ক্রিকেট ছাড়ছেন মঈন আলী

টেস্ট ক্রিকেট ছাড়ছেন মঈন আলী

আ.লীগকে রাজনৈতিক সমঝোতায় আসার আহবান জোনায়েদ সাকির

আ.লীগকে রাজনৈতিক সমঝোতায় আসার আহবান জোনায়েদ সাকির

আফগানিস্তানে নারীর অধিকার লঙ্ঘনে জাতিসংঘের দফতরে সামনে বিক্ষোভ

আফগানিস্তানে নারীর অধিকার লঙ্ঘনে জাতিসংঘের দফতরে সামনে বিক্ষোভ

নওয়াজুদ্দিনের ডিকশনারিতে সুপারস্টারের অর্থটা অন্যরকম

নওয়াজুদ্দিনের ডিকশনারিতে সুপারস্টারের অর্থটা অন্যরকম

১৩ টাকা কেজিতে বিদ্যালয়ের বই বিক্রি করলেন প্রধান শিক্ষক

১৩ টাকা কেজিতে বিদ্যালয়ের বই বিক্রি করলেন প্রধান শিক্ষক

২০২১ সালের এসএসসি পরীক্ষার সময়সূচি

২০২১ সালের এসএসসি পরীক্ষার সময়সূচি

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune