X
মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২
২১ আষাঢ় ১৪২৯

বিবেকবান রাষ্ট্র ও আইন

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১৫:১৩

নাদীম কাদির যে সময়টাতে প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতার শাস্তি দাবি করছেন প্রাণীপ্রেমী মানুষেরা তখন আমাদের বলা উচিত, এটা একটা সুদূর পরাহত ক্রন্দন। কারণ, মানুষের সুরক্ষার জন্য আমাদের আইনের প্রয়োগ করা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশ পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এর অনেক মানদণ্ডও রয়েছে।
মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) থেকে শুরু করে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ। শিষ্টাচারের জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে দেশের সুনাম রয়েছে। একটি দেশ গত কয়েক বছর ধরে বহু সেক্টরে রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। এমনকি আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গেও তুলনা করলেও এটা প্রযোজ্য।
পশ্চিমা দেশগুলোতে আমি এখন দেখতে পাচ্ছি, লোকজন বাংলাদেশকে নিয়ে ইতিবাচক কথাবার্তা বলছেন। এখন আমরা চমৎকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি বিন্দুতে পৌঁছেছি। একটি গণতান্ত্রিক দেশের জন্য এটা স্বাভাবিক ঘটনা। আমাদের ২০২১ এবং ২০৪১ সালের জন্য সুনির্দিষ্ট ভিশন রয়েছে। ‘অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাক্ট’-এর মতো সুবিবেচনাপ্রসূত আইন নিয়েও আমরা কাজ করতে পারি।
মন্ত্রিসভা সম্প্রতি এ সংক্রান্ত আইনের অনুমোদন দিয়েছে। এতে প্রাণীপ্রেমী মানুষেরা অনেক স্বস্তিবোধ করবেন। আমি এর পূর্ণ ও কঠোর প্রয়োগ চাই।
এই আইন প্রাণীদের সুরক্ষা দেবে। এর ফলে পোষা ও ঘরকুনো প্রাণীরা সুরক্ষা পাবে। এ সংক্রান্ত আইনের খসড়ায় প্রাণীহত্যার সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে দুই বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার কিংবা তাদের অত্যধিক পরিশ্রমের কাজে তাদের ব্যবহারের জন্য সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে।
আমি দেখেছি, শুধু পোষা প্রাণীই নয় বরং সাধারণভাবে প্রাণীদের প্রতিই আমরা কতটা উদাসীন। শিশুরা গবাদি পশু, কুকুর বা বিড়ালের দিকে পাথর নিক্ষেপ করে। কিন্তু এটা না করতে তাদের আমরা খুব কমই বলে থাকি। আমরা এটা ভুলে যাই, অনেক দিক থেকেই তারা মানুষের চেয়ে অধিক পরিমাণে স্মার্ট। তাদেরও প্রেম, আবেগ ও ক্রোধের অনুভূতি আছে।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই আমি এটা বলছি। আমি বড় হয়েছি পোষা প্রাণীদের সঙ্গে। আমার বাবার পক্ষে যখনই সম্ভব ছিল তখনই তিনি তাজা দুধের জন্য গবাদি পশু পালন করতেন।
আমাদের তোতা পাখি, ছোট কূজন পাখি, কুকুর ও খরগোশের মতো প্রাণী ছিল। এমনকি গিনিপিগও ছিল।

আমার বাবার চার পায়ের দুই কন্যা ছিল। রুস্টি এবং পেক্সি। একজন থাকতো ঘরের অভ্যন্তরে। অন্যজন বাড়ি পাহারায়। ১৯৭১ সালে বাবার হত্যাকাণ্ডের পর রুস্টি উন্মাদের মতো কাঁদতে থাকে। তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। পেক্সি একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষের উপস্থিতি ছাড়াই আমাদের বাড়িটিকে বহু বছর ধরে সুরক্ষিত রেখেছিল। শ্যাম্পেইন’সহ নিজের দুই বোনকে হারিয়েছিল সে। আম্মা হাসপাতালে থাকাকালে আমাদের খালি বাড়ির সুরক্ষা দিতে গিয়ে ছুরিকাঘাতের শিকার হয়ে শ্যাম্পেইন-এর মৃত্যু হয়। যেদিন তার মৃত্যু হয়, সেদিন আমরা পেক্সির চোখে পানি প্রত্যক্ষ করেছিলাম। যেন সে তার দুই বাচ্চার সঙ্গে যেন কথা বলছিল। আমরা তাকে আমাদের বাগানে সমাহিত করি। তার বিদায়ের পর আমাদের বাড়ি পাহারার দায়িত্ব নেয় তার দুই ছানা।

২১ ফেব্রুয়ারি উদযাপনের আগমুহূর্তে আমাদের বাগানের ফুলগুলোকে পাহারা দিচ্ছিল পেক্সি। দুষ্ট বালকদের হাতে গুরুতর আহত হওয়ার পর একপর্যায়ে তার মৃত্যু হয়। কেন সে নিজের জীবনের মূল্য দিয়ে এটা করেছিল? এটা হচ্ছে তার সততা। মনিবের প্রতি তার প্রতিশ্রুতি। সবকিছুর ওপরে একটা মহান প্রেম; যা আমরা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছি।

চেজ নামে আমার একটা চমৎকার পুত্র আছে। লোকজন হাসাহাসি করেন; যখন আমি বলে থাকি যে, ও আমার পুত্র। কিন্তু চেজ ঠিকই বুঝতে পারে আমি ওর বাবা।

আমি যখন কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নেই কিংবা আমার লাগেজটা গুছিয়ে নেই; তখন সে মন খারাপ করবে। আমার পিছু নেবে, আমার সঙ্গে লেগে থাকবে। তার চেহারা বলে দেয়, সে বিষণ্ন বোধ করছে; যদি আপনি সেটা বুঝতে পারেন। যখন আমি ঘরে ফিরি সে তার ঠাণ্ডা নাকটা আমার সঙ্গে ঘষে দেয়। এরপর আমার কোলে উঠে বসে। গাঢ় আলিঙ্গন আর কিছুক্ষণ খেলাধূলার পর আমার পুত্র খুশি হয়।

সে অঙ্গভঙ্গি দ্বারা তার মনোভাব প্রকাশ করে। ‘কু কু’-এর মতো আওয়াজ করে। আমি এসব দেখি এবং বুঝতে পারি, সে কী চাইছে? ফলে আমাদের পাপা-পুত্রের মতোই যোগাযোগ হয়। তার জন্য আমি দুনিয়ায় এমন অকৃত্রিম শর্তহীন ভালোবাসা পেয়েছি।

আমাদের দেশ সমৃদ্ধির পথে এগুচ্ছে। আমাদের উচিত কুকুর এবং বিড়ালের মতো উপেক্ষিত বা অব্যাখ্যেয় পরিবারের সদস্যদের যত্ন নেওয়া। কাঁটাবনে যারা খাঁচায় অমানবিকভাবে তাদের রেখে ব্যবসা করছে; সেদিকে আমাদের অবশ্যই নজর দিতে হবে।

চেজ কাঁটাবন থেকেই আমার কাছে এসেছে। ভাইবোনের সঙ্গে একটা ছোট খাঁচায় করে প্যাক করা হয়েছিল তাকে। আমি জানি না তারা কোথায়? আশা করি, তারাও একইভাবেই থাকবে; যেভাবে আমি চেজ’কে নিজের পুত্র হিসেবে দেখি।

সংবাদমাধ্যম এবং যারা প্রাণীদের ভালোবাসেন তাদের অবশ্যই প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা বন্ধে এ আইন ব্যবহার করা উচিত। ওহ! প্রাণী নয়। আমাদের পরিবারের বিশেষ ভালোবাসা পাওয়া সদস্য। এই আইনের জন্য মন্ত্রিপরিষদকে ধন্যবাদ।

লেখক: সাংবাদিকতায় জাতিসংঘের ড্যাগ হ্যামারসোল্ড স্কলার এবং লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
মহাগুরুকে নিয়ে মহাস্বপ্ন দেখছে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি
মহাগুরুকে নিয়ে মহাস্বপ্ন দেখছে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি
ডিপোতে আগুন: তদন্ত শেষ করতে পারেনি ৬ কমিটির পাঁচটি
ডিপোতে আগুন: তদন্ত শেষ করতে পারেনি ৬ কমিটির পাঁচটি
ইসরায়েলিরা ভাগ্যবান: ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট
ইসরায়েলিরা ভাগ্যবান: ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট
জমে উঠছে অনলাইন পশুর হাট
জমে উঠছে অনলাইন পশুর হাট
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ