মোদির ‘আচ্ছে দিন’ ও গৈরিকীকরণ যখন সমার্থক

হাসান ইমাম
০২ জুন ২০১৯, ১৩:২২আপডেট : ০২ জুন ২০১৯, ১৭:৪০

হাসান ইমাম যার দলীয় মূলনীতিতে হিন্দু জাতীয়তাবাদ এবং যিনি এই নীতির নিরম্বু উপাসক, সেই নরেন্দ্র মোদি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ভারত শাসন করবেন আরও পাঁচ বছর। অনেকে হয়তো একে প্রহসনের নয়া সংজ্ঞা হিসেবে দাগিয়ে দিতে চাইবেন, কিন্তু জোর হোঁচট খাবেন বাস্তবে এর প্রতিফলনের তীব্রতায়।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের সপ্তাহ না পেরোতে অভিনেত্রী শাবানা আজমিকে ভারত ছাড়ার পরামর্শ দিচ্ছেন হিন্দু জাতীয়তাবাদীর ঝাণ্ডাধারীরা। মোদি দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতাসীন হলে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা হুমকির মুখে পড়বে, পাঁচ-পাঁচ বার জাতীয় পুরস্কারজয়ী এই অভিনেত্রী নাকি এমন কথা বলেছিলেন। অবশ্য তিনি যতই বলছেন, এসব প্রোপাগান্ডা, মিথ্যা; কে শোনে কার কথা। এমনকি বিজয়ী মোদিকে টুইট করে অভিনন্দনও জানিয়েছেন শাবানা। কিন্তু এ যুগের গোয়েবলসরাও সত্যের সঙ্গে মিথ্যা মেশাতে সমান ওস্তাদ। ঘটনা যা-ই ঘটুক, সারিন্দা বাজবে সারিন্দার মতো।
মোদির দ্বিতীয় মেয়াদের প্রারম্ভিক এই ‘নমুনা’ আগামীদিনের যে ছবির আভাস দেয়, তাতে সম্ভবত রঙে-রেখায় ভালোই গরমিল থাকবে। আর তাই নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয় দফার জয় কেবল সংখ্যা দিয়ে নয়, বিস্তারেই বিবেচ্য।
মোদির শাসনামলের গত পাঁচ বছরে বিতর্ক কম তৈরি হয়নি, কমবেশি আন্দোলন দানা বাঁধে অপশাসন-কুশাসনের প্রতিবাদেও, জাতীয়তাবাদের নামে চূড়ান্ত বাড়াবাড়িরও কমবেশি বিরোধিতা হয়েছে। কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, সব ক্ষেত্রেই গভীর সংকট, বেকারত্বের হারে রেকর্ড—এসবও বহুল চর্চিত। অনেক জায়গায় কৃষক বিদ্রোহ, যুববিক্ষোভও দেখা গেছে। দলিত আন্দোলনের আঁচও মাঝে-মধ্যে আকার নিয়েছে বিস্ফোরণের। হাজার রুপির নোট নিষিদ্ধ বা রাফায়েল বিমান কেনায় ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের পাশাপাশি গোরক্ষকদের তাণ্ডবে নিরীহ মানুষের প্রাণহানির মতো বীভৎসতায় গোটা বিশ্ব হতবাক হয়েছে। অসহিষ্ণুতার প্রতিবাদে গত পাঁচ বছরে অনেক ভারতীয় লেখক-শিল্পী ফিরিয়ে দেন সরকারি সম্মাননা-পুরস্কারও।
তবে নির্বাচনের ফল বুঝিয়ে দেয়, ভারতীয় জনমানসে এসব ঘটনা দাগ কাটতে কেবল অক্ষমই নয়, প্রকারান্তরে তা বিজেপির পক্ষে কাজ করেছে! এ সবকিছু পাশে ঠেলে ভারতীয়দের বিশেষ করে, তরুণ প্রজন্মকে মাতিয়ে রাখে মোদির ‘ঘরমে ঘুসকে মারা হ্যায়’ যুদ্ধংদেহি বক্তব্য। ভারতবাসী আত্মশ্লাঘা বোধ করে পুলওয়ামার জবাবে বালাকোটে চালানো ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’-এ।
এই সামরিক হামলার মধ্যে কি কেবল ‘সন্ত্রাসের মদতদাতা’ প্রতিবেশীকে শায়েস্তা করার বিষয়টিই নিহিত; জাতীয় নিরাপত্তা ছাপিয়ে ধর্মীয় পরিচয়, জাতিবিদ্বেষ বা জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববাদের ধারণার কোনও যোগাযোগ নেই এতে? শুধু কট্টর দেশপ্রেমের গণ্ডিতেও একে আবদ্ধ করা যায় না; এই পরিসরে সংখ্যাগুরু ভারতীয়ের মনস্তত্ত্বের একটা আভাস স্পষ্ট হয়—যেখানে আঁচড় কাটতে সফল মোদি ও তার গৈরিক বাহিনী।
সমাজবিজ্ঞানী, ইতিহাসবিদ বা বিশ্লেষকদের অনেকে কবুল করেছেন, এই মুহূর্তে ভারতের একমাত্র ও কার্যকর ‘হেজিমনি’ হিন্দুত্ববাদ। সংখ্যাগুরুর আধিপত্য এবং একে কেন্দ্র করে সমাজচেতনায় সাম্প্রদায়িক বিভাজন এতটাই প্রকট যে, গোরক্ষার নামে নিরপরাধ মানুষ পিটিয়ে হত্যাও ‘বৈধতা’ পায়!  প্রতিবাদে সরব ব্যক্তিদের পড়তে হয় পুলিশি হয়রানিতে। প্রতিবাদীদের কেউ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হলে তাকে দেখিয়ে দেওয়া হয় পাকিস্তানের পথ! মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গডসের সমর্থনের আওয়াজ ওঠে ভারতব্যাপী। ‘সারে জাঁহা সে আচ্ছা’ ভারতে মোদির ‘আচ্ছে দিন’ আনার প্রতিশ্রুতির বাস্তব রূপায়ণ গৈরিকীকরণের সমার্থক হয়ে ওঠে।
এই উদগ্র ও কট্টরপন্থার একচেটিয়াত্বে বহুত্ববাদী মূল্যবোধ ও ধর্মনিরপেক্ষতায় আস্থাশীলরা বিপন্ন বোধ না করে পারেন না।
নির্বাচনি প্রচারের শেষ দিকে শাসক দলের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায় কট্টর দেশপ্রেমের মোড়কে জাতীয় নিরাপত্তা—পুলওয়ামার পাল্টা হিসেবে বালাকোট আক্রমণ। দেশের নিরাপত্তা, জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব ও সংখ্যাগুরুর শাসন (মেজরিটারিয়ান শভিনিজম) বহু ভারতবাসীর চেতনায় একাকার হয়ে যায়। তাই কর্মসংস্থানের সুযোগের বদলে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও পাকিস্তান-বিরোধিতায় ‘মাতোয়ারা’ হন তারা।
কোনও দায়িত্বশীল ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গণমাধ্যমকে উদ্ধৃত না করে, এমনকি কোনও গবেষণার ধার না ধেরেও বলা যায়, গত পাঁচ বছরে বিজেপির শাসনামলে ভারতে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। দেশটির অনেক জায়গার দলিত, আদিবাসী, খ্রিস্টান ও মুসলমানরা সামনের দিনগুলোতেও নিজেদের ‘বিচ্ছিন্ন’ ভাববে বলে অনুমান করা চলে। তবে এ কথাও ঠিক, নরেন্দ্র মোদির শাসনের প্রথম দিকে অসহিষ্ণুতা ও হিংস্রতা যতটা প্রকট ছিল, শেষের দিকে তাতে কিছুটা রাশ টানার প্রবণতা দেখা যায়।

অভিবাসীদের ‘পশু’ অভিহিত করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ তাদের বিশেষিত করেন ‘উইপোকা’ বলে। উপরন্তু বিজেপি সভাপতি ‘অবৈধ অভিবাসী’দের বঙ্গোপসাগরে ছুড়ে ফেলার অঙ্গীকার করেন। তিনি এলান করেছেন, বিজেপি ফের ক্ষমতায় এলে আসামের মতো পশ্চিমবঙ্গেও নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) করা হবে। উদ্দেশ্য, বাংলাদেশ থেকে আসা ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’দের চিহ্নিত করা, বিতাড়ন করা। মোদিও একই আগ্রাসী বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করেছেন সমান দাম্ভিকতায়। আসামের নাগরিকপঞ্জির খসড়ায় নাম বাদ পড়েছে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের, যাদের অধিকাংশই মুসলমান। এরই মধ্যে ৪০ জনের মতো এই ‘পরিচয়হীন-দেশহীন’ মানুষ আত্মহত্যা করে নিজেদের পরিচয় সংকট মিটিয়েছেন!
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’, পুতিনের ‘মেক রাশিয়া গ্রেট অ্যাগেইন’, শি জিনপিংয়ের ‘চীনবাসী নতুন করে জেগে ওঠো’র মতো একধরনের জাতীয়তাবাদী স্লোগান রয়েছে বিজেপিরও। মোদি স্পষ্টতই বলেছেন, ‘রামরাজ্য আমাদের আদর্শ এবং বিজেপি সরকার সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে।’
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস’ বলছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ক্রমে চীনের পাল্টা শক্তি হয়ে উঠছে ভারত। ধারণা করা চলে, দ্বিতীয় মেয়াদেও মোদি ভারতীয় প্রভাব বিস্তারের কোশেশ জারি রাখবেন। আর এতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক জোট ও বন্ধুত্বে ঘটবে পালাবদল। এরই মধ্যে সে আভাস স্পষ্ট হয়েছে মোদির শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে ইমরান খানকে ‘ব্রাত্য’ রাখার মধ্য দিয়ে।
জনতুষ্টিবাদী বা লোকরঞ্জনবাদী নেতাদের রমরমার এই যুগে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প, রাশিয়ায় পুতিন, ফিলিপাইনের দুতার্তে, হাঙ্গেরির ভিক্টর ওরবান, তুরস্কের এরদোগানদের পাশে সটান দাঁড়িয়ে যান নরেন্দ্র মোদিও।
তবে ভরসার কথা হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ জনচেতনার আধিপত্য কখনও চিরস্থায়ী নয়। ইতিহাস সাক্ষী, তার পরিবর্তনের সম্ভাবনা জেগে থাকে সবসময়ই। ইউরোপে আর্থসামাজিক কাঠামোর বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ‘হেজিমনিক’ চেতনা কীভাবে বদলেছে, তা সর্বজনবিদিত। ভারতের অভ্যন্তরেও রয়েছে এর মোক্ষম উদাহরণ।
ধর্মের ভিত্তিতে বাংলা ভাগ হলেও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক কোনও দলই কিন্তু মাটি পায়নি। হিন্দুসভার প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও তিনি বা ভারতীয় জনসংঘ অথবা বিজেপি—কেউ এতদিন পশ্চিমবঙ্গে ঝাণ্ডা ওড়াতে পারেনি। উল্টো বামেরা পশ্চিমবঙ্গে এতটাই শক্ত ঘাঁটি গেড়ে বসে যে তা ‘বেঙ্গলি কমিউনিজম’ আখ্যা পায়। সেই বামেদের পশ্চিমবঙ্গে এবার আসনসংখ্যা শূন্য। বিজেপি দখল কায়েম করেছে প্রায় অর্ধেক আসনে। এই প্রেক্ষাপটে স্মর্তব্য, এই বিজেপিই ১৯৮৪ সালের নির্বাচনে পুরো ভারতে আসন পেয়েছিল মোটে দুটি। ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যার পর অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে কংগ্রেসের ঝুলিতে যায় চার শতাধিক আসন।
তবে এসব অভিজ্ঞতাও এ-ও জানান দেয়, হিন্দুত্ববাদ প্রসারের বিজেপির গৈরিকীকরণ প্রকল্পের মোকাবিলা অতটা সহজ নয়, বিশেষ করে যখন তা নির্বাচনি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। উগ্র জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক হিন্দুত্বের মিশেলে যে পটভূমিতে ভারত দাঁড়িয়ে, তার ‘মহান’ বিশেষণ নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন না উঠে পারে না।

লেখক: সাংবাদিক

[email protected]

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
একটি ফ্লাইট কেন কখনও নির্ধারিত সময়ের আগেই পৌঁছে যায়
একটি ফ্লাইট কেন কখনও নির্ধারিত সময়ের আগেই পৌঁছে যায়
বাংলাদেশ ব্যাংকের এডি পদে নিয়োগে যেসব প্রস্তুতি জরুরি
বাংলাদেশ ব্যাংকের এডি পদে নিয়োগে যেসব প্রস্তুতি জরুরি
আজ থেকে বঙ্গভবনে অফিস করবেন নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল
আজ থেকে বঙ্গভবনে অফিস করবেন নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল
এআইয়ের পরামর্শ মেনে ২৪ ঘণ্টায় ২৫ একর ফসল নষ্ট চীনা কৃষকের 
এআইয়ের পরামর্শ মেনে ২৪ ঘণ্টায় ২৫ একর ফসল নষ্ট চীনা কৃষকের 
সর্বশেষসর্বাধিক